Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৫

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৫

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৫
আরোবা চৌধুরী আরু

সাইফান ধীরে ধীরে জারিনের দিকে এগিয়ে এল। সোজা হাত বাড়িয়ে জারিনের এক হাত ধরে টেনে নিল নিজের খুব কাছাকাছি।
জারিন হালকা চমকে উঠল।
” কী করছো…?”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সাইফান একটু ঝুঁকে পড়ল। পরের সেকেন্ডেই জারিনের অধরে নিজের অধর ছুঁইয়ে দিল।
হঠাৎ পাওয়া সেই স্পর্শে জারিনের চোখ বড় হয়ে গেল, কিন্তু সে সরে গেল না। বরং অজান্তেই সাইফানের বাহু আঁকড়ে ধরল। মুহূর্তটা যেন থেমে রইল। কিছুক্ষণ পরে ধীরে ধীরে আলাদা হলো দুজন। দুজনেই জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সাইফান একটু হাসল। আঙুল দিয়ে আলতো করে জারিনের ঠোঁট ছুঁয়ে মুছে দিল।
তারপর ফিসফিস করে বলল,

” চশমা… অমৃত খেতে এত স্বাদ কে? এত স্বাদ কেন?? ”
জারিন লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে।সাইফান সেটা দেখে মুচকি হেসে বলল,
” ইশশ… বউ, লজ্জা পাওয়ার তো কিছুই হয়নি এখনো। অনেক কিছু বাকি আছে।”
জারিন সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে সাইফান হেসে ফেলল।
” আরে আরে, এত ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো তোমার স্বামীই। ”
বলেই হঠাৎ জারিনকে কোলে তুলে নিল।জারিন অবাক হয়ে বলল,
” এই! নামাও! কেউ দেখে ফেলবে!”

— দরজা বন্ধ। কেউ দেখবে না।
সাইফান হেঁটে গিয়ে তাকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজেও পাশে বসে পড়ল। হাত বাড়িয়ে রুমের লাইট অফ করে দিয়ে ডিম লাইট জ্বালিয়ে দিল, তারপর জারিন এর দিকে তাকানো দেখলেও মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে ও লজ্জায় সেটা দেখে মুচকি হাসলো, নিজের শার্ট খুলে দূরে ছুড়ে মারল। জারিন এর ওপর আজ শোয়া হয়ে হাত বাড়িয়ে জারিনের পিট উঁচু করে জারিনের জামা খুলে টান দিয়ে ফেললো। জারিন সাথে সাথে চোখ বুজে ফেলল।
সায়ফান জারিন এর অধরে নিজের অধর মিলিয়ে দিল তারপর।জারিনের শরীরে নিজের হাতের ছুড়াই ভরিয়ে তুলল, আস্তে আস্তে ঘর জুড়ে দুইজন নর-নারীর নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ভোরে উঠলো। অবশেষে সাইফান তার বাসর করার স্বপ্ন সফল হল।

অন্যদিকে……
রুহি হাসিমুখে আকাশ আর রিশাকে রুম পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দিল। রুমের ভেতরে ঢুকতেই দুজনেই থমকে গেল। বিছানাটা সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো। চারপাশে নরম আলো, যেন পুরো ঘরটাই অন্যরকম একটা আবহে ভরে আছে। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আকাশ ধীরে ধীরে রিশার দিকে তাকাল। তার চোখে আজ অদ্ভুত এক আবেগ। কয়েক সেকেন্ড পর হঠাৎই সে সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
তারপর রিশাকে জড়িয়ে ধরে ফেলল। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় রিশা একটু চমকে উঠল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই বুঝতে পারল আকাশ কাঁদছে। তার কাঁধ কাঁপছে। আকাশ নিচু গলায় বলল

” রিশা… আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।”
রিশা কিছু বলল না। শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
ভালোবাসার মানুষের মুখ থেকে যখন ভালোবাসার কথা শোনা যায়, তখন বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত উষ্ণতা জন্ম নেয়। মনে হয় যেন অনেকদিনের জমে থাকা অপেক্ষা এক মুহূর্তে পূর্ণ হয়ে গেল।
রিশার চোখ ভিজে উঠল। আকাশ আবার বলল
“আমি কখনো তোমাকে এভাবে দূরে ঠেলে দিতে চাইনি… বিশ্বাস করো। পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করেছিল। কিন্তু আজ একটা কথা দিচ্ছি… আর কোনোদিন তোমাকে ছাড়ব না।”
তার গলায় কাঁপন ছিল। রিশা ধীরে ধীরে নিচু হয়ে বসল। তারপর আকাশকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মৃদু হেসে বলল,

“আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি… ব্ল্যাক ডায়মন্ড।”
হঠাৎ এত জোরে জড়িয়ে ধরায় আকাশ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল।
ঠাস করে দুজনেই মেঝেতে পড়ে গেল।আকাশ নিচে, আর তার ওপর রিশা।এক মুহূর্তের জন্য দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল একে অপরের দিকে। তারপর দুজনেই হেসে ফেলল। হাসির পর ধীরে ধীরে নেমে এল নীরবতা। এই নীরবতা অস্বস্তির না ভালোবাসার। আকাশ হাত বাড়িয়ে আলতো করে রিশার কপালের কাছে নেমে আসা চুলগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল।
তারপর একটু ঝুঁকে এল। রিশার চোখ দুটো ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
নরমভাবে তাদের দুজনের দূরত্ব মিলিয়ে গেল। আকাশ নিজের অধর জোড়া রিশার অধরে মিলিয়ে দিলো, কথা ছাড়াই ভালোবাসা আদান-প্রদান হতে লাগল—নীরব গভীর এক অনুভূতিতে।

পরদিন বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটা। ঘরের পর্দার ফাঁক দিয়ে রোদের আলো ধীরে ধীরে বিছানার উপর এসে পড়েছে। নরম আলোটা গিয়ে পড়েছে জারিনের মুখে। জারিন ধীরে ধীরে চোখ খুলল।কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না সে কোথায় আছে। তারপর হঠাৎই আগের রাতের কথা মনে পড়তেই তার গাল লাল হয়ে উঠল। সে একটু নড়তেই টের পেল, কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। জারিন ধীরে ঘুরে তাকাল। সাইফান একদম কাছে শুয়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো, মুখে শান্ত একটা হাসি। মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরেই হয়তো জেগে আছে। চোখ খুলেই সাইফান মুচকি হেসে বলল,

“ঘুম ভাঙলো, চশমা আপা?”
জারিন লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।
“এতক্ষণ তাকিয়ে ছিলে?”
” হুম।”
“কেন?”
সাইফান একটু ঝুঁকে এসে ধীরে বলল,
” ভাবছিলাম… তুমি এখন পার্মানেন্টলি আমার হয়ে গেছো।”
জারিন লজ্জা পেয়ে বলল
“কী সব বলো!”
সাইফান হেসে তার নাকটা আলতো ছুঁয়ে দিল।
” সারারাত আমার সাথে আকাম কুকাম করে এখন বলছ,, কি সব বলি আমি?? আজব একখান বউ পাইছি আমি আল্লাহ?? ”
জারিন তার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে ফেলল।

” এসব কথা বলতে লজ্জা লাগে না?”
” না। একদম না? একদমই না। তুই পা লজ্জা হালার বউ। আমি লজ্জা পেলে আমার বংশধর পয়দা হবে কেমনে। এত অবুঝ হলে চলে বউ? হে আল্লাহ আমার বউকে একটু রোমান্টিক করে তোলো, একটু বুদ্ধি দাও।
জারিন রেগে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই, দরজায় জোরে ধাক্কা।
দুজনেই চমকে উঠল। বাইরে থেকে রায়ানের গলা,
” এইইই সাইফান! এখনো ঘুমাচ্ছিস নাকি?”
তারপর রাজিব বলল,
” ওরে বের হ! তোর বাসর তো শেষ হয়েছে! এখন জনগণের সামনে আস!”
বাইরে সবাই হো হো করে হাসতে লাগল। রায়হানের গলা শোনা গেল
“এই শালা, দরজা খুল! আমরা ব্রেকফাস্ট করছি, আর তুই এখনো রুমে!”
রিশা মজা করে বলল,

” ভাবি কি এখনো ছাড়ে নাই নাকি?”
আরেক দফা হাসির শব্দ। জারিন লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলল।
” আল্লাহ! এরা কি শুরু করলো!”
সাইফান বিরক্ত হয়ে বলল,
এদের কোনো কাজ নাই।”
আবার দরজায় ধাক্কা,
” এই সাইফান! বের হ! নাকি আবার বাসর শুরু করবি?”
সাইফান চিৎকার করে বলল’
” ধুর! মানুষরে শান্তিতে থাকতে দিবা না?”
বাইরে থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর,
“না!”

সাইফন বিরক্ত হয়ে এবার উঠে এসে দরজা খুলে দিল, দরজা খুলে দিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে হ্যাবলাকান্তের মতো করে হাসি দিয়ে বলল,
“রোমান্টিক বউ পাইছি আমাকে ছাড়তেই না দেখ শুটকি তুই একদম ঠিক কথা কইছস তোর ভাবি আমারে ছাড়তেছে না। আমার পারফরমেন্স এত ভালো। ”
জারিন রেগে উঠে দাঁড়ালো সবার সামনে এসব কি বলছে এই ব্যাটা শুধু ওকে লজ্জা ফেলি সবার সামনে। জারিন উঠে গিয়ে সাইফানের পিঠে এক কিল মেরে দিল। হঠাৎ পিছন থেকে এভাবে আঘাত পাওয়াই সাইফান দুই হাত দুইজনের দিয়ে চিল্লাতে থাকলো,
“এ বউ এ চশমা সারারাত এত আদর দিলাম আর তুই কিনা আমারে এমনি মারছোস এখন। আল্লাহ সইবে না এইসব বলে দিলাম। ”

হতে সবার কথা বলার মধ্যে সায়মান আর নাফিসা উপস্থিত হল। সায়মান সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল
“আড্ডা শেষ হয়েছে? তাহলে সবাই তাড়াতাড়ি রেডি হও। আমরা রাশিদ ভিল্লায় যাবো।”
কথাটা শুনে যেন মুহূর্তের মধ্যে সবাই চুপ হয়ে গেল। সায়ফান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী বললে? রাশিদ ভিল্লা?”
সবচেয়ে বেশি অবাক হলো নাফিসা। সে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে সায়মানের দিকে। তার মনে পড়ল কতবার সে বলেছে সেখানে যেতে। কিন্তু সায়মান কখনো রাজি হয়নি। আজ হঠাৎ নিজেই নিয়ে যাচ্ছে? তাহলে কি… সত্যিই তার মন গলে গেছে?
ভাবতেই নাফিসার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা বড় হাসি ফুটে উঠল।সায়মান সেটা খেয়াল করল, কিন্তু কিছু বলল না। শুধু বলল,
” সবাই আধা ঘন্টার মধ্যে রেডি হয়ে নিচে আসো।”

কিছুক্ষণ পর সবাই রেডি হয়ে গাড়িতে উঠল।অনেকদিন পর নাফিসা যাচ্ছে রাশিদ ভিল্লায়। অবশেষে গাড়ি এসে থামল বড় গেটের সামনে। গেট খুলে সবাই ভেতরে ঢুকতেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আফিয়া বেগমের চোখ সবার আগে গিয়ে পড়ল নাফিসার উপর। এক মুহূর্তও দেরি করলেন না।
“নাফু”
বলেই প্রায় দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
” আমার মেয়ে এসেছে… আমার মেয়ে!’
বারবার নাফিসার মুখে চুমু দিতে লাগলেন।
“আমি আর ভুল করব না মা… কোথাও যেতে দেব না তোকে… আমার কাছে থাকবি।”
নাফিসাও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।
” মামনি… শান্ত হও… আমি তো এসে গেছি।”
আফিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
” আর যাবি না তো?”
“না মামনি।”
নাফিসা তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগল।কিছুক্ষণ পর আফিয়া বেগম চোখ মুছে এবার সায়মানের দিকে তাকালেন।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বললেন,

” তেহু আব্বা… আমারে মাফ করে দে।”
বলেই তাকে জড়িয়ে ধরে আবার কেঁদে ফেললেন।
“আমি আর এমন ভুল করব না।”
সায়মান মাকে ধরে শান্ত গলায় বলল,
” আচ্ছা আম্মু… ঠিক আছে… শান্ত হও। ”
ধীরে ধীরে সবাই ভেতরে ঢুকল। বাড়ির সবাই একে একে এসে দেখা করতে লাগল। ইমা বেগম, বিলকিস আর সাবিয়া খালেদ আর রাইমা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। দুইজনেই চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে নাফিসার দিকে। মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ।
সবাই নাফিসাকে ঘিরে থাকায় তাদের মুখগুলো আরো গোমড়া হয়ে আছে। হঠাৎই সাইফান সামনে এসে দাঁড়িয়ে জোরে চিৎকার করে উঠল,

” কেউ আমার দিকে তাকাও!”
সবাই চমকে তাকাল তার দিকে। সাইফান বুক চাপড়ে বলল,
” আমি বিয়ে করেছি! আমার বউ আছে! কিন্তু কেউ আমারে দেখতেছে না! আমাকে কেউ ভালোবাসে না!”
ঠিক তখনই আফিয়া বেগম এগিয়ে এসে সাইফানের কান মুলে দিলেন।
“ঢং কম কর!”
সাইফান চিৎকার করে উঠল
“আম্মু!”
আফিয়া বেগম রাগে বললেন,
“বউকে কিডন্যাপ করে তুলে নিয়ে এসে বিয়ে করছো, আর এখন ঢং করছো! তোমার বাবা ঐদিকে তোমার ভুলের মাশুল গুনতেছে!
তোমার শ্বশুর আর বউয়ের ভাই যুদ্ধক্ষেত্র বানাইছে। পাগলের মতো খুঁজতেছে তোমাদের!
সাইফান কিন্তু একটুও বিচলিত হলো না। ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৪

“আম্মু, এখন খুঁজে লাভ নাই।”
সবাই তাকিয়ে আছে সায়ফানের দিকে।সে মুচকি হেসে বলল,
” যা করার আমি করেই ফেলছি। আর একটা খবর দেই? তুমি খুব তাড়াতাড়ি দাদী হতে চলছো!
এর মাঝেই ইমা বেগম ঝট করে এগিয়ে এসে সাইফানের পিঠে এক চাপ্পড় বসিয়ে দিলেন।
” নির্লজ্জ ছেলে!”
সাইফান লাফিয়ে উঠে বলল,
” আরে আম্মা! সত্যি কথা বললাম!”

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৬৬