প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪৩
সাইদা মুন
জেলের ভেতরে বসে আছে সবাই। এই অল্প সময়েই খবরটা কলেজে পৌঁছে গেছে, এ নিয়ে আর কারও কোনো সন্দেহ নেই। কারণ সকলের গায়েই কলেজ ড্রেস আছে। তনিমা বারবার বাবাকে একটা কল দিতে চাইছিল, কিন্তু কেউই মোবাইল দেয়নি। এমনকি রাফির ফোনটাও আগেই নিয়ে নেওয়া হয়েছে। যোগাযোগের সব পথ বন্ধ।
একই বেঞ্চে গা ঘেঁষে বসে আছে সবাই। জেলের ভেতরের বাতাসটা ভারী, দমবন্ধ লাগছে যেন অক্সিজেন কম। কাঁচা ঘাম আর পুরনো দেওয়ালের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ মিলেমিশে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। সেই অস্বস্তির মাঝেই তাহিয়াকে ঘিরে রেখেছে বাকিরা। মেয়েটা ভয় পেয়ে একেবারে ভেঙে পড়েছে। মেহরীনের গা জড়িয়ে ধরে বসে আছে, আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে। বারবার কাঁপা, ভাঙা গলায় আওড়াচ্ছে, “ভাইয়া, আম্মু!”।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মেহরীনের বুকটা কেঁপে ওঠে। তাহিয়ার এই অবস্থা যদি ওর পরিবার দেখে? সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে ওঠে কঠিন সব মুখ, প্রশ্নভরা দৃষ্টি। তখন কি সব দোষ এসে পড়বে তার ওপরই? বলা হবে, তার সঙ্গেই তো মেয়েটা বেপরোয়া হয়েছে, সাহস বেড়েছে। ভাবতেই ভয় লাগে মেহরীনের। তাদের চোখে সে ধীরে ধীরে একটা ‘বাজে মেয়ে’ হয়ে উঠবে। এই ভাবনাটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে। অথচ সে তো ইচ্ছে করে কিছু করেনি, খারাপ চায়নি।
নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতে থাকে, দোষ কি সত্যিই তার নেই? টাকা দিয়ে বিয়ে পড়াতে যাওয়া। এই কাজটাই তো গোড়া থেকেই ভুল। আর এই ভুল কাজটাই সে করেছে। বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু তখন কি আর কোনো উপায় ছিল? যদি তখন তারা এগিয়ে না যেত, তাহলে তো একটা মেয়ের পুরো জীবনটাই ধ্বংস হয়ে যেত। অপমান, ভয়, অসহায়ত্ব, কলংকের দাগ সবকিছুর ভার এসে পড়ত ওই একার ওপর। এমন মুহূর্তে মাথায় তো আর বিকল্প রাস্তা ঢোকেনি।
একটা মেয়ের ইজ্জত বাঁচাতে গিয়ে কি সে বাকিদের এই ঝামেলায় ফেলল? এই একটা প্রশ্নই মেহরীনের বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। উত্তর খুঁজে পায় না, শুধু অপরাধবোধটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে জমতে থাকে।
অসহ্য অনুতাপে মেহরীনের চোখ ভিজে আসে। বুকের ভেতরের চাপটা আর ধরে রাখতে পারে না। গলাটা ভারী হয়ে আসে,
—সরি রে.. আমার জন্য তোদের এত বড় ঝামেলায় পড়তে হলো। যদি আমি তখন সায় না দিতাম..
কথাটা শেষ করার আগেই চোখ বেয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে তার দিকে। মেহরীনের টলমলে চোখ, অনুতাপে ভেঙে পড়া মুখটা দেখে রাফিই আগে মুখ খোলে,
—আন্তাজি কথা বলস কেন? দোষ যদি থাকে, তাহলে এখানে আমাদের সবারই দোষ আছে, তোর একার না।
তনিমাও এক মুহূর্ত দেরি না করে দৃঢ় গলায় বলে ওঠে,
—আমরা কোনো ভুল করিনি। উল্টো ভালো কাজ করেছি। একটা মেয়ের গায়ে কলঙ্ক লাগা থেকে বাঁচিয়েছি।
ফারিনও মাথা নেড়ে সায় দেয়,
—হ্যাঁ। এখানে তো আমি কোনো ভুল দেখছি না। অসহায় একটা মেয়েকে সাহায্য করেছি, ব্যস।
হঠাৎ গলা চড়িয়ে সে সেই মেয়েটার দিকে তাকায়,
—এই, এই মেয়ে। তুমি চুপ করে আছ কেন? সব বলছ না কেন? তোমার সাথে কী করেছিল, আমরা কীভাবে তোমাকে সাহায্য করলাম। এসব বলছ না কেন?
ফারিনের ধমকে মেয়েটা একটু সঙ্কুচিত হয়ে বসে। চোখ নামিয়ে নেয়, ঠোঁট কামড়ে ধরে। মুখ খুলছে না। এটা দেখে তনিমার ভেতরটা জ্বলে ওঠে। যার জন্য এত ঝামেলা, তার অন্তত তাদের হয়ে একটা কথা বলা উচিত ছিল। কিন্তু মেয়েটি মুখই খুলেনি। উপকারীর পিঠে এভাবে ছুরি মারবে?
মেয়েটা একবার ছেলেটার দিকে তাকায়, আবার মেহরীনদের দিকে। ছেলেটা চোখের ইশারায় কিছু বোঝাতেই সে হঠাৎ গলা শক্ত করে বলে,
—আমি কি বলেছিলাম আমাকে বিয়ে করিয়ে দিন? আমাকে তো ও এমনিতেই বিয়ে করত।
মুহূর্তের মধ্যে যেন জেলের ভেতর বোমা ফাটে। সবাই হকচকিয়ে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়ে কী বলছে? এমন ডিরেক্ট পল্টি, ভাবনাতেও ছিল না। মানুষ এত নির্দয়ও হয়? সবার গোল গোল চোখের চাহনি উপেক্ষা করে মেয়েটা ছেলেটার এক হাত জড়িয়ে ধরে বলে,
—আমার জামাইর কোনো দোষ নেই। যা করেছেন, বাড়াবাড়ি আপনারাই করেছেন।
একেকজন থ হয়ে বসে আছে। যার জন্য এতকিছু করল, সেই বলছে, চুরি! মানুষ এতটা ডেঞ্জারাস হয়।
মেয়ে আর ছেলেটা মিটিমিটি হাসছে তাদের অবস্থা দেখে। তাদের এই কাহিনি দেখে তাহিয়ার কান্না থেমে গেছে। চোখের ভেতর ভয় বদলে রাগ আর জিদ জমে ওঠে। হঠাৎই সে উঠে দাঁড়ায়। এক দৌড়ে গিয়ে মেয়েটার চুল মুঠো করে টেনে ধরে,
—খবিস মেয়ে। টাকা দে বলছি। এক্ষুনি আমার বান্ধবীর তিন হাজার টাকা, সাথে একশ টাকা গাড়ি ভাড়া, মোট তিন হাজার একশ টাকা দে। চুন্নির চুন্নি, তখন তো আমাদের টাকায় দেই দেই করে বিয়ে করলি, আর এখন পল্টি নিচ্ছিস?
হঠাৎ আক্রমণে মেয়েটা কিছু বোঝার আগেই ব্যথায় কুঁকড়ে যায়। চোখ-মুখ কুঁচকে আসে। মুহূর্তের মধ্যে বাকিরা উঠে আসে তাহিয়াকে ছাড়াতে। কিন্তু তাহিয়া এমনভাবে চুল আঁকড়ে ধরেছে যে ছাড়ানোই মুশকিল।
মেহরীন, ফারিন, রাফি তিনজন মিলে টানাটানি করছে তাহিয়াকে ছাড়াতে। আর অন্যদিকে তনিমা, ছাড়ানোর বদলে সুযোগ বুঝে উল্টো মেয়েটার চুল টেনে ধরেছে।
জেলের ভেতর একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। চেঁচামেচি, কান্না, ধস্তাধস্তিতে মুহূর্তে পরিবেশটা তেতে ওঠে। দুজন মহিলা পুলিশ দৌড়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। কড়া গলায় চিৎকার করে হুশিয়ার করে। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝে তারা টেনে সবাইকে আলাদা করে। কোনোরকমে তাদের পাঁচজনকে অন্য সেলে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়।
তাহিয়াকে শান্ত করে বসানো হয়েছে। নিঃশ্বাস এখনও কাঁপছে তার। মেহরীন কাছে গিয়ে নরম গলায় বলে,
—সরি রে…
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে মেহরীনের কাঁধে ধুম করে একটা কিল বসিয়ে দেয়,
—এই, আমি কি বলেছি তোর দোষ? আমি কারো দোষ দিইনি। দোষ হলে আমাদের সবার দোষ। এমনিতেই আমার কান্না পাচ্ছে। তুই তো জানিস, আমি অল্প কিছুতেই ভ্যা ভ্যা করে কাঁদি। এটা আমার অভ্যাস।
তাহিয়ার কথা শুনে কয়েক সেকেন্ড সবাই চুপ থাকে। তারপর হঠাৎ করেই একসাথে হেসে ওঠে সবাই।
তাহিয়া, মেহরীন, তনিমা, ফারিন চারজন একে অপরকে জড়িয়ে লেপ্টে বসে থাকে। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, এখনো কেউ আসছে না। মোবাইল নেই, সময় দেখার উপায়ও নেই। পরিবারকে কি এখনো জানানো হয়নি? বসে বসে বিরক্তি আর অস্থিরতা বাড়ছে। এক সেকেন্ডকেও একমিনিট মনে হচ্ছে এখানের।
হঠাৎ রাফি আড়মোড়া ভেঙে বলে,
—চল, এইটাকেও একটা অ্যাডভেঞ্চার ধরে এঞ্জয় করা যাক।
মেহরীন কপাল কুঁচকে তাকায়,
—যেমন?
তনিমা এপ্রোনের পকেট থেকে উনো কার্ড বের করে হেসে বলে,
—যেমন এইটা। চল শুরু করি। সময়ও কাটবে, টেনশনও কমবে।
ব্যস, সবাই রাজি। জেলের ভেতরেই শুরু হয়ে যায় উনো খেলা। হাসি, তর্ক, খুনসুটি সব মিলিয়ে এখন যেন মুহূর্তের জন্য হলেও টেনশন ভুলে গেছে সবাই। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ কনস্টেবলরা তাদের কাণ্ড দেখে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। কিন্তু কেউ বাধা দেয় না।
প্রায় আধাঘন্টা পর হন্তদন্ত পায়ে থানার গেট পেরিয়ে প্রবেশ করে এক ভদ্রলোক। ঢুকেই অফিসারের সামনে গিয়ে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
—আমার ছেলে-মেয়েরা কোথায়?
তার শক্ত স্বর শুনে মেহরীনরা সঙ্গে সঙ্গে খেলা বন্ধ করে চোখ ফিরিয়ে তাকায়। বাংলা স্যারকে দেখে সবাই হঠাৎ স্থবির হয়ে যায়। বাংলা স্যার এসেছে মানেই বাঁশ কনফার্ম। গলা শুকিয়ে আসে একেকটার, হৃদয় ধুকধুক করছে।
এদিকে অফিসার একজন বাংলাস্যারকে বসতে অনুরোধ করে বলতে শুরু করেন, ছেলে-মেয়েগুলো কী কী কাজ করেছে। শুধু তাই নয়, সত্যের সঙ্গে নিজের মতো করে বানিয়ে বানিয়ে আরও রঙ চড়িয়ে ঘটনাগুলো উপস্থাপন করতে থাকেন। প্রতিটা কথাই যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো।
সেলের ভেতর থেকে মেহরীনরা অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে। যতই শুনছে, বুকের ভেতর ততই দপদপ করছে। মনে হচ্ছে, এভাবে বলতে থাকলে স্যার আরও ক্ষেপে যাবেন, তখন পরিস্থিতি সামলানো অসম্ভব হয়ে যাবে।
রাফি দাঁতে দাঁত চেপে, নখ কামড়াতে কামড়াতে ফিসফিস করে বলে,
—এইরে, খবর আজ বড়সড় হবেই।
ফারিন ঠোঁট উল্টে চাপা স্বরে বলে,
—স্যারকে তো আরও উল্টোপাল্টা বলছে। দেখছিস দেখছিস, স্যার ধীরে ধীরে আরও রেগে যাচ্ছেন।
তাহিয়া লোহার দরজাটা শক্ত করে ধরে, কান্না কান্না গলায় বলে,
—ভাইয়াকে যদি স্যার এসব কথা বলে, আমাকে তো ভীষণ ভুল বুঝবে রে।
তাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। বাংলা স্যার হঠাৎ হাত তুলে পুলিশ অফিসারকে থামিয়ে দেন। দৃঢ় কন্ঠে বললেন,
—আমি জানি আমার ছেলে-মেয়েরা কেমন। ওদের বয়সে একটু বাচ্চামি থাকতেই পারে, কিন্তু জেনেশুনে অন্যায় কাজ ওরা কোনোদিন করবে না।
কড়া স্বরে ফের বললেন,
—আপনি এখনই আমার বাচ্চাদের আমার সামনে হাজির করবেন। আগে প্রমাণ করবেন ওদের অপরাধ, তারপর জেলে নেবেন।
স্যারের এই গর্জনে মুহূর্তেই ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অফিসাররা কেউ আর কিছু না। সেলের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা মেহরীনরা বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে । এ কাকে দেখছে তারা। তারা তো ভেবেছিল, স্যার হয়তো তাদের আরও ধমকাবে, গার্ডিয়ান ডাকিয়ে বিশাল ঝামেলা করবে। অথচ তিনি তাদের পক্ষ নিচ্ছেন? শুধু তাই নয়, নিজের ছেলে-মেয়ে বলে দাবি করছেন! এক মুহূর্তেই সবাই বাকরুদ্ধ। কিছুটা অনুতপ্তও বটে তারা। স্যারকে নিয়ে যেভাবে তারা ভাবে, বাস্তবে স্যার ততটাও তেমন নন। কথাটা একেকজনের মনে নীরবে আঘাত করছে।
স্যারের চিল্লাফাল্লায় দ্রুত সেলের দরজা খুলে দেওয়া হয়। একে একে সবাই বের হয়ে আসে। মাথা নিচু করে স্যারের সামনে দাঁড়ায় তারা।
স্যার কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় তাদের সামনে। রাফির কাঁধে হাত রাখেন, আলতো করে নিজের দিকে টেনে নেন। তারপর বাকিদের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন,
—কিছু করেনি তো তোমাদের সঙ্গে? গায়ে হাত দিয়েছে কেউ?
সবাই ছলছলে চোখে তাকায় স্যারের দিকে। মনে হচ্ছে নিজের আপন কেউ এসেছে, তাদের ভরসাযোগ্য কেউ, যে তাদের পাশে থাকবে। স্যারের কথায় সবাই একসঙ্গে মাথা নাড়ে, “না”।
ঠিক তখনই একজন অফিসার উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
—প্রমাণ এই ছেলে-মেয়েই।
বলেই সেই অপ্রাপ্তবয়স্ক দম্পতির দিকে আঙুল তোলে। স্যার তাদের দিকে তাকিয়ে কয়েক পা এগিয়ে যান। শান্ত কন্ঠেই প্রশ্ন ছুড়েন,
—ওরা তোমাদের জোর করে বিয়ে করিয়েছে?
ছেলে-মেয়ে দুজনেই তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যা।
স্যার কপাল কুঁচকে বলেন,
—পাগলে পেয়েছে? এমনি এমনি ধরে বিয়ে দিয়ে দেবে, তোমাদের মতামত ছাড়াই?
ছেলেটা আমতা আমতা করে বলে,
—স..সত্যি স্যার, আমরা তো এমনি ঘুরতে এসেছিলাম। আর ওরা..
বাকিটা শেষ করার আগেই রাফি চিৎকার করে ওঠে,
—এই মিথ্যাবাদি! তুই কী করছিলি সেটা বল। মিথ্যা বলছিস কেন? স্যার, এই ছেলে-মেয়ে মিথ্যা বলছে, আসল কথা আমি বলি..
কিন্তু তাকে বলতে না দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে এক পুলিশ অফিসার রাফিকে থামিয়ে দেয়,
—এই ছেলে, তুমি কী বলবে? প্রমাণ আমাদের সামনে রয়েছে। শুধু অভিযোগ নয়, একাধিক সাক্ষীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তোমরা জেনেশুনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ে আয়োজন ও তাতে সহযোগিতা করেছ, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তি, সহযোগীসহ, এমনকি কাজিও আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কারাদণ্ড ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে।
এই কথা শুনেই তনিমা আর নিজেকে সামলাতে পারে না। চোখে আগুন জ্বলে ওঠে,
—আইন আমাদের শেখাবেন না। প্রয়োজনের সময় এই আইন আপনাদের কোথায় থাকে? নারীর ইজ্জত হরণের সময় কি এই আইন চোখে পড়ে? এই মেয়েকে যখন ছেলেটা মারছিল তার সাথে অন্যায় করছিল তখন আপনারা কোথায় ছিলেন? রাস্তায় প্রকাশ্য অপরাধ, নারী নির্যাতন কিংবা মানুষ খুনের সময় তো আপনাদের এই আইনকে খুঁজেই পাওয়া যায় না। তখন আপনারা শাড়ি আর চুড়ি পরে নিশ্চুপ বসে থাকেন, ঘটনা ঘটার পর তদন্ত শুরু করেন, যেই তদন্ত কচ্ছপের গতিতে চলে।
পুলিশ কনস্টেবলদের মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে যায়। একেকজন রাগে তাকিয়ে। একজন রাগী স্বরে বলে,
—এই, তুমি কি বলতে চাচ্ছ আমরা অকেজো? আমরা আছি বলেই তোমরা রাস্তাঘাটে শান্তিতে চলতে পারছ। জনগণের নিরাপত্তা আমরাই দিচ্ছি। বেশি কথা বলছ।
তার কথায় রাফি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,
—হাদি হত্যার মতো এত বড়, আলোচিত ঘটনার খুনিকেও আজ পর্যন্ত শনাক্ত করতে পারেননি আপনারা। আর এখন এসব কথা বলছেন, শুনে হাসিই পাচ্ছে। আমরা তো সংকটে আছি, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কিছু হলে, পুলিশ সুষ্ঠু বিচার দেবে, সেই গ্যারান্টি নিয়ে।
মেহরীন এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—অথচ এখন, অপ্রয়োজনে আমাদের শুধু শুধু হেনস্তা করা হচ্ছে। কোনো প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই একের পর এক ছেলে-মেয়েকে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। একপাক্ষিক কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আমাদের কথা কি একবারও শুনেছেন? নাকি শোনার চেষ্টা করেছেন? আইন তো সবার জন্যই। তাহলে আমাদের ক্ষেত্রে কেন এই বৈষম্য?
পুলিশ স্টেশনের বাতাস থমথমে হয়ে আসে। সত্যি বলতে, তাদের কথার জবাব কারও কাছেই নেই। তবু নিজের ভুল ঢাকতে একজন গম্ভীর মুখে বলে,
—কি আর বলবে? নিজেদের সাফাই গাইবে? মুখের কথায় আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা প্রমাণে বিশ্বাসী।
ঠিক তখনই বাংলা স্যার সামনে এগিয়ে এসে দৃঢ় স্বরে বলেন,
—পাঁচ মিনিট সময় দিন। আগে আমি ওদের মুখ থেকে পুরো ঘটনাটা শুনব। তারপর আপনারা যা বলার বলবেন।
উনার কথার মাঝেই হন্তদন্ত পায়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে তালহা। এলোমেলো চুল, চিন্তায় ভাঁজ পড়া মুখ, গলার টাই ঢিলে হয়ে আছে, শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, হয়তো গরমে ঘেমে খুলে রেখেছে। হাতের ঘড়িটাও ঢিলে হয়ে কব্জিতে ঝুলছে। বড় বড় পা ফেলে সামনে এগোতেই তাহিয়া “ভাইয়া” বলে চিৎকার করে এক দৌড়ে ছুটে আসে।
ভাইয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে তাহিয়া। তালহা বোনকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, একই সঙ্গে দ্রুত চোখ বুলিয়ে চারপাশে কাউকে খুঁজতে থাকে। মেহরীনকে চোখে পড়তেই ভেতরে আটকে থাকা দমবন্ধ শ্বাসটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। কয়েক সেকেন্ড মেহরীনের দিকে তাকিয়ে থেকে সে তাহিয়াকে আলতো করে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নেয়। চোখজোড়া লাল টকটকে হয়ে আছে। ধীরে জিজ্ঞেস করে,
—পুলিশ স্টেশনে কি?
তাহিয়া কেঁপে উঠে মাথা নিচু করে নেয়। তালহা ঝাঁঝালো গলায় আবার প্রশ্ন করতেই তাহিয়া আবারও কেঁপে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন এগিয়ে এসে তাহিয়াকে নিজের সঙ্গে ধরে দাঁড়িয়ে যায় তালহার সামনে। তালহা মেহরীনের দিকে তাকাতেই সে চোখ নামিয়ে শান্ত গলায় বলে,
—আমরা ভুল কিছু করিনি। উনারা ভুল বুঝেছেন…
এরপর পুরো ঘটনাটা খুলে বলতে থাকে। থানার ভেতর সবাই চুপচাপ শুনছে। কথা শেষ হতেই তালহা কিছুক্ষন নিরব থেকে কপালে দু আঙুলের সাহায্যে স্লাইড করতে থাকে। এর পরপর পুলিশের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,
—গ্রেপ্তার করেছেন ওয়ারেন্ট কোথায়? কাগজ দেখি।
কিন্তু অফিসাররা একেকজন আমতাআমতা করিছে। নিকটবর্তী কাগজপত্র, ওয়ারেন্ট বা প্রমাণের কোনো কপি কিছুই নেই, কোনো লিখিত আদেশও নেই, কোনো ভেরিফায়েড প্রমাণও নেই। এককথায় তাদের কাছে মুখের কথা ছাড়া উপযুক্ত প্রমানই নেই।
তালহা ধীরে শ্বাস নিয়ে বলেন,
—অভিযোগ ছাড়া, প্রমাণ ছাড়া, ওদের কেন ধরে আনা হয়েছে কেন?
থানার ভেতরে হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। কেবল ফ্যানের শব্দ ভেসে আসে, আর পুলিশদের চোখের কপটতা, যে চাপে তারা পড়েছে, তা যেন স্পষ্ট। পুরো পরিস্থিতি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এবং সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের প্রতি অনিচ্ছাকৃত অমানবিকতা যেন খোলাখুলি চোখের সামনে।
তাদের কথার মাঝেই হঠাৎ সেই ছেলেটি বলে ওঠে,
—প্রমাণ কী? প্রমাণ তো আমরা নিজেরাই। আন্তাজি মিথ্যা বললেই হলো? আমরা দুজনেই সেখানে ঘুরতে গিয়েছিলাম। এরাই জোর করে বিয়ে করিয়েছে। এখন নিজেরাই মিথ্যা বলছে।
তালহার প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে কয়েকজন অফিসারও সেই ছেলেটির কথায় সায় দেয়। অন্যদিকে মেহরীনরা একের পর এক বলেই যাচ্ছে, তারা মিথ্যা বলেনি। চারদিক জুড়ে তর্ক-বিতর্ক, উত্তপ্ত কথা আর অভিযোগের ভিড়। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ রাফি গলা তুলে বলে ওঠে,
—প্রমাণ আমার কাছে আছে।
তার কথায় তালহা সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে থামিয়ে দেয়,
—স্টপ। রাফি, তোমার কাছে কী প্রমাণ আছে, ফাস্ট শো করো।
রাফি নিজের মোবাইল চাইলে প্রথমে তারা দিতে অস্বীকার করে। পরিস্থিতি আরও টানটান হয়ে ওঠে। তবে তালহার কড়া দৃষ্টির সামনে শেষ পর্যন্ত একজন কনস্টেবল মোবাইল এনে দেয়। রাফি সঙ্গে সঙ্গেই তখনই তোলা একটি ভিডিও প্লে করে।
ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মেয়েটি ছেলেটার পায়ের কাছে বসে কাঁদছে, আর ছেলেটা লাথি মেরে তাকে সরানোর চেষ্টা করছে। তা দেখতেই থানার ভেতর যেন তাপমাত্রা বেড়ে যায়। সবার চোখ গরম হয়ে ওঠে, দৃষ্টি গিয়ে আটকে যায় সেই ছেলে-মেয়ের দিকেই।
বাংলা স্যার তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না। কনস্টেবলদের দিকে তাকিয়ে গর্জে ওঠেন,
—এই যে প্রমাণ। এই প্রমাণগুলো যদি আগে দেখানোর সুযোগ দিতেন, তাহলে আমাদের ছেলে-মেয়েদের এত হেনস্তার শিকার হতে হতো না।
থানার ভেতর মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। কেউ কথা বলে না, সবাই মুখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর একজন অফিসার নিজেদের দোষ ঢাকতে নরম গলায় বলার চেষ্টা করেন,
—ওদের এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারকে জানানো যেত। বাল্যবিবাহ করিয়ে দেওয়া তো অপরাধ…
কথাটা শেষ করার আগেই তালহা টেবিলে জোরে হাতে বাড়ি মেরে উঠে। দাঁত খিচিয়ে বলল,
—ওরা নাহয় ছোট মানুষ। যতটুকু মাথায় এসেছে, ততটুকুই করেছে। কিন্তু আপনারা? আপনারা কি করেছেন?
এক মুহূর্ত থেমে, গলায় ভারী চাপা রাগ নিয়ে সে আবার বলে,
—এখন আপনাদের নামেই হেনস্তার অভিযোগে একটা জিডি ঠুকে দিই?
থানার ভেতরে তখন আর কোনো শব্দ নেই, শুধু চাপা শ্বাস আর চোখে জমে থাকা অস্বস্তি। একেকজন একেকজনের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে থাকে। পরিস্থিতি যখন চরমে, ঠিক তখনই থানার ভেতরে প্রবেশ করেন তনিমার বাবা, আইনমন্ত্রী। তার উপস্থিতিতেই পরিবেশ সেকেন্ডে বদলে যায়, কথার সুর নরম হয়ে আসে, চেয়ার সোজা হয়, চোখে-মুখে অস্বস্তি ভর করে অফিসারদের।
তিনি সরাসরি চিৎকার করে জানতে চান,
—ঘটনার লিখিত অভিযোগ কোথায়? গ্রেপ্তারের ওয়ারেন্ট কোথায়? প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টই বা কোথায়?
কিন্তু এই প্রশ্নগুলোর একটারও সঠিক উত্তর দিতে পারে না একজনও। উত্তর দিতে না পারায় থানার ভেতরে বেশ বড়সড় ঝড় বয়ে যায়। দায়িত্বে থাকা অফিসারদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি হেনস্তা ও তদন্ত ছাড়াই আটক, এই অভিযোগগুলো উঠে আসে। একপর্যায়ে বিষয়টি উপরমহল পর্যন্ত গড়ানোর উপক্রম হয়। তখনই পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে যায়।
সবাই যখন বুঝে ফেলে ব্যাপারটা চাকরি হারানো পর্যন্ত গড়াতে পারে। ব্যস সকলের নাচানাচি শুরু। নানান কৌশলে আকুতি মিনতি করতে থাকে। তবে কোনো কাজই হচ্ছে না। অবস্থা বেগতিক দেখে তনিমা ও বাকিরা তার বাবা আর তালহার কাছে অনুরোধ শুরু করে, “এইবার যেন কেবল কঠোর ওয়ার্নিং দিয়েই বিষয়টি শেষ করা হয়। ভবিষ্যতে এমন কাজ আবার হলে তখন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
অনেক বোঝানো, অনুরোধ এর পর শেষ পর্যন্ত তারা সম্মত হয়। লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেওয়া হয় এবং তাদের আচরণ ভবিষ্যতে পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওদিকে আটক থাকা ছেলে-মেয়েদের পরিবারকে থানায় ডেকে আনা হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করে, অভিভাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাদের। সবকিছু শেষ হতেই থানা ত্যাগ করে সবাই। থানার ভেতর তখন নিস্তব্ধতা।
গেট পেরিয়ে বাইরে এসে খোলা জায়গায় দাঁড়ায় সবাই। বাংলা স্যার তপ্ত শ্বাস ফেলে মেহরীনদের দিকে তাকিয়ে বলেন,
—মনে আছে একবার বলেছিলাম, মানুষ বড়ই স্বার্থপর। তোমরা তাদের সবটুকু দিয়ে করলেও, বিনিময়ে তারা তোমাকে একটুও করবে না।
মেহরীনরা ধীরে মাথা নিচু করে নেয়। সবাই অনুতপ্ত। তখন তো কথাটাকে তারা মজা হিসেবেই উড়িয়ে দিয়েছিল। অথচ আজ বুঝতে পারছে, সেটা কতবড় সতর্কবার্তা ছিল। সেদিন যদি কথাটা মন দিয়ে শোনা হতো, হয়তো আজ এত বড় ঝামেলায় পড়তে হতো না। পদক্ষেপ নেওয়ার আগে ভাবত একবার ঠিক-বেঠিক নিয়ে।
স্যার আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন,
—দেখলে তো আমি কেনো ক্লাসে এত ভাসন দিই? এখন প্রমাণ পেলেই তো। আমি তোমাদের মঙ্গলের জন্যই এতকথা বলি। তাছাড়া হুদাই চিল্লিয়ে আমার লাভ আছে? দুই টাকা বেতন বাড়ত? হা হা, মুটেও না। আমি ক্লাসে চিল্লিয়েও যেমন বেতন পেতাম, বসে থাকলেও তাই-ই পেতাম। তোমাদের সঙ্গে আমার কোনো ব্যক্তিগত দোষমনি নেই। কোনো শিক্ষকেরই তার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত রোষ থাকতে পারে না। আমাদের কাছে তোমরা নিজের ছেলে-মেয়ের মতো। আমরা শুধু চাই, তোমরা যেন জীবনে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা আর সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিটাই আমাদের থেকে নিতে পারো।
তারা বুঝতে পারল, স্যারের কথা নিয়ে যে মজা ও ঠাট্টা করত, তা কোনো কালেই মোটেও উচিত ছিল না। মুহূর্তেই অপরাধবোধ জেগে উঠল। নিজেরা এতদিন তারা কতটা অপরিপক্ব ছিল আর কত ভুলের মধ্যে বিচরণ করছিল, তা ভাবতেই লজ্জায় কাতর হয়ে উঠল একেকজন। সম্মানযোগ্য শিক্ষকরা, যারা তাদের সদা ভালো চেয়ে এসেছেন, অজান্তেই তারা তাদের অসম্মান করে এসেছে। এ উপলব্ধি যেন তাদের নিজের আচরণকে নিজের চরিত্রের প্রতি প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করল।
আমাদের জীবনে শিক্ষকরা কখনো অপ্রয়োজনীয় বা বেশি কথা বলেন না। তারা ঠিক ততটুকুই বলেন, যা সেই মুহূর্তে আমাদের জন্য দরকার। যেমন কলেজ লাইফ বা স্কুল লাইফ, এগুলো শুধু পড়াশোনা শেখার জায়গা নয়, একই সঙ্গে আমাদের জীবনের শিক্ষা নেওয়ারও জায়গা। তারা আমাদের শুধু বইয়ের জ্ঞান দেন না, পাশাপাশি শেখান নৈতিকতা, সঠিক ও ভুলের পার্থক্য, এবং কেমন আচরণ জীবনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে, এই গুরুত্বপূর্ণ পাঠও। মা-বাবা যেমন আমাদের পৃথিবীতে আনেন, তেমন শিক্ষকরাও আমাদের পৃথিবী চেনাতে সাহায্য করেন। তাই আমাদের উচিত প্রতিটা শিক্ষককে তাদের ন্যায্য সম্মান দেওয়া।
একে একে সবাই চলে যাচ্ছে। তনিমা তার বাবার সাথে চলে গেছে। রাফি আর ফারিনও তাদের সঙ্গে, তনিমারা তাদের বাড়ি পৌঁছে দেবে। এদিকে তাহিয়া ভাইয়ের বাম হাত ধরে এগোচ্ছে। পেছন পেছন মেহরীনও আসছে। তালহা রেগে আছে, এখনো একটা কথাও বলেনি। তাই তাহিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ভাইয়ের রাগ ভাঙানোর।
থানার মেইন গেট পেরিয়ে বের হতেই তালহা একবার পেছনে তাকায় মেহরীনের দিকে। তারপর মাথা ঘুরিয়ে সামনের রাস্তায় নজর রাখে, ডান হাতটা পেছনের দিকে আলতো করে বাড়িয়ে দেয়।
মেহরীন তালহার পায়ের দিকে চোখ রেখে একই তালে হাটছে। মনটা খারাপ, তালহা যে রেগে আছে তা স্পষ্ট। নয়তো এতক্ষনে সে হাতটা আকড়ে ধরত। ভাবনার মাঝেই হঠাৎ তালহা হাত বাড়িয়ে দেয়। মেহরীন চমকে তাকায়। কয়েক সেকেন্ড পিটপিটে চোখে তাকিয়ে থাকে। তালহা তখন আঙুল নাড়াতেই, মেহরীনের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। দ্রুত এগিয়ে এসে সে তালহার ডান হাতটি নিজের বাম হাতে ধরে। তালহাও শক্ত করে হাত আগলে নিয়ে রাস্তা পার হয়।
গাড়ির সামনে পৌঁছে তালহা নিজেই দরজা খুলে দেয়। দুজন চুপচাপ বসে পড়ে। পুরো রাস্তা তালহা আর একটাও কথা বলেনি কারো সাথে। তারা দুজনেই কাচুমাচু হয়ে বসে আছে, বুঝতে পারছে তা ঝড় আসার আগের পূর্বাভাস।
সিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে তখন সবাই উপস্থিত। গাঢ় এক চাপা উত্তেজনা ঘরজুড়ে। তাহিয়া ভয়ে ভয়ে ভেতরে পা রাখতেই তিতলি বেগম আর দেরি করেন না, ছুটে এসে মেয়েটাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কণ্ঠ ফেটে কান্না বেরিয়ে আসে তার। মেয়েকে কাছে পেয়ে যেন সব ভয়, দুশ্চিন্তা আরও একসাথে উথলে পড়েছে। বাকিরাও ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। কারও মুখে স্বস্তি নেই, সবার চোখেমুখে কঠোরতা আর চাপা ক্ষোভ।
মেহরীন একবার চারদিকে তাকাতেই সেই কঠিন দৃষ্টিগুলো তার দিকে ধেয়ে আসে। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সে ভয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। দুজন সোফায় বসতেই প্রশ্নের ঝড় শুরু হয়। একটার পর একটা, থামার নাম নেই। প্রত্যেকেই কথা বলছে, প্রত্যেকের গলায় রাগ আর উৎকণ্ঠা। কলেজ থেকে কল গিয়েছিল সরাসরি বাড়িতে। তারপর তিতলি বেগম ফোন করে সবটা ছেলেকে জানিয়েছিলেন।
এতক্ষণে তালহা মুখ খুলে পুরো ঘটনাটা খুলে বলল সবাইকে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হলো না। বরং সবাই যার যার মতো ঝারি দিতে শুরু করল।
—এত বড় সিদ্ধান্ত আমাদের না জানিয়ে নিলে কেনো? আজ যদি অন্য কোনো বিপদে পড়তে?
—তুমি কি ছোট বাচ্চা, তাহিয়া? আগে ওদের পরিবারকে জানানো উচিত ছিল। মানছি উপকার করেছো, কিন্তু উপকার করার পথটা একদমই ঠিক ছিল না।
চাচাদের এই একের পর এক ধমক মাথা নিচু করে শুনছে তাহিয়া। মেহরীন চুপচাপ বসে আছে, যেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। কখন যে তাকেও নিশানা বানানো হয়, এই ভয়টাই তার বুকের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। বেশিক্ষণ তা ভাবনায় থাকল না। ভয়টা বাস্তবেই রূপ নিল।
সব কথার মাঝেই সালমা বেগম হঠাৎ তেতে উঠলেন মেহরীনের উপর,
—খালি তাহিয়াকেই বকছ কেনো? এই মেয়েটাকে কিছু বলছ না কেনো?
বলেই মেহরীনের দিকে আঙুল তুললেন। মেহরীন যেটা আশঙ্কা করছিল, সেটাই ঘটতে দেখে আরও মিয়িয়ে যায়। সালমা বেগম রাগে কাঁপতে কাঁপতে আবার বলেন,
—এই মেয়ে আসার পর থেকেই তাহিয়ার সাহস বেড়েছে। নয়তো আমাদের মেয়ে এমন চঞ্চল ছিল না। আমাদের আয়ত্তেই ছিল।
তালহা গম্ভীর মুখে বসে থাকে। বিল্লাল সাহেব আর আফতাব সাহেব বারবার তার দিকে তাকাচ্ছেন, ছেলে রেগে উঠে কিছু বলে বসে কিনা, সেই ভয়ে। তিতলি বেগম ছোট জাকে থামাতে চেষ্টা করেন,
—এভাবে বলছিস কেনো? ভুল দুজনেরই হয়েছে। মেয়েটাকে এভাবে বলা ঠিক না, সালমা। ছোটমানুষ।
কিন্তু রিতু মুখ বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ওঠে,
—বেশি লাই দিওনা বড় মা। গ্রামের মেয়েরা এমনই হয়, সব পারে। তাহিয়াকে এই মেয়ের সাথে একা ছাড়া তোমাদের উচিত হয়নি। একদিন দেখবে, তোমাদের মেয়ের সর্বনাশ করবে এই মেয়েই।
মেহরীনের চোখ টলমল করে ওঠে। পানি যেন যে কোনো মুহূর্তে গড়িয়ে পড়বে। তাহিয়া আর সহ্য করতে পারল না। সে শক্ত করে মেহরীনের হাত চেপে ধরে দৃঢ় গলায় চেঁচিয়ে ওঠে,
—আপু যাতা-মাতা বলবে না। মেহরীন মোটেও ওমন না। ও বেস্ট তোমার থেকেও ভালো।
রিতু ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
—এখন তো এই মেয়ের সাথে উড়ছিস বলেই ভালো লাগছে। সময় থাকতে নিজেকে শুধরে নে।
তাহিয়া ক্ষুব্ধ গলায় বলে ওঠে,
—ভাইয়া, দেখো তো রিতু আপু কী সব ফালতু বকছে।
কিন্তু তালহা তখনও নিশ্চুপ। মেহরীন ভেজা চোখে একবার মাথা তুলে তাকায় তার দিকে। বুকের ভেতর হঠাৎ করেই ছোট্ট একটা আশা জেগে ওঠে। হয়তো এবার তালহা কিছু বলবে, অন্তত একটা কথা। কিন্তু অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও তার মুখ থেকে একটা শব্দও বের হয় না। সেই নীরবতা যেন মেহরীনের ভেতরটা আরও মুচড়ে দেয়। চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরতে থাকে।
ঠিক তখনই তিতলি বেগম মেহরীনের হয়ে কঠিন কণ্ঠে বলে ওঠেন,
—রিতু, আলতু-ফালতু কথা বলা কোনো ভদ্র ঘরের মেয়ের স্বভাব না। আগে নিজেকে শুধরে নে, তারপর অন্যকে শুধরাতে যাবি।
রিতু হতভম্ব চোখে তাকিয়ে থাকে তার বড় মায়ের দিকে। মুহূর্তের জন্য যেন বিশ্বাসই করতে পারে না, এই উত্তরটা সত্যিই তার বড় মায়ের মুখ থেকেই এসেছে। বুকের ভেতর কোথাও একটা কেঁপে ওঠে অহংকারে। কথাটা সরাসরি গিয়ে লাগে ইগোতে। জমে থাকা রাগ তরতর করে উপচে পড়ে, আর সেই রাগের মুখে পড়ে মেহরীন। এই মেয়ের জন্যই কি না, আবারও তাকে প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে এমন কথা শুনতে হলো। রিতু রাগে হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে থাকে, চোখে জমে ওঠে তীব্র আগুন।
ঠিক তখনই সালমা বেগম আবার মুখ খুললেন,
—ভাবি, রিতুকে এভাবে বলছ কেনো? রিতু তো খারাপ কিছু বলেনি। আর মেহরীনও যে দুধে ধোয়া তুলসি পাতা, তা-ও না। এই মেয়ের সঙ্গ পেয়েই আমাদের তাহিয়া খারাপের প্পথে যাচ্ছে দিনকে দিন। ওর পা লম্বা হচ্ছে। আগেই বলেছিলাম এই মেয়ে সুবিধার ন…
বাকিটুকু শেষ করার আগেই তালহার গর্জনে কথা আটকে যায়। নড়েচড়ে তাকান তালহার দিকে। তালহার চোখ তখন কঠিন। চোয়াল শক্ত করে সে বলে ওঠে,
—মেহরীনের নামে আর একটাও বাজে কথা যেন এই বাড়ির কারো মুখ দিয়ে না বের হয়। এটা আমার ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট ওয়ার্নিং।
মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা নেমে আসে ঘরে। যেন শব্দহীন শূন্যতায় সবাই আটকে গেছে। অবাক চোখে সবাই তাকিয়ে থাকে তালহার দিকে। মেহরীনের হয়ে তালহার এই হঠাৎ হুংকার অনেকের মনেই ভিন্ন অর্থ এনে দেয়। বাতাসে চাপা প্রশ্ন ঝুলে থাকে। অন্যদিকে মেহরীনের কান্নাভেজা মুখে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে ক্ষীণ এক হাসির রেখা। চোখের কোণে জমে থাকা জল এখনও শুকায়নি, তবু সেই ভেজা চোখেই সে মাথা তুলে তাকায় তালহার দিকে। দৃষ্টিতে তার অজান্তে জন্ম নেয় একরাশ স্বস্তি। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা একটু হালকা হয়ে আসল।
এইটুকুই তো চেয়েছিল সে তালহার থেকে। তার হয়ে অন্তত একবার দাঁড়াক, দু’টো কথা বলুক, বউ প্রকাশ্যে না হোক, অন্তত সবার সামনে তার সম্মানটুকু আগলে রাখুক।
নিস্তব্ধতা ভেঙে রিতু বলে ওঠে,
—কেনো? মেহরীনকে কিছু বললে তোমার কি?
এক মুহূর্তও দেরি না করে তালহা জবাব দেয়,
—মেহরীন আমার দায়িত্ব। আর তার সম্মান রক্ষা করাও আমার দায়িত্বেরই অংশ।
রিতুর ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের ছাপ,
—কেনো এই আজাইরা দায়িত্ব নিতে গেলে ভাইয়া? কোথাও তো লেখা নেই, তার দায়িত্ব নিতেই হবে। হুদাই বারতি ঝামেলা।
তালহা এবার মেহরীনের দিকে তাকায়। দৃষ্টি দুটো এক হতেই সে বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৪২
—তা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছে। এই দায়িত্বটা আমার ভালো লাগছে বলেই নিজের কাঁধে নিয়েছি। এতে কারো সমস্যা?
শেষের কথাটা জুড়ে গলায় বলল। কথাগুলো ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল ধীরে ধীরে। কেউ কিছু বলল না। তবে অনেকের মনেই অনেক প্রশ্ন জেগে উঠল…..
