Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬০

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬০

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬০
জান্নাতি আক্তার জারা

সাদা ধপধপে বিছানায় উপরে সাদা ঢিলেঢালা শার্ট প্যানে উপুর হয়ে গভীর ঘুমে আরশ, খনে খনে ভারী নিশ্বাস ফেলছে, পুরো রুম অন্ধকার, রাতটা ভীষণ গভীর, তাও তো হবে দুইটার কাছাকাছি, অন্ধকার রুমে একটা ছায়া মুক্তি ধীর পায়ে আরশের দিকে এগিয়ে এলো, আরশ তখনও গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে, ছায়া মুক্তি আরশের পাশে এসে মাথায় কাছে বসে আরশের মাথার চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো, অপলক তাঁর দৃষ্টি, আরশের ঘুমন্ত মুখে হাসি ফুটে উঠলো, যেন তাঁর স্বপ্নচারিনীর অপেক্ষা করছিলো এতক্ষণ , ছায়া মুক্তি তাঁর নরম নরম হাতে আরশের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তাঁর ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া আরশের কপালে ছুয়ে দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে অন্ধকার কক্ষে তাঁর ঠান্ডা নরম কন্ঠে বলে উঠলো,

___”আমাকে মনে পড়ে শহরের পন্ডিত মশাই ?
আরশ ঘুমের মধ্যে নিজের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দেওয়া হাতটা ধরতে চেয়ে হাতড়াতে লাগলো, কিন্তু নেই সেই আদুরে হাত,আরশের কপালে ভাজ পরলো, চোখের পাতা পিটপিট করে খুলে হাতটা খুঁজতে লাগলো, নিমেষেই ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসি টুকু গায়েব হয়ে গেলো, ধড়পড় করে বিছানায় উঠে বসে পরলো, চোখ দুটো পুরো অন্ধকার রুমে বিচরণ করতে লাগলো, না কেউ নেই, আজকেও তাঁর স্বপ্নচারিনী তাঁকে বিরক্ত করছে, সে বারবার ঘুমের সুযোগ নিয়ে আরশের স্বপ্নচারিনী হয়ে চলে আসে, এটা নতুন না নিত্যদিনের ভোগান্তি, আরশ কে ভুলতে দেয় না, আরশ শরীরের উপর থেকে কম্বল টা এক টানে সরিয়ে ফেলে বিছানা থেকে নেমে পরলো, বালিশের পাশ থেকে মোবাইল আর সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে বেডসাইড থেকে বাইকের চাবি নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে এলো, অন্ধকার নিস্তব্ধ বাড়িতে ধীরপায়ে সিড়ি বেয়ে নেমে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসে পার্কিন থেকে বাইক নিয়ে টান দিলো গভীর নিস্তব্ধ আলোকিত শহর থেকে কিছুটা নির্ঝর পরিবেশে,

নিস্তব্ধ স্নিগ্ধ পরিবেশ, আকাশে লক্ষ তাঁরার খেলা, কয়েকটা তাঁরা ছোটাছুটি করছে,জোছনার আলোতে উজ্জ্বল সবকিছু, চারপাশে মৃদু মৃদু হাওয়া এসে আরশের সাদা পাতলা ঢিলেঢালা শার্ট ভেদ করে শরীর টা হিম শীতল করে দিয়ে যাচ্ছে, মাথার চুলগুলো মৃদু হাওয়া এসে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে, চারপাশে পরিবেশ বলে দিচ্ছে, হয়তো বা এই জমিনে বৃষ্টি নামবে,আমের মুকুল সাধারণত জানুয়ারী থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে বের হয়, তবে বৃষ্টি ঝড় ও শিলাবৃষ্টির সঙ্গে আমের মুকুল ধীরে ধীরে ঝড়ে পড়ে, মার্চ থেকে এপ্রিল মাসে আমের গুটি ঝড়ে পড়ে, পরিবেশ টা টোটালি ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে আসে, মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়, এই মৃদু হাওয়ার স্পর্শ একাকিত্ব কে ঘুচিয়ে দেয়, আরশ বাইকের উপর বসে নিজের অনুভূতির সঙ্গে আবহাওয়ার ফিল করতে ব্যস্ত, চাহনি আকাশের ছোটাছুটি তাঁরার দিকে, আকাশের থেকে চোখ ফিরিয়ে সামনে দূর জমিনে চোখ নিক্ষেপ করে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো, তাঁর স্বপ্নচারিনী তাকে নিত্যাদিন মাঝরাতে ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে বাহিরে বের করে আনে, এই যে আজকেও মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো তাঁর অদৃশ্য ছোঁয়ায়,সপ্নে তাঁর বলা মিষ্টি কন্ঠ মনে পড়ে গেলো,
আমাকে মনে পড়ে শহরের পন্ডিত মশাই ? আরশের ফুরফুরে মুখে মলিন হাসি ফুটে উঠে, মনের গভীরতা থেকে একটা কথায় ভেসে আসে,

___” তোর পথের অলিগলিতে আমার বসবাস, তবুও তোর দেখা নেই, এটা কী আমার জন্য কম সাজা , তোকে মনে পড়বে কেনো,আমি তো কখনো তোকে ভুলিনি, যদি ভুলে যাইতাম তাহলে মনে পড়ার প্রসঙ্গ আসতো, তুই নিশ্চয়ই আমাকে ছাড়া ভালো আসিস, যদি আমাকে ছাড়া ভালো না থাকতি এতটা বছর অভিমান করে থাকতে পারতিস না, তুই তো সুখে আসিস তোর অভিমান অভিযোগ আমাকে সুখে থাকতে দিচ্ছে না কেনো? প্রতি রাতে আমার স্বপ্নচারিনী হয়ে এসে কষ্ট দিয়ে যায় কেনো? জবাব দিতে পারবি আমি তোকে ছাড়া কতটা ভালো আছি! বলতে পারবি আমার মন কেনো বারবার তোর অনুপস্থিতিতে তোকে খুঁজে, উওর দিতে পারবি, আমি আজ কেনো এতটা অগোছালো, হ্যাঁ আমি ভালো আছি যতটা ভালো কেউ তাঁর মৃত্যু দেহ নিয়ে জীবিত থাকে, তোর প্রতি আমার নেই কেনো অভিযোগ, নেই কেনো অভিমান, শুধু বলবো আমি ভালো আছি।
আরশ ফোন বাজার শব্দে নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো, পকেট হাতড়ে ফোন বের করলো, সঙ্গে বের হলো সিগারেট প্যাকেট আর লাইটার, আরশ ফোনে নিজের বড় ভাইয়ের নাম দেখে একটা নিশ্বাস ফেলে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বাইকের উপর রেখে দিয়ে ফোন রিসিভ করে কানে তুললো,

___” তিনটা বেজে যাচ্ছে বাড়ি ফিরে আয়, আম্মু আব্বু খাওয়ার টেবিলে তোর জন্য অপেক্ষা করছে।
হানিফের কথায় আরশ কিছুটা বিরক্ত হলো, এটা নতুন কিছু না, আরশ মাঝরাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় পুনরায় ঘন্টা দুয়েক পড়ে ভোরের দিকে বাড়ি ফিরে ফজরের নামাজ আদায় করে ঘুমিয়ে যায়, বাড়ির সবাই জানে আরশের অগোছালো জীবন সম্পর্কে, কিন্তু কখনো আরশ কে বাঁধা দেয় না, বাঁধা দিয়ে তাঁদের লাভ খুঁজে পায় না, আরশ বাড়ির মেম্বার দের কথা এক কানে শুনে আরেক কানে বের করে দেয়, এই যে অগোছালো জীবন টা গুছিয়ে নিতে বলে কিন্তু আরশের মধ্যে সেই গুছানো আরশ টা হাড়িয়ে গেছে, তাঁর এখন ছন্নছাড়া জীবন টা বেশি ভালো লাগে, গুছানো জীবন বইকি, নিজের দায়িত্ব আর সবার সামনে গুছানো আরশ কিন্তু সারাদিনের ক্লান্ত শেষে অগোছালো আরশ, ঘরের বাহিরে সবাই পরিপূর্ণ আরশ কে চিনে অথচ আরশ যে কতটা অগোছালো এটা একমাত্র আরশের ফ্যামিলি মেম্বার ছাড়া কেউ জানে না,আরশ খানিকটা বিরক্ত কন্ঠে গম্ভীর গলায় বলল,

___” আমার জন্য ওয়েট করতে হবে না ।
আরশের কথায় ফোনের বিপরীত পাশ থেকে হানিফ হতাশা কন্ঠে বলে উঠলো,
___” তুই না ফেরা উবদি আম্মু নিজের সঙ্গে আমাদের খাওয়া বন্ধ করে দেয়, এটা নিশ্চয়ই এই রমজান মাসে বুঝতে পেয়ে গেছিস, এখন সময় নষ্ট না করে দ্রুত বাড়ি ফিরে আয় আজান পড়ে যাবে।
ফোন কেটে গেলো, হানিফ কথাটা বলে ফোন কেটে দিয়েছে, আরশ কান থেকে ফোন নামিয়ে বাইকের উপরে রাখলো, সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরলো, কপাল কুঁচকে লাইটার দিয়ে সিগারেটে আগুন জ্বালিয়ে টান দিতে লাগলো, এই একাকিত্ব জীবনে এই সিগারেট টা যেন একমাত্র সঙ্গী হয়ে থেকে গেছে আরশের জীবনে, সিগারেটের ধোঁয়া উঠছে, আরশ কুঁচকানো ভ্রু সোজা করে নীরব চোখে জোছনার আলোতে দূর জমিনে চোখ নিক্ষেপ করে,সিগারেট টানতে টানতে কিছুক্ষণ দূরে চোখ রেখে নীরবতা পালন করে, সিগারেটের শেষ টান দিয়ে বাইকের সঙ্গে শরীর এলিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া উঠিয়ে বিরবির করে উঠলো,
___” তুই আমার জীবনে নেই, তবুও মস্তিষ্কে বাঁধা পড়ে আছিস একটা অভ্যাসের মতো একটা অসমাপ্ত অনুভূতি নিয়ে।
বিরবির করতে করতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে চেপে আগুন নিবিয়ে বাইক টান দিলো, কথায় আছে না থাকলে কাছে কে আর বোঝে হারিয়ে গেলে সবাই খোঁজে,

___” আচ্ছা দাদীমা তুমি ছোট বেলায় সেহরিতে কী খেতে?
রাবেয়া তালুকদারের কোলের মধ্যে সাড়ে চার বছরের নাতনীর মুখে এমন কথা শুনে খানিকটা অবাক হলেন, হাতে তাঁর তসবিহ, অবাক কন্ঠে জানতে চাইলো,
___” কেনো দাদুমনি?
রাবেয়া তালুকদার নাতনীর কথায় উওর না করে উল্টো প্রশ্ন করে উঠলো, দাদিমা কে উল্টো প্রশ্ন করতে দেখে ছোট মাহা ঠোঁট উল্টিয়ে বলে উঠলো,
___” হ্যাঁ বলো না দাদিমা, আমিও সেই খাবার খাবো, দেখো না আমি সেহরির সময় খাবার খেতে খেতে সকাল বেলা খিদে লেগে যায়।
রাবেয়া তালুকদার নাতনির কথায় শব্দ করে হেঁসে উঠলো, সাড়ে চারবছরের পিচ্চি রোজা থাকতে পারে নাকি, তাও জেদ ধরে রোজা রাখবে, কিন্তু সকাল আটটা বাজতেই দেখা যায় খিদা তে ছটফট করে, একদম মায়ের মতো হয়েছে, খিদা সহ্য করতে পারে না, রাবেয়া তালুকদার হাসি মুখে বললেন,

___” দাদুমনী আমিও ছোট বেলায় তোমার মতো দিনে পাঁচ ছয়টা রোজা রেখেছি।
ছোট মাহা চোখ বড় বড় করে বলে উঠলো,
___” সত্যি ?
রাবেয়া তালুকদার হাসি মুখে মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ বুঝালেন, ছোট মাহা পুনরায় জানতে চাইলো,
___” কিভাবে ?
রাবেয়া তালুকদার হাসি মুখে বললেন,
___” তোমার মতো খিদা লাগলে আমিও ইফতার করতাম।
মাহা ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে বলে উঠলো
___” আল্লাহ গুনাহ দিতো না ?
রাবেয়া তালুকদার নাতনীর কথায় হাসিমুখে মাহার কপালে চুমু রেখে দিয়ে বললেন,
___” আমি তো তোমার মতো ছোট ছিলাম, এজন্য গুনাহ দিতো না।
ছোট মাহা বুঝনোর ন্যায় বলে উঠলো,
___” ওওওও।
দু’জনের কথাকথনের মধ্যে কিচেন রুম থেকে ডাক পরলো,
___” মাহা..?

আরাত মাথায় ওড়না বা হাত দ্বারা ঠিক করতে করতে ব্যস্ত হাতে বেগুন ভাজা উল্টিয়ে দিচ্ছে, মুখে লেগে আছে স্নিগ্ধতা, আরাতের পাশেই আইরা ব্যস্ত হাতে নানারকম আয়োজন করছে আর ডাইনিং টেবিলে এক এক করে সেহরির রেডি করে রেখে আরছে, আজকে সেহরির রান্না দুই জা মিলে করছে, বলতে গেলে আদিবা তালুকদার আর রাবেয়া তালুকদার কে মাঝেমধ্যে রান্না ঘর থেকে ছুটি দিয়ে দেয় দুই জা মিলে, এই যে আরাত আইরা দুজন মিলে গল্প করতে করতে হেসেখেলে রান্না করছে, আর বাড়ির দুই কর্তা আর দুই গিন্নি পিচ্চি গুলো কে নিয়ে ড্রয়িং রুমে খেলা করছে, আরাত বেগুন ভাজা উল্টিয়ে দিতে দিতে আঁড়চোখে একবার দেওয়ালে টাঙ্গানো দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখে নিলো, সাড়ে তিনটা বেজে যাচ্ছে তবুও তাকবীরের ঘুম থেকে উঠার নাম নেই, আরাত পুনরায় ড্রয়িং রুমে দিকে চেয়ে ডেকে উঠলো,
___” মাহা.. ?
রাবেয়া তালুকদার আরাতের ডাকে নাতনী কে বলে উঠলেন,
___” মাম্মা তো ডাকছে দাদুমনী ?
মাহা রাবেয়া তালুকদারের কোল থেকে মাথা হেলিয়ে কিচেন রুমের দিকে তাকালো, ছোট ছোট কন্ঠে ডাকের জবাব দিলো ,
___” জ্বি মাম্মা?
আরাত মেয়ের কন্ঠ শুনতে পেয়ে পুনরায় বলে উঠলো,
___” তোমার পাপা কে ঘুম থেকে ডেকে দেও মাম্মা ।
ছোট মাহা দাদিমার কোল থেকে নামতে নামতে বলে উঠলো,
___” ওকে মাম্মা ।

মাহা রাবেয়া তালুকদারের কোল থেকে নেমে ছোট ছোট পায়ে সিড়িতে উঠতে লাগলো, রাবেয়া তালুকদার মাহা কে নামতে দেখে পাশে বসা আদনান তালুকদারের সঙ্গে গল্পে মগ্ন হয়ে গেলো, মাহা তাঁর ছোট ছোট পায়ে কয়েক সিঁড়ি ডেঙ্গিতেই কারো ঘুমুঘুমু কন্ঠে পিছনে ফিরে তাকালো,
___” মেহেক দাঁড়া।
মাহা কে রাবেয়া তালুকদারের কোল থেকে নামতে দেখে ছোট এরান আদিবা তালুকদারের কোল থেকে নেমে পরলো, কিছুটা দ্রুত পায়ে এসে মেহেক কে ডেকে উঠলো, মাহা কে বাড়ির সবাই মাহা বলে ডাকলেও একমাত্র ছোট এরান শুধু মেহেক বলে ডাকে, এই মেহেক আর কেউ না, বীর আর রাতের রাজকন্যা, মেহেক তালুকদার মাহা, আর মাহা কে পিছু ডাকা ছোট এরান হলো আনাস আইরার একমাত্র অস্তিত্ব আরহাম তালুকদার এরান,
তালুকদার বাড়িতে এই সাত বছরে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে, হ্যাঁ দেখতে দেখতে সাতটা বছর কেটে গেছে, সাত বছর আগে যেমন এক নিমেষেই হটাৎ করে রশ্মিরাতের মধ্যে ফাটল ধরেছে, ভুল বুঝাবুঝি তে মান অভিমানে দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল, মিমের চলে যাওয়া তে তালুকদার বাড়ির প্রত্যেকটা ইট দেয়ালে হাসিখুশি মিলিয়ে গেয়েছিল, আজ তারথেকেও বেশি আনন্দ হাসিখুশি লেগে আছে এই তালুকদার বাড়ির প্রত্যেকটা আনাচে কানাচে, ছোট মেহেক পিছু ফিরে ছোট ছোট চোখে এরান কে দেখছে, এরান মাহার সামনে এসে দুহাত উজাড় করে মিলিয়ে বলে উঠলো,

___” আমার কাছে অনেক চকলেট আছে।
এরান এর কথায় মাহার মুখ খুশিতে ঝলমল হয়ে উত্তর, উজ্জ্বল মুখময় নিয়ে মাহা এরান এর মতো দুহাত উজাড় করে মেলে বলে উঠলো ,
___” আমাকে দেবে এরান ভাই, আমি তোমাকে এতগুলো দোয়া করে দিবো প্রমিস ?
মাহার কথায় এরান শর্ত জুড়ে দিলো,
___” তোর দোয়া তুই নিজের জন্য রাখ, চকলেট পেতে হলে আমার কথা শুনতে হবে, বল শুনবি?
মাহা খুশি মনে বলে উঠলো,
___” হুম হুম শুনবো।
এরার সিড়ি থেকে নিচে তাকালো, নিচে হল রুমে সোফাতে আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার রাবেয়া তালুকদার আদিবা তালুকদার পাশাপাশি বসে টিভি দেখছে, টিভিতে চলছে দেশের চলমান ই্যাসু, এরান সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মাহা কে চোখের ইশারায় নিজের কাছে ডাকলো, মাহা মুখটা এরান এর মুখের কাছাকাছি নিয়ে এলো, এরান ফিসফিস করে বলে উঠে,

___” ইশান ভাইয়ার সঙ্গে খেলা করবি না, তাহলে আমার সব চকলেট তোকে দিয়ে দিবো।
এরান এর কথায় মাহার উজ্জ্বল মুখ অন্ধকার হয়ে এলো, সোজা হয়ে বলল,
___” আমি মনি কে বলে দিবো, তুমি ইশান ভাইয়ার সঙ্গে খেলতে বারন করছো।
এরান এর চোখমুখ গম্ভীর হয়ে এলো, ভারী কন্ঠে বলে উঠলো,
___” আম্মি কে বলে দিলে চকলেট পাবি না।
মাহা গাল ফুলিয়ে হাতে হাত ভাজ করে বলল,
___” তুমি অনেক পচা এরান ভাই।
এরান এবার রেগে গেলো, রাগী গলায় বলল,
___” ইশান ভাইয়া পচা তুই শুধু আমার সঙ্গে খেলা করবি, নয়তো তোকে আমি চকলেট দিবো না।
মাহা চোখমুখ অন্ধকার করে বলে উঠলো,
___” আমি বীরাত ভাইয়া কে বলে দিবো, তুমি আমাকে চকলেট দিতে চাইছো না।
এরান সিড়ি থেকে নিচে নামতে নামতে বলল,
___” হ্যাঁ সারাদিন তো পারিস আমার নামে নালিশ দিতে, যা তোর চকলেট নেই।
মাহা খানিকটা উঁচু গলায় বলল ,

___” আমি পাপা কে বলে দিবো, পাপা আমাকে এতগুলো চকলেট এনে দিবে দেইখো।
এরান পিছু ফিরে দেখলো না মাহার দিকে, মাহা মন খারাপ করে সিঁড়ির রেলিং ধরে ছোট ছোট পায়ে তাকবীর আরাতের রুমে ঢুকে গেলো, তাকবীর গভীর ঘুমে মগ্ন, নয়দিনের ক্লান্ত আজকে একেবারে লুটে নিচ্ছে, এই নয়টা দিন বিজনেসের খাতিরে দেশের বাহিরে ছিলো, ফিরছে রাত নয়টার দিকে, বাড়ি ফিরে তারাবি নামাজ আদায় করে আরাত কে বুকে জরিয়ে নিয়ে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়েছিলো, বেশি রাত হওয়ায় আর ছেলে মেয়ের সঙ্গে সময় কাটানো হয়নাই, কেননা এতক্ষণে মাহা বীরাত ঘুমিয়ে গিয়েছিল, হ্যাঁ বীরাত, আরাত তাকবীরের রাজকুমার, তালুকদার বাড়িতে আনাস আইরার ঘরে #আরহাম_তালুকদার_এরান জন্ম নেওয়ার প্রায় দুই বছর পড়ে বীর রাতের ঘরে দুটো ফুটফুটে জমজ বাচ্চার জন্ম নেয়, রাজকুমারের আগমনের তিন মিনিট পড়ে রাজকন্যার আগমন ঘটে, রাজকুমারের নাম রাখা হয় #আকসার_তালুকদার_বীরাত আর রাজকন্যার না #মেহেক_তালুকদার_মাহা আর কিছুক্ষণ আগে এরান এর মুখে ইশানের কথা শুনা গেলো, সে তালুকদার বাড়ি এবং শেখ বাড়ির বড় নাতিন, আরিশা আমানের একমাত্র ছেলে ইশান মির্জা, যদিও মির্জা পরিবারে আরেকটা রন্তের জন্ম হয়েছে মাস খানেক আগে, রাফি মিরার একমাত্র মেয়ে, #রিপ্তি_মির্জা
মাহা ছোট্ট ছোট গুটি গুটি পায়ে রুমে ঢুকে ডিম লাইটের আলোতে দরজার পাশে সুইচ বোর্ডের পাশে এসে দাঁড়ালো, সুইচ বোর্ড ছুটে না পেয়ে পা দুটো উঁচু করে ছোট ছোট হাতে সুইচ বোর্ড হাতরিয়ে রুমে লাইট জ্বালালো, রুমে লাইট জ্বলতেই মাহা পিছু ফিরে বিছানার দিকে তাকালো, খুশি মনে গুটি গুটি পায়ে বিছানার কাছে এসে উপুড় হয়ে প্রায় পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে বিছানায় উঠতে সফল হলো, বিছানার উপর উঠে বসে তাকবীরের কানের কাছে এসে ডাকতে লাগলো তাকবীর কে,

___” পাপা সেহরি খাইবা না ?
তাকবীর ঘুমের মধ্যে মেয়ের কন্ঠে শুনতে পেয়ে কিছুটা নরম সুরে হুম বলে পুনরায় ঘুমিয়ে পরলো, তাকবীর কে ঘুমাতে দেখে মাহা নিভু নিভু কন্ঠে পুনরায় ডেকে উঠলো,
___” তুমি তো ঘুমাইয়া গেছো ও ও পাপা ?
মেয়ের ডাকে তাকবীরের ঘুম কেটে গেলো, ঘুমন্ত চোখে বলে উঠলো,
___” কী হয়েছে মাম্মা?
মাহা বলে উঠলো,
___”সেহরি খাইবা না উঠো পাপা, মাম্মা তোমাকে বকা দিবে তো..?
মেয়ের কথায় তাকবীরের ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠলো, মেয়ে তাঁর মাম্মা কে ভিষণ ভয় পায়, আজকাল মেয়ের পাপাও মেয়ের সঙ্গে মেয়ের মাম্মা কে ভয় পেতে শুরু করছে, তাকবীর উঠলো না, নড়াচড়া করে পুনরায় কম্বল শরীরে ভালোভাবে জরিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো, তাকবীর মেয়ের রিয়াকশন দেখতে চাচ্ছে, ঘুম জাড়ানো গলায় বলে উঠলো,

___” মাম্মা আরেকটু ঘুমাই।
মাহা বুঝানোর ন্যায় বলে উঠলো,
___” ঘুম থেকে উঠতে উঠতে তো সকাল হবে, তাড়াতাড়ি উঠো পাপা প্লিজ!
তাকবীর চোখ মেললো না, মাহা পুনরায় ধীর কন্ঠে থেমে থেমে বলে উঠলো,
___” সেহেরি টা খেয়ে নামাজ পড়ে এসে তুমি যত ইচ্ছা ঘুমাও পাপা।
তাকবীর চোখ বন্ধ রেখে মুচকি হেঁসে বলে উঠলো,
___” মাম্মা আরেকটু ঘুমাই, আজকে সেহরি খেতে ইচ্ছা করছে না, নামাজ পড়তে অলস লাগছে।
মাহা এবার ছোট ছোট হাতে তাকবীরের মুখের সামনে থেকে কম্বল সরাতে সরাতে বার্থ চেষ্টা করে বলতে লাগলো,
___” না পাপা আল্লাহ গুনাহ দিবে, উঠে পরো।

তাকবীরের মুখে হাসিটা আরো গারো হলো, এতটুকু মেয়ের মধ্যে আল্লাহর ভয় আছে, হ্যাঁ তাকবীর মেয়েকে সেই ভাবে বড় করছে, এতটুকু মেয়ে কে দিন দিন কথা শিকানোর পাশাপাশি কিভাবে মানুষ কে সম্মান দিতে হয়, আল্লাহর ইবাদত করতে হয়, আরাত কে রুমে নামাজ আদায় করতে দেখে ছোট মাহা মাম্মার পাশে দাঁড়িয়ে যায় দুষ্টুমি করে, যেদিন তাকবীর রুমে নামাজ আদায় করে সেদিন তো ছোট মাহা তাকবীরের নামাজের সামনে চলে আসে, নামাজ আদায় করে তাকবীর যখন আরাতের কোলে মাথা রাখে,ছোট মাহা পাপার দেখা দেখি নিজেও আরাতের কোলে মাথা রেখে জায়নামাজে শুয়ে যায়, মাঝেমধ্যে আরাতের মতো নিজের তাকবীরের চুলে কপালে ছোট ছোট হাত দিয়ে হাত বুলিয়ে দেয়, বাড়ির বাহিরে বের হলে আরাত নিজের মতো মেয়েকেও বোরকা পড়িয়ে বাহিরে বের করে, ছোট মাহা যখন বোরকা পড়ে গুটি গুটি পায়ে হাতে , মনে হয় তাকবীরের মেয়ের জন্য চারপাশ টা সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে, ছোট মাহা তাকবীর কে চোখে হারালেও বীরাত পুরো বিপরীত হয়েছে, তাকবীর কে ভিষণ ভয় পায় অথচ আরাত কে চোখে হারায়, যদিও স্বাভাব পুরোটা তাকবীরের পেয়েছে, বীরাত আর এরান এর মূল লিডার আহিন, হ্যাঁ সেই বারো বছরের আহিন আজ উনিশে পা দিয়েছে, আগের মতোই ভন্ডামী আছে, শুধু আগে একটু খানি ভন্ড ছিলো আর এখন ভন্ড দের লিদার, কেননা বছর কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু পরিবর্তন ঘটছে, আলভী প্রায় তিন বছর আগে বাংলাদেশ ছেড়েছে পড়াশোনার খাতিরে, আরাত আইরা আর আগের মতো নেই, তাঁদের মধ্যে ম্যাচুরিটি চলে এসেছে, আহিন শুধু নিজেকে পরিবর্তন করতে পারেনি উল্টো নিজেই একটা ভন্ডামির ক্লাস খুলে ফেলছে ছোট গ্যাং গুলো কে নিজের মতো ভন্ডামি শিখাইতে ,
তাকবীর বিছানা থেকে নেমে মেয়েকে কোলে তুলে নিলো, মেয়ের কপালে একটা গারো করে চুমু রেখে দিয়ে নিচে নামিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,

___” যাও মাম্মা কে বলো পাপা রুমে ডাকছে।
মাহা পাপার আদুরে গদোগদো হয়ে পুনরায় রুম থেকে বের হয়ে গেলো, তাকবীর মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে ফুরফুরে মন নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো, মাহা রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার প্রায় ছয় মিনিট পড়ে আরাত হাত মুছতে মুছতে রুমে ঢুকলো, ওশয়ারুম থেকে পানির আওয়াজ শুনতে পেয়ে আরাত ব্যস্ত হাতে বিছানা গুছাতে লাগলো, তাকবীর মুখ মুচতে মুচতে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আরাত কে বিছানা গুছাতে দেখে হাতে থাকা তয়েলা সোফাতে ফেলে আরাত কে পিছন থেকে জরিয়ে ধরে ঘারে থুঁতনি রাখে, হটাৎ পিছন থেকে তাকবীর আরাতের ঘারে থুতনি রাখার সঙ্গে সঙ্গে আরাতের শরীর ভাইব্রশন করে উঠে, তাকবীর মুচকি হেঁসে বলে উঠলো,

___” দুই বাচ্চার মা হয়েও আমার ছোঁয়াতে এত কাঁপা-কাঁপি নট ব্যাড, সেই প্রথম দিনের ফিলিংস।
___” রমজান মাস একটু তো শরম নিয়ে আসেন নিজের মধ্যে।
আরাতের কথায় তাকবীর দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” শরম চলে আসে বাট কন্ট্রোলে আসে না বউ।
আরাত তাকবীরের কথায় লজ্জা পেয়ে তাকবীর কে নিজের থেকে আলেদা করে বলে উঠলো,
___” উফফ সারুন তো, সেহরির লেট হয়ে যাচ্ছে।
তাকবীর আগের ন্যায় আরাত কে বুকে টেনে নিয়ে দুষ্টু হেঁসে বলে উঠলো,
___” বউ কাছে থাকলে যখন তখন মুড চলে আছে, রমজান মাসে ভালোবাসা তো ইবাদতের মতো মন পরিস্কার করে দেয়, আর রমজানে প্রেম করলে ভালোবাসা আরো পবিএ হয়।
আরাত এবার এক হাতে তাকবীরের গলা জরিয়ে ধরে তাকবীরের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি তে আরেক হাতে স্লাইড করতে করতে দুষ্টু হেঁসে বলে উঠলো,

___” বি কেয়ারফুল বেশি দুষ্টুমিষ্টি কথা বললে ইফতারে আলাদা মিষ্টি পাবেন না কিন্তু।
তাকবীর আরাতের কথায় আরাতের কোমর দু’হাতে জরিয়ে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে বলে উঠলো,
___” প্রবলেম নেই আমার মিষ্টি তো আমার সামনে আছে, সময় মতো খেয়ে নিবো।
___”এত মিষ্টি খেলে আপনি মটু হয়ে যাবেন!
তাকবীর আরাতের কপালে কপাল ঠেকে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” তোমার ভালোবাসা তে ডায়েট করে নিবো!
আরাত নিজেও লাজলজ্জা ভুলে গিয়ে তাকবীরের সঙ্গে সুর মিলাতে লাগলো,
___”না এত মটু আমার সহ্য হবে না।
তাকবীর অবাক হলো, সিরিয়াস মুখে জানতে চাইলো,
___”কেনো?
আরাত তাকবীরের সিরিয়াস মুখের দিকে আঁড়চোখে চেয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে লাজুক হেঁসে বলে উঠলো,
___” সহজে ক্যারি করা যায় না।
___” তওবা আস্তাগফিরুল্লাহ, আমার ঘরে সয়তান প্রবেশ করছে চলো বউ ফ্রেশ হয়ে যা-ই।
আরাতের মুখ থেকে কথা বের করতে দেরি, তাকবীর আরাত কে ছেড়ে দিয়ে এক হাত টেনে ধরে ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল কথাটা, তাকবীর আরাত কে লজ্জায় ফেলতে গিয়ে নিজেই আরাতের কথায় লজ্জা পেলো, আরাত নিজেকে দিন কে দিন তাকবীরের সামনে নিজেকে পেস করছে, এতে তাকবীর মাঝেমধ্যে নিজেই বোকা এবং বিব্রতকর অনুভব করে।

জীবনের স্রোত নদীর মতো কখনো শান্ত কখনো উওাল, কেউ জানে না তাঁর জীবন আগামীতে কেমন যাবে, শুধু এতটুকু জানে মৃত্যু নিশ্চিত,মৃত্যু টা একদিন আসবেই, দেশ ছেড়ে আপন মানুষ দের ছেড়ে অভিমান করে যতই দূরে যাওয়া হোক না কেনো, ফিরতে একদিন হয় সেই আপন মানুষ দের টানে, সেই আপন দেশে আপন শহরে, হয়তো বা কিছুদিনের জন্য বা কখনো একিবারের জন্য, শুধু তফাৎ টা থেকে যায় মানুষ গুলো আগের মতো তাঁকে চায়ছে কিনা, কিছু অপেক্ষমান চোখ সবসময় থেকে যায়, কিন্তু মিমের বেলায় হয়তো সেই অপেক্ষামান চোখগুলো অপেক্ষা করে নেই, কারণ টা স্বাভাবিক, আজ থেকে সাত বছর আগে এই দেশ ছেড়েছে ধীরে ধীরে আপন মানুষ দের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করছে, আপন মানুষ গুলো অপেক্ষা করবে কিভাবে, যেখানে মিম বলেই দিয়েছে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখবে না, সেখানে মিমের বাবা একে একে দুই দু বার মেয়ের টেনশনে হার্ট অ্যাটাক করেছে , তবুও মিমের মধ্যে ফিরে আসার মতো কেনো আগ্রহ ছিলো না, এই মিম যেন আগের মিম নেই আর,বড্ড কঠিন মেয়েটা, তাহলে আপন মানুষ গুলো কিকরে অপেক্ষা করবে তাঁদের আদুরে মেয়ের ফিরে আসার, মিম কথাগুলো ভেবে মলিন হাসলো,বিমানটা যখন ঢাকার মাটিতে ছুঁয়ে নামল, মিমের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল, জানালার বাইরে ভেজা রানওয়ে, দূরে মেঘলা আকাশ সবকিছুই কেমন পরিচিত, অথচ নতুন, সাত বছরে অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে বিমানবন্দরের, যেখানে মানুষ বদলায়, শহর বদলায়, বাড়ি বদলায়, সেখানে আধুনিক যুগে এসে বিমানবন্দরে বদলে যাওয়া তো স্বাভাবিক, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হ্যাঁ মিম ফিরলো তাঁর দেশের মাটিতে, মিম একা না সঙ্গে তাঁর দূর দেশে সঙ্গ দেওয়া বেস্টফ্রেন্ড, জানা নেই ছেলেটার মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি এতটা আগ্রহ কেনো, কেনো বারবার মিম কে ফোঁস করছিলো বাংলাদেশে এসে ভ্রমন করে যেতে, মাঝেমধ্যে মিমের তো মনে হয়, মিমের মতো তাঁর ডাফার এর কেনো না কেনো পিছুটান আছে এই বাংলাদেশের মাটিতে, তবুও কিন্তু থেকে যায়, কেনো না ছেলেটা কখনো না বাংলাদেশে এসেছে, না সে বাংগালী, না তাঁর কেনো আত্মীয়স্বজন কেউ আছে বাংলাদেশে, মিম তাঁর ডাফার এর দিকে তাকালো,

ছেলেটা খুব মনোযোগ সহকারে চারপাশ দেখছে, প্রথম বার বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলো, এতদিন বাংলাদেশ সম্পর্কে গুগুলের দেখছিলো,আর আজকে নিজ চোখে দেখবে, যদিও আমেরিকার মতো এত উন্নয়ন দে-শ গুলো তে থাকতে থাকতে বাংলাদেশ চোখে ধরবে না তবে প্রকৃতিকে সৌন্দর্য দিকে তাকালে এই সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের প্রেমে পড়তে বাধ্য, মিম ছেলেটার থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে
ইমিগ্রেশনের লাইন পেরিয়ে ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে পুনরায় ভাবনায় মগ্ন হয়ে গেলো, শেষবার যখন এই দেশ ছেড়েছিল, তখন সে ছিল স্বপ্নভরা এক তরুণী, মনের ভিতরে কারো জন্য ছটফটানি, বুকে শতশত কষ্ট হাহাকার, চোখে হাজারো সপ্ন আর মিথ্যা বদনাম সঙ্গে মরীচিকার মতো জীবন নিয়ে, অথচ আজ সে ফিরে এসেছে সাফল্য, আর কিছু না বলা কষ্ট নিয়ে, বাইরে বেরিয়ে ঢাকার গরম হাওয়া মুখে লাগতেই মিমের মনে হলো এই শহর, এই ভিড়, এই কোলাহল সবই মিমের নিজের, শুধু বাইরে আপন মানুষ গুলোই নেই কেবল তাঁর অপেক্ষায়,
মিম এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে, পাশেই তাঁর ডাফার দাঁড়িয়ে, এই সাতবছরে মিমের পোষাকে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, সাদা গেঞ্জির সঙ্গে পা পর্যন্ত পৌঁছানো হালকা রঙের ফুলের ডিজাইনে স্কার্ট, গলায় পিচ রঙের একটি ওড়না সুন্দরভাবে ঝুলানো, পিঠ সফট কার্লস চুল, মুখে লেগে আছে বিষন্নতা, মিম পাশে তাঁর ডাফার এর দিকে তাকাতেই দেখলো, সাদা শার্ট ও কালো প্যান্টের সঙ্গে কালো টাই পরিহিত ছেলেটা,কালো কোট কাঁধে ঝুলিয়ে হাতে ধরে আছে, চোখে কালো চশমা, মুখে লেগে আছে চমৎকার হাসি, মিম ফোনে সময় দেখে নিলো না গাড়ি এখনো আরছে না, ক্লান্ত শরীর শুধু বিছানা টানছে, মিম কয়েক সেকেন্ড বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে থেকে বাধ্য হয়ে বলল,

___” ডাফার টু মিনিট আমি পাশের দোকান থেকে একটা ওয়াটার বটল নিয়ে আসছি।
মিম কথাটা বলে কোনোদিকে না তাকিয়ে যেতে লাগলো দোকানে, ডাফার পিছু ডেকে বলল,
___” আরে, আমি গেলে হয় না? ইউ স্টে, আমি নিয়ে আসি।
মিম মাথা নাড়িয়ে হালকা হেসে বললো,
___”না রে, তুই এখানেই স্টে কর, একটু খেয়াল রাখ, গাড়ি আসে কিনা, আমি জাস্ট আসছি ডোন্ট ওরি।
মিম কে যেতে দেখে ছেলেটা হাত থেকে কোট নামিয়ে লাগেজের উপর রাখলো, আশেপাশে চোখ বুলাতেই পাশের রাস্তায় একটা ছোট কিউট বেবি কে দেখতে পেলো, ছেলেটা বেবি টা কে দেখে ভ্রু কুঁচকালো, বেবি টা বয়স হবে হয়তো সাড়ে তিন থেকে চারবছর, এত ছোট কিউট বেবি একা একা রাস্তার পাশে গুটি গুটি পায়ে হাঁটাহাটি করছে জায়গায়, ছেলেটা বেবির আশেপাশে ভ্রু কুঁচকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলো, রাস্তার পাশে দুটো মেয়ে কে দেখা যাচ্ছে, একটা মেয়ের মুখ দেখা গেলো, মেয়েটার কোলে ছোট একটা বাচ্চা, তার সামনে আরেকটা মেয়ের দাঁড়িয়ে হয়তো হেঁসে হেঁসে কথা বলছে, মেয়েটার মুখ না দেখা গেলেও শুধু পিছনে পিঠ দেখা যাচ্ছে, তাঁদের পাশে আরেকটা ছেলে এক বয়স্ক ভদ্রলোক কে জরিয়ে ধরে আছে, দূর থেকে বুঝা যাচ্ছে বহুদিন পড়ে তাঁদের সাক্ষাৎ হলো, চারজন বহুদিন পড়ে দেখা হয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে এতটাই মগ্ন হয়ে গেছে, তাঁদের ছোট মেয়েটা যে গুটি গুটি পায়ে ধীরে ধীরে রাস্তার মাঝখানে চলে যাচ্ছে তাঁদের সেদিকে খেয়াল নেই, রাস্তায় একের পর একটা চলন্ত গাড়ি চলছে,

মিম পানির বোতল কিনে তাঁর সঙ্গে কেক আরো কিছু বিস্কিট নিয়েছে, দোকান থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে তাঁর ডাফার কে লক্ষ করলো, ছেলেটা আতঙ্কিত মুখে চলন্ত রাস্তায় দৌড়চ্ছে, এভাবে দিক বেদিক না দেখে দৌঁড়াতে দেখে মিমের বুক ধরফর করে উঠলো, রাস্তায় মাঝখানে ছোট বেবি টা ভীতু মুখে কান্না করতে করতে দেখছে চারপাশ, মিম দৌঁড়াতে নিবে ঠিক তখনই একটা চলন্ত কার এসে ছেলেটা কে ধাক্কা দিয়ে যায়, মিম দৌঁড়াতে নিয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে পরলো, নিস্তব্ধ শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো,
___” ডাফারররর……..
নিমেষেই হাত থেকে পানির বোতল কেক রাস্তায় পড়ে গেলো, চারপাশ নিস্তব্ধ, মিম চিৎকার দিয়ে সামনে তাকাতেই ছেলেটা কে রাস্তায় কিনারে র*ক্তা*ক্ত শরীরে ছটফট করতে দেখলো, মিম নিজেও দিকবিদিক ভুলে ছুটে গেলো ছেলেটার কাছে, ছেলেটার মাথার এক সাইট থেকে হুল হুল করে তাজা র*ক্ত বের হচ্ছে, মিম চোখে পানি নিয়ে রাস্তায় বসে ছেলেটার মাথা নিজের কোলের মধ্যে রাখলো, কণ্ঠে কাঁপন গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না, তবুও কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলতে লাগলো,

____” ডাফার এই ডাফার চোখ মেল, দেখ তোর লেডি গুগল তোকে ডাকছে, তোর কষ্ট হচ্ছে, বল আমাকে, আমার দিকে চেয়ে দেখ তোর কিছু হবে না, আমি তোর কিছু হতে দিবো না, ডাফারররর এই ডাফার কথা বলছিস না কেনো,একবার চোখ মেলে দেখ তোর লেডি গুগলের দিকে, পার্থ এই পার্থ শুনতে পারছিস আমাকে পার্থহহ আহহহহহহহ চোখ মেল না পার্থ ?
মিম চিৎকার দিয়ে পার্থ কে ডাকতে লাগলো, হ্যাঁ মিমের ডাফার আর কেউ না ভিনদেশী তরুণ পার্থ চৌধুরী ছিলো, মিমের চিৎকারে পার্থ ধীরে ধীরে নিভু নিভু চোখ মেলে তাকালো, এক হাত মাথার ক্ষতস্থানে চেপে ধরে, আটকে আসা গলায় ঢোক গিলে বলতে লাগলো,
___” আমি ঠিক আছি, তুই বেবি টা কে দেখ, অনেক ব্যাথা পেয়েছে মেবি।
পার্থের কথায় মিম সামনে তাকালো, সেদিকে তাকিয়ে আরেক দফা চমকে উঠলো মিম, নিজেদের থেকে কিছুদূরে মাহির আর মাহমুদ ইসলাম আতঙ্কিত মুখে সেই বাচ্চা টাকে জরিয়ে ধরে আছে, তাঁদের পাশে মিরা কোলের মধ্যে ছোট একটা বাচ্চা কে নিয়ে মিম দের দিকে চেয়ে আছে, আর ছোট মেয়েটার পাশে মাটিতে হতবাক নিস্তব্ধ মুখে পার্থ আর মিমের দিকে চেয়ে আরে রশ্মি, চোখ থেকে অবগত পানি পরছে,

সূরা ইউসুফ আমাদের কে শিক্ষা দেয় অতীতে যে যাই করুক না কেন আমাদের সাথে, ভবিষ্যতে আল্লাহ তায়ালা তাদের সামনে, আমাদের কে আবার দাঁড় করাবেন,তবে সেই সময় পরিস্থিতি ভিন্ন হবে ইনশাআল্লাহ, আজকে রশ্মির সামনে তাঁর অতীত, তাও আবার রশ্মির মেয়ে কে বাঁচাতে গিয়ে র*ক্তা*ক্ত অবস্থায় রাস্তায় ছটফট করছে,বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে গেল,অতীত যেন বর্তমানের মাঝখানে এসে বসে পড়েছে, রশ্মির বুকের ভেতরটা কাঁপছে, আট বছর আগে যে ছেলেটা হঠাৎ করেই সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া, যে চলে যাওয়ার পর রশ্মি নিজেকে হাজারবার বোঝিয়েছে সব ঠিক আছে, কিছু হয়নি, যে ছেলেটা কে ভুলতে বোনের মতো বেস্টফ্রেন্ডে কে কষ্ট দিয়ে তাঁর এক্স কে ভালোবেসে বিয়ে করেছে, সেই অতীত আজ কে রশ্মির সামনে, রশ্মি দৌঁড়ে ছুটে যেতে পারছে না নিথর র*ক্তা*ক্ত পার্থর কাছে,
এতক্ষণে চারপাশে রাস্তায় মানুষ জরো হয়ে গেছে, মিম এক নজর রশ্মি কে দেখে মানুষের হেল্প নিয়ে পার্থ কে গাড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে গেলো, কেননা পার্থর কন্ডিশন খুব বাজে,দ্রুত ইমারজেন্সিতে নিতে হবে, মাহমুদ ইসলাম নাতনি কে কোলে তুলে নিলেন, মাহির রশ্মির কাছে এসে রশ্মির কাঁদে হাত রাখলো,

___” রশ্মি দেখো আমাদের মেয়ে একদম ঠিক আছে, জাস্ট পায়ে একটু ব্যাথা পেয়েছে, তুমি এভাবে ভেঙ্গে পরলে আমাদের মেয়ে ভয় পাবে উঠে পরো।
কথাগুলোই বলে মাহির রশ্মি কে রাস্তায় থেকে উঠালো, রশ্মির চোখ এখনো সেই দূর রাস্তায়, সেখানে পার্থর র*ক্তা*ক্ত শরীর টা পড়েছিল, রশ্মি যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, পার্থ বাংলাদেশে কীভাবে, তাও মিমের সঙ্গে, আর মিম এতটা কেনো পার্থর জন্য ছটফট করছিলো, মিমের পাশে বাকি রা কই, আর পার্থ বাংলাদেশে কেনো, রশ্মির মাথা ঘুরে উঠলো, মাহির নিজের সঙ্গে রশ্মি কে জরিয়ে নিলো, সবার ধারণা রশ্মি নিজের মেয়ের জন্য এতটা নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, মাহির রশ্মি কে জরিয়ে ধরে দূর রাস্তায় চোখ রেখে বলল,
___” যে ছেলেটা আমার তিতি কে বাঁচলো, সে ঠিক আছে?
মিরা মাহিরের কথায় বলল,

___” ভাইয়া ছেলেটা ঠিক নেই, ইমারজেন্সি নিতে হবে মেবি, বাট ভাইয়া ছেলেটার পাশে আমি মিম কে দেখলাম।
মিমের কথা শুনতেই মাহিরের বুকের মধ্যে ধাক্কা লাগলো, এক নিমেষেই মিমের সঙ্গে ছেলেটাকে আরশ ভেবে মাহির ব্যাকুল হয়ে উঠলো, আরশ মাহিরের মেয়ে কে বাঁচাতে এক্সিডেন্ট করেছে ভেবে মাহির ব্যাকুল কন্ঠে পুনরায় বলতে লাগলো ,
___” আরশ ছিলো, তুই ঠিক দেখছিস তো, আমাকে ফাস্ট হাসপাতালে যেতে হবে।
মাহির মাহমুদ ইসলাম কে গাড়ি ডাকতে বলল,মিরা মাহিরের কথায় বলে উঠলো,
___” ভাইয়া ছেলেটা আরশ ভাইয়া ছিলো না, আমি মিম কে দেখে অবাক হলাম, মিম বাংলাদেশে কবে এলো?

মিরার কথায় মাহির রশ্মি দুজনেই অবাকের উপর অবাক হতে লাগলো, তাঁদের মাথা পুরো ফাঁকা ফাঁকা লাগছে মিম বাংলাদেশে কবে এলো মানে বুঝলো না, মিম কি বাংলাদেশে ছিলো না, আর মিমের পাশে ছেলেটা যদি আরশ না হয়ে থাকে তাহলে ছেলেটা কে ছিলো, মাহির কিছু ভাবতে পারছে না, রশ্মি মুখ ফুটে বলতে পারছে না, ছেলেটা আরশ না পার্থ ছিলো, রশ্মির বুক টা ছটফট করছে, সবকিছু জানতে ইচ্ছা করছে, পার্থ বাংলাদেশে কিভাবে, নিজের ভিতরকার ব্যাকুলতা রশ্মি প্রকাশ করতে পারছে না, কিভাবে স্বামীর সামনে বলবে নিজের অতীত ছিলো এটা, মাহির তো রশ্মির অতীথ সম্পর্কে সবকিছু জানে তবুও কী স্বামী কে সবকিছু বলা যায়, আজকে রশ্মির বারবার মনে হচ্ছে, আরাত কে সে কতটা কষ্ট দিয়েছে, সাত বছর আগের কথা টা বারবার মনে পরছে ফ্রেন্ড দিয়ে জীবন চলে না, জীবনে বাঁচতে গেলে জীবনসঙ্গী প্রয়োজন, আজকে রশ্মির কাছে মনে হচ্ছে, না এই দুনিয়াতে বাঁচতে গেলে জীবনে শুধু জীবনসঙ্গী না বেস্টফ্রেন্ড কে প্রতিটা পদে পদে প্রয়োজন পরে, মেয়েদের জীবনে এমনও মুহূর্ত আছে, যে কথাগুলো স্বামীর সঙ্গে শেয়ার করা যায় না, যে কথাগুলো বললে মনটা হালকা হবে, সে-সব কথা একমাত্র বেস্টফ্রেন্ডের সঙ্গে শেয়ার করা যায়, এই যে রশ্মি এখন বুঝতে পারছে, মাহিরের কাছে সে জীবনের প্রতিটা সময় মিনিট সেকেন্ডের কথা শেয়ার করলে মাহির কষ্ট পাবে না, আরো রশ্মি কে আগলিয়ে নিবে, কিন্তু রশ্মির মুখে পার্থর কথা শুনতে পেলে মাহির ভীষণ কষ্ট পাবে, এটা স্বাভাবিক কেনো পুরুষ তাঁর বউয়ের মুখে পরপুরুষের নাম বা পরপুরুষের জন্য ব্যাকুলতা সহ্য করতে পারবে না, শুধু পুরুষ কেনো নারী কী তাঁর স্বামীর মুখে কেনো পরনারীর কথা শুনতে পারে একদম না, কিন্তু রশ্মির এখন নিজেকে হালকা করতে হবে, ভিতরকার কথাগুলো প্রকাশ করে মনটা ফুরফুরে করতে হবে, কী আজব তাই-না, এই তো কয়েক ঘন্টা আগেও রশ্মি নিজের জীবন ভালোবাসা সংসার নিয়ে খুশি ছিলো,

আজ থেকে প্রায় সাত বছর পড় নিজের জন্মভূমিতে পা ফেললো, পরিবার বন্ধুত্ব আপন জন দের উপর অভিমান করে নিজের বাবার বাড়ি ছেড়েছিলো, পরিবারের উপর অভিমান টা খুবই স্বাভাবিক, যেখানে রশ্মি তাঁর গারো বিশ্বাস থেকে বিয়ে করে স্বামী কে নিয়ে মায়ের কাছে দোয়া নিতে গিয়েছিলো, কিন্তু সেই বাড়ি থেকে তাঁর স্বামী কে অপমান করে ঘার ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিলো, এটা কী রশ্মির জন্য অপমান ছিলো না, বিয়েটা যেভাবেই হোক বা করুক, এবং মাহিরের যতই দোষ থেকে থাক, মাহির তো রশ্মির স্বামী ছিলো, সবাই চাইলে তাঁদের কে মাফ করে একটা সুযোগ দিতে পারতো, ভুল করলে মাফ মেলে কিন্তু রশ্মি মাহিরের মেলে নি, তাঁরা তাঁদের বাড়ির জামাই কে অপমান করে ঘার ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলো, হ্যাঁ রশ্মির পরিবারের উপর অভিমান আছে কিন্তু আরাতের উপর অভিমান টা বেমানান, তবুও রশ্মি এতকিছুর জন্য আরকতের উপর অভিমান করে আছে, সেদিন রশ্মি নিজের বাবার বাড়ি ছেড়ে শশুর বাড়িতে আসে, শশুর বাড়িতে প্রায় এক মাসের মতো কাটিয়ে মাহির কে নিয়ে পারি দেয়, সেই চিরচেনা শহর কানাডায়, হ্যাঁ মাহির রশ্মির দৈর্ঘ্য সাত বছরের সংসার ছিলো কানাডায়, যে কানাডায় রশ্মি তাঁর প্রথম ভালোবাসার টানে গিয়েছিলো, আজকে ফিরলো দুজন থেকে তিনজন হয়ে, সামনে ঈদ মাহমুদ ইসলামের শরীর টা আগের মতো নেই আর, নাতনী কে দেখবেন, এতদিনে শুধু মাহির থেকে, পরিপূর্ণ ড.মেহেরব ইসলাম মাহির হয়ে ফিরছে, আর তাঁদের সঙ্গে তাঁদের ঘর আলো করে ভালোবাসার অস্তিত্ব #তানহা_জাহান_তিথি আগমন ঘটে,

এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই মাহমুদ ইসলাম নাতনি কে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগে, নাতনী কে আদর করে মাহমুদ ইসলাম তিথি কে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে মাহির কে জরিয়ে ধরে, আদরের ছেলে কে দৈর্ঘ্য সাত বছর পড়ে নিজের বুকে পেয়ে আবেগে ছেলেকে জরিয়ে ধরে রাখে, মাহির নিজের বাবা কে পেয়ে একি কাজটা করে, এদিকে রশ্মি মিরা কথা বলতে লাগে, ছোট তিথি তাঁর ছোট ছোট পায়ে কখন যে রাস্তায় মাঝখানে চলে গেছে তাঁড়া বুঝতেই পারে নি, তিথির কান্নার আওয়াজে সবার নজর যায় রাস্তায় মাঝখানে, এতক্ষণে একটা চলন্ত গাড়ি খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, রশ্মি তিথি বলে চিৎকার দিয়ে জায়গায় নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, আর মাহির মাহমুদ ইসলাম সেদিকে দৌড় লাগায়, তাড়া পৌঁছেতে পৌঁছাতে পার্থ এসে তিথি কে কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির সামনে থেকে লাফ দিয়ে রাস্তায় কোনারে পড়ে যায়, ছোট তিথি পার্থর বুকের উপর ছিলো, আর পার্থর মাথাটা একদম রাস্তায় পাশে পিচঢালা পাকার উপর বারি খেয়ে যায়, মাহির দৌড়ে এসে কোনোদিকে না তাকিয়ে নিজের মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে জায়গা প্রত্যাখান করে, কেনো না ছোট তিথি ভয় আর আতঙ্কে কান্না করতে করতে ন্যাসফেস করছিলো, আর চারপাশে মানুষের ভীর জমে যাচ্ছিল নিমেষেই, মাহির তিথি কে নিয়ে রশ্মির পাশে চলে আছে, মাহির পার্থর মুখটা দেখতে পারেনি, আর দেখলে চিনতে পারতো না, কেনো না মাহির শুধু পার্থর নাম শুনেছে, কখনো পিক দেখেনি, রশ্মি কে এতটা হাইপার হতে দেখে মাহির দ্রুত গাড়ি ডাকলো, গাড়ি আসতেই মাহমুদ ইসলাম নাতনি কে বুকে নিয়ে সামনে সিটে বসলো, আর মিরা তাঁর বেবি কে নিয়ে পিছনে মাহির রশ্মির পাশে বসলো, মাহির রশ্মির মাথা নিজের বুকে মধ্যে রেখে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত করতে লাগলো, রশ্মি ফাঁকা চোখে প্রকৃতি দেখছে, বুকের ভিতর হাজারো কষ্ট না জানা কথা, ছটফট, হাহাকার করছে, যা রশ্মি মাহিরের সামনে প্রকাশ করতে পারছে না,

পার্থর র*ক্তা*ক্ত শরীর টা স্ট্রেচারে পড়ে আছে, নিভু নিভু চোখে পার্থ মিমের দিকে চেয়ে আছে, পার্থের এক হাত মিমের দুহাতের মধ্যে বন্দী, বুকের ভেতরটা কাঁপছে, মিম পার্থের দিকে চেয়ে বলে উঠলো,
___”কেউ আছেন? প্লিজ আগে ডাফার কে দেখুন অনেক রক্ত পড়ছে!
মিম কথাগুলো বলতে বলতে পার্থের হাত আরো শক্ত করে ধরে বলতে লাগলো,
___”ভয় পাস না, আমি আছি তো,তোর কিছু হবে না ডাফার, একদম চোখ বন্ধ করিস না, চোখ খোলা রাখ, আমি তোর কিছু হতে দিবো না।
মিমের চোখে আতঙ্ক,মুখে স্পষ্ট ভয় চোখের পাতা কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, কণ্ঠে অসহায়তা, হাত দুটো কাঁপছে, তবুও শক্ত করে ধরে আছে পার্থের হাত, মিম যখন পার্থের জন্য ব্যাকুলতায় ছটফট করছে ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটারের পাশের দরজা খুলে বেরোল সাদা কোট পরা ডা. আরশ।
ডা. আরশ এই হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট, আরশ থমকে যাওয়া চোখে চেয়ে আছে, এতবছর পড়ে হটাৎ করে খুব প্রিয় একটা মুখ এভাবে দেখতে পাবে, ভাবনাতে ছিলো না, আরশ মিমের হাতের দিকে তাকালো, হাতের দৃঢ়তা, আশ্বাস সবকিছু দেখে আরশের বুকের ভেতর হালকা একটা হাহাকার উঠল, আরশ পুনরায় মিমের মুখপানে তাকিয়ে দেখলো, মিমের চোখে আজ যে আতঙ্ক,যে ছটফটানি সেটা সে আগে কখনও দেখেনি, হাসপাতালের সাদা দেয়ালগুলো আরশের কাছে আজ খুব নির্দয় মনে হচ্ছে, মিম কণ্ঠে কাঁপন নিয়ে পার্থর থেকে চোখ ফিরিয়ে ডক্টর কে বলতে লাগলো,

___“ডাক্তার সাহেব, প্লিজ আগে আমার ডাফার কে দেখুন ও নিশ্চয়ই অনেক ব্যথা পাচ্ছে।
প্লিজ শব্দটার মধ্যে যে অসহায়তা, সেটা আরশের বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে দিচ্ছে, মিমের মুখে আমার ডাফার শব্দ টা শুনা মাএ আরশ জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো, মিম সামনে তাকাতেই অস্থির চোখ দুটো নিমেষেই নিস্তব্ধ হয়ে গেলো, এক মুহূর্তের জন্য দু’জনের চোখে চোখ আটকে গেলো, আরশের চোখে তীক্ষ্ণতা,সময়ের স্তর ভেদ করে যেন পুরোনো সব স্মৃতি একসাথে ভেসে উঠলো, মিম তখনও পার্থর হাত ধরে আছে, এত বছর পর এভাবে দু’জনের দেখা হয়ে যাবে, দুজনের হয়তো কারো প্রত্যাশা ছিলো না,নার্স আরশের কাছে এসে বলল,

___“স্যার কেসটা আর্জেন্ট।
আরশ মিমের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে পার্থর দিকে রাখলো, কিছুক্ষণ পার্থর দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে পেশাদার ভঙ্গিতে বলল,
___” ডা. রাফি কে ডাকুন, উনি কেসটা নেবেন।
আরশ কাগজে সাইন করে, গম্ভীর মুখে অন্যদিকে হাঁটা দিল,তার পায়ের শব্দ করিডোরে প্রতিধ্বনিত তুললো,এক সেকেন্ডের জন্য মিমের চোখে বিস্ময়
মিম ভেবেছিল আরশ হয়তো এগিয়ে আসবে, কিন্তু না আরশ মিমের কাছে এলো না, এবং একবারও পিছনে ফিরে তাকালো না, মিমের চোখ থমকে রইল আরশের যাওয়ার পানে,সাত সাতটা বছরের জমে থাকা অভিমান, অপ্রকাশিত কথা সব মিলিয়ে তার দৃষ্টি ভারী হয়ে উঠল,বুকের ভেতরটা ফাঁকা লাগছে, আরশ তাকে ইগনোর করে চলে গেলো, একটি বার কাছে এসে জানতে চাইলো না, মিম কেমন আছে, এতক্ষণে নার্সরা পার্থ কে ইমারজেন্সি থিয়েটারে নিয়ে গেছে, মিম থিয়েটারের বাহিরে মুখে হাত দিয়ে থিয়েটারের দিকে চিন্তিত মুখে চেয়ে আছে , মিমের ভাবনার মধ্যে ড.রাফি মির্জা কে আসতে দেখা গেলো, রাফি এসে মিম কে কয়েক সেকেন্ড অবাক চোখে দেখে স্তব্ধ মুখে বলল,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৫৯

___” ডোন্ট ওরি, সব ঠিক হয়ে যাবে।
রাফি মিম কে আশ্বাস দিয়ে থিয়েটারের মধ্যে প্রবেশ করলো, মিম মুখে মলিন হাঁসি দিয়ে বন্ধ দরজার থেকে পিছনে ফিরে তাকালো, যে করিডোর দিয়ে আরশ গম্ভীর মুখে বিদায় নিয়েছে, কয়েক পলক সেদিকে চেয়ে থেকে থিয়েটারের বাহিরে ওয়েটিং এরিয়া সেট এর বসে পরলো, মিমের হাতে স্কার্টে লেগে আছে পার্থর মাথার র*ক্ত, মিম সেদিকে তাকিয়ে পুনরায় একবার আরশের বিদায় নেওয়ার পথে চেয়ে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে দেয়ালের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬১