সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৯
jannatul firdaus mithila
নিস্তেজ রেহান! জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছে হসপিটালের স্বচ্ছ টাইলসের ফ্লোরে। রৌদ্র তৎক্ষনাৎ দু’হাতে আগলে ধরে ছেলেটাকে। চোখমুখ লাল হয়ে এসেছে তার। যেন আশেপাশে কেউ না থাকলে এক্ষুণি কেঁদে দিতেন দৃঢ় পুরুষ। রৌদ্র কোনোরুপ কালবিলম্ব না করে রেহানকে তুলে নেয় কাঁধে। রেহানের কান বেয়ে র*ক্ত গড়াচ্ছে। ছেলেটাকে ইমার্জেন্সিতে নেওয়া অতীব জরুরী। ওদিকে সায়মা খাতুন বুক ভাসাচ্ছেন ছেলের ওমন করুণ দশা দেখে। পাশ থেকে ওসমান সিকদার বউকে ধরে রেখেছেন কোনরকম। বেচারা নিজেও তো কাঁদো কাঁদো মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। শত হলেও তার একমাত্র ছেলে বলে কথা!
ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড! বেডে শোয়ানো হয়েছে রেহানকে। বেডের চারদিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে — ইমার্জেন্সি মেডিকেল টিম। ইমার্জেন্সি ফিজিশিয়ান তৎক্ষনাৎ এয়ারওয়ে সিকিউর করলেন। প্রথমত ABC স্ট্যাবিলাইজ। ছেলেটার নিশ্বাসের গতি পরোখ করতে লাগলেন দক্ষ ভঙ্গিতে। পরক্ষণেই গলা উঁচিয়ে বললেন,
“ রোগী অচেতন! শ্বাসনালী ঝুঁকিতে আছে। নার্স! ইমার্জেন্সি অক্সিজেন মাস্ক পড়ান রোগীকে।রিমেম্বার, প্রয়োজনে টিউব ঢোকাতে হবে।”
কথামতো এগিয়ে এলেন নার্স। হাই ফ্লো অক্সিজেন মাস্ক পড়ালেন অচেতন রোগীকে। পরমুহূর্তেই রোগীর পালস চেক করতে উদ্যোত হলেন তিনি। ডানহাতের তর্জনী ও মধ্যমা আলতো করে চেপে ধরলেন রোগীর শ্বাসনালীর পাশে। অন্যহাতের কব্জি উল্টে চোখ রাখলেন ঘড়ির কাঁটায়। প্রায় ৬ সেকেন্ড ধৈর্য ধরে পালস রেট চেক করে প্রফেশনাল কায়দায় বললেন,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ পালস দূর্বল স্যার!”
এহেন কথায় মুহুর্তেই চিন্তায় পড়লেন ফিজিশিয়ান। তৎক্ষনাৎ হুকুম ছুড়ে বললেন,
“ ইমার্জেন্সি আইভি ফ্লুইড দিন!”
নার্স মুহুর্তেই ছুটলেন বেডের ধারে। সেথায় রাখা প্রয়োজনীয় ঔষধ-পাতি হতে আইভি ফ্লুইড নিয়ে ফের চলে এলেন ডাক্তারের কাছে। হাত বাড়িয়ে ডাক্তারের হাতে এগিয়ে দিলেন মোটা সিরিঞ্জ দুটো এবং ছোট তরলের শিশিটুকু।ডাক্তার সময় নিলেন না। তৎক্ষনাৎ সিরিঞ্জ দুটোতে তরল পরিপূর্ণ করে আলতো করে তা পুশড করতে লাগলেন রোগীর দেহে। পরপর দুটো আইভি লাইন বসিয়ে থামলেন তিনি। অপেক্ষা করলেন সর্বোচ্চ মিনিট দুয়েক। এর পরপরই তিনি ফের রোগীর ক্যারোটিড পালস ধরেন। এবারেও পালস রেট দূর্বল। ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে গলা উঁচিয়ে দুজন নার্সের উদ্দ্যেশে বলেন,
“ নার্স ওয়ান! চেক দা ব্লাড প্রেসার।এন্ড ইউ, রোগীকে হার্ট মনিটর এন্ড পালস অক্সিমেটর লাগান। ”
এহেন কথা বলতে দেরি, নার্সদ্বয়ের কাজে লাগতে দেরি নেই। দু’জনেই কেমন দক্ষতার সাথে নিজেদের কাজে মত্ত হলেন। রোগীর বুক উম্মুক্ত করে সেথায় লাগানো হলো কার্ডিয়াক মনিটরিংয়ের চিকন তার। ডাক্তার এবার চোখ রাখলেন মনিটরের পর্দায়। যেথায় সরু রেখাগুলি কেমন ওঠানামা করছে ক্রমশঃ। এরইমধ্যে নার্সদের মধ্যে থেকে একজন বলে ওঠেন,
“ স্যার! ব্লাড প্রেসার নব্বই বাই ষাট।”
ডাক্তার গম্ভীর হলেন এহেন কথায়। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রেখে কিয়তক্ষন বাদেই বললেন,
“ দেটস ভেরি ডিসাপয়েন্টিং”
বলেই ডাক্তার ঘুরে এসে দাঁড়ালেন রোগীর পায়ের কাছে। গ্লাভস পড়া হাতদুটো বা-দিকে বাড়াতেই একজন নার্স তক্ষুনি ইউরিন ক্যাথেটার এগিয়ে দিলেন ডাক্তারের হাতে। ডাক্তার মুহুর্তব্যয়ে রোগীর দেহে ইউরিন ক্যাথেটার বসালেন। এবার দেখার পালা রোগীর দেহে আদৌও ফ্লুইড কাজ করছে কি-না। প্রায় মিনিট পাঁচেক সময় নিয়ে ধৈর্য ধরলেন ফিজিশিয়ান।পরক্ষণে ইউরিন ক্যাথেটার চেক করতেই দেখলেন — সেথায় ইতোমধ্যেই কিছুটা মূ*ত্র জমা হয়েছে। এটুকুতেই যেন সামান্য হলেও আশার আলো দেখলেন তিনি। তৎক্ষনাৎ চাপা গলায় বললেন,
“ হাইপারটনিক স্যালাইন রেডি রাখো। এন্ড রোগীর মাথা ৩০° উঁচুতে রাখো।”
যথাযথ কাজ করলেন নার্সদ্বয়। ডাক্তার ঘুরে এসে দাঁড়ালেন রোগীর মাথার কাছে। কিয়তক্ষন পরিক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে বললেন,
“ গ্লাসগো কোমা স্কেল ছয়। মাথায় গুরুতর আঘাত।”
সিনিয়র নার্স অন্যপাশ দিয়ে এগিয়ে গেলেন রোগীর মাথার কাছে। হাতে ছোট্ট টর্চ জ্বালিয়ে রোগীর পিউপিল চেক করে জানান দিলেন,
“ স্যার! পিউপিল সমান নয়। প্রতিক্রিয়া ধীর!”
আর অপেক্ষা করতে পারলেন না ফিজিশিয়ান। তক্ষুনি নার্সের উদ্দেশ্যে হাঁক ছেড়ে বলে ওঠেন,
“ এখনই নিউরোসার্জন ডাকুন। জরুরি সিটি স্ক্যানের ব্যবস্থা করুন। দ্রুত যান!”
জুনিয়র নার্স ছুটলেন যথাতথা। তিনি ইমার্জেন্সি রুম ছেড়ে বেরোতেই আরেকপাশ দিয়ে রুমে ঢুকলেন ইএনটি ডাক্তার। মধ্যবয়স্ক মানুষটার চোখেমুখে স্পষ্ট অভিজ্ঞতার ছাপ। তিনি রোগীর কাছে এগিয়ে এলেন দ্রুত কদমে। রোগীর কান,নাক পরোখ করে বলতে লাগলেন,
“ রোগীর কী এক্সিডেন্ট হয়েছিল?”
ফিজিশিয়ান মাথা নাড়ায় ওপর নিচ।মাস্কের আড়ালে আবৃত মুখটায় কেবল একরাশ চিন্তার ছাপ। প্রতিটি কেস,প্রতিটি রোগী-ই তো তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে চিন্তা আসাটা স্বাভাবিক। ইএনটি ডাক্তার কেমন গম্ভীর হলেন যেন। হাত বাড়িয়ে চোখের চশমাটা খানিক ঠেলেঠুলে গম্ভীর মুখে বললেন,
“ রোগীর সামারি অনুযায়ী এক্সিডেন্টের পর কান দিয়ে রক্ত পড়ছে! এরমানে মাথার খুলির নিচের অংশ ভাঙার সম্ভাবনা আছে।সো কানে হাত দেবেন না কেউ।”
ফিজিশিয়ান মাথা কাত করলেন। কোমরের দু’ধারে হাত রেখে গম্ভীর মুখে আওড়ালেন,
“ তাহলে এখন স্ক্যানের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে!”
এহেন কথায় সম্মতি দিলেন ইএনটি ডাক্তার। কব্জি উল্টে হাতের ঘড়িটায় চোখ রেখে বললেন,
“ তাই বরং ভালো।”
সিটিস্ক্যান চললো প্রায় আধঘন্টা ধরে। রিপোর্ট এসেছে মাত্রই। নিউরোসার্জন তার কেবিনে বসে আছেন গম্ভীর মুখে। হাতে ধরে রেখেছেন ❝ রেহান সিকদার ❞ নামক পেশেন্টের সিটিস্ক্যান রিপোর্ট। কেবিনে আরও উপস্থিত আছেন ইমার্জেন্সি ফিজিশিয়ান ড.তারিকুল হক, ইএনটি ডাক্তার জনাব ফারুক মৃধা এবং কার্ডিওলজি স্পেশালিস্ট ড.ইফতেখার এহসান রৌদ্র। সকলের মুখাবয়বে স্পষ্ট পরিলক্ষিত দুশ্চিন্তার ছাপ। নিউরোসার্জন সময় নিয়ে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে ওঠেন।হাত থেকে আচমকা রিপোর্টটা ডেস্কের ওপর ফেলে, চোখ তুললেন সামনে। গম্ভীর মুখে আওড়ালেন,
“ রোগীর মাথার ভেতরে রক্ত জমেছে।এন্ড টেম্পোরাল বোন ফ্র্যাকচার আছে। দেটস হোয়ায় ব্রেইনে চাপ পড়ছে।”
এহেন কথায় ফিজিশিয়ান কেমন চিন্তিত মুখে ফটাফট বললেন,
“ তাহলে তো অপেক্ষা করবার সুযোগ নেই স্যার!”
নিউরোসার্জন মাথা নাড়ায় ওপর নিচ। বলে,
“ হুম! এজ সুন এজ পসিবল, অপারেশন থিয়েটার প্রস্তুত করুন।আমি আসছি।”
ফিজিশিয়ান তক্ষুনি ছুট লাগালেন কেবিনের বাইরে। এদিকে রৌদ্র এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মাথা নুইয়ে রেখে। নিউরোসার্জন ড. হিমেল চৌধুরী কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রৌদ্রের দিকে।পরক্ষণেই গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“ কিছু বলবে ইফতেখার?”
রৌদ্র মাথা তুললো এবার। লাল হয়ে আসা চোখজোড়া সামনে তাক করে মোটা কন্ঠে বললো,
“ স্যার! আই হেভ আ রিকুয়েষ্ট!”
ড.হিমেল হাসলেন একটুখানি। আগের ন্যায় দৃষ্টি বজায় রেখে নরম কন্ঠে বললেন,
“ আমাদের সাথে অপারেশন রুমে থাকবে তাইতো?”
রৌদ্র কোনরূপ কালবিলম্ব না করে ওপর নিচ মাথা নাড়ায়। হিমেল সাহেব তখন সময় নিয়ে বলেন,
“ বাট এজ পার আই নো, তোমার বোনও না-কি এ হসপিটালে ভর্তি। তুমি ওর অপারেশন টাইমে থাকবে না?”
রৌদ্র শক্ত অবয়বে দাঁড়িয়ে আছে।বুকের ভেতরটা আপাতত ফেটে গেলেও মুখে তেমন রা নেই ছেলেটার। সে কেমন রয়েসয়ে জবাব দেয়,
“ বোনের অপারেশন নিজ চোখে দেখার মতো সাহস এখন অব্ধি জোগাতে পারিনি স্যার। আর না কোনোদিন পারবো!”
ওটি রুম! অপারেশনের বেডে পড়ে আছে রুহি।চারদিকে তাকে ঘেরাও করে রেখেছে অভিজ্ঞ ডাক্তার টিম। ড.ফারহানা প্রতিনিধিত্ব করছেন সবটার। মানুষটার চোখেমুখে একরাশ আহত ভাবসাব। রুহির নির্মল মুখখানার পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। ইশশ! কতটা স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। এই মেয়ের সাথেই নিয়তি কেনো এতো কঠিন হলো কে জানে। ড.ফারহানা মনে মনে এক দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লেন। অতঃপর মনকে কঠিন করে নিয়ে শুরু করলেন অপারেশন নামক নিরব যুদ্ধ!
তিন তলার অপারেশন রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কবির সাহেবসহ আরও কয়েকজন। পাঁচ তলায় অপারেশন চলছে রেহনের। সেখানে আছেন বাড়ির বাদবাকি সদস্য। কবির সাহেব মানুষটা আর সময় কঠিন অবয়ব ধরে রাখলেও আজ কেমন ভেঙে পড়েছেন মানুষটা! তায়েফ সাহেব এবং তাশরিক সাহেব মিলে একাধারে সান্ত্বনা দিচ্ছেন ভাইকে। সাব্বির সাহেব নরম দিলের মানুষ। ভাইকে তিনি স্বান্তনা দিবেন তো দূরের কথা, নিজেই তো কেঁদেকেটে কুল পাচ্ছেন না বেচারা! ওদিকে জুবাইদা বেগমের অবস্থা করুণ। মানুষটার এই জ্ঞান ফিরছে তো আবার যাচ্ছে! যতবারই তার জ্ঞান ফিরছে ততবারই তার মুখে কেবল একটাই কথা..
“ আমার মা’কে আমি নিজ হাতে আজ সাজিয়েছি! নিজ হাতে আমার মা’কে সাজিয়েছি।”
সায়মা খাতুন ছেলের শোকে কাতর। তবুও বেয়ানের ওমন করুণ দশায় নিজে থেকে এগিয়ে এসেছেন তিনি। সে-ই কখন থেকে জুবাইদা বেগমকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন মানুষটা, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
“ হেলো তায়েফ সাহেব বলছেন?”
হসপিটালের ক্যাফেটেরিয়ায় দাঁড়িয়ে আছেন তায়েফ সাহেব। সদ্যই চার-পাঁচটে কফির অর্ডার দিয়েছিলেন ভাইদের জন্য। ওমনি ফোনে কল এলো তার।পকেট থেকে ফোন বের করে দেখলেন থানা থেকে কল এসেছে। তাইতো কেমন তড়িঘড়ি করে কল রিসিভ করলেন তিনি। কল রিসিভ করে কানে ঠেকাতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো কাঠকাঠ কন্ঠের কথাটা! তায়েফ সাহেব কোনরূপ ভনিতা ছাড়াই প্রতিত্তোরে বললেন,
“ জ্বি বলছি!”
ওপাশের ব্যাক্তির কন্ঠস্বর কর্কশ। ব্যস্ত ভঙ্গিতে ফের বলেন,
“ আপনার ইমার্জেন্সি একবার থানায় আসতে হবে।”
ভ্রু গোটালেন তায়েফ সাহেব। ঠোঁটের আগায় বহু কথা এসে হানা দিলেও বিচক্ষণ ব্যাক্তি চুপ করে রইলেন কেমন।বিনিময়ে কেবল বললেন,
“ জ্বি আসছি!”
কথাটা শেষ হতেই ওপাশ থেকে কল কেটে গেলো তক্ষুনি। এদিকে তায়েফ সাহেব পড়লেন গাঢ় চিন্তায়। হুটহাট থানা থেকে এমন কল আসাটা মোটেও স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। মানুষটা নিজ চিন্তায় মত্ত ফোনের স্ক্রিনে থেকেই আঙুল চালিয়ে কল লাগালেন তাশরিক সাহেবের নম্বরে। ওপাশে দুটো রিং হতেই কল রিসিভ হলো।তায়েফ সাহেব তৎক্ষনাৎ ব্যস্ত গলায় বললেন,
“ নিচে আয় তশু! আমি থানায় যাচ্ছি।”
মেদমেদে সবুজ রঙের জিপ গাড়িটা মাত্রই ধূলো উড়িয়ে থামলো থানার বাইরে। সময় নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন তায়েফ সাহেব। বামহাতের তর্জনীতে গাড়ির চাবিটা ঝুলিয়েই গটগট পায়ে ঢুকলেন থানার ভেতর।তিনি ভেতরে ঢুকতেই খেয়াল করলেন আশেপাশের এসআই, কনস্টেবলরা কেমন ঘুরে ঘুরে দেখছে তাকে। কেউ কেউ মুখ টিপে হাসছে। এহেন কান্ডে তায়েফ সাহেবের কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাজঁ পড়লো যেন।তিনি গম্ভীর মুখে সামনে পা বাড়াতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়লো তারই কেবিনের বাইরে মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে থাকা রাজন সাহেবের পানে। তায়েফ সাহেব গম্ভীর মুখে এগোলেন তার দিকে। মানুষটার সামনে সটানভাবে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধালেন,
“ কি সমস্যা রাজন সাহেব? এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন যে?”
রাজন সাহেব রয়েসয়ে ঘাড় উঁচালেন। মুহুর্তেই দেখা মিললো তার ছলছল চোখজোড়া। তায়েফ সাহেব ভড়কালেন। সন্দিহান গলায় তৎক্ষনাৎ জিজ্ঞেস করলেন,
“ আরে আরে! কাঁদছেন না-কি?”
রাজন সাহেব জবাব দিতে পারলেন না কেন যেন। কেবল কাঁদো কাঁদো মুখে তাকিয়ে রইলেন নিষ্পলক চোখে। তায়েফ সাহেব আর-ও কিছু বলতে উদ্যোত হবেন ঠিক তখনি তার কেবিন রুম থেকে বেরিয়ে আসে একজন কনস্টেবল। এসেই কেমন কাঠকাঠ কন্ঠে বলেন,
“ জনাব তায়েফ এহসান! বিভাগীয় কমিশনার আপনাকে ভেতরে ডাকছেন। তারাতাড়ি আসুন।”
এহেন কথায় যারপরনাই অবাক হলেন তায়েফ সাহেব। বিভাগীয় কমিশনার আজ হঠাৎ কী মনে করে এলো? তায়েফ সাহেব কোনরূপ কালবিলম্ব না করে ভেতরে ঢুকলেন। দুপা ভেতরে ঢুকতেই একপা তড়াক উঁচিয়ে, এক হাত কপালে ঠেকিয়ে সালাম ঠুকলেন সজোরে। ডেস্কের ওপাশে গম্ভীর মুখে বসে আছেন বিভাগীয় কমিশনার। তার ঠিক মুখোমুখি চেয়ারে কেউ একজন পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে আয়েশি ভঙ্গিতে। সম্মুখেই ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ। ঠান্ডা হচ্ছে অবহেলায়! তায়েফ সাহেব খানিকটা দূরে দাঁড়িয়েই কেমন বাধ্য গলায় বললেন,
“ স্যার! ডেকেছিলেন?”
কমিশনার সাহেব ভার মুখে মাথা নাড়ালেন ওপর নিচ। সামনেই ডেস্কের ওপর পড়ে থাকা কালো রঙা ফাইল থেকে কিসের একটা খাম বের করে আনলেন পরক্ষণেই। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলের হাতে খামটা ধরিয়ে দিয়ে আদেশ ছুড়ে বললেন,
“ দিয়ে দাও ওনাকে।”
যথাযথ কাজ করলেন কনস্টেবল। দ্রুত কদমে এগিয়ে এসে খামটা দিয়ে গেলেন তায়েফ সাহেবের হাতে। তায়েফ সাহেব এখনো বোধগম্যহীনের ন্যায় তাকিয়ে আছেন খামের দিকে। সময় নিয়ে খামের উপরাংশ ছিড়ে খাম থেকে বের করে আনলেন ভাঁজ করা একপিস কাগজখণ্ড। রয়েসয়ে কাগজখণ্ডটা খুলতেই যেন একপ্রকার ঝটকা খেলেন তায়েফ সাহেব। ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালেন সম্মুখে। হতবাক কন্ঠে অস্ফুটে বললেন,
“ সাসপেনশন লেটার?”
কমিশনার সাহেব গম্ভীর মুখেই জবাব দিলেন,
“ জ্বি! আপনাকে আজকের পর থেকে সাসপেন্ড করা হলো।”
মুহুর্তেই যেন কানের পাশ থেকে ভোলতা উড়ে গেলো তায়েফ সাহেবের। মানুষটা এখনো কেমন অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছেন। মুখ ফুটে কিছু আওড়াবেন সে অবস্থাতেও তো নেই তিনি। প্রায় কিয়তক্ষন বাদে তায়েফ সাহেব নিজেকে সামলালেন। সন্দিগ্ধ কন্ঠে বলতে লাগলেন,
“ বাট হোয়াই স্যার? আমার দোষটা কী?”
কমিশনার সাহেব জবাবদিহিতায় বড্ড অনিহা দেখাচ্ছেন। তায়েফ সাহেবের কথাটা যেন শুনেও শুনলেন না তিনি। ওদিকে তায়েফ সাহেবের বুক ফেটে যাচ্ছে ব্যাকুলতায়। কেনো আজ তাকে সাসপেন্ড করা হলো? কিসের জন্য? তিনি তো তার হোল ক্যারিয়ারে একজন সৎ-নিষ্ঠাবান মানুষ ছিলেন। তারপরও কেনো? তায়েফ সাহেবের বুক ভাঙা কষ্ট গুলো যেন এবার চোখ দিয়ে বেরুবে। মানুষটা তক্ষুনি এদিক ওদিক দৃষ্টি ফেললেন এলোমেলো। ঠিক তখনি ডেস্কের এপাশে বসে থাকা মানুষটা কেমন উঠে দাঁড়ায় আচমকা। কমিশনার সাহেব তক্ষুনি কেমন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মানুষটাকে নিয়ে। গদগদ কন্ঠে বলতে লাগলেন,
“ আরে স্যার! আপনি উঠলেন কেনো? আরেকটু বসেন। কফিটাও তো খেলেন না স্যার!”
সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা ইশারায় আঙুল নাড়লেন বোধহয়। তায়েফ সাহেব খুব একটা খেয়াল করলেন না সেসব। এদিকে সম্মুখের ব্যাক্তি ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে। তাকে দেখামাত্রই তায়েফ সাহেব যেন আকাশ থেকে পড়লেন। এই ছেলেটা গতকালের ঐ ছেলেটা না? যে কি-না আইনমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে তান্ডব চালিয়েছিলো? তায়েফ সাহেব কেমন অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন সামনে। এদিকে মুগ্ধ হাসলো ঠোঁট কামড়ে। দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে ডেস্কের সনে গা এলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিয়তক্ষন। ছেলেটার চোখেমুখে স্পষ্ট বিদ্রুপ! তায়েফ সাহেবের বিচক্ষণ মস্তিষ্ক খুব একটা সময় নিলোনা সবকিছুর গোড়া ধরতে। তিনি ঠিক টের পেলেন — এসব কান্ডের পেছনে এই ছেলেরই হাত আছে। কথাটা ভাবতেই তায়েফ সাহেবের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। দাঁতে দাঁত চেপে, হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ করলেন তক্ষুনি। মুগ্ধ সরু চোখে দেখলো সবটা। পরক্ষণে ঠোঁটের কোণে শ্লেষাত্মক হাসির রেশ টেনে দু’হাত গুঁজল প্যান্টের পকেটে। গায়ে বাতাস লাগিয়ে কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়ালো তায়েফ সাহেবের একদম মুখোমুখি। লম্বায় বেশ উঁচু হওয়ায় ছেলেটা কেমন ঘাড় নুইয়ে দাঁড়ায়। চাপা স্বরে বিদ্রুপের সুরে বলে,
“ বলেছিলাম না? আমাদের আবারও দেখা হবে? সি.. ইট হেপেন্ড!”
রাগে থরথর করে কাঁপছেন তায়েফ সাহেব। চোয়াল ফুটলো শক্তভাবে। মুগ্ধ সবটা পরোখ করে কেমন শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলে ওঠে,
“ রাগ লাগছে? মারবেন না-কি? মারলে মারুন না! নিন আপনার সুবিধার্থে গালটাও এগিয়ে দিলাম।”
বলেই ডান গালটা কেমন এগিয়ে দিলো মুগ্ধ। তায়েফ সাহেব সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরালেন অন্যত্র। তা দেখে মুগ্ধ ফের বাঁকা হাসলো। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চোখে তাকিয়ে ভরাট কন্ঠে বলল,
সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৮
“ সেদিনও বলেছিলাম, আজ আবারও বলছি! এখন থেকে আপনার আমার প্রায়শই দেখা হবে ডিসি সাহেব। এন্ড গেস হোয়াট? প্রতিবার আমাদের মিটিংয়ে আপনি ভীষণ রকম চমকাবেন! কেননা…আই লাভ টু গিভ সারপ্রাইজেস!”
কথাটা বলেই মুগ্ধ কেমন সটান হয়ে দাঁড়ায়। তায়েফ সাহেব তার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকতেই মুগ্ধ করলো আরেক কান্ড! ছেলেটা হুট করেই কেমন চোখ টিপলো! পরমুহূর্তে ক্রুর হেসে তৎক্ষনাৎ পা চালিয়ে চলে গেলো বাইরে। এদিকে তায়েফ সাহেব গজগজ করছেন রাগে। একটা হাঁটুর বয়সী ছেলে কি-না তাকে এভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে? সত্যি?
