তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬১
জান্নাতি আক্তার জারা
মিম ক্লান্ত চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো,আরশের মুখোমুখি হতে হবে বলে কখনো বাংলাদেশে ফিরতে চাইনি মিম, অথচ বাংলাদেশে ফিরে যাঁর সঙ্গে মুখোমুখি হবে না তাঁর সঙ্গে প্রথমে দেখা হয়ে গেলো, তবে পরিস্থিতি টা সম্পূর্ণ ভিন্ন, মনের ভিতর একদিকে ফ্রেন্ডের জন্য ভয় অন্যদিকে সাত সাতটা বছর পড়ে প্রিয় মুখের দেখা, মিম নিজেকে নিয়ে ভাবতে পারছে না, এ কেমন দোটানা বুকের ভিতর অস্থিরতা, সাত বছর আগে হাজারো কষ্ট গুলো আজকে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে পুনরাবৃত্তি ঘটছে কেনো, মিম তো সবকিছু থেকে পালিয়েছে তবুও সেই হাহাকার কষ্ট গুলো নতুন করে পিছু নিলো কেনো, মিমের মুখ দৈর্ঘ্য কয় ঘন্টা থেকে শুকিয়ে আছে, মিম যখন নিজেকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে চোখ দুটো লেগে এসেছে, ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে গেলো, মিমের দরজা খুলার শব্দে চোখ থেকে কাঁচা মুখটা ছুটে গেলো, তড়িঘড়ি করে বসা থেকে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে গেলো, অপারেশন থিয়েটার থেকে ডা. রাফি বেরিয়ে এলো, মিম রাফি কে দেখে জিজ্ঞাসা কন্ঠে কিছু বলতে নিবে, তাঁর আগেই রাফি মিমের অস্থির মুখপানে চেয়ে আশ্বাস দিয়ে বলে উঠলো ,
___“পেশেন্ট আউট অফ ডেঞ্জার, তবে অবজারভেশনে রাখতে হবে।
মিম কথাটা শুনা মাএ স্বস্তিতে চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো, চোখ বন্ধ রেখে ঠোঁট মৃদু নাড়িয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানিয়ে পুনরায় চোখে পানি ঠোঁটে কৃতজ্ঞতা নিয়ে রাফি কে বলল,
___” থ্যাঙ্ক ইউ ভাইয়া।
হঠাৎ করিডোরে ধীর পায়ের শব্দ, মিম রাফি পায়ের শব্দে সেদিকে তাকালো, দূরে দাঁড়িয়ে আরশ সাদা কোট খুলে হাতে নিয়েছে, চোখ দুটো অপারেশন থিয়েটারের দিকে স্থির তবে চোখে নীরবতা, চোখ দেখে বুঝা দায় মনের গভীরতার ঝড়, রাফি আরশ কে দেখে বলল,
___” আমার ডিউটি শেষ, আমার বউ-বাচ্চা ওয়েট করছে আমার জন্য, পেশেন্ট কে অবজারভেশনে চেক করার রেসপন্সিবিলিটি তোর আমি চললাম।
রাফি আরশ কে কথাটা বলে মিমের দিকে তাকালো, মিম কে আশ্বাস দিয়ে বলল,
___” চিন্তার কিছু নেই, তুমি জাস্ট নিজের খেয়াল রাখো, তোমার আশেপাশে নীরব আগুনে জ্বলজ্বল করে অনেক কিছুই পুড়ে যাচ্ছে টেক কেয়ার।
রাফি আঁড়চোখে আরশের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে শরীর থেকে সাদা আপ্রন টা খুলতে খুলতে করিডর দিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গেলো, মিম রাফির কথা বুঝতে না পেয়ে স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেললো, পুনরায় আরশের কথা মনে পড়তেই হুট করে চোখ তুলে পাশে তাকালো, আরশের দৃষ্টি অপারেশন থিয়েটার থেকে পার্থ কে কেবিনে শিফট করছে সেদিকে, মিম আরশের তীক্ষ্ণ চোখ অনুসরণ পার্থর দিকে তাকালো, পার্থ কে দেখে মিমের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো, হাসি মুখে নার্সদের সঙ্গে মিম কেবিনে ঢুকে পড়লো,আরশ একা দাঁড়িয়ে রইলো করিডোরে, আরশ দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে দাঁতে দাঁত চেপে রেখে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে করিডর থেকে বের হয়ে গেলো,
দূরে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে জানালার কাঁচ ভেদ করে ঢুকছে, রাতের অন্ধকার কাটিয়ে নতুন ভোর শুরু হচ্ছে, পার্থকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে রাতেই, স্যালাইনের বোতল থেকে ধীরে ধীরে ফোঁটা হয়ে স্যালাইন পার্থর শরীরে ঢুকছে, মাথায় ব্যান্ডেজ, মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে, মিম পার্থের পাশে বসে ঘুমিয়ে আছে, তার আঙুল এখনো পার্থর আঙুল জড়িয়ে,পার্থ ধীরে চোখ মেলে তাকালো, মিম কে নিজের বেডের পাশে চেয়ারে বসে ঘুমাতে দেখে পার্থর ফ্যাকাশে মুখে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো, পার্থ মিম থেকে চোখ ফিরিয়ে পুরো রুম চোখ বুলাতে মাথা ঘুরাতে নিলো,
___” আহহহ।
পার্থর ব্যথাতূর কন্ঠ শুনে মিম তড়িঘড়ি করে চোখ মেলে তাকালো, পার্থের চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ করা কপালের শিরা ফুলে উঠেছে, পার্থ কে মাথার ব্যাথায় চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে থাকতে দেখে মিমের বুক ধক করে উঠে, অস্থির হয়ে পার্থর হাত ছেড়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে দরজার দিকে ছুটে গেল, দরজা খুলে করিডোরে বেরিয়ে প্রায় চিৎকার করে নার্স কে ডাকতে লাগলো,
___“নার্স! প্লিজ কেউ আছেন? পেশেন্টের পেইন বেড়ে গেছে!
মিমের কণ্ঠ কাঁপছে শ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে, মিমের চিৎকারে একজন নার্স দ্রুত এগিয়ে এলো,
___“কি হয়েছে ম্যাম ?
মিম প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় নার্স কে বলে উঠলো,
___“ ডাফার, হটাৎ ডাফার এর মাথায় খুব ব্যথা করছে, চোখ বন্ধ করে ফেলেছে… দয়া করে দেখুন!
নার্স মিমের কথায় দ্রুত কেবিনের ভেতরে ঢুকে পার্থের পালস চেক করল, মনিটরের দিকে তাকাল, পুনরায় মিম কে শান্ত করতে বললো,
___“রিল্যাক্স ম্যাম, আমি ডাক্তারকে কল করছি।
নার্সের কথায় মিম বিছানার পাশে বসে পরলো, পার্থর হাত শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
___“আমি আছি ডাফার… চোখ খোল প্লিজ…
পার্থ ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো, ব্যাথাতূর মুখে হাসি ফুটে মিম কে খুব কষ্টে ধীরে ধীরে বলে উঠলো,
___” আমি একদম পারফেক্ট, কান্না করিস না লেডি গুগল, তোকে কাঁদলে পেত্নীর মতো লাগে।
মিম কান্না করতে করতে পার্থর বুকে থাপ্পড় দিয়ে বলতে লাগলো,
___” আমি সাধে বলি তুই ডাফার, সিরিয়াস টাইমে তোর মুখ থেকে বাজে শব্দ বের হতে থাকে, ডাফার একটা।
মিমের কথায় পার্থ ভ্রু নাচিয়ে হেসে মুখে বলে উঠলো,
___” হুম শুধু তোর ডাফার।
মিম কান্নারত মুখে পার্থর বুকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি দিতে লাগলো, নার্স পাশে দাঁড়িয়ে দুজন কে দেখছে আর মুচকি হাসছে, পার্থ হাসতে হাসতে ব্যাথারত মুখে বলে উঠলো,
___” আস্তে লেডি গুগল, আমি ব্যাথা পাচ্ছি।
___” পা ব্যাথা, তুই ব্যাথা পাওয়ার যোগ্য।
করিডোরে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেলো, আরশ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল, মুখ গম্ভীর, কণ্ঠ সম্পূর্ণ পেশাদার,তার চোখ এক সেকেন্ডের জন্য মিমের দিকে থামল, মিম পার্থ দরজা খুলার শব্দ সেদিকে তাকালো, আরশ মিমের হাতের দিকে তাকিয়ে নার্স কে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
___“ এটা কেনো যাত্রাপালা না, পেশেন্টকে বেশি কথা বলতে দেওয়া যাবে না, সবাই বাইরে যান।
নার্স নিচু কন্ঠে বলল,
___” সরি স্যার নেক্সট টাইম খেয়াল রাখবো।
আরশ নার্সের দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বলল,
___” গেট লস।
নার্স আরশের ধমকে মাথা নিচু করে একনজর মিম আর পার্থ কে দেখে বের হয়ে গেলো, পার্থ অবাক হয়ে আরশ কে দেখছে, সামান্য কারণে ডক্টর কে নার্সের সঙ্গে এতটা রুড ব্যাবহার করার মানে বুঝলো না পার্থ, মিম আরশের ধমকে একবার আরশ কে দেখে বসা থেকে উঠে ধীর পায়ে আঁড়চোখে আরশ কে দেখে কেবিন থেকে বের হয়ে গেলো, কেবিনের দরজা ধীরে বন্ধ হয়ে গেল,কেবিনের ভেতর শুধু আরশ আর পার্থ,মেশিনের বিপ… বিপ শব্দটা নীরবতাকে আরো ভারী করে তুলেছে, আরশ কিছুক্ষণ তীক্ষ চোখে পার্থ কে দেখে রিপোর্ট চেক করতে করতে ঠান্ডা গলায় বলল,
___“হিরো হওয়ার শখ?
পার্থ চোখ তুলে তাকাল আরশের দিকে, আরশের তিক্ততা কথার মানে বুঝলো না, মুখে দুর্বল হাসি টেনে আরশের কথায় উওর করলো,
___“সবাই হিরো হতে পারে না ডাক্তার।
পার্থর কথা আরশের পছন্দ হলো না, ফাইলে চোখ রেখেই দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
___“নিজের জীবনের দাম এত কম?
আরশের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নে পার্থ হেয়ালি করে হেঁসে পুনরায় বলে উঠলো,
___“ যখন সামনে একটা বাচ্চা থাকে… হিসাব করার সময় থাকে না ডাক্তার।
আরশ চোয়াল শক্ত করল,
___“হিরো হতে গিয়ে মরলে লাভটা কী?
পার্থ এবার সরাসরি তাকাল আরশের দিকে, হাসি মুখটা নিমেষেই গম্ভীর ফুটে উঠলো, গম্ভীর মুখে আরশ কে দেখতে দেখতে বলল,
___“সবাই নিজের মতো বাঁচে, কেউ নিজের জন্য কেউ অন্যের জন্য।
দুজনের চোখে অদৃশ্য লড়াই,আরশ আর কিছু বলল না, শুধু ফাইল বন্ধ করে গমগম পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল, পার্থ আরশের যাওয়ার পানে চেয়ে মুচকি হেঁসে চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো,বাইরে করিডোরে মিম দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে অস্থিরতা বুকের ভেতর ধকধক করছে,আজ অতীত বর্তমান সব এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, মিম কিভাবে সামাল দিবে সবকিছু,আরশ বের হতেই দুজনের চোখ আবার মিলল, আরশ মিম কে একনজর দেখে ও দেখার মতো এড়িয়ে যেতে নিলে, মিম নিজে থেকে আরশ কে পিছু ডেকে ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,
___“ শুনেন?
আরশ না চাইতেও থমকে দাঁড়ালো জায়গায়, তবে পিছু ফিরে তাকালো না, সেই পুরোনো মিমের তীক্ষ কন্ঠে নেই আজ তীক্ষ্ণতা, আরশ জায়গায় দাঁড়িয়ে মিমের পড়ের লাইন শুনতে ছটফট করে উঠলো, কিন্তু মিম আরশের ছটফট মনে তিক্ততা জরিয়ে দিতে পার্থর কথা জানতে চাইলো,
___” কেমন আছে ও?
আরশের মুখে সেই চিরচেনা রাগ ফুটে উঠলো, যা সাত বছর আগে কথায় কথায় তিরতির মেজাজে ফুটে উঠতো, এই সাতটা বছর যেন সেই কথায় কথায় রাগ দেখানো আরশ কোথাও হারিয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু আজ সেই পুরোনো আরশ যেন ফিরে এসেছে, হয়তো রাগ দেখানো মানুষ টা সামনে দেখে পুরনো অভ্যাস গুলো নতুন করে জেগে উঠছে, আরশ সামনে তাকিয়ে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলল,
___” নিজে গিয়ে দেখে নিন।
আরশ কথাটা বলে পুনরায় হাঁটতে লাগলো, মিম আরশের কথায় নিজেও রাগী ভঙ্গিতে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
___” আপনি ডক্টর, আপনি বলতে বাধ্য।
আরশ পিছনে ফিরে তাকালো, সেই রাগী চোখ, সেই মুখের বাণীতে তিক্ততা, আরশের তাকানো তে মিমের রাগ কোথাও যেন হারিয়ে গেলো, আরশ মিমের চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত খিঁচে বলল,
___“ মরে নি বেঁচে আছে, চিন্তার কিছু নেই।
আরশ কথাটা বলে বড়বড় পা ফেলে চলে গেলো,মিমের বুক থেকে যেন চাপা শ্বাস বেরিয়ে এল,কয়েক সেকেন্ড নীরবতা পালন করে হালকা তিক্ত হেঁসে বলল,
___” এই ছেলে আগের মতোই আছে, একটুও বদলায় নি।
মিমের ভাবনার মধ্যে একটা নার্স এসে বলল,
___“ম্যাম আপনাকে পেশেন্ট ভেতরে ডাকছে ।
মিম নার্সের কথায় তড়িঘড়ি করে ভেতরে ঢুকে গেল, মিম মলিন মুখে পার্থের পাশে চেয়ার টেনে বসতেই পার্থ মিমের হাত ধরে ফিসফিস করে বলল,
___“ওই ডাক্তারটা তোর পূর্বপরিচিত কেউ ?
মিম পার্থর কথায় কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকলো, চোখের কোণে পানি এসে জমে গেছে, পার্থ কপাল কুঁচকে দেখছে মিম কে, মিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত দিয়ে যত্নসহ কারে চোখের কোণ মুছে মলিন হেঁসে ধীর কন্ঠে বলল,
___“ছিলো একসময়।
পার্থ চোখ বন্ধ করে হালকা হাসলো, তাঁর ধারণা ঠিক ছিলো, আরশের চাহনি দেখে পার্থ ঠিক ধরে ফেলছে, এটাই আরশ হবে, কারণ মিমের বর্ণানা অনুযায়ী আরশ মেডিকেল স্টুডেন্ট ছিলো সাত বছর আগে, আর আজকে ডক্টর হওয়া টা স্বাভাবিক, কিন্তু আরশের চাহনি বলে দিচ্ছে, এটাই সেই আরশ যাঁর সঙ্গে মিমের হটাৎ বিয়ে হয়ে যাওয়া, যে ছেলের জন্য মিম আমেরিকায় পারি জামানো, পার্থ হালকা হেঁসে চোখ খুলে মিমের দিকে চেয়ে বলল,
___“তাহলে গল্পটা এখানেই শেষ না তাই তো?
পার্থর কথায় মিম উত্তর দিল করতে পারলো না, পুরো রুমটা কিছুটা সময় নীরবতায় ছেড়ে গেল,পার্থ একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে নীরবতা ভেঙ্গে মিম কে ডেকে উঠলো,
___“লেডি গুগল?
মিম চোখে পানি নিয়ে ছোট করে বলল,
___” হুম বল?
পার্থ কষ্ট করে হাসল, মিম কে নীরবে কান্না করতে দেখে নটকী ভঙ্গীমায় বলল,
___“আমি না বলেছিলাম আমি ঠিক আছি, তুই এমন কাঁদলে আমার ব্যথা বাড়ে।
মিম ঠোঁট কামড়ে ধরল, পার্থ মিম কে হালকা করতে চাইছে, মিম পার্থর দিকে চেয়ে অপরাধী মুখে বলল,
___“তোর কিছু হয়ে গেলে আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারতাম না।
মিমের মুখে আবেগি কথা শুনে পার্থ দুষ্টু হেঁসে বিদ্রুপে সুরে বলল,
___” পেশেন্টের সঙ্গে এত কথা বলবি না, তোর ডাক্তার রেগে যাবে।
পার্থর কথায় মিম দাঁত কিরমির করে তাকালো পার্থর দিকে, পার্থ দুষ্টু হাসতে লাগলো মিম কে রাগিয়ে, ঠিক তখনই করিডোরের অন্য প্রান্তে দ্রুত পায়ের শব্দ, রশ্মির মুখ ফ্যাকাশে চোখ লাল হয়ে আছে, তাঁর পিছনে মাহির নীরবে হেঁটে চলছে,মাহির কেবিন নম্বর জিজ্ঞেস করে এগিয়ে এলো দুজন, রশ্মির বুক ধুকপুক করছে, ধীর পায়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই থমকে দাঁড়াল, কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখল মিম পার্থর পাশে বসে আছে, আর পার্থ বিছানায় শুয়ে আছে, আজ কতদিন কত বছর পড়ে হটাৎ করে জীবনের প্রথম আবেগ, ভালোবাসার মানুষ টার মুখ দেখছে, যা কখনো দেখা হওয়ায় কথা ছিলো না, রশ্মির শ্বাস আটকে গেল, মুখ থেকে কথা বের হতে চাইছে না, কই থেকে শুরু করবে আর কীভাবে বা শুরু করবে, মাহির রশ্মি কে দাঁড়াতে দেখে বলল,
___” এই ছেলেটাই তিথিকে বাঁচিয়েছে?
রশ্মি মাহিরের কথায় শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝানো,
মাহির দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল, মাহিরের পিছনে পিছনে পার্থর দিকে চেয়ে ধীর পায়ে সামনে এগোতে লাগলো, দরজা নকের শব্দে মিম পার্থ দরজার দিকে তাকালো, মিম স্বাভাবিক ভাবে তাকালেও পার্থ যেন চমকে উঠলো, পার্থ অস্বাভাবিক হতে লাগলো নিমেষেই, বাংলাদেশে আসার একমাত্র লক্ষ ছিলো, রশ্মির সঙ্গে দেখা করা, মন থেকে নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাওয়া, এত বছর নিজের মধ্যে অপরাধ গুলো কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল, পার্থ আমেরিকা চলে যাওয়ার এক বছর পড়ে মনে হতে লাগলো, রশ্মির সঙ্গে দেখা করা দরকার, একবার নিজের ভুলের জন্য সামনাসামনি হওয়া দরকার, সঙ্গে সঙ্গে কানাডায় নিজের ফ্রেন্ড দের সঙ্গে কন্টাক্ট করে, কতক্ষণ রশ্মি কানাডা থেকে বাংলাদেশে চলে এসেছিলো, মিমের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের মাটিতে পা দেওয়ার ইচ্ছা টা গভীর হলো, মিমের সঙ্গে ধীরে ধীরে ফ্রি হয়ে উঠলো, মিম কে বাংলাদেশে আসতে ফোঁস করতে করতে এতদিনে পার্থ সাকসেস হয়ে এলো, কারণ মিম বাংলাদেশে আসতে চাইছিলো না, আমেরিকায় পড়াশোনার পাশাপাশি জব খুজতে লাগে, এবং জব পেয়েও যায় , মিম আমেরিকায় একদম সেটেল, বাংলাদেশে তাঁর আসার একমাত্র কারণ রুপালী বেগম আর মিমের বাবা কে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া, পার্থ এত দ্রুত কেনো প্রবলেম ছাড়া প্রথম দিন রশ্মি কে খুঁজে পেয়ে যাবে ভাবতেই পারেনি, রশ্মির সামনে অচেনা মাহির কে পার্থ কপাল কুঁচকে দেখছে,মাহির এগিয়ে এসে নরম গলায় পার্থ কে কৃতজ্ঞা কন্ঠে বলল,
___” থ্যাঙ্ক ইউ আপনি আমার মেয়েকে বাঁচিয়েছেন, আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।
পার্থ দুর্বল হাসল, বুঝতে পারলো যে মেয়ে কে বাঁচিয়ে ছে সেই মেয়ে এই ভদ্রলোকের, মাহির কথাটা বলে পুনরায় হাসি মুখে বলে উঠলো,
___” আই এম সরি আমি আমার পরিচয় না দিয়ে কথা বলতে শুরু করছি, আমি ড.মেহেরাব ইসলাম মাহির তিথির বাবা, আর ও আমার ওয়াইফ রিদিতা জাহান রশ্মি তিথির মা, আমরা আপনাকে থ্যাঙ্ক জানাতে এসেছি, আপনি আমাদের মেয়ে কে বাঁচিয়েছেন আমরা আপনার কাছে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবো।
মাহিরের কথায় পার্থ বুঝতে পারলো গতকাল যে ছোট মেয়েটা কে বাঁচিয়ে ছে সেটা রশ্মির মেয়ে, পার্থ রশ্মি কে একনজর দেখে মাহিরের দিকে চেয়ে মুখে হাসি টেনে বলল,
___“ওকে বাঁচাতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি, নেক্সট টাইম থেকে মেয়ে কে চোখেচোখে রাখবেন।
রশ্মি আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, চুপচাপ কিছু না বলে কেবিন থেকে বের হয়ে গেলো, রশ্মির যাওয়ার দিকে সবাই চেয়ে রইলো, মাহির গলা খাঁকারি দিয়ে পার্থ কে বলল,
___” সিওর, আপনি আমাদের বাড়িতে আসেন একদিন, একসঙ্গে ডিনার করি?
পার্থ মলিন হেঁসে বলল,
___” সিওর আসবো।
পার্থর কথায় মাহির হালকা হেঁসে মিমের দিকে তাকালো, মিম কে বললো,
___“ডাক্তার কি বলেছে?
মিম মাহির কে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো,
___“ডেঞ্জার কেটে গেছে।
মাহির কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে পুনরায় পার্থ কে বলল,
___” দেখা হবে আবার।
পার্থ মলিন হেঁসে বলল,
___” ইনশাআল্লাহ।
মাহির মিম কে একনজর দেখে কেবিন থেকে বের হয়ে গেলো, রশ্মি এতক্ষণ কেবিনের বাহিরে দাঁড়িয়ে দেখছিলো, মাহির কেবিন থেকে বের হয়ে আসতেই দেখলো রশ্মি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, মাহির রশ্মির কাছে এসে গম্ভীর গলায় বলল,
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬০
___” চলো।
মাহির আগে আগে হাঁটতে লাগলো, রশ্মি শেষবার পুনরায় মাথা ঘুরে কাঁচ দিয়ে পার্থ কে দেখলো, পার্থ বেডে শুয়ে থেকে রশ্মির দিকে চেয়ে আছে, রশ্মি সেদিকে একনজর চেয়ে থেকে একটা ঢোক গিলে মাহিরের পিছনে পিছনে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গেলো,
