Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৫

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৫

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৫
সানজিদা আক্তার মুন্নী

তৌসিরের এই অচেনা রূপ দেখে নাজহার মুখে কোনো শব্দ ফোটায় না। সে নিঃশব্দে ঘুরে দাঁড়ায় তারপর ধীর পায়ে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। দৃশ্যটি দেখে তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে, এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় নীল হয়ে উঠছে ভেতরটা। তারপরও নির্বাক দর্শক হয়ে দূর থেকে দেখা আর দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আজ তার আর কিছুই করার নেই। ওদিকে নাজহাকে চলে যেতে দেখেও তৌসিরের কোনো ভাবান্তর হয় না সে নির্মম উদাসীনতায় নিজের কাজ চালিয়ে যায়।

নাজহা ঘরে চলে আসে দ্রুত পায়ে। এসব দেখে ভয়ের চেয়ে বেশি ঘেন্না লাগছে তার। বমি পাচ্ছে তার। এসব দেখে নাজহার সারা শরীরে একপ্রকার ঘিনঘিনে ভাব ধরে গেছে। নাজহা ঘরে এসে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে যায়, গিয়েই বেসিনে ‘ওয়াক’ করে এক গাল বমি করে দেয়।
এই রক্ত, চামড়া এসব দেখে অভ্যস্ত সে, কিন্তু আজকেরটা অতিরিক্ত ছিল। তৌসির এমনটা করবে, তা আশার বাইরে ছিল না। নাজহা জানে তৌসির এমনই, তারপরও খারাপ লাগছে নাজহার, ঘেন্না লাগছে তার। নাজহা বমি করে, কুলি করে চোখে-মুখে পানি দিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই ওর ফোনে নাজহারের কল আসে। সে কল ধরেই জানায়, লুসিয়ান গুম হয়ে গেছে, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। এখন নাজহা কী করে বলবে নাজহারকে যে, লুসিয়ানকে তারই স্বামী জ্যান্ত কবর দিয়ে দিয়েছে? বলার সাধ্য কি তার আছে আদৌ? নাজহা তো অভিনয়ে নোবেলজয়ী, তাই সেও কথাটা ইনিয়ে-বিনিয়ে এড়িয়ে নেয়, নিজেও সমবেদনা জানায়। অনেকক্ষণ কথা বলার পর ফোন রাখে নাজহা।
ফোনে কথা বলতে বলতে বেলকনিতে চলে গিয়েছিল। ফোন শেষে বেলকনি থেকে এসে দেখে, তৌসির ঘরে এসে গোসল করে নিয়েছে। নাজহা তৌসিরের দিকে তাকিয়েও তাকায় না; মানে চোখ নামিয়ে নেয় আরকি একপলক তার পানে চেয়ে। তৌসির সরিষার তেল হাতের তালুতে নিয়ে ঘষে গায়ে মাখতে মাখতে নাজহার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করে, “কী হইলো? তুমি আমার দিকে তাকিয়ে এমনি চোখ ফিরাইয়া নিলা ক্যান?”

এটা বলে তৌসির নাজহার একদম নিকটে এসে দাঁড়ায়। নাজহা কোনো কথা বলে না, শব্দহীনভাবে তৌসিরের পাশ কাটিয়ে যেতে চায় কোনোপ্রকার বাক্য না ছুঁড়ে। তথাপি সে যেতে চাইলেই কি তৌসির যেতে দিবে? নাহ, অবশ্যই নাহ তৌসির তাকে যেতে দিবে না। তৌসির নাজহার ডান হাতের বাহু টেনে ধরে তাকে নিজের সামনে দাঁড় করায় আর তিতকুটে গলায় উচ্চারণ করে, “ছিনাল, সাউয়ার সাউয়ার করিস না, নয়তো সাউয়া ফাইরা নিমু। কিতা হইছে? ক আমারে! চলে যাচ্ছিস ক্যান? আমার দিকে তাকাস না ক্যান?”
নাজহা তৌসিরের মুখ হতে এই বিষে ভেজা অরুচিকর উক্তিগুলো শুনে তার চোখের দিকে মুখ তুলে তাকায় আর বলে, “আমার আপনার দিকে তাকালে বমি আসবে, তাই তাকাচ্ছি না। এই যে একটু আগে আপনার অবস্থা দেখে বমি করেছি, তাই আবারও করার সম্ভাবনা আছে, তাই তাকাচ্ছি না।”
তৌসির নাজহার থুতনিতে হাত রেখে হাসতে হাসতে বলে, “ওরে মারছি কারণ ও গাদ্দারি করছে। আর গাদ্দারগো এমন চু***দে দিতে হয়, বুঝলি?”

এটা বলে তৌসির মুখ নামিয়ে এনে নাজহার ঠোঁটের কিনারায় চুমু খায়। নাজহার কাছে এই চুমু মনে হচ্ছে বিধ্বংসী ছোঁয়া এই ঠোঁটের ছোঁয়া এই মুহূর্তে তার কাছে বিষময় স্পর্শের সমান। নাজহা বিরক্ত হয়ে তৌসিরকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে নিতে নিতে বলে, “এসব ভালো লাগে না। এক চুমু খাওয়া… এত চুমু আমি নিতে পারব না।”
তৌসির নাজহার এই বিরক্তি প্রকাশ দেখে বলে ওঠে, “শোন লো ছিনাল, এই যে দিন দিন তুই এত সুন্দর হইতেছিস, সেটা একমাত্র আমার এই দেওয়া চুমুর জন্য। কারণ বউরে জামাই বেশি বেশি চুমু দিলে বউয়ের সৌন্দর্য বাইড়া যায়।”
নাজহা এমন কথা শুনে তৌসিরের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে, “এইসব হাদিস আর লজিক আপনি কোথায় পান?”

“হাদিস মনে হয় শুধু তুই আর তোর নোবেল-প্রাপ্ত বদমাশ বাপ-চাচাই জানে? আমিও হাদিস জানি।”
ইবলিশের মুখে কালিমার কথা শুনে মানুষ যেমন চমকায়, তৌসিরের মুখেও এমন কথা শুনে এমনভাবেই চমকায় নাজহা। তৌসিরকে জিজ্ঞেস করে, “বাহ বাহ! তাহলে শোনান তো।”
তৌসির বলে, “সর, পিছনে সর। গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকা, বলতাছি।”
এতটুকু বলে তৌসির নাজহার দিকে এক কদম এগোয়। নাজহা তৌসিরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পিছনে পা ফেলে। ধীরে ধীরে একসময় তার পিঠ ঠেকে যায় দেয়ালে। তৌসির নাজহার একদম নিকটে এসে নাজহাকে বলে, “প্রথমটা হইলো, যে বউ জামাইর সামনে যত খোলামেলা থাকবে, তার তত সওয়াব। যে বউ স্বামীর সাথে মিষ্টি কথা বলে, স্বামীকে তৃপ্তি দেওয়ার জন্য হাসে, হাসির সাথে যতটা দাঁত বের হয়, প্রতিটা দাঁতের জন্য একটা নফল হজের সওয়াব দেওয়া হয়। যে স্ত্রী স্বামীকে রাতে বলে ‘আপনি খুশি না হওয়া পর্যন্ত আমি ঘুমাব না’, সে স্ত্রী জান্নাতি। আর শুনতে চাস হাদিস?”

নাজহা তৌসিরের কথায় হাসবে না রাগ করবে গুলিয়ে ফেলছে। মতলবের হাদিস ভালোই জানে তৌসির। নাজহা তৌসিরকে রাগী গলায় বলে, “মতলবের হাদিস তো ভালোভাবেই জানেন দেখতেছি। তাহলে এটাও শুনুন, কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে কিপ্টামি করে কিছু না দেয়…,,,,,
টাকার আর কিপ্টামির প্রসঙ্গ আসতেই তৌসির নাজহাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, “আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর বলতে হবে না। এখন আমার জন্য চা নিয়ে আসো, যাও।”
“হ্যাঁ, এখন তো শুনতে হবে না। এখন যে উচিত হাদিস চলে আসছে কথার টানে।”
এটা বলে নাজহা তৌসিরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে চলে যেতে চায়। তৌসির ফের তার হাত ধরে নিয়ে বলে, “একটু চুমু খাই? পরে যাইস।”

নাজহা বিতৃষ্ণা নিয়ে বলে, “দিন, তাড়াতাড়ি দিন। নিচে কাজ আছে।”
তৌসির নাজহার গালে টুপ করে বারকয়েক ঠোঁট ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে বলে, ” তালুকদারের মাইয়া আইজ রাইতে কিন্তু খেলা হবে, মনে থাকে জেনো।”
নাজহা এটা শুনে তৌসিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন কেন? আমি তো আপনাকে বিয়ের পরের দিনি বলেছি, আপনার যা ইচ্ছে করুন, আমার সমস্যা নেই।”
তৌসির মুচকি হেসে শুধায়, “দেখ তালুকদারের মাইয়া, আমার কাছে তোর শরীর পাওয়াটা বড় বিষয় না। নিজের পৌরুষের চাহিদা মেটাতে তো চুটকি মারলেই মাগীরা বিছানায় কাপড় খুইলা আমার জন্য পইড়া যাইব। কিন্তু আমি তো এসব চাই না। আমি বিয়ের রাইতেই তোর উপর জোর খাটাইতে পারতাম, কিন্তু খাটাই নাই। কেন জানস?”
নাজহা নিরসভাবে জিজ্ঞেস করে, “কেন?”

তৌসির নাজহার গালে দুই হাত রেখে মৃদু হেসে বলে, “বিশ্বাসের লাইগা, ভরসার লাইগা। এই যে আমি তোর বুকে মাথা রাখলে তুই আমার মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে আমার চুলের ফাঁকে হাত বুলিয়ে দেস যদি তোর লগে আমি জোর করতাম, এইটা তুই কখনো করতি না। এই যে রাইতে-দিনে যখন ইচ্ছে তখন আমার বুকে ঘাপটি মাইরা শুইয়ে থাকস, এইটা হলো ভরসা। এই ভরসা তুই আমারে কখনো করতি না, যদি তোর লগে উল্টাপাল্টা নিজের মন মতো করতাম কিছু। এই যেমন মনে ধরে ওমন ওড়না ছাড়া বেসামাল অবস্থায় আমার সামনে থাকস আমি তোর উপর শিকারীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়লে এটা কখনো করতি না। সবশেষে, তুই আমারে ভরসাই করতি না। এমনিই তো ঘেন্নাস, আরও বেশি ঘেন্নাইতি। নয়তো চাহিদা আমারও আছে, শুধু কন্ট্রোল রাখি কারণ আমি বিশ্বাস করি ধৈর্য আর বী*** সামলাতে পারলেই জীবন সহজ।

তৌসিরের কথাগুলো একদৃষ্টিতে চেয়ে শোনে নাজহা সব কথা সুন্দর লাগলেও শেষের কথা ভালো লাগে না মুঠেও ভালো লাগে না। কী সুন্দর বোঝাল সে নাজহাকে! আদৌ যদি তৌসির সবদিক এতটা ভাবত, তাহলে কতই না ভালো হতো! নাজহা তৌসিরের কথাগুলো গিলে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু উঁচু হয়ে তৌসিরের গালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তৌসিরের পানে চেয়ে। ধীরলয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, কোনোপ্রকার কথা না বলে তৌসিরের জন্য চা আনতে।

ওয়াসেম একজনকে খুন করতে গিয়ে নিজেই আঘাত পেয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে যাকে মারতে চেয়েছিল, তাকে মেরেই ফিরেছে। যে লোকটাকে মেরেছে, তাকে যখন ধরে, তখন সে ভারী কিছু দিয়ে ওয়াসেমের কপালে আঘাত করেছে। কপাল ফেটে রক্ত বেরিয়েছে, তাই ফার্মেসিতে গিয়ে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে ফার্মেসির পাশের দোকানেই চুল আর দাড়ি-গোঁফ ছাঁটিয়ে, পশুর মতো অবস্থা থেকে মানুষের মতো চেহারা বানিয়ে বাড়ি ফিরেছে।
তবে বাড়ি ফিরে বাড়ির সদর দরজার চৌকাঠ মাড়াতেই ওয়াসেমের শান্ত মেজাজটা টগবগে জ্বলে ওঠে। লিভিং রুমের সোফায় আয়রাদ বসে আছে, তার সামনে তৃষ্ণা চায়ের ট্রে এগিয়ে দিচ্ছে। আয়রাদ তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চায়ের কাপটা নিচ্ছে। ওয়াসেম এ দৃশ্য দেখে থেমে যায়; যতখানি পর্যন্ত এসেছিল, ততখানিই পা থেমে যায় ওর। কত বড় সাহস আয়রাদের! কত বড় কলিজা! তার বাড়িতে ঢুকে তারই জিনিসের উপর নজর দিচ্ছে! ওয়াসেমের তো মন চাচ্ছে আয়রাদকে কেটে টুকরো টুকরো করে কুত্তাকে খাইয়ে দিতে। কিন্তু সে এখন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। দেখালে তৃষ্ণা মনে করবে ওয়াসেম তৃষ্ণার উপর অধিকার দেখাচ্ছে বা ওয়াসেম তৃষ্ণার প্রতি দুর্বল। এইসব ভেবে ওয়াসেম নিজেকে সংবরণ করে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যায় সিঁড়ির দিকে। আয়রাদকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যায়, তবে যাওয়ার আগে তৃষ্ণাকে বলে যায়, “তৃষ্ণা, ঘরে আয়।”

তৃষ্ণা ওয়াসেমকে দেখেনি, তবে তার গলা শুনে পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে সে ঘরের দিকে যাচ্ছে। এ দেখে সে তাড়াতাড়ি চায়ের ট্রে-টা নিয়ে রান্নাঘরে যায় গিয়ে সিতুজাকে বলে, “মা, উনি আমাকে ডাকছেন। আমি যাই? আপনি মেহমানকে দেখুন।”
সিতুজা তরকারি রান্না করছিলেন। তিনি পিছনে ফিরে তৃষ্ণাকে জিজ্ঞেস করেন, “ওয়াসেম চলে আসছে? আচ্ছা তুই যা, আমি দেখতেছি।”
তৃষ্ণা মাথা নেড়ে বলে, “আচ্ছা।”
আয়রাদ একটা কাজে এসেছে তাদের বাড়িতে। তার বাড়ি দিল্লিতে। গুজরাটে এখানে অর্থাৎ পাটোয়ারী বাড়িতে কিছুদিন থাকবে সে। কাজ তো বাহানা, লক্ষ্য হলো তৃষ্ণা।
তৃষ্ণা দ্রুত পায়ে ঘরে যায়। ঘরে গিয়ে দেখে ওয়াসেম ঘরে নেই, তবে বাথরুম থেকে পানির শব্দ আসছে। তৃষ্ণা তাড়াতাড়ি ওয়াসেমের গামছা আর লুঙ্গি আলমারি থেকে নিয়ে বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আওয়াজ দেয়, “আপনার লুঙ্গি নিন।”

ওয়াসেম রাগ আয়ত্তে আনতে শাওয়ার ছেড়ে শাওয়ারের নিচে বসে আছে। আয়রাদকে একদম সহ্য হয় না তার। বারবার চোখের সামনে আয়রাদ যে তৃষ্ণাকে দেখছে, সেই দৃশ্য ভেসে উঠছে। মন তো চাচ্ছে আয়রাদ আর তৃষ্ণা দুজনকে কিমা বানিয়ে খেয়ে নিতে! এমন রাগের মুহূর্তে তৃষ্ণার ডাক আর তার উপস্থিতি ওয়াসেমকে পাগল করে দেয়। ওয়াসেম তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বাথরুমের দরজা খোলে। এক পলক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তৃষ্ণার দিকে পরখ করে নেয়। তারপর কিছু না বলে দাঁত চেপে তৃষ্ণার ডান হাতের কবজি চেপে ধরে তাকে এক টানে বাথরুমের ভেতর নিয়ে যায়। নিয়ে গিয়ে সোজা শাওয়ারের নিচে দাঁড় করিয়ে দেয় তাকে।

আকস্মিক এমন হওয়ায় তৃষ্ণা তো ভেবেই পায় না এই লোক এমন কেন করল? কী হলো? হঠাৎ এমন উন্মাদ হয়ে গেছে কেন? ওয়াসেম তৃষ্ণার দুই হাতের বাহু দাঁত চেপে ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে শাওয়ারের ঠান্ডা পানির নিচে। তৃষ্ণা ওয়াসেমকে কিছু বলার জন্য তার দিকে মুখ তুলে তাকায়। তাকিয়ে বেশ বিস্ময়ে পড়ে যায় এখন আর তার জঙ্গলের মতো চুল-দাড়িগুলো নেই। এখন খুব পরিপাটিভাবে তা কাটা, সাথে কপালে ব্যান্ডেজ করা। তৃষ্ণার দুই হাতের বাহু ছিঁড়ে যাচ্ছে, এমন জোরে চেপে ধরেছে ওয়াসেম তার বাহুদ্বয়। তৃষ্ণা ওয়াসেমের মাথায় ব্যান্ডেজ দেখে বুঝে যায়, এই লোক কারো সাথে মারপিট করে এসেছে। এ নতুন কিছু নয়, সবসময়ই ওয়াসেমের কপাল, হাত-পা কাটা-ছেঁড়া থাকে। তৃষ্ণা বুঝতে পারে ওয়াসেম অন্যের রাগ তৃষ্ণার উপর মেটাচ্ছে। তৃষ্ণা ব্যথায় হাত থেকে ওয়াসেমের গামছা আর লুঙ্গিটা ছেড়ে দিয়ে কাতর স্বরে বলে, “কী হয়েছে আপনার? আমি গোসল করেছি, এভাবে কেন ভেজাচ্ছেন আমায়? অন্যের রাগ আমার উপর কেন ঝাড়ছেন?”

এ কথা শুনে তো ওয়াসেমের চোখ দুটো রক্তবর্ণ ধারণ করে, রাগ আর ক্ষোভ দ্বিগুণ চওড়া হয়ে যায়। ওয়াসেম ঠাস করে তৃষ্ণাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে ঝাঁকিয়ে তুলে বলে, “তোর সাহস কী করে হয় শালী? তুই ওই আয়রাদের সামনে যাস? বল, কেন গিয়েছিস?”
তৃষ্ণার জান বেরিয়ে যাচ্ছে। তার উপর এখন ওয়াসেম একদম ওর শরীরের সাথে মিশে যাচ্ছে। এতদিন তো হাত দিয়ে তাকে দেয়ালে চেপে ধরে শাসাত, আজ শরীর দিয়ে শাসাচ্ছে। তৃষ্ণা যন্ত্রণায় কাতর গলায় উচ্চারণ করে, “মা বলেছিল তাই গিয়েছি। শুধু চা দিতে গিয়েছি।”
“মা বলল আর তুই চলে গেলি? মা যদি বলে কাপড় খুলে নাচতে, তো তুই নাচবি? যে মায়ের অজুহাত দিচ্ছিস!”
এমন কুরুচিপূর্ণ কথা শুনে তৃষ্ণা ওয়াসেমের রাঙানো চোখের দিকে তাকিয়ে বড় বিষাদভরা গলায় জিজ্ঞেস করে, “আপনি এত নোংরা কথা কীভাবে আমায় নিয়ে বলেন? সবসময় তো আপনার সামনেই থাকি, কখনো নোংরামিতে পেয়েছেন?”

ওয়াসেম তৃষ্ণার প্রশ্নের উত্তর দেয় না। উল্টো রাগ দেখিয়ে পাশে থাকা একটা বালতিতে সজোরে লাথি মারে। এক ঘুষি দেয়ালে বসিয়ে দেয় আর চিৎকার করে ওঠে, “তুই যদি ওর সামনে আর যাস, তাহলে আল্লাহর কসম আমি ওর লগে তোরেও কবর দিব।”
তৃষ্ণা ওয়াসেমের থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে, “ওয়াসেম আমাকে ছাড়ুন, আমার দম বন্ধ লাগছে। আমি আর যাব না তার সামনে।”

ওয়াসেম এটা শুনে কিছুটা শান্ত হয় ও তৃষ্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। তৃষ্ণা বুঝে যায় এখন তার সাথে কী হবে। ওয়াসেম নিশ্চয়ই এখন তার চুলের মুঠি করে ধরবে। ওয়াসেম যখন তার মাথায় হাত রাখে, তখনই চুলের মুঠি করে ধরে। খুব কষ্ট হয় তৃষ্ণার, চুলের গোড়ায় দুদিন যাবৎ ব্যথা থাকে। তৃষ্ণা ওয়াসেমের চোখের দিকে তাকিয়ে অসহায় হরিণীর ন্যায় দুদিকে মাথা নেড়ে বলে, “আমার চুলগুলো টেনে ধরবেন না, চুলের গোড়ায় ব্যথা করে।”
ওয়াসেম তৃষ্ণার মুখে ব্যথার কথা শুনে ওয়াসেম তৃষ্ণার চুলের ফাঁকে আঙ্গুল ঢুকিয়ে আরও জোরে চেপে ধরে চুলের একাংশ চেপে ধরে। চেপে ধরে তৃষ্ণাকে একদম নিজের সম্মুখে নিয়ে এসে, তৃষ্ণার গালে নিজের নাক চেপে ধরে জোরে জোরে শ্বাস ছেড়ে বলে, “আমি তোকে ব্যথা দিব, সারাজীবন তোকে ব্যথা দিব।”

তৃষ্ণা তো সবসময়ই ওয়াসেমের দ্বারা অত্যাচারিত হয়, কিন্তু কখনো ওয়াসেম তার গা ছুঁয়ে বাজেভাবে স্পর্শ করেনি। যেটা কখনো করেনি, ওয়াসেম আজ সেটাও করল। তৃষ্ণা ওয়াসেমকে নিজের থেকে সরিয়ে নিতে সাহস করে ওয়াসেমের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলে, “আমাকে এত বাজেভাবে স্পর্শ কেন করছেন?”
এ শুনে ওয়াসেম আরও জোরে তৃষ্ণার চুল চেপে ধরে তাকে নিজের পাঁজরের কাছে নিয়ে এসে ঝাঁকিয়ে তুলে বলে, “আমার স্পর্শ বাজে লাগছে? এখন নতুন নাগর দেখেছিস তাই বাজে লাগছে?”
এটা বলে ওয়াসেম তৃষ্ণার ঠোঁটের কিনারায়, নাকে, মুখে, গালে, কপালে যেভাবে পারে ওভাবে বন্য হিংস্রের রূপে এলোপাতাড়ি চুমু খেতে শুরু করে। তৃষ্ণা যে বলবে ‘আমাকে ছাড়ুন’, সেই সুযোগও নেই তার। ওয়াসেম একপর্যায়ে তৃষ্ণার কোমর অন্য হাতে চেপে ধরে। তার গলায় মুখ গুঁজে তৃষ্ণার গলায় জমে থাকা বিন্দু বিন্দু পানিগুলো শুষে নিতে থাকে। দাঁত চেপে ধরে তৃষ্ণার গলার চামড়ায়। ওয়াসেমের এই উন্মাদনা তৃষ্ণা সহ্য করতে পারছে না, প্রাণটা বেরিয়ে যাচ্ছে তার। তৃষ্ণা চোখ বন্ধ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে বলে, “ওয়াসেম আমার চুলটা ছাড়ুন। আর কত? আমার গলা জ্বলছে। ওয়াসেম, একটু দয়া করুন না আমায়।”

ওয়াসেম তৃষ্ণার আর্তনাদ শুনে তৃষ্ণাকে ছেড়ে দেয়। নিজে কী করছিল নিজেরই বোধগম্য হচ্ছে না। তৃষ্ণাকে ছেড়ে দিয়েই ওয়াসেম আবারো শাওয়ারের নিচে বসে পড়ে। তৃষ্ণা লজ্জায় আর ঘৃণায় এক মুহূর্ত এখানে দাঁড়ায় না, দ্রুত পায়ে বেরিয়ে চলে যায়। সারা শরীর ভিজে কাঠ হয়ে গেছে, সাদা রঙের কামিজ পরে থাকায় সারা শরীরের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে গেছে ভেজা অবস্থায়। তৃষ্ণা রুমে আসে, সারা রুমের ফ্লোর ভিজে যায় তার শরীরের পানিতে। ও কোনোরকমে কাপড় নিয়ে, কাপড় রাখার ঘরে গিয়ে ভেজা কাপড়গুলো ছেড়ে শুকনো কাপড় পরে। তারপর ভেজা ফ্লোর মুছে নেয়। মোছা শেষে ওয়াসেমের জন্য গামছা আর লুঙ্গি নিয়ে বাথরুমের সামনে দাঁড়ায়। দেখে ওয়াসেম গোসল শেষ করে ভেজা লুঙ্গি পরেই বের হতে নিচ্ছে। তৃষ্ণাকে দেখে তার হাত থেকে ছোঁ মেরে গামছা আর লুঙ্গি নিয়ে ওয়াসেম ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেয়। তবে লাগানোর আগে আঙুল নাচিয়ে হুমকি দেয়, “তুই যদি নিচে যাস, তাহলে ঠ্যাং দুটো কেটে গর্দানে ঝুলিয়ে দিব শালী তোর।”

তৃষ্ণা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। ওয়াসেম কাপড় বদলিয়ে বেরিয়ে আসে। এসে দেখে তৃষ্ণা সেই আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ওয়াসেম বেরিয়ে এসে তৃষ্ণার পাশে দাঁড়ায়। তৃষ্ণার ঠোঁট-গাল তার দাড়ির চাপে ছিঁড়ে যাওয়ার মতো দাগ পড়ে গেছে। তৃষ্ণার গলায় ওয়াসেমের দাঁতের দাগে লালচে হয়ে আছে। ওয়াসেম সব দেখেও তৃষ্ণাকে বলে না আড়াল করতে। মূলত তৃষ্ণা এখনো আয়না দেখেনি, দেখলে অবশ্য সে চোখ-মুখ ভ্যাসলিন দিয়ে এই দাগগুলো মুছে নিত। ওয়াসেমের মন চায় এই দাগগুলো থাকুক, এইগুলো আয়রাদ দেখুক। এবার কেন মন চাচ্ছে, কী জন্য চাচ্ছে, কী জন্যই বা এত হিংসে হচ্ছে ওয়াসেমের তা ওয়াসেম নিজেও জানে না। নিজের জাতশত্রুদের প্রতিও এত হিংসে হয় না, যতটা আয়রাদের প্রতি হচ্ছে ওয়াসেমের আজ। ওয়াসেম তৃষ্ণাকে হুকুম দিয়ে বলে, “যা, কাপড়গুলো বেলকনিতে মেলে দিয়ে আয়। আমি ধুয়ে দিয়েছি। খবরদার আবার ধুতে যাবি না। কাপড় পাঁচ মিনিটের ভেতর মেলে নিচে আসবি।”

তৃষ্ণা তো অবাক! বাহ, এত মহান হয়ে গেল ওয়াসেম? যে কাপড় ধুয়ে রেখেছে! এত মহান কী করে হলো সে? তৃষ্ণার তো হুকুম মানা ব্যতীত করণীয় কিছু নেই। মার খেয়েও ওয়াসেমের বাধ্য থাকতে হবে, নয়তো লাথি মেরে ওয়াসেম তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিবে। ওয়াসেম তৃষ্ণাকে হুকুম দিয়ে ঝটপট করে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। উদ্দেশ্য নিচে যাওয়া। নিচে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখে লিভিং রুমে আয়রাদের সাথে তার বাবা, মানে ইব্রাহিম সাহেব গল্প করছেন। ওয়াসেম আয়রাদের দিকে ক্ষিপ্ত বাঘের ন্যায় এক নজর তাকায়। তারপর ধীরে ধীরে আয়রাদের মুখোমুখি সোফায় বসে পড়ে। আয়রাদ ওয়াসেমকে দেখে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে, “কী অবস্থা ওয়াসেম ভাই?”
ওয়াসেম সৌজন্যতার খাতিরে জবাব দেয়, “আলহামদুলিল্লাহ। তোমার?”

“এই তো আমারও আলহামদুলিল্লাহ, বেশ ভালোই আছে অবস্থা।”
ওয়াসেম এ শুনে মনে মনে বলে, “জানোয়ারের বাচ্চা ভালো থাকবি তো! আমার জিনিসে নজর দিয়েছিস। তোর ভালো থাকা তোর পিছন দিকে ঢুকামু, সময় হোক একটু।”
এরই মধ্যে ওয়াসেমকে সিতুজা এসে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “তৃষ্ণা কী করছে ওয়াসেম? তুই তো এখানে, ও কোথায়?”
ওয়াসেম এই প্রশ্নের উত্তরে সত্য বলার ভান করে বলে, “গোসল করছে।”
“কেন? ও হঠাৎ গোসল করছে কেন? ও তো একটু আগেই গোসল করল!”
ওয়াসেম সোজাসাপটা উত্তর দেয়, “আমার জন্য করছে। কেন, কোনো প্রয়োজন? প্রয়োজন হলে একটু অপেক্ষা করো, ফরজ গোসল সম্পূর্ণ করে আসুক।”

এটা বলে ওয়াসেম বসা থেকে উঠে লুঙ্গির কোণ হাতে তুলে নিতে নিতে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। উপস্থিত সবাই তো লজ্জায় থ মেরে গেছেন। ইব্রাহিম সাহেব সিতুজার উপরই বিরক্ত হয়ে গেছেন। কী প্রয়োজন ছিল এই অসভ্য ছেলেকে এসব জিজ্ঞেস করার? কী একটা পরিস্থিতিতে ফেলে দিল! বাপ-মায়ের সামনে এমন কথা কোনো পুত্র বলতে পারে শুনি? তার উপর আয়রাদের সামনেই ঠাস-ঠুস বলে দিল! ছিঃ ছিঃ কী ভীষণ লজ্জা! হায় লজ্জা!
রাত এখন ন’টার কোঠায়। গ্রামের নির্জন রাস্তা ধরে ছুটে চলছে একটি গাড়ির যার ভেতরে তৌসির, সাথে মিনহাজ মামা, নাযেম চাচা, রুদ্র আর নুহমান। তন্ময় চাচার নির্বাচনী প্রচারণায় সারাদিনের ধকল শেষে বাড়ি ফেরার পথ ধরেছে সবাই। তৌসির গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিয়েছে চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি তার। সে মেয়র, কিন্তু তার চেয়েও বড় পরিচয় সে গণমানুষের চোখের মণি। প্রচারে নামলে মানুষের যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর ভালোবাসা দেখা যায় তা নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট তৌসির।

তন্ময় চাচার নির্বাচনের প্রচারে আজ গিয়েছিল সারাদিন কেটেছে এসবেই। আহা! মানুষের কি ভালোবাসা তার জন্য। মানুষ তো তাদের লোকদের দেখলেই বলে তৌসির ভাই কোথায় উনি আসেননি? উনার কথাগুলো শুনতে বেশ ভালো লাগে। উনাকে এদিকে আসতে বইলেন। সারাদেশে তাদের দলেন নেতাদের মানুষ দেখতে পারে না কিন্তু এখানে তৌসির কে মানুষ বড্ড ভালোবাসে। এই ভালোবাসা তৌসিরকে গভীরভাবে ভাবায়। সে মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করে স্বভাবে সে তো পুরোদস্তুর ‘জাউরা’ কিসিমের, মুখে কোনো লাগাম নেই তবুও মানুষ কেন তাকে এত ভালোবাসে? এই সমীকরণের উত্তর সে কিছুতেই মেলাতে পারে না। জনসম্মুখে বাছবিচার না করে ‘টাশ-টুশ’ সত্য কথা বলে দেওয়াই তার মজ্জাগত স্বভাব। যা মন ধরে তা বলে দেয়। এই ঠোঁটকাটাকাটা স্বভাব আর অসংযত ভাষার জন্য কতবার যে সমালোচনার তীব্র তীরে বিদ্ধ হতে হয়েছে তাকে তার হিসেবে নেই! সারা শহর, এমনকি গোটা দেশ তাকে ‘গালিবাজ নেতা’ হিসেবে চেনে। অথচ অদ্ভুত এক মায়াজাল আছে তার এই গালিমন্দের আড়ালে। নিন্দুকেরা যা-ই বলুক, সাধারণ জনগণ এই গালিবাজ তকমা ছাপিয়েও তার মাঝে খুঁজে পায় এক বিশ্বস্ত বন্ধুকে। তাই তো সব বিতর্ক একপাশে ঠেলে, জনগণ তাকে ‘নিজেদের মানুষ” বলে বুকে টেনে নেয়। তৌসির যতই ছলচাতুরী করুক না কেন জনগণ কে সে ঠকায় না।

এই তো আজকের এক ঘটনা ঘটল তৌসির মাছের বাজারে সাধারণ মানুষকে ভোটের গুরুত্ব বোঝাচ্ছে, চড়া গলায় কথা বলছে জনতার ভিড়ে। ঠিক এমন সময় এক ‘শয়তান’ সাংবাদিকের উদয় হয়। প্রচারণার মাঝখানে হুট করে মাইক মুখের সামনে ধরে নিয়ে সে এক বেখাপ্পা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় তৌসিরের দিক,“আপনাদের দল যদি গদিতে যায়, তাহলে প্রথমেই আপনারা কি সারা দেশের কারেন্টের খাম্বা সব সাফ করার পদক্ষেপ নিবেন?”
এমনিতেই মাছের বাজারের হট্টগোল, তার ওপর এমন অহেতুক ও খোঁচামরা প্রশ্ন শুনে তৌসিরের মেজাজ আর ঠিক থাকে না। মুহূর্তের মধ্যে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় তার। কোনো রাখঢাক না রেখেই সে ওই সাংবাদিককে মুখের ওপর এক মোক্ষম জবাব কষে দেয়,“সাফ তো করবই! তবে করার আগে আপনাদের মতো সাংবাদিক নামক ‘সাউয়া-দিক’গো পিছনে কারেন্টের খাম্বা যয়টা লাগে তয়টা ভরমু। ভরার পর বাকিগুলা লন্ডন সাপ্লাই দিমু।
ব্যাস! যা হওয়ার তাই হয়ে যায় । মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ঘেঁটে যায়। নিউজ চ্যানেলগুলো লুফে নেয় এই গরম খবর, যা পারছে তা-ই প্রচার করে যাচ্ছে। চারদিকে এখন শুধুই তৌসিরের এই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ক্লিপের আলোচনা।

তৌসিরের মুখে এমন আগুনের ফুলকি অবশ্য নতুন কিছু নয় সারা দেশের মানুষ এখন তার এমন কাণ্ডে অভ্যাস্ত । চব্বিশের নির্বাচনের সময়েও এক আওয়ামী লীগ নেতা ধর্মকে পুঁজি করে মানুষকে ভুলভাল বোঝাচ্ছিল। তৌসির তখন সরাসরি মিডিয়াতেই সেই নেতাকে ধুয়ে দিয়েছিল তার বিখ্যাত উক্তিতে,
“সাউয়ার নাই ঠিকানা, নির্বাচন আইলেই সাজে কাকুরা মওলানা।”
তখনকার মিডিয়াপাড়ায় এই এক কথাতেই তুমুল আগুন জ্বলে উঠেছিল। আর ঠিক তার এক সপ্তাহ পরেই গুম হয়ে যায় তৌসির। স্বৈরাচারের নির্মম শিকার হয়েও সে যে আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছে, তা কেবল হায়াত আর ভাগ্যের জোরেই। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেও তৌসির আজও ঠিক আগের মতোই নির্ভীক আর বেপরোয়া কথা মনে চেপে না রেখে ধুমধাড়াক্কা বলে দিয়ে জনগণ কে বলে, ” আমি সহজ সরল মানুষ তাই মনের কথা মুখে বলে দেই।”

জনগণও তাকে সহজভাবে নিয়ে নেয় এখন অবশ্য প্রথমে অনেকে দেখতে পারত না তাকে।
তাদের গাড়িটা বেশ গতিতেই এগোচ্ছে। হঠাৎ কোথা থেকে এক তরুণী দৌড়াতে দৌড়াতে তৌসিরদের গাড়ির ঠিক সামনে এসে দাঁড়ায়। চালকের আসনে মিনহাজ মামা পরিস্থিতি বুঝে তিনি মুহূর্তের সিদ্ধান্তে সজোরে ব্রেক কষেন। তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা থেমে যায়। ​এমন অতর্কিত ব্রেকের ধাক্কায় রুদ্র হুমড়ি খেয়ে পড়ে প্রায়। তাল সামলে নিয়েই মেজাজ হারিয়ে সে চেঁচিয়ে ওঠে, “বাইনচোদ ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি?”
​মিনহাজ মামা সেদিকে কান না দিয়ে সামনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “আরে, দেখছিস না? একটা মেয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে! কাপড়চোপড় সব ছেঁড়া। নাম তো তোরা, দেখ কী হয়েছে।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৪

​কথাটা শোনামাত্রই সবাই ব্যস্ত হয়ে দুপাশ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে আসেন রাস্তায়। নেমে মেয়েটিকে দেখা মাত্রই সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। কী ভীষণ বিধ্বস্ত অবস্থা তার! দৃশ্যটি দেখে মনে হচ্ছে, বিস্ময়ে সবার চোখের মণি কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে। মেয়েটির এমন জরাজীর্ণ ও বিপর্যস্ত দশা দেখে লজ্জায় আর সংকোচে কেউ দ্বিতীয়বার তাকাতে পারেন না। উপস্থিত সবাই অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে নেন। শুধু একজন বাদে। সে পলকহীন তাকিয়ে থাকে মেয়েটির এই অবস্থার দিকে তার পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে যাচ্ছে ব্যাথায় মেয়েটাকে এমন অবস্থায় দেখে।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৬

1 COMMENT

Comments are closed.