প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৮
নওরিন কবির তিশা
—’আই লাভ ইউ বউ!
বরাবরের ন্যায় আজও কলের প্রথমেই অপর প্রান্তের মানববিটিকে হ্যালোর পরিবর্তে আই লাভ ইউ বলল নাহিয়ান। এটা উপস্থিত সকলের কাছে স্বাভাবিক হলেও বড্ড অস্বাভাবিক ঠেকলো তিহুর কাছে। নাহিয়ান ফোনটা কানে চেপেই বেরিয়ে গেল বিমানের লাউঞ্জ থেকে।
বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ নির্বাসন আর জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একের পর এক কালবৈশাখী ঝড় সবটা যেন আজ এক নিমেষে ফিকে হয়ে আসছে। নীল আর তিহুর জীবনে যে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ জমেছিল, তা কাটিয়ে আজ তারা পরম শান্তিতে বাংলাদেশ ফিরছে। প্রিয় মাতৃভূমির মাটির সোঁদা গন্ধ নেওয়ার জন্য ছটফট করছে মনটা।
আর তাদের এই প্রত্যাবর্তনের মিছিলে বড় সারথি হয়ে আছে নাহিয়ান। বহুদিনের কর্মব্যস্ততা আর ছোটাছুটি থেকে এক দীর্ঘ ছুটি দিয়েছে সে। বিমানের লাউঞ্জে অপেক্ষমান ছিল তারা সকলেই। হুট করে একটা ফোন আসায় নাহিয়ান তৎক্ষণাৎ হ্যালোর পরিবর্তে এমনটা বলেই বেরিয়ে গিয়েছে। তিহু চমকে নীলের দিকে চেয়ে বলল,,
—’নাহিয়ান ভাইয়া এমন করলো কেন?
নীল এক ঝলক তাকালো মাত্র প্রস্থান করা নাহিয়ানের দিকে। মৃদু হেসে বলল,,
—’হি ইজ লাইক দ্যাট। বউ কল দিলে দিন দুনিয়ার হুঁশ থাকে না ওর।
তিহু চোখ সরু করে বলল,,–‘তাহলে ঠিক আছে! সবাই কি আপনার মত নাকি হ্যাঁ? যে সারাদিন নিজের পার্টি অফিস নিয়ে পড়ে থাকবে।
নীল মুহুর্তেই বেকুব সাজলো তিহুর এমন কথায়। বোকা কন্ঠে বলল,,–‘মানে?
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—‘মানে আমার মাথা! সরুন এখন!
তিহু সামান্য সরে যেতে নিতেই নীল তাকে এক ঝটকায় নিজের বক্ষদেশ বরাবর এনে তার চুলগুলো কানের পিছে গুঁজে দিয়ে, কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,,
—‘রেগে কতদূর যাবেন ম্যাডাম? আপনার শেষ গন্তব্য তো এই রাগী গম্ভীর আর বদমেজাজি পুরুষটারই বক্ষদেশ।তাই না?
তিহু মেকি রাগ দেখালো। পরক্ষণেই অনুভব করল আশেপাশের সকলে এখন তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। তৎক্ষণাৎ সে মুখ লুকালো নীলের প্রশস্ত বক্ষ দেশে। নীল সামান্য মৃদু হাসতেই তিহু তার বুকের বা পাশে আলতো আঘাত করে বলল,,
—’নির্লজ্জ নেতা।
—’লজ্জাবতী আমার বাবুর মাতা।
লাউঞ্জ থেকে ঘোষণা আসতেই নীল আর তিহু উঠে দাঁড়াল। নাহিয়ান ততক্ষণে তার বউয়ের(শিশিরের) সাথে প্রেমময় আলাপ সেরে ফিরে এসেছে, চোখেমুখে এক চিলতে দুষ্টুমি হাসি। এদিকে তিহুর মনের ভেতর তখন রীতিমতো তবলার বাড়ি পড়ছে। এর আগে যখন এই দেশে এসেছিল, তখন তো সে ছিল চেতনাহীন বলা চলে জীবন্ত পুতুলের ন্যায় প্রাইভেট জেটের সেই সফরের কোনো স্মৃতিই তার মস্তিষ্কে ধরা নেই। তাই আজই প্রথম সজ্ঞানে সে বিশাল এক যান্ত্রিক পাখির পেটে চড়তে যাচ্ছে।
বিমানের ভেতরে ঢুকেই তিহুর চোখ ছানাবড়া। চারদিকের ঝকঝকে তকতকে ভাব আর এয়ারহোস্টেসদের কৃত্রিম হাসিতে সে যেন আরও বেশি জড়সড় হয়ে গেল। নীল ওর অবস্থা বুঝতে পেরে আলতো করে তিহুর কাঁধে হাত রাখল।
—’ভয় পাচ্ছো?
তিহু দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,,
—’কই না তো! ভয় পাব কেন?
যদিও মুখে সে সাহসের পরিচয় দিচ্ছিল, কিন্তু সিটে বসার পর যখন বেল্ট বাঁধার সময় এল, তখন তার হাত দুটো কাঁপছিল স্পষ্ট। নীল নিজের বেল্ট বেঁধে তিহুর দিকে ঝুঁকে এল। তীব্র প্রেমময় স্পর্শে সে তিহুর বেল্টটা ঠিক করে দিতে দিতে চোখে চোখ রাখল। তিহু সেই গভীর চাহনিতে নিজেকে একটু সামলে নিল ঠিকই, কিন্তু হৃদয়ে প্রবাহমান উদ্বেগ আর আশঙ্কা দমাতে পারল না কিছুতে।
ইঞ্জিন যখন গর্জন করে উঠল, তিহু শক্ত করে সিটের হাতলটা চেপে ধরল। বিমানটা যখন রানওয়ে ধরে তীব্র গতিতে ছুটতে শুরু করল, তিহুর মনে হলো তার হৃৎপিণ্ডটা বুঝি গলা দিয়ে বেরিয়ে আসবে। ঠিক যে মুহূর্তে চাকা মাটি ছাড়ল আর শরীরটা অভিকর্ষের বিপরীতে সিটের সাথে লেপ্টে গেল, তিহু আর সহ্য করতে পারল না। সব লোক দেখানো সাহসিকতা ঝেড়ে ফেলে পাশে থাকা নীলের শক্ত হাতটা খপ করে চেপে ধরল সে। নিজের নখগুলো নীলের হাতের ওপর বসিয়ে দিয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল।
নীল ব্যথার বদলে এক অদ্ভুত তৃপ্তি পেল। সে তিহুর আঙুলের ভাঁজে নিজের আঙুল গলিয়ে দিয়ে হাতের ওপর একটা ভরসার চাপ দিল। তিহুর কানের কাছে মুখ নিয়ে শান্ত স্বরে বলল,,
—’তাকাও নুর, দেখো পৃথিবীটা কত সুন্দর লাগছে।
তিহু মিটিমিটি চোখে তাকাতেই দেখল জানালার ওপাশে মেঘের দল লুকোচুরি খেলছে।নীল আকাশ আর তুলোর মতো মেঘের গালিচা দেখে সে তার ভয় মুহূর্তেই ভুলে গেল। নীলের হাতের মুঠোয় নিজের হাতটা রেখে তিহু ভাবল এই আকাশ ছোঁয়া উচ্চতা আর জীবনের গভীর খাদ, যেখানেই সে থাকুক না কেন, এই হাতটা পাশে থাকলে বোধহয় মহাকাশ জয় করাও কঠিন কিছু নয়।
নীল ফিসফিসিয়ে বলল,,–‘কি? এখনো ভয় পাচ্ছেন ম্যাডাম?
তিহু তার দিকে ফিরে নিশ্চিন্ত হেসে বলল,,–‘আপনি পাশে থাকলে আর আপনার হাতটা এভাবে আমাকে আঁকড়ে রাখলে শুধু আকাশটা কেন গোটা জীবনটা আমি নির্ভয় পাড়ি দিতে পারব মিস্টার পলিটিশিয়ান।
শত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে তিহু আজ নিজের বাড়ির আঙ্গিনায় পা রেখেছে। পরিচিত সুবাসে তিহুর চোখ ভিজে এল কানায় কানায়। বাড়ির গেটের সামনে পৌঁছাতেই দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।তার প্রত্যাবর্তনের খবরটা আগেই পৌঁছে গিয়েছিল, তাই পুরো পরিবার যেন গেটের মুখে চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে।
গাড়ি থামতেই তিহু দরজা খুলে একরকম দৌড়ে বেরিয়ে এল। সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ওর মা। তিহুকে দেখামাত্রই তিনি হাহাকার করে জড়িয়ে ধরলেন নিজের বুকের পাঁজরে। সেই চিরচেনা মা মা গন্ধ, সেই আঁচলের ওম—তিহু যেন এতদিনে প্রাণ ফিরে পেল। মায়ের কান্নায় ভিজে একাকার তিহুর কাঁধ। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বাবার চোখের কোণেও তখন নোনা জল চিকচিক করছে। তিনি এগিয়ে এসে এই মেয়েকে বক্ষে আগলালেন।
—’তোর খুব কষ্ট হয়েছে রে মা, তাই না?
তিহু মাথা নেড়ে বাবার বুকে মুখ লুকাল। নিহাল হক কোত্থেকে ছুটতে আসলেন। বলাবাহুল্য তিহু বাড়ির বড় মেয়ে হওয়ায় সবার আদরের একটা বড় অংশই ছোটবেলা থেকে সে পেয়েছে। তাই সকলের তার ওপর এক অন্যরকম টান কাজ করে। নিহাল হক ভাইয়ের থেকে এক প্রকার ভাতিজিকে ছাড়িয়ে নিজের বক্ষে আগলে বললেন,,
—‘খুব কষ্ট হয়েছে তাই নারে মা? দেখ, আমি কি দুর্বল। ঠিক কতটা দুর্বল আমি যে নিজের মেয়ের সুরক্ষাও দিতে পারিনি।
তিহু কান্না জড়িত কন্ঠে বলল,,–‘এভাবে বলবেন না চাচ্চু। আপনারাই তো আমার সব তাই না আপনারাই তো আমাকে এতকাল আমাকে আগলে রেখেছেন।
নিহাল হকের চোখের কার্নিশ পেয়ে গড়িয়ে পড়লো নোনা জল। কি অদ্ভুত পারিবারিক বন্ধন গুলো। যে মানুষটার মানুষকে খু*ন করতেও হাত কাঁপে না তিনিই আজ হারিয়ে যাওয়া ভাতিজিকে খুঁজে পেয়ে পাগলের ন্যায় কান্না করছেন। তিহুর প্রত্যেকটা ফুপি তিহুকে মূল্যবান রত্নের ন্যায় আগলে রেখেছেন।তিহু দাদা-দাদী এতদিন যাবৎ শয্যাশায়ী ছিলেন।
প্রিয় পুতুলের প্রত্যাবর্তনে আজ যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে তাদের মাঝে। নুরুজ্জামান হক আর আফরোজা আনম তিহুকে বুকে জড়ালেন। সে এক অদ্ভুত মুগ্ধ দৃশ্য! বৃদ্ধ দাদুর প্রকম্পিত হাত দুটো যখন তিহুর মুখটা আগলে ধরল, মনে হলো যেন বহু বছর পর কোনো এক তৃষ্ণার্ত মরুভূমি এক পশলা বৃষ্টির দেখা পেয়েছে। দাদী আফরোজা আনম হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
নবকুড়ি গুলা ছুটে এসে জড়িয়ে নিলো তিহুকে। সাজ্জাদ বরাবরই তিহুপ্রেমি খুব। ছোটবেলা থেকেই একটা বোনের সাধ তার আর তিহু এ বাড়ির বড় মেয়ে। বছর পাঁচেকের ছোট সাজ্জাদের।তাই বড্ড তিহু অনুরাগী সাজ্জাদ ছোট থেকে। ছোট বোনটা হারিয়ে যাওয়ার প্রতিটা মুহূর্ত তার কাছে কতটা বেদনাদায়ক ছিল একমাত্র সেই সেটা ভালো জানে।
বাদ গেল না মাহা,রিশাদও। দীর্ঘদিন পর পারিবারিক মিলনায়তনের সঙ্গে সঙ্গে এক গভীর বন্ধুত্বেরও পুনর্মিলন ঘটল।
চারদিকে আজ এক সাজ সাজ রব। তিহুর অ*প”হৃতা হওয়ার সেই অভিশপ্ত রাতের আগে এ বাড়িতে উৎসবের যে প্রদীপ জ্বলে উঠেছিল, তা যেন এক ফুঁৎকারে নিভে গিয়েছিল মাঝপথেই। আলমারিতে তোলা ছিল বিয়ের সরঞ্জাম ড্রয়ারের কোণে পড়ে ছিল নিমন্ত্রণপত্রের গোছা, আর মনের কোণে জমা ছিল এক রাশ বিষাদ। কিন্তু আজ সেই বিষাদকে বিদায় জানিয়ে বাড়িটা যেন আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
নব উদ্যমে শুরু হচ্ছে বিয়ের তোড়জোড়।তবে এবার আরেকটু নতুন মাত্রা যোগ করেছে এক নতুন আয়োজন। বিয়ের আয়োজন হক ম্যানশন কিংবা খান মহল কোত্থাও হচ্ছে না। বরং সে আয়োজন হচ্ছে খুলনার বিখ্যাত এক কমিউনিটি সেন্টারে। কাল সকালে দুই পরিবারের লোকই রওনা হবে সেখানে।
বিকেলের সেই উৎসবমুখর শোরগোল থিতিয়ে এসে এখন এক মায়াবী নিস্তব্ধতায় রূপ নিয়েছে। অন্তরীক্ষের বুকে আজ রূপালি চাঁদের একাধিপত্য। নক্ষত্রের মেলা তার চারিপাশে। শহরের ব্যস্ততাও যেন আজ এই বাড়ির আনন্দের কাছে হার মেনে একটু ঝিমিয়ে পড়েছে। ম্যানশনের বিশাল ঝুল বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে ছিল তিহু। ঝিরঝিরে বাতাসে তার চুলগুলো অবাধ্য হয়ে মুখে আছড়ে পড়ছে।
দৃষ্টি বাহির আকাশে স্থির। আনমনে ভাবছে কিছু, তৎক্ষণাৎ অনুভূত হলো এক জোড়া শক্ত হাত পেছন থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। তবে তিহু চমকাল না, কারণ এই স্পর্শের ঘ্রাণ তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। নীল তার চিবুকটা তিহুর কাঁধে রেখে গভীর এক শ্বাস নিল।
তিহু দেহের শিহরণ দমিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নীল ফিসফিস কন্ঠে বলল,,
—‘মোবারক ম্যাডাম, অবশেষে আমাদের বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। বিয়ে নিয়ে আপনার যত অপূর্ন আশা ছিল সবগুলো এবার পূরণ করব ইনশাআল্লাহ।
তিহু এবার চমকে তাকালো নীলের দিকে। সত্যি বলতে বিয়ে নিয়ে অনেক আশা ছিল তার। সবচেয়ে বড় আশা ছিল বউ সাজার,ফটো শুট করার, অন্তত তিনদিন যাবত বিয়ের অনুষ্ঠান হবে এটা তার অনেক আগেকার বাসনা। তবে নীলের হুট করে অমন করে বিয়ে করে নেওয়া এই সব কিছুই অপূর্ণতায় পর্যবসিত হয়েছিল তার। কিন্তু নীল কি করে জানলে এই কথাগুলো?
নীল মৃদু হেসে গভীর কণ্ঠে বললো,,—‘আপনাকে বলেছিলাম না ম্যাডাম, আপনাকে আপনার থেকেও হাজারগুন ভালো চিনি আমি।
—‘কিন্তু কিভাবে?
নীল তার কথার রেশ ধরে আরেকটু কাছে আসতেই দরজায় হুরমুড়িয়ে কারো ঢোকার শব্দ হলো। নীল আর তিহু নিজেদের সামলে নেওয়ার আগেই ঝড়ের বেগে রুমে ঢুকল রাফা,সারা,পিহু। পিহু উত্তেজনায় বলতে বলতে ঢুকছিল,,
—’তিহুপু! দেখ কে এসেছে! তোমার সেই কলেজের বান্ধবী ফারিন আসছে, সাথে নির্ঝ…!
বাকি কথাটুকু পিহুর গলাতেই আটকে গেল। ব্যালকনির হালকা আলো-আঁধারিতে নীল আর তিহুর এই নিবিড় মুহূর্তটা ওদের চোখে পড়তেই সবগুলো থমকে দাঁড়াল। পরিস্থিতি বুঝতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। রাফা,সারা, পিহু মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো। নিহিত ওদের পিছনেই ছিল। রাফা বোকা হেসে তাকালো তার দিকে।
এদিকে তিহু লজ্জায় একেবারে সিঁটিয়ে গেল। নীলের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে বিড়বিড় করে বলল,,
–‘ছাড়ুন! কি কেলেঙ্কারি হলো বলুন তো! ওরা এখন সারা বাড়িতে ঢোল পিটিয়ে বেড়াবে।
নীল অবশ্য নির্বিকার। সে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বরং এক চিলতে বাঁকা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে উঁচু গলায় বলল,,
—‘তোমরা কি ওখানেই রাত পার করার পরিকল্পনা করেছ? নাকি ভেতরে আসার ইচ্ছা আছে?
রাফারা না রুমে ঢুকে সোজা দরজার দিকে দৌড় দিল। তারা বেরিয়ে যেতেই নিহিত বের হবার পূর্ব মুহূর্তে কিছুটা জোর গলায় বলে গেল,,
—‘না ভাইয়া, আমরা চললাম! তোমরা তোমাদের রোম্যান্স চালিয়ে যাও। আমরা নিচে গিয়ে আমরা বরং বলছি যে কাপলরা এখন খুব জরুরি কাজে ব্যস্ত আছে!
নীল চোখ পাকিয়ে তাকাতেই নিহিত ছুট্টে পালালো।ওরা হাসতে হাসতে বেরিয়ে যেতেই তিহু নীলের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বলল,,
—‘সব আপনার জন্য! নির্লজ্জ মানব!
বলেই সে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে নীল তাকে ধরতে গিয়েও ধরল না। সামান্য হেসে বলল,,
—‘নির্লজ্জের বাকি নির্লজ্জতা তোলা থাকলো ম্যাডাম, কিছুদিন পর সুদে-আসলে পূরণ করব।
ফারিন-তিহুর বহু পুরাতন বান্ধবী বলা যায়। ছোটবেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে একসাথে পড়াশোনা হয়েছিল তাদের। বিদ্যালয়ে পরিবর্তনের কারণস্বরূপ মাধ্যমিকে আলাদা হয়েছিল তারা। তবে কলেজ পর্যায়ে আবার এক হয়েছিল তারা। এখন আবার ভার্সিটি পর্যায়ে আলাদা। বড্ড অদ্ভুত তাদের বন্ধুত্ব। এসব ভেবেই হাসাহাসি করছিল তারা।
ছাদে আসন পেতে বসে আছে সবগুলো। আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজের নিচে ছাদ শোভিত কৃত্রিম নক্ষত্ররাজের আলোয়। নির্ঝর বসে আছে নীল দের সাইডে। উপস্থিত চৌধুরী আবাসনের সকলে। বলা বাহুল্য চৌধুরী আবাসনের সাথে হকদের সম্পর্কও বহু পুরাতন। উপস্থিত শিশির নাহিয়ানরাও। সবমিলিয়ে এ যেন এক চাঁদের হাট।
তিহু-ফারিন একে একে শিশিরের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে সকলের সঙ্গে। তবে পরিচয় করানোর প্রয়োজন হচ্ছে না তত একটা। ওইযে নাহিয়ানের বউ পরিচয়। তাতেই সকলের কাছে বিখ্যাত হয়ে আছে শিশির। ব্যাপারটা তার জন্য যতটা লজ্জার বাদবাকি সবার জন্য ঠিক ততটাই উপভোগ্য।
গিটারের টুংটাং শব্দে মুখরিত পরিবেশ। সৌজন্য– নিহিত তাজহীর আর রিশাদের সঙ্গে ভাব জমিয়েছে বেশ। নিঝুমের সম্পর্ক জমেছে পিহু,রাফা,সারাদের সঙ্গে। আলাপচারিতার একপর্যায়ে সৌজন্য বললো,,
—‘আলাপ অনেক জমিয়েছি ভাই, এবার একটা গান হয়ে যাক।
তার সঙ্গে তাল মিলালো উপস্থিত সকলে। ফারিন এমনিতেই সর্বদা আমদপ্রবণ। সে এক প্রকার লাফিয়ে বলল,,
—‘হোয়াই নট! হয়ে যাক একটা গান, আমার তিহু বেবির বিয়ে বলে কথা। কিন্তু একটা শর্ত আছে, প্রত্যেককে তার বউ অথবা গার্লফ্রেন্ড, কিংবা মনের মানুষ যাইহোক তাকে ডেডিকেট করে মনের কথা বলতে হবে। সেই সঙ্গে অপর পক্ষকে তার রিপ্লাই দিতে হবে।সবাই রাজি?
—‘ওকে তাহলে হয়েই যাক!
নাহিয়ান এক ঝটকায় কেড়ে নিল রাওফিনের হাতে থাকা গিটারখানা। তাকে টিটকিরি কেটে বলল,,
—‘শুধু গিটার কেন?শেরওয়ানি পড়ে বসে থাকলেও তোর জন্য বউ জুটবে না। সো, গিটারটা আমার কাছে দে, আমার বউয়ের উদ্দেশ্যে একটা গান গাই।
রাওফিন ভ্রু কুঁচকে বলল,,—‘হা-রাম-জাদা! বিয়ে করে নিজেকে খুব বড় হনু মনে করছ তাইনা? শা*লা তোর যে আমলে বিয়ে হইছে ওই সময় বিয়ে হলে এতদিনে দশ বাচ্চার বাপ হয়ে যেতাম!
—-‘হাতির ডিম হতে তুমি; এখনো অব্দি একটা মেয়ে পটাতে পারলে না আবার বলছো বাচ্চার বাপ হবে!শখ কত।
রাওফিন চিৎকার করে বলল,,—‘নাহিয়ানের বাচ্চা!
—‘ওই আস্তে বল। আমার এখনো বাচ্চা হয়নি। আর আপাতত ইচ্ছা নেই, আগে বউয়ের সাথে প্রেম করি ভালো মতো তারপর ওসবের প্লানিং।
তাদের এমন কথোপকথনে মুচকি মুচকি হাসছে সবাই তবে এবার বিব্রত হল শিশির। মানে এই লোকটাও না! কখন কি বলতে হয় সেটাও জানে না! নীল পাশ থেকে বলল,,
—‘শাট আপ স্টুপিডের দল।
নাহিয়ান মুখ কুঁচকে বলল,,—‘ওই যে আসছেন আমাদের শাট আপ সাহেব! নে বাবা বুঝছি করলাম চুপ।
ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা। হুট করে গিটারের টুংটাং আওয়াজ তুলে নাহিয়ান শিশিরের পানে চেয়ে গেয়ে উঠলো,,
🎶 খোলাখুলি বলতে গেলে…..
পড়ে গেছি তোর কবলে….
জড়িয়েছে মন…..
ভীষণ রকম অথৈ জলে….
সাঁতার কেটেছে….
ঘুমিয়ে হেঁটেছি…..
এতটা ডুবেছি তোরই তো কারনে….
তোকে ভালবাসতে গিয়ে….🎶
নাহিয়ান এর কন্ঠে তার দিকে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে আছে শিশির। মানুষটা বরাবরই এমন। সেটা দু-একজনের সম্মুখে হোক কিংবা দুটা গোটা দুনিয়ার সম্মুখে ভালোবাসার কথা নির্দ্বিধায় স্বীকারের হিম্মত আছে তার।
এরকম গেমে মজা পাচ্ছে না তারা। তাই ফারিন আর মাহা মিলে এবার নতুন ফন্দি এঁটেছে। রিং ঘূর্ণনয়। যার দিকে পড়বে তাকেই গাইতে হবে গান। আগত্যা সকলেই মেনে নিয়েছে তাই। চলছে গানের আসর। হঠাৎ রিং এর মুখটা দুর্ঘটনাক্রমে ফারিন এর দিকেই পড়ল। বিচারি বোকা দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকালো। সকলে হাসছে তাকে দেখে। মাহা বললো,,
—‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে। কেমন লাগছে এখন? তো? আর দেরি কেন? স্টার্ট করো বেবি!
ফারিন কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বোকা হেসে বলল,,–‘ইয়ে মানে আমি তো গান গাইতে পারি না!
তিহু তৎক্ষণাৎ আটকে দিল তাকে,,—‘নাটক কম করো সুইটহার্ট! তুমি খুব সুন্দর গান করো। তাইনা নির্ঝর স্যার?
সকলে তাকালো নির্ঝরের দিকে। বেচারি ফারিন নাক কুঁচকে মনে মনে বলল,,—‘হনুমানটার কাছে শুনছে!
সে নির্ঝরকে কোনো উত্তর না দিতে দিয়েই তৎক্ষণাৎ বলল,,—‘হ্যাঁ হ্যাঁ পারি পারি। আর শোনার দরকার নেই গাচ্ছি!
তিহু-মাহা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হাসলো। ফারিন নির্ঝরের কলেজের সেই কেমিস্ট্রি তাদের সকলেরই ভালো করে জানা। তাই আজকেও তাদের উস্কে দিতে তিহু ফের বলল,,
—‘ওহো শুধু তুই না। তোর সাথে আজকে স্যার ও গাইবে।
অতঃপর সে নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে বলল,,—‘তাই না স্যার!
এতগুলো মানুষের সামনে তাদের বড্ড বিরম্বনায় ফেলেছে তিহু। ফারিন দাঁতে দাঁত চেপে চেয়ে আছে মাহা-তিহুর দিকে। তবে তাতে তাদের কি। তারা ঠিকই লুফে নিচ্ছে মজা খানা।
মুহূর্ত কিছু অতিবাহিত হলো। হঠাৎ নির্জনতা চিঁড়ে শোনা গেল ফারিনের মেয়েলি সুরেলা কন্ঠস্বর,,
—‘ভালো লাগেনা…
কেন জানিনা….
তোমাকে হারালে…
চোখেরি আড়ালে…..
মনে জাগে দোরাসা…..—-
ফারিন ইচ্ছাকৃত এমন গান গেয়েছে যাতে নির্ঝর প্রত্যুত্তর না দিতে পারে। তবে তাদের সকলকে অবাক করে দিয়ে তার গানের কলিটা বাতাসে মেলাতেই নির্ঝর গেয়ে উঠল,,
—‘মনের মাঝে…
পাবে খুঁজে…
যখনই আমাকে হারাবে দুচোখে…
আমি সেই ভালোবাসা….—
বিস্মিত ফারিন। তবে শর্ত অনুযায়ী তাকে পুনরায় গাইতে হলো পরবর্তী কলিগুলো,,
—‘তোমায় পেয়ে যায় না বোঝা
কখন ফুরায় এই দিনটা….—
নির্ঝরও গাইলো পরপর,,
—‘এমন জাদু করেছে মন…
ভালোবাসার কথাটা….—
ফারিন নির্ঝরের সুর কল্লোল বায়ুতে তখনও বিদ্যমান।তাদের রসায়নে মুচকি মুচকি হাসছে সবগুলো। তৎক্ষণাৎ আবার ঘোরানো হলো রিং খানা। তবে এবার সেটা ঘুরলো নিহিতের দিকে। বেচারা বিস্ফারিত নয়নে তাকালো সকলের দিকে। অজুহাত দেখিয়ে সেখান থেকে উঠে যেতে নিতেই সৌজন্য হাতখানা চেপে ধরল তার,,
—’কোথায় যাচ্ছো? গানটা কে গাইবে!
—‘আ..আ। আসলে আমার গলা ভেঙে গেছে আজকে।
—‘ওসব অজুহাতে তো কাজ হচ্ছে না স্যার, গানটা গেয়ে যাও।
তার এমন দশায় সকল দিয়ে যখন হাসছে তৎক্ষণাৎ রাফা টিটকারি কেটে বলল,,—‘আরে ছাড়ুন ভাইয়া, গাধা দিয়ে হাল চাষ করা যায়? ওর থেকে বরং আবার রিং ঘোরান!
রাফার সুক্ষ্ম অপমানটা বেশ গায়ে লাগলো নিহিতের। ধপাস করে সেখানে বসে সে বলল,,
—‘তুই কি আমাকে অপমান করতে চাইলি?
—‘একদম না।মান থাকলে তো অপমান করব তাই না?
নিহিতের রাগের আগুনে ঘি ঢাললো কথাগুলো। সে সৌজন্যের হাত থেকে গিটার খানা এক প্রকার কেড়ে নিয়ে বলল,,
—‘সবাইকে নিজের মত মনে করিস?
—‘কি বলতে চাইছো তুমি?
—‘বলতে চাইছি না বলছি। আমি না চাইলেও গানের সুর হবে কিন্তু তোর মত কাকের গলা দিয়ে কা-কা ছাড়া আর কোন শব্দ বের হবে না!
রাফা ভ্রু কুঁচকে রাগী ভঙ্গিমায় কিছু বলার আগেই নিহিত গিটারে টুংটাং শব্দ তুলে গেয়ে উঠলো,,
🎶 তুই কবে যে বুঝবি বল…
পাগল মনের উথাল পাথাল….
তুই কবে যে বুঝবি বল…
পাগল মনের উথাল পাথাল….
হলো বানজারা বানজারা হলো বানজারা বানজারা…
হলো বানজারা এই মন….🎶
নিহিতের কন্ঠে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে রাফা। বেচারী ভীষণ রকম তব্দা খেয়েছে। এদিকে বড়গুলো বোধ হয় বুঝেছে নিহিতের মনোভাব। নিহিত রাফার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে তারা। হঠাৎ তিহু আরেকটু ফোড়ন কেটে বলল,,
—‘তা তোমার আহা আহা মেইবি তোমার পাগল মনের উথাল পাথাল বুঝে গেছে দেবরজী।
মুখ চেপে হাসছে সবগুলো।পিহু রাফা কে পাশ থেকে খুঁচিয়ে বলল,,–‘সামথিং সামথিং?
রাফা চোখ কুঁচকে তাকালো তার দিকে। মুখে বলল,,—‘নাথিং নাথিং!
রাত তখন বেশ গভীর। একঝাঁক উজ্জ্বল নক্ষত্র তখনো হক ম্যানশনের ছাদে উচ্ছ্বাসে মগ্ন। এই প্রাণবন্ত তরুণ-তরুণীর দলটি যেন আকাশের সেই ছায়াপথেরই এক একটি জীবন্ত স্ফুলিঙ্গ। আগত শীতের আমেজ মেশানো ঝিরঝিরে হাওয়া আর কৃত্রিম আলোকসজ্জার মায়াবী মায়া মিলে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি হয়েছে চারিপাশে।
আকাশের ওই রুপালি চাঁদটা ঠিক মাঝ আকাশে এসে স্থির হয়েছে, যেন সে-ও উৎসুক হয়ে দেখছে এই মর্ত্যের আনন্দলীলা। হঠাৎ রিংটা সশব্দে ঘুরে ঠিক নীলের সামনে এসে থেমে গেল। মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো গম্ভীর আর শান্ত স্বভাবের নেতা ওয়াহাজ খান নীলের ওপর।
ফারিন চিরকালই একটু সাহসী আর ঠোঁটকাটা। সে এক চিলতে দুষ্টুমি হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলে উঠল,,
—’নীল ভাইয়া, একটা কথা কিন্তু আমরা সবাই জানি। শুনেছি আপনি নাকি আমাদের এই তিহু বেবিকে না দেখেই ভালোবেসে ফেলেছেন? শুধু ওর অস্তিত্বের টানেই আপনি পাগল ছিলেন! কিন্তু এই ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের কিউরিওসিটির শেষ নেই যে না দেখে কি করে ভালোবাসা যায়? তো আপনার না দেখা ভালবাসাকে এতদিন পর আপন করে পাচ্ছেন আপনার মনোভাব টা প্লিজ একটা গানের মাধ্যমে আমাদের জানান।
তিহু লাজুক দৃষ্টিতে কটমট করে তাকানো ফারিনের দিকে। ফারিন তার দিকে চেয়ে অনবরত ভ্রু নাচিয়ে চলেছে।সবার উৎসুক চাহনি এখন নীলের দিকে। নীল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, অরপর অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়াল।নীল তিহুর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে গেয়ে উঠল,,
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৭
🎶 নূর-এ-জাহান অউর নূর-এ-মহব্বত……
জগতের আলো আর মহব্বতের জ্যোতি,)
দোনো জুড়ে তুঝসে পিয়া……
(দুটোই তোমার সাথে মিশে আছে প্রিয়।)
পাগল ইয়া জোগী মুঝকো কহো তুম…..
(পাগল বলো আর বৈরাগীই বলো আমায়,)
হাঁ মেরা ইশক সবসে জুদা…
(হ্যাঁ, আমার এই প্রেম সবার চেয়ে আলাদা…)
তেরি হি খাতির লুঁ শৌ জনম ম্যায়….,
(তোমারই খাতিরে আমি একশবার জন্ম নিতে পারি,)
চাহে হো জো ভি ভলা …..
(তাতে ভালো যা হওয়ার হোক না কেন।)
না ম্যায় হুয়া আশিক না ম্যায় দিওয়ানা…..
(না আমি চিরাচরিত প্রেমিক হয়েছি, না হয়েছি দিওয়ানা,)
কহ দো মুঝে জো পিয়া…
(তুমি আমায় যা খুশি বলতে পারো প্রিয়…)
তেরা মেরা হ্যায় পেয়ার অমর…..
(তোমার আর আমার এই প্রেম অমর,)
তু চাহে তো কদমো মে সর রখ লুঁ…..
(তুমি চাইলে আমি তোমার চরণে মাথা রাখতে পারি।)🎶
