তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৬
নীতি জাহি
হলের প্রবেশদ্বারে সাদা কালো ফরমাল শার্ট প্যান্ট পরিহিত কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে। যেন মোনা আসার অপেক্ষায় আছে। মোনা হলের ভেতর ঢুকার জন্য পা বাড়াতেই চারদিক থেকে স্লো মিউজিক শুরু। সবাই কি সুন্দর কুর্নিশ জানিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে। সাথে ফুলের বর্ষণ। মোনা একবার সামান্তা,নওশীন এবং তুশির দিকে তাকাচ্ছে অন্যবার ওই লোকগুলোকে দেখছে। খাম্বার মত লোকগুলো কিনা এভাবে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। মোনা অবাক হয়ে সামান্তাকে প্রশ্ন করে,
‘সামান্তামনি এখানে কি রাজা রানী আসছে,এগুলা কি?’
‘আমি জানিনা মামী বিশ্বাস করো।’
তুশি মুচকি হেসে বলে,
‘আমার মনে হয় ভাবী তোমাকে ভাইয়া নিজের রানী বানিয়ে ভেতরে নিতে চাচ্ছে।’
মোনা হতবাক, মুখে লালীমা আভা। বুড়ো বয়সে ভীমরতি। সামান্তা তাড়া দিলো। ভেতরে ঢুকতেই সারা হলরুমে আলোর ঝলকানি। হলরুম জুড়ে থাকা সবাই আশ্চর্য হয়ে মোনাকে দেখছে। এমন রাজকীয় অভ্যর্থনা দেখে সবাই এতক্ষন প্রবেশপথের দিকে তাকিয়ে ছিলো কে আসছে এই পথ দিয়ে! কার জন্য ইমরান শরীফ খান এত পসরা সাজিয়েছে!! উৎসুক দৃষ্টি বলে দিচ্ছে স্পেশাল কেউ। হলের ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে আছে ইমরান এবং পাশে ইশান। হলরুম জুড়ে রজনীগন্ধা,গন্ধরাজ,দোলনচাঁপা ফুলে সাজানো। মাঝে কিছু লাল,গোলাপী গোলাপ। মোনা জানে আজকের পুরো প্ল্যান ছিলো রিক্তার কিন্তু মোনার যে সাদা ফুল পছন্দ তা তো ইমরান ছাড়া কেউ জানতোনা। নিশ্চয়ই ইমরানই বলেছে রিক্তাকে।
মোনাকে ঢুকতে দেখে ইশান মন ভুলানো হাসি দিয়ে এগিয়ে গেলো। সামনে দাঁড়িয়ে মোনার হাত ধরে ধীর পায়ে এগিয়ে এনে ইমরানের সাথে দাঁড় করিয়ে দিলো। মোনা এক পলক ইমরানের দিকে চাইলো। সকালের পর আর ইমরানের সাথে কথা কিংবা দেখা হয়নি। বুকের ভেতর টা কেমন করে উঠলো। কি হবে এত কিছু দিয়ে মানুষটাই তো দূরে দূরে আছে সকাল থেকে। ইমরান আজ নেভি ব্লু রঙের স্যুট, টাই,আর সাদা শার্ট পরেছে। স্যুটের পাশে পকেটে স্কয়ার করে রুমাল দেওয়া। হাতে চেইনের ঘড়ি।চোখে রিমলেস চশমা। পকেটে একগুচ্ছ বেলী ফুল রাখা। মোনা কিছুটা অবাক হয়ে আছে। নেভি কোটের পকেটে সাদা বেলী বড্ড মানিয়েছে। গোলাপ রাখতে দেখেছে,বেলী রাখতে এই প্রথম দেখলো। সাথে কলার ব্রুচ তো আছেই। লোকটা এত মানানসই সাজ দেয় কেনো! চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ইমরান এবং ইশানের মাঝে। সবার দৃষ্টি মোনার দিকে যেন তারা জানতে চাচ্ছে কে এই রমনী! ইশান ও বাবার মত সেজেছে পার্থক্য হলো ও ফুল গুজেনি পকেটে। ইশানকে ইশারা দিতেই মাইক্রোফোন টা ইমরানের হাতে এনে দেয়। এক পাশে মোনার পরিবার, অন্যপাশে ইমরানের পরিবার এবং সাথে নয়ন,রিক্তা। চোখ জুড়ে আজ প্রশান্তি। মুচকি হাসি দিয়ে ইমরান সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে,
‘সবাইকে অনেক শুভেচ্ছা ও স্বাগতম আজকের আয়োজনে আমার সঙ্গ দেওয়ার জন্য। শুধু আজকে নয় গত বারো বছর ধরে আমার সুখ,দুঃখ,হাসি,কান্না সবকিছুতে আপনারা পাশে ছিলেন। আপনারা আমার সবচেয়ে বড় পরিবার। এই পুরো মাসটা আমি উদযাপন করতে চাই কিছু উপহার দিয়ে। তাই এই মাসে আপনারা সবাই ডাবল স্যালারি পাবেন সাথে ১ সপ্তাহ ছুটি কাটাবেন। ছোট্ট উপহার আমার পক্ষ থেকে সবার জন্য। ‘
রুমে জুড়ে করতালি। ইমরান সবার দিকে তাকিয়ে দেখে উচ্ছ্বাস, উল্লাসে সবাই আমোদিত। সারা বছর এরা এত পরিশ্রম করে কোম্পানিকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।এদের পরিশ্রমের ঋণ তো শোধ হবে না কিন্তু একটু আনন্দ তো দেওয়াই যেতে পারে। একটু থেমে আবার বলে,
‘আপনাদের সাথে আমি নতুন মুখের পরিচয় করিয়ে দিতে যাচ্ছি। আপনাদের কোম্পানির নতুন দুজন চেয়ারম্যান। মোনাকে এক হাতে আগলে ধরে বলে, আজ থেকে আপনাদের নতুন একজন চেয়ারম্যান মিস. মোনাশা ইকবাল যিনি টিউলিপ ইন্টারন্যাশনাল এ বসবেন। সেই সাথে তার আরেকটা ছোট্ট পরিচয় হচ্ছে সে আমার ছেলে ইশানের মা এবং আমার অর্ধাঙ্গিনী মিসেস ইমরান শরীফ খান।অনেকেই উনাকে চেনেন তবে আমার স্ত্রী হিসেবে নয়।মিনহাজ ভাইয়ের মেয়ে হিসেবে। অন্যজন ইশান ইমরান খান, সে বসবে শাহাদাত প্রোপার্টিজে। এই দুজন নিয়ে আমার পুরো পৃথিবী। বাকিটা মা-ছেলে সামলে নেবে। তবে তার আগেই দুজনকে তার যোগ্য করে তুলবেন আপনারা।কাজ শিখিয়ে পড়িয়ে।ওরা যেদিন চেয়ারে বসবে আমি আমার দায়িত্ব ছেড়ে অবসর নিব।’
বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে আজ মোনা এবং ইশান। দুজনই একজন অপরজনের তাকিয়ে আছে। পাশে ইশান এসে কানের কাছে বলে,
‘মা আমি বলেছিলাম পাপা তোমাকে অনেক ভালোবাসে।’
পরিবারের সবাই ভাষা হারিয়ে ফেলেছে ইমরানের এমন এনাউন্সমেন্টে। কাঁকন দূর থেকে দাঁড়িয়ে ভ*স্ম করে দিচ্ছে। সে ভাবতেই পারেনি এত কিছু হবে। ইমরান দুজনকে আগলে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আবার বললো,
‘ মিস কাঁকন,আমার সাবেক স্ত্রী আপনারা অনেকেই জানেন আবার অনেকেই জানেন না। উনার সাথে কিছু বছর আগে একটা ব্যবসায়িক ডিল ছিলো। আজ তা শেষ হয়েছে। আজকের পর টিউলিপ ইন্টারন্যাশনাল বা শাহাদাৎ প্রোপার্টিজের কোনো কিছুর সাথে সে সংযুক্ত থাকবেনা। আমার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতে আমার কোনো এমপ্লয়ি, কোনো ইনভেস্টর বা কোনো এম.ডি যদি তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে আমি সেই মুহুর্তে তাকে কোম্পানি থেকে ফায়ার্ড করে দিতে বাধ্য হব। এটা আমার অনুরোধ আমার অজান্তে কেউ কিছুই করবেন না। আজ এতটুকুই। আপনারা এঞ্জয় করুন আমার কথা শেষ। ‘
ইশান হঠাৎ মাইক নিয়ে বলে,
‘আমার কিছু কথা আছে। আমার পাপাই আমার সব। মা,বাবা,ভাই,বোন। আর পাঁচটা ছেলেমেয়ের মত আমি বড় হয়নি। পাপা আমাকে নিজে না খেয়ে খাইয়েছে, যে বয়সটা পাপার বন্ধুদের সাথে আড্ডা,ট্যুরে যাওয়ার কথা সে বয়সটা পাপা আমাকে নিয়ে কাটিয়েছে। কত নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। আমি মনে হয় বয়সের তুলনায় একটু বেশি ম্যাচিউর।কারণটা পাপা নিজে। আপনারা বাচ্চাদের মোবাইলে কার্টুন দেখিয়ে ভাত খাওয়ান আর আমি ভাত খেয়েছি পাপার বই দেখে,খাতা এসাইনমেন্ট এর কাগজ পত্র ছিড়ে। এক হাতে আমাকে খাইয়েছে,অন্য হাতে বই পড়েছে। আমি বুয়েটের লাইব্রেরিতে ঘুমিয়েছি পাপার কোলে। পাপা ম্যাথ করতো আমি পাপার বুক জড়িয়ে কোলে ঘুমাতাম। পাপার বন্ধুরা ব্যাগে গার্লফ্রেন্ডের গিফট নিয়ে ঘুরত,আর আমার পাপা আমার খাবার,ডায়াপার নিয়ে বের হত। আমি টিভি দেখিনি সজীব চাচ্চু, নয়ন চাচ্চু,মিনহাজ চাচ্চুদের গান শুনে, কন্সার্ট দেখে বড় হয়েছি। আপনারা ছেলে মেয়েদের নিয়ে চিড়িয়াখানায়,পার্কে যেতেন আমি পাপার সাথে এক্সাম হলে বসে পেইন্টিং করতাম। সেই হিসেবে আদর ও পেয়েছি অনেক।
ইশানকে বাঁধা দিলো ইমরান।
‘ইশান,বাবা এসব কথা থাক আজ।’
‘না পাপা বলতে দাও আমাকে।জানুক সবাই কেনো ইশান তার পাপা ছাড়া আর কিছুই বুঝে না। ইশানের আইডল তার পাপা,সুপারস্টার তার পাপা।
আপনারা যে বয়সে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়েছেন আমি সেই বয়সে পাপার সাথে রাজনৈতিক সমাবেশে গিয়েছি। পাপা ব্যবসায় মনোযোগ দিয়েছে,রাজনীতি ছেড়েছে। আমি স্কুলে ভর্তি হয়েছি। আপনারা বাচ্চাদের ‘অ’ ‘আ’ শিখিয়েছেন, মুখে তুলে খাইয়েছেন আর আমি ফুফির কাছে শিখেছি কিভাবে টিফিন বক্সে করে নিজের খাবার নিয়ে যেতে হয় আবার বাসায় এসে খেয়ে গুছিয়ে রাখতে হয়।কারণ পাপা যখন বাসায় থাকেনা,ফুফিও থাকেনা তখন একা খেতে হয়। আমি পাপা বা ফুফি ছাড়া কারো হাতে খেতে পারতাম না। এজন্যই বোধ হয় আমি আমার পাপার ছেলে, একটু বেশি ম্যাচিউর। প্যারেন্টস ডে তে পাপাকে পাশে পেতাম বন্ধুরা মা নিয়ে যেত। আমার তো মা নেই।
পাপাকে বুঝতে দি নিই কখনো আমার কষ্ট লাগতো। তবে এই বয়সে এসে আমি অনেক খুশি কারণ মা পেয়েছি। এই প্রথম পাপাকে ছাড়া বুয়েটে প্রোগ্রামে মা কে নিয়ে গিয়েছি। একটু ও খারাপ লাগে নি। এখন আর বাড়ি খালি লাগে না। না খেলে মা বকে খাওয়ায়। আমরা একসাথে শপিং এ যাই। রেস্টুরেন্টে যাই।পাপা কক্সবাজার ছিলো। তখন মা কে নিয়ে অনেক জায়গায় ঘুরেছি। আমার মা কিন্তু মোনাশা ইকবাল ব্যাতিত অন্য কেউ নয়। আমি তার কথাই বলছিলাম এতক্ষন। আমার আর পাপার জীবনে আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ মা।আমি এবং পাপা তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’
ইশান মোনাকে জড়িয়ে ধরলো। ইশান কাঁদছে। ইশানের কথা শেষ কিন্তু পুরো হল রুম জুড়ে কঠিন নিরবতা। অনেকের চোখে পানি। কাকন নিস্তব্ধ। কারণ সে আজ ব্যর্থ। পেটের ছেলেও আজ তাকে অস্বীকার করলো। ইমরানের মত মানুষটাকে হারালো। মোনা সত্যি ভাগ্যবতী। ইমরান ইশানকে পেয়ে।
মোনা বাবাকে জড়িয়ে ধরে আছে। মায়ার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে কিন্তু মায়া শান্ত। মায়ার চোখে চোখ মেলাতেই মায়া একটা হাসি দিলো। নিজে থেকে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো মোনাকে। মোনা ফুফিয়ে কেঁদে উঠলো। মায়া হেসে উত্তর দিলো,
‘ কাঁদবিনা তুই, আমি কি তোকে কাঁদতে শিখিয়েছি। আমি মন থেকে দোয়া করি তোরা ভালো থাক। কাঁকনের মত আমিও ভু*ল করেছি। দীপ্তর বাবা এসেছিলো। নিয়ে যাবে আমাকে। আমার ভালো কাজ ছিলো আমার আর দীপ্তর বাবার ডিভোর্স টা হয়নি। ইমরান ভাই দেয় নি। পরে শুনেছিলাম। ফুফির উপর রাগ করিস না মা। মানুষ অনেক ভুল করে। আমিও করেছিলাম।মাফ করে দিস।’
মোনা জড়িয়ে ধরে আছে মায়াকে। আজ সবাই খুশি। মোনার জীবনে এই দিনটা আসবে মোনা কখনো কল্পনা করে নি। এত সম্মান এত ভালোবাসা কি করে পেলো সে!! কিন্তু একটা বিষয়ে মন এখনো খচ খচ করছে। ইমরান সাহেব কি এখনো রেগে আছে!!!! করেছে নাহয় ভুল সে। ইচ্ছে করে তো আর করেনি। সে ও জানে আ/ত্ন/হ/ত্যা মহাপাপ। তখন তো মনে অনেক কষ্ট ছিলো নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিলোনা। এত বছর আগের শাস্তি এখন কেন পাচ্ছে?? এই লোকটা কবে একবার বলবে ‘ভালোবাসি মোনালিসা’ নিজের তো চুলে পাক ধরেছে এখন সে চায় মোনালিসা ও বুড়ি হয়ে যাক। তবুও ভালোবাসি নিজ মুখে বলবে না। সবাইকে বলে কিন্তু মোনাকে বলে না। মোনাও আর কথা বলেবে না। একটু ও না অনেক অভিমান জমে আছে। আগে অভিমান ভাঙতে হবে এরপর কথা। আড়ি লোকটার সাথে।
ইমরান বন্ধুমহলের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো। মোনা একপাশে চেয়ারে বসে আছে। পাশে সালমা,মায়া,আইরিন,নওশীন এবং তুশি আছে। ইমরানের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করলো বন্ধুদের সাথে কথা বলতে বলতে মোনার দিকেই তাকিয়ে আছে। লোকটার মুখে কোনো হাসি নেই। পাশ থেকে একজন মহিলার কথায় মোনার ধ্যান ভাঙলো। কথা হেসে বললেও কেমন যেন তাচ্ছিল্য ছিলো,
‘ তুমি মোনা রাইট? ইমরান এত মেয়ে ফেলে তোমায় কেনো বিয়ে করলো? রহস্যময় গন্ধ পাচ্ছি।’
মোনা ঠিক মহিলাটিকে চিনতে পারেনি। কেমন খোঁচা দিয়ে কথা বললো। বাকিদের মুখ বিকৃত হলো। রিক্তা আকস্মিক এসে উত্তর দিলো,
‘ অনন্যা দি তুমি পারো বটে। কিসের রহস্য। ইমরান ভাই যে মোনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে তা জানো না। পিউর লাভ ম্যারেজ।’
‘ তাই নাকি, ছোট মেয়েরা সুন্দরই হয়। কায়দা জানে অনেক।’
‘ ও আপনি সেই অনন্যা। আপনার কথা অনেক শুনেছি। আপনি তো ইমরান সাহেবের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিলেন ভার্সিটি লাইফে।’
মোনার এমন কড়া জবাব অনন্যা কেনো, এখানে বসে থাকা কেউই আশা করেনি। কথা বলতে বলতে ইমরান একটু এগিয়ে এসেছিলো রিক্তার সাথে ইভেন্ট এর খরচ নিয়ে আলোচনার জন্য। মোনার এমন একটা জবাব শুনে ও নিজেই থমকে গেলো। মোনা আবার বললো,
‘ কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম, আমি মেয়েটা বয়সে ছোট হলেও বুদ্ধিতে একেবারেই খাটো নই। আপনি অসম্ভব রূপবতী। আপনাকে রিজেক্ট করার কোনো কারনই আমি খুঁজে পাচ্ছিনা। তারপরও ইমরান সাহেব রিজেক্ট করেছিলেন। আমি শ্যামারঙা। কিন্তু ভীষণ চটপটে। যতখানি পাগলামি ইমরান সাহেবকে পেতে করেছি, তার অর্ধেক যদি সেই যুগে আপনি করতেন তাহলে হয়তো আমার জায়গায় আপনি থাকতেন। আমি ইমরান সাহেবের জোড়া। আপনি বা এখানে উপস্থিত অনেকেই যা পারেন না আমি তা এক নিমেষে করতে পারি ইমরান সাহেবের জন্য। তার প্রতিপত্তি আমার দরকার নেই, তার নাম-যশ লাগবে না মোনার। আমার যা দরকার পেয়ে গিয়েছি। পেছনে তাকিয়ে দেখুন কিভাবে মুগ্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আপনাকে দেওয়া প্রতিটি জবাব শুনছে।’
ইমরান নিজেই হকচকিয়ে গেলো। অনন্যা পেছনে তাকিয়ে দেখে ইমরান। ইমরান সবার দিকে দৃষ্টি বুলালো। ভাবছে কিভাবে এই সিচুয়েশন মোকাবেলা করবে। অনন্যা বলে উঠলো,
‘ তুমি বড্ড বেহায়া মোনা, আমি তোমার চেয়ে অনেক বড়। সম্মান টাও দিতে শেখায়নি মিনহাজ ভাই তোমায়।’
‘ আপনার মত হায়া আমার লাগবে না ম্যাডাম অনন্যা। ছোট বলে সেভাবে যদি কথা বলতেন আমার সঙ্গে, তাহলে এই লজ্জায় পড়তে হতনা আপনাকে। আমার ইমরান সাহেব বেহায়া মোনালিসাকেই তার হৃদয় দিয়ে বসে আছে। একবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখুন, আমি তো আমার সর্বনাশ দেখি। তার চোখে আমি শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। এখানে কোনো রহস্য নেই।’
আকস্মিক মোনা ইমরানকে একটু রাগতস্বরে বলে,
‘ কি দরকার এত সেজে গুজে থাকার। শকুনীদের নজর পড়েনা আপনার উপর। আপনি শুধু আমার। আমার এই জীবনে,পরের জীবনে, সব জীবনে আমি আপনার,আপনি আমার।’
নয়ন মাঝখান থেকে হো হো করে জোরে হেসে উঠলো। এরমধ্যে বাড়ির লোকজনেরা একপাশে উপস্থিত হয়েছে। ইমরান আশেপাশের অবস্থা দেখার জন্য চোখ বুলালো। তাকিয়ে দেখে পরিবারের লোকজন ছাড়া বাকিরা গল্প খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। শুকনো ঢোক গিললো ইমরান। মোনার কি বিধ্বংসী রূপ। অনেক বছর আগে দেখেছে। এই মেয়ে মোটেও ছোট নেই আর। অবশ্য ছোট কালেও এর মধ্যে নেকামো ছিলোনা। নাহয় ১৪ বছর বয়সে কি করে ৩৬ বছর বয়সের ইমরানের প্রেমে পড়ে। নয়ন বলে উঠলো,
‘ এসব পাকনা কথা বলেই ইমরানকে কাবু করেছেন তাই না ভাবীজান।’
ইমরান ধমকে উঠলো,
‘ নয়ন জাস্ট শাট আপ। আর একটাও কথা না। এটা একটা অনুষ্ঠান। আমি চাই না এখানে কোনো ঝামেলা। একটা সিলি ম্যাটার নিয়ে এত কাহিনী না করাই ভালো। অনন্যা আ’ম স্যরি। মোনালিসার কথায় রাগ করোনা। ওর মধ্যে এখনো বাচ্চামো রয়ে গিয়েছে। আমি জানিনা তোমাদের মধ্যে কি কথা হয়েছে। তবে মোনালিসা অনেক স্পষ্টভাষী। যা বলে মুখের উপর বলে দেয়। প্লিজ রাগ করোনা।’
‘ ইমরান.. তুমি কিন্তু আমাকে ইনডিরেক্টলি বুঝিয়ে দিলে তোমার ওয়াইফ এতক্ষন যা বলেছে বা করেছে সবই ঠিক।’
‘ আমার ওয়াইফ মিথ্যা বলে না অনন্যা। আমি আর এই বিষয়ে কথা বাড়াতে চাই না। তুমি তো বিদায় নিতে এসেছিলে তাই না। কাঁকন চলে যাচ্ছে। আমার মনে হয় তুমি ওর সাথেই যাবে।’
তীব্র অপমান সইতে না পেরে অনন্যা হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গেলো সবার সামনে দিয়ে। অনন্যা বেরিয়ে যাওয়ার পর ইমরান মোনার দিকে ক্ষীপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। বাকিরা সবাই ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে ইমরানের দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই বুঝতে পারছে ইমরান ক্ষেপেছে।
‘ ইট’স নট ফেয়ার মোনা।’
‘ হু কেয়ার’স। ডোন্ট কল মি মোনা,আ’ম ইউর মোনালিসা। শুনেন আপনি ও জানেন আমি ঠিক,আমিও জানি আমি ঠিক। আপনি কি ভুলে গিয়েছেন আমি সেই মোনাশা ইকবাল যে রাতের দুইটা বাজে ওয়াল টপকে আপনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, আমি সেই মোনা যে ১৪ বছর বয়সে ৩৬ বছর বয়সী ইমরানের প্রেমে পড়ে নিজের জ্ঞান হারিয়ে বসেছিলাম, আমি পরিণত হয়েছি আপনার চোখের সামনেই।আমার বেড়ে উঠা,মস্তিষ্ক সচল হওয়া সবই আপনার দৃষ্টিসীমার মধ্যে।আমি চুপচাপ হয়েছি ঠিকই নিজের সত্তা ভুলিনি। আপনি খালেদ জব্বারকে পিটিয়ে পুলিশে দিলেই যে সে খবর অগোচরে থাকবে তা তো নয়। আমার উপর সেদিন কক্সবাজারে যারা এটাক করেছিলো সবাই ভেবেছিলো আমি পালিয়ে এসেছি। আসলে আমি তাদের পিটিয়ে জখম করে লাবনী পয়েন্টেই ফেলে এসেছি। আর আপনি এই খবর জানতেন।ধামাচাপা দিয়ে পুলিশে দিয়েছিলেন ছেলেগুলোকে, সবাই জেনেছিলো মাদকপাচারীদের পুলিশ এরেস্ট করেছে। সেই খবর আমার কানে আসে ইমরান সাহেব। আপনি যদি হোন বাঘ,তবে আমি ও বাঘিনী।’
ইমরান তর্জনী আঙ্গুল তুলে মোনার দিকে শাসানোর জন্য বলে,
‘ তোমার বাঘিনী রূপ অনুষ্ঠানে দেখানোর কি দরকার।’
মোনার আঙ্গুল টা খপ করে ধরে অধর প্রসারিত হাসি দিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে ইমরানকে বলে,
‘ তোমায় দেখে মনের ভেতর জাগলো ইমোশন,
আমি প্রেমে পড়ে গেছি ওগো,ওগো জেন্টালম্যান। ‘
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৫
মোনা আঙুলটা আলগা করে দিতেই ইমরান সবার সামনে থেকে সরে চলে গেলো। উপস্থিত কেউ কেউ মুখ টিপে হাসছে তো কেউ কেউ হাসি আটকানোর চেষ্টায় আছে। ইশান পাশে এসে দাঁড়ায়,
‘ মা ইউ আর জিনিয়াস,তুমি মার্শাল আর্ট জানো তাতো জানতাম না। পাপা কুপোকাত, ওয়েল ডান মা।’
