Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৬

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৬

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৬
জান্নাতি আক্তার জারা

আরাত কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে, ফ্রেশ হয়ে আসরের নামাজ আদায় করে কিচেন রুমে ঢুকেছে, তাকবীরের জন্য নিজ হাতে রান্না করবে বলে,আদিবা তালুকদার আর রাবেয়া তালুকদার কে কিচেন রুমে ঢুকতে দেয় নি, মিম আইরা আর রশ্মি কে নিয়ে কিচেন রুমে তাকবীরের জন্য রান্না বাসাছে, আইরা বাড়ির সবার জন্য রান্না করছে, আইরা কে হেল্প করছে মিম আর রশ্মি, আরাত একা একা তাকবীরের জন্য লাউ দিয়ে চিংড়ি মাছ রান্না করছে, আইরা বাড়ির সবার জন্য রান্নার ফাঁকে ফাঁকে আরাত কে শিখিয়ে দিচ্ছে কিভাবে লাউ দিয়ে চিংড়ি মাছ রান্না করতে হয়, আরাত আইরার শিখিয়ে দেওয়া অনুযায়ী রান্না করতে লাগলো, মিম রশ্মি সাইটে দাড়িয়ে আইরা কে টুকিটাকি হেল্প করছে আর রান্না করা দেখছে,

আইরা আনহা শেখের কাছে আনাস এর জন্য পায়েস রান্না শিখতে গিয়ে টুকিটাকি সব রান্না করতে হয় জেনে নিয়েছে, যদিও কখনো রান্না করে নি কিন্তু কিভাবে রান্না করে জানা আছে, রান্না ঘরে আজকে চার রাধুনী নতুন, রাবেয়া তালুকদার আদিবা তালুকদার সোফাতে বসে কিচেন রুমের দিকে বারবার দেখছে আর নিজেরা গল্প করছে, দুজন কে আজকের জন্য কিচেন রুম থেকে বের করে দিয়ে চার রাধুনী রাঁধতে বসেছে, চারজন রান্না করছে কম কথা বলছে বেশি, আরাত আইরার কথা অনুযায়ী প্রথমে বাতিলে তেল দিয়ে দিলো,আরাত কে তেল দিতে দেখে রশ্মি বিরক্ত হয়ে দ্রত গলায় বলে উঠলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

___” আরে আরে প্রথমে তেল দিলি কেন, আইরা আপু প্রথমে পেঁয়াজ দিতে হবে তাঁর পর তেল!
আরাত তেল ধেলে রশ্মির দিকে চেয়ে বলল,
___”তেল প্রথমে দিতে হবে, আমি ওইদিন উনাকে প্রথমে তেল দিতে দেখেছিলাম!
আরাতের কথায় তিনজনই আরাতের দিকে তাকালো, মিম বুঝতে পেয়ে দ্রুত বসা থেকে উঠে আরাতের পিছনে দাড়িয়ে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” এই উনি টা কে গো আপু?
আরাত মিমের কথায় রশ্মি আর আইরার দিকে তাকালো, রশ্মি আর আইরা কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরাত আমতা আমতা করে মিম কে উওর করলো,

___” উনি মানে, মানে তোর ভাইয়া,আইরা আপু তাঁর পর বলো কী দিতে হবে?
আইরা আলু কাটতে কাটতে আরাতের কথায় ব্যঙ্গ করে বলে উঠলো,
___” কেনো তারপর তোর উনি কী দিয়েছে জানিস না?
আইরার কথায় আরাত মুখ ভার করে তাকালো,মিম আর সন্ধ্যা আরাত কে মুখ ভার করতে দেখে মিটিমিটি হাসতাছে, আইরা আরাতের মুখ ভার দেখে গলা খাঁকারি দিয়ে পুনরায় বলল,
___” তেল জলে যাচ্ছে, জলদি পেঁয়াজ দে!
আইরার কথায় আরাত দ্রুত পেঁয়াজ বাতিলের মধ্যে দিয়ে দিলো,এভাবেই নুনের আগে হলুদ দিতে হয় তো হলুদের আগে মরিচ দিতে হবে,নানারকমের কথা হাসাহাসি আড্ডা দিয়ে তিনঘন্টা সময় নিয়ে রান্না শেষ করতে লাগলো, বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, রাবেয়া তালুকদার নিজের রুমে চলে গিয়েছিলেন, রুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িং রুম থেকে চিল্লিয়ে বললেন,

___” রান্না কতদূর তোমাদের?
আইরা কিচেন রুম থেকে উওর করলো,
___” মামনী এইতো প্রায় শেষ।
রাবেয়া তালুকদার কিচেন রুমের সামনে এসে দাঁড়ালেন, পুরো কিচেন রুম চোখ বুলিয়ে তিনি অসহায় মুখে আরাত আইরার দিকে তাকালেন, সকাল বেলা কিচেন রুম গুছানো ছিলো, আর এখন পুরো রুম এলোমেলো হয়ে আছে, মসলার বয়াম এদিকে ওদিকে হয়ে আছে, একটা খুঁজে বের করতে গিয়ে অন্যটা বের করেছে, কাঁচাবাজার সব এলোমেলো হয়ে আছে, রাবেয়া তালুকদার কে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে দেখে চারজন চারজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো, রাবেয়া তালুকদার চারজন কে একনজর দেখে নিয়ে বললেন,

___” এটা কিচেন রুম?
চারজন একসঙ্গে মাথা নাড়িয়ে ছোট করে বলল,
___” হুম।
চারজন কে একসঙ্গে উত্তর করতে দেখে রাবেয়া তালুকদার পুনরায় বলে উঠলো,
___” এমন হাল কেনো?
___” মামনী আমরা পরিস্কার করে দিচ্ছি।
আইরা কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে চারজন পুনরায় কাঁচাবাজার মেঝে থেকে উঠাতে লাগলো, কেউ বাতিল চামিচ পরিস্কার করতে লাগলো, কেউ মসলার বয়াম গুছিয়ে রাখতে লাগলো, রাবেয়া তালুকদার বলে বলে দিলেন কোথায় কী ছিলো বা রাখতে হবে, কয়েক মিনিটের মধ্যে কিচেন রুম আগের ন্যায় হয়ে গেলো, রান্না করতে যতটুকু হাঁপিয়ে উঠেছে তাঁর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কিচেন রুম গুছাতে হাঁপিয়ে গেলো, রাবেয়া তালুকদার কিচেন রুমের সাইটে দাড়িয়ে চারজনের কাজ করা দেখলেন, মনে হচ্ছে চার বাচ্চা খেলা করছে, চারজন একসঙ্গে কোমরের ওড়না খুলে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলো, রাবেয়া তালুকদার হাসি মুখে বললেন,

___”তোমাদের রান্না দেখাও!
আরাত মেঝেতে টুলে বসে পরলো, মিম হাসি মুখে আইরার রান্না করা ডিমের কোরমা আর চিকেন চাপ ভুনা এক এক করে রাবেয়া তালুকদার কে দেখালো, রাবেয়া তালুকদার চিকেন চাপ ভুনা দেখে বললেন,
___” বা দেখতে তো লোভনীয় লাগছে, আর ওটা কী?
রাবেয়া তালুকদারের হাতের ইশারা অনুযায়ী আইরা হাসি মুখে আলুর পকোড়ার বাটি রাবেয়া তালুকদারের সামনে ধরলো,
___” মামনী একটা খেয়ে দেখো, কেমন মজা!
রাবেয়া তালুকদার একটা পকোড়া হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরাত বসা থেকে উঠে বাটি থেকে একটা নিয়ে খেতে লাগলো, আরাতের দেখে মিম একটা নিয়ে খেতে লাগলো, তাঁদের সঙ্গে রশ্মিও একটা নিয়ে খেতে লাগলো, তিনজন কে একটা একটা করে হাতে নিয়ে খেতে দেখে আইরা রাগী গলায় বলল,

___” আমি তোদের নিতে বলছি, এখনই শেষ করবি!
রাবেয়া তালুকদার চারজনের কান্ডে হাসলেন, আইরা গরম পকোড়া মুখে তুলে খেতে খেতে বলল,
___” তুমি তো বললে খেয়ে দেখতে, আপু বিশ্বাস করো অনেক মজা হয়েছে।
___” হ্যাঁ আপু অনেক সাদ, দেও আরেকটা দেও!
মিম কথাটা বলে পুনরায় বাটি থেকে আরেকটা পকোড়া হাতে তুলে নিলো, রশ্মিরাত নিতে যাবে আইরা বাটি সরাতে সরাতে রাগী গলায় বলল,
___” তোদের মতো রাক্ষসী আমার লাইফে দুটো দেখিনি, সর হাত সরা বলছি আর নেই তোদের ছোট মামনী আহিন আলভী কে দিতে হবে ।
আইরার কথায় রশ্মিরাত বাড়ানো হাত মুখ বেঁকে ফিরে নিলো, রাবেয়া তালুকদার হাসি মুখে আইরা কে বললেন,
___” অনেক আছে তো, দেও ওদের!
___” না মামনী ওঁদের ভাগের গুলো শেষ, ভাজতে থেকে খেতে নিছে, আর একটাও হবে না।
আইরার কথায় মিম আরাতের বানানো লাউ চিংড়ির বাটি রাবেয়া তালুকদারের সামনে ধরলো, রাবেয়া তালুকদার হাসি মুখে বললেন,

___” এটা আবার কী?
রশ্মি আরাতের পিছনে দাঁড়িয়ে ঘারে দু-হাত রেখে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” বড়মা, এটা হচ্ছে স্পেশাল নাউ চিংড়ি,তাকবীর ভাইয়ার ফেভারিট ডিশ, বলেন তো কে রেঁধেছে?
রাবেয়া তালুকদার অবাক হয়ে আরাত কে দেখিয়ে দিয়ে জানতে চাইলো,
___” আরাত?
রশ্মি আগের ন্যায় বলল,
___” হ্যাঁ।
রাবেয়া তালুকদারের মুখে হাসি ফুটে উঠলো, তাঁর ছেলের সংসার টা সুখের যাচ্ছে, তাঁদের ছোট আরাত মানিয়ে নিচ্ছে সবকিছু,স্বামীর খেয়াল রাখছে, আরাত শাশুড়ির চাহনিতে লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে নিলো, আরাত কে লজ্জা পেতে দেখে রাবেয়া তালুকদার আরাতের সামনে আসলেন,আদুরে হাত দিয়ে আরাতের নিচু মুখটা উপরে তুলে বললেন,

___” দুজন সারাজীবন হাসিখুশী থেকো,আমার গম্ভীর ছেলেটাকে সামলিয়ে রেখো কেমন, সুখী হও তোমরা, তোমারা সুখী থাকলে আমরা খুশী মা।
আরাত রাবেয়া তালুকদারের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরলো, মুখে হাসি রেখে সিরিয়াস মুখে বলে উঠলো,
___” ইনশাআল্লাহ বড়মা।
আরাতের কথাতে রাবেয়া তালুকদার আরাতের থুতনিতে হাত বুলে চুমু খেলেন, বউ শাশুড়ীর সুন্দর মুহূর্তটা মুগ্ধ হয়ে দেখছে তিনজন, তাঁদের সুন্দর মুহূর্ত নষ্ট করতে আগমন ঘটে আহিন আলভীর, দুজন সচারাচর কিচেন রুমে পা দেয় না, আরাতের সঙ্গে মাঝেমধ্যে নুডুলস রান্না করতে তিনজন আসে, আদিবা তালুকদারের কাছে থেকে জানতে পারে রশ্মিরাত আইরা মিম আজকের রান্না করছে, কথাটা শোনা মাএ দৌড়ে নিচে নেমে কিচেন রুমে এলো, আহিনের শরীরে টি-শার্ট জরানো আর আলভীর শরীরে জ্যাকেট মাথায় তুপি, হাত পায়ে মুজা, আহিন আলভী কে দৌড়ে আসতে দেখে সবাই তাঁদের দিকে তাকালো, আহিন বলে উঠলো,

___” তোমরা নাকি রান্না করছো, কী কী রেঁধেছ?
আইরা পকোড়ার বাটি আহিন আলভীর সামনে দিয়ে বলল,
___” আলুর পকোড়া বানাইছি নে খা।
আহিন একটা হাতে তুলে নিয়ে মুখে পুড়ে নিলো, আলভী নাক ছিটকে বলে উঠলো,
___” আমি খাবো না তেল ওয়ালা ভাজাপোড়া, আর কী রেঁধেছ?
___” না খাইলি,এখানে অনেক রাক্ষসী আছে তোর ভাগেরটা তাঁরা খাবে নে।
আইরা পকোড়ার বাটি আলভীর হাতে নিয়ে কিচেন রুম থেকে বের হয়ে গেলো ফ্রেশ হতে, আইরা যেতেই আরাত মিম রশ্মি আলভীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো, রাবেয়া তালুকদার কিচেন থেকে বের হয়ে গেলেন, আহিন বাটি থেকে পকোড়া তুলছে আর খাচ্ছে আলভী তিনজন কে হাত বাড়িয়ে দিতে দেখে মিম কে নিজের ভাগের গুলো দিতে লাগলো,আহিন রশ্মিরাত হা হয়ে আলভী কে দেখছে,মিম তো খুশিতে আলভীর ভাগের গুলো খেতে শুরু করছে, তিনজনের ধারনা আলভী রশ্মি কে না দিলেও আরাত কে দিবে, কিন্তু না তাদের ধারণা ভুল প্রমান করে আলভী মিম কে দিয়ে দিলো, আহিন খেতে খেতে বলল,

___” তুই তোর মায়াবতী কে না দিয়ে মিম আপু কে দিয়ে দিলি?
আলভী মুখ ভার করে বলল,
___” মায়াবতী আমার অপেক্ষা না করে বিয়ে করে নিয়েছে, এজন্য আমি সাহসীরানী কে ভালোবাসতে শুরু করেছি।
মিম খেতে খেতে হা করে আলভীর দিকে তাকালো, রশ্মিরাত আহিন তিনজন আলভীর কথায় বলে উঠলো,
___” সাহসীরানী?
আহিনের মুখে হাসি ফুটে উঠলো, মিম কে দেখিয়ে দিয়ে বলল,
___” হ্যাঁ সাহসীরানী, মায়াবতী ম্যারেড আজকে থেকে আমি আমার সাহসীরানী কে ভালোবাসবো।
আলভীর কথায় পকোড়া মিমের গলায় বেজে কাশি উঠে গেলো, কাশতে কাশতে হাতের বাকি পকোড়া গুলো বাটিতে রেখে দিতে দিতে নাক ছিটকে বলল,

___” ছিহহহ,
আহিন আলভীর কথায় নাক ছিটকে বলল,
___” তুই সবসময় সিনিয়র আপুদের প্রেমে পরিস কেন ছ্যাহ!
আহিনের কথার মধ্যে মিম কিচেন রুম থেকে বের হতে হতে মুখ বেঁকে বলল,
___” এর মধ্যে লুচ্চা লুচ্চা ভাইপ আছে, বড় হলে প্লেবয় হবে দেইখো তোমরা।
মিম কথাটা বলে কিচেন রুম ত্যাগ করলো,রশ্মিরাত আহিন কোমরে হাত রেখে ভ্রু উঁচিয়ে আলভীর দিকে চেয়ে আছে, আলভী মিমের যাওয়ার দিকে থেকে চোখ ফিরিয়ে তিনজন কে নিজের দিকে তাকাতে থাকতে দেখে মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,

___” একেই বলে সাহসীরানী, মুখের উপর সত্যি কথা বলে গেলো।
আরাত আলভীর কথায় হাতে হাত ভাজ করে ঠোঁট উল্টালো,রশ্মি আলভীর মাথায় গাট্টা মেরে বিরক্ত হয়ে বলল,
___” সব বুঝলাম, বাট তুপি পরছিস কেনো?
রশ্মি আলভীর মাথায় গাট্টা মারাতে আলভী বিরক্ত কন্ঠ বলে উঠলো,
___” ধ্যাত শাঁকচুন্নি কী করছো,দেখছো না অনেক শীত?
আহিন দুষ্টু হেঁসে আলভীর কথার মধ্যে নিজে বলে উঠলো,
___” আপু ওর মাথার মধ্যে কী চলছে ওটা ঢেকে রাখার জন্য টুপি পড়ে।
আহিনের কথায় আলভী আহিনের দিকে তেরে আসতে নিলো,আরাত এক হাত দিয়ে আলভী কে আটকাচ্ছে, আহিন আগের ন্যায় স্বাভাবিক মুখে দাঁড়িয়ে আছে, রশ্মি রাগী গলায় বলে উঠলো,
___” চুপ করবি তোরা, কী শুরু করছিস, বড় হয়ে যাচ্ছিস আস্তে আস্তে ভন্ডামি গুলো ছেড়ে দে এখন!
আহিন তিনজন কে একনজর দেখে নিয়ে, কিচেন থেকে বের হতে হতে বলল,

___” আপু তুমি যে কী বলো না, এই শীতে গোসল করায় ছাড়তে পারি না, আর তুমি ভাবো ভন্ডামী ছেড়ে দিবো হাঁসালে।
আহিন চলে গেলো, আলভী রাগী চোখে এখনো আহিন কে দেখছে,দুজনের যেমন মিল তেমন ঝগড়াও লাগে, দেখা যায় কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না আবার কেউ কাউকে ছাড়া থাকতেও পারে না। আরাত, দুজনের খুনসুটি দেখে মিটিমিটি হাসলো, রশ্মি আহিন কে যেতে দেখে পুনরায় আলভী কে বলে উঠলো,
___” আগের মতো শীত নেই, এখন অন্তত নিয়মমতো গোসলটা করিস, আর কী জ্যাকেট টুপি পড়েছিস, তোর জ্যাকেট পড়া দেখে আমার গরম লাগতাছে খোলে ফেল?

রশ্মি কথাটা বলে আহিনের জ্যাকেট খুলতে নিলো, আহিন মুখ ভার করে পারবো না বলে জায়গা ত্যাগ করলো, আলভী কে মুখ ভার করে যেতে দেখে রশ্মিরাত দুজন একিউপর কে ধরে শব্দ করে হেঁসে উঠলো, দুই বান্ধবী অনেকদিন পর মন খুলে হাসিহাসি করছে, ঠিক আগের দিনের মতো, মুহূর্তটা ছিলো আগের দিনগুলোর মতো, এভাবে নিত্যদিন ছোট ছোট সোনালী অতীত গুলো আমাদের জীবনে ফিরে এলে ক্ষতি কী, বরংশ জীবনটা সুন্দর থাকতো, আরাত রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করে,পুনরায় ধৈর্য হারিয়ে নিচে নেমে প্লেটে ভাত নিয়ে নিজের হাতে রান্না করা লাউ চিংড়ি তরকারি প্লেটে বেরে নিয়ে সোফাতে বসে টিভি চালু দিয়ে খেতে লাগলো, তাকবীর বাড়ি ফিরবে রাত দশটার পর এতক্ষণ ধৈর্য ধরা ইম্পসিবল, একে তো আরাত খিদা সহ্য করতে পারে না, তাঁর উপর নিজের হাতে বানানো তরকারি এত অপেক্ষা করার তো প্রশ্ন আসে না।

সন্ধ্যারাত জন্য বাড়ির বাকি মেম্বার গুলো নিজেদের রুমে রুমে, এই সুযোগে সবার অগোচরে খেতে বসেছে, খাওয়ার শেষে আরাত হাত ধুয়ে খুশিতে নিজের হাতে কয়েটা চুমু খেলো,নিজের হাতে এতটা পারফেক্ট ভাবে রান্না করার জন্য, নুন ঝাল সবকিছু ঠিকঠাক যদিও প্রথমবার রান্না দেখে তরকারি সাদটা ঠিকঠাক খাওয়ার মতো,তবুও আরাত এতেই খুশি, যাক প্রথমবার রান্না করেছে অন্তত মুখে তুলা যাচ্ছে, অকর্মা জীবনে এর চেয়ে সফলতা আর হতে পারে, এখন শুধু যার জন্য রেঁধেছে তাঁর রিয়েকশন দেখা বা জানার পালা, আরাত নিজের প্রশংসা করতে করতে কিচেন রুমে এসে তাকবীরের জন্য বাটি থেকে আলেদা একটা বাটি সাজিয়ে আলেদা রেখে দিলো, আরাত পুনরায় নিজের আগের রুমটায় এসে পরার টেবিলে পরতে বসল, কেটে গেলো আধাঘন্টা, আরাত ফোনে টাইম দেখছে বারবার, আজকে যেতে সময় ফুরচ্ছে না, আরাত পুনরায় আধাঘন্টা সময় নিয়ে পড়ায় মনোযোগ দিলো, শেষে বিরক্ত হয়ে পড়ার টেবিলে ফোন নিয়ে রিল দেখতে লাগলো, না তবুও সময় ফুরায় না, রিল দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে আনাস এর কন্ঠ শুনতে পেলো, আরাত তাকবীর এসেছে ভেবে দৌড়ে রুম থেকে বের হলো, আনাস কে একা নিজের রুমে ঢুকতে দেখে আরাত দৌড়ে তাকবীরের রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো, দরজা আগের ন্যায় আটকানো দেখে আরাত বন্ধ দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে তাকবীর কে খুঁজতে লাগলো, না তাকবীর নেই, না ওয়াশরুমে না বেলকনিতে না রুমের ভেতর, আরাত ব্যর্থ হয়ে মলিন মুখে রুম থেকে বের হয়ে এলো, আনাস আর আইরা কে নিচে নামতে দেখে আরাত আনাস কে পিছু ডেকে উঠলো,

___” ভাইয়া..?
আরাতের ডাকে আনাস আইরা দু’জনেই পিছু ফিরে তাকালো, আনাস প্রশ্ন ভরা চাহনি নিয়ে ছোট করে বলে উঠলো,
___” বল?
আরাত ওড়নার কোণা পেঁচাতে লাগলো, আরাত যখন বেশি লজ্জা বা নার্ভাস ফিল করে তাঁর স্বভাব ওড়নার কোণা পেঁচানো, আনাস আরাত কে দেখেই বুঝতে পারলো, আরাত কিছু বলতে চাইছে কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছে না, আরাত কী বলবে এটাও বুঝে গেলো, তাঁর চঞ্চল বোন কে সে জানে চিনে, কোনোকিছু চাওয়া পাওয়ার থাকলে ভনিতা ছাড়াই ফটাফট বলে দেয়,শুধু তাকবীরের বেলা শান্ত হয়ে যায়, আনাস গম্ভীর গলায় আরাত কে বলে উঠলো,
___” তাকবীর ভাইয়ার ফিরতে একটু লেট হবে।
আরাতের মন খারাপ হয়ে এলো, মলিন মুখে ছোট করে বলল,

___” ও।
আরাত কে মন খারাপ করতে দেখে আনাস এর ভালো লাগলো, আনাস হয়তো দুনিয়াতে প্রথম ভাই যে বোনের মন খারাপ হয়েছে ভেবে খুশি হয়েছে, খুশি হবেই না কেনো খুশিটা তো তাকবীর কে ঘিরে, নিজের বোন কে তাকবীরের জন্য চিন্তা করতে দেখছে, তাঁর বোনের মনে তাকবীরের জন্য অনুভূতি সৃষ্টি হচ্ছে এটা খুশি হওয়ার যথেষ্ট কারণ না। আনাস গলা খাঁকারি দিয়ে আরাত কে বলে উঠলো,
___” বুড়ী খেয়েছিস?
___” হুম।

আরাত মলিন মুখে হুম বলে তাকবীরের রুমে চলে এলো, আইরা আনাস নিচে নেমে গেলো রাতের ডিনার করার জন্য, আরাত রুমে এসে পুরো রুমে পায়চারী করছে, কয়েক মিনিট পায়চারী করার পর আরাত ফোনে তাকবীরের নাম্বার বের করতে লাগলো, পুরো কল লিস্ট খুঁজে সব শেষে বীর ভাইয়া দিয়ে সেভ করা নাম্বারটা বের করলো, অনেক আগেই নাম্বারটা নিজের ফোনে সেভ করা ছিলো, কোনোদিন ফোন করা হয়নাই বিধায় কললিস্টের শেষে পড়ে আছে, আরাত নাম্বারটা বের করে কিছুসময় নিস্তব্ধ হয়ে নাম্বার দেখতে লাগলো, ফোন দিয়ে কী বা বলবে, বাড়ি ফিরার কথা বলবে, কিন্তু কীভাবে শুরু করবে, আরাত দোনোমোনো করতে করতে ফোন লাগলো তাকবীরের ফোনে, তিন থেকে চারবার রিং হতেই ওপাশে ফোন রিসিভ হলো, আরাত ধুকপুক বুক নিয়ে নিস্তব্ধ রুমে ঠান্ডা কন্ঠে সালাম দিয়ে উঠলো,

___” আসসালামু আলাইকুম!
আরাত সালাম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারি নিশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো ফোনে, আরাত নিঃশ্বাসের শব্দে জায়গায় জমে গেলো, তাকবীর আজকে ফোনে প্রথম আরাতের কন্ঠ শুনতে পেলো, বাস্তব থেকে ফোনে কন্ঠটা একটু বেশিই নেশালো লাগে, আরাতের কন্ঠে তাকবীরের মনে রাগ টগবগ করে উঠলো, মনে পড়ে গেলো এই নেশালো কন্ঠে আরাত অন্য ছেলের সঙ্গে কথা বলেছিলো, আজকে তাকবীরের রাগ লাগছে আরাত কেনো অন্য ছেলের সঙ্গে কথা বলবে, পরমুহুর্তে বিরবির করে নিজেকে সামলাতে লাগলো,
___” ক্যাম ডাউন তাকবীর ক্যম ডাউন, সবকিছু পাস্ট তোকে বুঝতে হবে ইয়ার।
তাকবীর কে বিরবির করতে দেখে আরাত পুনরায় সালাম দিয়ে উঠলো,

___” আসসালামু আলাইকুম?
তাকবীর গম্ভীর গলায় সালামের উত্তর করলো,
___” অলাইকুম আসসালাম,
তাকবীর সালাম নিয়ে চুপ করে আছে আরাতের কথা শুনার জন্য, এদিকে আরাত আমতা আমতা করছে কোথাও থেকে শুরু করবে কথা, তাকবীর আরাত কে কিছু বলতে না দেখে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,
___” কিছু বলবে?
আরাত মলিন মুখে অভিযোগের সুরে দ্রুত বলে উঠলো,
___” আর কতক্ষণ অপেক্ষা করাবেন, কখন বাড়ি ফিরবেন?

তাকবীরের কুঁচকানো ভ্রু সোজা হয়ে এলো, আরাত তাঁর অপেক্ষা করছে, কথা ভাবতেই মনে প্রশান্তি বয়ে গেলো,ছেলেরা বাহিরে সারাদিনের ক্লান্ত ব্যস্ততায় দিন পার করে যদি জানতে পারে তাঁর অর্ধাঙ্গিনী তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে, পুরো দিনের ক্লান্ত নিমেষেই বিলীন হয়ে যায়, সুখী হতে টাকা পয়সা লাগে না সঠিক মানুষের সঙ্গ লাগে, তাকবীর আরাত কে ছোট করে প্রশ্ন করলো,
___” আমার জন্য অপেক্ষা করছো?
আরাত কোনোরকম ভনিতা ছাড়া অভিমানী গলায় উওর করলো,
___” হুম।
তাকবীরের ঠোঁটের হাসি বড় হয়ে এলো,

___” সকাল বেলার কথা তোমার মনে আছে, আমি যা চাইবো তুমি তাই দিবে বউ?
আরাত থতমত খেয়ে গেলো, তাকবীর কী চাইবে মাথায় সব এলোমেলো চিন্তাভাবনা নিয়ে আরাত “জানি না আমি, বলে কল কেটে দিলো,তাকবীরের হাসি গারো দেখা গেলো, ফোনের ওপাশে তাঁর বউ লজ্জা পেয়েছে, ছোট বউটার লজ্জা পাওয়া মুখটা দেখতে ইচ্ছা করলো, আদিল তাকবীর কে মুচকি হাসতে দেখে অবাক হলো, তাকবীর আরাতের সামনে হুটহাট কারণ ছাড়া কথা বললে বা মুচকি হাসলেও সবার সামনে ঠিক আগের গম্ভীর তাকবীর এখনো, আদিল তাকবীরের সঙ্গে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো শেয়ার করছে সমাধানের আশায়, আনাস আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে অফিস থেকে বের হয়ে গেলে আদিল তাকবীরের কেবিনে ঢুকে, তাকবীর তখন বাড়ির উদ্দেশ্য বের হচ্ছিল, আদিল অনুমতি নিয়ে কেবিনে ঢুকে বলে,

___” স্যার আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিলো!
তাকবীর খুলে রাখা কোট শরীর জরিয়ে নিতে নিতে আদিল কে বলল,
___” ফার্স্ট।
___” স্যার ইমপোর্ট্যান্ট কথা ছিলো,সময় চাই আপনার!
তাকবীর তীক্ষ্ণচোখে তাকালো আদিলের দিকে, আদিল চুপচাপ মাথা নিচু করে আছে, তাকবীর টেবিলের সঙ্গে হেলিয়ে দাড়িয়ে আদিলের দিকে তাকিয়ে রইলো, আদিল চোখ তুলে তাকবীর কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বুঝলো তাকবীর শুনতে চায়, আদিল কিছুটা সময় নিয়ে বলতে লাগলো, আদিলের কথা বলার মধ্যে তাকবীরের ফোনে ফোন এলো, তাকবীর ফোনটা হাতে নিয়ে দেখতেই দেখলো আরাতের ফোন, তাকবীর বেশ অবাক হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো, কপাল কুঁচকে একবার আদিলের দিকে তাকালো,ফোন আসাতে আদিল কথা বন্ধ করে তাকবীরের দিকে চেয়ে আছে, তাকবীর কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আরাতের ফোন রিসিভ করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে,আরাতের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে ফোনের দিকে চেয়ে মুচকি হেঁসে উঠে, আদিল তাকবীর কে ফোনের দিকে চেয়ে মুচকি হাসতে দেখে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

___” স্যার?
আদিলের ডাকে তাকবীর পিছনে ফিরলো, হাসি মুখটা নিমেষেই গম্ভীর করে কেবিন থেকে বের হতে হতে বলল,
___” সেম সেম বাট ডিফারেন্ট, ট্রাই এগেইন।
আদিল তাকবীরের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলো, তাকবীরের কথায় অর্থ বুঝতে পারছে সে, এখন শুধু চেষ্টা করার পালা, আরাত বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো, তাকবীর আসছে কী না দেখার জন্য, প্রায় ১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর তাকবীরের দেখা মিললো না, মনে তাকবীরের জন্য অভিমান জমে গেলো, মন ভার করে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে গেটের দিকে চেয়ে রইলো তাকবীরের ফিরে আসার।

এভাবে কেটে গেলো আরো পনেরো মিনিট তাঁরপর তাকবীরের গাড়ি তালুকদার বাড়ির গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে দেখা গেল, আরাতের মুখে হাসি ফুটে উঠলো, তাকবীর গাড়ি পার্কিং করে গাড়ি থেকে নেমে কিছু সদাইয়ের প্যাকেট গাড়ি থেকে বের করে হাতে নিয়ে বাড়ির ভিতরে যেতে নিয়ে কী যেন মনে করে নিজের বেলকনির দিকে তাকালো,আরাত কে কুয়াশার মধ্যে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা রাগ লাগলো, পরমুহুর্তে মনে পড়ে গেলো তাঁর বউ তাঁর পথ চেয়ে আছে, আজকাল তাকবীরের কী যে হয়েছে সময়ই রাগ সময়ই হাসিখুশি তো সময়ই বউ কে মিস করতে থাকে, তাকবীর কে উপরের দিকে দেখতে দেখে আরাত হাতে হাত ভাজ করে জায়গায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, তাকবীর ড্রয়িং রুমে এসে দেখলো লাইট জ্বলছে কিন্তু বাড়ি নীরব হয়ে আছে, তাকবীর ড্রয়িং রুম পেড়িয়া নিজের রুমে এলো কিন্তু না আরাত কে রুমে আসতে না দেখে তাকবীর সাদায়ের প্যাকেট গুলো বেড সাইদের উপর রেখে দিলো, কোট খেলে বিছানায় উপর রেখে দিলো, হাতের ঘড়িটা খুলতে খুলতে বেলকনির দিকে চেয়ে আরাত কে ডেকে উঠলো,

___” রাত…?
আরাত উত্তর করলো না, তাকবীর ঘড়িটা বেড সাইদের উপর রেখে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বেলকনির দিকে পা বাড়ালো,আরাত কে আগের ন্যায় গার্ডেনের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে আরাতের পাশে এসে দাঁড়ালো, আরাতের চোখ অনুসরণ করে একপলক গার্ডেনে চোখ বুলালো, নিচে দেখার মতো কিছুই চোখে পরলো না তাকবীরের, আরাত কে মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে কোনোপ্রকার নড়াচড়া না করতে দেখে তাকবীর আরাতের পিছনে থেকে আরাত কে জরিয়ে ধরলো, আরাতের কোনোপ্রকার ভাবান্ত হলো না, না কোনো রিঅ্যাকশন দেখালো, আরাত কে রোবটের মতো চুপচাপ থাকতে দেখে তাকবীর বুকের সঙ্গে আরাতের পিঠ ঠেকালো,আরাতের কাঁধে থুতনি রেখে নেশাতূর কন্ঠে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

___” এখান থেকেই কন্টিনিউ করবো?
কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলা কথায় আরাত কেঁপে উঠলো, অভিমান করেও শান্তি নেই,দেরিতে আসার জন্য সরি বলবে তা না, উল্টো বেসামাল করে তুলছে, আরাতের রাগ বাড়তে লাগলো, অভিমানী গলায় নিজের থেকে তাকবীর কে দূরে সরাতে সরাতে কাঁপা গলায় বলল,
___” দূরে সরুন, একদম আমাকে ছোঁবেন না।
তাকবীর আরাত কে নিজের দু’হাতের মধ্যে বন্দি করে নিয়ে বিরক্ত গলায় বলে উঠলো,
___” উঁহু রাত ডোন্ট ডিস্টার্ব মি।
তাকবীরের বিরক্ত মাখা কন্ঠে আরাত নড়াচড়া বন্ধ করলো,তাকবীর এভাবেই কিছুক্ষণ আরাতের ঘারে মুখ গুঁজে রইলো, আরাত হাসফাস করছে, তাকবীর হুট করেই আরাত কে কোলে তুলে নিলো, আরাত ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, দুহাতে তাকবীরের গলা জরিয়ে ধরে ছোট্ট ছোট্ট চোখে তাকবীর কে দেখছে, তাকবীর নেশাতূর চোখে চেয়ে বলে উঠলো,

___” রুমে যাওয়া যাক?
আরাত তাকবীরের কথায় মানে বুঝতে পারছে, বয়সের দুহায় দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় মাথা নিচু করে বলে উঠলো,
___” আমি অনেক ছোট!
তাকবীরের নিলিপ্তর উত্তর,
___” ম্যানেজ করে নিবো।
___” বুঝি না কিছু!
তাকবীর আরাতের চোখের দিকে তাকালো, আরাত আমতা আমতা করতে করতে চোখ অন্যদিকে ফিরালো,তাকবীর জানে আরাত বাহানা দিচ্ছে, পুনরায় হাঁটতে হাঁটতে গম্ভীর গলায় বলল,
___” ডোন্ট ওয়ারি বুঝিয়ে দিবো।
আরাত মনে মনে তাকবীরের দিকে চেয়ে বলল,

___” দেখে মনে হয় ভাজা মাছ উল্টাইয়া খাইতে পারে না, অথচ সুযোগ পেলে কাটা সহ মাছ গিলে ফেলতে পারে।
তাকবীর আরাতের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলল,
___” কিছু বলছো?
আরাত তারাহুরো কন্ঠে বলে উঠলো,
___” মুড নেই,
তাকবীর হুট করেই আরাতের গলায় ডিপলি ভাবে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো, আরাত চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে কেঁপে উঠলো, তাকবীর নেশাতূর গলায় ঠান্ডা কন্ঠে বলে উঠলো,
___” নো প্রবলেম, মুড বানিয়ে দিবো।

গভীর রাত পুরো বাড়ি নীরব ড্রয়িং রুমে লাইট জ্বলছে আর ধীকে ধীকে ডাইনিং টেবিল থেকে প্লেট চামিচের শব্দ শুনা যাচ্ছে,তাকবীর আরাত কে প্লেটে ভাত তুলে দিয়ে নিজের জন্য ভাত তুলে নিলো, আঁড়চোখে আরাতের দিকে তাকাতেই দেখলো আরাত মাথা নিচু করে চুপচাপ ভাত হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করছে শুধু,শরীরে থ্রি পিসের উপর লেডিস জ্যাকেট, আধভেজা চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া, তাকবীর গলা খাঁকারি দিলো, আরাত চোখ তুলে এক পলক তাকবীর কে দেখে পুনরায় চোখ নামালো, তাকবীর নিজের প্লেট সহ বসা থেকে উঠে এসে আরাতের পাশে বসলো,পুনরায় আরাতের প্লেট নিজের কাছে নিয়ে ভাত মেখে লোকমা আরাতের মুখের সামনে ধরে বলে উঠলো,
___” হা করো।

আরাত লজ্জায় মুখ তুলতে পারছে না, ভাত মুখে পুড়ে নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে চিবোতে লাগলো, তাকবীর আরাতের দিকে তাকিয়ে একবার নিজে খেতে লাগলো তো আরেকবার আরাত কে খাওয়াতে লাগলো,তাকবীর নিজেও কথা বলল না কেমন সংকোচ হচ্ছে কথা বলতে, খাওয়া শেষ হয়লে তাকবীর প্লেট কিচেন রুম রেখে এলো, পুনরায় ডাইনিং টেবিল থেকে টিস্যুর প্যাকেট থেকে টিস্যু বের করে আরাতের ঠোঁটে লেগে থাকা পানি খুব যত্ন সহকারে মুছে দিলো, মনে হচ্ছে তাকবীর কোনো অসুস্থ মানুষের যত্ন নিচ্ছে অথচ কারো মুখে কথা নেই, তাকবীর পুনরায় আরাত কে কোলে তুলে নিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো, রুমে এসে আরাত কে বিছানায় শুয়ে দিয়ে কম্বল শরীরে জরিয়ে দিলো, আরাত ছোট্ট ছোট্ট চোখে শুধু তাকবীর কে দেখছে, তাকবীর রুমে ডিম লাইট জ্বালিয়ে বেলকনিতে পা বাড়ালো,বেলকনির সোফাতে বসে অন্য মনস্ক হয়ে কয়েক মিনিট পার কর,কোথাও যেন একটা গিল্টি ফিল হচ্ছে, মনে হতে লাগলো আরাত কে আরেকটু সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিলো, মনের মধ্যে অপরাধ নিয়ে তাকবীর অন্ধকার বেলকনিতে দশবারো মিনিট পার করলো, কেন যেন মনে হচ্ছে আরাত এখনো জেগে আছে, তাকবীর সোফা থেকে উঠে টি-শার্ট ঠিক করে রুমে পা বাড়ালো, আরাত কে পিছন ঘুরে শুয়ে থাকতে দেখে তাকবীর বিছানায় শুয়ে পরলো, কম্বলের নিচে ঢুকে আরাতের পিঠ নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে আরাতের কোমর জরিয়ে ধরলো, আরাত কে কোনোপ্রকার নড়াচড়া না করতে দেখে আরাতের মাথায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে অপরাধী গলায় বলল,

___” আমি জানি তুমি জেগে আছো,আই এম সরি তোমাকে আমার সময় দেওয়ার প্রয়োজন ছিলো, বিলিভ মি তোমাকে ছাড়া আমার কিছুই ভালো লাগে না, নিজেকে সবসময় সামলিয়ে রাখি বাট কীভাবে যেন নিজের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেললাম….
আরাত তাকবীরের হাতের উপর হাত রাখলো, তাকবীরের বুকে মাথা ভালোভাবে গুজে দিয়ে নিচু স্বরে বলে উঠলো,

___”এক্সপ্লেইন করতে হবে না, আমি আপনার বিবাহিত স্ত্রী, আপনার পুরো অধিকার আছে আমার উপর,নেগেটিভ ভেবে দূরত্ব সৃষ্টি করবেন না প্লিজ।
তাকবীর যেন আরাতের কথায় স্বস্তি পেলো, আরাত কে আরো নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো, আরাতের মধ্যে আর কোনো দু-টানা নেই আজকে যেন পরিপূর্ণ লাগছে, ভালো লাগা আর ভালোবাসার তফাৎ খুঁজে পেলো, কাউকে চোখের দেখায় ভালো লাগতে পারে কিন্তু ভালোবাসা তো কারো আগলিয়ে রাখা যত্নের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়, যে তোমাকে সন্মান করবে তাঁর প্রতি তোমার ভালোবাসাটা আপনাআপনি সৃষ্টি হয়ে যায়।

রশ্মিরাত মিম পাশাপাশি ছিটে বসেছে, তাঁদের আলেদা কোনো গ্যাং লাগে না তাঁরা কাজিন রা মিলেই যেন একটা গ্যাং, সন্ধ্যা আজকে কলেজে আসেনি, মিরা রশ্মিরাতের থেকে দূরত্ব রেখে বসেছে, একা একা ব্রেঞ্চ বসে ক্লাস করছে, রশ্মি মিম কে দিয়ে মিরার সঙ্গে কথা বলাছে, তাঁদের পাশে বসতে বলছিল কিন্তু মিরা মিম কে বারণ করে দেয়, সে একাই ঠিক আছে বলে, রশ্মিরাত আর কথা বাড়ায়নি, ছুটির শেষে ক্লাস থেকে বের হয়ে রশ্মি পুরো ভার্সিটি চোখ বুলাচ্ছে, আরাত শুধু রশ্মি কে পরক করছে, রশ্মি ওয়াশরুমের কথা বলে আরাত আর মিম কে গেটের সামনে দাঁড়াতে বলে চলে গেলো, আরাতের বুঝতে বাকি রইলো না, ওয়াশরুমের বাহানা ছিলো এটা, আরাত কিছুই বললো না, না রশ্মি কে আটকালো, কেটে গেলো ছয় থেকে সাত মিনিট তবুও রশ্মির দেখা মিললো না, আরাত গম্ভীর হয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো, মিম রশ্মির আশায় বিরক্ত হয়ে আরাত কে বলল,

___” আপু রশ্মি আপু আসছে না কেনো, আপু কেনো প্রবলেমে পরলো না তো, চলো তো ওদিকে!
আরাত থায় দাঁড়িয়ে ভারী কন্ঠে মিম কে বলল,
___” প্রয়োজন নেই চলে আসবে।
মিম আরাতের কথায় ঠোঁট উল্টালো,এভাবেই আরো এক দু মিনিট যেতে লাগলো মিম বিরক্ত প্রকাশ করে পুনরায় আরাত কে বলে উঠলো,

___” আপু তুমি থাকো, আমি দেখে রশ্মি আপু কই!
আরাত কিছু বলল না,মিম আরাত কে রেখে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো, রশ্মি কে ওয়াশরুমে খুঁজে না পেয়ে ক্যান্টিনের দিকে পা বাড়ালো, ক্যান্টিনে প্রবেশ করতেই কোথায় থেকে আরশ মিমের সামনে এসে মিমের হাত ধরে ক্লাস রুমের ভিতরে টেনে নিয়ে গেলো, মিম নিজের হাতের মধ্যে থেকে আরশের হাত ছাড়াতে মোচড়ামুচড়ি করছে, আরশ ক্লাস রুমে ঢুকে মিম কে ধাক্কা দিলো,মিম টাল সামলাতে নিয়েও ব্রেঞ্চের উপর পরল, আরশ ক্ষিপ্ত চোখে চেয়ে আছে মিমের দিকে, মিম সোজা হয়ে প্রথমে নিজের হাতের দিকে তাকালো, আরশ হাত চেপে ধরার কারণে জায়গাটা কালো হয়ে গেছে, আরশ মিমের কাছাকাছি এসে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে উঠলো,

___” আমার ভাইয়ের আশেপাশে তোকে যেন না দেখি, মিডেল ক্লাস ফ্যামিলির মেয়ে হয়ে স্বপ্ন দেছিস বড়োলোক ছেলেকে ভুলিয়ে বিয়ে করার?
মিম নিজের পরিবার আর নিজেকে নিয়ে নোংরা কথায় অপমান বোধ করলো, কথাটা লেগেছে, নিজেকে কেউ ছোট করে কথা বললে মেনে নিতে পারে না সেখানে পরিবার কে ছোট করছে এটা মেনে নেয় কিভাবে, মিম দাঁতে দাঁত চেপে আরশ কে নিজের সামনে থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রাগী গলায় বলল,

___” আমার পরিবারের যথেষ্ট রয়েছে,তোর ভাইয়ের পিছনে আমাকে ঘুরতে হবে না। তোর ফ্যামিলিতে টাকা থাকতে পারে বাট আমার ফ্যামিলিতে সম্মান আছে, তোর ফ্যামিলি বড়োলোক হতে পারে কিন্তু তোকে ভালো শিক্ষা দিতে পারেনি, কিভাবে মেয়েদের সম্মান করতে হয় জানিস না,শিক্ষার অভাব তোর মধ্যে।
মিমের কথায় আরশ আরো রেগে গেলো, মিম কে দেখে আসার পর কোনো কথা ছিলো না, গতকাল রাতে রুপোলী বেগম আরশের মায়ের কাছে ফোন করে বলেন, মেয়ে তাঁর শহরে আছে,আপনার ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ে কে ঘুরতে পাঠাবেন, দু’জন ফ্রি হয়ে গেলে বিয়ে দ্রুত দিতে পারবে,রুপোলী বেগমের কথায় আরশের মা খুশিতে বড় ছেলের রুমে এসে বলেন, আগামীকাল বিকালে মিম কে তালুকদার বাড়ি থেকে রিসিভ করে ঘুরতে বের হতে, মায়ের কথায় হানিফ রাজি হলেও মা রুম থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হানিফ আরশের রুমে আসে এবং আরশ কে সবকিছু বলে, মিম কে নিয়ে লং ড্রাইভে যেতে হবে, হানিফ যাবে না আরশ কে সবকিছু ম্যানেজ করতে বলে, আরশ সবকিছু শোনার মাএ রেগে যায়, বিশেষ করে রুপোলী বেগমের উপর, আরিশা আমানের বিয়েতে আরশ রুপোলী বেগম কে বুঝতে পারে ভদ্রমহিলা একটু লোভী টাইপের, আরিশার বিয়েতে মিমের প্রতি এক মুহূর্তের জন্য একটু ভালা লাগা জন্মেছিল, কিন্তু ব্যাপারটায় মনোযোগ দেয় নি, হাজারো সুন্দরী মেয়ে আশেপাশে থাকে, তাঁদের প্রতি কোনো ফিলিংস কাজ করে না, মিম কে একটু অন্যরকম ভেবেছিলো, গায়ের রং শ্যামলা মুখটায় মায়া লেগে আছে,টুকিটাকি দুজনের ঝগড়ার মধ্যে দিয়ে মিমের প্রতি আরশের একটু দুর্বলতা কাজ করলেও পর মুহূর্তে রুপোলী বেগমের সঙ্গে পরিচয় হয়ে মিমের প্রতি ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়।

গ্রামের পরিবেশ প্রথম থেকেই পছন্দ ছিলো না, বড় ভাইয়ের বিয়ের জন্য বাবা-মার চাপে গ্রামে মেয়ে দেখতে যাওয়া, সেখানে বড় ভাইয়ের পাশে মিম কে দেখামাত্র যেন রাগ উঠে ছিলো,তারপর রুপোলী বেগমের বাড়াবাড়ি তাঁর সঙ্গে যোগ হয়েছে নিজের বাবা-মা, আরশ মিম কে গতকাল কলেজে দেখেই ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়,আরশের ধারণা মিম হানিফের জন্য শহরে এসেছে, রাতে বড় ভাইয়ের কথায় সিওর হয়ে যায়, মিম হানিফ কে ফাঁসাতে শহরে এসেছে, সারাদিন সবকিছু ভুলে গিয়ে কলেজ ছুটির শেষে রুপা তাসিন কে সঙ্গে নিয়ে ক্যান্টিনে বসে আড্ডা দিচ্ছিল, মিম কে ক্যান্টিনে উঁকি দিয়ে কাউকে খুজতে দেখেই সবকিছু মনে পড়ে যায়, হাসি মুখটা বন্ধ হয়ে রাগ ফুটে উঠে। ক্যান্টিনে আরো অনেকই ছিলো আরশ সবাই কে পাওা না দিয়ে রাগী মুখে সবার সামনে মিম কে টেনে নিয়ে ক্লাস রুমে চলে আসে। আরশ মিম কে টেনে নিয়ে যাওয়াতে রুপা তাসিন হতভম্ব হয়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো, আশেপাশে বাকি ছেলেমেয়ে উঁচু গলায় বলতে শুধু করে, ওদের নাটক ফুরাবে না, এই মেয়েগুলো কলেজে পা দেওয়ার পর থেকে কিছু না কিছু ঘটতেই আছে, প্রথমে তো মাহির ব্রো আর দুই মেয়ে এখন আবার নতুন নাটক, আরশ ব্রো ওই নতুন মেয়েকে এভাবে টেনে নিয়ে গেলো কেনো, নিচ্চয় মেয়েটা কিছু করেছে।
এভাবেই নানারকম কথা বলতে লাগলো, তাসিন কথাগুলো পাওা না দিয়ে আরশ আর মিমের কাছে যেতে নিলো, তাসিনের পিছনে পিছনে রুপা হাঁটা ধরলো, মিমের কথায় আরশ তাচ্ছিল্য হেঁসে মিমের চারপাশ ঘুরতে ঘুরতে ব্যঙ্গ করে বলল,

___” রিয়েলি… হুমমম গুড, তো সম্মানিত সতী ম্যাম, বিয়ের কথা চলমান ছেলের সঙ্গে লং ড্রাইভে যেতে চাওয়া আপনার ফ্যামিলির শিক্ষার মধ্যে পড়ে মেবি, ওকে ভেরি গুড আই লাইক ইট রুলস, সতী ম্যাম সব ছেলের সঙ্গে কী লং ড্রাইভে যাওয়া হয়, নাকি আমার ভাই ফাস্ট মুরগী ?
মিম দাঁতে দাঁত চেপে সবকিছু শুনলেও শেষের কথায় আরশের গালে কষিয়ে থাপ্পড় লাগলো, আরশ দাঁতে দাঁত চেপে আশেপাশে তাকালো, মিম রাগে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
___” তোর মতো নোংরা ছেলে আমি আমার লাইফে ফার্স্ট দেখছি, কী ভেবেছিস গ্রামের মেয়ে যা ইচ্ছা বলবি আর আমি সহজ-সরল মেয়েদের মতো কষ্ট পেয়ে কান্না করে দিবো, ভুলেও নাদান মেয়ে ভাবতে যাবি না। তোর ভাই কেনো তুই আমার পায়ে ধরলেও আমি তোদের মতো বড়লোক দের বিয়ে করবো না, আমি নিজের পায়ে দাঁড়াবো, সফল হয়ে তোকে দেখিয়ে দিবো শুধু টাকা থাকলেই হবে না সুন্দর মন থাকতে হবে।

মিম কথাটা বলে আরশের দিকে ঘিন্নার চোখে চেয়ে কলেজ ব্যাগ ঠিক করতে করতে ক্লাস থেকে বের হতে যাবে, আরশ হুট করেই মিম কে নিজের সঙ্গে চেপে ধরলো, মিম হকচকিয়ে গেল, আরশ মুখে বাঁকা হেঁসে মিম কে নিজের সঙ্গে জরিয়ে ধরে রাখলো, মিম আরশের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করছে আর বুকে কিল-ঘুষি দিতে লাগলো, তখনই কয়েক জোরা পায়ের শব্দ ভেসে এলো, পায়ের শব্দ বলে দিচ্ছে এদিকেই তাড়া আসছে,মিম ভয় পেলো, এভাবে দুজন কে দেখলে সবাই বাজে বলবে, চরিত্রের দাগ বসাবে, মিম আরশের দিকে তাকিয়ে দেখলো আরশের মুখে বাঁকা হাসি, মিম নিজের সন্মান বাঁচাতে আরশের বুকে কিল-ঘুষি বসাতে বাসাতে ভীতু সুরে আকুতি করে বলতে লাগলো,

___” প্লিজ আমাকে ছেড়ে দেন, এভাবে আমাদের কেউ দেখলে আমার চরিত্রে দাগ পরবে, আমাকে কলঙ্কিত করবেন না, আমি সমাজে মুখ দেখতে পারবো না, প্রমিস করছি আমি আর আপনার সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলবো না, দয়া করেন প্লিজ!
মিমের আকুতি করার মধ্যে কয়েক জোরা পা এসে ক্লাস রুমের সামনে দাড়ালো, সঙ্গে সঙ্গে আরশ মিমের মুখের কাছাকাছি নিজের মুখ রাখলো, দরজা থেকে সবার চোখে পরলো, আরশ মিম দুজন দুজন কে লিপ কিস করছে, মিমের হাত আরশের বুকে কিল-ঘুষি দিচ্ছে, অথচ আরশ মিমের হাত এমনভাবে ধরে রেখেছে, দূর থেকে দেখে বুঝা যাচ্ছে, দুজনের হাত দুজনের আতের মধ্যে আগলিয়ে রেখেছে, আরশ আরেক হাত দিয়ে মিমের কোমর চেপে ধরে রেখেছে, দরজায় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, রশ্মিরাত রাফি মিরা রুপা তাসিন, রাফি অন্যদিকে চোখ ফিরালো, আরাত হতভম্ব থেকে বেরিয়ে এসে চিৎকার দিয়ে রাগী গলায় মিম কে ডেকে উঠলো,

___” মিম…?
সঙ্গে সঙ্গে আরশ মিম কে ছেড়ে দিয়ে বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো, ভাবটা এমন অন্যায় করে ধরা পড়ে গেছে, মিম আরশের থেকে ছাড়া পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কান্না করতে করতে দৌড়ে এসে আরাত কে জরিয়ে ধরলো,
কান্না করতে করতে ফুপিয়ে বলে উঠলো, আরাত মিম কে দু’হাতে জরিয়ে নিলো, এক এক করে সবাই ক্লাসের মধ্যে ঢুকে গেলো, কারো জানা নে এমন পরিস্থিতি সামাল দেয় কিভাবে, তাসিন মেয়েটা নাক ছিটকে বলে উঠলো,
___” বা বা বা, এত টুকু মেয়ের মধ্যে এত কিছু ছি, আমি তো ভাবতে পারছি না লজ্জাহহহ।
তাসিনের কথায় মিম নিজেকে পবিত্র প্রমাণ করতে কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,

___” আপু, আপু তোমরা যা দেখছো সব মিথ্যা,সব মিথ্যা, আমাকে তো তুমি চিনো আমি এমন বলো!
আরাত মিমের গালে হাত রেখে বিশ্বস্ত চোখে বলল,
___” হ্যাঁ, হ্যাঁ শান্ত হ, দেখ দেখ আমার দিকে দেখ!
মিমের কথায় তাসিন পুনরায় মিম কে ব্যঙ্গ করে বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ আমরা তো দেখলাম তুমি কেমন, আর আমরা এটাও দেখলাম এখানে কী হচ্ছিল।
তাসিনের কথায় মিম তাসিনের দিকে চেয়ে রাগী গলায় বলল,
___” আপনি বিশ্বাস করেন আর না করেন, আমার যায় আসে না, আরাত আপু বিশ্বাস করে আমাকে এতেই এনাফ।
মিমের কথায় রুপা মেয়েটা বলে উঠলো,

___” দেখছিস তাসিন, বলে না চোরের মায়ের বড় গলা, তাই হয়েছে এই মেয়ের, আমরা নিচ চোখে সবকিছু দেখার পড়েও এই মেয়ে আমাদের মিথ্যুক বানিয়ে দিচ্ছে, গ্রামের মেয়ে তো চালু বেশি।
মিম কান্না করতে লাগলো, এখন আর বলে লাভ হবে না,কেউ বিশ্বাস করবে না দূর থেকে যা দেখেছে তাই সত্যি ভাবছে,রুপার কথায় রাফি ধমক দিয়ে উঠলো,
___” তুই চুপ করবি, সবসময় দু লাইন বেশি বলিস, সবসময় আমরা যা দেখি তা সত্যি হয় না।
রাফির পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে তাসিন বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ মেনে নিলাম আমরা যা দেখেছি সবকিছু ভুল ছিল, কিন্তু আরশ কিছু বলছে না কেনো, ওকে বলতে বল সত্যিটা?
তাসিনের কথায় সবাই আরশের দিকে তাকালো,মিম আশাভরা চোখে আরশের দিকে তাকালো, আরশ মিম কে একনজর দেখে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

___” আমি কী বলবো, যা হয়েছে দেখলি তো।
আরশের কথায় মিমের আশাভঙ্গ হয়ে গেলো, একটু বিশ্বাস জেগে ছিলো, আরশ সত্যিটা অন্তত বলবে, কিন্তু না মিমের সব আশায় পানি ঢেলে দিয়ে মিম কে কলঙ্কিত করলো,রশ্মিরাত নিস্তব্ধ হয়ে আছে কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না, মিম আরাত কে ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে আরশের কাছে এসে আরশের কলার চেপে ধরে কান্না করতে করতে বলে উঠলো,
___” কী ক্ষতি করেছি আপনার হ্যাঁ, কিসের সাজা দিচ্ছেন আমাকে,আপনি মানুষ ছি, এতটা চিফ মিন্টালিটি!
আরশ মিমের হাত নিজের কলার থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
___” কী এক্সপেক্টেশন ছিলো, আমি অনেস্ট, নো ইয়ার আই এম ব্যাড বয়, সো সরি তুমি তো কান্না করছো, আরে ইয়ার তুমি তো স্ট্রং!
আরশ শার্টের কলার ছেড়ে নিয়ে পুনরায় দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,
___” কী বলতো, তোর ওই অহংকার আমাকে বড্ড ইনসাল্ট করেছে, এতেই কান্না করছিস, কলেজ থেকে বের হওয়ার পর যখন তোকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করবে, তখন কী করবি?
মিম নিস্তব্ধ হয়ে গেলো, চুপচাপ ফাঁকা চোখে মেঝের দিকে চেয়ে আছে, রশ্মি সবাই কে এক নজর দেখে নিয়ে মিমের হাত ধরে বলে উঠলো,

___” মিম চলো বাসায় যাবো।
রশ্মি মিম কে নিয়ে যেতে নিলে তাসিন মেয়েটা মিম কে আটকে দিয়ে বলে উঠলো,
___” যাবে মানে, কই যাবে, তোমার কোথাও যেতে পারবে না, আরশ আর মিমের বিয়ে হবে আজকে।
বিয়ের কথা শোনা মাএ সবাই চমকে উঠলো, আরশ নাকচ করে বলে উঠলো,
___” হোয়াট ননসেন্স,তুই কী পাগল এই বিয়ে ইম্পসিবল।
রাফি আরশের কথায় আরশের দিকে তীক্ষ্ণচোখে চেয়ে বলল,
___” কেনো পসিবল না, তোরা দুজন নিচ্চয় আমাদের অগোচরে রিলেশনে ছিলি,তাহলে মিম কে তোর বিয়ে করতে প্রবলেম কেনো?
আরশ আমতা আমতা করতে লাগলো, সত্যিটা তো আর বলা যাচ্ছে না, তাসিন আরশের মনোবল বুঝতে পেয়ে রাফি কে বলে উঠলো,

___” রাফি তুই সময় নষ্ট করছিস, আর কোনো কথা না চল কাজি অফিসে, আগে ওদের বিয়ে টা সম্পূর্ণ হতে দে তারপর কথা বলা যাবে।
কথাটা বলতে বলতে তাসিন রুপা তে ইশারা করলো তাঁর সঙ্গে সায় জানাতে, রুপা হ্যাঁ হ্যাঁ বলতে বলতে তাড়াহুড়া করতে লাগলো, রশ্মিরাতের সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে, মিরা এতক্ষণে কথা বলে উঠলো,
___” আমার কী মনে হয়, ফ্যামিলিতে জানানো দরকার, উনারা বসে একটা ডিসিশন নেবে, এটাই ভালো হবে তাইনা?
মিরার কথায় রশ্মিরাত সায় জানিয়ে হ্যাঁ হ্যাঁ বলে উঠলো, মিমের মুখে কথা নেই, তাসিন তৎক্ষণিক ব্ল্যাকমেইল করে উঠলো,

___” দুজন কে এখন কাজি অফিসে নিয়ে বিয়ে না পড়ালে আমি পুরো কলেজে বলে দিবো।
তাসিনের কথায় সবাই রেগে গেলো, আরাত রাগী গলায় তাসিনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
___” ওদের বিয়ে নিয়ে আপনার এত তাড়া কেনো জানতে পারি ?
___” তোমাকে বলার প্রয়োজন মনে করছি না।
আরাত রাগী গলায় বলল,
___” আপনার তো এত কথা বলার প্রয়োজন দেখছি না, আপনি এত কথা বলছেন কেনো, আমার বোনের বিয়ে কার সঙ্গে হবে এটা আমার ফ্যামিলি ঠিক করবে আপনি না বুঝতে পারছেন, যতসব আজাইরা পাবলিক চলতো মিম।
আরাত মিমের হাত ধরে বাহিরে নিয়ে যেতে লাগলো, রশ্মি তাঁদের পিছনে আসছে, তাসিন দ্রুত পায়ে আরাত মিমের সামনে এসে দাঁড়ালো, এতক্ষণে আরাত মাঠের মধ্যে এসেছে, রাফি মিরা আরশ ধীরে ধীরে ক্লাস থেকে বের হয়ে এলো, তাসিন আর রুপা মেয়েটা আরাতের সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো,

___” তোমার বোন পাবলিকলি রোমাঞ্চ করতে পারলে, আমরা বলতে পারবো না?
আরাত রাগী চোখে তাসিনের দিকে চেয়ে আছে,মুখটা না দেখা গেলেও নেকাবের আড়ালে দুটো রাগী চোখ বলে দিচ্ছে, আরাত যেকোনো সময় তাসিনের চুলের ঝুটি টেনে ধরবে, রশ্মি এবার তাসিনের সামনে এসে বলে উঠলো,
___” আপু অনেক হয়েছে, আমাদের বোন আমরা বুঝে নিবো, আর হ্যাঁ আপনি সিনিয়র বলে অনেক রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলছি আর না, পথ থেকে সরে দাঁড়ান।
___” এই মেয়ে কাকে থ্রেট দেও, আমি মাহিরের মতো তোমার ভালোবাসার পাগল না, যে মেনে নিবো ওকে?
রশ্মি আর কথা বলতে পারলো না, মাঠের মধ্যে কয়েকজন কে দাঁড়িয়ে হইচই করতে দেখে কলেজের প্রিন্সিপাল মাঠের মধ্যে এলো, কলেজ ছুটির কারণে আশেপাশে দুএকজন কে ছাড়া কাউকে দেখা যাচ্ছে না, স্যার ম্যাম রা চলে গেছে, প্রিন্সিপাল স্যার নিজের কেবিনে ইম্পরট্যান্ট ফাইল দেখছিল, কেবিন থেকে বাড়ি ফিরার জন্য বের হতেই মাঠের মধ্যে রশ্মিরাত দের দেখতে পেয়ে সেদিকে পা বাড়ালো, এক নিমেষেই চারপাশ নীরব হয়ে গেলো, প্রিন্সিপাল স্যার বলে উঠলেন,

___” কী হয়েছে এখানে?
___” স্যার আই এম সরি বলতে লজ্জা লাগছে বাট না বললেই না, এতে কলেজের অসম্মান হবে।
বাকি সবাই ভীতু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মিম আরাতের হাত চেপে ধরে আছে, রাফি ইশারায় বলতে বারণ করছে, প্রিন্সিপাল স্যার সবাই কে পরক করে তাসিন কে বলতে বলল,তাসিন এই সুযোগে বলে উঠলো,
___” স্যার আরশ আর এই মেয়েটা ক্লাস রুমে একে উপরের সঙ্গে!
তাসিনের কথায় প্রিন্সিপাল স্যার গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলো, উনি যা বুঝার বুঝে গেছে, রাগী চোখে মিম আর আরশ কে দেখতে লাগলো, মিম মাথা নিচু করে ধীকে ধীকে ফুপিয়ে উঠছে, আরশ গম্ভীর, আরশ কে দেখে বুঝা দায় কী চলছে মনে তাঁর , প্রিন্সিপাল স্যার রাগী গলায় বললেন,

___” আগামীকাল তোমাদের গার্জিয়ান কে দেখতে চাই।
এতেও আরশের মধ্যে ভাবান্তরিক দেখা গেলো না, প্রিন্সিপালের কথা তাসিনের পছন্দ হলো না, নিজে বলে উঠলো,
___” সরি স্যার আপনার মুখের উপর কথা বলছি, স্যার আমার মনে হয় ওদের বিয়ে পড়িয়ে দেন, নেক্সটাইম কেউ আর এমন নোংরা কাজে লিপ্ত হওয়ার সাহস করবে না।
স্যার কয়েক সেকেন্ড ভেবে তাসিনের কথায় সায় জানালো, কেউ আর প্রিন্সিপালের মুখের উপর কথা বলতে পারলো না, প্রিন্সিপাল নিজে দাঁড়িয়ে আরশ আর মিমের বিয়ে পড়িয়ে দিলো, বিয়ে পড়ানোর শেষে প্রিন্নিপাল স্যার চলে গেলেন, আরশ মিম পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, মিমের মনে আরশের জন্য ঘিন্না ছাড়া কিছুই এলো না। আরশ এখনো নিলিপ্ত, রাফি আরশ কে বলে উঠলো,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৫

___” এখন কী করবি?
আরশ মিমের দিকে আড়চোখে চেয়ে বলে উঠলো,
___” ডিভোর্স।
কথাটা বলে আরশ সবাই কে রেখে একটা রিকশা ধরে চলে গেলো,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৪৭