সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৮
jannatul firdaus mithila
রেহান বুক ধরে হাঁপাচ্ছে। গলার কাছটা কেমন শুকিয়ে কাঠ বনে গেছে তার! মুখগহ্বর থেকে শুষ্ক জিভখানা বেরিয়ে এসেছে বহু আগে। একটুখানি পানির তিয়াসে বুকটা বুঝি ফেটে যাচ্ছে বেচারার! ওদিকে মুগ্ধ যেন দেখেও দেখলোনা সেসব। সে কেমন গা-ছাড়া ভাব নিয়ে সিগার ফুঁকছে রীতিমতো।ঠোঁটের ফাঁকে সিগারের শেষভাগ গুঁজে রেখে ক্ষনে ক্ষনে বসাচ্ছে জোরালো টান। পরমুহূর্তেই নিজের নিকোটিনে পোড়া বাদামী ঠোঁটদুটো একে-অপরের থেকে খানিক আলগা করে, মুখে জমিয়ে রাখা সিগারের কলুষিত ধোঁয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে আবদ্ধ কেবিনে। যার সংস্পর্শে যেতেই ফের কেশে ওঠে রেহান। নিশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে ছেলেটার। সে কেমন ব্যাথাতুর কন্ঠে মিনমিনিয়ে বলল,
“ বন্ধ কর এসব!”
কথাটা কানে তুলেনি মুগ্ধ। উল্টো সিগারের ধোঁয়া ছড়ালো বেশি করে। যেখানে অন্যসময় লম্বা মোটা সিগারটা শেষ করতে মিনিমাম মিনিট দশেক লাগেই সেখানে আজ মুগ্ধ সময় নিলো মাত্র মিনিট তিনেক! লম্বা লম্বা টানে সিগারটা শেষ করে, সিগারের শেষভাগ ফেললো চকচকে টাইলসের মেঝেতে। পরক্ষণে মুগ্ধ বেশ জোরালো ভঙ্গিতে সিগারের অবশিষ্টটুকু পা দিয়ে পিষে, বাঁকা চোখে তাকালো রেহানের দিকে। শান্ত অথচ ভয়ংকর নিরেট কন্ঠে বললো,
“ ঠিক সেম ভাবেই যদি কিছু কিছু মানুষকে মাটির সাথে পিষে ফেলতে পারতাম, ইসস! তাহলে বোধহয় তেমন কোনো অপ্রয়োজনীয় মাথাব্যথাই থাকতো না আমার!”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
রেহানের শক্তিতে কুলোয়নি চোখ তুলে উপরে তাকানোর। তবুও সে বেশ শুনলো মুগ্ধের কথাটা। বুক চেপে বহুকষ্টে ঠোঁটের কোণে ফোঁটালো তাচ্ছিল্যের হাসি। ভাঙা ভাঙা কন্ঠে কোনমতে বলল,
“ রিভেঞ্জ অফ নেচার বলেও কিছু একটা থাকে বাডি! এন্ড আ’ম ডেস্পারেটলি ওয়েটিং ফর দিস।”
এটুকু বলেই রেহান তৎক্ষনাৎ চোখ তুললো ওপরে। মুগ্ধের ভরাট মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে শ্লেষাত্মক কন্ঠে ফের আওড়ালো,
“ বিশ্বাস কর! সেদিনটা আসতে কিন্তু খুব একটা সময় লাগবে না! সেদিন আমার জায়গায় তুই থাকবি আর আমি থাকবো নিরব দর্শক হয়ে। মনে রাখিস — মির্জা সায়ান মুগ্ধ! এভরি একশন হেজ দেয়ার ইক্যুয়াল রিয়েকশন। যেখানে ফেরাউনের মতো দাম্ভিকেরও পতন হয়েছে সেখানে তুই আবার এমন কী চিজ? তুই সময় গুনতে থাক।বরঞ্চ এখন থেকেই গুনতে শুরু কর, কেননা পরে যদি সময় না পাস? ”
মুগ্ধ হাসলো ঠোঁট পিষে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রেহানের আপাদমস্তক পরোখ করে দাঁত খিঁচে বলে ওঠে,
“ রাস্সি জাল গেয়া, পার আভিতাক তেরা হেকরি নেহি গেয়া! মাদা*র দোচ কেয়সা ইনসান হে বে তু?”
কথাটা ব’লেই সটান হয়ে দাঁড়ায় মুগ্ধ! মাফিয়া মনস্টার আবার বেশ কতক ভাষায় পারদর্শী। যখন যেটা রুচিতে ওঠে, তখন সেটাতেই গালাগাল করে ক্ষ্যান্ত হন। এই যেমন এখন। রেহান নিঃশব্দে হাসছে। মুগ্ধ আর দাঁড়ালো না।তৎক্ষনাৎ মেজাজ চটিয়ে প্রস্থান ঘটালো গটগট পায়ে। মুগ্ধ চলে যেতেই ধীরেসুস্থে দরজার গায়ে ভর দিয়ে ওঠে দাঁড়ায় রেহান। দু’পায়ে ভর দিতেই মাথাটা হঠাৎ চক্কর দিয়ে ওঠে তার। ছেলেটা তৎক্ষনাৎ দু’হাতে চেপে ধরে নিজের মাথা। দুচোখ একটুখানি বুঁজে নিয়ে, ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিয়তক্ষন! মাথাটায় সে-কি ভোঁতা যন্ত্রণা হচ্ছে তার। কানদুটোর চারপাশে এখনো ভো ভো শব্দ হচ্ছে।
গাড়ির চার চাকার বেসামাল ঘর্ষণে রাস্তার ধুলো উড়ছে! সে ধুলোর বেপরোয়া ছন্দকে একপ্রকার উপেক্ষা করে সিটি হসপিটালের সামনে গাড়ি থামায় রৌদ্র। সেকেন্ড খানেকের মধ্যেই গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে বেরিয়ে আসেন জনাব। পায়ের গতিতে বিন্দুমাত্র লাগাম না টেনে ছুটলেন ঘোড়ার বেগে। হসপিটালের রিসিপশন ডেস্ক পেরিয়ে কিছুটা সামনে যেতেই, তারাহুরো বশত হঠাৎ কারো সঙ্গে ধাক্কা লেগে যায় রৌদ্রের। রৌদ্র থামলো।তৎক্ষনাৎ পিছু ফিরে ধাক্কা লেগে যাওয়া ব্যাক্তির দিকে খুব একটা মনোযোগ না দিয়েই তাড়া দেখিয়ে বলল,
“ সরি ব্রো! আমি ইচ্ছে করে করিনি!”
ধাক্কা খাওয়া ব্যাক্তিটা বরং আর কেউ নয় স্বয়ং মুগ্ধ। রৌদ্রের এহেন কথায় ছেলেটা কেমন বাঁকা হেসে বললো,
“ নো ইট’স ওকে! আমি আবার এমন হুটহাট ঘটনা খুব একটা মনে রাখি না!”
রৌদ্র কৃতজ্ঞ হাসলো। হাতে সময়ের অভাব থাকায় আবারও ছুটলো লিফটের দিকে। এদিকে, রৌদ্রের চলে যাওয়ার পথে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মুগ্ধ! ছেলেটার আবার কি হলো কে জানে! সে কেমন অদ্ভুতভাবে ঠান্ডা হেসে বিরবিরিয়ে বলল,
“ যদিওবা আমি এমন হুটহাট ঘটনা মনে রাখিনা, কিন্তু আমি যাদের সাথে ঘটনা ঘটাই,তারা আবার খুব সহজে এসব ভুলতে পারেনা।”
থামলো মুগ্ধ। ডানহাতের বাহুটা খানিক নাড়িয়ে চারিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“ ধাক্কাটা কিন্তু খারাপ হয়নি! ব্যাটার গায়ে জোর আছে তবে। সে যাকগে… খেলাটা তবে এইবার জমবে!”
সরু করিডর দিয়ে পা খুঁড়িয়ে হাঁটছে রেহান।নিজের সাধ্যমত জোর চালিয়ে ছুটছে সে। এরইমধ্যে করিডরের শেষপ্রান্ত হতে উম্মাদের ন্যায় ছুটে আসে রৌদ্র। পায়ের বেপরোয়া গতিতে ছেলেটা খানিক স্লিপ কাটতে গিয়েও বহুকষ্টে নিজেকে সামলে নিলো কোনরকম। অন্যদিকে, রেহান বেচারা হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ তাকালো সম্মুখে।রৌদ্রকে ওমন নিজের দিকে ছুটে আসতে দেখে থামলো সে। এতক্ষণ যাবত নিজের উপচে পড়া কান্নাগুলোকে কোনমতে গিলে-টিলে রাখলেও এবার যেন চোখের পানি আর বাঁধ মানলোনা তার। ছেলেটা কেমন হু হু করে কেঁদে ওঠে দাঁড়িয়েই। রৌদ্র ছুটে এলো বন্ধুর নিকট। দু’হাতে শক্ত করে রেহানকে ঝাপটে ধরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে শুধালো,
“ তুই ঠিক আছিস ভাই? তোর..”
কন্ঠ জুড়িয়ে আসছে রৌদ্রের। এটুকু বাক্যও মুখ থেকে বেরুচ্ছে না ঠিকঠাক। ছেলেটা কী আর কম কষ্ট করলো? সে-ই যে আগন্তুক লোকটা রেহানের নম্বর থেকে বলল — রেহানকে সিটি হসপিটালে নেওয়া হয়েছে, সে কথা শোনামাত্রই তো রৌদ্র কেমন ঝড়ের বেগে ছুটে এসেছে বন্ধুকে দেখতে। শরীরটা তো এখনো কাপছে তার। এদিকে রেহান কেমন শক্ত করে খামচে ধরলো রৌদ্রের পিঠ। কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“ আমার বউ কই রোদ?”
থমকায় রৌদ্র। খানিক শুষ্ক ঢোক গিলে আলগোছে ছেড়ে দিলো রেহানকে। রেহানের ছলছল চোখের দিকে দৃষ্টি মেলানোর সাধ্য নেই তার। তাইতো রৌদ্র কেমন এলোমেলো দৃষ্টি ফেলছে এদিক-ওদিক। রেহান সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায় এবার।হেঁচকি তুলে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে ফের জানতে চাইলো,
“ আমার শ্যামবতী কোথায় রোদ? ও ভালো আছে তো?”
এবারেও নিশ্চুপ রৌদ্র! তার ওমন নিরবতা যেন কাঁটার ন্যায় বিঁধছে রেহানের গায়ে। রেহান তক্ষুনি নিজের সকল ব্যাথাকে উপেক্ষা করে দু’হাতে খামচে ধরে রৌদ্রের শার্টের কলার। দাঁত খিঁচে হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,
“ আমার বউ কই রোদ? কী হয়েছে ওর? তুই কথা বলছিস না কেনো?”
রৌদ্র ঘনঘন নিশ্বাস ফেলছে। নুইয়ে রাখা মাথাটা সামান্য উঁচিয়ে যেইনা কিছু বলতে যাবে ওমনি রেহান কেমন নিজ থেকেই দুকদম ছিটকে পড়লো পেছনে।চোখমুখ কুঁচকে সে তৎক্ষনাৎ চেপে ধরে নিজের কানদুটো। রৌদ্র হকচকিয়ে তাকায়।তক্ষুনি কদম বাড়িয়ে এগিয়ে এসে বসলো রেহানের সামনে। বিচলিত কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ এই রেহান! ভাই তোর কী হয়েছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোর?”
রেহান কাঁপছে। কাপাঁ কাঁপা কন্ঠে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে ওঠে,
“ আমার কানে কেমন চিনচিন ব্যাথা হচ্ছে রোদ! মাথাটা বোধহয় এক্ষুণি ফেটে যাবে!”
চিন্তায় পড়লো রৌদ্র। তড়িঘড়ি করে রেহানের হাতদুটো কান থেকে সরিয়ে আনতেই বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় সে। রেহানের হাতের তালু ভরে গেছে লাল টকটকে তাজা তরলে।রৌদ্র কেমন দিশেহারার ন্যায় দু’হাতে রেহানের মুখটা সামান্য বাঁকিয়ে, চোখ ফেললো কানের গহব্বরে। দেখলো, ছেলেটার কান বেয়ে অবলীলায় গড়িয়ে পড়ছে লহু। রৌদ্র তখন কোনরূপ কালবিলম্ব না করে বলে ওঠে,
“ তোর ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট দরকার রেহান! তারাতাড়ি ওঠ!”
বলেই রৌদ্র একহাতে চেপে ধরে রেহানের বাহু।বসা ছেড়ে উঠে গিয়ে, রেহানকে টানতে লাগলেই রেহান কেমন ঝাঁকুনি দিয়ে নিজের হাতটা সরিয়ে আনে রৌদ্রের হাত থেকে। মাথায় অসহ্য ব্যাথা থাকা স্বত্বেও, জমিনে ভর দিয়ে দাঁড়ায় সে। রৌদ্রের চোখে চোখ রেখে অনড়ভাবে বলে,
“ আমি আমার বউয়ের কাছে যাবো। আমায় তারাতাড়ি নিয়ে চল!”
“ কিন্তু রেহান..”
হাত উচাঁয় রেহান।ঠোঁটের ওপর তর্জনী চেপে বলে,
“ হুঁশ! নো মোর ওয়ার্ডস! আমি আমার বউয়ের কাছে যাবো। তুই নিয়ে গেলেও যাবো, না নিলেও যাবো।”
অগত্যা এমন কথায় দমে গেলো রৌদ্র। তবে মনে মনে চিন্তায় ফেটে পড়ছে ছেলেটা। এতবড় এক্সিডেন্টের পর মাথায় গুরুতর চোট লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু কান থেকে রক্ত পড়া? এতো নিসন্দেহে ইমার্জেন্সি কেস!
হসপিটালের সরু করিডরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন এহসান বাড়ি এবং সিকদার বাড়ির লোকজন। জুবাইদা বেগম মেয়ের শোকে জ্ঞান হারিয়েছেন আধঘন্টা আগে। তাকে নিয়েই ছুটোছুটি চলছে বাড়ির গৃহিণীদের। কবির সাহেব পাথর বনে গেছেন এহেন কান্ডে। রাফিয়া বেগম যখন ফোন করে জানালেন রুহির এহেন অবস্থার কথা, তখন সকলের মাঝে এক ভিন্ন আতঙ্ক চোখে পড়লেও, আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে কবির সাহেব ছিলেন একদম নির্বিকার! মানুষটার চেহারার রঙ বদলেছে ঠিকই, কিন্তু তেমন কোনো ভাব-গতিক পরিলক্ষিত হয়নি এখনো।তিনি কেমন স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন বারান্দায় পেতে রাখা আসনের একটায়। সাব্বির সাহেবসহ তার বাকি ভাইয়েরা মিলে কবির সাহেবকে এটা-ওটা বলছেন। কেউবা আশ্বাস দিচ্ছেন মেয়েকে নিয়ে। তবে এতেও কবির সাহেবের মুখাবয়বে তেমন কোনো পরিবর্তন নেই!
অন্যদিকে, সায়মা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে দিশেহারা! ওসমান সিকদার বউকে সামলাতে গিয়ে বেশ বেগ পোহাচ্ছেন! এরমধ্যে ছেলের ফোনে বারকয়েক কল দিয়েছেন যদিও, তবুও ছেলেটা যে কোথায় আছে তার কে জানে!
প্রায় মিনিট বিশেক পর, সরু বারান্দা দিয়ে পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে আসে রেহান। বারান্দায় থাকা পরিবার -পরিজনেরা ছেলেটার এহেন অবস্থা দেখে একমুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন আচমকা।রেহানের সম্পূর্ণ কপাল ঢেকে আছে সফেদ রঙা মোটা ব্যান্ডেজে। তারপরও ব্যান্ডেজের বেশ কিছু জায়গায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে র**ক্তের দাগ। ঘাড় বেয়ে চুইয়ে পড়ছে লহু। ডানহাতের পিঠে গভীর ক্ষত। সেখান থেকে এখনো ঝড়ছে র*ক্ত। গালের একপাশের চামড়ায় পড়েছে গোটাকতক ক্ষতের চিহ্ন। শুধু কী তাই? ছেলেটা তো এখনো কেমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে! সায়মা খাতুন পলক ফেলতেই দৌড়ে এলেন ছেলের কাছে। ছেলের সারা গায়ে কাঁপা কাঁপা হাত বুলিয়ে থেমে থেমে বললেন,
“ এসব কী রেহান? তুই এতো ব্যাথা পেলি কীভাবে বাবা? তোর কষ্ট হচ্ছে না? আয় আমার সাথে!”
রেহান মায়ের কথায় তেমন একটা পাত্তা দিলোনা।উল্টো এদিক ওদিক নজর ঘুরিয়ে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“ তোমরা সবাই এখানে কেনো? আর.. আমার রুহি কোথায়?”
রুহির কথা উঠতেই আরেকদফা ভেঙে পড়লেন সায়মা খাতুন। হু হু করে কেঁদে দিয়ে, মানুষটা কপাল ঠেকালেন ছেলের বক্ষে। এহেন করুণ ক্রন্দন সুর শুনে রেহানের বুকটা কেমন ধ্বক করে উঠলো। সে তৎক্ষনাৎ মা’কে নিজের বুক থেকে সরিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কাঁদছো কেনো আম্মু? যতবার রুহির কথা জিজ্ঞেস করছি ততবারই সবাই এমন কেঁদে উঠছো কেনো? আমার বউ কোথায়? ওকে ডাক দাও,বলো আমি এসেছি!”
কথা শুনলেন না সায়মা খাতুন। একাধারে কেঁদেই যাচ্ছেন তিনি। রেহান এবার বড্ড বিরক্ত। তেতে উঠা কন্ঠ উঁচিয়ে ডাক দিলো,
“ রুহি! রুহি? বউ আমার! কই তুমি? তারাতাড়ি বেরিয়ে এসো।”
“ রুহি আসবেনা রেহান।ও এখন ওটিতে, জীবন -মৃত্যুর মাঝখানে ঝুলছে!”
থমকায় রেহান।কন্ঠস্বর যেন হারিয়ে ফেললো মুহুর্তেই। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে ফিরে তাকায় বাবার পানে। কানে ভুল শুনলো কি-না যাচাই করতে কেবল জিজ্ঞেস করল,
“ ক-কী বললে?”
ওসমান সাহেবের গলা ধরে এসেছে। তিনি বারকয়েক শুকনো ঢোক গিললেন।ছেলের ব্যাথাতুর চোখদুটোর পানে দৃষ্টি না ফেলে অন্যত্র তাকিয়ে বললেন,
“ রুহি সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছে!”
এহেন কথায় নিশ্বাস আঁটকে আসে রেহানের।ছেলেটা কেমন থমকে গিয়ে পিছিয়ে যায় দু-কদম। বুকটা কেমন জ্বলছে তার।রেহান তৎক্ষনাৎ হাত উঠিয়ে বুক ডলতে থাকে অনবরত। আরেকবার মাথায় হাত বোলায় পাগলের ন্যায়। ঠোঁট কামড়ে এদিক ওদিক উম্মাদের ন্যায় দৃষ্টি ফেলে বিরবির করে বলে,
“ আমার বউ! আমার বউ!”
প্রতিটা মানুষ গুমরে কাঁদছে। সায়মা খাতুন ছেলের এহেন পরিস্থিতি সহ্য করতে পারছেননা মোটেও। এদিকে রেহান এবার বহুকষ্টে নিজেকে শক্ত করলো। দৃষ্টি ফেললো অদূরের বদ্ধ ওটির পানে।রেহান সেদিকে কদম বাড়াতে গেলেই পেছন থেকে তার একহাতের কব্জি টেনে ধরে রৌদ্র। রেহানের পদযুগল থামলো। ঘাড় বাকিয়ে তাকালো পেছনে। সন্দিহান গলায় বললো,
“ হাত ধরলি কেনো? হাত ছাড়!”
ছাড়েনি রৌদ্র। উল্টো হাতের চাপ বাড়িয়ে বলতে লাগলো,
“ তোর সাথে জরুরী কথা আছে আমার। আগে শুনে যা!”
বিরক্ত হলো রেহান। তৎক্ষনাৎ বিরক্ত ভঙ্গিতে এক’হাতে রৌদ্রের বুক বরাবর সজোরে ধাক্কা দিয়ে বলে ওঠে,
“ ফা*ক ইউর কথাবার্তা! আমার হাত ছাড়।আমাকে আমার বউয়ের কাছে যেতে দে!”
হঠাৎ ধাক্কার তাল সামলাতে না পেরে রৌদ্র খানিক পিছিয়ে গেলেও হাত ছাড়েনি রেহানের। এদিকে, করিডরে এমন হৈচৈ শুনে হন্তদন্ত পায়ে ছুটে এলেন ডক্টর ফারহানা। হাত বাড়িয়ে চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
“ কি হচ্ছে এখানে? এতো চেচামেচি কিসের? ভুলে যাবেন না এটা হসপিটাল!”
ডাক্তারের কন্ঠ পেয়ে সেদিকে তাকায় রেহান। তারপর কী মনে করে রৌদ্রের হাত থেকে নিজের হাতটাকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে চলে আসে ডাক্তারের নিকট। এসেই কেমন করুণ কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“ ডাক্তার.. আমার বউ কোথায়?”
ডক্টর ফারহানার টনক নড়লো এবার।তিনি তক্ষুনি প্রশ্ন ছুড়লেন,
“ আপনি পেশেন্টের হাজবেন্ড?”
রেহান কালবিলম্বহীন ওপর নিচ মাথা ঝাকায়। ডাক্তার তখন ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো খানিকটা। সময় নিয়ে বলল,
“ আ’ম সরি টু সে দেট জেন্টলম্যান, বাট আপনার ওয়াইফের অবস্থা খুব ক্রিটিকাল! ”
বুক কাঁপছে রেহানের। গলার স্বরটাও কেমন জুড়িয়ে আসছে হঠাৎ হঠাৎ। এরমধ্যে মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। রেহান কান্না জড়ানো কন্ঠে ভেঙে ভেঙে বলল,
“ আমার বউকে সুস্থ করে তুলুন ডক্টর! বিনিময়ে আপনার যা দরকার সব নিয়ে নিন। প্রয়োজনে আমার দেহের সকল র*ক্ত নিয়ে যান। আমার ব্লাড গ্রুপ O নেগেটিভ। আমি দিতে পারবো আমার বউকে র*ক্ত!”
ডক্টর ফারহানা নিশ্চুপ হয়ে শুনলেন পাগল ছেলেটার কথাগুলো। তিনি পরক্ষণে আবারও যোগ করলেন,
“ আমরা হয়তো আপনার বাচ্চা কিংবা বউয়ের মাঝে যেকোনো একজনকে বড়জোর বাঁচাতে পারব। এখন আপনি কাকে বাঁচাতে চান?”
ডক্টরের কথা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রেহান কেমন জোর গলায় বলে ওঠে,
“ বাচ্চা লাগবেনা আমার! একদম লাগবেনা।আপনি শুধু আমার শ্যামবতীকে বাঁচান।আমার বউকে সুস্থ করে ফিরিয়ে আনুন!”
এটুকু বলে থামলো রেহান। গলা থেকে কান্নাগুলো উগড়ে আসছে তার। ছেলেটা কেমন ঢোক গিলে থেমে থেমে বলল,
“ আমার বউ বাঁচবে তো ডাক্তার? আমি.. ওকে আবারও ফিরে পাবো তো নিজের কাছে? ওর কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচব না ডাক্তার। আপনি দয়া করুন আমার ওপর!”
ডাক্তার ফারহানার চোখ ভরে আসছে এপর্যায়ে।তিনি তৎক্ষনাৎ কিছু না বলে চলে গেলেন অন্যত্র। এদিকে তিনি রাস্তা থেকে সরে যেতেই রেহান আবারও ছুটলো ওটির দিকে।তবে খুব একটা কাছে যেতে পারেনি সে।এর আগেই রৌদ্র ছুটে এসে পেছন থেকে ঝাপটে ধরেছে তাকে।
“ ছাড় আমায়! আমাকে আমার বউয়ের কাছে যেতে দে! আমার শ্যামবতী ঐখানে কষ্ট পাচ্ছে.. ও একা একা থাকতে পারবেনা আমাকে ছাড়া।ও…ও র*ক্ত খুব ভয় পায় রোদ।আমাকে ছেড়ে দে প্লিজ! আল্লাহর দোহাই লাগে আমাকে ওর কাছে যেতে দে।”
রেহানের গগনবিদারী আর্তনাদে হসপিটালের সরু বারান্দার চারপাশটা কেমন ভারী হয়ে উঠেছে মুহুর্তেই। ব্যাথায় জর্জরিত রেহানের নিজের প্রতি তেমন হুঁশ নেই!চারপাশের মানুষজন স্পষ্ট দেখছেন আহত ছেলেটার আত্মচিৎকার। ছেলেটার ঘাড় বেয়ে এখনো টুপটুপ করে চুইয়ে পড়ছে লহু। কান থেকেও বইছে মৃদু র*ক্ত। কপালের উপরিভাগে মোটা করে ব্যান্ডেজ লাগানো জায়গাটায় এতক্ষণ বাইরে থেকে কেবল র*ক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখা গেলেও এখন কপাল বেয়ে ঝড়ে পড়ছে লহু। হাতের ক্যানোলা বসানো গভীর ক্ষত জায়গাটা হতে চুইয়ে পড়ছে র*ক্ত। হাতের তালু লেপ্টে গেছে লাল রঞ্জিত তরলে। বেচারার ওমন করুণ পরিস্থিতি দেখে সকলেই কেমন ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। এদিকে রৌদ্র তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে। থামাচ্ছে ওটির ভেতরে যাওয়া থেকে।
তবে রেহান আজ তেমন কারো বাঁধ মানছেনা।ছেলেটার গায়ে হুট করেই এতো শক্তি এলো কোত্থেকে কে জানে!শক্তপোক্ত রৌদ্রের এখন বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে তাকে ধরে রাখতে। রেহান মোচড়াচ্ছে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে ভেতরে যেতে। কিন্তু রৌদ্র ছাড়ছেনা। দু’হাতের বাঁধন আরও খানিকটা দৃঢ় করে রেহানকে আঁটকে রাখলো কোনরকম! রেহানের এবার পাগল হওয়ার দশা যেন! ছেলেটা কেমন বোধ হারিয়ে মাথা দিয়ে সজোরে রৌদ্রের নাক বরাবর আঘাত করে বসলো।আচমকা আক্রমণে রৌদ্র নামক দৃঢ় পুরুষের খানিকটা টলে যাওয়ার কথা থাকলেও সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো আগের মতো। হঠাৎ রৌদ্রের বোধ হলো, তার নাক দিয়ে গরম কিছু চুইয়ে পড়ছে! চোখদুটো কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমাগত! তারপরও সে একবিন্দু নড়লোনা রেহানকে ছেড়ে। উল্টো রেহানকে চেপে ধরেই বলতে লাগলো,
“ যত ইচ্ছে মার ভাই,কিচ্ছু বলবো না আমি! তবুও নিজেকে শক্ত কর। এমুহূর্তে একসাথে দু’জনকে সামলানোর মুরোদ নেই আমার।প্লিজ বোঝ একটু!”
রেহানের আজ ওতো বুঝ-টুঝ কাজে আসবে? বউকে একপলক কাছ থেকে দেখার জন্য ছেলেটা কেমন পাগল সেজেছে দেখো! সে উল্টো রৌদ্রকে আর্তনাদ করে বলে ওঠে,
“ তোর দু’টো পায়ে ধরি ভাই। আমায় একটু যেতে দে আমার শ্যামবতীর কাছে। একটু ছুঁতে দে ওকে। ওকে দেখতে না পেয়ে — আমি মরে যাচ্ছি ভাই। এই দেখ!আমার বুকটা ভীষণ কাঁপছে ভাই। খুব ব্যাথা হচ্ছে আমার এ বুকটায়।”
গম্ভীর পুরুষদের কাঁদতে নেই। তাও যদি হয় লোকালয়ে! তাহলে তো কথাই নেই। রৌদ্র চোখ নুয়ে ফেললো আচমকা। করুণ কন্ঠে বলল,
“ এমুহূর্তে ওকে দেখলে সইতে পারবিনা ভাই।ভেঙে পড়বি!”
আপাতত রৌদ্রের প্রতিটি কথা বিষের ন্যায় যন্ত্রণা দিচ্ছে রেহানকে।ছেলেটা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে ছোটার। তবে পারছেনা কোনমতেই। ঠিক তখনি তাদের পাশ কাটিয়ে স্ট্রেচারে করে অপারেশনের সরঞ্জামাদী নিয়ে যাচ্ছেন একজন নার্স। রেহানের মাথায় হঠাৎ কোন ভূত চাপলো কে জানে। সে তক্ষুনি বামহাতের কনুই দিয়ে আবারও রৌদ্রের নাক-মুখ বরাবর ঘুষি বসালো সজোরে। এবারের ব্যাথাটা বুঝি ব্যাপক লেগেছে রৌদ্রের।ছেলেটা তৎক্ষনাৎ নাকে হাত চেপে পিছিয়ে গেলো দু-কদম। এই সুযোগে রেহান ছুটলো।ওটির সামনে এসে দাঁড়াতেই বাঁধ সাধলো সাব্বির সাহেব আর তাশরিক সাহেব। দু’জন সটান হয়ে দাঁড়ালেন দরজার সামনে। রেহান থামলো।উদ্ভ্রান্তের ন্যায় আশপাশ একদফা নজর বুলিয়ে হুট করেই চলে গেলো নার্সের কাছে।একটানে অপারেশনের সরঞ্জামভর্তি ট্রে থেকে ধারালো A9 সাইজের চিকন ছুরিটা হাতে নিয়ে তৎক্ষনাৎ নিজের গলায় চেপে ধরলো।তা দেখামাত্রই সায়মা খাতুন কেমন চিৎকার দিয়ে ওঠেন! কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে ওঠেন,
“ রেহান! বাপ আমার!”
শুনছেনা রেহান। উল্টো গলার কাছে ধারালো ছুরিটা বেশ গভীরভাবে চেপে ধরে বলল,
“ আমাকে আমার বউয়ের কাছে যেতে দে! নইলে এক্ষুণি নিজেকে শেষ করে ফেলবো আমি!”
এহেন কথায় রৌদ্রের সম্বিত ফিরল যেন। সে তড়িৎ তাকালো রেহানের পানে।ছেলেটার ওমন পাগলামি দেখে দাঁত খিঁচে ধমকে উঠে বলল,
“ হোয়াট দা হেল আর ইউ ডুয়িং রেহান? পুট দা নাইফ ডাউন।”
কে শোনে কার কথা! রেহানের হাত-পা কাঁপছে উত্তেজনায়।গলায় ধরে রাখা ছুরিটার গায়ে ধীরে ধীরে র*ক্তের পরশ বইছে। ফ্যাকাশে হয়ে আসা ঠোঁটজোড়া দিয়ে ছেলেটা কেমন করুণ উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বলতে লাগলো,
“ মরে যাবো ভাই! আমার শ্যামবতীর কিছু হলে আমি এমনিতেই মরে যাবো।অন্তত আমার মতো অভাগাকে মরার আগে একটিবার আমার শ্যামবতীকে দেখতে দে। ওকে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরতে দে। কথা দিচ্ছি, খুব সময় নিবোনা আমি। আর নিবোই বা কীভাবে ভাই? আমার কাছে কী আর ওতো সময় বেঁচে আছে? আমায় ভেতরে যেতে দে। নাহলে…নাহলে কসম খোদার! আমি এক্ষুণি নিজেকে শেষ করে ফেলবো। রাখবো না আমি আমার এ প্রাণ।আমার অস্তিত্ব যেখানে মৃত্যুসংকটে সেখানে আমার বেঁচে থেকে কী লাভ?”
রৌদ্রের এপর্যায়ে দিশেহারা হবার ন্যায় অবস্থা। তারপরও ছেলেটা নিজের বিচক্ষণ মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে রেহানকে কথার জালে ফাঁসাতে লাগলো। চোখের ইশারায় তাশরিক সাহেবকে বোঝালো কিছু একটা। তাশরিক সাহেব বুদ্ধিমান মানুষ! তড়িৎ বুঝে গেলেন যা বোঝার। রেহানের পেছন থেকে তিনি তৎক্ষনাৎ কন্ঠ উঁচিয়ে বলে ওঠেন,
“ এমন সময় পাগলামি করতে নেই রেহান! প্লিজ নিজেকে সামলাও!”
রেহান কন্ঠায় ছুরি চেপে রেখেই পেছনে ঘুরে তাকায়। ভাঙা কন্ঠে বলে,
“ নিজেকে সামলানোর মতো একবিন্দুও শক্তি অবশিষ্ট নেই আমার মাঝে। এপর্যায়ে যা আছে তা কেবল একরাশ অপেক্ষা, আকাঙ্খা! নিজের শ্যামবতীকে খুব কাছ থেকে দেখার তৃষ্ণা!”
সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৭
এই সুযোগ! রৌদ্র কেমন পা টিপে টিপে এগিয়ে এলো রেহানের পিছে।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নার্সের ট্রে থেকে নিঃশব্দে সেডেটিভ নিয়ে নেয় হাতে। তারপর ট্রে থেকে একটা নতুন অব্যাবহৃত সিরিঞ্জ নিয়ে, সেডেটিভ লিকুইডটা সিরিঞ্জে ঢুকিয়ে নেয়।এহেন সময় ভুলবশত নার্সের হাত থেকে ট্রে টা পড়ে যায় নিচে। ঠিক তখনি ঘাড় বাকিয়ে পাশে তাকায় রেহান। গলা থেকে ছুরিটা খানিক আলগা হতেই রৌদ্র তৎক্ষনাৎ একহাতে চেপে ধরে রেহানের ঐ হাত। তারপর ছেলেটাকে নিজের শক্তপোক্ত বাহুর আগলে ধরে রেখে, বেশ কায়দা করে রেহানের ঘাড় বরাবর ইনজেকশনটা পুশ করে দেয়। রেহান ছটফটায়। তবে সে ছটফটানি খুব একটা সময় স্থায়ী হলোনা যেন। এরইমধ্যে রেহানের চোখের সামনে সবটায় কেমন আধার নেমে গেলো। ছেলেটা চলে গেলো গভীর নিদ্রার জালে। তবুও তার কন্ঠে অস্ফুটে ভাসছে,
“ শ্যামবতী! আমাকে ছেড়ে যেয়ো না!”
