Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৭

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৭

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৭
jannatul firdaus mithila

হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে রৌদ্র! দু’হাতে র*ক্তাক্ত বোনটাকে কোলে তুলে একপ্রকার দৌড়াচ্ছে হসপিটালের করিডর দিয়ে। ছেলেটার গায়ে এখনো জড়িয়ে রাখা কিচেন এপ্রন। তবে এপ্রনটার শুভ্র নির্মল রং খানা ধুয়েমুছে রক্তা*ভ রঙে জর্জরিত। রৌদ্র ছুটছে ভীষণ। গলা উঁচিয়ে ডাক পারে,
“ নার্স! নার্স! তারাতাড়ি আসুন স্ট্রেচার নিয়ে।”
সরু করিডোরের শেষভাগ দিয়ে সামনের দিকে ছুটে আসছেন দু’জন নার্স।টাইলসের ফ্লোরে কর্কশ শব্দ তুলে ঠেলে আনছেন স্ট্রেচার! মিনিট খানেকের মধ্যেই স্ট্রেচার চলে এলো রৌদ্রের সম্মুখে। রৌদ্র সময় নিলো না। তৎক্ষনাৎ বোনকে আলতো করে স্ট্রেচারে শুইয়ে দিয়ে হুকুম ছুড়লো,

“ গো এন্ড টেক হার টু দা ওটি রুম! আ’ম কামিং!”
হুকুম তামিল করলেন নার্স দু’জন। ঝড়ের গতিতে ছুটলেন রোগীকে নিয়ে। অন্যদিকে, সরু করিডর দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসেন জুবাইদা বেগম। পেছন থেকে রাফিয়া বেগম, মাইমুনা বেগমও ছুটছেন রীতিমতো। তবে তারা আজ মোটেও নাগাল পাচ্ছেন না জুবাইদা বেগমের। মানুষটার আজ কি হলো কে জানে! তিনি তো নিজের মাঝে নেই একদমই! খালি পায়ে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় দৌড়াচ্ছেন তিনি। মাথায় কাপড় নেই,চুলগুলো পাখির বাসার ন্যায় এলোমেলো। শাড়ির আঁচল ঝুলছে ফ্লোরে। রৌদ্র ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকায়। মায়ের ওমন বেহাল দশা দেখে তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে নিজ জায়গায়। ছুটন্ত জুবাইদা বেগম ছেলেকে পাশ কাটিয়ে মেয়ের ওটির দিকে ছুটতে চাইলেই বাঁধ সাধলো রৌদ্র। দু’হাতে তৎক্ষনাৎ ঝাপটে ধরলো মা’কে। জুবাইদা বেগম ভারী অশান্ত! উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছুটোছুটি চালিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ আব্বা আমার মেয়ে! আব্বা ছাড়ো আব্বা!”
রৌদ্রের মুখাবয়ব বাইরে থেকে গম্ভীর। বড় ছেলে কি-না! তার কী আর বয়স আছে, অবুঝদের ন্যায় চিৎকার দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করার? রৌদ্র ছাড়লোনা মা’কে। উল্টো মা’কে ভীষণ শক্তভাবে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে বলল,
“ শান্ত হও আম্মু! আমি আছি তো।বুড়ির কিচ্ছু হবে না!”

মায়ের মন কী আর ওতো কথা শোনে? জুবাইদা বেগম একাধারে দুদিকে মাথা নাড়াচ্ছেন আর বায়না ছুড়ছেন মেয়ের কাছে যাবার। রৌদ্র পড়লো বিপাকে। ওদিকে মেয়েটার কাছে যাওয়াটাও তো জরুরী। রৌদ্র সামনের দিকে তাকায় আরেকবার। অদূর থেকে ছুটে আসছে অরিন। রাফিয়া বেগম আর মাইমুনা দাঁড়িয়ে আছেন করিডরের মাঝ বরাবর। ফোনে কথা বলছেন কারো সাথে। বোধহয় বাড়ির কর্তাদের জানাচ্ছেন এ অঘটনের বিষয়ে।
অরিন ছুটে আসে রৌদ্রের নিকট। হাঁটুর ওপর দু’হাতের ভর রেখে খানিকক্ষণ হাঁপাতে থাকে অনবরত। রৌদ্র নির্বিকার। অরিন খানিকটা স্থির হতেই সে কেমন ভরাট কন্ঠে বলে ওঠে,

“ আম্মুকে ধর!”
সটান হয়ে দাঁড়ায় অরিন। রৌদ্রের বলা কথাটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে, দু’হাতে আগলে ধরে জুবাইদা বেগমকে। রৌদ্র তখন নিশ্বাস ফেললো ক্ষুদ্রভাবে।অরিনের পানে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তর্জনী উঁচিয়ে কাঠকাঠ কন্ঠে বলে,
“ খেয়াল রাখবি সবার!”
ওপর নিচ মাথা নাড়ায় অরিন। রৌদ্র ফের বলে,
“ আই সেইড — সবার! ইনক্লুডিং মাই সানশাইন! আমি আসছি।”
বলেই তৎক্ষনাৎ উল্টো দিকে পা বাড়ায় রৌদ্র।অথচ পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার কাঁধে দিয়ে গেলো একরাশ দায়িত্ব!

চারিদিকে কোলাহল! মানুষের ভীড়ে পা রাখবার জায়গা নেই কোথাও। মিনিট পাঁচেক হবে হয়তো মহাসড়কে রোড এক্সিডেন্ট হয়েছে।অথচ এরইমধ্যে চারিদিকে পড়ে গিয়েছে মাত্রাতিরিক্ত ভীড়। সকলের হাতে একখানা স্মার্টফোন।কেউ কেউ ইতোমধ্যেই ফোনের লাইভ অপশন অন করেছে, কেউ কেউ কায়দা করে করছে ভিডিও। পুলিশ এখনো অনস্পটে আসেনি।স্বাভাবিক! এত তারাতাড়ি চলে এলে কীভাবে হবে শুনি? ওদিকে ঘিয়ে রঙা চকচকে গাড়িটা উল্টে আছে রাস্তার একপাশে। গাড়ির আশেপাশে ছড়িয়ে আছে ছিটেফোঁটায় র*ক্ত। কেউ একটু আগ বাড়িয়ে যাচ্ছেও না কাছে। অথচ গাড়ির ভেতরে কেউ একজন যে মৃত্যুর সমতূল্য যন্ত্রনায় ছটফট করছে তা কী দেখছে কেউ?

রাস্তার ঠিক ডানদিকে উল্টো মহাসড়ক। গাড়িসব যাচ্ছে উল্টোদিকে।অথচ ব্যস্ত রাস্তাটার একপাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো রঙা মার্সিডিজ বেঞ্জ ব্র্যান্ডের প্রাইভেট কার। সে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বেশ আয়েশ করে বসে আছে মুগ্ধ।দু-আঙুলের ভাঁজে বিদেশি সিগার নিয়ে টানছে টুকটাক। পরমুহূর্তেই ঠোঁট ফাঁক করে কলুষিত ধোঁয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসে। রাস্তার ওপারে যেখানে জনে জনে ভীড় জমিয়েছে এক্সিডেন্ট দেখতে, সেখানে রাস্তার এপাড়ে বসে আয়েশ করছেন তিনি। ছেলেটার চোখেমুখে মোটেও দুঃখ দুঃখ ভাব নেই। উল্টো ভাবলেশহীন ভঙ্গিমায় লেপ্টে গেছে সর্বমুখ। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে সে-ই চিরচেনা ক্রুর হাসি। সময় পেরুলো। মুগ্ধ একবার বা-হাতের কব্জি উল্টে ঘড়ির পানে চোখ রাখে।সময় গড়িয়েছে প্রায় ১০ মিনিট। এবার বোধহয় তার বেরুনো উচিত। তাই যে-ই ভাবনা সে-ই কাজ।গাড়ির দরজায় ধাক্কা দিয়ে ড্রাইভিং সিট থেকে বেরোয় মুগ্ধ। গায়ে ফিনফিনে কালো রঙা শার্ট। শার্টের গলার কাছে আঁটকে আছে সোনালী -কালো আভা মিশ্রিত রোদচশমা। মুগ্ধ হাত বাড়িয়ে চশমাটা চোখে আঁটে। অতঃপর গম্ভীর মুখে শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে পা বাড়ায় রাস্তার ওপারে।

মাথার ওপর দিবাকর তুলছে তান্ডব। সেদিকে পাত্তা নেই যুবকের। সে কেমন ভীড় ঠেলে এগিয়ে আসে স্পটে।এতক্ষণে স্থানীয়দের উদ্যোগে রেহানের উদ্বার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। র*ক্তা*ক্ত নিথর দেহখানা লুটিয়ে আছে কনক্রিটের জমিনে।সর্বমুখে,গায়ে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে গভীর ক্ষত। সে দিকে তাকিয়ে থেকে মুগ্ধ কেমন রহস্য নিয়ে হাসলো। কদম বাড়িয়ে নিষ্প্রাণ রেহানের কাছে এসে, একহাঁটু গেঁড়ে বসলো আলতো ভাবে। তারপর আহত রেহানের মুখপানে তাকিয়ে থেকে চাপা স্বরে ঠেস মেরে বলল,

“ গাড়ি চালানোর সময় কথা বলতে নেই কিডো! এক্সিডেন্ট হয়তো। ইশশ্! হয়ে গেলো তো? চু চু চু!”
ঠোঁট গোল করে চুক চুক চুক শব্দ তুলছে মুগ্ধ। পরমুহূর্তেই নিজের মুখাবয়বে আচমকা পরিবর্তন আনে সে।বেশ দুঃখী দুঃখী একটা ভাব।কাঁদো কাঁদো মুখ বানিয়ে, শক্তপোক্ত দু’হাত বাড়িয়ে আহত রেহানকে তুলে নিলো কাঁধে। আশপাশ থেকে দুয়েকজন এগিয়ে আসতে চাইলেই হাত উঁচিয়ে বাঁধ সাধে মুগ্ধ। কপট আহত কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ ও আমার পরিচিত! আপনারা সরে দাঁড়ান,আমি ওকে হাসপাতাল নিয়ে যাবো।”
আশেপাশের মানুষজন আর আগ বাড়িয়ে তেমন কিছু বললেন না।এমনিতেই রোড এক্সিডেন্ট, পুলিশি ঝামেলার ব্যাপার স্যাপার। কেই-বা যাবে আগ বাড়িয়ে ওসবে পড়তে? এরচেয়ে বরং নিয়ে যাক সে। যার যারটা সে সে বুঝুক।

ইমার্জেন্সি রুমে ব্যস্ত ভঙ্গিতে ছুটছেন নার্স কয়েকজন। সে-ই সাথে ব্যস্ত ইমার্জেন্সি ফিজিশিয়ান, সিনিয়র অবসটেট্রিশিয়ান, অ্যানেস্থেশিওলজিস্ট আর নিওনেটোলজিস্ট। সকলের চোখেমুখেই উপচে পড়া উদ্বেগ। রোগীকে ইমার্জেন্সি রুমে আনার সাথে সাথেই মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি টিম এসে হাজির। দায়িত্বরত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ রেজা হাবিব, রোগীকে বেডে শোয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লাইফ সেভিং একশনে তৎপর হয়েছেন। তার হুকুমে নার্স দু’জন একইসাথে রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি, পালস পরীক্ষা এবং রক্তচাপ পরিক্ষা করছেন।মেডিসিন ডাক্তার ইমার্জেন্সি আইভি লাইন সংযোগ দিয়েছেন। সে-ই সাথে দিয়েছেন প্রাথমিক ঔষধ। তবে রোগীর অতিরিক্ত র*ক্তপাতের কারণে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ তৎক্ষনাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,

“ ইট’স এন ইমার্জেন্সি! কল অবস্টেট্রিক্স!”
এহেন কথায় অবসটেট্রিশিয়ান এবং গাইনেকোলজিস্ট তৎক্ষনাৎ ছুটে আসেন জোরালো পায়ে। রোগীকে ভালোমতো পরিক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দু’জনেই একযোগে চোখ রাখে মনিটরের স্ক্রীনে। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মায়ের গর্ভে থাকা ছোট্ট প্রাণটার হৃৎস্পন্দন গতি। যা তুলনামূলক বেশ কম।গাইনেকোলজিস্ট খানিক ঢোক গিললেন তা দেখে। ঘাড় বাকিয়ে অবসটেট্রিশিয়ানকে চাপা স্বরে বললেন,
“ আই থিংক ইট’স প্লাসেন্টাল এবরাপশন!”

অবসটেট্রিশিয়ান নির্বাক।তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর না করে সময় নিয়ে নার্সের উদ্দেশ্যে বললেন,
“ রোগীর আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্ট কোথায়? ইমার্জেন্সি নিয়ে এসো সেটা!”
এহেন কথা শুনে তক্ষুনি নার্সদের মধ্যে একজন ঝড়ের বেগে ছুটলেন বাইরে। তবে খুব একটা দৌড়াতে হয়নি তার।এর আগেই হাতে আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্ট নিয়ে ওটির বাইরে হাজির রৌদ্র। নার্সকে দেখতে পেয়েই তাড়া দেখিয়ে বলল,
“ তারাতাড়ি এটা নিয়ে যাও ভেতরে।”
হালকা মাথা নাড়ায় নার্স। রৌদ্রের হাত থেকে রিপোর্টটা নিয়ে আবারও ঢুকলো রুমে। ছুটে এসে দাঁড়ালেন ডাক্তারের সামনে। হাত বাড়িয়ে রিপোর্টটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,

“ স্যার! রিপোর্ট!”
ঘাড় বাকিয়ে তাকায় গাইনেকোলজিস্ট। রিপোর্টটা হাতে নিয়ে তড়িঘড়ি করে পাতা উল্টায় ব্যস্ত হাতে।মুহুর্তেই রেজাল্টের দিকে তাকিয়ে থেকে কপালে ঘাম ছুটলো তার। অবসটেট্রিশিয়ান আড়চোখে দেখলো সবটা। গম্ভীর মুখে জানতে চাইলো,
“ কী এসেছে রিপোর্টে?”
গাইনেকোলজিস্ট কাঁপছে কেমন। হাতদুটোও কেমন ঠান্ডা হয়ে গেলো তার! তিনি সময় নিয়ে থেমে থেমে বললেন,
“ প্লাসেন্টাল এবরাপশেন কিন্তু… ”
“ কিন্তু?”

ওটির বাইরে অপেক্ষমান রৌদ্র। সাধারণত কার্ডিলোজিস্টদের এসব কেসে খুব একটা প্রয়োজন নেই। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে আপন গতিতে। অপেক্ষার প্রতিটা মুহূর্ত এবার বিষাক্ত ঠেকছে! প্রায় আধঘন্টা পর, ওটির দরজা খুললো। অবস্টেট্রিক্স দু’জন বেরিয়ে আসেন একসাথে। তাদের দেখতে পেয়ে দ্রুত এগিয়ে আসে রৌদ্র। উৎসুক কন্ঠে জানতে চায়,
“ হাউ ইজ শি?”
ডক্টর দু’জন একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো একবার। দু’জনার চোখেমুখে স্পষ্ট দ্বিধা! বিচক্ষণ রৌদ্রের দৃষ্টি এড়ায়নি সেসব। সে কেমন গম্ভীর হলো এবার। প্রফেশনালদের মতো জানতে চাইলো,
“ ভুলে যাবেন না আমিও একজন ডক্টর! সো নির্দ্বিধায় বলুন সবটা!”

গাইনেকোলজিস্ট মধ্যবয়স্ক ফারহানা আফরোজ। এ দেশের নামকরা গাইনী ডাক্তারদের মধ্যে তিনিও একজন। রৌদ্রের এরূপ কথায় ড.ফারহানা আলগোছে নিজের মুখ থেকে মাস্কটা সরালেন। গম্ভীর মুখে বললেন,
“ আপনার সাথে প্রাইভেটলি কথা আছে ড.ইফতেখার। আপনি আমার কেবিনে আসুন।”
কথাটা বলেই তিনি পা বাড়ালেন নিজ কেবিনের দিকে। রৌদ্র মিনিট দুয়েক সময় নিলো। তার বিচক্ষণ মস্তিষ্ক এতক্ষণে স্পষ্ট টের পেয়েছে কিছু একটা। তবুও ভাই বলে কথা! ছেলেটা বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস ফেললো বারকয়েক। নিজেকে যথেষ্ট শক্ত করে তারপর পা বাড়ালো ড.ফারহানার কেবিনের দিকে।

“ মে আই কাম ইন ম্যাম?”
ডেস্কের ওপাশে বসে রিপোর্ট দেখছেন ড.ফারহানা। ঠিক তখনি দরজার কাছ থেকে ভেসে আসা রৌদ্রের কন্ঠে তিনি কেমন নড়েচড়ে বসলেন।মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন ভেতরে আসার। রৌদ্র ঢুকলো নিঃশব্দে। এগিয়ে এসে বসলো চেয়ার টেনে। গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,
“ পেশেন্টের কী অবস্থা ম্যাম?”
ড. কিয়তক্ষন চুপ রইলেন। প্রায় মিনিট দুয়েক পেরুতেই নিজ থেকে নিরবতা ভেঙে বললেন,
“ পেশেন্টের অবস্থা খুব ক্রিটিকাল ড.ইফতেখার। এন্ড নাউ,আ’ম গোয়িং টু সে সামথিং ব্যাড।সো প্লিজ কিপ ইউরসেলফ স্ট্রং।কেননা আমি জানি, পেশেন্ট আপনার বোন।”
বুক কাঁপছে রৌদ্রের। তবুও বাইরে থেকে নিজেকে শক্ত রাখার সে-কি আপ্রাণ চেষ্টা যুবকের। ডাক্তার আবারও বলতে লাগলো,

“ দেখুন ইফতেখার! আপনার বোন লাস্ট ট্রাইমেস্টারে আছে।এন্ড ইন দিস সিচুয়েশন, এভাবে হেভি ব্লাডফ্লো ওনার জন্য ভীষণ ক্ষতির কারণ। আপনার বোনের প্লাসেন্টাল এবরাপশেন হয়েছে। বাচ্চার হার্টবিট কমে গিয়েছে খুব। আমরা চাইলে ইমার্জেন্সি সি-সেকশনে যেতে পারি কিন্তু এখানেও বিশাল বড় সমস্যা আছে!”
থমকায় রৌদ্র। কাঁপা কাঁপা কন্ঠফুড়ে বেরিয়ে আসে কেবল,
“ কী?”
ডাক্তার ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলেন খানিকটা। পরক্ষণে বলেন,

“ প্লাসেন্টার দেয়াল খুলে গেছে। যার দরুন বাচ্চা নিশ্বাস নিতে পারছেনা। এরমধ্যে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি রোগীর রক্ত বন্ধ করার বাট আমরা বরাবরই ব্যর্থ।এমুহূর্তে আমরা যদি ইমার্জেন্সি সি-সেকশনে যাই তাহলে এমনও হতে পারে পেশেন্টের হেমোহরেজ হয়ে গেলো। সি-সেকশনে এমনিতেই প্রচুর ব্লিডিং হবে তন্মধ্যে ওনার ব্রেনে অক্সিজেন না পৌঁছালে উনি কোমায় কিংবা মারাও যেতে পারেন। অথবা আমরা যদি বাচ্চাকে না বাঁচিয়ে পেশেন্টকে বাঁচানোর দিকে ফোকাস করি, তাহলেও পেশেন্টের কোমায় যাওয়ার পসিবিলিটি ৫৬%। তাছাড়া আরেকটা কথা, পেশেন্ট বেঁচে গেলেও আর কোনোদিন মা হতে পারবেন না! কারণ, তার গর্ভাশয় ফেটে গিয়েছে যতটুকু আমার ধারণা!”

নির্বাক চেয়ে আছে রৌদ্র। কন্ঠ কাঁপছে তার। মস্তিষ্ক কেমন ফাঁকা লাগছে এখন! এ কি শুনলো সে? রৌদ্রের দৃষ্টি এলোমেলো। হাতদুটো কাঁপছে রীতিমতো। ডক্টর ফারহানা আড়চোখে খেয়াল করলেন সবটা। লম্বা এক নিশ্বাস ফেলে স্বান্তনার বাণী আওড়ালেন,
“ আই নো ইফতেখার! একটা ভাইয়ের জন্য এসব সংবাদ নিসন্দেহে কঠিন। কিন্তু এটাই সত্যি! এখন আমাদের হাতে মাত্র ৩৫ মিনিট সময় আছে।এরমধ্যে যেভাবেই হোক একটা ফাইনাল ডিসিশনে আসো তোমরা। কন্সেন্ট পেপারে পেশেন্টের হাজবেন্ডের সই নাও। আই রিপিট, আমাদের হাতে মাত্র ৩৫ মিনিট সময় আছে। এরপর শত চেষ্টা করেও কিন্তু আমরা মা অথবা বাচ্চাকে বাঁচাতে পারবোনা।”

দূর্বল রৌদ্র দুরুদুরু বুকে তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। উদ্ভ্রান্তের মতো তক্ষুনি ছুটলো কেবিনের বাইরে। দ্রুত পকেট হাতড়ে ফোন বের করে এনে কল লাগায় রেহানের ফোনে।রিং হচ্ছে ওপাশে। তবে তুলছেনা রেহান।রৌদ্রের মেজাজ বিগড়ায় এবার।সে কেমন দাঁত খিঁচে আবারও কল লাগায় সে নম্বরে। কলটা প্রায় কেটে যাবে যাবে মুহুর্তে ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।রৌদ্র কেমন দৃঢ় চোয়ালে বলতে লাগলো,
“ কই তুই? তারাতাড়ি আমার হসপিটালে… ”
“ এক্সকিউজ মি?”
ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা অপরিচিত কন্ঠে ভ্রু কুঁচকায় রৌদ্র। তৎক্ষনাৎ ফোনটা কান থেকে সরিয়ে এনে চেক করলো ডায়ালকৃত নম্বরখানা আদৌও ঠিক কি-না! যে-ই দেখলো ঠিক আছে, ওমনি সে কেমন সন্দিহান গলায় বললো,

“ কে আপনি? এই ফোন আপনার কাছে কেনো? রেহান কোথায়?”
ওপাশের মধ্যবয়স্ক ব্যাক্তি তৎক্ষনাৎ ছটফটে ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
“ আসলে এই ফোনটা যার তার তো কিছুক্ষণ আগে মারাত্মক গুরুতরভাবে কার এক্সিডেন্ট হয়েছে। তাকে এখন স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা অনস্পটে আসলাম মাত্র!”
আরেকদফা থমকায় রৌদ্র! নিজেকে কেমন পাগল পাগল লাগছে এমুহূর্তে! ছেলেটা আজ কোথায় দৌড়াঁবে? কার পিছে দৌড়াঁবে? ওটির বেডে পড়ে থাকা বোনের পেছনে? না-কি ভাই সমতূল্য বন্ধুর পেছনে?

অপরিচিত বাগান! চারিদিকে নানান ফুলের সমারোহ। আশেপাশের গোটা পরিবেশে ভাসছে এক অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস। জায়গাটা বড্ড অপরিচিত রেহানের। অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে বেশ বড়সড় একটা ম্যাপল-ট্রি। তার নিচে বসে পাতা কুড়াচ্ছে কেউ একজন। রেহান হতবিহ্বলের ন্যায় পা বাড়ায় সেদিকে। পাতা কুড়ানো মেয়েটার সামনে এসে দাঁড়াতেই মেয়েটা কেমন খিলখিল করে হেসে ওঠে আচমকা! হাসতে হাসতে মাথা তুলে তাকায় রেহানের পানে।মেয়েটা যে আর কেউ নয়, স্বয়ং রেহানের প্রিয়তমা স্ত্রী রুহি! মেয়েটাকে কি সুন্দর প্রানবন্ত লাগছে! রেহান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আলগোছে বসলো রুহির পাশে।হতবিহ্বল কন্ঠে বললো,

“ কী করছো?”
রুহি পাতা কুড়াচ্ছে।হাতের কাজ বহাল রেখে একটু করে বলে,
“ তোমার ছবি আকঁব। তাই পাতা কুড়াচ্ছি!”
ভ্রু কুঁচকায় রেহান।সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে,
“ পাতা কুড়িয়ে ছবি আঁকবে কীভাবে?”
রুহি প্রতিত্তোর করলোনা।উল্টো ভূবন ভোলানো হাসিতে মেতে পরলো হঠাৎ। রেহান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে হাসির দিকে। রুহি হাসতে হাসতেই আচমকা কেঁদে ওঠে। তা দেখে বেচারা কেমন অস্থির হলো! তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে ঝাপটে ধরলো বউকে।বউয়ের কাঁধে মাথা রেখে নরম কন্ঠে বলে,

“ কাঁদছো কেনো শ্যামবতী? আমি আছি তো!”
রুহি কাঁদছে একাধারে। বারবার বলছে,
“ আমার ব্যাথা হচ্ছে রেহান! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি আর সহ্য করতে পারছিনা এসব।সত্যি! আমি হয়তো আর বাঁচব না!”
এহেন কথায় বুক মোচড় দিয়ে উঠে রেহানের। সে আরেকটু শক্ত করে মেয়েটাকে নিজের বুকের খাঁচায় ঝাপটে ধরে বলে,
“ কিচ্ছু হবে না তোমার! আমি থাকতে কিচ্ছু হবে না তোমার।শুনলে তুমি?”
কথাটা বলতে বলতেই রেহানের বোধ হলো তার বুকে রুহি নেই! রেহান অবাক হয় তা দেখে। চারিদিকে পাগলের ন্যায় চোখ বুলিয়ে ডাকতে থাকে,

“ শ্যামবতী! কই গেলে তুমি? বউ?”
নাহ! চারিদিক থেকে আওয়াজ আসেনি কারো! রেহান বুঝি আরেকধাপ পাগল হলো। কাঁদতে কাঁদতে গলা উঁচিয়ে ডাকলো,
“ রুহি!!!!”
বিকট চিৎকার দিয়ে আচমকা জ্ঞান ফিরলো রেহানের। এতক্ষণ যাবত অচেতন হয়ে পড়ে থাকা ছেলেটা এখন কেমন চিৎকার দিয়ে বসে পড়েছে শোয়া ছেড়ে। রেহান হাঁপাচ্ছে। কী দেখলো সে? তার বউ কোথায়? রুহি কোথায় গেলো তাকে ছেড়ে? রেহান তৎক্ষনাৎ বেড থেকে নামতে উদ্যত হয়।তার যে এখন কী হালত, সে খবরও নেই তার! বেড থেকে নামতে গেলে আচমকাই তার ডানহাতে কেমন সূঁচালো কিছুর টান লাগলো যেন।রেহান মুখ কুঁচকে হাতের দিকে তাকায়। হাতে লাগিয়ে রাখা ক্যানোলা,যা দিয়ে রক্ত যাচ্ছে তার শরীরে। রেহান বিরক্ত হলো তা দেখে! তৎক্ষনাৎ অন্যহাত দিয়ে ডানহাতের ক্যানোলাটা একটানে খুলে ফেললো মুহুর্তেই। পরক্ষণে ফ্লোরে পা রাখতে গেলেই হঠাৎ তার চোখ পরলো অদূরের সিঙ্গেল সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকা গম্ভীর যুবকের পানে। রেহান চোখ তুললো কপালে।হতবিহ্বল কন্ঠে বললো,

“ মুগ্ধ! তুই?”
মুগ্ধ বাঁকা হাসলো। পায়ের ওপর পা নাচিয়ে বুকের কাছে দু’হাত বেঁধে বলল,
“ কেনো? মাথায় আঘাত লাগায় চিনতে পারছিস না না-কি?”
রেহান নিশ্চুপ! নিজেকে বড্ড দূর্বল লাগছে তার। এমুহূর্তে মুগ্ধের সাথে কথা বাড়ানোর প্রশ্নই উঠেনা! সে কেমন পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললো কেবিনের দরজা অব্ধি। দরজার নবে হাত রাখতেই পেছন থেকে ভেসে এলো মুগ্ধের অদ্ভুত শান্ত কন্ঠ!
“ গাড়ি চালানোর সময় ফোনে কথা বলিস কেনো?”
থামলো রেহান।হতচকিত দৃষ্টিতে তড়িৎ ঘাড় বাকিয়ে তাকায় সে।হতবুদ্ধিকর ভাব নিয়ে বলল,

“ তুই জানলি কীভাবে? তুই তো ঐখানে… ”
বাকিটা বলার আগেই থামলো রেহান।বিচক্ষণ মস্তিষ্কে একে-একে দুই মিলিয়ে বুঝে নিলো অনেককিছু। পরমুহূর্তেই কেমন অবিশ্বাস্য চাহনিতে মুগ্ধের পানে তাকিয়ে বলল,
“ তারমানে এসব তুই?”
কাঁধ ঝাকায় মুগ্ধ। পায়ের ওপর থেকে পা নামিয়ে দাঁড়ায় পরক্ষণে। একপ্রকার ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
“ কোনো সন্দেহ?”
হতবাক রেহান। বদনখানি কাঁপছে তার।ছেলেটা কেমন গা দুলুনি সইতে না পেরে পিছিয়ে গেলো দু-পা। ভাগ্যিস তার পিঠ ঠেকলো দরজার গায়ে। নাহলে যে কী হতো! রেহান কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আরেকবার বলল,

“ আমার সাথে এমনটা করতে পারলি তুই? আমিতো ভাই হই তোর!”
মুগ্ধের মাঝে গা-ছাড়া ভাব স্পষ্ট! ছেলেটা কেমন গাল বাকিয়ে ঘাড় চুলকাচ্ছে এক আঙুল দিয়ে। রেহান এবার চোয়াল শক্ত করলো।ত্যাড়ামি করে হুট করে বলল,
“ তুই একটা জানোয়ার মুগ্ধ! লিট্রেলি জানোয়ার। আর তোর এমন স্বভাবের কথা আর কেউ জানুক বা না জানুক, এহসানদের আমি জানিয়েই ছাড়ব!”

থামে মুগ্ধ। ঘাড়ে হাত রেখে বাঁকা চোখে তাকালো রেহানের দিকে। দৃঢ় চোয়ালখানা বেশ শক্তভাবে ফুটিয়ে তক্ষুনি তেড়ে আসে রেহানের দিকে। অতঃপর কোনোরূপ আগাম সর্তক বার্তা ছাড়াই একহাতে সজোরে চেপে ধরে রেহানের গলা।রেহান ছটফটায়।মুগ্ধের হাত সরানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায় তবে নাহ! বলিষ্ঠদেহী যুবকের পেশিবহুল বাহুর শক্তির সাথে পেরে উঠছেনা সে।এদিকে মুগ্ধের চোখ দিয়ে বুঝি আগুন বেরুচ্ছে। মুখটা কাঁপছে রাগের চোটে। রেহানের গলা চেপে ধরা হাতটা কেমন ক্রমশ উপরে উঠছে।জমিন হতে ধীরে ধীরে রেহানের পা উঠে যাচ্ছে ওপরে। বেচারা রেহানের দম আঁটকে যাচ্ছে এবার। সারামুখ লাল হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে! চোখদুটো বুঝি এই বেরিয়ে আসবে কোটর ছেড়ে। ওদিকে মুগ্ধ এবার দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

“ তুই ভাবলি কীভাবে এমনটা দ্বিতীয়বার করতে গেলে, তোকে আমি বাঁচিয়ে রাখবো? একদম তোরে টুকরো টুকরো করে রাস্তার কুকুরকে খাওয়াবো।রিমেম্বার, আমি একবার যেটা চাই,পৃথিবী উলোটপালোট হয়ে গেলেও সেটা আমি হাসিল করেই ছাড়ি! সেক্ষেত্রে তুই না বলার কে রে? লাস্টবার ওয়ার্ন করছি, নেক্সট টাইম এমন বোকামি করতে গেলে শুধু তোকে না, তোর বউ-বাচ্চাকে সহ কবরে পাঠিয়ে ছাড়ব বলে দিলাম!”

বলেই মুগ্ধ গলা ছাড়লো রেহানের। দম বন্ধ হবার অন্তিম মুহুর্তে ছাড়া পেয়েছে রেহান, বেচারার কাশতে কাশতে বুক ধরে গিয়েছে ইতোমধ্যে। নিশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে ব্যাপক। ছেলেটা কেমন মেঝেতে পড়ে হাঁপাচ্ছে বুক ধরে। মুগ্ধের মন গললোও না একটু! সে উলটো পকেট হাতড়ে সিগার বের করে ঠোঁটে গুঁজল। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর রেহান কিছুটা স্থির হলো।পেছনের দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে নিবুনিবু চোখে তাকিয়ে রইলো মুগ্ধের পানে।থেমে থেমে অল্প স্বরে বলল,

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৬

“ একদিন তুই আফসোস করবি মুগ্ধ! আমি ছেলে আজ তোকে অভিশাপ দিলাম — একটা সময় তুইও কাঁদবি।নিজের সব থেকে কাছের মানুষটাকে নিজের কাছে আঁকড়ে রাখতে চেয়েও না রাখার যন্ত্রনায় কাঁদবি! ছটফট করবি আমার মত। বেঁচে থেকেও সহ্য করবি মরণ-যন্ত্রনা! সেদিন বুঝবি— প্রিয় মানুষের না থাকার কষ্ট কী!”
তাচ্ছিল্যভরা হাসি টানলো মুগ্ধ। সিগারের শেষভাগে টান বসিয়ে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলল,
“ যার মধ্যে মন নেই তার আবার কষ্ট? সিরিয়াসলি?”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৮