Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৯

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৯

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৯
জান্নাতি আক্তার জারা

___” তুমি রেডি বৌমা কোথায় ?
ভদ্র মহিলা হানিফ কে সিড়ি বেয়ে লাগেজ উঁচু করে ধরে নিচে নামতে দেখে বলল কথাটা,হানিফ নিজের মায়ের কথায় লাগেজ ড্রয়িং রুমে রেখে দিয়ে হাতের গুছানো কোটটা লাগেজের উপর রেখে ছোট করে উওর করলো,
___” রুমে রেডি হচ্ছে ।
হানিফের কথায় ভদ্র মহিলা নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে হতাশা কন্ঠে বলল,
___” বৌমা রেডি হচ্ছে আর তুমি বৌমা কে একা ফেলে নিচে চলে এসেছো তাইতো?
হানিফ মায়ের কথায় কিছুটা বিরক্ত কন্ঠে গম্ভীর গলায় বলল,
___” আম্মু উনি শাড়ি পরছে,আমি রুমে থেকে কী করবো?
হানিফের কথায় ভদ্র মহিলা রাগী গলায় বলল,
___” কী করবে মানে, তুমি বৌমা কে শাড়ি পড়তে হেল্প করবে।
হানিফ ভদ্র মহিলাকে আঁড়চোখে একনজর দেখে লাগেজের উপর থেকে কোট নিয়ে শরীরে জরিয়ে নিতে নিতে গম্ভীর গলায় বলল,
___” আম্মু উনাকে নিচে আসতে বলেন লেট হয়ে যাচ্ছে।

ভদ্র মহিলা হতাশ হয়ে হানিফের কাছে এসে দাঁড়ালো, ছেলের কাঁদে এক হাত রেখে বুঝানোর ন্যায় বলে উঠলেন,
___” বিয়ের তো তিনমাস পেরিয়ে গেলো, এভাবে দুজন দুজনের থেকে দূরে থাকলে তোমাদের সম্পর্ক এগোবে কী ভাবে, মেয়েটা তোমার বউ,সময় থাকতে যত্ন করো আগলিয়ে রাখো, চোখের সামনে তো তোমার ছোট ভাই কে দেখছো, এই তিনমাসে কেমন অগোছালো হয়ে গেছে আমার ছেলেটা।
ভদ্র মহিলা আরশের কথা বলতেই চোখ পানিতে ভরে উঠলো, হানিফ নিজের মা’কে দু’হাতে আগলে নিয়ে শান্ত করতে বলল,
___” আম্মু কান্না করবেন না, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
ভদ্র মহিলা হানিফের কথার বিপরীত বলে উঠলো,
___” ইনশাল্লাহ তাই যেন হয় বাবা।
হানিফ মুখে মেকি হাসি টেনে হাতে সময় দেখে নিয়ে বলল,

___” আম্মু আপনার বৌমা কে দ্রুত নামতে বলেন, উনাকে গ্রামে পৌঁছে দিয়ে আমাকে ব্যাক করতে হবে।
মা ছেলের কথোপকথনের মধ্যে আরশ কে সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে দেখা গেলো, চোখমুখ বরাবরের মতো শুকনো, মাথার চুলগুলো এলোমেলো, শরীরে ঢিলেঢালা পাতলা সাদা শার্ট আর সাদা প্যান্ট, এই তিনমাসে ছেলেটার মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে, সবসময় চুপচাপ গম্ভীর থাকে, আরশ ভার্সিটি থেকে বাড়ি ফিরলো, ড্রয়িং রুমে নিজের বড়ভাই আর আম্মু কে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে, তাঁদের পাশ কেটে দু-তিন সিড়ি বেয়ে উঠে গেলো নিজের রুমে যাওয়ার জন্য, দু-তিন সিড়ি যেতেই ভদ্র মহিলা আরশ কে পিছু ডাক দিলেন,
___” আরশ দাঁড়াও।
আরশ মায়ের কথায় জায়গায় দাঁড়িয়ে পরলো, কিন্তু পিছু ফিরলো না, ভদ্র মহিলা হানিফ কে একনজর দেখে নিয়ে আরশ কে বলল,
___” বৌমা গ্রামে যাবে বাবা-র বাড়িতে, হানিফ আজকে পৌঁছে দিয়ে আসবে, তুমি তো গ্রামে যাওয়া আসা করো দুদিন পড়ে বৌমা কে নিয়ে ফিরো।
আরশ গম্ভীর মুখে বলল,

___” ওকে।
আরশ বড়বড় পা ফেলে সিড়ি বেয়ে নিজের রুমে চলে গেলো, হানিফ পুনরায় বিরক্ত মুখে নিজের মা’কে বলতে লাগলো,
___” আম্মু আর কত ওয়েট করবো, আসতে বলেন উনাকে।
ভদ্র মহিলা বলল,
___” হ্যাঁ দাঁড়াও ডাকছি, বৌমা, বৌমা, তুমি শাড়ি পড়তে পেরেছ, হেল্প লাগবে আসবো?
উপর থেকে মিষ্টি কন্ঠ ভেসে এলো,
___” আম্মু আমার হয়ে গেছে এক মিনিট।
ভদ্র মহিলা হানিফের দিকে তাকালো, হানিফ মুখে খানিকটা বিরক্ত মিশিয়ে বলল,
___” উনার এক মিনিট যাবে না, এক মিনিট বলতে বলতে আধাঘন্টা লাগিয়ে দিলো।
হানিফের বিরক্ত মুখ দেখে ভদ্র মহিলা মুখটিপে হাসতে লাগলো, হানিফ নিজের মা’কে হাসতে দেখে বলল,
___” আম্মু আপনি হাসতেছেন ?
হানিফের কথায় ভদ্র মহিলা নিজের হাসি আটকে রেখে বলল,
___” না আমি কোথায় হাসলাম, ছোট মানুষ শাড়ির সঙ্গে সাজগোজ করেছে মেবি, একটু ওয়েট করো এসে পড়বে।
___” এই তো আম্মু আমি রেডি।

দুজনের কথোপকথনের মধ্যে মিষ্টি কন্ঠ শুনতে পেয়ে দুজনেই সিড়ির দিকে তাকালো, হানিফ সিড়ির দিকে তাকাতেই থমকে গেলো,উজ্জ্বল ফর্সা শরীরে লাল টকটকে সিলকে শাড়ী,সঙ্গে হাতে লাল চুড়ি, চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া, ঠোঁটে হালকা করে লিপিস্টিক আর চোখে কাজল,এতেই তিশা কে অপরূপ সুন্দর লাগছে মুখে এক টুকরো হাসি ঝুলে নিচে নামছে, তিশা নিচে নেমে শাশুড়ির সামনে এসে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে বলল,
___” আমি রেডি আম্মু, আমাকে কেমন লাগছে ?
তিশা শাশুড়ী কে কথাটা বলে হানিফের দিকে আঁড়চোখে একবার তাকালো,হানিফ কে চোখের পলক ফেলতে না দেখে তিশা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে নিলো, ভদ্র মহিলা তিশার কথায় হানিফ কে একনজর দেখে নিয়ে মুচকি হেঁসে তিশার গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
___” মাশাআল্লাহ আমার বৌমা কে একদম আসমানের পরী লাগছে, কারো নজর না লাগুক আমার বৌমার উপর,অলরেডি একজনের লেগে গেছে।
শাশুড়ীর কথায় তিশা আরো বেশি লজ্জা পেয়ে শাশুড়ী কে জরিয়ে ধরে আঁড়চোখে হানিফের দিকে তাকায়, মায়ের কথায় হানিফ তিশার থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে কাশতে লাগলো, হানিফ কে কাশতে দেখে ভদ্র মহিলা মুখটিপে হেঁসে বললেন,
___” পানি লাগবে বাবা?
হানিফ কাশতে কাশতে আঁড়চোখে নিজের মায়ের বুকে জরিয়ে ধরা তিশার দিকে চেয়ে বলল,
___” নো আই এম ফাইন, লেট হয়ে যাচ্ছে, আমাদের এখন বের হওয়া উচিত।
হানিফ কথাটা বলে গটগট পায়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো, তিশা শাশুড়ির বুকে মাথা রেখেই হানিফের যাওয়ার দিকে চেয়ে বিরবির করতে করতে মুখ বাঁকালো,

___” নো আই এম ফাইন, বদ লোক একটা, কত সময় নিয়ে কত কষ্ট করে শাড়ি পরে সাজলাম, আর উনি ঠিকমতো তাকালো না পর্যন্ত বদ লোক কোথাকার ।
তিশা কে বিরবির করতে দেখে ভদ্র মহিলা বলল,
___” কিছু বলছো?
তিশা শাশুড়ী কে ছেড়ে দিয়ে সোজা হতে হতে বলল,
___” না আম্মু।
ভদ্র মহিলা হাসি মুখে বলল,
___” আচ্ছা ঠিক আছে যাও তাহলে, হানিফ গাড়িতে অপেক্ষা করছে, আমার ছেলে কে আর অপেক্ষা করাও না।
তিশা হাসি মুখে মাথা ঝাকিয়ে বাড়ির বাহিরে যেতে নিলো, ভদ্র মহিলা পুনরায় বললেন,
___” আমার বাড়ি টা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, দুদিনের বেশি থাকবে না কিন্তু, দুদিন পড়ে আরশের সঙ্গে চলে এসো।
তিশা পিছু ফিরে বলল,

___” ঠিক আছে আম্মু আসলাম, আল্লাহ হাফেজ।
তিশা বাড়ি থেকে বের হয়ে গার্ডেনে এলো, হানিফ গাড়ি পার্ক থেকে বের করে তিশার জন্য অপেক্ষা করছিলো, তিশা গাড়ির সামনে আসতেই হানিফ নিজের পাশের সিটের দরজা খুলে দিলো, তিশা চুপচাপ বসে পরলো গাড়িতে, আজকে কতদিন পড়ে যাচ্ছে গ্রামে, মুখ থেকে যেন খুশি সরছে না, হানিফ আঁড়চোখে একনজর তিশা কে দেখে বলল,
___” মাশাআল্লাহ শাড়িতে অনেক সুন্দর লাগছেন।
তিশার মুখের হাসি আরো গারো দেখা গেলো হানিফের কথায়, মুখ হাসি নিয়ে ছোট করে বলল,
___” থ্যাঙ্কস।
হানিফ গাড়ি চালানোতে মনযোগ দিয়ে বলল,
___” মোস্ট ওয়েলকাম।

আমেরিকা,
মিম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের পুরোনো সৃতিচারণ করছে, হ্যাঁ পুরোনো সৃতি, দেখতে দেখতে নিউইয়র্কে আসা তিনমাস বারো দিন হতে চলল, এখনো ঠিকমতো নতুন শহর নতুন মানুষ নতুন পরিবেশ প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে উঠতে পারেনি, সেই চিরচেনা শহর মানুষ গুলো কে মিস করে সবসময়, অচেনা শহরে সারাদিনের ক্লান্তি ব্যস্ততার শেষে যতটুকু সময় পায় নিজের জীবনে ফিরে যায়, সৃতিগুলো পুরোনো বাট ভাবনা সেই একি, বাড়িতে কথা হয় না বহুদিন , প্রথম প্রথম রুপোলী বেগম কে ফোন দিলে তিনি অভিমানে ফোন উঠায় না, এই তিনমাসে মিম নিজের মায়ের অভিমান ভাঙতে ব্যর্থ হয়ে আর ফোন করে না, তালুকদার বাড়িতে ফুপির সঙ্গে মাঝেমধ্যে টুকিটাকি কথা বললেও এখন আর নিজে থেকে কথা বলে না, তাঁদের সঙ্গে কথা বললে বাড়ির কথা মনে পড়ে, তাঁদের কাছে ছুটে যেতে মন চায়, মিম তো কেনো পিছুটান রাখতে চায় না, আরাত আইরার সঙ্গে টুকিটাকি কথা হয়,যদিও তিনমাসে সবমিলিয়ে পাঁচ থেকে ছয়বার হবে হয়তো তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, কিন্তু সময় নিয়ে না দুএক মিনিট মতো কথা হয়েছে প্রত্যেকবার, বাড়ির কথা উঠলে মিম এড়িয়ে অন্য প্রসঙ্গ টানছে বারবার, শুধু তাকবীরের সঙ্গে যোগাযোগ চলে মিমের, সবাই সবার লাইফ নিয়ে ব্যস্ত, হয়তো ব্যস্ততার আড়ালে যতটুকু হাতে সময় পায়, গতদিন গুলোর কথা মনে করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, খানিকক্ষণ হয়তো হতাশায় ডুবে থাকে, এইতো মিম সেই গতদিন গুলো সৃতিচারণ করছে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে,

___” ইউ আর লস্ট ইন আনাদার ওয়ার্ল্ড এগেইন?
হটাৎই একটা মেয়ের কন্ঠে মিম নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো, মেয়েটা আর কেউ না মিমের রুমমেট, মিম ছোট একটা বাংলোতে উঠেছে, একা একা টাকা খরচ বেশি হবে বিধায় মেয়েটার সঙ্গে বাংলো শেয়ার করে, মিম পিছু ফিরে দেখলো মেয়েটা ওয়েস্টিন ড্রেস পড়া, মিম মেয়েটা কে দেখে ছোট করে বলল,
___” নো আই এম অলরাইট আর ইউ গোয়িং টু দ্য পার্টি?
মেয়েটা হাসি মুখে বলল,
___” ইয়া।
মিম একটা মলিন হাসি উপহার দিয়ে পুনরায় জানালার দিয়ে বাহিরে তাকালো, মিমের মন খারাপ দেখে মেয়েটা মিমের পাশে এসে বলল,
___”কাম উইথ মি টু দ্য পার্টি, ইউ’ল ফীল সুপার হ্যাপি!
___” নো, আইম গুড অ্যাট হোম, ইউ গো অ্যান্ড এনজয় দ্য পার্টি।
___” ওকে বাই বাই।
মেয়েটা ঠোঁট উল্টে কথাটা বলে চলে গেলো, এ আর নতুন কিছু না, মিম ভার্সিটি থেকে বাড়ি ফিরে রান্না করে খেয়ে ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দেয়, আর এই মেয়ের মধ্যে কেনো কান্ত খুঁজে পায় না মিম, ভার্সিটির শেষে রাতে পার্টিতে যায় নিত্যদিন, গভীর রাতে ফেরে কেনোদিন তো ফিরতে ফিরতে রাত তিনটা চারটা বেজে যায়, দেখা যায় নিত্যদিন নতুন নতুন ছেলে এসে মেয়েটা কে বাড়ি নামিয়ে দিয়ে যায়, আবার কখনো মেয়েটা মাতাল অবস্থায় ছেলেগুলোর গলা জড়িয়ে ধরে হেলতে হেলতে হেঁটে আছে, আর ছেলেরা মেয়েটা কে তাঁর রুমে শুয়ে দিয়ে যায়, মিম প্রথম প্রথম বিরক্ত হতো রাগ লাগতো, মেয়েটা কে দেখে ঘিন্না হতো, বাংলো ছেড়ে দিতে মন চাইতো, কিন্তু মেয়েটার কথাবার্তা ভালো, আর এগুলো তো এই দেশে নরমাল, চারপাশে এমনই চলে, মিম যখন পুনরায় নিজের ভাবনায় মগ্ন তখনই মাথায় গাট্টা খেয়ে পিছনে ফিরে তাকায়, মাথায় হাত দিয়ে পিছনে ফিরে তাকাতেই একটা ছেলের হাস্যজ্জ মুখ দেখে মিম মুখ অন্ধকার করে চিল্লিয়ে উঠে ছেলেটার উপর,

___” ডাফার ….
ছেলেটা হাসি মুখে দুহাত প্রসারিত করে মেলে দিয়ে মাথা ঝুকে বলে,
___” ইয়েস ম্যাম ?
ছেলেটার রেসপিরেশন দেখে মনে হচ্ছে, ক্লাসে ম্যাম নাম ডাকছে আর ছাএ প্রেজেন্ট করছে, মিম কিছুই বলল না মলিন মুখে ছেলেটা কে দেখছে, ছেলেটা মিম কে গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে ডিভোর্স পেপার মিমের সামনে ধরে বলল,
___” ডিভোর্স পেপার।
মিম ডিভোর্স পেপার নামটা শুনা মাএ কিছুটা চমকে ছেলেটার হাতের দিকে তাকালো, কী আজব তাই-না মিম নিজেই ডিভোর্স পেপার রেডি করতে বলছে, অথচ ডিভোর্স পেপার রেডি হতে দেখে মিমের ঠোঁট কাঁপছে চোখের পাতা পিটপিট করে চেয়ে আছে, সবকিছু রেডি শুধু মিমের একটা সাইন তাহলে এই বন্দি জীবন থেকে একিবারে মুক্ত, ছেলেটা মিমের দিকে বাড়িয়ে দিলো পেপার,
___” সিগনেচার করে দেও।
মিম কিছুটা সময় নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে দিয়ে ডিভোর্স পেপার হাতে নিয়ে দেখতে লাগলো,
___” ওয়াই আর ইউ সো লেইট ?

মিম ছেলেটার কথায় বিছানায় বসে পরলো, ছেলেটা নিজের কাছে থাকা কলম মিম কে দিলো,মিম কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে দিয়ে কলম নিয়ে ডিভোর্স পেপারের দিকে অপলক চেয়ে আছে, কোথাও একটা মন বাঁধা দিচ্ছে, আবার আরেক মন বলছে, মুক্ত হয়ে যা মিম, তুই বন্দী জীবন থেকে মুক্ত হয়ে যা, যে সম্পর্কে তোর কেনো ভেলু নেই, সেই নামহীন সম্পর্ক থেকে মুক্ত হয়ে যায়, কেনো পিছুটান রাখিস না, তুই তো মুক্ত হতে এসেছিস, সমাজের চোখে কলঙ্ক বানানো ছেলেটাকে সাজা দিতে এত দূরে এসেছিস, তুই তো মেনে নিয়েছিস তুই ডিভোর্সি, মিম নিজের ভাবনায় এতটা মগ্ন হয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলছে, চোখের পানিতে ডিভোর্স পেপারের উপর ফোঁটা ফোঁটা পানি তে ভিজে গেলো, ছেলেটা মিম কে নীরবে চোখের পানি ফেলতে দেখে বলল,

___” মন থেকে বের করে দেওয়া উচিত, যে তোমাকে সবসময় মনের মধ্যে কষ্ট দিচ্ছে।
মিম ছেলেটার কথায় হুঁশে ফিরলো, মলিন হাসি দিয়ে বলল,
___” মন থেকে বের করে দেওয়া টা কী এতোই সোজা, তুমি পেয়েছো ?
মিমের কথায় ছেলেটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো, কয়েক সেকেন্ড মিমের মুখপানে চেয়ে থেকে ধীর কন্ঠে বলে উঠে,
___” অতীত ফিরে চাইলে সামনে এগোতে পারবো না, এখন ওর জায়গাটা আমার কাছে যেমন, পেয়ে গেলে হয়তো তাঁর মূল্যায়ন করতে পারতাম না, সবকিছু কী পেতেই হবে, থাক না কিছু অপূর্ণতা, অপূর্ণতা ঘিরেও বেঁচে থাকা যায়, অতীতের সুন্দর অনুভূতির সৃতিচারণ নিয়ে।
ছেলেটার কথায় মিম মলিন মুখে ডিভোর্স পেপারে কাঁপা কাঁপা হাতে সাইন করতে করতে বিরবির করলো,

___” আপনাকে কাগজে মুক্ত করলাম, মন থেকে পারলাম না,আপনি আমার মনের কোণে আজীবন থেকে যাবেন, তবে ভালোবাসা হয়ে না আমার জীবনের অভিশপ্ত এক পুরুষ হয়ে, আপনার কথা মনে পড়লে আমার মনে পড়বে, আপনার কারণে নিজের পরিবার নিজের গ্রাম শহর এমনকি সমাজের চোখে কলঙ্ক হয়ে দে-শ ছাড়তে হয়েছি, মুক্ত হলাম আমি এই না হওয়া বন্দী সংসার থেকে।
মিম ডিভোর্স পেপার সাইন করে চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো, চোখের কোণ থেকে পানি গড়িয়ে পরছে, আর নেই কেনো পিছুটান, এখন একদম মুক্ত, ছেলেটা ডিভোর্স পেপার নিয়ে মিম কে একপলক দেখে নিয়ে ধীর পায়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো, মিম এবার বালিশে মাথা গুঁজে এতক্ষণের আটকে রাখা কান্না হাউমাউ করে কান্না করতে লাগলো, কান্না করতে করতে চিৎকার দিতে দিতে বলল,

___” আপনি কেনো আমাকে জোর করে বললেন না, আমার তো তোমারেই লাগবে,তোমারেই লাগবে মিম, আপনি কেনো স্বামীর অধিকার ঘাঁটিয়ে আমাকে আটকালেন না, আমি সেদিন বারবার এয়ারপোর্টের বাহিরে তাকাচ্ছিলাম, এই বুঝি আপনি এসে আমাকে আটকাবেন, আটকিয়ে বলবেন মিম তুমি আমাকে ফেলে যেও না, তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না, আমি শুধু আপনার পথ চেয়েই থাকলাম আপনি আর আসলেন না, আমাকে আটকিয়ে বললেন না, থেকে যাও মিম,অধিকার খাটিয়ে বললেন না, আমি যা বলবো তুমি শুনতে বাধ্য, তুমি আমার বিয়ে করা বউ আমার কথা তোমাকে মানতেই হবে, যানেন নিজের সাথে সর্বচ্চো পর্যায়ে খারাপ হওয়ার পরও নিজেকে নিষ্ঠুর বানাতে পারি নি, আপনার জন্য আমার এই হতভাগা হৃদয় টা পুড়ে, এইদিন আপনি যদি আসতেন আজকে আমাদের সুন্দর একটা সংসার হতে পারতো, আমরাও সুখী হতে পারতাম, কিন্তু আপনি আমার অভিমান ভাঙ্গাতে আসেন নি, আমি কলঙ্কের দাগ পাইলাম, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা পাইলাম, পাইলাম না শুধু আপনারে।
মিম চিৎকার দিয়ে কান্না করতে করতে একপর্যায়ে মাথা ব্যায়ায় ক্লান্ত হয়ে সেন্স হারিয়ে ফেললো, পড়ে থাকলো দূর দেশে একা এক বাংলোতে সেন্স হারিয়ে, হয়তো বাড়িতে থাকলে এভাবে পড়ে থাকতে হতো না, তাঁর পরিবার তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতো, কিন্তু আজকে কেউ জানলোই না তাঁদের মেয়ে অর্তনাদ করতে করতে সেন্স হারিয়ে পড়ে আছে।

কেটে গেছে আরো পাঁচ-ছয় দিন, আরাত তাকবীর একিবারে রেডি হয়ে নিচে নেমে এলো, পুরো তালুকদার বাড়ি বদলে গেছে, আগের মতো আর হইচই নেই, নেই কেনো হাসাহাসি আড্ডা মজা, সবাই সবার মতো, রাহিমা সুলতানা আর আগের মতো আসে না, না আসে আলভী, মিম আমেরিকা যাওয়া আর রশ্মিরাত আলেদা হয়ে যাওয়ার প্রায় ছয়-সাত দিন পড়ে তালুকদার বাড়িতে কিছু মূহুর্তের জন্য আনন্দ ফিরে এসেছিল বাড়িতে নতুন অতিথির আগমনের খবর পেয়ে, হ্যাঁ আইরা পেগনেন্ট,আইরা প্রেগনেন্ট কথা টা যখন পুরো বাড়ি সরিয়ে পরছিলো, বাড়িতে হটাৎ করে খুশির আমেজ ফিরে এসেছে, কয়েক মূহুর্তের মধ্যে ভরপুর খাওয়া দাওয়ার আয়োজন,সঙ্গে আনাস এর পাগলামি, আনাস আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদারের সঙ্গে যখন বাড়ি ফিরে, ড্রয়িং রুমে আইরা কে ঘিরে মা বড়মা আর আনহা শেখ আরাত কে খুশি মনে গল্প করতে দেখে অবাক হয়ে যায়, আনহা শেখ যখন হাসি মুখে সবাই কে আনন্দের সংবাদ শুনায় কয়েক সেকেন্ড জন্য আনাস তব্দা খেয়ে সোফাতে বসে থাকা আইরার দিকে চেয়ে থাকে, আহাদ তালুকদার যখন আনাস এর কাঁধে হাত রাখে, আনাস উৎফুল্লতায় নিজের বোধবুদ্ধি ভুলে গিয়ে খুশি তে আহাদ তালুকদার কে বলতে লাগে,

___” বাবা আমি আমার বাবার বাপ হবো।
আনাস এর মুখে এমন উদ্ভট কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে আনাস এর মুখপানে চেয়ে একসঙ্গে বলে উঠলো,
___” মানে।
আনাস উৎফুল্লতায় নিজের অগোছালো কথায় জিভে কামড় বসিয়ে পুনরায় ভুলভাল বলতে থাকে,
___” না আমি আমার বেটার বাপ হবো উফফফ নাহহহ আমি আমার বউয়ের বাচ্চার বাপ হবো।
আনাস ভুলভাল বকে হাসি মুখে আইরার কাছে এসে সবার সামনে আইরার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়, বাড়ির সবাই অবাক হয়ে তব্দা খাওয়া মুখে আনাস কে দেখতে দেখতে হটাৎ শব্দ করে হেঁসে উঠে, সবার মুখে খুশির ঝিলিক, তাকবীর বাড়িতে প্রবেশ করা মাএ আনাস ভুলভাল কথা গুলো কানে পড়ে, আঁড়চোখে সোফার দিকে চেয়ে বাড়ির সাবাই কে একখানে দেখতে পেয়ে কিছু না বলে নিজের রুমে চলে যায়, আরাত তাকবীর কে উপরে যেতে দেখে সবাই কে রেখে নিজেও রুমে চলে আসে, রুমে এসে দেখে তাকবীর শাটের বোতাম খুলছে, আরাত হাসি মুখে তাকবীরের সামনে এসে বলল,

___” আমরা বেবি কবে নিবো ?
আরাতের লিলিপ্ত কথায় তাকবীর শাটের বোতাম খুলতে খুলতে ভ্রু কুঁচকে আরাত কে দেখতে লাগলো, আরাতের মধ্যে আগের মতো নেই আর কেনো সংকোচ, অথচ তাকবীর একটু ছুঁয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লজ্জাবতী গাছের মতো ঝিম ধরে যাবে, আরাত পুনরায় তাকবীর কে বলে উঠলো,
___” আমার বেবি চাই ।
তাকবীর কয়েক সেকেন্ড আরাত কে দেখে গম্ভীর গলায় বলল,
___” আগে বড় হও তারপর ভেবে দেখবো এখন চুপচাপ পড়তে বসো।
আরাত ঠোঁট উল্টে তাকবীরের কথার বিপরীতে বলে উঠলো,
___” বাট আমি বড় হতে হতে আপনি তো বুড়ো হয়ে যাবেন?
তাকবীর চোখ পাকিয়ে ধমকে উঠলো,

___” রাতততত।
তাকবীরের ধমকে আরাত মুখ অন্ধকার করলো, আরাত যানে তাকবীরের ধমক এই পর্যন্তেই, মুখ অন্ধকার করে হাতে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে রইলো , তাকবীর আরাত কে গাল ফুলাতে দেখে হতাশ হয়ে একটা নিশ্বাস ফেলে আরাত কে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো, আরাত আগের মতো মুখ ফুলিয়ে আছে, তাকবীর মুচকি হেঁসে আরাতের গালে হাত রেখে আদুরে ভঙ্গীমায় বলে উঠলো,
___” তুমি নিজেই একটা ছোট কিউট বেবি, এইযে বাচ্চা দের মতো বাহানা ধরেছো,তুমি পিচ্চি হয়ে আরেক পিচ্চি কে সামলাতে পারবে ?
আরাত তাকবীরের কথায় লজ্জারত মুখে তাকবীরের খুলা বুকে নক দিয়ে আঁকাআকি করতে করতে বলল,
___” আপনি সামলাবেন আমাদের।
আরাতের কথায় তাকবীর বলে উঠলো,
___” আল্লাহ মাপ করুক, একটা বাচ্চা কে ঠিকঠাক সামলাতে পারি না, আরেকটা বাচ্চা আমার দ্বারা ইম্পসিবল বউ।
আরাত তাকবীরের কথায় নাক ছিটকে বলল,

___” আমি এতটাও ছোট না।
___” তাই ?
___” হুম।
তাকবীর দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” ওকে চলো তাহলে।
আরাত অবাক কন্ঠে,
___” কোথায়?
তাকবীর আগের ন্যায় বলে উঠলো,
___” তোমার বেবি লাগবে, নতুন করে প্রিপারেশন নিতে হবে না, লেটস গো ।
আরাত তাকবীরের কথার মানে বুঝতে পেয়ে তাকবীর কে নিজের থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে যেতে যেতে বলল,
___” আমি ফান করছিলাম।
তাকবীর শব্দ করে হেঁসে উঠে, আরাতের দৌড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
___” বাট বউ আই এম সিরিয়াস।
আরাত সেদিনের কথাগুলো ভাবতে ভাবতে শব্দ করে হেঁসে উঠলো, আহিন আরাত কে হটাৎ হাসতে দেখে বলল,
___” আপু তোমাকে ভূত ধরেছে এভাবে হাসো কেন?

আহিনের কথায় আরাত নিজের হুঁশে ফিরে এলো, হাসি মুখ বন্ধ করে আশেপাশে তাকালো, খাবার টেবিলে সবাই কে অবাক হয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরাত পুনরায় তাকবীরের দিকে তাকালো, তাকবীর ভ্রু কুঁচকে আরাতের দিকে চেয়ে আছে, আদিবা তালুকদার আইরার পাশে দাঁড়িয়ে আইরা কে ডিমের খোসলা ছাড়িয়ে দিচ্ছে, কেউ আরাতের হাসির কারণ বুঝতে পারছে না, আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার আনাস তাকবীর আহিন আদিবা তালুকদার রাবেয়া তালুকদার সবাই খাবার টেবিলে উপস্থিত, সবাই সবার মতো করে চুপচাপ খাবার খাচ্ছে, তারমধ্য হটাৎ আরাত শব্দ করে হেঁসে উঠলো, আরাত নিজের হাসিতে লজ্জা পেয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে মাথা নিচু করে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো, আইরার চারমাস চলছে, পেটটা একটু উঁচু দেখা যায়, এদিকে আরিশার আটমাস চলছে, তালুকদার বাড়ি সবসময় মনমরা হয়ে থাকলেও আইরার প্রেগন্যান্টের খবর শুনার পর থেকে কিছুটা আনন্দ আর আইরা কে ঘিরে সবার পাগলামি তে চলছে তালুকদার বাড়ি।

তাকবীর আরাত কে ভার্সিটির সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলো, আরাত ভার্সিটির মাঠে ঢুকে সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করছে, আরাত এখন প্রায় একা হয়ে গেছে, না মিম আছে না রশ্মি আছে, সন্ধ্যা আরাতের সঙ্গে থাকে, তাঁর পাশাপাশি মিরার সঙ্গে আড্ডা দেয়, মিরা আরাতের সঙ্গে কথা বলে না, আরাত বই থেকে মুখ তুলে পিছনের ফিরে তাকালো, মিরা আর সন্ধ্যা আড্ডা দিচ্ছে, আর কিছুক্ষণ পরপর হেঁসে উঠছে, সেদিনের পর থেকে আরাত রশ্মি কে আর দেখে নি কলেজে, না মাহির কে দেখা গেছে, আরাত নিজেও আগ বাড়িয়ে মিরার কাছে রশ্মির কথা জানতে চাইনি, এভাবে চলছে আরাতের দিন, কেমন যেন কলেজ লাইফটা ফেকাসে হয়ে গেছে আরাতের জীবনে, আগে কত সুন্দর হাসিখুশি ছিলো, আর এখন কলেজে এসে মলিন মুখে কলেজ শেষ করে চলে যায়, মিরার দায়িত্ব যেন রাফির উপর পড়েছে এখন, মাহমুদ ইসলাম রাফি কে রিকোয়েস্ট করছে যেন মিরা কে ছোট বোন মনে করে প্রতিদিন বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে, সকাল বেলা মাহমুদ ইসলাম মিরা কলেজে রেখে যায়, আর ছুটির পর রাফি পৌঁছে দেয়, সন্ধ্যা মিরা কে বলে উঠলো,

___” আমার প্লান কতদূর কাজ করছে ?
মিরা সন্ধ্যার কথায় ভাবান্তর হয়ে বলে উঠলো,
___” এখনো রেজাল্ট আসেনি, দেখি সামনে কী হয়।
সন্ধ্যা বলে উঠলো,
___” কী হয় আমাকে জানিয়ে দিও।
মিরা ছোট করে বলল,
___” হুম।
মিরা ছুটির শেষে প্রতিদিনের মতো আজকেও ভার্সিটির মাঠে রাফির জন্য ওয়েট করছে, কিছুক্ষণ ওয়েট করার পড়ে রাফি কে বড়বড় পা ফেলে মিরার দিকে আসতে দেখা গেলো, রাফি মিরার সামনে এসে দাঁড়াতেই মিরা অবাক হয়ে জানতে চাইলো,
___” বাইক কই আপনার ?
রাফি মিরার কথার উত্তর না করে গম্ভীর স্বরে উল্টে মিরা কে প্রশ্ন করে উঠলো,
___” তোমাকে গতকাল দেখতে এসেছিল?
মিরা রাফির কথায় আমতা আমতা করে বলে উঠলো,
___” ভাইয়ার সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে ?
মিরা কে অন্য প্রসঙ্গ টানতে দেখে রাফির চোখমুখ আরো গম্ভীর হয়ে এলো, মিরার চোখে চোখ রেখে কন্ঠে কিছুটা রাগ মিশিয়ে বলল,
___” এটা আমার প্রশ্নের জবাব না আমি তোমাকে পরিস্কার করে একটা বলছি আমাদের মধ্যে কোনো তৃতীয় ব্যাক্তি আসলে আমি মেনে নিবো না।

রাফি কেনো ভনিতা ছাড়ায় সরাসরি কথাটা বলে পার্কিনের দিকে হাঁটা ধরলো, মিরা কয়েক সেকেন্ড থম ধরে দাঁড়িয়ে থাকলো, সন্ধ্যার প্ল্যান কাজে দিয়েছে তাহলে,মিরা রাফির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ভেবে মুখে মুচকি হাসি ফুটে উঠলো, পুনরায় রাফির পিছনে দৌড়ে রাফির কাছাকাছি এসে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাঁটতে লাগলো, মিরা রাফির পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলে উঠলো,
___” আপনার কথার মানে কী ?
মিরা রাফির থেকে খুচরে খুচরে কথা বের করতে চাইছে, রাফি বুঝতে পেয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে মিরার দিকে চেয়ে বলল,
___” আমাকে বিয়ে করবে?
মিরার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো, মিরা এতটাও আশা করেনি, রাফি মিমের চোখে চোখ রেখে পুনরায় বলে উঠলো,

___” আমাকে তোমার হাসবেন্ড বানাবে, আমি তোমার যন্ত নিবো, প্রতিদিন বাইকে করে তোমাকে ভার্সিটি আনবো, দুজন একসঙ্গে কফি খাবো, তোমাকে কখনো ডিস্টাপ করবো না প্রমিস, প্লিজ তুমি আমাকে তোমার হাসব্যান্ড বানিয়ে নেও!
মিরা পুরো রোবট হয়ে গেছে, মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না, সন্ধ্যা মিরাকে একটা প্লান বলে, সন্ধ্যার প্লান অনুযায়ী মিরার মিথ্যা বিয়ের নিউজ সাজিয়ে রাফির সামনে তুলে ধরা, আর মিরা এতে সফল হয়েছে, মাহমুদ ইসলাম রাফি কে ভুলভাল বুঝিয়েছে, আর রাফি ভুলভাল শুনে বিশ্বাস করে মিরা কে নিজের অনুভূতি বলে দিলো, রাফির কাছে মিরা একটা অভ্যাসে পরিনত হয়েছে, মিরা রাফি কে লাইক করে রাফি আগে থেকে জানতো, মাঝখান থেকে আইরা কে ভালোবেসে মিরা কে ইগনোর করছে, এই কয়েক মাসে রাফি মিরা কে খুব কাছে থেকে লক্ষ করছে, যেহেতু রাফি জানে মিরা আগে থেকে রাফি কে লাইক করে, সেই ধারণা থেকে রাফি নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে চাইলো, এখন আবার মিরার বাড়ি থেকে মিরার বিয়ে দিতে ছেলে খুঁজছে, রাফি যখন জানতে পারে, অজানা রাগ চোখমুখে দেখা যায়, মিরা মুখে অসহায় টেনে বলে উঠলো,

___” আম্মু আব্বু মেনে নিবে না, আপনি যদি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়, তাহলে আম্মু আব্বু তাঁর সঙ্গে আমিও রাজি হয়ে যাবো প্রমিস করলাম ।
মিরার কথায় রাফি কেনোকিছু না ভেবে বলে উঠলো,
___” ওকে আসবো বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।
মিরা মুচকি হাসি দিলো, রাফি এখনো মিরা কে মন থেকে ভালোবাসতে পারেনি, মিরা কে ভালো লাগতে শুরু করছে, এই যে ভার্সিটির শেষে একসঙ্গে বাইকে লিফট দেওয়া, মাঝেমধ্যে রাস্তায় বাইক আটকে এটাওটা কিনে দেওয়া, এ-সব থেকে মিরার প্রতি ভালো লাগা, আসতে আসতে হয়তো ভালোবাসা তে পরিনত হবে, কিন্তু তাঁর আগে মিরার বিয়ের কথা শুনে রাফি ঠিক করে নিলো, রাফি নিজের পরিবার কে নিয়ে মিরা দের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবে, রাফি বাইকের কাছে এসে পার্কিং থেকে বাইক বের করে মিরা কে উঠতে বলল,

আরশ ভার্সিটি থেকে ফিরছে আধাঘন্টা হবে, ভার্সিটি থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে কালো ঢিলেঢালা শার্ট পড়ে আয়নায় সামনে মাথায় চুলগুলো পরিপাটি করছে, তিশা শাশুড়ীর সঙ্গে ড্রায়িং রুমে বসে গল্প করছে, হানিফ বাড়ি ফেরেনি এখনো, বউ শাশুড়ী গল্প করার মধ্যে কলিং বেল বেজে উঠলো, একে একে দুবার কলিং বেল বাজতেই তিশা ওর শাশুড়ী কে বলল,
___” আমি দেখছি।
তিশা বসা থেকে উঠে এসে গেইট খুলে দিতেই গেইটের সামনে একটা অচেনা বয়স্ক ভদ্রলোক কে দেখতে পেলো, মিম ভদ্রলোক কে সালাম নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
___” কাকে চাই ?
তিশার কথায় ভদ্রলোক বলল,
___” আরশ স্যার কে চাই, উনি কী বাড়িতে আছে ?
তিশা মাথায় কাপড় ভালোভাবে দিতে দিতে স্বাভাবিক ভাবেই উওর করলো,
___” হ্যাঁ আপনি ভিতরে এসে বসেন, আমি ভাইয়া কে দেখে দিচ্ছি।
ভদ্রলোক তিশার কথায় বলে উঠলো,
___” না না ম্যাম আমি বসবো না, এই ফাইল টা আরশ স্যারের জন্য,আমেরিকা থেকে কুরিয়া এসেছে
তিশা অবাক হয়ে ভদ্রলোকের থেকে ফাইল টা হাতে নিলো, অচেনা ভদ্রলোক ফাইলটা দিয়ে বিদায় নিলো, তিশার শাশুড়ী মেন গেটের কাছে এসে বলল,

___” কে এসেছে বৌমা ?
তিশা ফাইল টা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে বলল,
___” আম্মু আরশ ভাইয়ের জন্য আমেরিকা থেকে পার্সেল এসেছে।
আমেরিকা থেকে আরশের জন্য পার্সেল এসেছে শুনে ভদ্র মহিলা অবাক হয়ে দ্রুত পায়ে তিশার কাছে এসে বলল,
___” দেখি দেখাও তো।
তিশা শাশুড়ীর হাতে ফাইল টা দিলো, ভদ্র মহিলা তিশার মতো ফাইল টা উল্টেপাল্টে দেখে আরশের রুমে হাঁটা ধরলো, তিশাও শাশুড়ীর সঙ্গে আরশের রুমে এলো, আরশ তখন কেচ পরছিলো, মা আর ভাবি কে নিজের রুমে দেখে ভ্রু কুঁচকালো, ভদ্র মহিলা আর আরশ কে রেডি হতে দেখে বললেন,
___” আজকেও যাবে ?
আরশ নিজের মনে কেচ পড়তে পড়তে গম্ভীর গলায় ছোট করে উওর করলো,
___” হ্যাঁ।
ছেলের কথায় ভদ্র মহিলা বলে উঠলো,

___” এই যে প্রতিদিন ভার্সিটি থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাইক টেনে গ্রামে যেতে তুমি বিরক্ত হও না?
মায়ের কথায় আরশ উত্তর করলো না, এটা নতুন না বিগত দুইমাস থেকে আরশ এটাই করে আসতেছে, এক্সিডেন্ট করে বিছানায় প্রায় পনেরো দিনের বেশি থাকতে হয়েছে, শরীর পুরোপুড়ি ঠিক না হতেই ভার্সিটি টু গ্রাম যাওয়া আসা করছে, বাড়ির সবাই এই অসুস্থ শরীরে বাইক নিয়ে বের হতে বারণ করে কেনো লাভ হয় না, আরশ নিজের মন মতো চলে, আরশ কেচের ফিতা বাঁধতে বাঁধতে তিশা কে বলল,
___” ভাবী আমাকে এক কাপ কফি বানিয়ে দেন।
তিশা আরশের কথায় হুম বলে নিচে নেমে গেলো, ভদ্র মহিলা আরশের দিকে ফাইল টা এগিয়ে দিয়ে বলল,
___” তোমার জন্য পার্সেল এসেছে।
আরশ মায়ের কথায় কপাল কুঁচকে তাকিয়ে ছোট করে বলল,
___” পার্সেল?
ভদ্র মহিলা আরশের কথায় স্বাভাবিক গলায় বলল,

___” হ্যাঁ পার্সেল আমেরিকা থেকে নাকি এসেছে, মনে তো হচ্ছে কিছু পেপার…
আমেরিকা থেকে এসেছে কথাটা শুনা মাএ আরশের কপালের ভাজ সোজা হয়ে গেলো, দ্রুত মায়ের হাত থেকে ফাইল টা নিয়ে ব্যাকুল হতে খুলতে লাগলো, ভদ্র মহিলা আরশের ব্যাকুলতা দেখে অবাক হয়ে দেখছে আরশ কে, তিশা কফি নিয়ে আরশের রুমে প্রবেশ করে শাশুড়ীর মতো অবাক হয়ে আরশ কে দেখতে দেখতে বলল,
___” ভাইয়া আপনার কফি।
আরশ ফাইল খুলতে খুলতে বলল,
___” রেখে দেন।
তিশা আরশের কথা অনুযায়ী কফিটা বেডসাইডের উপর রেখে দিলো, আরশ ফাইল খুলে পেপারের চোখ বুলাতেই চোখ বন্ধ করে বিছানার উপর ধপাস করে বসে পরলো, আরশ কে এভাবে বিছানায় বসতে দেখে ভদ্র মহিলা আরশের হাত থেকে পেপার টা নিয়ে দেখতে লাগলো, তিশাও শাশুড়ীর সঙ্গে পেপারে চোখ বোলাচ্ছে, আরশের ক্রোধে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, চট করে চোখ মেলে মায়ের হাত থেকে ডিভোর্স পেপার কেড়ে নিয়ে মিমের হাতের সিগনেচারের দিকে রক্ত চক্ষু নিক্ষেপ করে রইলো, ভদ্র মহিলা তিশা কে একপলক দেখে অসহায় মুখে আরশের কাঁধে হাত রেখে বলতে লাগলো ,

___” আমাকে কথা দেও নিজের কেনো ক্ষতি করবে না…..
আরশ ডিভোর্স পেপারের দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
___” আম্মু আমাকে একা ছাড়ো।
ভদ্র মহিলা আগের ন্যায় বলে উঠলো,
___” না আগে আমাকে বলো নিজের ক্ষতি কর…..
আরশ এবার আর নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারলো না, বেডসাইডে পা দিয়ে লাথি দিতে দিতে রাগী গলায় বলতে লাগলো,
___” আমি বলছি না আমাকে একা ছাড়ো, বেরিয়ে যাও আমার রুম থেকে গেট আউট অফ মাই রুম।
বেডসাইডে পা দিয়ে লাটি দেওয়ার কারণে গরম কফি সিটকে এসে আরশের পায়ের উপর পরে, সেদিকে আরশের কেনো ধ্যান নেই, তিশা ভয়ে চমকে উঠলো, ভদ্র মহিলা ছেলের রাগ দেখে কেঁপে ওঠে আরশের পা দেখতে ধরলো, আরশ এতে আরো বেশি রেগে গিয়ে লাল হয়ে যাওয়া পা দিয়ে কাঁচের দেওয়ালে আঘাত করতে করতে রাগী গলায় চিল্লিয়ে বলতে লাগলো,

___” এই মূহুর্তে এই রুম থেকে বের না হলে আমি নিজের ক্ষতি করে দিবো আম্মু জাস্ট লিভ।
ভদ্র মহিলা কান্না করতে করতে তিশার হাত ধরে বের হয়ে গেলো, আরশ রেগে গেলে আসবাবপত্র উপর রাগ ঝাড়ে, সঙ্গে আসবাবপত্র ভঙ্গা অংশ দিয়ে হাত-পা ক্ষত বিক্ষত করে ফেলে, ভদ্র মহিলা আরশ কে একা ছাড়তে চাইলেন না, কিন্তু রুম থেকে না বের হলে আরশ আরো বেশি রেগে যাবে বা যাচ্ছে, ভদ্র মহিলা আর তিশা রুম থেকে বের হতেই আরশ রুমের দরজা শব্দ করে লাগিয়ে দিলো, কাঁচের দেওয়ালের বাকি অংশ গুলো হাত দিয়ে আঘাত করতে করতে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো,
___” তোর সাহস হয় কী করে আমাকে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দেওয়ার, তোকে আমি নিজের হাতে মেরে ফেলবো, আমার থেকে দূর হওয়ার কল্পনা তোর মাথায় আসলো কী করে, আই জাস্ট হেইট ইউ মিম, আই জাস্ট হেইট ইউ।
আরশ ভাঙ্গা কাঁচের উপর আঘাত করতে করতে মেঝেতে বসে পরলো, হাত বেয়ে রক্ত ঝরছে, চোখমুখ লাল টকটক করছে, পুরো শরীরে জায়গায় জায়গায় কাঁচের টুকরো বিঁধে গেছে, এতটুকু সময়ের মধ্যে গুছানো আরশ এলোমেলো হয়ে গেলো, চোখমুখে রাগ ক্লান্ত সঙ্গে বুক ফাটা না বলা আর্তনাত, আরশের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরছে, রক্তমাখা ক্লান্ত শরীর নিয়ে মেঝেতে ভাঙ্গা কাঁচের উপর শরীর টা এলিয়ে দিলো, আরশের ভিতরকার ছটফটানি বেড়ে গেলো,রক্তাক্ত হাতে ডিভোর্স পেপার হাতে নিয়ে ভাঙ্গা কাঁচের উপর শুয়ে অসহায় কন্ঠে বলতে লাগলো,

___”তুমি কেনো আমার লাইফে ভালোবাসা
হয়ে এলে, কেনো, আমাকে তোমার মায়ায় পরতে
বাথ্য করলে, আমার লাইফটা চেঞ্জ করে দিয়ে
তুমি একবার দেখার চেষ্টা করলে না আমি তোমাকে
কতটা ভালোবাসি..!
আরশের হাতের রক্ততে ডিভোর্স পেপার লাল হয়ে গেলো, আরশ সেদিকে তাকিয়ে আগের ন্যায় বুকভরা আর্তনাদ নিয়ে বলতে লাগলো,

___” আমার কষ্ট হচ্ছে মিম, আমার বুক খুব ব্যাথা করছে, তুই কী করে পারলি আমাকে কষ্ট দিতে, কী করে পারলি, আমাকে একবার ভালোবেসে আগলিয়ে নিয়ে দেখতি, আমি তোর বেস্ট হাসবেন্ড হয়ে দেখিয়ে দিতাম এই দুনিয়া কে, কেনো আমার ভুল গুলো শুধরানোর সময় টুকু দিলি না, কেনো, কেনো,কেনো, আহহহহহহহহহ।
আরশ মেঝেতে শুয়ে ডিভোর্স পেপার শক্ত করে মুচড়ে ধরে চিৎকার দিয়ে কান্না করতে লাগলো, বেশ কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পড়ে আরশ শান্ত হয়ে মেঝেতে বসে পরলো, এতক্ষণে ডিভোর্স পেপার ক্ষত ক্ষত হয়ে গেছে, আরশ রক্তাক্ত হাতে ডিভোর্স পেপার আরো শক্ত করে মুচড়ে ধরে বলে উঠলো,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৮

___” আমার জন্য অনেক কান্না করেছিস, আমি চাই তুই সুখী হ, মুক্তি চেয়েছিলিস না আমার থেকে, নে তুই আজ থেকে মুক্ত, তোকে মুক্ত করে দিলাম, তুই আমার বিশ্বাস ভাঙ্গছিস, তুই ফিরিস নি তুই আমাকে জিন্দা লাশ বানিয়ে দিয়েছিস, তোকে আমি মুক্ত করে দিলাম, তুই আমার লাইফ থেকে মুক্ত….।
আরশ ক্ষতবিক্ষত ক্লান্ত শরীরে কথাগুলো বলে মুচড়ানো রক্তাক্ত নষ্ট হয়ে যাওয়া ডিভোর্স পেপার মেঝের মধ্যে ফিকে মারলো,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬০