কাজলরেখা পর্ব ৫০
তানজিনা ইসলাম
আঁধার ঢাকার আসার পর বেশ কয়েকদিন খুব একাকিত্বে ছিলো। একেতো ওর ঢাকায় আসার কোনো ইচ্ছে ছিলো না, তারউপর ওর বাবা একপ্রকার জোর করেই পাঠিয়েছিলো ওকে।নিজের উপর হতাশা আর বাবার উপর রাগ থেকে খুব বিষণ্ণতায় ছিলো ও। ভার্সিটির প্রথম দিন গুলো আরো জঘন্য ছিলো ওর জন্য। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ, সব অপরিচিত মানুষ, আঁধার কোনোভাবেই খাপ খাওয়াতে পারছিলো না। ও সবসময় ক্লাসে, কর্ণারে একাকি বসে থাকতো। যখন সবাই হৈ-হুল্লোড়, বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে থাকতো, ও চুপচাপ লাইব্রেরিতে বসে থাকতো। ছেলে মানুষ, হতাশা একাকিত্ব, রাগ সব একসাথে চেপে ধরেছিলো ওঁকে।
ভার্সিটির তেমনই একটা বোরিং দিনে, নির্জনে চুপচাপ বসেছিলো আঁধার।তখন ওর পরিচয় হয়েছিলো শাবিহার সাথে। শাবিহা নিজ থেকেই এসেছিলো ওর সাথে কথা বলতে।
তখন কাঠফাটা রোদ্দুরে পর্যবসিত দুপুর। কারেন্টও ছিলো না। অসম্ভব গরমেও আঁধার চুপচাপ বসেছিলো। শাবিহা এসে বসলো ওর পাশের চেয়ারে। আঁধার তাকালো ওর দিকে। শাবিহা ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। আঁধার আগে থেকেই চিনতো শাবিহা কে। ভার্সিটিতে প্রথম দিন এসেই শাবিহা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরেছিলো। সে এমপির মেয়ে বলে টিচাররা খুব তোলাতোলা করতো তাকে।সবাই খুব তোষামোদ করতো মেয়েটাকে।আঁধার বরাবরই নিজের প্রতি অবসেসড। কে কি সেসব দেখার প্রয়োজন নেই। ও কখনো শাবিহার সাথে নিজ থেকে কথা বলতে যায়নি। অথচ ক্লাসের অর্ধেক ছেলেই বোধহয় চায়তো শাবিহা একটু কথা বলুক তাদের সাথে। সেখানে আঁধারের কোনো কিছু যায় আসতো না। সবসময় ডিপ্রেসড হয়ে এক জায়গায় বসে থাকতো। উদাস, চুপচাপ, ইনোসেন্ট একটা ছেলে, শাবিহার নজর কেড়েছিলো এই বিষয়টায়।
-“তুমি কী খুব স্যাড? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
শাবিহার প্রশ্নে আঁধার ডানে বায়ে মাথা নেড়ে বললো
-“নাহ।আমি কী আপনাকে চিনি?”
আঁধার প্রথমেই শিউর হয়ে নিতে চেয়েছিলো, শাবিহা যেচে কেনো ওর সাথে কথা বলতে আসছে।
-“তুমি চেনো না।আমি চিনি তোমাকে।”
শাবিহা তুমি করেই বললো। আঁধার চঞ্চল দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকালো। পরক্ষনে শাবিহার দিকে তাকিয়ে দেখলো ও তাকিয়ে আছে।
-“কিছু বলতে চান?”
-“বন্ধু হবে আমার?”
-“নাহ!”
সংকোচহীন নাকচ।
-“এমনিই। আপনাকে আমার ঠিক লাগে না।”
-“মুখের উপর বলে দিচ্ছো। ইম্প্রেসিভ! শোনো তুমি কী কিছু নিয়ে খুব ডিপ্রেসড? সবসময় মন খারাপ করে বসে থাকো!”
-“আপনি জেনে কি করবেন?”
-“আগে তুমি করে বলো।”
-“ইচ্ছে করছে না।”
-“বন্ধু হও।”
-“আপনার তো অনেক বন্ধু।সবাই বেশ তোষামোদ করে আপনাকে। যেচে পরে আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে আসছেন কেন?”
-“জানা নেই। শুধু জানি তোমার সাথে বন্ধুত্ব করতে ইচ্ছে করছে।”
আঁধার না চায়লেও কেমন কেমন করে যেন বন্ধুত্ব টা হয়েই গেলো। শুধু শাবিহার সাথে না। শাবিহার সব বন্ধুদের সাথেই আঁধারের বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। উল্টো শাবিহার চেয়ে ওঁদের সাথে আঁধারই বেশি ক্লোজ হয়ে গেলো। আঁধারের একাকিত্বতা, বিষন্নতা শেষ হলো। আর বন্ধুর সংখ্যা শুধু বাড়তেই থাকলো। আঁধার এমনিতেই মিশুক প্রকৃতির ছিলো।রিকের সাথে পরিচয়টাও হয়েছিলো শাবিহার মাধ্যমে। শাবিহার খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিলো ও। দিন যেতেই আঁধার খেয়াল করলো, শাবিহার আরেকটা বন্ধুমহল আছে যেটা,ভার্সিটির বন্ধুমহল থেকে আলাদা। তাদের সাথে শুধু শাবিহা ক্লোজ, বাকিরা এমনিতে কথা বলে। আঁধার এমনিতে কথা বলতে গিয়ে জড়িয়ে পরলো তাদের সাথে। তাদের মতো হতে গিয়ে নিজেকেই বদলে ফেলো। সেই লাগামছাড়া স্মার্ট বন্ধুদের সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে কতো কিছুতে যে জড়িয়ে পরলো। বারে যাওয়া, আ্যালকোহলে এডিক্ট হওয়া, মারামারি, র্যাগ দেওয়া আরো বহু অনৈতিক কাজে যা ওর মতো একটা ছেলের করার কথা ছিলো না। এতোটা উচ্ছ্ন্নে গিয়েছিলো যে ওর বাবার কথা পর্যন্ত শুনতো না ও। শুধু রিকের মতো রেড লাইট এরিয়াতে যাওয়াটাই বাকি ছিলো।
কিন্তু শাবিহার সাথে রিলেশনে যাওয়ার পর ওর রিককে অকারণেই বিরক্ত লাগতো। আঁধার সবসময়ই কন্ট্রোলিং নেচারের। ওর প্রিয় মানুষ শুধু ওর। আর কারো না। রিক খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিলো শাবিহার।আঁধার জানে শাবিহা ভালো মেয়ে। ও কখনো কোনো অ্যারোগেন্সি দেখেনি শাবিহার। সবার চেয়ে আঁধারের প্রতি বেশি এটাচমেন্ট ছিলো ওর। আঁধার কখনো বলেনি, তোর ওই বাজে বন্ধুটার সাথে কম মিশবি শাবিহা। শাবিহা নিজ থেকেই দূরে সরে গিয়েছিলো কারণ আঁধার অকারণেই জেলাস হতো।যার কোনো ভিত্তি ছিলো না। শাবিহার ভালোবাসার পরিমাণটা আঁধার কখনো জানতে পারেনি, জানার চেষ্টা করেনি। করলে, শুধু দেড় মাসের যোগাযোগ বন্ধে আঁধার চট্টগ্রামে চলে যেতে পারতো না।ওর কাজিনের সাথে ওর বাবা ওর বিয়ে ঠিক করেছে, সেটা জানা মাত্রই সে কাজিনকে বিয়ে করার জন্য রাজি হয়ে যেতে পারতো না। শাবিহা পারেনি কখনো।আঁধার পেরেছে। ও কখনো ভালোইবাসেনি শাবিহাকে।ওর মনে হয়, ওই শুধু কেয়ার করে,ওই শুধু ভালোবাসে। ওঁকে কখনো কেও ভালোবাসেনি। অথচ ভালোবাসার পরিমাণটা বিপরীত পাশের মানুষটারই বেশি থাকে সবসময়।
আঁধার জিন্সের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। ও ওর বন্ধুদের সাথে নেই। আবার চাদনীর পাশেও নেই। চাদনীকে ঘিরে ওর বন্ধুরা। আঁধার এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে রাতের দিকে। রাতও ক্ষণকাল পরপর দেখছিলো ওঁকে। তবে এখন সে দেখা৷ ইস্তফা ঘটিয়েছে। কিছু স্পেশাল গেস্ট দেখা করতে এসেছে রাতের সাথে। সে কথা বলায় ব্যস্ত। অন্য কোনোদিকে তার নজর নেই। চাদনী কয়েকবার তাকালো আঁধারের দিকে। আবার চোখ ঘুরিয়ে রাত কেও দেখলো। আঁধার মূলত করতে চাচ্ছে টা কী সেটাই বুঝে আসছে না ওর।রাতের দিকে তাকাতে গিয়ে আঁধারের সাথে কয়েকবার চোখাচোখি হলো চাদনীর। আঁধার ততবার চোখ ছোটছোট করে তাকিয়েছে। পার্টি থেকে বেরোতে পারছে না শুধু ও। নয়তো এই মেয়ের তাকানো বের করতো। আজ ওর কপালে শনি আছে। চাদনী ঢোক গিললো।
আচ্ছা, রাত কী প্রশ্ন করতে আসবে ওর থেকে। যদি প্রশ্ন করতে আসে চাদনী মিথ্যে কেন বললো! চাদনী কি উত্তর দেবে? ও তো জানাতে পারবে না আঁধার ওঁকে মানা করেছে। আবার আধারও চড়াও হবে ওর উপর। পরে আবার মনে হলো, রাত কেনো প্রশ্ন করবে! হয়তো ওর মনেই নেই চাদনী ওকে কি বলেছে না বলেছে। এতো কিছু মনে রাখার সময় কই রাতের।চাদনী নামটাও তো ঠিকঠাক মনে রাখতে পারে না ও।
রিক চেয়ারের উপর বসে রাগে ফোঁসফোস করছে। খুব রাগ হচ্ছে ওর। এতোটা ইগো হার্ট কোনোদিন হয়নি ওর। এই আঁধার বদমাইশটা সবার সামনে বেইজ্জত করলো ওঁকে। শুধু শাবিহার জন্য কিছু করতে পারলো না ও। নয়তো ওর হাতও চলতো। শাবিহা থামিয়ে দিলো। এখনও এতোটা টান মেয়েটার! আঁধার তো ঠিকই বিয়ে করে ফেললো। শাবিহা কেন এতো এটাচমেন্ট রেখে দিচ্ছে ওর প্রতি!
শাবিহা এসে দাঁড়ালো ওর পাশে। রিক ওর উপস্থিতি বুঝতে পেরেও মাথা তুললো না।
-“রাগ করেছিস?”
শাবিহা প্রশ্ন করলো। কিন্তু রিক উত্তর দিলো না। শাবিহা ঢোক গিলে বললো
-“সরি রে।”
-“এখানে কেন এসেছিস? যা আঁধারের সামনে গিয়ে দাঁড়া! তা-ও বা দাড়াবি কী করে? সে তো বউয়ের পাশ ছাড়ছেই না। প্রয়োজনের সময়ই তোকে লাগে। বাকি সময় চেনেও না তোকে।”
শাবিহা ওর কথা আমলে না নিয়ে বললো,
-“এমন করছিস কেন?ছোট একটা মেয়ে। জানিস এখনো আঠারোও হয়নি ওর। আমার ছোট ভাইয়ের সমান।এভাবে কেন বললি?”
-“ও, এখন তোকে কৈফিয়ত দেবো!
-“কৈফিয়ত না! বাট এমন রিয়েক্ট কেন করলি তুই?”
-“আমার ইচ্ছা। ভাই একটা সিম্পল হাগ দিতে গিয়েছিলাম। এভাবে চড়াও হওয়ার কি আছে! গাইয়া কতোগুলা!”
-“সবাই তো তোর মতো স্মার্ট না, কম্ফোর্টেবল ছিলো না ও। গ্রাম থেকে এসেছে ভাই। এসব কী নরমাল ওর কাছে?”
-“নরমাল না হলে পার্টিতে এসেছে কেন? তার পসেসিভ হাসবেন্ডের উচিত ছিলো তাকে,ঘরে লুকিয়ে রাখা।”
শাবিহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
-“হয়েছে তো। থাম এবার। সরি বলেছি না!”
-“রাখ তোর সরি। খুব রাগ হচ্ছে আমার। ও তোর সাথেও এমন করতো। এই ছেলেটার জন্য তুই আমার সাথে দূরত্ব বাড়িয়েছিলি শাবিহা? দেখ, ওঁকে।
রিক আঙুল তাক করলো আঁধারের দিকে। শাবিহা তাকালো সেদিকে। ও চাদনীর পাশ ছেড়ে নড়ছেই না। শাবিহা তাকাতেই রিক বললো
-“ও তোকে কখনো ভালোইবাসেনি। নয়তো কিছুদিনেই তোকে এভাবে ভুলে যেতে পারতো না।”
-“আমি তো ভালোবেসেছি।”
-“ওই বাস্টার্ড ভালোবাসা ডিজার্ভ করে না।”
শাবিহা টলমলে দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। ভাঙা গলায় বললো
-“গালি দিবি না ওঁকে।”
-“এখনো এতো টান?”
-“নাহ, টান নেই। ভুলে যাচ্ছি তো। খুব করে চেষ্টা করছি। আর কতো করতে বলছিস?”
-“ভুলিস না! এতো সহজে ছেড়ে দিবি।”
-“তো কী করবো? ছেড়ে না দিয়ে আর করার কী আছে আমার। ধরে তো রাখতে চেয়েছিলাম। থাকেনি।”
রিক শক্ত কন্ঠে বললো
-“তুই ওঁকে চাস শাবিহা?”
-“আরেকজনের হাসবেন্ড কে?”
-“যেটা প্রশ্ন করছি সেটার উত্তর দে, বাড়তি কথা বলিস না।”
-“নাহ, চাই না।”
-“সত্যি?”
শাবিহা উত্তর দিতে পারলো না। রিক ওর দিকে তাকিয়ে বললো
-“আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল। চাস না?”
শাবিহা বললো
-“চাইলে কী? পাবো? কবেই তো হারিয়ে গেছে। মেনে নিয়েছি যা হয়েছে।”
-“নাহ, মেনে নিবি না।কেড়ে নিবি। তুই শুধু একবার বল তুই চাস ওঁকে।”
-“কী করবি তুই?”
-“দেখতে পাবি। আর তোর জানার দরকার নেই। সে তোর হলেই হলো।”
-“সে হবে না আমার। সে অন্যজনের।”
-“হবে। কথা দিচ্ছি তো। প্রমিস করছি।
পরক্ষনে দাঁতে দাঁত চেপে বললো
-“কি যেন নাম! চাদনী! ওর ব্যবস্হা আমি করবো। চিন্তা করিস না।ওই মেয়েটার জন্য তোর বন্ধু আমার মেইল ইগো হার্ট করেছে। যাহ, তোর অন্ধকার কে ছেড়ে দিলাম, ওই মেয়েকে ছাড়বো না আমি।”
শাবিহা উতলা হয়ে বললো
-“প্রতিশোধ নিবি?মেয়েটার কোনো ক্ষতি করিস না। ছোট একটা মেয়ে।”
-“লেদা বাচ্চা।”
-” না হোক। আমাদের তুলনায় ছোটই। গ্রামের মাইন্ডসেট অন্যরকম বলে বিয়ে হয়ে গেছে। আমাদের শহরে ও লেদা বাচ্চাই।”
-“তুই নিশ্চিন্তে থাক।”
-“কিছু করিস না।”
-“নাহ। শুধু তুই যা চাস তা পাবি।আমার বন্ধুত্বের একটা দায়িত্ব আছে না।”
শাবিহা মুখ কালো করে বললো
-“যা করবি কর। আমি না ফাসলেই হলো। বড় ভাইয়া খুব রাগ করবে। এজন্যই আমি পারছি না। না পারছি সহ্য করতে, না পারছি মেনে নিতে। ওঁকে ভুলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।”
-“তোর বড় ভাইয়ের কী হয়েছে?”
-“সে এসব নিয়ে খুব সেন্সিটিভ। সংসার ভাঙা সহ্য করতে পারে না। তুই জানিস তো, আম্মু…
শাবিহা আর বলতে পারলো না। রিক বললো
-“বুঝতে পেরেছি। তোর বড় ভাই কিছু জানতে পারবে না। একটা জবরদস্ত প্ল্যান আছে আমার কাছে। শুধু জেনে রাখ ওই প্ল্যানে তুই সামিল নেই। কিন্তু লাভ তোর আর আমার দু’জনেরই হবে।”
-“তোর লাভ কী করে?আমি সাবধান করছি তোকে, উল্টাপাল্টা কিছু করবি না তুই। আমার নাম দিয়ে নিজের সাধ্যসিদ্ধি করার কথা ভাবলে, ওই ভাবনা মাথা থেকে ঝেরে ফেল।”
কাজলরেখা পর্ব ৪৯ (২)
-“ওইটা সিক্রেট থাক। তুই না ফাসলেই হলো।”
রিক শয়তানি হাসলো। শাবিহা বুঝতে পারলো না ওর হাসির কারণ। ও খুব খারাপ কিছু করবে শাবিহা বুঝতে পারছে। যেটা চাদনীর জন্য একটুও ভালো হবে না।তবুও শাবিহা ওঁকে মানা করলো। চাদনীর সাথে খারাপ হলে ওর কী? ওর ভালোটুকু হলেই হলো।
