Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৬

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৬

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৬
জেরিন আক্তার

মাঝেরাতে স্নিগ্ধকে ব্যালকনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল প্রাণেশা। মনে হলো যেনো স্বপ্ন দেখছে। প্রাণেশা আসফাঁস শুরু করলো। স্নিগ্ধ হাত উঁচু করে হাই দিলো। প্রাণেশা কথা বলতে নিয়ে চুপ হয়ে গেলো। এখন কিছু বলতে গেলে সবাই জেগে যাবে। ও হাত দিয়ে ইশারা করে বোঝালো, “আপনি এখানে কেনো?”
স্নিগ্ধ হাতে থাকা একগুচ্ছ গোলাপ দেখালো। প্রাণেশা কিছু বলতেও পারছে না। ব্যালকনি থেকে বেরিয়ে রুমে এসে স্নিগ্ধকে কল দিলো। কল রিসিভ হতেই ও অস্থির কণ্ঠে বলল,

“আপনি এতো রাতে এখানে কেনো?”
“তোমার জন্য ফুল এনেছি। স্টোরিতে লিখেছো ফুল চাও। আর সুবহাকে বললে গোলাপ ফুলের কথা, তাইতো নিয়ে এলাম।”
প্রাণেশা অবাক হলো বৈকি। থমথমে মুখে জিজ্ঞাসা করলো,
“আপনি লিখলাম আর আপনি ফুল নিয়ে চলে আসবেন এতো রাতে?”
“হুমম। এর আগেই এনে দিতাম। এসেও ছিলাম। দারোয়ান ছিলো, আবার তোমার ভাইও বাহিরে ঘোরাফেরা করছিলো। তাই চলে গিয়েছিলাম।”
“তাহলে এখন কেনো নিয়ে এলেন? এখন ভাইয়া জেগে গেলে কি হবে ভেবে দেখেছেন? আপনি চলে যান। নাহলে কেউ উঠে গেলে আপনাকে দেখে নিলে কি হবে তখন? ভাইয়া এমনেই রাগী, এর মাঝে তার বোনের জন্য ফুল এনেছেন।”
স্নিগ্ধ শ্বাস ছেড়ে বাচ্চাদের মতো করে বলল,

“তাহলে ফুল কি করবো? তোমার জন্য যে নিয়ে এলাম।”
“ওখানে রেখে যান, আমি নিয়ে নিবো।”
স্নিগ্ধ একহাত কোমরে রেখে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল,
“হ্যা রেখে যাই আর সকালে ভুলে যাবে।”
“না, আমি সকালেই নিয়ে আসবো। আপনি রেখে যান।”
“ওকে, তাহলে আরেকবার দেখা দিয়ে যাও প্রাণ।”
প্রাণেশা অবাক কণ্ঠে বলল,
“ক কি বললেন?”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“প্রাণ একটু দেখা দিয়ে যাও, তাহলে আমার অস্থির হৃদয়টা একটু স্বস্তি পাবে।”
প্রাণেশা সোজা গলায় জিজ্ঞাসা করলো,
“আচ্ছা ভালোবাসেন আমায়?”
স্নিগ্ধ মুচকি হেসে বলল,
“উহু।”
প্রাণেশা রাগী কণ্ঠে বলল,

“ভালোবাসেন না তাহলে অচেনা একটা মেয়েকে ফুল দিতে এসেছেন কেনো? সেদিন ঐভাবে চোখ কেনো মারলেন? আবার আমায় দেখে হাসেন, আবার একটু দেখার জন্য ক্লাসেও যেতে বলেন?”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“তুমি আমার স্টুডেন্ট তাই এরকম করি।”
“সব স্টুডেন্টদের সাথে তো এমন করেন না। তাহলে আমার সাথে কেনো?”
স্নিগ্ধ শুধানো গলায় বলল,
“তুমি একটু স্পেশাল স্টুডেন্ট বুঝছো সোনা! অনেক অনেক স্পেশাল। এখন ফুলগুলো রেখে যাচ্ছি নিয়ে যেও।”
হঠাৎ স্নিগ্ধ কারো এদিকে আসার শব্দ পেয়ে একটু আড়ালে গেলো। এরপরে বাগানে দোলনায় এসে ফুলগুলো রেখে দেয়াল টপকে চলে গেলো। ও একা আসেনি। সাথে ওর চাচাতো ভাই সিয়ামকেও নিয়ে এসেছিলো।
প্রাণেশা সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বের হলো। রোকেয়া বেগম ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছে। প্রাণেশা তার সাথে টুকটাক কথা বলে সদর দরজাটা খুলে বাহিরে গেলো। বাগানে দোলনার উপরে একগুচ্ছ গোলাপ পেয়ে খুশিতে হাতে নিলো। নাকের কাছে ফুলগুলো নিয়ে স্মেল নিতে নিতে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো। সিঁড়ি দিয়ে নামছিল সৌরভ। প্রাণেশার হাতে ফুল দেখে, আর ওর দ্বিগুন খুশি হওয়া দেখে সৌরভ সন্দেহ করলো। এগিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

“ফুল কই পেলি তু্ই?”
প্রাণেশা দমে না গিয়ে হেয়ালি করে বলল,
“এতো সকালে ফুল কই পাবো? বাগানে দেখলাম, এগুলো মনে হয় কেউ রেখে গিয়েছে। তাই নিয়ে এলাম।”
“বাগানে দেখবি আর নিয়ে আসবি? আমাকে বলতি এনে দিতাম। যা এগুলো যেখানে রাখা ছিলো রেখে আয়। অন্যের ফুল নিতে হবে না। একটু পরে এনে দিবো।”
প্রাণেশা সিঁড়ির কাছে গিয়ে উপরে যেতে যেতে বলল,
“এগুলো আমি রেখে আসবো না। অনেক পছন্দ হয়েছে।”
বড় অবাক হলো সৌরভ। রাগী কণ্ঠে বলল,
“দিনদিন এতো এমন হচ্ছিস কেনো? ফুল কি আর দেশে নেই?”
প্রাণেশা উত্তর দিলো না। তাকিয়ে থেকে উপরে চলে গেলো। সৌরভ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে সোফায় বসলো। আরশাদ খানও এসে বসলেন। সৌরভ গভীরভাবে ভাবছে হুট্ করে প্রাণেশার আচরণ পাল্টে যাওয়ার কারণ কি?
আরশাদ খান সৌরভকে জিজ্ঞাসা করলেন,

“কি হয়েছে টেন্স লাগছে কেনো?”
সৌরভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“এসেছি থেকে দেখছি, প্রাণেশার আচরণ কেমন পাল্টে গিয়েছে।”
আরশাদ খান বললেন,
“বাচ্চা মানুষতো একেক সময় একেক মুড সুইং হয়।”
সৌরভ কথাটা আমলে নিলো না। মুড সুইং হলে ও এমন করতো না।
আজকেও সৌরভই প্রাণেশাকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে অফিসে চলে গেলো। প্রাণেশা যেতে যেতে হঠাৎ বুঝতে পারলো ওর পাশাপাশি কেউ একজন যাচ্ছে। পাশে তাকিয়ে দেখলো স্নিগ্ধ যাচ্ছে। প্রাণেশা বলল,
“ভালো আছেন স্যার?”
স্নিগ্ধ হালকা হেসে বলল,
“হুমম। তুমি?”
“ভালো নেই স্যার?”
স্নিগ্ধ কপাল কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলো,
“কেনো?”
প্রাণেশা শয়তানি করে বলল,
“স্যার জানেন আপনাকে ছাড়া মন ভালো থাকে না।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“এখানে আমি আপনার স্যার, আর আপনি এন স্টুডেন্ট। দেন আর এরপরে থেকে এরকম কোনো অপ্রাসঙ্গিক কথা বলবেন না।”

প্রাণেশা একটু করে মুখ ভেঙচি দিয়ে বলল,
“যান বলবো না। আর আপনার সাথে বড়সড় একটা বিচার আছে।”
স্নিগ্ধ পকেটে হাত গুজে বলল,
“পরে শুনবো ম্যাডাম। ক্লাসে যান।”
প্রাণেশা রাগ করেই ক্লাসে চলে গেলো। আর স্নিগ্ধ নিজেই হাসছে। হামিম এসে দাড়ালো, দুজনে প্রায় সমবয়সী। বাহিরে তু্ই-তুকারি করে কথা বললেও, এখানে আপনি করেই বলে। হামিম স্নিগ্ধকে বলল,
“কি ব্যাপার স্যারের মন আজকাল দেখি খুব ভালো থাকে। প্রেমে-টেমে পড়ে গেলেন নাকি?”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“ওই চলছে আরকি। আপনার কি খবর? বিয়ে করবেন না?”
“হুমম। করবো ভাবছি।”
“ও, তাহলে মেয়ে দেখবো নাকি?”
হামিম হেসে বলল,
“একজনকে ভালো লাগে। দেখি সে কি বলে।”
“ভালোই তাহলে।”
হামিম এগিয়ে এসে আস্তে করে বলল,
“আপনার কি অবস্থা সেটা বলুন। দেখে তো মনে হচ্ছে প্রেমে পড়েছেন।”
স্নিগ্ধ হেসে গভীর গলায় বলল,
“হুমম, ভয়ানক এক প্রেমে পড়েছি। যেখানে থেকে বের হয়ে আসা অসম্ভব।”

সন্ধ্যার দিকে সৌরভ বাড়িতে ফিরলো। বিকেলে এক বন্ধুর সাথে শপিংয়ে গিয়েছিলো। এতো ঘোরাফেরা করে মাত্র ২ টা টি-শার্ট কিনেছে। প্রাণেশা ড্রইং রুমে বসে টিভি দেখছিলো। সৌরভ বাড়িতে ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো। শপিং ব্যাগগুলো রেখে ও ফ্রেশ হতে ঢুকলো। এদিকে প্রাণেশা ওর রুমে ঢুকে সেই ব্যাগগুলো খুলল। ওখানে থেকে একটা টি-শার্ট পছন্দ হলো। সাথে সাথে সেটা নিয়ে রুমে চলে গেলো।
সৌরভ রুমে এসে ব্যাগগুলো সোফায় রেখে বিছানায় একটু শুলো।
একটু পরেই প্রাণেশা সেই টি-শার্ট আর তার সাথে একটু ঢোলা প্লাজু পড়েছে কালো রঙের। আর গলায় চেরি কাপড়ের ওড়না। ও রুম থেকে বেরিয়ে ড্রইং রুমে এলো। রোকেয়া বেগমের রান্না শেষ। প্রাণেশা রোকেয়া বেগমের কাছে গিয়ে বলল,
“আন্টি দেখো তো কেমন লাগছে আমাকে।”
রোকেয়া বেগম হেসে বললেন,
“অনেক সুন্দর লাগছে মা।”

প্রাণেশা হেসে হেসে কথা বলছিলো। সৌরভ ফোনে কথা বলতে বলতে এলো ড্রইং রুমে। হঠাৎ করে চোখ আটকে যায় প্রাণেশার পড়া টি-শার্ট দেখে। একটু চেনা চেনাই লাগছে সৌরভের কাছে। মনে হচ্ছে শার্টটা কোথাও দেখেছে। তৎক্ষণাৎ মাথায় স্মরণ হলো এই টি-শার্ট তো একটু আগেই কিনে নিয়ে এসেছে। আর এর মধ্যেই এই বিড়ালের বাচ্চার পড়াও শেষ।
সৌরভ কলটা কেটে দিয়ে প্রাণেশার কাছে এসে বলল,
“তু্ই এই শার্ট পেলি কোথায়?”
প্রাণেশা ফিচেল হেসে বলল,
“কোথায় আবার পাবো? এটা তুমি আমায় গিফট করলে না। আসলে তুমি না বললে কি হবে আমি তোমার মনের কথা বুঝি ভাইয়া। আসলে ভাই তো বুঝতে তো হবেই।”
সৌরভ রেগে গিয়ে বলল,
“একটুও পড়িনি শার্টটা। এর আগেই নিয়ে নিলি।”
প্রাণেশা গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“এ আর নতুন কি? দুদিন পড়ে দিয়ে দিবো।”
“খুব তো বলিস দিয়ে দিবি। কই একটাও তো আমার কাছে আসে না। এরপরে থেকে না শার্ট পড়বো না। পাঞ্জাবী পড়বো।”
প্রাণেশা কুটিল হাসলো। সৌরভ বলল,

“তোর ঘাড়ের পেছনে ট্যাগ টাও খুলিসনি। গাধা কোথাকার।”
প্রাণেশা টি-শার্টের ট্যাগ খুলতে খুলতে মনে মনে বলল, এই বাড়িতে থাকলে তোমার শার্টগুলো আমি নিবো। আবার শশুরবাড়ি গেলেও জামাইয়েরটা পড়বো। বিশেষ করে সুবহার ভাইয়ের সবগুলো শার্টই আমার হবে।
ভাবতে ভাবতে প্রাণেশা নিজে নিজেই হেসে উঠল।
এরই মাঝে ড্রইং রুমে আরশাদ খান এলেন। সৌরভকে ডেকে সোফায় বসতে বললেন। খুব জরুরি কথা বলবেন। আবার বাহিরে থেকে দারোয়ান এলেন। আরশাদ খান আর সৌরভের সামনে দাঁড়ালেন। সৌরভ তাকে বলল,

“আংকেল কিছু বলবেন?”
দারোয়ান বলল,
“সৌরভ মধ্যরাতে দেখলাম কেউ দেয়াল টপকে ওইপাশে চলে গেলো। এরপরে গেটের বাহিরে বেরিয়ে দেখি দুটো ছেলে একটা বাইকে উঠে চলে গেলো। মূলত একজনই ভিতরে ঢুকেছিলো।”
সৌরভ অবাক কণ্ঠে বলল,
“বলেন কি আংকেল। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করেননি?”
উত্তরে দারোয়ান বলল,

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৫

“চেক করেছি কিন্তু ছেলেটা মুখে মাস্ক পড়েছিলো।”
এই শুনে প্রাণেশা হাফ ছাড়লো। এখন এসব বিষয় আমলে না নিয়ে খুশি মনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে গেলো। এর থেকেও বড় খুশির ব্যাপার হলো কালকে প্রাণেশা স্নিগ্ধর সাথে ঘুরতে যাবে।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here