Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৬ (২)

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৬ (২)

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৬ (২)
jannatul firdaus mithila

“ আচ্ছা শ্যামবতী! তোমার বিরহে তবে আমিও কি নিষ্ঠুর হয়ে গেছি? মনটা কি তবে সত্যি সত্যি পাথরে পরিনত হলো?”
আগের ন্যায় নিস্তেজ রুহি। ঘুমিয়ে আছে চোখ বুজেঁ। বাদবাকি মানুষের জন্য সকাল হলেও তার কাছে কি আর সকাল কিংবা রাতের ভিন্নতা আছে? সে-তো বরাবরের ন্যায় ঘুমিয়ে আছে। তবে ডাক্তার বলেছে — মেয়েটার না-কি মিনিমাল কনশাসনেস জাগ্রত হয়েছে। অর্থাৎ তার চোখদুটো বন্ধ থাকলেও সে না-কি ঠিক শোনে সবার কথা। এটাই বা কম কিসে? রেহান মেয়েটার বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে কথা বলছে। চোখদুটো তার আদৌও ভেজা কি-না কে জানে! তবে তার যে কন্ঠ কাঁপছে তা বেশ স্পষ্ট! রেহান এখন সর্বক্ষণ মেয়েটার আশেপাশে থাকে। লোকেদের ভাষ্যমতে ইদানিং মশাই ঘরকুনো হয়েছেন। সারাদিন ঘুমন্ত রুহির কানের কাছে বসে এই-সেই রাজ্যের কথা জুড়ে বসেন। কথা বলেই হয়তো নিজের বুকের ওপর জমে থাকা কষ্ট গুলো খানিক লাঘব করবার বৃথা চেষ্টায় তৎপর থাকেন।

বেশ কিছুক্ষণ একই ভঙ্গিমায় পড়ে থেকে, রেহান রয়েসয়ে নিজের মাথা তুললো রুহির বুকের ওপর থেকে। রুহির শুকনো মুখখানায় তাকাতেই দেখে মেয়েটার বন্ধ চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নিরব অশ্রু! রেহান তৎক্ষনাৎ উদ্বিগ্ন হলো। হাত বাড়িয়ে তর্জনী দিয়ে মেয়েটার চোখের পানিগুলো মুছে দিলো আলগোছে। ঠোঁটের কোণে ব্যাথাতুর হাসি ফুটিয়ে বলতে লাগলো,
“ তুমি কাঁদছ কেনো শ্যামবতী? আমি কি তোমায় কষ্ট দিচ্ছি বলো?”
রুহি থোড়াই উত্তর দিলো! রেহান কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার মুখপানে। হঠাৎ করেই ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে শুধালো,
“ কে বলে আমি অভিনয় পারিনা? এই দেখো না! তোমাকে, আমার রাহিলকে বাঁচাতে প্রতিনিয়ত আমি কেমন অভিনয় করে যাচ্ছি! কী সুন্দর নিখুঁত অভিনয় জানি আমি শ্যামবতী। তুমি দেখলে নিশ্চয়ই অবাক হতে। হয়তো বলতে — এ আমার রেহান নয়।”

কথাটা বলে আনমনেই হাসে রেহান। সময় নিয়ে দু’হাতে ঝাপটে ধরে রুহিকে। কিয়তক্ষন হাসতে হাসতে হঠাৎ করেই সে হাসি তার বদলে গেল হু হু কান্নায়। রুহির বুকের কাছের অংশটা ভিজে যাচ্ছে ক্রমশ। রেহান তার নিরব অশ্রু ঝরাচ্ছে। শ্যামবতীকে আঁকড়ে ধরে নিজের নামে নিজেই একের পর এক বিচার দিয়ে যাচ্ছে। অথচ রুহি কেমন চুপ করে আছে! আগের ন্যায় সুস্থ থাকলে মেয়েটা হয়ত এক্ষুণি দু’হাতে ঝাপটে ধরতো রেহানকে। বেচারার ক্রন্দনরত মুখখানায় লেপ্টে দিত অজস্র চুম্বন। মাথা বুলিয়ে বলত — ধূর বোকা! কাঁদছ কেনো? আমি আছি তো। তবে আফসোস! আজ রেহান কাঁদলেও তাকে থামানোর জন্য রুহি উঠছেনা। বলছেনা চুপ করতে। রেহান কাঁপছে। চাপা কান্নায় বুক ভাসাচ্ছে শ্যামবতীর। তার হাতের বাঁধনটাও শক্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। সে সময় নিয়ে কান্না গুলো আটকানোর চেষ্টা চালালো বেশ। কিন্তু কান্নারা আজ রুপ নিয়েছে হিংস্র। থামতে চাচ্ছেনা কোনমতেই। একবার একটু থামতে গেলেই পরমুহূর্তে তারা ঠিকরে বেরিয়ে আসছে গলা ছেড়ে। রেহান কাঁদতে কাঁদতেই হঠাৎ বলে ওঠে,

“ তোমার বিরহে আজ তিনটে সপ্তাহ হলো শ্যামবতী। নিষ্ঠুর হওয়ার তিনটে সপ্তাহ। কঠিন মানবে পরিনত হওয়ার তিনটে সপ্তাহ। অদেখা অভিনব কৌশলী নাটকে অভিনেতা হওয়ার তিনটে সপ্তাহ। আশ্চর্য! সবাই সবটা না জেনে-বুঝে আমায় কেনো নিষ্ঠুর বলছে শ্যামবতী? কেনো তারা ধরে নিয়েছে আমি খারাপ? কেনো তারা বলছে আমি নিষ্ঠুর? তারা কি জানে না? তোমার বিরহে আমি শূন্য! যেখানে আমার সকল অস্তিত্ব তোমায় ঘিরে, আমার তুমি নামক অস্তিত্বটা যেখানে ঘুমিয়ে আছে নিরবে, সেখানে তারা আমায় নিষ্ঠুর বলে কোন সাহসে? আমার সকল আনন্দ -হাসি-ভালোবাসা, সবটাই তো এখন ঘুমন্ত বউ! ভীষণ গভীর ঘুমে ঘুমন্ত।”
বুকফাটা আর্তনাদে মত্ত রেহান। এরইমধ্যে তার কর্ণকুহরে ভেসে আসে কারো উচ্চ কন্ঠ!
“ ছোট স্যার? ছোট স্যার?”
গোলাকার লিভিং রুমে দাঁড়িয়ে হাঁক ছুড়ছেন বাড়ির কাজের লোক শাহিন। মধ্যবয়স্ক মানুষ, মলিন হয়ে আসা শার্ট প্যান্ট গায়ে জড়িয়ে, গলায় ঝুলিয়েছে লাল-সাদা মিশেলের একখানা গামছা। পান খাওয়া আধো আধো লাল ঠোঁটদুটো নাড়িয়ে তিনি ফের ডাকলেন,

“ ছোট স্যার! ও ছোট স্যার?”
এতো এতো হাঁকাহাঁকিতে এবার যেন বড্ড বিরক্ত হলো রেহান। কেন যে ঘরের দরজাটা খোলা রাখতে গিয়েছিল কে জানে! রেহান একবার চাইলো জবাব দিবেনা। পড়ে রইল শ্যামবতীকে ঝাপটে। তবে আবারও শোনা গেল শাহিন মিয়ার কন্ঠ। মুহুর্তেই চোয়াল শক্ত হলো রেহানের। চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি লেপ্টে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। ধুপধাপ পায়ে দোতলার সরু বারান্দার দ্বার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ঝাঁঝাল কন্ঠে বলে,
“ কী হয়েছে শাহিন ভাই? এত হাঁক ডাক কিসের? দেখছ যেহেতু তোমার ডাকে তেমন সাড়াশব্দ দিচ্ছি না তারমানে বোঝা উচিৎ ছিল — আমি ব্যস্ত আছি। সে যাইহোক, বলো কেনো ডেকেছো?”
শাহিন মিয়া পুরাতন লোক এ বাড়ির। সে জের ধরেই প্রত্যেকের সাথে তার সখ্যতাও বেশ পুরনো। তাইতো কেউ হুটহাট রাগ করে কথা বললে খুব একটা আহত হন না তিনি। এই যেমন এখন হলেন না। শাহিন মিয়া দাঁতকপাটি বের করে হাসলেন একটুখানি। রয়েসয়ে শুধালেন,
“ রুদ বাবা আসচে। ভেতরে আইবার কমু?”

হকচকায় রেহান। হতবাক নেত্রে তাকায় শাহিন মিয়ার দিকে। মনে মনে ভাবল, রৌদ্র হঠাৎ সকাল সকাল তার বাড়িতে এলো কেন? সে-তো কাল তাকে বলেই দিয়েছিল, সে চাইলেও এখন কারো সাথে সফট বিহেভ করতে পারবেনা। এটলিস্ট বাদবাকি মানুষজনদের ভালোর জন্য হলেও না। সেক্ষেত্রে রৌদ্র হঠাৎ তার সম্মুখে এসে দাঁড়ালে সে থোড়াই কপট ভাব ধরে থাকতে পারবে! নিজ ভাবনায় নিমগ্ন রেহান। তা দেখতেই গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলেন শাহিন মিয়া। মনোযোগ কাঁড়ার পুরাতন চেষ্টা অবলম্বন করতেই সম্বিৎ ফিরল রেহানের। ছেলেটা নিজেকে খানিক ধাতস্থ করে ত্বরিত নেমে এলো সিঁড়ি ডিঙিয়ে। হকচকিয়ে যেইনা কিছু বলতে যাবে ওমনি তার দৃষ্টি গিয়ে থমকায় বাড়ির সদর দরজার কাছে দু’হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা রৌদ্রের পানে। যার অনিমেষ চোখজোড়া রেহানকেই দেখছে। চোখেমুখে তার নেই বিন্দুমাত্র তাড়াহুড়ো। রেহান ভড়কায়। আমতা আমতা করে গলায় ঝাঁঝ ঢালে কপট। নিজের সত্যবাদী চোখদুটোকে আড়াল করে কপট শক্ত গলায় বলে ওঠে,

“ কেন এসেছিস?”
রৌদ্র মৌন! খানিকক্ষণ চুপচাপ রেহানের দিকে তাকিয়ে থেকে পা বাড়ালো সম্মুখে। গম্ভীর কন্ঠে আওড়ালো,
“ আমার বুড়িকে দেখতে এসেছি।”
রৌদ্রের এহেন ভাবলেশহীন কন্ঠে মনে মনে খানিক স্বস্তি পেলেও বাইরে থেকে যথেষ্ট গম্ভীর এবং শক্ত ভাব ধরে রাখল রেহান। আগের ন্যায় শক্ত গলায় শুধালো,
“ আমার বউকে এমুহূর্তে দেখা যাবে না। সো লিভ নাউ।”

কে শোনে কার কথা! রৌদ্র রেহানের কথাগুলোকে একপ্রকার চুলোয় চড়িয়ে হাঁটছে সিঁড়ির দিকে। তা দেখে রেহান কেমন ছুটে এলো তৎক্ষনাৎ! এগিয়ে এসেই চেপে ধরল রৌদ্রের শক্তপোক্ত ডানহাতের বাহু। রৌদ্রের পায়ের গতি থামল একটুখানি। সে ঘাড় বাকিয়ে শক্ত চাহনি নিক্ষেপ করল রেহানের মুখপানে। ওদিকে রেহান নিরবে ইশারা করে যাচ্ছে রৌদ্রকে। বোঝাচ্ছে — গালি দিস না। গালি দিস না ভাই! রৌদ্র বিচক্ষণ মানুষ। বুদ্ধিমানের ন্যায় ঠিক বুঝে গেল বন্ধু কম ভাইয়ের মনোভাব। সে কেমন বাঁকা হেসে তক্ষুনি এক ঝটকায় নিজের হাতখানা ছাড়িয়ে নিলো রেহানের হাতের বাঁধন থেকে। রেহান পড়ে যাবার ভান ধরল। খানিক দুলে-টুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল পরক্ষণে। ওদিকে রৌদ্র তৎক্ষনাৎ একহাতে চেপে ধরে রেহানের শার্টের কলারের অংশ। এতে খানিক ভড়কালেও মুখাবয়ব শক্ত রাখলো রেহান। দাঁত খিঁচে যেইনা মুখ খুলতে যাবে ওমনি আরেকহাতের দু-আঙুলে ছেলেটার চোয়াল চেপে ধরে রৌদ্র। চিড়বিড়িয়ে বলে ওঠে,

“ আমার বুড়ির সাথে আমি দেখা করবো, যখন ইচ্ছে তখন করব। এতে তুই বাঁধা দেবার কে বে? ভুলেও নিজের অওকাদ ভুলে যাস না। অবশ্য ভুলে গেলেও সমস্যা নেই। কেননা আমার হাতদুটো কিন্তু এখনো বেশ শক্ত আছে। জায়গামত দুয়েকবার পড়লেই সবটা মনে পড়ে যাবে আশা করি।”
কথাটা বলেই রেহানের চোয়াল ছেড়ে দেয় রৌদ্র। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ টেনে, শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে পা বাড়ালো সিঁড়ির পানে। ওদিকে রেহান স্মিত হাসলো। পেছন থেকে শাহিন মিয়া কি বুঝলো কে জানে! বেচারা এক কদম এগিয়ে এসে গলা খাঁকারি দিয়ে শুধালেন,
“ এটা কী হইল ছোট স্যার?”
রেহান তৎক্ষনাৎ মুখাবয়বে গম্ভীর ছাপ টানে। কপট ভাব ধরে বলে,
“ কিছু না। আপনি নিজের কাজে যান।”

শাহিন মিয়া বাধ্য মানুষ। আগ বাড়িয়ে আর তেমন কিছু না বলে চুপচাপ প্রস্থান ঘটালেন সেখান থেকে। রেহানও পা বাড়ায় উল্টোপথে। মাত্র কয়েক লাফে সিঁড়ি ডিঙিয়ে উঠে গেল দোতলায়। তবে এবার আর মহাশয় খুব একটা তাড়া দেখালেন ঘরের দিকে যেতে। কচ্ছপের গতিতে হাঁটছেন তিনি। বারবার দোতলা থেকে দৃষ্টি ফেলছে লিভিং রুমে। দেখছে, আশেপাশে কেউ আছে কি-না!
প্রায় মিনিট পাঁচেক পর, রেহান ঘরে এলো। একহাতে দরজাটা আলতো করে লাগিয়ে দিয়ে, নিরবে পা বাড়ালো সম্মুখে। খানিকটা এগুতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকালো অদূরের বিছানার পাশ ঘেঁষে মেঝেতে বসে থাকা রৌদ্রের পানে। ছেলেটা কেমন নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে নিস্তেজ বোনের দিকে। দু’হাতের মুঠোয় রুহির অবশ হাতখানা আঁকড়ে ধরে, সেথায় ঠোঁট ডুবিয়েছে নিঃশব্দে। বেড়াল চোখদুটো তার আদৌও কথা বলছে কি-না কে জানে। অথচ ঠোঁটের আগায় শব্দ নেই তেমন। রেহান নিঃশব্দে রৌদ্রের পাশে এসে দাঁড়ায়। কান খাঁড়া করতেই শুনতে পায়, রৌদ্র কেমন বিড়বিড়িয়ে বলছে,

“ জানিস বুড়ি? আমি না.. গত বেশ কয়েকদিন ধরে ঠিকমত ঘুমাইনি। ঘুমোতে গেলেই মাথায় জেঁকে বসে হাজারটা চিন্তা। তখন কেন যেন তোর হাতের ব্ল্যাক কফির কথাটা ভীষণ মনে পড়ে। আচ্ছা.. তোর কী আমার কথা মনে পড়ে না বুড়ি? তোর মনে আছে? লাস্টবার তুই আমার কাছে ফুচকা খেতে চেয়েছিলি। আমি কিন্তু বানিয়েছিলাম বুড়ি। হয়তো লবনটা একটুখানি বেশি পড়েছিল। হয়ত তোর মনমতো ঝালটা দিতে পারিনি তেমন। কিন্তু ভেবেছিলাম তুই খেয়ে ঠিক বলবি — ভাইয়া খুব ভালো হয়েছে। তবে তুই তো খেলি না বুড়ি। সে-ই যে ঘুমালি, আর তো উঠলি না…!”

থামলো রৌদ্র। গলার কাছটা হুট করেই ধরে এসেছে তার। বলার মতো কত কথা জমে আছে পেটে, অথচ কন্ঠরুদ্ধ তার। রৌদ্র লম্বা এক নিশ্বাস টেনে নিজেকে সামলায়। উঠে এসে বোনের ললাটে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতেই হঠাৎ টের পায়, রুহির বন্ধ চোখের কার্নিশ বেয়ে চুইয়ে পড়ছে নোনাজল। একমুহূর্তের জন্য থমকায় রৌদ্র। কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিতে তক্ষুনি পেশেন্ট মনিটরে দৃষ্টি ফেলে দেখে — রুহির হার্টবিট ফাস্ট। তারমানে মেয়েটার মধ্যে মিনিমাল কনশাসনেস এখনো আছে। রৌদ্র তৎক্ষনাৎ পেছনে ঘুরতেই রেহান মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে রেখে, অপরাধীর ন্যায় মাথা নুইয়ে রেখেছে সে। রৌদ্র খানিক ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান গলায় আওড়ায়,
“ ওর মিনিমাল কনশাসনেস স্টেট স্টার্ট হয়েছে কবে থেকে?”
রেহান সামান্য ঢোক গিললো বোধহয়। আমতা আমতা সুরে বলল,
“ গত চারদিন আগে।”

কথাটা শেষ হতে যতটুকু না দেরি হলো, তারচেয়ে কয়েকগুণ দ্রুত রেহানের গাল বরাবর সপাটে থাপ্পড় বসাতে দেরি হলোনা রৌদ্রের। মুহূর্তেই ঠাসস..একটা শব্দ তুলে কান গরম হয়ে গেল বেচারা রেহানের। সে কেমন গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠোঁট উল্টে। অথচ রৌদ্রের চোয়াল শক্ত হয়েছে ইতোমধ্যে। সে আবারও এক হিংস্র থাবায় রেহানের চোয়াল চেপে কঠিন গলায় হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,
“ আগে জানাসনি কেন আমায়? কেন বলিসনি ওর কনশাসনেস ফিরেছে? কিরে কথার উত্তর দে!”
রাগে অন্ধ ডাক্তার সাহেব বোধহয় ভুলেই গিয়েছেন, কারো চোয়াল চেপে ধরে রাখলে সে থোড়াই কথা বলতে পারবে! রেহান মোচড়াচ্ছে। ব্যাথায় ককিয়ে যাচ্ছে রীতিমতো। দু’হাতে রৌদ্রের হাত সরানোর আপ্রাণ চেষ্টায় মত্ত থেকে কোনরকমে আধো আধো স্বরে বলল,
“ ভা–ই চো–য়া–ল–টা ছাড়!”

ছাড়লো রৌদ্র। কপালে গোটাকতক ভাঁজ ফেলে, কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রেহানের পানে। ওদিকে রেহান দু’হাতে নিজের চোয়ালখানা চেপে রেখেছে কেমন। সময় নিয়ে নিজেকে সামলে বলল,
“ কিভাবে বলতাম আমি? ফোন দিয়ে বলতাম? না-কি দেখা করে? দুভাবেই তো আমার সকল পথ বন্ধ ছিল। ইভেন আমিতো এখন ভয় পাচ্ছি এ নিয়ে যে মুগ্ধ কোনমতে টের পেয়ে গেল কি-না তুই এখানে এসেছিস। জানলে আবার কোন কাহিনি ঘটায় কে জানে!”
গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা রৌদ্র হঠাৎ করেই কেমন কুটিল হাসল এহেন কথায়। তা দেখে ভ্রু গোটায় রেহান। সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করে উঠে,

“ এভাবে হাসছিস যে? আবার কী হলো তোর?”
রৌদ্র তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর করেনি। ঠোঁটের কোণে আগের ন্যায় কুটিল হাসি বজায় রেখে ঠান্ডা স্বরে শুধালো,
“ জানলে জানুক! দেখি ও আর কী কী করতে পারে।”
হতভম্ব রেহান। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল,
“ তুই আবার কিছু প্ল্যান করিসনি তো? দেখ রোদ! ও কিন্তু সাধারণ কেউ নয়। ও আবার…! ”
“ সো হোয়াট? বাদ দে!”
রৌদ্রের এহেন গা ছাড়া উত্তরে হতবাক রেহান। রয়েসয়ে একটুখানি এগুতেই শোনা গেল রৌদ্রের ভরাট কন্ঠের আদেশ!
“ ফাইটার কোথায়? ওকে নিয়ে আয়।”
থামে রেহান। নিজেকে খানিক ধাতস্থ করে ঠান্ডা স্বরে প্রতিত্তোরে শুধায়,
“ আম্মুর ঘরে আছে। দিস ইজ হিস মিল টাইম।”
রৌদ্র সটান হয়ে দাঁড়ায় এবার। দরজার পানে এগুতে এগুতে বলে ওঠে,
“ চল! ফাইটারের সাথে দেখা করে আসি।”
এহেন কথায় রেহান খানিক চিন্তিত হলো যেন। আচমকা এগিয়ে এসে আওড়াল,
“ ওয়েট রোদ!”
পাদু’টো থামলো রৌদ্রের। ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পরক্ষণে। রেহান কেমন ইতস্তত সুরে বলে ওঠে,
“ একচুয়েলি! আব্বু আম্মু জানেনা এসব বিষয়ে। তারা শুধু এটুকু জানে তোদের সাথে আমার মনোমালিন্য চলছে। এন্ড..এলাস বাট আম্মু আব্বুর সাথে মুগ্ধের ভীষন খাতির। ”
গম্ভীর হলো রৌদ্র। কিয়তক্ষন চুপ থেকে হঠাৎ মাথা নাড়িয়ে শুধালো,
“ বুঝলাম আয়!”

“ কেনো এসেছিস তুই এখানে? চলে যা। এক্ষুণি চলে যা বলছি।”
রেহান চেঁচাচ্ছে। তার ওমন চেচামেচিতে তক্ষুনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন সায়মা খাতুন। কোলে তার ছোট্ট রাহিল। হাত-পা ছুড়ে খেলছে পুতুলটা। সায়মা খাতুন বেরিয়ে এসেই দেখতে পেলেন, রেহান চেচাচ্ছেঁ রোদের ওপর। আর রৌদ্র? ছেলেটা কেমন অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে রেহানের পানে। সায়মা খাতুনের বড় মায়া হলো রৌদ্রের ওমন হাবভাব দেখে। তিনি তক্ষুনি ছেলের ওপর চড়াও হলেন।
“ কি হচ্ছেটা কী রেহান? রোদের সাথে এমনভাবে বিহেভ করছো কেনো?”
রেহান এরূপ কথার প্রতিত্তোর করেনি। উল্টো দাঁত খিঁচে দাঁড়িয়ে রইলো কেমন। এদিকে সায়মা খাতুন রৌদ্রের পানে নরম চোখে তাকায়। আলতো হেসে রাহিলকে রৌদ্রের দিকে বাড়িয়ে দিতে গেলেই রেহান ঘটালো আরেক কান্ড! তৎক্ষনাৎ ছো মেরে রাহিলকে নিয়ে নিলো নিজ বাহুডোরে। কটমটিয়ে শুধালো,
“ খবরদার আমার ছেলেকে ওদের কারো হাতে দিবেনা।”
সায়মা খাতুন হতভম্ব ছেলের এহেন ব্যাবহারে।এদিকে রৌদ্র এবার মুখ খুলল। গলায় ভীষণ অসহায়ত্ব ঢেলে আওড়াল,

“ রেহান! শেষবারের মতো বাবাটাকে একটু ছুঁতে দিবি আমায়? কথা দিচ্ছি! জাস্ট একটু ছুঁবো!”
রেহানের পাথুরে মন নরম হয়নি একটুও। চোখদুটো এখনো জ্বলজ্বল করছে আগের মতো। রাহিল নামক ছোট্ট নবজাতককে বুকের মাঝে ভীষণ গভীরভাবে চেপে রেখেছে সে। রৌদ্র ঠায় দাঁড়িয়ে আছে অসহায় চোখে। হাতদুটো তার এখনো বাড়িয়ে রাখা রেহানের দিকে। কিয়তক্ষন পেরুনোর পরও রেহান যখন রাহিলকে রৌদ্রের হাতে দিলোনা, রৌদ্র তখন আচমকা মোটা কন্ঠে বলে ওঠে,
“ সবার সাথে অভিমান করলি তা নাহয় মুখ বুঁজে মেনে নিলাম, কিন্তু আমি কি দোষ করেছি একটাবার বলবি প্লিজ? কোন দোষের এহেন নিরব শাস্তি দিচ্ছিস আমায় তুই?”

রেহান প্রতিত্তোরে মৌন! বলার মতো তেমন কিছু না পেয়ে হঠাৎ হালকা নাক টেনে আলতো করে রাহিলকে বাড়িয়ে দিলো রৌদ্রের দিকে। রৌদ্র তৎক্ষনাৎ বাচ্চাটাকে দু’হাতে আগলে নেয়। কতদিন পর…ঠিক কতগুলো দিন পর বাচ্চাটাকে একটুখানি ছুঁতে পারলো সে। এই আনন্দেই বেচারা আত্মহারা। দু-কদম দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা রেহান অলক্ষ্যে হাসছে। চোখেমুখে সে-কি স্বস্তির ছাপ তার। ছোট্ট রাহিল তার ছোটো ছোটো হাত-পা ছুড়ছে। গুলুমুলু গালদুটো ফুলিয়ে খিল খিল করছে। রৌদ্র অনিমেষ চোখে তাকিয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। তার অজান্তেই চোখদুটো কেমন ভরে এসেছে তার। কোনরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়াই দুয়েক ফোঁটা অশ্রু টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়ল রাহিলের গুলুমুলু গালের একপাশে। রৌদ্র আলতো করে আঙুল উঁচিয়ে গালটা মুছে দিলো নরমভাবে। ভেজা চোখে খানিকটা হেসে নরম কন্ঠে বলে ওঠে,

“ ভিন দেশে ভালো থেকো ফাইটার! মামা তোমায় ভীষণ মিস করব। তুমি একদম চিন্তা করোনা ফাইটার, খুব শীঘ্রই তোমাকে আমি নিয়ে আসব আবারও। কথা দিচ্ছি তোমায়, সকল পরিস্থিতি তোমার অনুকূলে করে ছাড়বই ইনশাআল্লাহ। তোমাকে, আমার বুড়িকে আর তোমার ঘাড়ত্যাড়া বাপকে ঠিক আবারও নিয়ে যাবো এহসান বাড়িতে। তখন তোমার বাপ বলো কিংবা দাদা, কারোর ধার ধরবোনা আমি! ”
এহেন নিরব হুমকিতে হাসলো রেহান। সায়মা খাতুন তৎক্ষনাৎ পা চালিয়ে চলে গেলেন নিচে। রৌদ্র এসেছে কতগুলো দিন পর। ছেলেটাকে কী আর না খাইয়ে পাঠাবেন তিনি? তাইতো তিনি ছুটলেন দ্রুত। ওদিকে তিনি যেতেই রেহান চুপচাপ এগিয়ে এসে দাঁড়ালো রৌদ্রের কাছাকাছি। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
“ তুই কিন্তু আমার চাইতেও কয়েকগুণ ভালো অভিনয় করিস বাডি!”
এহেন কথায় ভ্রু উঁচিয়ে তাকায় রৌদ্র। বাঁকা হেসে একহাতের তর্জনী দিয়ে চোখের অশ্রুগুলো আলতো করে মুছতে মুছতে জবাব দিলো,
“ আই নো দ্যাট!”

দুপুর হয়েছে বেশ! এহসান বাড়ির পরিবেশ আজ ভীষণ ঠান্ডা। বাড়িতে ছেলেমেয়ে গুলো একটাও নেই। তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে অন্যত্র। আপাতত বাড়িতে আছেন বয়োজ্যেষ্ঠরা। লাঞ্চ টাইম। ডাইনিং টেবিল ভর্তি খাবারের সমারোহ। দু’ধারের চারটে চেয়ারে বসে আছেন বাড়ির চার কর্তা। কারো মুখে তেমন রা নেই। আছে কেবল একরাশ দুশ্চিন্তা। জুবাইদা বেগম চুপচাপ ভাত সার্ভ করে দিচ্ছেন প্রত্যেকের প্লেটে। রাইসা বেগম রান্না ঘরে ছুটেছেন লেবু কাটতে। ওদিকে মাইমুনা বেগম ও রাফিয়া বেগম কেমন বিরস মুখে তরকারি বাড়ছেন। তরকারি বাড়ার একপর্যায়ে হঠাৎ সকলের কানে এলো বাইরের চেচামেচির শব্দ। রাফিয়া বেগম ভ্রু কুঁচকালেন এহেন চেচামেচির শব্দ পেয়ে। হাত থেকে তক্ষুনি তরকারির বাটিটা নামিয়ে রেখে যেইনা উদ্যোত হলেন ডাইনিং ছাড়তে ওমনি ডাইনিং রুমে গটগট পায়ে প্রবেশ করল মুগ্ধ। তার সে-ই চিরচেনা গম্ভীর রুপে। সাদা ফিনফিনে কাপড়ের একখানা শার্ট জড়ানো গায়ে, যার হাতা গুটিয়ে রাখা কনুই অব্ধি। গলার কাছের বেশ কয়েকটা বোতাম হা করে খুলে রেখেছে বেয়াদব ছেলে। যার দরুন তার লোমহীন ফর্সা বুকখানা সহজেই চক্ষু গোচর। চোখে আটাঁ নীল রঙা রোদচশমা। কপালের চামড়ায় ব্যান্ডেজের পরিবর্তে এখন শোভা পাচ্ছে ওয়ান টাইম স্ট্রিপ। ছেলেটা কেমন কোমরের পিঠে দু’হাত বেঁধে এসে দাঁড়ালো ডাইনিং এ। রোদচশমার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাদামী চোখদুটো এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ঠোঁটে ঝোলাল তীর্যক বাঁকা হাসির রেশ। ভরাট কন্ঠে কৌতুকের টান মেরে বলল,

“ কি অবস্থা সবার? খাচ্ছিলেন না-কি?”
এমন একটা সময়ে এরূপ উদ্ভট কথায় বড্ড বিরক্ত বাড়ির সকলে। তায়েফ সাহেব তো রেগেমেগে বোম! তক্ষুনি বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মহাশয়। ওদিকে মুগ্ধ খানিকটা এগিয়ে এসেছে টেবিলের দিকে। আগ বাড়িয়ে টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা খাবারগুলোর একে একে ঢাকনা সরিয়ে দেখতে লাগল কী রান্না হয়েছে। প্রথম বাটিতে কাতলা মাছের ঝোল দেখেই নাক সিটকায় মুগ্ধ। বিড়বিড়িয়ে বলল,
“ এসব বালছাল মানুষ খায়?”
বিড়বিড় করে বলা কথাটাও বেশ শুনলেন বাড়ির সবাই। মুহূর্তেই চোখেমুখে স্পষ্ট রাগ ছেয়ে গেল সবার। মুগ্ধ এবার আরেকটু এগিয়ে দ্বিতীয় বাটির ঢাকনা সরায়। সেথায় মাংসের উপস্থিতি দেখেই গাল বাকাঁয় সে। ঢাকনাটা ধ্রিম করে বাটির গায়ে ছুড়ে মেরে, তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বলে ওঠে,
“ মাথার ওপর আমি নামক আস্ত শনি ঘোরপাক খাওয়া স্বত্বেও মুখে দেখি রুচির শেষ নাই আপনাদের! বাহ! ভালোই তো।”
এবার আর চুপ করে থাকতে পারলেন না তায়েফ সাহেব। তক্ষুনি গর্জে ওঠে শুধালেন,
“ ইউ স্কাউন্ড্রেল! কোন সাহসে আমার বাড়িতে আবারও পা রেখেছ তুমি? এক্ষুণি বের হও আমার বাড়ি থেকে নাহলে কিন্তু তোমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিব বলে দিলাম!”
এহেন কটুবাক্য গায়ে ধরেনি মুগ্ধের। ছেলেটা কেমন গা-ছাড়া ভাব নিয়ে চেয়ার টানলো একহাতে। সেথায় বসতে বসতে কুটিল হেসে বলল,

“ উড়ি বাবা! খাইরুল এহসানের ছেলের তো দেখি মুখ থেকে পা*য়ুপথ অব্ধি সাহস আর সাহস। শেষে কি-না আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিবে? আসলেই?”
তায়েফ সাহেব আগুন চোখে তাকালেন। পারছেন না এই চোখের দৃষ্টি দিয়ে এক্ষুণি ঝলসে দিতে মুগ্ধকে। মুগ্ধ আড়দৃষ্টিতে দেখল তা। অতঃপর ইচ্ছে করে তায়েফ সাহেবকে দেখিয়ে পায়ের ওপর পা তুলল। পা নাচাতে নাচাতে হঠাৎ কেমন মোচড়ামুচড়ি করতে লাগল চেয়ারে বসে। বাড়ির গৃহিণীরা শক্ত মুখে তাকিয়ে আছেন কেবল। মুগ্ধ খানিক সময় নিয়ে হাত ঘুরিয়ে কোমর থেকে রিভলবারটা বের করে এনে রাখল টেবিলের ওপর। তা দেখতেই ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলেন বাড়ির গৃহিণীরা। মুগ্ধ বোধহয় ইচ্ছে করেই করল কাজটা। একহাতে আলতো করে চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে এনে ভাঁজ করে রাখল শার্টের বোতামের সঙ্গে। বাড়ির গৃহিণীদের পানে শান্ত চোখে তাকিয়ে থেকে ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি টেনে ভাবলেশহীন গলায় বলল,
“ পেছনে ভীষণ খোঁচাচ্ছিল, তাই সামনে নিয়ে এলাম।”
হতভম্ব সবাই। মুগ্ধ এবারেও বাঁকা হাসে। একহাতের কনুই ঠেকায় চেয়ারের হাতলে। পরক্ষণে ভরাট কন্ঠে গাল বাকিয়ে আওড়ায়,

“ আসলে কী বলুনতো! আমি আমার জিহবার ওপর খুব একটা লাগাম টানতে পারলেও, আমার রিভলবারের ওপর ওতো লাগাম টানতে পারিনা। এটা সবসময় আমার একধাপ আগে আগে ছোটে। এই যেমন আমার কাউকে ভাল্লাগলোনা, আমি হয়তো জিভ খসিয়ে তাকে কিছু বললাম না তবে আমার এই বন্দুকটা কিন্তু চুপ করে বসে থাকেনা। তৎক্ষনাৎ নিজের কাজ করে বসে। আশা করি বুঝছেন ব্যাপারটা!”
নিরব ধমকি! এ যেন নিরব ধমকি। বেয়াদব ছেলে কথাটা কোন আঙ্গিকে বলেছে তা আর বুঝতে বাকি নেই তায়েফ সাহেবসহ বাকি সবার। তায়েফ সাহেব তক্ষুনি গলায় ঝাঁঝ ঢাললেন ফের। চিড়বিড় করে শুধালেন,
“ তোমার এই ফোকলা ধমকি-ধামকি কিংবা ব্ল্যাকমেইলিং অন্য কাউকে গিয়ে দেখাও। ভুলেও আমার সামনে এসব করতে আসবেনা। তোমার মতো বিদেশি গুন্ডাকে আর যাইহোক আমি তায়েফ এহসান ভয় পাই না।”
গাল বাঁকায় মুগ্ধ। ঘাড়টা সামান্য বাকিয়ে সরু চোখে তাকায় তায়েফ সাহেবের পানে। একহাত উঁচিয়ে ঘাড়ের একপাশ সামান্য চুলকাতে চুলকাতে আওড়ায়,

“ এই বয়সে এতো চিল্লাবেন না ডিসি সাহেব। পরে আবার দেখা যাবে, সময়ের আগেই উপরে পৌঁছে গেছেন। সেক্ষেত্রে কি দরকার শরীরের ওপর ওতো জুলুম করার?”
রাগটা যেন তরতর করে বাড়ছে তায়েফ সাহেবের। চোখেমুখে লেপ্টে গিয়েছে অদৃশ্য আগুন। মানুষটা তৎক্ষনাৎ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শক্ত হাতের থাবা বসালেন টেবিলের ওপর। মুহূর্তেই কাঁচের টেবিলটায় এক বিকট শব্দ হলো। এতে আশপাশের সবাই ঘাবড়ালেও বিন্দুমাত্র হেলদোল হলোনা মুগ্ধের। ছেলেটা উল্টো ভ্রু উঁচিয়ে ঠেস মেরে শুধালো,
“ শরীরে দেখছি তেলের অভাব নেই আপনার! ভালোই তো জোর দেখাতে পারেন দেখছি!”
তায়েফ সাহেব নিজেকে আর সংবরণ করে রাখতে পারলেননা। তক্ষুনি পা ঘুরিয়ে ছুটে আসতে লাগলেন মুগ্ধের দিকে। তবে খুব কাছে আসার আগেই মুগ্ধ আলতো করে হাত বাড়িয়ে বন্দুকটা তুলে নেয় নিজ হাতে। যা দেখতেই থেমে গেলেন তায়েফ সাহেব। ভীষণ রাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন খানিকটা দূরে। মুগ্ধ আড়চোখে দেখলো তা। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি লেপ্টে চটপট উঠে দাঁড়াল বসা ছেড়ে। পরনের সফেদ রঙা ফিনফিনে শার্টটাকে খানিক ঝাঁকিয়ে, নজর বুলালো এদিক-ওদিক। খানিকটা সন্দিষ্ট কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ আপনাদের বাড়ির বড় ছেলে আছে না? কি যেন নাম তার?”

রৌদ্রের কথা উঠতেই কেঁপে ওঠেন জুবাইদা বেগম। দূর্বল দেহটা কেমন কাঁপছে রীতিমতো। ওদিকে মুগ্ধ অপেক্ষমান উত্তরের। কিন্তু কেউ কী আর যেচে পড়ে উত্তর দিলো তার প্রশ্নের? এতে অবশ্য রাগ হয়নি মুগ্ধের। সে কেমন ক্রুর হেসে আবারও চশমাটা চোখে পড়ল। কঠিন গলায় আচমকা বলল,
“ ঐ মাঙ্গির নাতীকে বলে দিবেন, ও যাতে যথাসম্ভব আমার হাতের নাগালের বাইরে থাকে। অবশ্য দূরে থাকলোও লাভ নেই। আমি যেদিন ধরব, একদম ওর দুপা দু’দিকে ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেলব। বলে দিয়েন!”
এরূপ ধমকিতে নিশ্বাস আঁটকে গেল জুবাইদা বেগমের। মানুষটা কেমন টলতে লাগলেন দেখো। পাশ থেকে রাফিয়া বেগম তৎক্ষনাৎ দু’হাতে আগলে ধরেন তাকে। এদিকে মুগ্ধ এবার ভ্রু গোটায়। চেয়ারের ওপর দু’হাত রেখে সামান্য ঝুঁকে দাঁড়ায়। তায়েফ সাহেবের পানে সরু দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কী ডিসি সাহেব? মেয়েকে লুকিয়ে রেখেছেন নিশ্চয়ই?”

অজানা তথ্য জেনে যাওয়ায় খানিকটা অপ্রস্তুত হলেন তায়েফ সাহেবসহ বাকিরা। একে-অপরের সঙ্গে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন এরইমধ্যে। মুগ্ধের নজরে বেশ ধরা পড়ল সব। ছেলেটা এবার কুটিল হেসে শুধালো,
“ শেয়ালের ভয়ে যতই মুরগীকে পাতালের তলে সিন্দুকের ভেতর লুকিয়ে রাখেন না কেনো, শেয়াল কিন্তু সময়মত মুরগী শিকার করবেই!”
তায়েফ সাহেব ঘাবড়ে গেলেন। কপাল বেয়ে চুইয়ে পড়ছে ঘাম। মুগ্ধ আর দেরি করলোনা। বাঁকা হেসে পা বাড়ালো উল্টো পথে। কিন্তু এরইমধ্যে তার আবার কি হলো কে জানে! এক-দু পা এগুতেই সে আবার হুট করেই পা থামিয়ে ঘাড় কাত করে চাইলো তায়েফ সাহেবের মুখপানে। বাহাতের তর্জনী দিয়ে চোখ থেকে চশমাটা খানিক নিচু করে এনে, শান্ত অথচ গম্ভীর কন্ঠে ফের ঠেস দিয়ে বলল,

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৬

“ অতিরিক্ত তেলমশলা জাতীয় খাবার খাওয়া কমিয়ে দিন ডিসি সাহেব। কেননা এখন থেকে রোজ নিয়ম করে আপনার প্রেসার বাড়ানোর দায়িত্ব আমার। এন্ড ইউ নো হোয়াট? এই কাজটা আমি কিন্তু খুব ভালো করে করব।প্রমিস!”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৭