Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৮

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৮

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৮
jannatul firdaus mithila

রাত আনুমানিক দুটো বেজে পয়ত্রিশ মিনিট! ধানমণ্ডির ব্যস্ত রাস্তা আপাতত জনমানবহীন। থানার সম্মুখের প্রধান সড়কের একপাশে সাইড করে দাঁড় করিয়ে রাখা একখানা কালো রঙা চকচকে গাড়ি। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে, স্টিয়ারিংয়ের ওপর হাত ঠেকিয়ে বসে আছে রৌদ্র। ছেলের বেড়াল চোখদুটো কেমন অপেক্ষমান দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। অদূরের থানায় জ্বলছে টিমটিমে আলোর বাতি। থানার মূল ফটকের বাইরে বসে থাকা কনস্টেবল সাহেব ঝিমুচ্ছেন রীতিমতো। এরইমধ্যে হঠাৎ থানা থেকে বেরিয়ে এলো একজোড়া ত্রস্ত পা! নিঃশব্দে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা রৌদ্রের গাড়ির পানে। ঘাড় বাকিয়ে একদফা এদিক-ওদিক সর্তক দৃষ্টি বুলিয়ে, মহাশয় খানিক নুইয়ে দাঁড়ালেন জানালার সম্মুখে। আতঙ্কিত কন্ঠে খানিক ঢোক গিলে আমতা আমতা সুরে বললেন,

“ কাজ হয়ে গেছে স্যার। আপনি এবার আসতে পারেন।”
চুপচাপ কথাটা শুনলো রৌদ্র। পরক্ষণে কোনরূপ কালবিলম্ব না করে বেরিয়ে এলো গাড়ি থেকে। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা দারোগা মশাই তখনো ভীতসন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে এদিক ওদিক নজর বুলচ্ছেন। রৌদ্র খানিক সময় নিয়ে গাড়ি থেকে একখানা কালো স্যুটকেস বের করে আনে। তারপর স্যুটকেসটা গাড়ির ওপর তুলে আলতো করে ওপেন করতেই পাশ থেকে দারোগা মশাই কেমন চক্ষু ছানাবড়া করে তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। স্যুটকেস ভর্তি টাকার বান্ডিল! যা দেখতে পেয়ে ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলতে লাগলেন দারোগা সাহেব। রৌদ্র আড়দৃষ্টিতে খেয়াল করলো এহেন পরিস্থিতি। সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হাতে স্যুটকেস থেকে ৩ বান্ডিল টাকা তুলে, দারোগার দিকে এগিয়ে দিয়ে শুধালো,
“ কথাটা যেন বাইরে না যায়!”

পুলিশ মানুষ টাকার ঘ্রাণ পেলে কী আর ওতো কিছু থোড়াই মনে রাখে? দারোগা মশাই কুটিল হেসে হাত বাড়িয়ে টাকাগুলো নিয়ে নিলেন। কচকচে নতুন টাকার নোটগুলোতে হাত বুলিয়ে আওড়ালেন,
“ আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। এই কথা কখনো বাইরে যাবে না।”
মনের মতো উত্তর পেয়ে তৎক্ষনাৎ স্যুটকেস হাতে নিয়ে এগিয়ে চললো রৌদ্র। উদ্দেশ্য, থানার আর্কাইভে ঢোকা। বিগত বছরগুলোতে তার চাচ্চু অর্থাৎ প্রাক্তন ডিসি — জনাব তায়েফ এহসানের দ্বারা সমাধানকৃত সকল কেসের হিস্ট্রি গুলো একটুখানি যাচাই-বাছাই করতে এসেছে রৌদ্র। কেননা তার সিক্সথ সেন্স বলছে, হোক বা না হোক, মুগ্ধের সাথে তায়েফ সাহেবের কোনো না কোনো কানেকশন ঠিকই আছে! নাহলে এহসান পরিবারে এতো সদস্য থাকা স্বত্বেও, একজন মোস্ট ওয়ান্টেড রাশিয়ান মাফিয়া কেনইবা শুধুমাত্র তায়েফ এহসানের পেছনে পড়বে?
এহেন হাজারো চিন্তায় জর্জরিত রৌদ্র। দ্রুত কদমে পা বাড়াচ্ছে থানার দিকে। তবে কিছুটা সামনে এগোতেই হঠাৎ পা জোড়া থামলো তার। কানের পাশ দিয়ে এই বুঝি উড়ে গেল বোলতা জাতীয় কিছু! বলে গেল অরিনের ক্রন্দনরত কন্ঠে — ডাক্তার সাহেব! রৌদ্রের শক্তপোক্ত শরীরটা কেঁপে উঠল আচমকা! মনের ভেতর জেঁকে বসল একরাশ অস্থিরতা। রৌদ্র হতবাক নিজের এহেন হুটহাট অস্থিরতায়। সে আনমনে নিজের বা-হাতটা উঠিয়ে এনে বুকের বাঁপাশে রাখল। স্পষ্ট টের পেলো, বুকের খাঁচায় লুকায়িত অঙ্গটা লাফাচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে। আশ্চর্য! হঠাৎ এমন লাগছে কেনো তার? মনের মধ্যে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর মিলেনি। অথচ রৌদ্রের গোলাপি অধরজোড়ার ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো,

“ সানশাইন!”
“ কি হয়েছে স্যার? আপনি এখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন যে?”
পেছন থেকে হঠাৎ ভেসে আসা দারোগা সাহেবের মিনমিনে কন্ঠে ঘোর ভাঙলো রৌদ্রের। ছেলেটা কেমন নড়েচড়ে দাঁড়াল কোনরকম। দারোগা মশাই আরেকটু এগিয়ে এসে রৌদ্রের কানের ধারে ফিসফিসিয়ে বললেন,
“ তারাতাড়ি ভেতরে চলেন স্যার। আমাদের হাতে কিন্তু খুব বেশি সময় নেই।”
কথাটা যথার্থ বলে মনে হয়েছে রৌদ্রের। সে তৎক্ষনাৎ নিজের সকল অস্থিরতা লুকিয়ে গটগট পায়ে এগিয়ে গেল ভেতরের দিকে। পেছন পেছন দারোগা মশাইও ঢুকলেন। থানার ভেতর পা রাখতেই ভ্রু কুঁচকে আসে রৌদ্রের। প্রতিটি ডেস্কের ওপর মাথা রেখে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন দায়িত্বরত পুলিশ, কনস্টেবল। এদিকে দারোগা সাহেব ততক্ষণে থানার বা-দিকে পা বাড়িয়েছেন। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে ঘুরতেই দেখলেন — রৌদ্র এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে থানার দরজার সামনে। দারোগা সাহেব কিছুটা বিরক্ত হলেন এতে। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে পরক্ষণেই ফের উল্টো পথে পা বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন রৌদ্রের নিকট। চাপা স্বরে শুধালেন,

“ স্যার? ভেতরে ঢুকবেন না?”
রৌদ্র ঘাড় বাকিয়ে তাকায় এবার। গুরুগম্ভীর মুখে কথা না বলেই পা বাড়ায় বা-দিকে। দারোগা মশাই ভ্রু কুঁচকালেন রৌদ্রের ওমন এটিটিউড দেখে। নেহাৎ টাকা নিয়েছেন বলে এই ছেলের এহেন এটিটিউড সহ্য করছেন তিনি। নাহলে এতক্ষণে ঠিকই কান বরাবর সপাটে বসিয়ে দিতেন এক ঘা! কথাটা ভাবতে গিয়েই হঠাৎ দারোগা সাহেবের মনে বেজে উঠল আরেক কথা। ভাবলেন,
“ ওমন মাসেলওয়ালা ছেলেকে তিনি আদৌও চড় বসাতে পারতেন? পরে না আবার চড় বসাতে গিয়ে নিজেই চেপ্টে যেতেন এই ছেলের হাতে!”

দারোগা সাহেবের এহেন ভাবনার সমাপ্তি ঘটলো অচিরেই। লোকটা কেমন গাল বাকিয়ে তক্ষুনি ছুটলেন রৌদ্রের পিছুপিছু। অন্ধকার সরু পথ দিয়ে একটুখানি এগুলেই আর্কাইভ রুম।সরু পথের দুপাশের দেয়ালগুলো থেকে রঙের আস্তরটা খসে পড়ছে যেন। মাথার এক ইঞ্চি ওপরে সিলিং। রৌদ্রের উচ্চতা সিলিংয়ের একদম কাঁটায় কাঁটায়। বেচারা ঘাড় নুইয়ে হাঁটছে। একটুখানি হাঁটতেই দু’জন একযোগে দাঁড়াল আর্কাইভ রুমের সামনে। দারোগা সাহেব পকেট থেকে চাবির গোছা বের করে, এগিয়ে এলেন নিঃশব্দে। ধীরে ধীরে মোটা তালার বুকে চাবি ঢুকিয়ে দু’টো ঘুরান দিতেই তালাটা খুলে গেল খট করে। দারোগা সাহেব আর সময় নিলেন না। চটপট ভঙ্গিতে দরজা থেকে তালা সরিয়ে রৌদ্রকে ইশারা করলেন ভেতরে যেতে। রৌদ্র সে অনুযায়ী ভেতরে ঢুকতেই যাবে ওমনি দারোগা সাহেবের কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ায় তিনি হঠাৎ চেপে ধরলেন ছেলেটার বাহু। রৌদ্র ভ্রু কুঁচকে পাশ ফিরতেই দারোগা সাহেব ফিসফিসিয়ে বললেন,

“ ৫৫ নম্বর তাকে আছে ডিসি সাহেবের কেস হিস্ট্রি। আপনি ভেতরে যান, আমি বাইরে থেকে পাহারা দিচ্ছি যেন কেউ এদিকে না আসে।”
রৌদ্র আলতো করে মাথা নাড়ায়। চুপচাপ পকেট থেকে ফোন বের করে টর্চ জ্বালিয়ে প্রবেশ করে ভেতরে। পেছন থেকে দারোগা মশাই ধীরে ধীরে দরজাটা আলতো করে আঁটকে দিলেন। রৌদ্র ঘাবড়ালোনা মোটেও। হাতের টর্চ দিয়ে এদিক ওদিক আলো ফেলে দেখতে লাগলো হাজারো ফাইলের স্তুপ! সবকটার ওপর ধুলোবালির মোটা আস্তরণ। বিশালাকার পুরো ঘরজুড়ে মাকড়সার বুনো জাল। রৌদ্র হাটতে হাটতে একপর্যায়ে চলে এলো ৫৫ নম্বর তাকের কাছে। তবে বিপত্তি ঘটলো আরেক জায়গায়। বিশাল এই শেলফে শুধু একটা-দুটাে ফাইল নয় বরং রয়েছে হাজার হাজার ফাইল। এতো এতো ফাইল এইটুকু সময়ের মধ্যে কিভাবে দেখবে সে? রৌদ্র পড়ল মহা চিন্তায়। কপালে গোটাকতক ভাঁজ ফেলে, একবার ফোনের আলো ঘুরিয়ে দেখে নিলো পুরো শেলফটা। শেলফের একদম মাঝের অংশে সফেদ রঙা কাগজে লিখে রাখা —

Name: DC Tayef Ahsan.
Service: 2000–2026

Total Cases Solved: 187
High Profile: 23
Unsolved: 2
★★
Notable Cases:
01. Spy Operation (2000) — The operative was neutralized during a covert encounter.
02. Cox’s Bazar Murder Case (2008)
03. River Smuggling Network (2013)
04.Chairman Kidnapping (2019)
★★★
Status: Suspended (2026)
Reason: Not mentioned.

পুরোটা লেখা পড়ে থামলো রৌদ্র। বিচক্ষণ মস্তিষ্ক তার পরক্ষণেই জানান দিলো — সম্ভবত এই বড় কেসগুলোতেই কোনো না কোনো কানেকশন রয়েছে। তাই যেই ভাবনা, সে-ই কাজ! রৌদ্র তক্ষুনি উদ্যোত হলো বড় বড় কেসগুলোর ফাইল কালেক্ট করতে। ধুলোপড়া শেলফের প্রতিটি তাক খুঁজতে লাগলো হন্যে হয়ে। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর, সে পেয়েও গেল তিনটে ফাইল। তবে যেই এনকাউন্টারের কেসটা সবার ওপরে মেনশন করা তার ফাইলটা এখন অব্ধি খুঁজে পেলোনা রৌদ্র। আশ্চর্য! সবগুলো ফাইল পেয়ে গেলেও ঐ এনকাউন্টারের ফাইলটা পাচ্ছে না কেন সে? রৌদ্র এবার চিড়বিড়িয়ে ওঠে। এতো সহজে হার মানার পাত্র নয় সে। তাই তৎক্ষনাৎ এদিক ওদিক নজর ঘুরিয়ে কিছু একটা খুঁজতে লাগলো ছেলেটা। কিয়তক্ষনের মধ্যেই অদূরে দেখতে পেলো একখানা ভাঙা টুল জাতীয় কিছু। রৌদ্র আর দেরি না করে, তক্ষুনি ছুটে গিয়ে নিয়ে এলো টুলটা। শেলফের সামনে টুলটা ভালোমতো দাঁড় করিয়ে সেথায় আলতো করে ভর দিয়ে দাঁড়াল কোনরকম।

টুলটা এখনো নড়ছে বেশ, তবে এতে তেমন পাত্তা দেয়নি রৌদ্র। ফোনের মৃদু আলোয় খুঁজতে লাগলো ফাইলটা। শেলফের উপরাংশে মোটা মোটা বেশকিছু ফাইল। প্রত্যেকটার গায়ে পড়েছে এক ইঞ্চি ধুলোর আস্তরণ। রৌদ্র ব্যস্ত হাতে ফাইলগুলো নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখছে। এতে ধুলোবালি উড়ে-টুড়ে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা! রৌদ্রের কাশি উঠে গেল আচমকা। বেচারা মুখে হাত চেপে কাশতে কাশতেই হঠাৎ দেখল তাঁকের একদম শেষ কর্নারে একখানা ফাইল দাঁড় করিয়ে রাখা। যার গায়ের শেষ ভাগে মোটা কালিতে আন্ডারলাইন করে লিখে রাখা — (এনকাউন্টার অফ ২০০০) রৌদ্রের টনক নড়লো এবার। সে তৎক্ষনাৎ হাত বাড়ালো সেদিকে। তবে ভাগ্য দেখো! ফাইলটা ছেলের হাতে এলেও তক্ষুনি টুলটা ভেঙে পড়লো মাটিতে। বেচারা রৌদ্র কেমন ধপ করে চিৎ হয়ে পড়লো মেঝেতে। বেশ উঁচু থেকে পড়ায় কোমর বরাবর ভীষণ চোট লাগল তার। রৌদ্র কেমন মুখ কুঁচকে, ঠোঁট কামড়ে কোমর চেপে ধরেছে একহাতে। বেশকিছুক্ষন একইভঙ্গিমায় মাটিতে পড়ে থেকে, ধীরে ধীরে উঠে বসে রৌদ্র।

মৃদু শব্দে ফোঁস ফোঁস করে ব্যাথাতুর নিশ্বাস ফেলে শেলফের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে বসে বেচারা। হঠাৎ টের পায় — তার কোমরের সাথে কী যেন একটা চুবে যাচ্ছে বেশ! খোঁচাটা ধীরে ধীরে প্রবল হচ্ছে। রৌদ্র তৎক্ষনাৎ হাত উল্টে কোমরে ঠেকায়। সেথায় সামান্য ভেজা ভেজা অনুভূত হতেই হাত বাড়িয়ে সামনে এনে দেখে, হাত তার ভরে গিয়েছে র*ক্তে। রৌদ্র ভ্রু গোটায় এবার। দাঁত খিঁচে নিজের সকল ব্যাথাটুকু একপ্রকার গিলে নিয়ে আবারও উদ্যত হয় ফাইলটা খুঁজতে। তখন টুল ভেঙে পড়ে যাওয়ায় রৌদ্রের হাত লেগে ওপরের তাঁকের সবগুলো ফাইল পড়ে গিয়েছে মেঝেতে। এরমধ্যে এনকাউন্টারের ফাইল কোনটা কে জানে! রৌদ্র একহাতে কোমর চেপে রেখে, মেঝেতে ভর দিয়ে এগিয়ে আসে। লাল তরলে রঞ্জিত হাত দিয়ে উদভ্রান্তের ন্যায় খুঁজতে থাকে ফাইলটা। বেশ কয়েকটা ফাইল উল্টাতে গিয়ে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত ফাইলের দেখা পেলো রৌদ্র। ধূলোময়লা জমা বেশ মোটা ফাইল। যার গায়ে ক্লোজড সিল দেওয়া। রৌদ্রের কৌতুহলী মন তক্ষুনি ব্যস্ত হলো ফাইল দেখতে।

হাতদুটো ব্যগ্র ভঙ্গিতে ছুটলো ফাইলের বাঁধন আলগা করতে। মিনিট খানেক বাদেই ফাইল খুললো রৌদ্র। তবে ফাইলের প্রথম দুটো পৃষ্ঠা ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে এলো একখানা ছবি। বেশ পুরনো, অর্ধেক নষ্ট হয়ে যাওয়া ছবি। রৌদ্র ভ্রু কুঁচকে ছবিটা হাতে নিলো। ছবিতে দাঁড়িয়ে আছে একজন কমবয়সী সুন্দরী নারী। যার কালো মেঘরাশির ন্যায় চুলগুলো ছুয়েছে পা অব্ধি। নারীটির গায়ে চকচকে রঙের শাড়ি, টানা টানা বড় বড় চোখদুটোতে মোটা করে কাজল লেপ্টানো। ঠোঁটে ঝুলছে মিষ্টি হাসি। তার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক বাচ্চা ছেলে। একখানা শার্ট গায়ে, হাঁটুর বেশ ওপর অব্ধি প্যান্ট পড়া। বাচ্চা ছেলেটার মাথায় খুব একটা চুল নেই। যতটুকু আছে তাও আবার তেল দিয়ে চুপেচুপে করে রাখা। তার হাতে বোধহয় বেলুন জাতীয় কিছু একটা। ছবিটা হয়তো আগেরকার দিনের ফটো স্টুডিওতে তোলা। রৌদ্র কিছুক্ষণ আনমনে তাকিয়ে রইলো ছবিটার দিকে। তার বেড়াল চোখদুটো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাচ্চা ছেলেটার অদ্ভুত সুন্দর বাদামী চোখদুটোর দিকে। তার কেন যেন মনে হচ্ছে — এই চোখদুটো তার বড্ড চেনা। তবে চোখদুটো যে কার…রৌদ্র চোখ কুঁচকে ভাবতে লাগলো এবার। এই বাদামী চোখদুটো সে কোথায় দেখেছে? ঠিক কার ছিলো এই চোখদুটো… ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ রৌদ্রের কল্পনার মানসপটে ভেসে উঠলো মুগ্ধের শক্ত মুখখানা। তক্ষুনি চোখ মেলে রৌদ্র! ভড়কানো দৃষ্টিতে ছবিটার পানে ফের তাকিয়ে মিলাতে লাগলো তার আন্দাজ! হ্যা..ঠিক এমন-ই, এমন-ই চোখদুটো মুগ্ধের। তারমানে কী তবে এই বাচ্চা ছেলেটাই মুগ্ধ? রৌদ্র অস্থির হলো এবার। ব্যস্ত হাতে ছবিটা উল্টেপাল্টে দেখতে গিয়ে নজর আটকালো ছবির পেছনে বাংলায় গুটিগুটি অক্ষরে লিখে রাখা —

“ শ্যামৌপ্তী দেবী রায়।
অধীর রায়।”
রৌদ্র ঢোক গিললো এবার। নাম দু’টো দেখে মনে হচ্ছে ছবিতে থাকা ব্যাক্তিদের নাম বোধহয় এগুলো। তবে সে যে ধারণা করছিল এই বাচ্চা ছেলেটা মুগ্ধ, কিন্তু এখানে নাম তো বলছে আরেকটা। রৌদ্রের মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগছে এবার। সে তৎক্ষনাৎ পাতা উল্টালো ফাইলের। আসামির ডিটেইলসে চোখ পরতেই আরেকদফা থমকায় সে। যখন দেখলো আসামীর নামের জায়গায় নাম লেখা —
❝ শ্যামৌপ্তী দেবী রায়।
আসামির স্বামীঃ-…………
সন্তান-সন্ততীঃ- অধীর রায়।❞
হতভম্ব রৌদ্র! এ যেন কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে এসেছে। তারমানে… এই অধীর অন্য কেউ? না-কি তারই বুঝতে ভুল হচ্ছে কোথাও? আশ্চর্য! এতবড় অন্যায়ের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায়, ফাইলে কেন আসামীর কোনরূপ কার্যকলাপ লেখা হলোনা? কেনো এনকাউন্টারে মারা হলো শ্যামৌপ্তি দেবীকে? কেন কেন কেন? মাথাভর্তি হাজার চিন্তা রৌদ্রের! নিউরনের প্রতিটি ডেনড্রাইট এবং অ্যাক্সনে বাজছে সর্তক সংকেত। মনের গাট ফিলিংস জানাচ্ছে অন্যকিছু। বারবার চিৎকার দিয়ে ভেতরকার অনুভূতিরা জানান দিচ্ছে —
“ মুগ্ধ নামক মাফিয়া কোনো সাধারণ কাজে এ দেশে আসেনি। সে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো বিগ রিজনে এসেছে। কিন্তু সেটা আসলে কী?”

দ্রুত কাজ সেরে থানা থেকে বেরিয়ে এসেছে রৌদ্র। একহাতে বেচারা এখনো চেপে রেখেছে নিজের কোমর। আরেক হাতে স্যুটকেস। রৌদ্র বহুকষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে এলো গাড়ি অব্ধি। সময় নিয়ে গাড়িতে ঢুকে, ইঞ্জিনে স্টার্ট বসায় ছেলেটা। গাড়ি ঘুরিয়ে মেইনে রোডে উঠে, একহাতে তক্ষুনি ফোন লাগায় তায়েফ সাহেবের নম্বরে। ফোন বাজছে, তবে তুলছেনা তায়েফ সাহেব। কল রিং হতে হতে কেটে গেল একবার। রৌদ্রের মেজাজ চটলো এবার। সে আবারও কল দিলো তায়েফ সাহেবের কাছে। দুটো রিং হতেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ করলেন তায়েফ সাহেব। কিছু একটা বলতেই যাবেন ওমনি রৌদ্র ফোনটা হাতে তুলে বিচলিত কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ তোমার হোয়াটসঅ্যাপে একটা জরুরী ডকুমেন্ট পাঠিয়েছি চাচ্চু। ইমার্জেন্সি সেটা চেক করো।”
শুনলেন না তায়েফ সাহেব। রৌদ্রের কথাগুলো কেটে কেটে যাচ্ছে কেমন। বোধহয় নেটওয়ার্ক প্রবলেম। তিনি কেমন অবোধের সুরে আওড়ালেন,

“ কি বললি রোদ? কোথায় যাবো?”
দাঁত খিঁচে রৌদ্র। চোখেমুখে ব্যাপক অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে আবারও শুধালো,
“ হোয়াটসঅ্যাপে যাও। একটা ফাইল দিয়েছি…”
“ কোথায়? হেলো? হেলো? রোদ আমি শুনতে পাচ্ছি না তোকে। তুই কোথায় বাবা? হেলো?”
“ আ-মা-য় শুনতে….”
“ কী? হেলো?”

রৌদ্র একাধারে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। অথচ মরার নেটওয়ার্কে যত সমস্যা সব এখনই বোধহয় দেখা দিলো। ছেলেটা বিরক্তি নিয়ে যেইনা আরেকবার চেঁচাতে যাবে ওমনি ঘটে গেল আরেক অঘটন। এই সুনশান-নিস্তব্ধ রাস্তায় কোত্থেকে কে যেন ছুটে এলো গাড়ির সামনে। হুট করেই মানুষটা গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই তৎক্ষনাৎ ব্রেক কষলো রৌদ্র। তবে লোকটার গায়ে গাড়ি লেগে গেল আচমকা। লোকটাও কেমন ছিটকে পড়লো অদূরে। একমুহূর্তের জন্য হতভম্ব বনে গেল রৌদ্র। হতবাক চোখে সম্মুখে তাকাতেই দেখলো — রাস্তার মাঝে পড়ে আছে অপরিচিত কেউ। রৌদ্র কেমন উদ্বিগ্ন হলো তাকে দেখে। তক্ষুনি আগপাছ বিবেচনা না করে গাড়ি থেকে ফোন ছাড়াই বেরিয়ে এলেন ডাক্তার সাহেব। কোমর চেপে ধীরে ধীরে কদম ফেলে রাস্তায় লুটিয়ে থাকা ব্যাক্তির সন্নিকটে বসে, একহাতে লোকটাকে সোজা করতেই দেখলো — লোকটা তাকে দেখে মিটমিটিয়ে হাসছে। রৌদ্র ভড়কায়। পরমুহূর্তে কিছু বুঝতে ওঠার আগেই কেউ একজন পেছন থেকে এসে তার মাথা বরাবর সজোরে বসালো লাঠির আঘাত। সঙ্গে সঙ্গে মাথা চেপে ধরে রৌদ্র। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বেচারা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল রাস্তায়।

এদিকে, তায়েফ সাহেব একাধারে কল দিয়েই যাচ্ছেন রৌদ্রকে। এতক্ষণ ফোনে কল ঢুকলেও এখন রিং হচ্ছে না ফোনে। বারবার বন্ধ বলছে নম্বরটা। এতে চিন্তাগুলো ক্রমশ বাড়ছে তায়েফ সাহেবের। শরীরে বাড়লো অস্থিরতা। তিনি পুরো ঘরময় পায়চারি চালাতে চালাতে হঠাৎ মনে করলেন — রৌদ্র তখন বারবার হোয়াটসঅ্যাপ বলছিল কেন? তায়েফ সাহেব তক্ষুনি ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলেন। দেখলেন — রৌদ্র কি যেন একটা পাঠিয়েছে আরও মিনিট ত্রিশেক আগে। তায়েফ সাহেব ব্যস্ত হয়ে ঢুকলেন রৌদ্রের একাউন্টে। আগত ডকুমেন্টে ক্লিক করতেই যা দেখলেন তাতে মুহুর্তেই তার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল কেমন। নিশ্বাস ভারি হয়ে গেল ক্রমশঃ। চোখদুটোর সামনে ভাসতে লাগলো বহু পুরনো কিছু ঘটনা। কারো আহাজারি, কারো চিৎকার, কারো ভয়মিশ্রিত কন্ঠ, মাটিতে ভেসে যাওয়া র**ক্তাক্ত মুখশ্রী। ঢাকার টপনচ নাচনেওয়ালীর নিথর দেহ!
এবার বুঝি ভয় হচ্ছে তায়েফ সাহেবের। বুকটা কাঁপছে অস্বাভাবিকভাবে। শরীরের অতিরিক্ত কম্পনের ফলে হাত থেকে ফোনটা তার খসে পড়ল মেঝেতে। দরদরিয়ে ঘামতে থাকা ললাটে আলতো করে হাত ঠেকালেন তায়েফ সাহেব। কাঁপা কাঁপা কন্ঠফুড়েঁ অস্ফুটে বেরিয়ে এলো,
“ অধীর!!!”

ভারী বাতাসের তীব্রতায় দেহ অব্ধি নড়বে যেন। মাথার ওপর পড়ছে রৌদ্রের কড়া তাপ। পিটপিট করে চোখ মেলছে রৌদ্র। চোখের ওপর থেকে একটুখানি পর্দা সরাতে গেলেই পরমুহূর্তে তা আরও ভারী হয়ে চোখের সামনে নেমে যাচ্ছে যেন। তবুও এক অদম্য অব্যর্থ চেষ্টায় চোখের পর্দা উঠায় রৌদ্র। ঝাপসা ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকায় সম্মুখে। চারপাশে বেশকিছু সশস্ত্র বডিগার্ডের আবছা প্রতিমূর্তি দেখছে সে। দেখছে, মাথার ওপরের খোলা আকাশকে। কিন্তু ভাবাবেগ হলোনা তার। বুঝলোনা নিজের বর্তমান পরিস্থিতি। তবে নিস্তেজ মস্তিষ্ক তার সজাগ হলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই। মনে পড়ে গেল গতকাল রাতের ঘটনা। মুহুর্তেই গা ঝাঁকিয়ে ওঠে রৌদ্র। তবে পরক্ষণেই টের পেলো, তার হাতদুটো বুঝি পেছন দিকে বেঁধে রাখা। রৌদ্র মোচড়াচ্ছে ভীষণ। গলা ছেড়ে হুংকার ছুঁড়ছে একের পর এক। বারবার বলছে,

“ হাত খোল আমার।”
বিশালাকৃতির খোলা ছাঁদের চারিদিকে গোলাকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কতক বিদেশি বডিগার্ড। প্রত্যেকের হাতে বিদেশি অ*স্ত্র। ছাঁদের একদম মাঝে উবুড় হয়ে পড়ে আছে রৌদ্র। মোচড়াচ্ছে অনবরত। অন্যদিকে, ছাঁদের একদম সম্মুখে পায়ের ওপর পা তুলে, নির্বিকার ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে আছে মুগ্ধ। ডানহাতে তার শোভা পাচ্ছে রাশিয়ান মডেলের কার্বিন। তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটজোড়ার ফাঁকে গুঁজে রাখা ক্রুটস নিকারাগুয়ান সিগার। বাদামী চোখদুটো কেমন কুঁচকে তাকিয়ে আছে মেঝেতে পড়ে থাকা রৌদ্রের পানে। সে সময় নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। পাশ থেকে তক্ষুনি একজন বডিগার্ড ছুটে আসে তার নিকট। মুগ্ধের সামনে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থেকে, দু’হাত বাড়িয়ে ধরল সামনে। মুগ্ধ তখন আলগোছে নিজের হাতের কার্বিনটা দিয়ে দেয় বডিগার্ডের হাতে। পরক্ষণে গম্ভীর মুখে দু’হাত পকেটে গুঁজে, ব্যুট জুতোর মর্মর শব্দ তুলে হেঁটে আসে রৌদ্রের নিকট। রৌদ্র মোচড়াতে মোচড়াতে হঠাৎ খেয়াল করলো একজোড়া ব্যুট পরিহিত পা তার সামনে এসে থেমেছে। সে ধীরে ধীরে চোখ ওপরে তুলতেই দেখে মুগ্ধ কেমন কুটিল হেসে তার পানে তাকিয়ে! বেয়াদব ছেলে রৌদ্রকে দেখিয়ে দেখিয়ে একহাতে ঠোঁট থেকে সিগারটা সরিয়ে, ভ্রু উঁচিয়ে কঠিন গলায় বলে ওঠে,

“ কি-রে মাঙ্গের নাতী? কী অবস্থা?”
রৌদ্র কটমট করছে। গলায় ভীষণ ঝাঁঝ ঢেলে হুংকার ছুঁড়ে বলে,
“ কাপুরুষের মতো আমার হাত বাঁধলি কেন? সত্যিকারের পুরুষ হলে এটলিস্ট এমনটা করতিনা।”
বিরক্ত হলো মুগ্ধ। কপাল গুটিয়ে ত্যাড়া বাক্যে আওড়ে বলল,
“ এখন তোকে কী আমার প্যান্টের জিপার খুলে প্রমাণ দিতে হবে না-কি যে আমি পুরুষ?” লুইচ্চা শালা!”
দাঁত খিঁচে রৌদ্র। তৎক্ষনাৎ ঝাঁঝিয়ে বলে,
“ আমার হাতটা খুলে দেখ একবার, আমি তোর কী হাল করি।”

থামলো মুগ্ধ। কুটিল হেসে তক্ষুনি তর্জনীর ইশারায় দু’জন গার্ডকে বোঝালো — রৌদ্রকে খুলে দিতে। গার্ড দু’জন তক্ষুনি এগিয়ে এসে হুকুম তামিল করলেন। রয়েসয়ে রৌদ্রের হাতের বাঁধন খুলে দিতেই ঘটলো আরেক বিপত্তি! ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় এপর্যায়ে লোকদুটোর ওপর ঝাপিয়ে পড়ে রৌদ্র। হিংস্র হাতের থাবায় লোক দুটোর নাকমুখ বরাবর সজোরে আঘাত বসাতেই লোকদুটো ছিটকে পড়লো পেছনে। ওদিকে মুগ্ধ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে নিজ জায়গায়। প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে নির্লিপ্ত চোখে দেখছে রৌদ্রের কর্মকাণ্ড। রৌদ্র থামছেনা। সে হিংস্র গর্জন তুলে এগিয়ে আসতে লাগলো মুগ্ধের নিকট। তবে তার আগেই মুগ্ধের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ালো বেশ কয়েকজন গার্ড। আশ্চর্যের বিষয়, প্রত্যেকের হাতে বন্দুক থাকলেও তা চালানোর অনুমতি এখন অব্ধি দেয়নি মুগ্ধ। রৌদ্র এবার আরেকধাপ চটলো যেন। আশেপাশের বেশ কয়েকজন তাকে ঘিরে ধরতেই শোনা গেল মুগ্ধের ভারী অথচ কঠিন শক্ত কন্ঠ!

“ মুভ!”
কথাটা শোনামাত্রই প্রত্যেকে সরে গেলো। রৌদ্র এবং মুগ্ধ এবার মুখোমুখি। রৌদ্রের কোমর থেকে এখনো ঝরে পড়ছে তাজা লহু। তবুও ছেলের দৃঢ় বদনে নেই কোনো আহত ভাবসাব। সে কটমটিয়ে এগিয়ে এসে মুগ্ধের গাল বরাবর সজোরে বসালো এক ঘুষি। মুগ্ধ গাল বেকে ঘাড় বাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। বাঁকা হেসে রয়েসয়ে ঘাড় সোজা করতেই আরেক ঘা বসলো তার গাল বরাবর। এবারেও চুপ রইলো মুগ্ধ। বাহাতের আঙুলের সাহায্যে নিজের লম্বাটে তীক্ষ্ণ চোয়ালখানা আলতো করে নাড়িয়ে পরক্ষণে দাঁড়াল আগের ন্যায়। এবার রৌদ্র এগিয়ে এসে যে-ই না ঘুষি মারতে যাবে ওমনি ছেলেটার মুষ্টিবদ্ধ হাত মুঠোয় আঁকড়ে ধরে মুগ্ধ। বাদামী চোখদুটো সংকুচিত করে, ঠোঁটের কোণে লেপ্টালো ক্রুর হাসির রেশ। অতঃপর চোখের পলকে রৌদ্রের মুষ্টিবদ্ধ হাতটা একটানে সামনে আনতেই, রৌদ্রও চলে এলো নিকটে। ঠিক তখনি রৌদ্রের মাথা বরাবর নিজ মাথা দিয়ে সজোরে আঘাত করে বসে মুগ্ধ। এক বিকট শব্দ তুলে দু’জনেই ছিটকে গেল খানিকটা দূরে। রৌদ্র দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে নিজের দৃষ্টি স্থির করছে। পাশ থেকে মুগ্ধ ছুটে এসে তার বুক বরাবর লাথি বসাতে গেলে, মুগ্ধের পা দুবাহুর সাহায্যে আঁটকে ফেলে রৌদ্র। সঙ্গে সঙ্গে মুগ্ধের পা ঘুরিয়ে ধরতেই মেঝেতে উল্টে পড়ে মুগ্ধ। এতে অবশ্য দমে যায়নি মুগ্ধ। মেঝেতে পিঠ ঠেকিয়ে রেখেই পায়ের জোরালো গতি দিয়ে রৌদ্রের মুখ বরাবর দিয়ে বসলো আরেক লাথি। রৌদ্র এবার পেছালো এক-কদম। মুগ্ধ তখন এক ঝটকায় শোয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। শক্ত মুখাবয়বে গা থেকে কালো রঙা কোটটা খুলে, ছুড়ে ফেলে মেঝেতে। হিংস্র কন্ঠে গর্জে বলে,

“ আয় বাস্টার্ড!”
রৌদ্র একইরকম তেজীয়ান। মুগ্ধের দিকে দৌড়ে আসতে চাইলেই মুগ্ধ রৌদ্রের বুক বরাবর লাথি বসায় আবারও। এতে রৌদ্র নড়লোও না একটু! উল্টো বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মুগ্ধের পানে তাকিয়ে কুটিল হাসল সে। দাঁত কিড়মিড় করে তক্ষুনি মুগ্ধের বুকের কাছটা খামচে ধরতেই, মুগ্ধ সে হাত উল্টে ধরল। এতে মুখ কুঁচকায় রৌদ্র। হাত ঝাঁকিয়ে কাজ না হওয়ায়, তক্ষুনি নিজের মাথা দিয়ে মুগ্ধের নাক বরাবর আঘাত করতেই পেছনে সরলো মুগ্ধ। একহাতে নাক চেপে খেয়াল করলো, নাক থেকে তার লহু গড়াচ্ছে। মুগ্ধের ভেতরকার শয়তান বুঝি এতক্ষণে জাগলো। সে তক্ষুনি এগিয়ে এসে গলা চেপে ধরলো রৌদ্রের। ঠিক একইভাবে রৌদ্রও চেপে ধরলো মুগ্ধের গলা। দুটো বলিষ্ঠ দেহের পুরুষ একে-অপরের গলা চেপে ধরেছে। দু’জনার মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। হাতের শক্তি বাড়তে থাকায় আচমকা দু’জনার বাহুর কাছের শার্টটা কেমন ফেটে ছিঁড়ে গেলো। চারদিকে দাঁড়িয়ে থাকা বডিগার্ডরা কেমন হা করে তাকিয়ে আছে দেখো! এই প্রথম বুঝি তারা সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দেখলো! অন্যদিকে, রৌদ্র -মুগ্ধ কেউই কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। এরইমধ্যে মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ নিজের পা দিয়ে রৌদ্রের হাঁটু বরাবর লাথি বসাতেই, হাতের বাঁধন ঢিলে হয়ে গেলো রৌদ্রের। বেচারা হাঁটু গেঁড়ে বসলো মেঝেতে। মুগ্ধ তখন ঘুরে এসে রৌদ্রের গলা বাহু ঘুরিয়ে চেপে ধরলো। এদিকে রৌদ্র এবার ছটফট করছে। মুগ্ধের হাতের শক্ত নখের আঁচড় বসাচ্ছে বেশ। মুগ্ধ কুটিল হাসল কেবল। রৌদ্রের কান বরাবর মুখ এনে হিসহিসিয়ে বলল,

“ আই হেভ সারপ্রাইজ ফর ইউ বাডি।”
রৌদ্র শুনলো তবে প্রতিক্রিয়া দেখানোর অবস্থাতে নেই সে। ওদিকে মুগ্ধ এবার রৌদ্রের গলা ছেড়ে দিয়ে চুপ চেপে ধরে শক্ত হাতে। রৌদ্রের মাথাটা ডানদিকে ঘুরিয়ে ধরতেই রৌদ্র চোখ মেলে তাকায় সেদিকে। পরক্ষণেই আহত ছেলেটার দৃষ্টি যুগল হয়ে গেল বিস্ফোরিত। অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে অরিন। উষ্কখুষ্ক চুল, গায়ের কাপড়ে কাঁদা লেপ্টে আছে বেশ। মেয়েটার হাতদুটো পেছন দিকে বাঁধা। মুখে ঢোকানো রুমাল। মেয়েটা গোঙাচ্ছে, কাঁদছে অনবরত। সঙ্গে সঙ্গে বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে রৌদ্রের। গা থেকে তার এতক্ষণের বলিষ্ঠ মনোভাবটা হারিয়ে গেল কোথায় যেন। মুগ্ধ তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে এলো অরিনের নিকট। একবার অরিনের দিকে তাকিয়ে, পরক্ষণে তাকালো রৌদ্রের পানে। রৌদ্রের ওমন অসহায় দৃষ্টি এড়ায়নি মুগ্ধের চোখ থেকে। বেয়াদব ছেলে বাঁকা হেসে তক্ষুনি একহাতে চেপে ধরে অরিনের চুলের গোড়া। অরিন মৃদু ককিয়ে উঠলেও চিৎকার দিয়ে ওঠে রৌদ্র।
“ হেই স্টপ! স্টপ! আমার বউজান ব্যাথা পাচ্ছে, ওকে ছাড় বলছি।”

ছেলেটার এহেন ছটফটানিতে যেন বেশ আনন্দ পাচ্ছে মুগ্ধ। সে ধীরে ধীরে অরিনের সামনে সটান হয়ে দাঁড়াল। একহাতে ব্যগ্র ভঙ্গিতে অরিনের চোখ থেকে বেঁধে রাখা পট্টিটা খুলে দিতেই চোখ পিটপিটিয়ে চাইলো অরিন। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় তাকায় এদিক ওদিক। সুউচ্চ ভবনের ছাঁদ! হ্যালিপ্যাডের একদম মাঝ বরাবর হাঁটু গেঁড়ে বসিয়ে রেখেছে রৌদ্রকে। ঠোঁট, নাক ফেঁটে র*ক্ত গড়াচ্ছে নিজের মতো। অরিনের বুক কেঁপে ওঠে রৌদ্রকে এভাবে দেখে। সে কাঁদতে কাঁদতে পা বাড়াতে চাইলেই হঠাৎ টের পেলো তার মাথার বা-দিকে কিছু একটা ঠেকিয়ে রাখা। অরিন শুকনো ঢোক গিললো যেন। ঘাড় বাকিয়ে আড়দৃষ্টিতে তাকাতেই দেখলো — তার সম্মুখেই ক্রুর হাসিতে মেতে আছে মুগ্ধ। তার ডানহাতে এবার শোভা পাচ্ছে রাশিয়ান AQ1 মডেলের পি*স্তল। পিস্তলের নল ঠেকেছে তার মাথার ঠিক বা-দিকে। ছেলেটার ঠোঁটে গুঁজে আছে ক্রুটস নিকারাগুয়ান সিগার। অরিন নিশ্বাস ফেলতে ভুলে গেল যেন। মেয়েটা কেমন পাথর বনে দাঁড়িয়ে রইলো ঠায়। এদিকে মুগ্ধের বৃদ্ধা আঙুল পিস্তলের গোড়ায় পড়তেই অদূর থেকে দূর্বল কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো রৌদ্র। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,

“ আমার সানশাইনকে ছেড়ে দে মুগ্ধ! তোর দুটো পায়ে ধরি ওকে ছেড়ে দে। তোর যত আঘাত করার আমায় কর, তবুও আমার বউজানকে ছেড়ে দে!”
এহেন কথায় ঘাড় বাঁকায় মুগ্ধ। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ টেনে ঠোঁট কামড়ে ধরল পরক্ষণেই। হাত উঁচিয়ে বন্দুকের নলটা নিজের বাম ভ্রুয়ের ওপর খানিক ঘষতে ঘষতে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বললো,

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৭

“ শক্তপোক্ত মানুষের দূর্বলতা থাকতে নেই ডাক্তার! থাকলেও তা শত্রুর সামনে প্রদর্শন করতে নেই।”
থামলো মুগ্ধ। পরমুহূর্তেই তার শান্ত মুখখানায় আগুন ভাব বজায় রেখে দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে গেলো রৌদ্রের দিকে। আহত রৌদ্রের থুঁতনির নিচে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“ বলেছিলাম না? যেদিন হাতের কাছে পাব, একদম টেনে ছিঁড়ে ফেলব তোকে। তোর ঐ চোখ দিয়ে শেষ কান্না কাঁদিয়ে ছাড়ব বলেছিলাম না?”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ শেষ পর্ব