Home তুমি আমার শেষবেলা তুমি আমার শেষবেলা শেষ পর্ব

তুমি আমার শেষবেলা শেষ পর্ব

তুমি আমার শেষবেলা শেষ পর্ব
নীতি জাহি

‘মোনালিসা…’
‘জ্বি’
‘যাবে?’
‘কোথায়’
‘জানতে হবে না চলো।’
এতক্ষন ছাদে বসে রাতের আকাশে তারা দেখছিলো দুজন। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে রাত এগারোটা। অনেক দিন পর নিজেরা একান্তে সময় কাটাচ্ছে। ইমরান অফিস,মিটিং এসব নিয়ে ব্যস্ত। মোনাও নতুন প্রোজেক্টে হাত দিয়েছে সাথে ছেলে- মেয়ে ভার্সিটি এক্সাম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। ইমরান মোনার হাত ধরে টেনে সিড়ি বেয়ে ইশানের রুমের সামনে আসলো। ইশানের দরজায় কড়া নাড়লে মোনা বকা দিয়ে বললো,

‘ ছেলেটা ঘুমাচ্ছে ইমরান সাহেব,কেনো জাগাচ্ছেন? ছেলেকেও সাথে নিবেন?’
তোমার ছেলে ঘুমায় না,জেগে জেগে প্রেম করে। মনে মনে বললেও মুখে প্রকাশ করলোনা ইমরান। এই কথা বলে রাতের মিষ্টি সময়টা সে নষ্ট করবে না। আরেকবার কড়া নাড়তেই ইশান চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুললো। মোনা ইমরানকে আবার ধমকে বললো,
‘ আহারে বাবাটা ঘুমাচ্ছিলো কি সুন্দর। জাগালেন কেনো?’
ইমরান ছেলের দিকে কটমট দৃষ্টিতে বলে,
‘ আব্বাজান আপনি নাটক বন্ধ করেন। ঘুমান নাই যে সেটা জানি। আপনার বাইকের চাবিটা দেন।’
ইশান চোখ বড় বড় করে বাবার দিকে চেয়ে আছে। যে বাবা বাইক কিনে দিবেনা বলে এক পায়ে খাড়া ছিলো সে আজ বাইকের চাবি চাচ্ছে। আচ্ছা বাইক টা বেচে দিবে না তো। ইশান থতমত খেয়ে বলে,
‘ নাই বাইক,চাবি নাই। চোরে নিয়ে গিয়েছে।’
‘ চুপ ব্যাটা, কার সাথে ধাপ্পা মারিস। চাবি দেয় তোর বাইক বেচবোনা আব্বা। তোমার মাকে নিয়ে একটু চন্দ্রবিলাস করে আসবো।তুমি একটু বোনের খেয়াল রাখতে পারবে?’

বাহ,আর কি লাগে। যাক না তার আনরোমান্টিক বাপ টা মাকে সময় দিতে। এই সুযোগে সে বোনের পাশে থাকবে রক্ষক হিসেবে৷ ইশান সারাক্ষন বোনের সাথে ঘেঁষে,গত ছয়মাসে বোনটাও হয়েছে ইশানের ন্যাওটা। সুযোগ পেলেই ইশানের বুকে ঘুমাবে,ইশানের হাতে খাবে। ইশান ইমরানের হাতে বাইক এর চাবি দিয়ে বাবা মায়ের রুমে চলে গেল। দৌড়ে গিয়ে দোলনা থেকে বোনকে তুলে কোলে নিয়ে খাটে শুয়ে পড়লো। ইমরান মোনা যাওয়ার আগে কি মনে ঘরে উঁকি দিলো। এত মনোরম একটা দৃশ্য দেখলো।ইশান ঔশানকে বুকের উপর শুইয়ে ঘুমাচ্ছে। মেয়ে তাদের পরমযত্নে ভাইয়ের বুকে ঘুমায়। চোখ জুড়িয়ে যায়,মন শীতল হয়। মোনার দিকে তাকিয়ে বলে,

‘ মোনালিসা আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই। আমাদের অনুপস্থিতিতে ইশান সামলে নিবে।’
‘ ইমরান সাহেব আপনার অবর্তমানে ইশান আমার ঢাল ছিলো। ছেলেটা আবার বাচ্চা হয়ে গেলো কিন্তু সেই সময়টাতে আমি আপনাকে দেখেছি ওর মাঝে।’
ইমরান হাসে। মোনার হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। মোনাকে নিয়ে গ্যারেজ থেকে বাইক বের করে। মোনাকে পেছনে বসিয়ে এলোমেলো চুলগুলো কানে গুঁজে দিয়ে হেলমেট পরিয়ে দেয়৷ নিজেরটাও পরে নেয়। বাইক স্টার্ট দেয়। বাতাসের গতিতে ছুটে যাচ্ছে বাইক। গন্তব্য মোনার অজানা। অনেকদিন পর ইমরান প্রশান্ত হয়েছে। এখন চিন্তারা কমেছে। কায়েস চলে যাওয়ার আগে সব সমস্যার সমাধান করে দিয়ে গিয়েছে। ফয়সাল নিজের কাজে ব্যস্ত। সবাই এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সেদিন রাতে মিনহাজ ভাই ফোন দিয়ে বলেছিলেন মোনাকে জানাতে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে অজানা কিছু না থাকাই ভালো। আজ ইমরান সিদ্ধান্ত নিয়েছে সব মোনাকে জানাবে। মনের মধ্যে অনেক ভয়। বাইক থামে নদীর পাশে। মোনাকে নামতে সাহায্য করে ইমরান। দুজনই পাড়ে বসে আছে। আশপাশটা নিরব৷ উপরে আকাশ, নিচে পানি, পাশে তার প্রিয় রমনী মোনালিসা। মোনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে ইমরান। মোনা ইমরানের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ইমরান আবেশে চোখ বন্ধ করে। একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,

‘ মোনালিসা কিছু কথা ছিলো? ‘
‘ হুম বলেন।’
‘ সত্যি টা জানার পর যা শাস্তি দিবে মেনে নিব,অ/ন্যা/য় করেছি তো তাই। কিন্তু কথা দাও ফেলে যাবে না,ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করবে না।’
‘ কি এমন সত্যি?’
‘কথা দাও।’
‘আগে শুনব’
ইমরান মোনালিসার চোখের ভেতরের গতিবিধি পর্যবেক্ষন করছে। এই মেয়ে কি আদৌ মাফ করবে তাকে। ফোস করে দম ফেলে বলে,
‘ আজ থেকে একুশ বছর আগে একজনকে খু*ন করেছি নৃসংশভাবে। খু*ন করেই ক্ষান্ত হইনি।বারো টুকরো করেছি। আমি একটা খু*নী।’

মোনালিসা শান্ত। ইমরানের চোখ বন্ধ।সে চায় না তার ছোট্ট মোনালিসার চোখে তার জন্য ঘৃ*না দেখতে।
‘ আইন হাতে তুলে নেয়া উচিত হয়নি আপনার। যেহেতু অ/ন্যা;য় করেই ফেলেছেন আল্লাহর কাছে মাফ চাইবেন। আমার আর কি বলার আছে। শাস্তি দেয়ার মালিক তো উনি। আর বাকি রইলো ভালোবাসার কথা। আমি কি এত পাগল নাকি ভালো মানুষকে তো আর হ*ত্যা করেন নি করলে কোনো মানুষরূপী জা*নো*য়া*রকেই করেছেন। ওই শ*য়*তা*নে*র জন্য আমি কেনো আপনাকে ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করবো। আপনি আমার অনেক সাধনার ইমরান সাহেব। আমি কোনো ভাবেই আপনাকে ভালো না বেসে থাকতেই পারবোনা। তবে অনুরোধ করবো আল্লাহর কাছে দু হাত তুলে মাফ চাইবেন। টুকরো করতে অনেক সাহস লাগে। আপনার মধ্যে তখনের ওই
হিং/স্র/তা যেন ভবিষ্যতে না দেখি। আমার দু সন্তান যেন এই ব্যাপারে ঘুনাক্ষরে ও টের না পায়।তাদের কাছে তাদের বাবা আইডল। আমার কাছে ও আমার স্বামী ওয়ান্ডার ম্যান। সবসময় মনের প্রাসাদের সিংহাসনে বসা রাজপ্রধান। রাজ্যের প্রয়োজনে রাজাকে কঠোর হতে হয়। আপনি হলে ভুল কিছু করেন নি।’

ইমরান হতবাক, বিস্মিত, চরম ভাবে আশ্চর্য এটাও কি সম্ভব। এত সম্মান,এত শ্রদ্ধা। সে কি আদৌ যোগ্য। নিজের কানকে বিশ্বাস করছে না। আজকে নতুন মোনা সামনে। সাধারণ কাউকে এই কথা বললে তো ভয় পেয়ে পালাতো। আর এই মেয়ে কিনা কথা শেষ করে কপালে অধর স্পর্শ করে।না না এই মেয়ে তো সাধরণ নয়,অসাধারণ কেউ। মনে হয় যেন ইমরান খুব ভালো কাজ করেছে, তার পুরষ্কার দিচ্ছে। কি সুন্দর প্রসঙ্গ পালটে নদীর আশপাশটার বর্ননা দিয়ে যাচ্ছে। ইমরান মোনার পেটে মুখ গুঁজে দিয়ে শক্ত করে দুহাতে কোমড় আকড়ে ধরে। মোনা জানে ইমরান এই স্বস্তি টাই খুঁজে বেড়াচ্ছিলো এতগুলা বছর। মোনার শক্ত করে ইমরানকে আঁকড়ে ধরে। ছোটবাচ্চার মত ইমরান মোনার কোমড় পেঁচিয়ে ধরেছে। মোনা একটু দুষ্টুমি করে বলে,

‘ আপনি কি ঔশানের মত হয়ে গেলেন নাকি?’
‘ ঔশান তো তাও মায়ের আদর পায়, আমি তো অভাগা। তার মা এখন আমার দিকে তাকায়ই না। কত দিন ধরে পেছন পেছন ঘুরছি যদি মহারানী একটু কৃপা করে কিন্তু সে তো সারাক্ষন ব্যস্ত থাকে। আজ এই মেহমান,কাল ওখানে যাবে।পরশু অফিস। আমার মত রিটায়ার্ড পারসনকে কি ভাল্লাগে?’
‘ আহারে বেচারা। অনেক দিন হয়েছে তাই না?’
ইমরান তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলে,
‘ চুপ করো পাজি মেয়ে, অনেক দিন হয়েছে তাই না??? ঢং করে এসব বলো কেনো। অনেক দিন হয়েছে নাকি অনেক মাস হয়েছে সেটা বলো? শেষ কবে আমাকে আদর করতে দিয়েছো।’
‘আপনার কি এসব লাগে নাকি। ছিঃ কি বলেন এগুলা। আপনি তো অনেক ব্যস্ত মানুষ তার উপর নিজ থেকে কাছে আসেন নাকি।’

ইমরান নিশ্চিত বুঝতে পারছে এই মেয়ে ইচ্ছে করে জব্দ করছে। সে মানছে যে এসব বলতে পারেনা। একটু গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ কিন্তু এতটাও আনরোমান্টিক না যে তার মধ্যে অনুভূতি নেই। বয়স হচ্ছে তো তাই এভাবে খোঁচা দিচ্ছে। এছাড়া মোনার কাছে যেতে ওর নিজেরই সংকোচ লাগে। যত যাই বলুক মেয়েটা ছোট। এই সংকোচ বিয়ে দেড় বছরেও কাটাতে পারেনি ইমরান। মোনাও গত ছয়মাস ছেলে,মেয়ে, পরীক্ষা সংসার সামলে হাঁপিয়ে উঠেছে। তাই ইমরান নিজ থেকে কখনোই ওর প্রতি এসব ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি পাছে মোনা অন্যকিছু ভাবলে। ছয়মাসে হাতে গোনা কয়েকবারই মোনা কাছে এসেছিলো।
‘ আমি তো ভাবলাম আমি মোটা হয়েছি দেখে আপনার আর আমাকে ভালো লাগে না।তাই আগ্রহ দেখাই না।’
‘ তুমি কি আজকে আমার মেজাজ খারাপ করার উদ্দেশ্য নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছো?’
‘ কত হট মেয়ে আছে অফিসে, মিটিং এ তো দেখি নতুন বায়ারদের। আপনার একজন নতুন এসিস্ট্যান্ট আছে না কাশফিয়া সে তো আপনি বলতে অজ্ঞান।’

‘ তা অবশ্য ঠিক। কাশফিয়া সুন্দর খারাপ না।’
বাহ কড়াইয়ে গরম তেল ঢেলেছে ইমরান। ছ্যাত করে উঠেছে। মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলো। নদীর পানি বাতাসের ধাক্কায় ছলছল করছে। চাঁদের আলো পড়েছে পানিতে চিকচিক করছে যতদূর চোখ যায়,তাই দেখা যাচ্ছে। ইমরান মোনাকে বুঝার চেষ্টা করছে। অন্য সময় হলে তো এতক্ষনে ইমরানের চুল মাথায় থাকতোনা। কিন্তু আজ এত নিরব কেনো। অকস্মাৎ ইমরানের মনে হলো সে ভুল সময়ে ভুল কথা বলে ফেলেছে। মোনাকে প্যাম্পারের প্রয়োজন ছিলো। এখন মোনার বাড়ন্ত শরীর। সে সারাক্ষন আগের বডির জন্য আফসোস করে ডায়েট করবে করবে বলে,কিন্তু বাড়ির কেউ তাতে সায় দেয় না। ইমরান নিজেও রেগে যায় মাঝে মাঝে। মেয়েটা কি বডি শেইমিং এ ভুগছে। ইমরান সাথে সাথে মোনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

‘ মোনালিসা, প্লিজ স্যরি। কেনো এসব নিয়ে মজা করো। তুমি আমার চোখে আমার মায়ের পরে দেখা সেরা রমনী। তোমার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ আমৃত্যু আমার জন্য একটা ঘোর জাগানো মোহ হয়ে থাকবে। কে বলেছে তুমি মোটা হচ্ছ বলে আমার ইচ্ছে কমে যাচ্ছে। উল্টো আমি বুড়ো হচ্ছি বলে কেউ কাছে ডাকেনা। আর ওই কাশফিয়া, ঘাশপিয়াকে তুমি রেখেছো আমার এসিস্ট্যান্ট হিসেবে। আমি তো ওকে একদিন ও এলাও করিনি। তুমি তো জানোই না ওর ডিপার্টমেন্ট শিফট করে তমালকে এসিস্ট্যান্ট করেছি আর ওই মেয়েকে ফ্যাশন হাউসে পাঠিয়েছি। তোমাকে ভয়ে বলিনি,বকা খাব তাই।’
মোনালিসা হাসছে। ছলছল চোখে বলে,
‘ আমার আজ রাতে আপনাকে লাগবে। নতুন ভাবে,সেই রাত গুলোর মত। খুব কাছে। আগের বেসামাল, অস্থির ইমরানকে।’
‘ দেখো চারপাশটা নিরব। তুমি চাইলে এখানেই…।
‘ আকাশকে স্বাক্ষী রাখার কি কোনো প্রয়োজন আছে। এখন আইসক্রিম কিনে দেন।খেতে খেতে বাসায় যাব।’
‘ এরপর আমার মেয়ের ঠান্ডা লাগবে। চলো অন্যকিছু কিনে দেব।’
‘ ওকে তাহলে ডেইরী মিল্ক।’
ইমরান মোনাকে চোখ টিপে বলে,

‘ ঠু গুড সুইটহার্ট। আই লাইক দ্যা টেস্ট অফ ডেইরীমিল্ক।লেটস গো।’
ইমরান কাকে যেন ইশারা দিলো। মোনা অবাক হয়ে সেদিকে তাকাতেই দেখে দুটো গাড়ি। পরে ভালো করে খেয়াল করে বুঝতে পারলো এরা ইমরানের লোক। হয়তো এতো রাত হয়েছে তাই নিরাপত্তার জন্য এদের থাকতে বলেছিলো। মোনাকে নিয়ে আবার ইমরান রওয়ানা হয় বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাড়িতে ঢুকেই মোনা ফ্রেশ হয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত তিনটা। ঘড়ির পাশের দেয়ালে চোখ গেলো একটা ছবিতে। এই রুমটা ইশানের। ইশান, ঔশান ওদের রুমে ঘুমাচ্ছে তাই আর না জাগিয়ে দুজনই ইশানের রুমে চলে আসে। ছবিতে ওদের চারজনের ছবি। কক্সবাজারের রিসোর্ট উদ্ভোধনের ছবি। দুইটা রিসোর্ট সেদিন উদ্ভোধন হয়েছিলো। একটা ঔশান মারমেইড, অপরটা ইশান মারমেইড। একসাথে পরিবারের ছবি ইশান ঘরে ঝুলিয়ে রেখেছে। ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে দেখে মোনা ইশানের এলবামের ছবিগুলো দেখছে। ইশানের ফটোগ্রাফির বড্ড শখ। হাতে ডেইরি মিল্ক। একটু খাচ্ছে একটু দেখছে। চোখ না তুলেই ইমরানকে বললো,
‘ দেখেন ইমরান সাহেব ইশানের এই ছবিটা বেশি সুন্দর না! ও যখন সাজেক গিয়েছিলো বন্ধুদের সাথে তখনের তোলা!!’

ইমরান এগিয়ে এসে এলবামটা হাত থেকে নিয়ে কোনো কথাই বললো না। সরাসরি মোনার ওষ্ঠ আষ্ঠেপৃষ্ঠে নিজের ওষ্ঠাগত করলো। যে ভয়টা মোনা পেয়েছিলো তাই হলো। সবসময় মোনার চকলেট খাওয়া অবস্থায় ইমরান আক্রমণ করে। প্রায় শেষের দিকেই ছিলো চকলেট। মোনা তাড়াতাড়িই খাচ্ছিলো কিন্তু শেষ করতে পারলোনা। মোনাকে আলতো করে শুইয়ে দিয়ে কামরা জুড়ে বাতি নিভিয়ে ঘোর অমানিশা নিয়ে আসে ইমরান। মনের সব গোপনতা মিটিয়ে, দুঃখ বিসর্জন দিয়ে সমস্ত ভালোবাসা ঢেলে মুড়িয়ে নেয় মোনাকে। সূর্যকিরন ছড়ানোর আগেই স্ব-কিরন ছড়িয়ে মোনাকে রাঙিয়ে তোলার প্রচেষ্টায় আবারো প্রনয় সাগরে ডুব দেয় মোনার তেতাল্লিশ বছরের একমাত্র,একান্ত,ব্যক্তিগত প্রেমিক পুরুষ ইমরান শরীফ খান।
ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে আছে নিরলস চোখে। মোনা লজ্জা নিয়ে মুখ ঢেকে বলে, ‘এভাবে তাকাচ্ছেন কেনো?’ ইমরান মোনার মুখ থেকে সযত্নে হাত সরিয়ে বলে,

নেশা লাগিলো রে, নেশা লাগিলো রে,
বাঁকা দু’নয়নে নেশা লাগিলো রে।
হাসন রাজা পেয়ারির প্রেমে মজিলো রে
হাসন রাজা পেয়ারির প্রেমে মজিলো রে।
নেশা লাগিলো রে, নেশা লাগিলো রে,
বাঁকা দু’নয়নে নেশা লাগিলো রে।
ছটফট করে হাসন দেখিয়া চাঁদ মুখ,
ছটফট করে হাসন দেখিয়া চাঁদ মুখ
হাসন জানের রূপ দেখিয়া,
হাসন জানের রূপ দেখিয়া
জনমের গেলো দুঃখ।
লাগিলো রে,
বাঁকা দু’নয়নে নেশা লাগিলো রে,
নেশা লাগিলো রে, নেশা লাগিলো রে…।

ড্রইং রুমে আজ মিটিং চলছে। মিটিং টা ইশানকে নিয়ে। একবার মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছে, আবার বাবার। ঔশান ভাইয়ের কাঁধের উপর উঠে বসে আছে। ওকে কিছুতেই নামানো যাচ্ছে না। ইতু কোলে, ঔশান কাঁধে।ইশান ও নামাতে চাচ্ছেনা। ওকে এই পুচকি দুই বোনই উদ্ধার করতে পারবে আসন্ন বি/পদ থেকে। মিটিংটা সিরিয়াস কিন্তু এই বাচ্চা দুটোর জন্য কিছু বলতে পারছেনা।
‘ ঔশান ভাইয়ের উপর থেকে নামো। তুমি কি চাও আমি তোমাকে পিট্টুনি দিই?’
‘ আমি এখানেই থাকবো। তোমাল চোখ দিয়ে ভয় লাগাচ্ছো কেনো? মাব্বো তোমাকে। তুমি আমাল ভাই কে বকবে তাই মিতিন ডেকেছো।’

‘ এই ফাজিল নাম বলছি, হইছিস তো বাপের মত বাঁদর।’
মোনার কথা শুনে ড্রইং রুমে সবাই ভয়ার্ত চোখে ইমরানের দিকে তাকিয়ে আছে। মোনা ইমরানকে বাঁদর বলেছে!! ইমরান চোখের সামনে থেকে পেপার টা সরিয়ে চশমা ঠিক করে নড়েচড়ে বসলো, বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। ছেলে মেয়ে যাই দোষ করে সব নাকি বাপের দোষ। ইমরান ছেলে,মেয়ে, ছোট ভাই, ভাইয়ের বউ, বোনের ছেলের, সোহানের বউ সবার সামনে লজ্জ্বা পেয়ে বলে,
‘ ঠিক তাই আম্মাজান আপনি একদম বাবার মত বাঁদর হয়েছেন, আপনার আম্মা তো আমি জন্মের সময় থেকে আমার পাশে ছিলো। আমাকে পেলে পুষে বড় করেছে তাই দেখেছে আমি কতটা বাঁদর ছিলাম। তবে আমি কখনো প্রেমিকার জন্য ওয়াল টপকাইনি।’
মোনা ইমরানের দিকে তেঁড়ে এসে কোমড়ে হাত দিয়ে বলে,
‘ আপনি কি আমাকে অপমান করলেন?’
‘ কই নাহ,কারো নাম কি বলেছি আমি, তোরা কি শুনেছিস আমাকে কারো নাম নিতে?’
সবার না ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে জানালো শুনেনি।
‘ একদম প্রসঙ্গ পাল্টাবেন না। আমি ইশানের সাথে কথা বলছি। ইশান মেয়েটা কে? শপিং মলে তোমার পাশে দেখলাম যে।’

ইশান শুকনো ঢোক গিলছে আর বাবাকে দেখছে। ইমরান ছেলের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছে, কাম সারছে। এতবার বারন করছি মাকে জানায় পাবলিক প্লেসে ঘুরিস তা না বেশি পন্ডিত। এবার ঠেলা সামলা। ইশানের নিরবতা দেখে মোনা ইমরানের দিকে আঙ্গুল তুলে আবার শাসায়,
‘ এই আপনি চুপ করে আছেন কেন? ছেলে কাকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছে খোঁজ খবর রাখেন না কেনো?’
‘ আশ্চর্য!! মেয়ে দুষ্টুমি করলে আমার দোষ,ছেলে প্রেম করলে আমার দোষ। সব দোষ কি আমার নাকি।আমাকে বকছো কেনো?’
‘ তো কাকে বকবো পাশের বাড়ি সাত্তার মিয়াকে? সে বাপ এই বাচ্চা দুটোর?’
‘ এই মোনালিসা এমন রনাঙ্গিনী হয়ে আছো কেনো? প্রেম তুমি করোনি,হ্যাঁ। ছেলে প্রেম করলে কি দোষ??’
‘ দোষ নাই কিন্তু আমাকে দেখে পালালো কেনো দুজন?’
‘ মা ভয় পেয়েছি, তুমি যদি ওর সামনে আমার ইজ্জতের ফালুদা বানিয়ে দাও।’
মোনা হা করে আছে। ও কখন ইজ্জতের ফালুদা বানালো। মোনা সোফায় বসে মন খারাপের মত মুখ করে নরম স্বরে বলে,
‘ আমি বোধ হয় ভালো মা না।’
ইশান ইতু, ঔশানকে নামিয়ে, উঠে গিয়ে মায়ের কাছে হাঁটুগেড়ে বসে।মায়ের গালে হাত দিয়ে বলে,
‘ মা আসছে তোমার হবু ছেলের বউ। ফোন করে বলেছি।ওকে দেখলেই বুঝবে আমি কেনো বলেছি ইজ্জতের ফালুদার কথা। ওই মেয়ে আমাকে অনেক রেসপেক্ট করে,যদি দেখে আমি আসলে তোমার আদরের বাঁদর, আমার মান সম্মান থাকবে বলো??’
কেউ আসার শব্দে হঠাৎ দরজার দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। নাহিয়া দৌঁড়ে এসে মোনার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে।

‘ মামনি কি হয়েছে তোমার তুমি নাকি অসুস্থ। আমাকে দেখতে চেয়েছো?’
বাকহারা হয়ে সবাই তাকিয়ে আছে, মোনা স্তব্ধ। গতদিনের ড্রেসটাই পরেছে নাহিয়া।মুখে মাস্ক থাকায় সেদিন না চিনলেও আজ চিনতে একটুও অসুবিধা হয়নি। মোনা নাহিয়ার হাত ধরে টেনে বসায় ওর পাশে। মেয়েটা গেট থেকে এতটুকু শ্বাস রুদ্ধ অবস্থায় দৌঁড়ে এসেছে। অসম্ভব ভালোবাসে মোনাকে। এখনো বুকের ধুকপুকানি কমে নি দেখেই বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু নাহিয়া আর ইশান কিভাবে সম্ভব। বাসায় যখনই নাহিয়া আসে ইশান ইগনোর করতো। কথাই বলতোনা। মোনার নিজের ও ইচ্ছে ছিলো ইশান নাহিয়া জুটিকে দেখার। ছেলের ব্যবহারে কষ্ট পেত। মুখ ফুটে বলতো না পাছে ছেলে কষ্ট পায় তাই। ছেলে যে নিজের অজান্তে মায়ের ইচ্ছে পূরণ করে ফেলবে তা কল্পনাই করতে পারেনি। সবাই মোনার হতবাক করা মুখাভঙ্গি দেখছে। ইশানকে এবার নাহিয়ার পাশে বসিয়ে নিজে গিয়ে ইমরানের পাশে বসে। এতক্ষনে মুখ খুলে বলে,
‘ মাশা আল্লাহ খুব সুন্দর মানিয়েছে। ছেলে তো বাপের থেকে ও দুই ডিগ্রি বেশি। কিভাবে করলা আব্বু, তোমাকে তো বাসায় দেখতাম কেমন গম্ভীর হয়ে থাকতে নাহিয়াকে দেখলে।’
ইমরান ফোস করে দম ফেলে জোরেই বলে,

‘ এখানে ও আমি! ছেলের হবু বউ এর সামনে ও ছাড়লেনা আমাকে। আসলেই ইজ্জতের ফালুদা করে ছেড়েছো।’
নাহিয়া কিছুই বুঝতে পারছিলোনা। তখনই ইশান ফিসফিস করে বলে,
‘ মা সব জেনে গিয়েছে।’
‘ ইশান নাহির সাথে কথা বলো। নাহি আম্মা তুমি আজ থেকে যাও। মা-বাবাকে বিকেলে আসতে বলব। যাও উপরে যাও।’
নাহিয়া হতবাক।
সবাই যে যার যার রুমে চলে আসে। ঔশান পাপার কোলে। চার বছরের মেয়েটা পাপার জান। পাপাকে স্মুচ দিতে দিতে পুরো মুখ ভিজিয়ে দিয়েছে।
‘ সব ভালোবাসা পাপার জন্য, আমাকে কেউ চিনেই না। মোনা রুমে ঢুকতে ঢুকতে মেয়েকে বলছে। মেয়ে বাবা মা দুজনের মাঝে বসে দুজনকে আগলে ধরেছে। এমন সময় ইশান ও রুমে ঢুকেছে নাহিয়াকে নিয়ে। ইশানকে দেখে মোনা সামনে এগিয়ে আসতেই একপাশ থেকে নাহি অন্যপাশ থেকে ইশান,ঔশান সবাই মিলে জড়িয়ে ধরেছে মোনাকে। ইমরান বুক ভরা প্রশান্তি নিয়ে এগিয়ে এসে মোনাকে ছেলে মেয়ের সামনেই জড়িয়ে ধরে বলে,

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৪৬

‘ আমার শেষবেলায় খুঁজে পাওয়া এক টুকরো বরফ শীতল প্রশান্তি তুমি। আমার মোনালিসার সাম্রাজ্য এভাবে বিস্তার লাভ করুক। সুখে শান্তিতে এভাবেই আগলে রাখো তোমার রাজ্য। আমরা রানীর হুকুম পালনে আজ্ঞাবহ।’
সবাই একসাথে বলে,
‘ যথা আজ্ঞা মহারাজ।’
খিলখিল হাসিতে কানায় কানায় ভরে উঠে মোনার সংসার। অসম প্রেম কাহিনী সফলতা অর্জন করে আজ পরিপূর্ণতা পেয়েছে। শত বাঁধা পেরিয়ে মোনা ইমরান আজ সুখী। ভালো থাকুক, সুখে থাকুক। ভালোবাসা দেখতে সুন্দর। ভালোবাসায় ভালোবেসে আগলে রাখুক তাদের রাজ্য। এইতো এগিয়ে যাচ্ছে জীবন।

সমাপ্ত