তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১২
নীতি জাহিদ
সামনে একটা বিশাল ডিশে অক্টোপাস, লবস্টার, স্যামন, ক্রেব দিয়ে সাজানো। সামুদ্রিক মাছ অল্প স্বল্প খাওয়া হলেও এভাবে খাওয়া হয়নি। দেখতে ভালোই লাগছে। খেতে কেমন হবে তাই ভাবনা। বাবা এর আগে অনেক খেয়েছে।গল্প ও করেছে অনেক। কিন্তু মোনার জন্য এই প্রথম। মোনা ক্রেব এর আগে খায় নি। ক্রেবস দিয়ে শুরু করেছে। ইমরান আর মিনহাজ কি সুন্দর গল্প করতে করতে অক্টোপাস খাচ্ছে। মনে হয় যেন এর চেয়ে সুস্বাদু খাবার আর হতেই পারে। ক্রেব খেয়ে মোনা এক টুকরো অক্টোপাস নিলো। মুখে দিতেই রাবার রাবার ফিলিংস এলো কিন্তু জিনিস টা মজা। মোনার চকচক করা চোখের দিকে তাকিয়ে ইমরান হাসছে। মিনহাজকে ইশারা দিয়ে দেখালো। মিনহাজ মেয়ের খুশি দেখে জিজ্ঞেস করলো,
” আম্মা ভালো লাগছে আপনার? আরেকটা অর্ডার করবো?”
” না না লাগবে না। প্রথমে দেখে ভয় পেয়েছিলাম এত লম্বা লম্বা পায়ের অক্টোপাস কিভাবে খাব? কিন্তু এটা মজা”
ইমরান মোনার কথায় মিটমিটিয়ে হাসছে। মোনার চোখ যেতেই মোনা মনে মনে ভাবলো এই গোমড়ামুখো হাসলে বেশ লাগে। খাবার শেষ করে বীচ এর দিকে গেল। মোনা আবার ছুটে গেলো সেই ফল বিক্রেতার কাছে। মিনহাজ হাসছে। ইমরান ভাবছে কি এমন জিনিস দেখলো যে আশ পাশটা ইগ্নোর করে এভাবে এত বড় মেয়ে ছুট লাগালো। মেয়েটা ওখানে কি করে?সারাক্ষন ছুটোছুটির দিকে মন।শান্ত হয়ে বসে থাকতে দেখেনি ইমরান মোনাকে। মিনহাজ ইমরানের ভাবনাচ্ছেদ ঘটিয়ে বললো,
” চল, একটা জিনিস টেস্ট করাবো”
মোনা আরাম করে খাচ্ছে। ইমরান কাছে এসেই বললো,
” টমেটো?”
” আমি জানতাম এসবই বলবে, একটু পর বলবে ছিঃ ছিঃ আনহাইজেনিক, আনহেলদি” মোনা খেতে খেতে ইমরানকে পিঞ্চ দিয়ে বলল।
মিনহাজ ইমরানের হাতে একটা দিয়ে বললো,
” খা, ব্যাটা টেস্ট কর কি জিনিস দেখ।”
এর মধ্যে মোনা আরেকটা দিতে বললো। সেটাও মজা করে খাচ্ছে। সেই সাথে ফোনে ভিডিও করছে কিভাবে বানাচ্ছে তা। এই ভিডিও বাসায় গিয়ে সবাইকে দেখাবে।বন্ধুদের ও দেখাবে কত মজার একটা খাবার। ভাবছে বাসায় যাওয়ার সময় অনেকগুলো নিয়ে যাবে।ফুফিকে,চাচীকে খাইয়ে চমকে দিবে। তারা নিশ্চয়ই এই ফল কখনো খায় নি।
ইমরান এক চামচ মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো। একটু পর চোখ খুলে বলে,
” ইট’স আমেজিং”
মোনা খুশিতে লাফিয়ে উঠে ইমরানকে উড়ন্ত কিস ছুড়ে দিয়ে বলে,
” অনেক গুলা থ্যাংক্স আমি ভেবেছি আপনার পছন্দই হবেনা”
কিস দেওয়ার স্টাইল দেখে ইমরান এর চক্ষু ছানাবড়া, ভ্যাবাচেকা খেয়েছে। মিনহাজ এর দিকে তাকিয়ে দেখে ফল বিক্রেতাকে টাকা দিচ্ছে। মনে হলো যেন হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। মিনহাজ দেখলে একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হত। ইমরান চায়না এখন এসবের ঝামেলায় পড়ুক। এমন সময় ফোন আসলো। ফোন পেয়ে সব ভুলে গেলো ইমরান। ভিডিও কল রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে বাচ্চা কথা বলে উঠলো,
” আসসালামু আলাইকুম পাপা, আই মিস ইউ। তুমি কোথায়। বাড়িতে আসো।”
” ও মেরি জান, পাপা আসবো খুব তাড়াতাড়ি আসবো। একটু কাজে আটকে গিয়েছি। সমুদ্র দেখবে মাই প্রিন্স?”
ইমরান ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে ছেলেকে বীচ দেখাচ্ছে। রাতের বেলাও কল কল ধ্বনি কানে লাগছে। দূরের উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে এসে। ভাটার সময় ঘনিয়ে আসছে। পেছন দিক থেকে মোনা সব দেখছে। মিনহাজ মোনার হাত ধরে ইমরান এর পাশে এসে দাঁড়ালো। এরপর মিনহাজ ইশানের সাথে কথা বলতে চাইলে ফোনটা মিনহাজের হাতে দে।
মোনার একটু পাশে ঘেঁষে কানের কাছে ফিসফিস করে করে বলে,
” গ্রে’সন ব্যাচেলর ছিলো, আমার বারো বছরের একটা ছেলে আছে মোনালিসা।”
মোনা চুপচাপ তাকিয়ে আছে ইমরানের চোখের দিকে। বুকটা জ্বলছে। এই অনুভূতির সাথে ও সম্পূর্ণ অপরিচিত। মনে হচ্ছে চোখগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে। ইমরানের সামনেই চোখের উষ্ণ জলের উপস্থিতি টের পেলো নিজের গালে। দুহাত দিয়ে চোখ মুছে উপর নিচ মাথা দুলালো, যার মানে দাঁড়ায় আমি বুঝতে পেরেছি। মোনা ইমরানের সামনে থেকে মিনহাজের সামনে চলে এলো। পুরো এক ঘন্টা বীচে ছিলো মোনার মুখে কোনো শব্দ বের হলোনা। বের হবে কি করে এত বড় ধাক্কা নিতে পারেনি। আচ্ছা মোনা ভাবলো কি করে মানুষটার বিয়ে হয়নি,বাচ্চা থাকতে পারেনা? এত বড় একটা মানুষ বিয়ে করবে, বাচ্চা হবে এটাই স্বাভাবিক। তাহলে ইমরান ও বিয়ে করেছে একটা বাচ্চা ও আছে। তার বউ আছে বাসায়। মোনা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। এজন্যই কি সেদিন মায়া ফুফিকে ইশানের দায়িত্বের কথা বললো। ওর ছোট্ট মস্তিষ্ক কেনো সেদিন এই কথা গুলি জানান দিলো না।
বীচ থেকে ফিরে ইমরান শরীর এলিয়ে দিলো। আজকে দুদিন টানা জার্নি হচ্ছে। মাঝে মাঝে কাজের মাঝে ভুলে যায় তার শরীর আছে,যাকে একটু বিশ্রাম দেয়া প্রয়োজন। ঘুম চলে আসলো কিছু সময়ের মধ্যে। অকস্মাৎ ইমরান দরজায় ঠকঠক আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দেখে ট্রলি ব্যাগ হাতে মিনহাজ এবং মোনা অন্য পাশে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। পুরোপুরি রেডি। হতবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,
” কি হলো,কোথায় যাচ্ছ?”
” ঢাকা , মোনা বীচ থেকে আসার পর থেকে কাঁদছে। ও কিছুতেই এখানে থাকবেনা। বার বার মায়ের কথা বলে কাঁদছে। তুই কি যাবি?”
” অবশ্যই। ভেতরে এসো,বস। মোনার সাথে কথা বলি আমি?”
“আচ্ছা”
ইমরান মোনার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করবে তার আগেই মোনা কান্না শুরু করে দিয়েছে। ইমরান মোনার মাথায় হাতে দিয়ে কাছে টেনে ধীরে জিজ্ঞেস করলো,
” কি হয়েছে মোনালিসা? ফ্রেন্ডকে বলবে না?”
” আমি আপনাকে ভালোবাসি। আজকের পর আর বলব না। আজকেই শেষ।”
কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। প্রস্থান মঙ্গলজনক। ইমরান মোনার থেকে এক ধাপ পিছিয়ে বললো,
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১১
” রুমে যাও, আমি আসছি।”
মোনার সাথে ইমরান ও পেছন পেছন এলো। ব্যাগ গুছিয়ে রাতেই চেক আউট করে বেরিয়ে গেলো। কক্সবাজার ভ্রমণ আর শেষ করতে পারলোনা।
