Home তুই শুধু আমার উন্মাদনা তুই শুধু আমার উন্মাদনা শেষ পর্ব

তুই শুধু আমার উন্মাদনা শেষ পর্ব

তুই শুধু আমার উন্মাদনা শেষ পর্ব
তাবাস্সুম খাতুন

বাংলাদেশের সময়টা এখন সন্ধ্যা সাতটা বাজে। চৌধুরী ম্যানশন আগের মতোই আছে। তবে এই নয় বছরে অনেকের জীবন পরিবর্তন হয়েছে। জিহান আর সামিয়ার একটা মেয়ে হয়েছে যার নাম সাদিয়া শেখ মীরা। বয়স ছয় বছর। পিহুর বিয়ে হয়েছে দুই বছর হচ্ছে। স্বামী সহ বিদেশে থাকে সেখানে সেটেল। মিহু আমেরিকা গিয়েছে পড়াশোনার জন্য। বাড়ির সব থেকে ছোট সদস্য তাজ সেও আজ অনেক বড়ো হয়ে গেছে বয়স গিয়েছে ঠেকেছে ২০ এর কোঠাই, অনার্স সেকেন্ড ইয়ার এ পরে। বাড়িতেই আছে এখনো অর্নাস শেষ হলে দেশের বাইরে যাবে।রাত্রি আর অভির ও জমজ ছেলে হয়েছে পাঁচ বছর বয়স। নাম সামিয়ান তালুকদার আশিক, আরিয়ান তালুকদার অরিস।এইদিকে জারা আর আয়ানের বিয়ে হয়েছিল তাদের একটা মেয়ে আছে তিন বছরের তার নাম আইরিন তালুকদার অর্থী। চৌধুরী পরিবারে থাকা তিহান শেখ, এখনো ডুবে আছে মৃত সিমরানের প্রতি। তাকে বিয়ের কথা বললে পাত্তা দেই না। সবসময় এড়িয়ে চলে। এই নিয়ে বাড়ির সবার দুশ্চিন্তা। তবে তিহান নিজেকে সবসময় সুস্থ রাখে, কাজ করে। আবার নিয়ম করে সিমরানের কবরের পাশে বসে থাকবে।

চৌধুরী বাড়ির তিন কর্তা সহ রুবেল ড্রইং রুমে বসে ব্যবসা সম্পর্কে কথা বলছে। রোজিনা, কিয়া আর মেহেরিমা মিলে সন্ধ্যার জন্য হাল্কা নাস্তা তৈরী করছে। জিহান মাত্র বাসায় আসলো, উপরে নিজের রুমে গিয়েছে। সামিয়া মেয়েকে বই পড়াচ্ছিলো। জিহান আসতেই সামিয়া মীরাকে তাজের কাছে দিয়ে রুমে আসলো। জিহান ওয়াশরুমে ঢুকেছে। সামিয়া আলমারি থেকে জিহানের জন্য একটা সাদা টিশার্ট আর কালো টাউজার বাহির করে বেডে রেখে জিহানের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। পনেরো মিনিট পরে জিহান লম্বা সাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে আসলো।
সামিয়ার রেখে দেওয়া পোশাক পড়ে নিল। সামিয়া বলে উঠলো,

“নিচে চলুন, নাস্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
জিহান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো সেট আপ করে বললো,
“নিচে যাওয়ার আগে আরো একটা কাজ আছে যে।”
সামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো,
“আবার কি কাজ?”
জিহান এইবার সামিয়ার কাছে আসলো, আচমকা ওর কোমরের খাঁজে হাত দিয়ে টেনে নিজের কাছে আনলো। সামিয়া আগের মতো ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কি মতলব?”
জিহান সামিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে হাঁস্কি টোনে বললো,
“লিপ কিস।”

সামিয়া জিহানের হাত নিজের কোমর থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বিরক্ত কণ্ঠে বললো,
“মেয়ের বাপ হয়েচ্ছেন, এখন এইসব জুত বাদ দিয়ে নিচে চলেন।”
জিহান সামিয়ার কথা তৌক্কা না করে, সামিয়ার ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেয়ে বললো,
“শুধু মেয়ের বাপ হয়রছি, এখনো ছেলের বাপ হতে বাকি আছি। আমার থেকে দূরে থাকলে ছেলের বাপ হবো কিভাবে?”
সামিয়া জিহানের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঠোঁট মুছে বললো,
“আমার লাগতো না আর ছেলে মেয়ে এই একটাই যথেষ্ট। অসভ্য বেডা।”
বলে রুম থেকে চলে গেলো। জিহান নিঃশব্দে হেসে সামিয়ার পিছু পিছু গেলো। ড্রইং রুমে সবাই গোল করে বসে আছে। নাস্তা করছে। মীরা তার পাপা জিহানের কোলে বসে গল্প করছে, আজকে কি হলো? কি করলো? সেইসব বলছে।

তাঁদের গল্প করার মধ্যেই সদর দরজায় কলিং বেলের শব্দ হলো। সামিয়া উঠে দরজার কাছে গেলো। সবার দৃষ্টি সদর দরজার দিকে। সামিয়া দরজা খুললো। সামনে তাকাতেই ও অবাক হয়ে গেলো। যেন নিজের চোখ কে কোন ভাবে বিশ্বাস করতে পারছেনা। সামিয়ার অবাক মুখ দেখে সিমি মুচকি হেসে বললো,
“অবাক থেকে সিরিয়াস হো সামু।”
সামিয়ার চোখে পানি টলমল করছে। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো সিমির বুকে। কান্না করে দিলো। সিমির চোখেও পানি টলমল করছে। সামিয়ার এমন অবস্থা দেখে দৌড়ে সবাই দরজার কাছে আসলো। সামিয়ার মতো তারাও অবাক। আজ পুরো নয়টা বছর পরে নিশান আর সিমি চৌধুরী ম্যানশনে পা রাখলো। তারা এতটা অবাক হতো না, যদি নিশান তাঁদের সাথে যোগাযোগ করতো। কিন্তু এই নয় বছরে একটা বারের জন্য ও তো যোগাযোগ করি নি বাড়িতে। তাই অবাক হচ্ছে। সাথে সবার চোখে পানিও চলে আসছে। জিহান এগিয়ে গিয়ে নিশানকে জড়িয়ে ধরে বললো,

“ইয়ার এত বছর কই ছিলিস? আমাদের কথা কি একদম মনে পড়ি নি তোর?”
নিশান জিহানকে নিজের থেকে সরিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বললো,
“মেয়েলি স্বভাব এখনো যাই নি তোর।”
জিহান কিছু বললো না, বরং হাসলো। এইসব কথা আজ পুরো নয়টা বছর ধরে কেউ তাকে বলে নি। খুব আনন্দ লাগছে। এইদিকে সিমি আর সামিয়া এখনো নিজেদের জড়িয়ে ধরে আছে। ইহান এইসব দেখে হঠাৎ বলে উঠলো,
“পাপা এই আন্টিটা কে? পুরো দশ মিনিট ধরে মাম্মাম কে জড়িয়ে ধরে আছে, ছাড়ার কোন নামই নেই দেখছি ডিসগাস্টিং।”
ইহানের কথা সবার কানে যেতেই সবার দৃষ্টি পড়লো ইহানের দিকে। কারোর আর বুঝতে দেরি হলো না এইটা নিশান আর সিমির ছেলে। নিশান আর সিমিকে ছেড়ে এইবার সবাই ইহানকে নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। ইহানকে নিয়ে ড্রইং রুমে গেলো সোফায় বসালো। তাজউদ্দিন তার পাশে বসে আছে। ইহানের হাত ধরে হাসি মুখে বললো,

“মাশাআল্লাহ একদম নিশানের মতো দেখতে হয়েছে। নাম কি দাদু তোমার?”
ইহান কপাল কুঁচকে বললো,
“আজব তো? আমাকে দেখে কি বুড়ো মনে হচ্ছে, যে দাদু বলে ডাকছেন?”
ইহানের কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো। সিমি ধমকে উঠে বললো,
“ইহান তুমি দিনদিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছ দেখছি।”
সিমির ধমক শুনে নিশান এইবার ধমক দিয়ে সিমিকে বললো,
“তোর কানের নিচে থাপ্পড় মারবো ইশু, ছেলেকে বেয়াদব বলস কেন?”
সিমি একবার নিশান তো আর একবার ইহানের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুসতে লাগলো। জীবনটা তেজপাতা। নিশান সোজা উপরে চলে গেলো নিজের রুমে। নিশানের পিছুপিছু জিহান ও গেলো। এইদিকে বাড়ির সবাই তাঁদের কাহিনী দেখে হাসলো। তাজউদ্দিন আবার বললো,

“বুড়ো তো আমি হয়ে গেছি। তুমি এখনো জুয়ান। তো নাম কি তোমার?”
ইহান এইবার তার মাম্মাম এর দিকে তাকিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বললো,
“মাম্মাম এরা কারা? আমাকে কেন বারবার এত প্রশ্ন করছে? তুমি তাঁদের বলে দিতে পারছো না, আমি এত প্রশ্ন পছন্দ করি না।”
সিমি দাঁত কিরমির করতে করতে বললো,
“অসভ্য হোচ্ছ?”
ইহান আগের টোনই বললো,
“আমি কোন অসভ্যতামি করি নি মাম্মাম, যে তুমি আমাকে অসভ্য বলবে। আমাকে রুম দেখিয়ে দাও। আমি জাস্ট টায়ার্ড।”
সিমি কিছু বলবে তখনই তাজউদ্দিন বললো,
“থাক সিমি মামুনি, আর কিছু বলোনা। আমরা বুজে ফেলছি নিশানের মতো ঘাড়তেড়া হয়েছে। মীরা দাদু মনি তোমার ভাইয়াকে নিয়ে তোমার রুমে যাও।”
এত ক্ষণ ধরে নীরব দর্শক থাকা মীরা এগিয়ে আসলো। ইহানের কাছে এসে বললো,
“আসো ভাইয়া।”
ইহান নেমে যেতে যেতে বিরক্ত কণ্ঠে বললো,
“তুমি আমার মাম্মামের পেটে হও নি, যে তুমি আমাকে ভাইয়া বলে ডাকবে।”
মীরা ইহানের কথা শুনে তার দিকে ফিরে সরল ভাবে বললো,
“তাহলে নামটা বলো।”
“আমার নাম শুনে তোমার কোন কাজে লাগবে না মেয়ে, আমাকে জাস্ট রুমে নিয়ে চলো।”
মীরা কিছু না বলে রুমে নিয়ে গেলো। সিমি মীরাকে দেখে বললো,

“এই পিচ্চি মেয়েটা কে?”
তাজউদ্দিন হেসে বললো,
“জিহানের মেয়ে।”
সিমি হেসে বললো,
“মাশাআল্লাহ খুব সুন্দর।”
এরপর সিমি সবার সাথে বসে টুকটাক গল্প করতে লাগলো। রোজিনা জারা আর রাত্রিকে বলে দিয়েছে সিমিরা বাসায় আসছে। এইটা শুনে তারা অনেক খুশি হলো। সেই রাতেই গাড়িতে উঠে চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্য আসতে লাগলো।

নিশান রুমে ঢুকলো, তার রুম আগের মতোই আছে। কোন পরিবর্তন হয় নি, হয়তো সবসময় পরিষ্কার করে রাখছে। জিহান ও নিশানের পিছু পিছু রুমে আসলো। বেডে বসে বলে উঠল,
“কই ছিলিস এতদিন?”
“ইতালি।”
“ইতালির কোথায়?”
“রোম শহরে।”
“রোম শহরে, কোথায়?”
“নিজের বাড়িতে।”
জিহান অবাক কণ্ঠে বললো,
“নিজের বাড়ি কবে বানিয়েছিস?”
“ইতালি থাকা কালীন।”
“তাহলে আমি জানলাম না কেন?”
“কারন তুই গাধা।”
“অপমান করিস না ইয়ার, গাধা হলে মেয়ের বাপ হতাম না।”
“Good মেয়ের বাপ হওয়ার জন্য কংগ্রাচুলেশন।”
“তোকেও কংগ্রাচুলেশন আমার মেয়ের জামাইয়ের বাপ হওয়ার জন্য।”
জিহানের কথা শুনে নিশান ভ্রু কুঁচকে বললো,

“মেয়ের জামাই মানে?”
জিহান হাসি মুখে বোঝালো,
“সিম্পল বিষয়, তোর ছেলেকে আমার সেই পছন্দ হয়েছে। তাই ঠিক করে নিয়েছি, আমার মেয়ের সাথে তোর ছেলের বিয়ে ফাইনাল।”
নিশান দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“দুনিয়ায় ছেলে অভাব পড়ছে? যে আমার ছেলের দিকে নজর দিস।”
জিহান আগের মতোই বললো,
“ছেলের অভাব নেই, তবে তোর মতো ঘাড়তেড়ার একমাত্র ছেলের অভাব এই দুনিয়াতে একটাও নেই। জাস্ট অন পিস তাই তোর ছেলে আমার মেয়ের জামাই জাস্ট ফিক্সড।”
নিশান কিছু বললো না সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। সে জানে জিহান এখন এইবার বিয়ের আয়োজন সম্পর্কে কথা বলতে থাকবে, যত আজগুবি ভাবনা সব বলে ফেলবে।

মীরা ইহানকে নিজের রুমে আনলো। ইহান রুমে ঢুকে দেখলো রুমের অর্ধেক জায়গা ধরে শুধু পুতুল। বেড এর উপরে বিছানো চাদর ও পুতুলের। বালিশ গুলোও তাই। ইহান চোখ ছোট ছোট করে বললো,
“এইটা রুম নাকি অন্য কিছু?”
মীরা হাসি মুখে বললো,
“আমার পছন্দ পুতুল, তাই সবজায়গায় পুতুল।”
ইহান মাথায় হাত দিয়ে বললো,
“O my god এ কোন জায়গায় এসে পড়লাম আমি?”
মীরা বুঝতে না পেরে বললো,
“কেন কি হয়েছে?”
ইহান নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললো,
“আমি পাগল হয়ে যাবো।”
মীরা বলে উঠলো,

“আমি কি মাম্মাম কে ডেকে এনে বলব, তোমাকে পাগলা গারদে রেখে আসার জন্য।”
ইহান তাকালো মীরার পানে। মীরা চোখ ছোট ছোট করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ইহান বলে উঠলো,
“নাম কি তোমার?”
মীরা হাসি মুখে বললো,
“সাদিয়া শেখ মীরা।”
ইহান আবারো বললো,
“বয়স কত?”
মীরা বললো,
“ছয় বছর।”
“তুমি আমার থেকে অনেক ছোট। আমি তোমার বড়ো আমাকে সন্মান দিয়ে কথা বলবে এইবার থেকে। আমি এখন রেস্ট নেবো তুমি যাও।”
মীরা ভ্রু কুঁচকে বললো,

“বাহ্ রে আমার রুম আমার সব, আবার আমাকেই তাড়িয়ে দাও? আমি যাবো না।”
বলে মীরা সোজা বেডে গিয়ে একপাশে শুয়ে পড়লো। ইহানের রাগ হচ্ছে তবুও কিছু বললোনা। সে ওয়াশরুমে ঢুকলো ফ্রেশ হলো। তার সাথে আনা একটা ট্রলি থেকে টিশার্ট আর টাউজার বাহির করে পড়ে নিলো। এরপর বেডে গেলো লাইট অফ করে বেডের আরেক পাশে চুপ করে শুয়ে রইলো। মীরা চোখ বন্ধ করে আছে। এইদিকে ইহান ঘুমিয়ে গেছে। মীরা উঠে চুপিচুপি লাইট অন করে ইহানের কাছে আসলো। ইহানের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো, ইহান ঘুমিয়ে আছে। মীরা হাসলো এরপর তার টেবিলের কাছে গিয়ে সেই জায়গা থেকে একটা কালো আর লাল রঙের মার্কার তুলে আনলো। ইহানের পাশে বসে হেসে বললো,
“আমার দাদুকে কিভাবে বলছিলে, সাথে আমাকেও। দাড়াও তোমার মজা দেখাচ্ছি এইবার।”
বলে কালো মার্কার দিয়ে ইহানের গোঁফ আকিয়ে দিলো। লাল মার্কার দিয়ে ইহানের দুই গালে ব্লাশিং করিয়ে দিলো। কালো মার্কার দিয়ে আবারো ইহানের কপালে একটা টিপ দিলো। এরপর লাল মার্কার দিয়ে খুব ধীরে ঠোঁটে লিপিস্টিক দিয়ে দিলো। এরপর আস্তে আস্তে উঠে মার্কার রেখে দিলো। লাইট অফ করে আবারো নিজের জায়গায় গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়লো। পাঁচ মিনিট পড়ে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলো।

আধা ঘন্টার মধ্যে জারা আর রাত্রি আসলো। সিমির সাথে বসে আড্ডা দিলো। সিমি সবার ছেলে মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করলো। বাচ্চারা ঘুমাতেই তারা নিয়ে রুমে গেলো। রাতের খাবার সাজানো হয়েছে। সিমি বললো প্লেটে বেড়ে দিতে। উপরে নিশানের সাথে খাবে।
এর মধ্যে সিমি এগিয়ে গেলো মীরার রুমে। রুমে ঢুকে লাইট অন করতেই দেখলো মীরা ঘুমিয়ে আছে এক পাশে। আর ইহান মীরার দিকে মুখ করে ঘুমিয়ে আছে। সিমি হাসলো। লাইট অফ করে চলে গেলো। ডাইনিং টেবিল থেকে ভাত তরকারি নিয়ে রুমের দিকে গেলো। রুমে ঢুকে দেখলো। নিশান সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছে। সিমি প্লেট টা টি টেবিলে রেখে। আলামারি থেকে নিজের জন্য সালোয়ার কামিজ বাহির করে। ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। দশ মিনিট পড়ে সিমি ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে আসলো। এরপর সোফায় বসে নিশানের উদেশ্য বললো,

“খাওয়া লাগবে না?”
নিশান আগের মতো ফোন স্ক্রল করতে করতে বললো,
“খাইয়ে দে তুই।”
সিমি কিছু বললো না, ভাত মাখিয়ে নিশানকে খাইয়ে দিলো, আর নিজেও খেলো। সম্পূর্ণ খাবার শেষ হতে সিমি বললো,
“আপনি বসুন, আমি একটু পরে আসছি।”
নিশান কিছু বললোনা। সিমি রুম থেকে বেড়িয়ে চলে গেলো। জারা রাত্রি আর সামিয়া সাথে সিমি একসাথে মিলে, ছাদে উঠলো। আজ তারা গল্পের আসর বসাবে।

রাত বাজে এখন বারোটা চার। ইহানের ঘুম ভেঙে গেলো। সে ঘুম থেকে উঠে লাইট অন করলো। বেডের আরেক পাশে শুয়ে থাকা মীরার মুখের দিকে তাকালো। ওর গায়ে ব্লাঙ্কেট টেনে দিয়ে। ওয়াশরুমে ঢুকলো। ওয়াশরুমে ঢুকে আয়নার সামনে নিজেকে এই অবস্থাতে দেখে ইহান রাগে ফেঁটে পড়লো। সাবান দিয়ে নিজের মুখ পরিষ্কার করতে করতে বিড়বিড় করলো,
“বেয়াদব মেয়ে একটা, জীবনেও তোর ভালো হবে না। মেয়ে বলে রেহাই পেলি। ছেলে হলে এত ক্ষণে মেরে ফেলাতম ডিসগাস্টিং।”
বলে মুখ পরিষ্কার করে। রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। সোজা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলো। সেখানে কিছু ক্ষণ দাঁড়াতেই। সিমিরা নেমে আসলো। ইহানকে দেখে জারা রাত্রি এগিয়ে আসলো কথা বলার জন্য। তবে ইহান কাউকে পাত্তা দিলো না। সে সোজা তার মাম্মামের কাছে গিয়ে বললো,
“আমার রুম কই?”
“কেন কি হয়েছে?”
“কিছু না আমার ঘুম লাগছে, ঘুমাবো। রুম কোথায়?”
সিমি আর কথা বাড়ালো না। ইহানকে নিয়ে সোজা নিজের রুমে গেলো। বিয়ের আগে ও যেই রুমে থাকতো। সেখানের দরজা খুলে দিয়ে বললো,
“এই রুমে আপাতত থাকো। সকালে ব্যবস্থা করে দেবো।”
ইহান কিছু না বলে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। লাইট অফ করে বেডে গিয়ে শুয়ে পড়লো। রাগে তার মাথা ফেঁটে যাচ্ছে। কোন এক ডিসগাস্টিং জায়গায় এসে পড়লো সে?

সবাই যে যার রুমে গেলো। সিমি ও রুমে ঢুকলো। রুম অন্ধকার। তার ভ্রু কুচকে গেলো। পরক্ষনে ভাবলো হয়তো নিশান ঘুমিয়ে গেছে এইজন্য অফ। সে দরজা লক করে। লাইট অন করতে যেতেই। ওর কোমরের খাঁজে হাত ঢুকিয়ে দিলো। শক্ত করে চেপে ধরলো। সিমি চোখ মুখ খিচে বন্ধ করলো। নিশান সিমিকে দেওয়াল এর সাথে চেপে ধরলো। ঘাড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে সেখানে মুখ ডুবিয়ে জোরে কামড় দিলো। সিমি ব্যাথায় নিশানের জামা চেপে ধরলো। নিশান সিমির কানেও কামড় দিলো। সিমি এইবার কাঁপা কন্ঠে বললো,
“ব্যাথা.. লা.. গাছে তো।”
নিশান সিমির কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললো,
“লাগুক, পাখনা বাড়ছে দেশে এসে। কয়টা বাজে? এত সময় ছাদে ছিলিস?”
সিমি ভয় পেলো। কোন মতে বললো,
“সর.. সরি আর এমন হবে না।”

নিশান সিমির কোমরে নখ দিয়ে চাপ দিলো। সিমি ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো। নিশান দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“এখন সরি বলস কেন? উড়তে দিয়েছি বলে এত দূরে উড়বি?”
সিমি এইবার নিশানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,
“প্লিজ মারবেন না, আর এমন হবে না। ভুল হয়ে গেছে তো।”
নিশান কিছু বললো না। সিমি এইবার নিশানের গালে চুমু খেয়ে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো,
“চুমু ও দিলাম এইবার মাফ করুন।”
দুই সেকেন্ড নিরাবতার মধ্যে। হঠাৎ নিশান সিমির কাঁপতে থাকা দুই ঠোঁট নিজের শুষ্ক ঠোঁটের ভাজে আগলিয়ে নিলো। সিমি আবেশে চোখ বন্ধ করে নিলো। দুই মিনিট পরে নিশান সিমিকে ছেড়ে দিলো। দুইজনে কপাল ঠেকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। নিশান সিমির উড়না দিয়ে ঠোঁট মুছে নিলো। এরপর সিমির হাত ধরে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে দেখে সিমি বলে উঠলো,

“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
নিশান উত্তর দিলো না। তারা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলো। বাড়ির পাশে থাকা বাগানে গেলো। বাগানের শেষ প্রান্তে দাঁড়ালো। একটা গাছের নিচে। সেখানে যেতেই সিমির বুকটা কেঁপে উঠলো। নিশানের হাত জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। নিশান বসে পড়লো সেখানে। সিমিও বসলো। সিমি ফুঁফিয়ে কান্না করছে। নিশানের চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। নিরাবতা নেমে আছে তাঁদের ঘিরে। নীরবতা ভেঙে হঠাৎ নিশান মাটিতে হাত দিয়ে বলতে শুরু করলো,
“আমাকে প্রিন্সেস কেমন আছো তুমি? এই দেখ, তোমার পাপা আর মাম্মাম তোমার সাথে দেখা করতে আসছে। তুমি শুনতে পারছো প্রিন্সেস? তুমি জানো তোমার একটা ভাই হয়েছে। সে জানেনা তার একটা বোন আছে। বলিনি আমরা। প্রিন্সেস আজ সারে নয়টা বছর ধরে বিদেশের মাটিতে থাকলেও তুমি সবসময় আমার মনে ছিলে। আমাকে মাফ কর আম্মু আমি তোমাকে দেখতে আসি নি কত বছর। তুমি রাগ কর নি তো?”
নিশানের গলা কাঁপছে। সিমি মাটির দিকে তাকিয়ে কান্না মিশ্রণ কণ্ঠে বললো,
“আমার বাচ্চা, আমার সোনা, আমার কলিজা। মাম্মম আসছে তোমার সাথে দেখা করার জন্য। তুমি কি শুনতে পাচ্ছ কলিজা আমার।”
সিমি কান্না করেই যাচ্ছে। আবারো বলে উঠল,

“আজ যদি তুমি বেঁচে থাকতে, তাহলে আমাদের সুন্দর একটা পরিবার হতো কলিজা আমার। তুমি আমার অংশ, আমার পেটে একটু একটু করে বেড়ে উঠেছিলো। আমি আজও তোমাকে ভুলি নি সোনা।”
নিশান সিমিকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। হাসি মুখে বললো,

তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৭২

“আমার প্রিন্সেস আমি জানি তুমি এই অন্ধকার কবরে ভালো নেই। আমার এত এত সম্পদ থাকার পরেও আমি তোমাকে বাঁচাতে পারি নি। তুমি অন্ধকার কবরে আছো। আমি আজও বলব আমাকে কখনো ক্ষমা করবে না আম্মু।”
বলে উঠে দাঁড়ালো। সিমিকেও নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সিমির হাত ধরে বাড়ির ভিতরে যেতে লাগলো। আজ যদি তাঁদের মেয়ে বেঁচে থাকতো। তাঁদের পরিবার আরো সুন্দর হাসিখুশি থাকতো। কারন নিশান আর সিমি এখনো পরি পূর্ণ হতে পারিনি। তাঁদের অংশ যে কবরে শুয়ে আছে। সবকিছুর উর্ধে সবার জীবনের ইতি টানতে হয়। তবে নিশান সিমির জীবনটা আজও সুন্দর সমাপ্ততে ইতি টানবে। তারা যে অপূর্ণতা ইতি টানতে প্রতি ক্ষনে পস্তাতে থাকে।

সমাপ্ত