Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৬

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৬

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৬
jannatul firdaus mithila

“ অভ্যাস করে নিন।এ-তো সবে শুরু। এবার থেকে আপনার -আমার দেখা-সাক্ষাৎ তো রোজকার ঘটনা হবে! দিস ইজ জাস্ট দা বিগিনিং!”
চিন্তায় পড়লেন তায়েফ সাহেব। সবে শুরু মানে? এ ছেলে হঠাৎ এ কথা বলছে কেনো? কী চলছে এর মাথায়?তায়েফ সাহেব থমথমে মুখে চেয়ে রইলেন একদৃষ্টিতে। মুগ্ধ ঠোঁট পিষে ক্রুর হাসলো। শার্টের বোতামে লাগিয়ে রাখা চশমাটা খুলে এনে আটঁলো চোখ বরাবর। অতঃপর ডানহাতের দু-আঙুলের মাঝে ধরে রাখা সিগার-টা ফের ঠোঁটের ভাঁজে চেপে পা বাড়ালো চলে যাবার উদ্দেশ্যে।এদিকে তায়েফ সাহেব কঠোর চোখে তাকিয়ে রইলেন। হয়তো মনে মনে ভাবছেন — ছেলেটা কী পরিমাণ বেয়াদব!

বাড়ির ড্রয়িং রুমে সারি সারি করে সাজিয়ে রাখা ব্যাগ-পত্র।ড্রাইভার মফিজ এসে একেক করে গাড়িতে তুলছে সব। সিড়ি বেয়ে ধুপধাপ পা ফেলে নামছে অনিক। একহাতের কব্জিতে বাঁধছে কালো রঙা ঘড়ি। সুদর্শন যুবক একেবারে ফিটফাট।তার পিছুপিছু ধীর পায়ে নামছে ইকরা।চোখেমুখে লাজুক ভাবসাব। অনিক কী মনে করে একবার ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকায়। পরক্ষণে ইকরার সনে চোখাচোখি হওয়ায় মুচকি হাসলেন মহাশয়। চোখের ইশারায় বোঝালেন অন্যকিছু।ঠোঁটের ভঙ্গিতে দেখালেন উড়ন্ত চুমু।তা দেখামাত্রই লজ্জা বাড়লো ইকরার। মেয়েটা পারেনা লজ্জায় মিইয়ে যেতে। অনিক হাসলো।তক্ষুনি পথ আঁটকে দাঁড়ালো প্রিয়তমার।ইকরা পায়ের গতি থামিয়ে হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে রইলো। ইশারায় জিজ্ঞেস করল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ কি হলো?”
অনিক নিশ্চুপ! প্রগাঢ় চাহনিতে মেয়েটাকে দেখে যাচ্ছে আপাদমস্তক। ইকরার নাকের পাটা ক্রমশ লাল হচ্ছে। কপাল ঘামছে একটু-আধটু। লোকটা কেনো হুটহাট এমন গাঢ় চাহনিতে আটকে ফেলে তাকে? সে-কি জানেনা,তার ওমন চাহনির কবলে পড়লে বুক কাঁপে তার! ইকরা মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনিক কদম বাড়িয়ে এক সিঁড়ি ওপরে উঠে দাঁড়ায়। হাত উঁচিয়ে মেয়েটার মুখের ওপর থেকে অবাধ্য এলোমেলো চুলগুলোকে খানিক সরিয়ে দিয়ে দুষ্ট কন্ঠে বললো,

“ যাওয়া অব্ধি তো তর সইছে না সুন্দরী! ভাবা যায়, কী পরিমাণ অধৈর্য্য হলাম আমি?”
ইকরা লাজুক হাসলো। নুইয়ে রাখা মাথাটা আরও খানিকটা নুইয়ে গেলো এরূপ কথায়। ওদিকে সরু করিডর দিয়ে গটগট পায়ে এগিয়ে আসে রৌদ্র। সিঁড়ির আগায় পা রাখতেই ভ্রু-যুগল কেমন কুঁচকে আসে তার। গম্ভীর যুবক তৎক্ষনাৎ অন্যত্র চোখ সরিয়ে মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে ওঠে। তা শোনামাত্রই অনিক বেচারা তক্ষুনি সরে গেলো দু-কদম। ভড়কে গিয়ে তাকালো সিঁড়ির ওপরে। দেখে রৌদ্র কেমন মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে অন্যত্র দৃষ্টি ফেলে।রৌদ্র সময় নিলো সামান্য। গম্ভীর মুখে হঠাৎ বলল,

“ আমাদের মতো সাধারণ জনগনকে নাহয় একটুখানি সাইড দিয়ে বাধিত করুন।”
লজ্জায় মরি মরি অবস্থা ইকরার।মেয়েটা তক্ষুনি ব্যস্ত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলো হুড়মুড়িয়ে। অনিক আমতা আমতা করছে কেমন।রৌদ্র ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তার পানে। প্রথম প্রথম ভ্রু কুঁচকে রইলেও এখন কেমন মুখ টিপে হাসছে সে।অনিকের নজর এড়ায়নি তা। ছেলেটাও পরমুহূর্তে যোগ দিলো ভাইয়ের সঙ্গে। উল্টো দিকে তাকিয়ে থেকে হাসতে লাগলো আনমনে।

সকাল থেকেই বড্ড অস্থির রুহি। গা-টা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে তার।দুপুরের খাবারটাও খেয়েছে কোনরকম। রেহানের আজ বেশ গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হওয়ায় বউভক্ত সুদর্শন পুরুষ ভীষণ অনিহা থাকা স্বত্বেও ছুটেছেন অফিসের উদ্দেশ্যে।তা নাহলে তাকে কেউ ঠেলে সরাতে পারে বউয়ের কাছ থেকে? রুহি পুরো ঘরময় পায়চারি চালাচ্ছে।দাঁত দিয়ে ডানহাতের নখ খুঁটে যাচ্ছে একাধারে। নাহ! তবুও মনের অস্থিরতা কমবার নাম নেই তার। রুহি এবার ঠিক করলো মায়ের কাছে গিয়ে একটুখানি বসবে।এতে যদি খানিকটা অস্থিরতা কমে তার!

নিচ তলার গেস্ট রুমে থাকছে রুহি। প্রেগ্ন্যাসির এই অন্তিম সময়ে ওতো কষ্ট করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থোড়াই দিবে কেউ? আটমাসের উঁচু পেটটা ধরে ধরে ধীরপায়ে হাঁটছে রুহি।ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই তার চোখ যায় অদূরে দাঁড় করিয়ে রাখা লাগেজ গুলোর পানে। রুহি সেসবে তেমন কোনো পাত্তা না দিয়ে মায়ের ঘরের দিকে আসে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটু-আধটু উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখে নেয় ঘরের পরিবেশ। ভেতরে জুবাইদা বেগম বিছানা গোছাচ্ছেন।মানুষটার আবার এ এক জ্বালা! বিছানার চাদর যতক্ষণ না পর্যন্ত টানটান হবে ততক্ষণ অব্ধি বিছানায় বসতে পারেননা তিনি। রুহি দুয়ারের দ্বারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থেকে মুচকি হাসলো মায়ের কান্ড দেখে।হঠাৎ করেই মেয়েটা কেমন পা টিপে টিপে প্রবেশ করলো ঘরে। একমনে কর্মরত জুবাইদা বেগমের আশেপাশে তেমন হুঁশ নেই। এ সুযোগটাই বোধহয় কাজে লাগালো রুহি।নিঃশব্দে মায়ের একদম পিছু এসে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করেই চেচিয়ে উঠে বলল,

“ ভোওওওও!”
হকচকিয়ে ওঠেন জুবাইদা বেগম। ❝ আল্লাহ গো ❞ বলে দিয়ে বসেন আরেক চিৎকার।হাতের বিছানা ঝাড়ুটা কেমন অবহেলায় গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে। বেচারি তৎক্ষনাৎ পেছনে ফিরেন। আতঙ্কে চোখমুখ ফ্যাকাশে বনে গেছে তার।ওদিকে রুহি কেমন পেট ধরেই হেসে কুটোকুটি খাচ্ছে। জুবাইদা বেগম দাঁত কিড়মিড় করছেন। মন তো চাইছে মেয়েটাকে এক ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিতে, তবে মাতৃসূলভ মন তার পরক্ষণেই কেমন দমে গেলো মেয়ের ওমন উপচে পড়া হাসি দেখে।জুবাইদা বেগম নিজেও ফিক করে হেসে ওঠেন। মেয়ের মাথায় আলতো করে চাটি বসিয়ে মৃদু বকুনির সুরে বললেন,

“ মানুষ হবি না কোনোদিন তাই-না?”
রুহি হাসতে হাসতেই ডানে-বামে মাথা নাড়ায়। মায়ের হাতটা টেনে ধরে বসায় বিছানার একপাশে। পরমুহূর্তে নিজেও বসলো মায়ের পাশে। মায়ের কাঁধে আলতো করে মাথা রেখে মেয়েটা কেমন পরম শান্তিতে চোখ মুদলো একটুখানি। জুবাইদা বেগম মুচকি হেসে মেয়ের মাথা বরাবর আদুরে পরশ একেঁ দিলেন। একহাতে আলতো করে মেয়েকে জড়িয়ে ধরতেই হঠাৎ করে বুকটা কেমন কেঁপে ওঠে তার! আশ্চর্য! এতক্ষণ হাসি-তামাশার পর হুট করেই বুক কাঁপছে কেনো তার? জুবাইদা বেগম নিজের ওমন ভাবনায় কেমন চিন্তিত হয়ে পড়লেন। মেয়ের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বিচলিত কন্ঠে বললেন,

“ তোর কি কিছু হয়েছে?”
এতক্ষণ অস্থির লাগলেও এখন মনটা বড্ড শান্ত হয়েছে রুহির।তাইতো সে একগাল হেসে বলে ওঠে,
“ কই নাতো!”
জুবাইদা বেগমের মন মানলোনা কেন যেন।হঠাৎ এমন অস্থিরতার কারণ কী? তিনি খানিক দোনোমোনো করে বসা ছেড়ে উঠে বসেন। রুহির পানে না তাকিয়েই গম্ভীর মুখে বললেন,
“ তুই বস, আমি আসছি!”
বলেই তিনি কদম বাড়ালেন সামনে। তবে ঠিক তখনি পেছন থেকে তার শাড়ির আঁচল টেনে ধরে রুহি। জুবাইদা বেগম থমকান। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখেন — রুহিটা কেমন হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে তার পানে। জুবাইদা বেগমের দৃষ্টি থমকায়।মেয়েটার চেহারায় আজ ওমন অদ্ভুত প্রকারের মায়া দেখাচ্ছে কেনো? হাসিটা একদম ছোটবেলার ন্যায় প্রাণবন্ত। মনে হচ্ছে — এইতো, সামনে বসে থাকা মেয়েটা তার সেই ছোট্ট রুহি! মানুষটা যখন নিজ ভাবনায় নিমগ্ন ঠিক তখনি তার কানে ভেসে আসে রুহির অদ্ভুত আবদার।

“ আম্মু! আমার বুকটা কেমন যেন জ্বলছে। আমায় একটু জড়িয়ে ধরবে প্লিজ?”
জুবাইদা বেগমের বুকটা আরেক দফা কেঁপে উঠল যেন। তিনি তৎক্ষনাৎ দু’হাত ছড়িয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন বুকের সঙ্গে। রুহিও ঝাপটে ধরে মা’কে। মায়ের নরম বুকে নাক ঘষে ঘ্রাণ নেয় প্রাণভরে। আশ্চর্য! আজ হঠাৎ মায়ের শরীরের ঘ্রাণটা এতো টানছে কেনো তাকে? কেনো বারবার মনে হচ্ছে কিছু একটা হবে? কেনো মা’কে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে তার? জুবাইদা বেগম স্পষ্ট টের পেলেন মেয়ের হাতের বাঁধন শক্ত হচ্ছে ক্রমশ। তিনি আলতো করে মেয়ের মাথায় হাত বুলালেন। চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

“ কি হয়েছে মা?”
রুহি নাক ঘষছে মায়ের বুকে। কেন যেন চোখদুটো ভরে আসছে তার।ইচ্ছে করছে মা’কে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদতে। কেন যে হুটহাট এমন লাগে তার কে জানে! রুহি মোটা স্বরে প্রতিত্তোরে বলে,
“ আমাকে একটু সাজিয়ে দিবে মা? ছোটবেলায় যেমন মাথার দুপাশে দুটো বিনুনি গেঁথে দিতে,হাতে-পায়ে আলতা পরিয়ে দিতে।ঠিক সেভাবে! দিবে কী মা?”
জুবাইদা বেগম আনমনেই হ্যা বললেন। রুহি হাসলো তা শুনে। চটপট মা’কে ছেড়ে দিয়ে পা উঠিয়ে বসলো বিছানায়। জুবাইদা বেগম মুচকি হাসলেন মেয়ের ওমন পাগলামো দেখে। তিনি তক্ষুনি পা চালালেন ড্রেসিং টেবিলের দিকে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে চলে এলেন মেয়ের কাছে।মেয়েকে সাজাবেন আজ অনেকদিন পর! এটা কী কম আনন্দের?

প্রায় আধঘন্টা পর সাজানো শেষ হলো জুবাইদা বেগমের। সব কাজকর্ম সেরে মানুষটা একপলক তাকালেন মেয়ের পানে। মাথাভর্তি এলোমেলো কাকের বাসার ন্যায় চুলগুলোতে তেল দিয়ে টেনে বেঁধে দিয়েছেন দু’টো বিনুনি। বিনুনি গেঁথেছেন মোটা ফিতা দিয়ে। মেয়ের আদুরে সুশ্রী মুখখানায়ও দিয়েছেন হালকা প্রসাধনীর ছাপ।টানা টানা চোখদুটোতে দিয়েছেন মোটা করে কাজল। মেয়ের কথামতো তার হাতে-পায়ে দিয়ে দিয়েছেন আলতা। পায়ে পরিয়ে দিয়েছেন ছোটবেলার নুপুরখানা। এতেই যেন বড্ড আদুরে লাগছে মেয়েটাকে।জুবাইদা বেগম মনে মনে মাশাআল্লাহ বললেন বেশ কয়েকবার। এগিয়ে এসে আলতো করে চুমু বসালেন মেয়ের ললাটে। মুচকি হেসে বলেন,
“ সাজ পছন্দ হয়েছে কি-না দেখতো!”
রুহি আয়নায় দেখলোনা নিজেকে। আসলে প্রয়োজনই তো পড়েনি তার।সে-তো উল্টো মা’কে জড়িয়ে বলল,
“ তুমি সাজিয়ে দিয়েছো বলে কথা! খারাপ তো হতেই পারেনা!”

“ জবা! ওরা বেরুচ্ছে তো। দেখা দিবি না? আয় আয়!”
রাফিয়া বেগমের ওমন তাড়া দেওয়ায় জুবাইদা বেগমের হুঁশ ফিরলো এতক্ষণে। তিনি তৎক্ষনাৎ জিভে দাঁত কেটে মেয়েকে ছেড়ে বললেন,
“ দেখলি কান্ড! ছেলেমেয়ে গুলো বেরোবে অথচ আমি কি-না ঘরে বসে আছি। আচ্ছা তুই থাক এখানে মা,আমি তোর ভাইদের কে বিদায় দিয়ে আসি কেমন?”
রুহি নিজেও বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলে,

“ চলো আমিও যাবো।”
জুবাইদা বেগম আর বারণ করলেন না।মেয়ের সাথে সাথে নিজেও পা বাড়ালেন বাইরে। রুহি ধীরেসুস্থে পিছুপিছু হাটঁছে। মায়ের রুম ছেড়ে ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়াতেই অনিক এসে আলতো করে আগলে ধরে বোনকে। রুহির একহাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে নরম কন্ঠে বলে,
“ আস্তে আস্তে আয়!”

রুহি হাসলো একটুখানি। অনিকের হাত ধরেই চলে এলো সোফার কাছে। শরীর খুব একটা সায় না দেওয়ায় বসে গেলো সোফার এককোণে। এরইমধ্যে ড্রয়িং এ এসে হাজির হলো রৌদ্র। একহাতে ধরে রেখেছে অরিনের হাত। অরিনের চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে আছে লজ্জালু ভাব! ইশশ্!এ নিয়ে কতবার হানিমুনে গেলো সে? আর কেউ না জানুক, সে-তো জানে। আহারে! এসব ভাবতেই মেয়েটা কেমন লজ্জায় মূর্ছা যাচ্ছে। এদিকে রৌদ্র একেবারেই নির্বিকার। মেয়েটার হাত ছেড়ে দিয়ে চলে এলো বোনের কাছে। হাত উঁচিয়ে বোনের মাথায় আদুরে পরশ দিয়ে বলতে লাগলো,

“ চ্যাম্পের কী অবস্থা?”
রুহি ঠোঁট উল্টায়। ভাইয়ের কাছে বিচার দেওয়ার সুরে বলে,
“ তোমার চ্যাম্প নিশ্চয়ই বড় হয়ে ফুটবলার হবে ভাইয়া! এখনি যা কিক দিচ্ছে!”
রৌদ্র স্মিত হাসলো। খানিকটা নুইয়ে ভর রাখলো হাঁটুদ্বয়ের ওপর। বোনের পেটের সামনে মাথা এনে চাপা স্বরে বলতে লাগলো,
“ আসসালামু আলাইকুম চ্যাম্প! কি অবস্থা আপনার?ঐটুকু জায়গায় দিনকাল কেমন যাচ্ছে?”
কথাটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই রুহি কেমন মুখ কুঁচকে ব্যাথাতুর শব্দ করে বসে,
“ আউচ!”
রৌদ্র চমকে তাকায় বোনের মুখপানে। চিন্তিত কন্ঠে বলে,

“ বুড়ি! আর ইউ ওকে?”
সোফায় বসেই কাতরাচ্ছে রুহি। মুখ কুঁচকে বলে,
“ আর ওকে! তোমার চ্যাম্প তোমার কথা শোনামাত্রই কিক দিয়েছে আরেকটা! উফফ!”
ড্রয়িং ভর্তি মানুষজন মুখ টিপে হাসছে।রৌদ্রও হাসছে তবে নিঃশব্দে। সে সময় নিয়ে সটান হয়ে দাঁড়ায়। ঘাড় বাকিয়ে অনিকের পানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে ওঠে,
“ গাড়িতে সব উঠিয়েছিস?”
“ হ্যা ভাইয়া! অল সেট।এবার আমাদের বেরোনোর পালা।”

রৌদ্র মাথা নাড়ায়। একপা আগাতেই পেছন থেকে রুহি কেমন চটপট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলো,
“ ভাইয়া শোনোনা।আসার সময় আমার জন্য আচার…”
বাকিটা বলার আগেই রুহির চোখের সামনে কেমন আধার ছড়িয়ে গেলো।হুট করে বসা ছেড়ে উঠলে তো এমন হবেই! রুহি মাথা ধরে হেলছে খানিকটা। তাল সামলাতে না পেরে পাশে হেলে পড়তে নিলেই রৌদ্র তৎক্ষনাৎ আগলে ধরে বোনকে। ঝাপটে ধরে নিজের সঙ্গে। ধীরে ধীরে নিজেকে সামলায় রুহি। চোখের সামনে সবটা আবারও সুস্পষ্ট হতেই সে চোখ তুলে চাইলো ভাইয়ের দিকে। আলতো হেসে বললো,

“ আমি ঠিক আছি ভাইয়া!”
রৌদ্রের মুখাবয়ব যথেষ্ট গম্ভীর। সে রয়েসয়ে বোনকে সোজা করে দাঁড় করায়। বোনের দিকে না তাকিয়েই গলা উঁচিয়ে বলে ওঠে,
“ অনিক! আমার ব্যাগপত্র সব নামিয়ে নিয়ে আয়।আমি যাবো না।”
চকিত দৃষ্টি ফেলে রুহি। দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে অপরাধীর সুরে বলে,
“ না না ভাইয়া! আমি একদম ঠিক আছি দেখো।তুমি প্লিজ যাওয়াটা ক্যানসেল করোনা।”
রৌদ্র কী আর শুনছে কারো কথা? সে উল্টো হাত বাড়িয়ে আনলো বোনের গালের ওপর। চাপা কন্ঠে মৃদু ধমকের সুরে বলল,

“ হুঁশ! ভাইয়া তোকে ছেড়ে কোত্থাও যাবোনা বুড়ি।এমুহূর্তে আমার তোর কাছে থাকাটা সবচেয়ে বেশি জরুরী!”
রুহি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো ভাইয়ের দিকে। বাকিরাও কেমন বিমোহিত দর্শক। অনিক আগ বাড়িয়ে বলল,
“ ভাইয়া! তাহলে আমি থাকবো বাসায়।”
এহেন কথা শোনামাত্রই পেছনে ফিরে রৌদ্র। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“ না অনিক! চাচ্চু অনেক শখ করে এসব এরেজমেন্ট করেছে।আমরা কেউ না গেলে সে নিশ্চয়ই কষ্ট পাবে।এরচেয়ে বরং তুই যা।আমিতো আছি এখানে!”

অগত্যা এহেন যুক্তিতে দমে গেলো অনিক।ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে মেনে নিলো ভাইয়ের কথা। রৌদ্র আবারও বোনের দিকে তাকায়। মুচকি হেসে বোনের মন ভালো করার উদ্দেশ্যে বলে,
“ কি খাবে আমার বুড়ি? আচার? চকলেট? না-কি অন্যকিছু?”
তৎক্ষনাৎ ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো রুহির।মেয়েকে কেমন আবদারের সুরে ভাইকে বলল,

“ ফুচকা খাবো!”
“ কিহ! এই সময় এসব?”
চেচিয়ে কথাটা বললেন জুবাইদা বেগম। তা শুনে রুহি কেমন ঠোঁট উল্টায় বাচ্চাদের মতো। ভাইয়ের দিকে তাকায় কাঁদো কাঁদো মুখে। আহারে! বোনের ওমন মুখভঙ্গি দেখে গলে গেলেন ডাক্তার সাহেব। খানিকটা মাথা চুলকে বললেন,
“ আচ্ছা! আমি নাহয় বাড়িতেই বানিয়ে দিচ্ছি! খেতে পারবি তো?”
রুহি যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার ন্যায় খুশি হলো।মেয়েটা তৎক্ষনাৎ নেচে-কুঁদে বলল,
“ আলবাত পারবো!”

বিকেল নাগাদ বাসায় এসেছে ইফতি।যাওয়ার আগে বোনকে একটুখানি দেখার জন্যই বোধহয় এসেছেন জনাব। অনিক বিদায় নিয়েছে এইতো মিনিট বিশেক হবে। তবে ইফতি এখনো রয়ে গিয়েছে এ বাড়ি।রৌদ্র থাকতে বলেছে তাকে। ছেলেটা আবার বোনের জন্য নি হাতে ফুচকা বানাচ্ছে কি-না! সেই সুবাদেই থাকতে বলেছে ইফতিকে।
পড়ন্ত বিকেল।গোধূলির শেষ লগ্ন এসে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে আকাশটায়। মাহি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ছাঁদের কার্নিশ ঘেঁষে। চোখে চশমা খুলে হাতে রাখা। মাহি দূর আকাশের পানে চোখ রেখে কেমন আনমনে হাসছে।চশমা ছাড়া সব ভিউই কেমন এস্থেটিক! এককথায় ঝাপসা! মাহি নিজের ওমন চিন্তা ভাবনায় নিজেই হাসছে। এরইমধ্যে ছাঁদের দরজার কাছ থেকে ভেসে আসে তার বেশ পরিচিত পুরুষালী কন্ঠ!

“ কি করছো এখানে?”
ইফতির কন্ঠ পেয়ে তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে বসলো মাহি। চোখে পড়লো হাতের চশমাটা। ইফতি সময় নিয়ে চলে আসে ছাঁদের কার্নিশে।মাহির থেকে দু’হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে চোখ রাখলো দূর আকাশে। মাহি তৎক্ষনাৎ নিজ থেকে সরে গেলো আরেক-কদম। দৃষ্টি তার আগের ন্যায়। কিয়তক্ষন নিরবতা চললো দু’জনার মাঝে।নিরবতা ভাঙলো ইফতির চমৎকার কন্ঠে,

“ কেমন যাচ্ছে দিনকাল? আগের মতো লাইব্রেরীতে যাচ্ছো না না-কি?”
মাহি নির্বিকার। নির্বিঘ্নে গম্ভীর কন্ঠে জবাব দেয়,
“ ইদানিং বাইরে বের হতে খুব একটা ভালো লাগেনা।”
ইফতি হঠাৎ পাশে ফিরলো। চমৎকার হেসে সন্দিহান গলায় বললো,
“ এ বয়সে ভালো লাগে না নামক রোগটা অবশেষে তোমাকেও ধরলো!”
মাহি হাসলো। দূর আকাশে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,
“ ধরেছে তো বহু আগেই! তবে তা প্রকাশ পায়নি কখনো।”
ইফতি ভ্রু উঁচায়।দৃষ্টি অন্যত্র ফেলে বলে,
“ একটা কথা জিজ্ঞেস করব মাহি?”
মাহির নির্লিপ্ত উত্তর,

“ করুন!”
ইফতি খানিক সময় নিলো। দোটানায় জিজ্ঞেস করল,
“ আমায় ভালোবাসো?”
মাহির বোধহয় কিছুটা থমকানোর কথা ছিলো।তবে মেয়েটা কেমন ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো শান্তভাবে। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে ঠান্ডা হাসির রেশ। মেয়েটা ঠান্ডা স্বরেই বলল,
“ এমনটা তো ভেবে দেখিনি কখনো!”
ইফতি এবার সত্যি সত্যিই দোটানায় পড়লো।গলায় গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে ফের জানতে চাইলো,
“ সিরিয়াসলি বলছি! ভালোবাসো আমায়?”

মাহি ঘুরেও চাইলোনা ইফতির পানে।উল্টো অপলকভাবে অদূর আকাশপটে স্থির দৃষ্টি ফেলে অকপটে বলল,
“ অন্যের নামে লেখা মানুষকে, শুধু শুধু যেচে পড়ে ভালোবাসতে যাবো কেনো বলুনতো?”
মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইফতি। ভাবছে অন্যকিছু। মাহি আর দাঁড়াতে পারলোনা সেথায়। চুপচাপ পা বাড়ালো চলে যেতে। তবে কি একটা মনে করে সে তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো। ছোট বয়সেও যথেষ্ট গম্ভীর কন্ঠে অকপটে বলল,
“ এক জীবনে আমাদের এ দুনয়নে অনেককেই ভালো লাগে জনাব।তাই বলে সেসবটাই কী ভালোবাসা? ভালোবাসা আপেক্ষিক তত্ত্ব। একবার যার জন্য এ মনে উদয় হয় তা সারাজীবন বয়ে যেতে হয় নির্বিশেষে। আপনি শুধু এতটুকু জেনে রাখুন — আপনি আমার জীবনের প্রথম ভালো লাগা হলেও ভালোবাসা হতে পারেননি। হলে নিশ্চয়ই আপনাকে এতো সহজে ভুলতে পারতাম না আমি!”

কেঁপে ওঠে ইফতি।চমকে তাকায় মাহির পিঠ বরাবর। তবে তার ধারণা সত্যি ছিলো।মাহিও একটা সময় পছন্দ করতো তাকে!
মাহি আর দাঁড়ায়না। লম্বা একটা নিশ্বাস ফেলে গটগট পায়ে প্রস্থান ঘটায় ছাঁদ থেকে। ইফতিও বিষন্ন মুখে পা ফেললো চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।তবে ছাঁদের দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই পাদু’টো আঁটকে গেলো তার।কানদুটো সজাগ হলো ওমনি। সে ধীরেসুস্থে ঘাড় বাকিয়ে দরজার পাশে তাকায়।ওমনি তার নজর আটকায় আহিরার দিকে। মেয়েটা কেমন হতভম্বের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখদুটো লাল টকটকে হয়ে এসেছে কেন যেন। ইফতি তড়িৎ এগিয়ে এসে বিচলিত কন্ঠে বলে,

“ আহি! তুমি এখানে?”
ছলছল চোখজোড়া ওপরে তুলে আহি।ভড়কায় ইফতি। কন্ঠস্বর আঁটকে যাচ্ছে তার। আহি কেমন থেমে থেমে ভাঙা কন্ঠে বলল,
“ এমনটা নাহলেও পারতো! কিছু কিছু সত্যি নাহয় আড়ালেই থাকতো।”
প্রতিত্তোরে কেবল মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইফতি। কি বলবে সে? জানলোই তো আজ!

দোতলার ঘরের সম্পূর্ণ আলমিরা জুড়ে সারি সারি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে আচারের বৈয়ম। তা আনতেই সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে দোতলায় এসেছে রুহি।দু’হাতে দু’টো আচারের বৈয়ম ধরে ধরে সরু করিডরে হাঁটছে ধীরপায়ে। কিয়তক্ষন হাঁটতেই পিঠ ধরে এসেছে বেচারির।উপায়ন্তর না পেয়ে সে তৎক্ষনাৎ একটা বৈয়ম নিচে রেখে আরেকটা নিয়ে হাঁটতে লাগলো কোনরকম। আচার দেখতেই লোভ সামলানো দায় তার।তাইতো কোনরূপ কালবিলম্ব না করে, বৈয়মের ঢাকনা খুলে আচারের ভেতর হাত ডুবিয়ে খেতে লাগলো রুহি। তেঁতুলের আচার! টকমিষ্টি-ঝালের দারুণ কম্বিনেশন। প্রতিটা বাইট মুখে যেতেই তন-মন কেমন শিরশির করছে তার।রুহি বেশ আনন্দ নিয়ে খাচ্ছে আচার। ধীর পায়ে একটু একটু করে চলে আসে সিঁড়ির কাছে। এরইমধ্যে ডাইনিং পেরিয়ে রুমে যাচ্ছিলেন জুবাইদা বেগম। ওমনি সিঁড়ির ওপরে মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকালেন তিনি। তড়িৎ কন্ঠ উঁচিয়ে বললেন,

“ রুহি! তুই দোতলায় কি করছিস?”
আঁতকে ওঠে রুহি।মায়ের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ায় পরপর বারকয়েক শুকনো ঢোক গিললো মেয়েটা। আচারের বৈয়মে হাত ডুবিয়ে রেখে বলল,
“ ইয়ে মানে… ঐ আরকি!”
জুবাইদা বেগমের দৃষ্টি পড়লো মেয়ের হাতের পানে। আচার দেখেই তিনি কেমন ধমকের গলায় বললেন,
“ আমাকে বললে আমি এনে দিতে পারতাম না তোকে? নিজে থেকে এতো পাকনামি করতে বলেছে কে?”
রুহি ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে আছে। পরক্ষনে মায়ের ওমন রাগী মুখ দেখে সে কেমন খিলখিল করে হেসে ওঠে এক কদম ফেলে সিঁড়ির ওপর। তা দেখে জুবাইদা বেগম ফের সতর্ক কন্ঠে বললো,

“ এই মেয়ে! সিঁড়ি দেখে নাম,নাহলে কিন্তু পা পিছলে পড়বি!”
মায়ের ওমন বক্তব্যে সর্তক হলো রুহি।আচারের বৈয়ম থেকে এক পিস আচার নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সিঁড়ির ওপর। এদিকে তার হাত বেয়ে গড়িয়ে পরছে আচারের তেল। তা গিয়ে পরছে সিড়িঁর ওপর। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই মেয়েটার! সে-তো ব্যস্ত বচার খেতে। চোখদুটো বুঁজে রেখে কী সুন্দর মজা মজা করে আচার খাচ্ছে। জিভ দিয়ে তুলছে টুক-টুক শব্দ। জুবাইদা বেগম আরও কিছু বলতে উদ্যোত হবেন এমন সময় তার ফোনটা কেমন কর্কশ শব্দ তুলে বেজে উঠল ঘরে। তিনি না চাইতেও পা বাড়ালেন ঘরের দিকে। যাওয়ার আগে অবশ্য মেয়েকে সাবধান করে বলে গিয়েছেন,

“ একপা-ও নড়বিনা আমি না আসা অব্ধি!”
রুহি কেবল মাথা কাত করলো। ভীষণ আনন্দের সাথে আচার খাওয়ার মাঝে বাগড়া দিতে হঠাৎ করে তার ফোনেও কল এলো।রুহি বেজায় বিরক্ত হলো।চোখমুখ কুঁচকে কোমরের কাছ থেকে বের করে আনলো ফোনটা। ফোনের স্ক্রিনে চোখ পড়তেই দেখে — রেহানের ভিডিও কল।মুহুর্তেই সকল বিরক্তি কেটে গেলো মেয়েটার। সে কেমন হাসিমুখে তৎক্ষনাৎ রিসিভ করে কলটা। ওপাশে রেহান গাড়ি চালাচ্ছে। ছেলেটার চোখেমুখে উপচে পড়া আনন্দ। তা দেখে রুহি কেমন সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,

“ কী ব্যাপার মিস্টার? এতো খুশি খুশি লাগছে যে?”
রেহান গাড়ির স্পিড কমিয়ে আনলো। গালভর্তি হাসি টেনে বলতে লাগলো,
“ বউ!দেয়ার ইজ আ গুড নিউজ ফর ইউ! আমি আমার নতুন প্রজেক্টটা পেয়ে গেছি! উফফ…এবার সবকাজ শেষ আমার।এখন থেকে সারাদিন তোমার আর পুঁচকো সোনার সাথে সময় কাটাবো।ইশশ্! ভাবতেই বেশ লাগছে বউ!”
স্বামীর এহেন আনন্দে বিমোহিত রুহি। নিজেও কেমন গদগদ কন্ঠে আবদার জুড়ে বলে ওঠে,
“ কংগ্রাচুলেশনস জামাই! এবার আসার সময় মনে করে আমার জন্য ছানা মিষ্টি নিয়ে আসবে কিন্তু। না আনলে বাড়িতে ঢুকতে দিবোনা বলে দিলাম!”
রুহির ওমন গাল ফোলানো দেখে মুচকি হাসলো রেহান। স্টিয়ারিং এ হাত রেখেই মাথা নাড়ায় ওপর নিচ।আজ্ঞাকারী কন্ঠে বলে,

“ যো হুকুম শ্যামবতীর!”
রুহি খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখেই একপা রাখলো সিঁড়ির ওপর। তখনই ঘটলো আরেক অঘটন! সিঁড়ির ওপর পড়ে থাকা ফোঁটা ফোঁটা আচারের তেলে পা পিছলে সিঁড়ি থেকে উল্টে গেলো সে।মুহুর্তেই এক বিকট চিৎকারে থমকে যায় চারপাশ! আর্তচিৎকারে ভেসে আসে,
“ মা!!!!”
রেহান থমকায়।একমুহূর্তের জন্য ভুলে যায় তার অবস্থান। ছেলেটা কেমন ভয়ার্ত কন্ঠে চেচিয়ে বলে,
“ বউ!বউ!”
দু’টো ডাক বোধহয় বেরুলো তার মুখ থেকে। ওপাশের স্ক্রিন তখনো বন্ধ। কলও কেটে গিয়েছে ইতোমধ্যে। রেহান হাত উঁচিয়ে ফোনটা ধরতেই কোত্থেকে যেন উল্টো পথে ছুটে আসে এক বিরাটকার ট্রাক।পরক্ষনেই সে ট্রাক এসে ধাক্কা বসায় রেহানের গাড়িতে।সেকেন্ডের ব্যাবধানে ট্রাকের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো রেহানের গাড়ির। মুহুর্তেই উল্টে গেলো ছোট আকারের গাড়িটা। গড়িয়ে গেলো কনক্রিটের রাস্তার ওপর দিয়ে। অতঃপর ফোনের এপাশেও শোনা গেলো বিপ বিপ শব্দ!

ওদিকে, রুহি গড়িয়ে পড়ছে সিঁড়ি বেয়ে। তার ওমন আত্মচিৎকার কানে যেতেই সকলে যে যার মতো একপ্রকার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে বাইরে। রৌদ্রও ছুটে এলো তক্ষুনি। জুবাইদা বেগম ছুটে এসে ঘর থেকে বেরুতেই তার পায়ের ধারে এসে ছিটকে পড়লো মেয়ের আলতা রঙা পাদু’টো। জুবাইদা বেগম থামলেন। ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে আতঙ্কিত চোখে তাকালেন পাদু’টোর দিকে। এখন আর আলতার রঙ নেই সেথায়।আলতার সাথে র*ক্ত লেপ্টে গিয়ে রঙ ধরিয়েছে প্রগাঢ়। জুবাইদা বেগম এবার নিজেও বুক ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠেন। তৎক্ষনাৎ মেঝেতে লুটিয়ে থাকা মেয়ের নিথর দেহটা বুকে টেনে কাঁপতে কাঁপতে ছেলেকে ডেকে বললেন,

“ আব্বা আমার মেয়ে! ও আব্বা, আমার মেয়ে!”
রৌদ্র তক্ষুনি ছুটে এসে দাঁড়ালো বোনের সামনে। পুরো মেঝেতে লেপ্টে গিয়েছে র*ক্ত। মেয়েটার মুখটাও কেমন লেপ্টে গিয়েছে রঙিন তরলে।রৌদ্র আর সময় নিলোনা।তক্ষুনি নিচু হয়ে বোনকে তুলে নিলো পাঁজা কোলে। মেয়েটা খানিক ঝাঁকিয়ে ডাকলো,

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৫

“ বুড়ি! এই বুড়ি চোখ খোল!”
নিস্তব্ধ রুহি। নিশ্বাসটা চলছে কি-না কে জানে! জুবাইদা বেগম ছেলের পেছনে ছুটলেন। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে মেয়ের নুপুর পড়া পাদু’টো। যেখান থেকে অবলীলায় গড়িয়ে পড়ছে লহু! জুবাইদা বেগমের কানে যেন হঠাৎ বেজে উঠল,
“ আমায় একটু সাজিয়ে দিবে মা?”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১৭