তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৩
জেরিন আক্তার
স্নিগ্ধর এমন হুট্ করে চোখ মারা দেখে প্রাণেশা মুচকি হেসে গাড়িতে উঠল।
এদিকে স্নিগ্ধ স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে হাসছে। পাশের সিট থেকে সুবহা খেয়াল করে বলল,
“হাসছো কেনো ভাইয়া?”
স্নিগ্ধ আগের ন্যায় হেসে বলল,
“তোর ভাবিকে দেখে।”
সুবহা স্নিগ্ধর দিকে ঘুরে বসে বলল,
“ভাইয়া জানো আজকে প্রাণেশা জিজ্ঞাসা করছিলো তুমি প্রেম করো কিনা! পরে বলেছি প্রেম করো না। ও মনে হয় তোমাকে একটু একটু পছন্দও করে।”
স্নিগ্ধ ভ্রু উঠিয়ে বলল,
“তাই! আচ্ছা ভালোই হবে তাহলে।”
সুবহা প্রাণেশার ভাই আর বাবার কথাগুলো মনে করে বলল,
“ভাইয়া প্রাণেশা বলছিলো ওর বাবা আর ভাই নাকি প্রেম-ভালোবাসা মানে না। তাহলে কি তোমাদের মিল হবে না?”
স্নিগ্ধ ভাবুক গলায় বলল,
“ওর বাবা-ভাইয়ের কথা আমি জানি। একটু মানিয়ে নিতে হবে। কিন্তু তার চেয়ে বড় বিষয় প্রাণেশাকে আমার করতে হবে। তবে আর যাই বল প্রাণেশা কিন্তু নরম মনের মানুষ। ওর বাবা-ভাইয়ের মতো রাগী না। আমি প্রথম দিনেই বুঝেছি।”
সুবহা অধৈর্য কণ্ঠে বলে দিলো,
“তাহলে বলে দাও ওকে তুমি ভালোবাসো।”
স্নিগ্ধ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“উহু এখনই না। আমি দেখতে চাই ওর মনেও আমার জন্য ফিলিংস আসে কিনা।”
এই বলে স্নিগ্ধ পরপর কড়া গলায় সুবহাকে বলল,
“তোর এসবে নাক গলাতে হবে না। পড়াশোনা কর। আর প্রেম-ভালোবাসা আমাকে বোঝাতে হবে না। তোকে যেনো এসবের মধ্যে না দেখি।”
সুবহা মুখটা ভার করে সামনে তাকিয়ে রইলো। ভাবলো, ভালোই তো কথা হচ্ছিলো, কিন্তু পড়াশোনার কথা তোলা কি ভাইয়ার খুব দরকার ছিলো! আবার বলে প্রেম করা যাবে না। নিজে করবে সেটা কিছু না।
পরদিন প্রাণেশা ভার্সিটিতে গেলো। আজকে সুবহা আসেনি। সকালে মেসেজে বলল তো যে আসবে, কিন্তু ক্লাস শুরু হচ্ছে এখনও আসছে না কেনো? প্রাণেশা ফোনটা বের করে স্যারের নজর এড়িয়ে মেসেজ দিলো কিন্তু মেসেজ সিন্ করার নাম নেই মেয়েটার।
প্রথম ক্লাসটা শেষ হতেই প্রাণেশা বের হলো। বান্ধবীকে ছাড়া একটুও ভালো লাগছে না। এরপরই এলো স্নিগ্ধ, বেশ হ্যান্ডসাম লুকে। প্রাণেশা তাকিয়ে দেখতে দেখতে পেছন থেকে সুবহা এসে ডাক দিলো। প্রাণেশা পেছন ফিরে মন খারাপ নিয়ে দাড়িয়ে রইলো। সুবহা কাছে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আই এম সরি দোস্ত। একটু লেট্ হলো। আর বলিস না ভাইয়ার একটা কাজ ছিলো রে।”
“হয়েছে আর বলতে হবে না। চল। তোকে ছাড়া ভালো লাগছিলো না।”
দুজনে ক্লাসে ঢুকলো। তবে প্রাণেশার বড্ড তৃষ্ণা জাগছে স্নিগ্ধকে দেখতে। কিন্তু কি করে যাবে? সেই তো ছুটি হলেই দেখতে পাবে।
সন্ধ্যার পরপর প্রাণেশা এই বাড়ির কাজের লোক রোকেয়া বেগমের সাথে বসে টিভিতে সিরিয়াল দেখছিলো। ছোট থেকে তিনিই বড় করেছেন প্রাণেশাকে।
এই পরপরই প্রাণেশার ফোনে সৌরভ কল দিলো। প্রথমেই সৌরভ বোনকে খোঁচা মেরে কথা বলল,
“কিরে বিড়ালের বাচ্চা কেমন আছিস?”
“উফ ভাইয়া এসব নামে ডাকবে না। ভালো ভাবে ডাকবে, আমি তোমার বোন হই।”
সৌরভ হেসে বলল,
“আপা ভুল হয়ে গিয়েছে, ক্ষমা করুন।”
প্রাণেশা একটু রেগে গেলো।
“ভাইয়ায়ায়ায়া।”
“কি আ আ করছিস? বল কি আনতে হবে, শপিংয়ে এসেছি। কালকে দেশে আসবো।”
প্রাণেশা খুশি হয়ে রয়েসয়ে বলতে শুরু করলো…
“ভাইয়া আমার জন্য চকলেট আনবে, ঘড়ি আনবে, লিপস্টিক, নেলপালিশ আর আর…”
“হয়েছে থাম, এতো টাকা-পয়সা নাই। তোর বাপকে গিয়ে বল।”
প্রাণেশা ঠোঁট উল্টিয়ে ঝাড়ি মেরে বলল..
“থাক আনতে হবে না।”
বলে ফোনটা কেটে দিলো। সৌরভ হেসে ফেলল। ওর আবার বোনকে রাগাতে বেশ ভালো লাগে। যেনো যুদ্ধে জয়লাভ করার মতো আনন্দ পায়।
প্রাণেশা মুখ ভার করে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। আরশাদ খান বাড়িতে ঢুকে মেয়ের মুখখানা দেখে সামনে এসে বললেন,
“কি হয়েছে তোমার আম্মু?”
প্রাণেশা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“বাড়িতে কেউ ছিলে না তাই ভালো লাগছিলো না।”
আরশাদ খান হেসে শুধালেন,
“মন খারাপ করার কিছু নেই কালকেই তোমার ভাইয়া আসছে।”
রাত তখন ১০টা,,
প্রাণেশা আজও সেই ডায়েরিটা নিয়ে বসে আছে। স্নিগ্ধকে নিয়ে কিছু কথা লিখছে আবার হাসছে। রোকেয়া বেগম প্রাণেশার রুমে ঢুকে বললেন,
“মামনি হাসছো কেনো?”
প্রাণেশা ডায়েরিটা বন্ধ করে হেসে আমতা আমতা করে বলল,
“ওই আসলে কলেজের একটা হাসির কথা মনে পড়ে গিয়েছিলো তাই।”
রোকেয়া বেগম কিছু কথা বলে চলে গেলেন। এরপরেই প্রাণেশা সুবহাকে কল দিলো। উদ্দেশ্য স্নিগ্ধর সাথে একটু কথা বলার চেষ্টা। হয়তো যোগাযোগ করার জন্য নাম্বার অথবা ফেসবুক আইডি চাইতে পারে।
“কিরে সুবহা ঘুমিয়ে পড়েছিস নাকি?”
“না দোস্ত। বসে আছি। তু্ই কি করছিস?”
“কিছুনা। আচ্ছা সুবহা শোন না একটা হেল্প করবি?”
“কি হেল্প বল এক্ষুনি করে দিচ্ছি।”
প্রাণেশা আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে তো তোর ভা..”
থামলো প্রাণেশা। বান্ধবীর থেকে তার ভাইয়ের নাম্বার চাওয়া….. আসলেও তো ব্যাপারটা কেমন দেখায়। এদিকে সুবহা বুঝতে পারলো না প্রাণেশার কথা। কপাল কুঁচকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
“কি আমার বল!”
প্রাণেশা আবার বলতে চেয়েও পারলো না, এরপরে নিজেই টুস করে কল কেটে দিলো। সুবহা আবার কল দিলো। প্রাণেশা কল কেটে দিয়ে মেসেজ দিলো,
“ঘুমাবো পরে কথা হবে।”
সুবহা আর কল দিলো না। এই দুদিন ধরে প্রাণেশাকে লক্ষ্য করছে, যেই মেয়েটা এতো চঞ্চল, এতো কথা বলায় পটু সে কিনা এতো কম কথা বলছে। আবার কিছু ভাবছেও। মনে হচ্ছে কিছু লুকাচ্ছে। থাক এখন আর ওকে কল দিবে না, কালকে ভার্সিটিতে এলেই কথা হবে।
প্রাণেশা শুয়ে পড়লো। কালকে ওর ভাই সৌরভ আসবে সেই খুশিতে কি আর ঘুম আসে? এই প্রথম মনে হয় ওর ভাই ওকে রেখে এতদিন আলাদা একটা জায়গায় আছে। অবশ্য প্রাণেশা বিন্দাস ঘুরে-বেরিয়েছে কিন্তু মনে মনে ভাইয়ের করা প্রতিটা শাসন মিস করেছে।
পরদিন,
বেলা তখন ১০টা। সুবহা ভার্সিটিতে এসে প্রাণেশাকে পেলো না। কতবার কল দিচ্ছে কিন্তু ধরছে না, আবার মেসেজ দিচ্ছে তাও সিন্ করছে না। কই এমন তো কোনোদিন করেনি। তাহলে আজকে এমন করছে কেনো? ওর সাথে ৫ বছরের ফ্রেন্ডশিপ, এর মাঝে কোনোদিন এমন করেনি। অতঃপর সুবহা চিন্তায় স্নিগ্ধকে মেসেজ দিলো,
“ভাইয়া, প্রাণেশা আজকে আসেনি। কল ধরছে না, মেসেজ সিন্ করছে না। কালকে রাতে কিছু একটা বলতে চেয়েও বলল না।”
স্নিগ্ধ অন্য একটা ক্লাসে ব্যাস্ত ছিলো বিধায় সুবহার মেসেজটা দেখেনি। এরপরে স্নিগ্ধ ক্লাসে আসে। শুরুতেই ওর চোখ দুটো প্রাণেশাকে খুঁজছে। প্রাণেশার অনুপস্থিতিতে স্নিগ্ধ কেমন একটা গুমোট বেধে ক্লাস করালো।
বাড়িতে ফেরার পথে সুবহা স্নিগ্ধকে সব বলল। স্নিগ্ধও চিন্তিত হলো।
সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পরে স্নিগ্ধ এলো সুবহার রুমে। এসে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“তোর বান্ধবী কল দিয়েছিলো?”
“না দেয়নি তো।”
“তু্ই দিয়েছিলি?”
“না। ভেবেছি হয়তো ব্যাস্ত তাই আর দেইনি।”
স্নিগ্ধ কিছু একটা ভেবে বলল,
“ওর নাম্বারটা দে!”
সুবহা তড়িৎ পায়ে এগিয়ে এসে ফোনটা নিয়ে নাম্বার বের করে দিলো। স্নিগ্ধ নাম্বার উঠিয়ে কল দিতে দিতে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
এদিকে প্রাণেশা সকাল থেকে ভাইয়ের জন্য নিজ হাতে রান্না-বান্না করেছে। ভাইয়ের রুম গুছিয়েছে। এরপরে দুপুরের পরপরই সৌরভকে আনতে এয়ারপোর্টে গিয়েছে। ফোনটা যে ধরবে তারও সময় নেই কাছে।
সৌরভ রুমে গিয়েছে ফ্রেশ হতে। আর প্রাণেশা নিজের রুমে এসে ফ্রেশ হলো। এরপরই স্নিগ্ধর কল এলো। নাম্বারটা চিনলো না তাই ধরলো না। এরপর যখন আবার কল এলো তখন রিসিভ করে কানে ধরে বলল,
“হ্যালো কে বলছেন?”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার কণ্ঠ পেয়েই নিরেট কণ্ঠে বলল,
“স্নিগ্ধ বলছি।”
প্রাণেশা কিছু সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে গেলো। এরপরে মুখের কোণে হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে চেয়েছিলো স্নিগ্ধর সাথে যদি কথা হতো, আর শেষে হলোও। স্নিগ্ধ কপাল কুঁচকে বলল,
“কি হলো প্রাণেশা!”
প্রাণেশা খুশিতে বিছানায় উঠে বসে বলল,
“হ্যা হ্যা বলুন!”
স্নিগ্ধ ভেবেছিলো কল দিয়ে অনেক কথা বলবে কিন্তু এর একটাও মনে আসছে না। ভাবছে কি বলা যায়।
দুজনেই টুকটাক কথা বলছে। সৌরভ এলো প্রাণেশার রুমে। এখন লাগেজ খুলবে তাই বোনকে ডাকতে এসেছে। প্রাণেশা ফোনটা কানে থেকে নামিয়ে কল কেটে দিয়ে বলল,
“ভাইয়া তুমি…”
সৌরভ সন্দীহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে রসিকতা করে বলল,
“এমন হাবভাব করছিস যেনো প্রেম করতে গিয়ে ধরা পড়েছিস।”
প্রাণেশা হেসে বলল,
“কই নাতো! আসলে ওই আজকে ভার্সিটিতে যাইনি তাই স্যার ফোন করেছিল।”
সৌরভ কপাল কুঁচকে নিয়ে কোমরে হাত রেখে বলল,
“বাব্বাহ, দেখি কোন স্যার কল দিয়েছে।”
প্রাণেশা ঘাবড়ে গেলো না। মনে সাহস এনে ফোনের স্ক্রিনে স্নিগ্ধর নাম্বারটা সৌরভকে দেখিয়ে বলল,
“এই যে স্যারের নাম্বার। কথা বলবে, কল দিয়ে দেই?”
সৌরভ শ্বাস ছেড়ে গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“এর প্রয়োজন নেই। তু্ই যেই ভার্সিটিতে পড়িস সেখানে আমার বন্ধু হামিম জব করে। আমার অজান্তে তোর কোনো সমস্যা হলেও জানতে পারবো।”
প্রাণেশা সৌরভের কথাটা ভাবতে লাগলো। তার মানে হামিমের থেকে সৌরভ ওর খবর নিতে পারবে। সৌরভ বলল,
তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২
“তু্ই এখন একটু আমার সাথে গিয়ে লাগেজটা খোলার অনুমতি দে বইন।”
প্রাণেশা অতশত চিন্তা বাদ দিয়ে বিছানায় থেকে নেমে দাড়ালো। ভাইয়ের হাত ধরে যেতে যেতে বলল,
“ভাইয়া তুমি লন্ডনে গিয়ে প্রেম করোনি? না মানে কাউকে পছন্দ হয়নি?”
সৌরভ দাড়ালো। কটমট দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“লাঠি চিনিস লাঠি? এই তিনমাস তো লাঠির চেহারা দেখিসনি তাই ভুলে গিয়েছিস মনে হয়।”
প্রাণেশা ফিচেল হেসে বলল,
“না একটু পরিচয় করিয়ে দিও।”
