তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬৯
তাবাস্সুম খাতুন
“গোপন সুড়ঙ্গের কারাগারে, কতজন কে হত্যা করেছেন? TN টিমের বস তানভীর চৌধুরী নিশান।”
সিমির কথা শুনে নিশানের ভ্রু জোড়া যেন আরো বেশি কুঁচকে গেলো। তার মাথায় খেলছে না, সিমি এইগুলো জানলো কিভাবে?সে নিজেকে শান্ত করে একই টোনে বললো,
“ফালতু কথা তুই পাস কোথায়? কিসের গোপন সুড়ঙ্গ? আর কিসের কারাগার? আমি কোন টিমের বস – টস না।”
সিমির চোখ বেয়ে এক ফোঁটা নোনা পানি গড়িয়ে পড়লো। সিমি এখনো নিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে। হুট করে সিমি নিশানের শার্ট এর কলার টেনে ধরে নিজের আরো একটু কাছে আনলো। দুইজনের মাঝে দূরত্ব হয়তো দুই সেন্টি মিটার। সিমি নাক টেনে বললো,
“কথা লুকাবেন না। আমি না চাইতেও কিছু কথা শুনে ফেলেছি। আপনি যদি মসজিদে দাঁড়িয়েও বলেন, আমি কোন খুন করি নি। তবে যে আমার বিশ্বাস করতে বড্ড কষ্ট হবে। কারন কারোর হৃদপিন্ড ছিঁড়ে এনে আমার পায়ে ফেলেছিলেন আপনি। সেইসব বাদ দিলাম তবে ইতালির এই রোম শহরে কি পাপে মুড়ানো সম্পর্ক আছে আপনার? TN টিম এইটা কেমন টিম? কে ফারহান দরিয়াস? গোপন সুড়ঙ্গের অন্ধকার কারাগার কোথায়? আর সেখানে কত জন কে হত্যা করছেন? কি আছে ওই সুড়ঙ্গে?”
সিমির কথা গুলো নিশানের কর্ণ’গুছর হলো।সে সিমির চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“TN এইটা আমার টিম। এই ইতালির রোম শহর আমার দখলে। চারিদিকে আমার TM টিম ছড়িয়ে আছে। গোপন সুড়ঙ্গ আছে এই শহরের শেষ সীমানায় একটা বড়ো বিল্ডিং এর নিচে। আর সেই সুড়ঙ্গের নিচে আছে অন্ধকার কারাগার। ঐখানে আটকিয়ে আছে এই ইতালির সবচেয়ে বড়ো মাফিয়া ডন ফারহান দরিয়াস। ঐ কারাগারে যাকে নিয়ে গিয়েছি তাকে জীবিত তো দূর মৃত দেহ ও আজ পর্যন্ত বাহির করিনি। ঐভাবেই পচে আছে ওই অন্ধকার কারাগারে নৃশংস ভাবে হত্যা করে রাখা মানুষ গুলো।”
সিমির চোখ থেকে অঝোর ধারায় পানি পড়ছে। তবুও সে বললো,
“খুব বেশি দরকার ছিল কি? ওই পাপের সাম্রাজ্য পা দেওয়ার!”
নিশান সিমির চোখের দিকে তাকিয়ে নরম কন্ঠে বললো,
“তোকে ভোলার জন্য ওই পাপের সাম্রাজ্য পা দিয়েছিলাম। কিন্তু এইটা ভাবি নি, ওই সাম্রাজ্য পা দেওয়ার পরে তুই আমার দ্বিগুন আসক্তি হয়ে উঠবি।”
সিমি নিশানের গালে এক হাত রেখে বললো,
“কবে থেকে এত বেশি আসক্ত হয়ে পড়লেন আমার উপরে?”
নিশান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। নিজের সিট্ এ গিয়ে বসলো। সিট্ এ মাথা এলিয়ে দুই হাত মাথার পিছনে রাখলো। চোখ দুটো বন্ধ করা। সিমি একটু হেলে তাকালো নিশানের পানে। হুট করেই নিশান বলতে শুরু করলো,
“তুই যখন পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিলিস, তখন আমার বয়স মাত্র দশ। তোকে পেয়ে বাড়ির সবাই খুশি। তোর নাম ঠিক করার জন্য অনুষ্ঠান এর আয়োজন করা হলো। আমার এইসব দেখে শুনে ভীষণ রাগ লাগতো। তোকে কোলে দিতে গেলেও আমি নিতাম না অসহ্য লাগতো। মোট কথা তোকে সয্য করতে পারতাম না। এইভাবেই দিন যাই তুই ও বড়ো হলি। আমিও হলাম তোর তিন তো আমার তেরো বছর। একদিন তোকে আর জারাকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পরে আমার। আমি যেতে চাইছিলাম না তবে বাধ্য হয়ে গেলাম।সেইদিন তুই আমাকে ভাইয়া বলে ডাকছিলিস। আমার ভালো লাগছিলোনা তোকে ধমক ও দিয়েছি। আমাকে ভাইয়া বলবি না।তুই মুখ ফুলিয়ে রেখেছিলিস পাত্তা দেই নি আমি। দুইজনকে খাবার কিনে দিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম সেইসময় আমার ফ্রেন্ড আসে আমার কাছে তুই মাথা নিচু করে আছিস। ওরা জারার সাথে কথা বললো।
একজন তোকে ডাকলো, আমার কেন জানি তখন ভালো লাগলো না তোকে আমার পিছনে আড়াল করে রাখলাম। তবে তুই চোখ তুলে তাকিয়েছিলিস। ও তোর প্রশংসা করছিলো। আমার রাগ হচ্ছিলো প্রচুর, তোকে পিঠে জোরে চড় দিয়েছিলাম। তুই খাবার ফেলেই কান্না করতে করতে দৌড় দিলি। সেইদিন আমিও দৌড়ে তোকে আবার কোলে নিলাম। তোর মাথা আমার কাঁধে রাখলাম। তুই কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লি। অথচ সেইদিন সেই নিষ্পাপ কান্না করতে করতে গাল নাক লাল করে দাও পিচ্চিটার প্রতি কেমন জানি আমার একটা অনুভব কাজ করছিলো। যার রহস্য বাহির করতে আরো তিনটা বছর কেটে গেলো। যখন বুঝলাম তখন অবুঝ ভাবে বার্থডে গিফ্ট হিসাবে তোকে চেয়ে বসলাম। তবে আমাকে দিলো না তোকে। শর্ত ছুড়লো আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে তারপর তোকে পাবো। সেইদিন এর পরে মনে বসিয়ে ফেললাম তোকে। টার মানে তুই শুধুই আমার। এই তানভীর চৌধুরী নিশানের।”
থামলো নিশান। সিমি অস্পলক চাহুনিতে এখনো তাকিয়ে আছে নিশানের পানে। সে আরো শুনতে চাই এই মানুষটার কথা। ভাবতেই অবাক হচ্ছে এই তানভীর চৌধুরী নিশান একটা তিন বছরের বাচ্চার প্রেমে পড়েছিল। সেইদিন!সিমির ভাবনার মধ্যে নিশান আবারো বলা ধরলো,
“এরপর তোকে সবসময় চোখে চোখে রাখতাম। কোন ছেলের সাথে মিশতে দিতাম না। শুধু একমাত্র আমার বোন ছাড়া। তবে যেইদিন দেখি ওই নীলের হাত তুই ধরেছিলিস, আমার বুকের বাম পাশে থাকা হৃদপিন্ডটা যেন কেউ ছুরি দিয়ে টুকরো টুকরো করছিলো। তাই তোকে আমি বদ্ধ রুমে আটকিয়ে শাস্তি দিয়েছিলাম। যার দরুন আমার বাবা আমাকে রক্তাত করে বাড়ি থেকে বাহির করে দিয়েছিলো। আমি সেইদিন হাসি মুখেই বাড়ি ছেড়েছি। কারন আমি নিজের পায়ে দাঁড়ালে তবেই তোকে পুরোপুরি ভাবে আমার করে পেয়ে যাবো। ইতালি আসি পড়াশোনা করি।
এইভাবেই চলছিল ধীরে ধীরে তোকে আপন করে পাওয়ার দ্বিগুন তীব্রতা মনে উন্মাদনার সৃষ্টি করে। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারতাম না। কষ্ট হতো ভীষণ তোকে সরাসরি দেখা তোকে জড়িয়ে ধরা। এইসব কল্পনা করতাম না। বাড়ির আনাচে কানাচে হিডেন ক্যামেরা লাগলাম তোকে সবসময় দেখার জন্য। আমি কেমন যেন মানসিক রুগী হয়ে উঠছিলাম। একদিন আমার ফিট করা লোক বললো কেউ তোকে বাজে ভাবে ছুঁয়েছে, আমার রক্ত যেন মাথায় উঠে গেছে।দ্রুত ইমার্জেন্সি টিকিট কেটে বাংলাদেশ আসি। সেই রাতে আমি তাকে বিকৃত ভাবে খুন করি। ওর রক্ত আমার সারা দেহে লেগেছিলো। খুবই নিকৃষ্ট খুন ছিল সেইটা। আমার জীবনে প্রথম খুন ছিল সেইটা। সেই খুন করে কেন যেন একটু মানসিক শান্তি পেলাম।
তখনই আবার ইতালি আসলাম। তোকে ভোলার জন্যই তখন ওই সাম্রাজ্য পা দিলাম। তবে সেখানে পা দিয়ে তুই আমার আরো বেশি আসক্তি তে পূর্ণ হলি। তোকে পাওয়ার ইচ্ছা আরো বেশি গ্রাস করলো আমাকে। খুন করতাম তবে তারা কেউ নিষ্পাপ ছিল না। আমি কোন নিষ্পাপের প্রাণ নেই নি। হ্যা আমি হাজারো খুন করেছি। তবে তারা কেউ ভালো ছিলোনা। তাঁদের পাপের শাস্তি তাঁদের দিয়েছি। সেই থেকে শুরু হয় আমি। আমার TM টিম। সব মাফিয়াদের সরিয়ে নিজে রাজত্ব বসলাম এই শহরে। তবে যেইদিন তোকে পাওয়ার দিনটা কাছাকাছি আসলো আমি সবকিছু ছেড়ে তোর কাছে গেলাম। তোকে জোর করে আমার করলাম। তবে তোর দিকে করোর বাজে নজর সয্য করতে পারতাম না। তাই অনেক কে খুন করছি দেশে থেকে। কারন আমার উন্মাদনার একমাত্র মালকিন তুই। ”
বলে থামলো নিশান। হাত বাড়িয়ে পানির বোতল নিয়ে। ধকধক করে খেয়ে নিলো। বোতলটা রেখে দিলো। মাথাটা আবার সিট্ এ হেলিয়ে দিতেই হুট করে সিমি ঝাঁপিয়ে পড়লো নিশানের বুকে। নিশান কোন রিএকশন দিলোনা। চোখ বন্ধ করে রইলো। সিমি নিশানের বুকে মুখ গুঁজে কান্না করতে করতে বললো,
“আমাকে যে এত করে চান আপনি। কখনো কল্পনাও করি নি। আমি আপনাকে অনেক বেশি ভালোবাসি। হয়তো আপনার কাছাকাছি যাবে না আমার পাগলামি তবে ১ % যেতেই পারে। আপনাকে যদি এখন একটা আবদার রাখি আপনি কি পূরণ করবেন আমার এই আবদার?”
নিশান ‘হুম বলতেই সিমি বলে উঠলো,
“এইসব ছেড়ে দিন। আর কোন খুন খারাবি করবেন না প্লিজ। আপনি এইভাবেই থাকেন আমার জীবনে এইভাবে পাগলামো করবেন। আমি দেখবো আরো গভীর ভাবে ভালোবাসবো। শুধু একটাই ছেড়ে দেন ওই টিম খুন খারাবি আর করবেন না প্লিজ।”
নিশান সিমির বাহু ধরে নিজের সামনে এনে কর্কশ কন্ঠে বললো,
“কানের নিচে দুইটা থাপ্পড় মারবো। বেয়াদব মেয়ে। তোকে কতবার বলেছি, যে কান্না করবি না। তোর চোখের পানি কি সস্তা হয়ে গেছে?”
নিশানের এমন কথা শুনে। সিমি ফিক করে হেসে দিলো। নিশানের গলা জড়িয়ে ধরে নিশানের মুখোমুখি এসে বললো,
“সস্তা না জনাব একটু নাটক করছি। কারন এই কান্না করা পিচ্চির প্রতি আসক্তি হয়েছিলেন আপনি।”
বলেই সিমি টুপ করে নিশানের ঠোঁটে একটা চুমু দিলো। নিশান অবাক হলো, তবুও নিজেকে সামলিয়ে বললো,
“আমাকে পাগল করলে কিন্তু এই পাগলামির ভর তোকে সয্য করতে হবে এখন। পারবি তো জান?”
সিমি মাথা নত করে বললো,
“পাগল হলে পাবনার পাগলাগারদে ভর্তি করিয়ে দেবো।”
সিমির কথা শুনে নিশান সিমির মুখ তুলে এক সেকেন্ড সময় না দিয়ে সিমির ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে করে নিলো। সিমির চোখ জোড়া বড়ো বড়ো হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পরে সে নিজেও রেসপন্স করলো। ছয় মিনিট পরে নিশান সিমিকে ছেড়ে দিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগলো। নিশান হাঁস্কি টোনে বললো,
“আমার পাগলামির পাগলাগারদ একমাত্র তোর মাঝেই বিরাজমান জান। এইভাবে আমাকে পাগল বানালে। আমার পাগলামি সয্য করতে হবে তোকে। যা খুবই ব্যাথাদায়ক যন্ত্রনা হতে পারে তোর জন্য।”
সিমি চোখ বন্ধ করে নিশানের কথা শুনছে। নিশান আবারো নেশালো কন্ঠে বললো,
“বউ কাছে আছে এইজন্য কন্ট্রোল ধরে রাখার চেষ্টা ও করবো না। ব্যাক সিটে চল।”
সিমি লজ্জা পেলো। নিশান তাকে নিয়ে ব্যাক সিটে গেলো। নিশান সিমির মুখে পরপর দুইটা চুমু দিলো।ধীরে ধীরে তারা গভীরে যেতে লাগলো। রাত আরো গভীর হতে লাগলো। আর এইদিকে দুই কপোত – কপোতী আরো গভীরে যেতে লাগলো।
“আমি আপনাকে ভালোবাসি।”
জারার কথা শুনে আয়ানের কাশি উঠে গেলো। তারা কফিশপে বসে আছে। সবে কফি টা মুখে নিয়েছে। সাথে সাথে বাহির করে কাশতে লাগলো। জারা সেইদিকে পাত্তা দিলোনা। আয়ান নিজেকে সামলিয়ে জারার দিকে তাকিয়ে বললো,
“তুমি কি বলছো এইসব? এইগুলো বলার জন্য আমাকে ডেকেছো? তোমার ভাইয়া জানতে পারলে খুন করে ফেলবে আমাদের। মাথা খারাপ নাকি? আমি তোমার ভাই হয়।”
আয়ানের কথা শেষ হতেই জারা জোরে টেবিলেবারি মেরে বললো,
“কিসের ভাই? আমার আপন ভাই না। আমার রক্তের ও কেউ নন। তাহলে কিভাবে ভাই হয়? আর কি বললেন ভাইয়া জানলে খুন করবে? করুক আমি তো ভয় পাচ্ছিনা আপনি পাচ্ছেন কেন? কতদিন ঘুরাবেন আমাকে আর? আমি বলে দিয়েছি আমি ভালোবাসি আপনাকে। এখন কিভাবে আমাকে নিজের ঘরের বউ বানিয়ে তুলবেন এইটা আপনার পার্সোনালিটি। আর আপনাকে বিয়ে করে ঘর সংসার সহ আপনাকে সয্য করা এইটা আমার পার্সোনালিটি বুঝেছেন?”
জারার কথা শুনে আয়ান নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বললো,
“দেখ জারা তুমি ভেবে চিন্তে কথা বলো। এইভাবে…
আয়ান কে কিছু বলতে না দিয়ে জারা উঠে আয়ানের কাছে আসলো। আয়ানের গলার কাছে নিজের ফোন ধরে বললো,
“শুধু ভাইয়া না, আমিও কিন্তু মাথা গরম মানুষ। কারন ভাইয়ার রক্ত আমার শরীরেও বইছে। আর আমি সবসময় ভেবে চিন্তেই কথা বলি। লাস্ট চান্স আপনি ভেবে দেখেন, হয় আমাকে বিয়ে করুন নয়তো পরপারে যাওয়ার টিকিট কাটুন।”
তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬৮
বলে জারা চলে গেলো। তার রাগের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এই আয়ান এর সাথে সে অনেক দিন থেকে কথা বলছে। আয়ান তার সাথে ফ্লাট করে সেও করে। আয়ান নিজ ইচ্ছাই জারার সাথে ভার্সিটি দেখা করতে আসে। একসাথে নাস্তা করে। আয়ানের ছোট কেয়ারিং এ সে যেন ধীরে ধীরে আয়ানের প্রেমে পড়লো। অনেকদিন থেকে সে আয়ান কে বলছে ইশারায় তবে যেন বুঝার চেষ্টা করছেনা। এইজন্য সে আজ কফিশপে আয়ানকে ডেকে সাহস জুগিয়ে ওই কথাগুলো বললো। এইদিকে জারা যেতেই আয়ান গালে হাত দিয়ে বললো,
“যেমন ভাই তার তেমন বোন। দুইটাই বোম্বাই মরিচ। আমার মতো নিরীহ ছেলেকে দুই ভাই বোন খুবলিয়ে খাচ্ছে ছিঃ।”
