তোমার আমার গল্প পর্ব ৩২
noorayn
নোমান বাড়িতে ঢুকতেই দেখা মিলে আলিশার সাথে, সে এক পলক সেদিকে চেয়ে থমকে দাঁড়ায়। আলিশার পড়নে নীল রঙের লুস ফিটিং পাকিস্তানি স্টাইল থ্রিপিস, কানে ছোট ডায়মন্ড এর ইয়ার-পিস আর হাতে নোমান এর পছন্দ করা চুড়ি – যা দেখে নোমান এর মুখে আপনা-আপনি হাসি ফুটে উঠে। চুলগুলা ছোট একটা ক্লিপ এর সাহায্য বেধে রাখার কারনে সামনে দিয়ে কিছু চুল বেড়িয়ে আছে যার কারনে আরো সুন্দর লাগছে আলিশা কে। তার এই রুপ বড্ড স্নিগ্ধ লাগলো নোমান এর কাছে। সে মনে মনে আওড়ালো – ফুল আমার স্নিগ্ধ ফুল। তবে তার এই হাসি বেশিক্ষন স্থায়ী হলোনা কেননা আলিশাকে পরখ করতে করতে তার চোখ গিয়ে ঠেকে তার গলার কাছে যেখানে আরহামের দেয়া ভালোবাসার চিহ্ন জ্বলজ্বল করছে, যা দেখে নোমান এর হাত আপনা-আপনি মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে গেলো। কাজের ফাঁকে কখন যেন গলার কাছ থেকে ওড়না সরে গিয়ে ক্ষতগুলা দেখা যাচ্ছে তা আলিশা খেয়ালই করেনি তবে আরহাম এর চোখে পড়া মাত্র সে এসে নিজে আলিশার ওড়না দিয়ে ঢেকে দিলো গলার সাইডটা, তারপর আলিশার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো – “কাজেই না আর অকর্মার ঢেকি বলি, তুই যেন উঠে পড়ে লেগেছিস এই নামকে নিজের জন্য সার্থক করতে।”
আলিশা একহাতে আরহাম কে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে – “এই বেয়াদব ছেলে, সবার সামনে ওড়না ধরে টানাটানি করছো কেন? এসব ছুইঁছুইঁ স্বভাব এখন রুমের বাইরেও শুরু করেছো? এতো অধঃপতন হয়েছে তোমার! ছিঃ!”
আলিশার কথা শুনে আরহাম যেন সপ্তম আসমান থেকে নিচে পড়লো, বড়-বড় চোখ করে তাকে শাসিয়ে বললো – “এই অকর্মার ঢেকি একদম উল্টা-পাল্টা ভাববি না। আমি না থাকলে এতক্ষনে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারতিনা, আবার বলে আমি কিনা তার ওড়না ধরে টানাটানি করছি! এই জন্যই বলে যার জন্য করলাম চুরি সেই বলে চোর।”
“কি আবোল-তাবোল বলছো এসব? খুলে বলো।”
“ওড়না সরে গিয়ে লাভ-বাইট দেখা যাচ্ছিলো তাই ঠিক করে দিয়েছি আর তুই কিনা নিজের বাচ্চার বাপকেই বখাটে ছেলেদের মতো ট্রিট করলি!”
সব শুনে আলিশা জ্বিভ কাটলো – “ওই মানে না..আমি আস..লে..তা বলতে চাই…”
আলিশার কথা শেষ হওয়ার আগেই আরহাম অভিমানী কন্ঠে বলে উঠে -“থাক আর সাফাই গাইতে হবেনা, তুই আমাকে নিয়ে কি ভাবিস তা আমি বুঝে নিয়েছি।”
“হয়েছে কুদ্দুস এর বাপ, আর নাটক করতে হবেনা। স্যরি।”
“হোয়াট! শেষমেশ কুদ্দুস এর বাপ?”
“হ্যাঁ, তো?”
“গন্ডার যা ছিলো তাই বলে কুদ্দুস এর বাপ? আমার ভোলাভালা টমেটোর মতো দেখতে এতো কিউট বাচ্চা ছেলেটার নামের এই কি দশা করেছিস তুই!”
“বেশ করেছি, সামনে আরো নাম রাখবো। প্রস্তুত থেকো।”
এটা শোনার পর আরহাম এর দশা বি লাইক – “ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি।”
এতক্ষন যাবত, আরহাম-আলিশার ফিসফিস কথা-বলা খেয়াল করছিলো নোমান তবে এখন যেন তার ধৈর্য্যের বাধ ভেঙে গেলো তাই হনহনিয়ে চলে গেলো নিজের বরাদ্দকৃত কামরার দিকে।
সবাই ব্রেকফাস্ট কমপ্লিট করে ড্রয়িং রুমে বসেছে আড্ডা দিতে কিন্ত আলিশার মোবাইলে মিথি বারবার কল দেয়ায় সে তা রিসিভ করতে উঠে গিয়েছে করিডোরের দিকে।
আলিশা মিথির সাথে কথা শেষে ফোন রাখা মাত্রই দেখতে পেলো, নোমান তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
“কেমন আছো আলিশা?”
“আমি তো ভালোই আছি। তুমি ব্রেকফাস্ট করতে আসোনি কেন ভাইয়া? রিনা চাচি বেশ রেগে আছে এই নিয়ে।”
নোমান হেসে উত্তর করলো – “মম কে নিয়ে ভাবতে হবেনা, তাকে আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেবো।”
“তাই ঠিক, তবে আসলেনা কেন?”
নোমান খুব সুক্ষভাবে এড়িয়ে গেলো প্রশ্নটা। সে কি উত্তর দিবে? – “তোমায় অন্য কারো পাশে দেখতে কষ্ট হয় স্নিগ্ধ ফুল।” না। সে তো এটা বলার অধিকার রাখেনা তাইতো উত্তর দেয়া প্রয়োজন মনে করেনি বরং কথা কাটাতে বলে উঠলো, – “চুড়ি গুলা খুব সুন্দর মানিয়েছে তোমার হাতে আলিশা।”
“হ্যাঁ, আমার অনেক পছন্দ হয়েছে ডিজাইনটা। চাচি বললো, তুমি পছন্দ করে দিয়েছো।”
“ঠিক পছন্দ নয় বরং স্পেশালি অর্ডার দিয়ে বানিয়ে এনেছি তোমার জন্য।”
“থ্যাঙ্কিউ, নোমান ভাইয়া। তোমার চয়েস বরাবরই সুন্দর।”
নোমান আলিশার দিকে তাকিয়ে বললো, –
“তা আমিও জানি।”
ডোরার ক্ষিদে পেয়েছে বিধায় আরহাম এদিকেই এসেছিলো আলিশা কে ডাকতে যার কারনে এতোক্ষন যাবত নোমান-আলিশার সকল কথোপকথন তার কানে এসেছে।
সে এমনিতেই নোমানকে পছন্দ করেনা তার উপর আলিশার সাথে দেখার পর রাগে ফুসতে ফুসতে চলে গেলো নিজ কামরার দিকে। সার্ভেন্টকে দিয়ে ডেকে পাঠালো আলিশা কে।
আলিশা রুমে আসা মাত্রই আরহাম খাবলে ধরলো তাকে।
হঠাৎ আক্রমনে আলিশা ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, কি হলো তা বুঝে আসতেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো আরহাম এর হাত থেকে। -“এভাবে ধরার মানে কি?”
আরহাম উত্তর তো করলোই না বরং আলিশার হাত টেনে ধরে একে একে খুলে ছুড়ে ফেললো সব চুড়ি।
জোড় করে চুড়ি খোলার কারনে আলিশার হাত লাল হয়ে উঠেছে। সে হাত ডলতে ডলতে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আরহামের দিকে – যেন বুঝার চেষ্টা করছে হয়েছে টা কি?
কিছুসময় অতিবাহিত হলেও আলিশা যখন কোনো উত্তর খুজে পেলোনা তখন আরহাম এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো এমন করার কারন কি?
প্রশ্নটা যেন আরহামের রাগে ঘি ঢালার কাজ করলো। এবার সে আলিশার চোয়াল চেপে ধরে রাগে হিসহিস করে বললো – “তোকে আমি চুড়ি কিনে দেইনা? কোনো কিছু মুখ ফুটে চাওয়ার আগে হাজির থাকে তোর সামনে। তাও কেন পরপুরুষের দেয়া চুড়ি হাতে পড়তে হবে?”
আলিশা কোনোমতে বললো – “ছাড়ো ব্যাথা পাচ্ছি…”
“চুপ একদম চুপ। পুরা লকার জুড়ে এতো জুয়েলারি থাকা শর্তেও তো কোনোদিন দেখিনি আগ্রহ দেখাতে। তাহলে এই চুড়ির মধ্যে এমন কি আছে যে এতো পছন্দ হতে হলো তোর?”
“বড়মা বলেছিলো, বাড়িতে গেস্ট আছে তাই হালকা গোল্ডের কিছু পড়তে এবং সব জুয়েলারি লকারের ভিতর থাকায় সেগুলা আর বের করতে ইচ্ছা হয়নি, সামনে যা পেয়েছি তাই পড়েছি। এতে এতো রিয়েক্ট করার কি আছে?”
“অবশ্যই এটা রিয়েক্ট করার মতো বিষয়। যেখানে আমার নোমানকে পছন্দ নয় সেখানে ওর পছন্দ করা কিছুই তোর আশেপাশে থাকতে পারবেনা। এই বালাজোড়া যেন আর কোনোদিন তোর হাতে না দেখি। বুঝেছিস?
-এটা বলেই আলিশার চোয়াল ছেড়ে দিলো আরহাম।
আলিশার ফর্সা গাল হাতের চাপে লাল বর্ণ ধারন করেছে। সে ছলছল চোখে চেয়ে আছে আরহামের দিকে।
“সুন্দর করে বললেই পারতে, আমি খুলে রেখে দিতাম কিন্তু এতো রিয়েক্ট করার মতো কিছুই হয়নি।”
“বেয়াদব মহিলা। আবার মুখে মুখে তর্ক করছিস? এক থাপ্পড়ে গাল লাল করে দেবো। নোমানের চয়েস সুন্দর, তাই না?”
আরহামের এতো রাগের কারন এখন বোধগম্য হলো আলিশার। এই গন্ডার নিশ্চয়ই তাকে নোমান ভাইয়ার সাথে কথা বলতে শুনেছে। তাইতো একটু পরপর গন্ডারের মতো গর্জে উঠছে। আলিশা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো আরহামের দিকে কিন্তু ভয়ে কিছু বলতে পারছেনা, কখন না জানি এই গন্ডার আবার গর্জে উঠে।
আরহাম তাকিয়ে দেখলো আলিশার গালজোড়া রক্তিম বর্ণ ধারন করেছে। সে আলিশার হাত ধরে কাছে টেনে তাকে নিজের উরুর উপর বসালো।
“ব্যাথা পেয়েছিস?”
আলিশা জবাব দিলোনা তবে তার চোখজোড়া ছলছল করছে।
“আচ্ছা স্যরি। আর হবেনা এমন।”
–কোনো উত্তর এলোনা।
আরহাম আলতো হাতে আলিশার গাল ধরে জিজ্ঞেস করলো-“এখানে ব্যাথা পেয়েছিস?” এবারে সে কোনো উত্তরের অপেক্ষা করলোনা বরং যেদিকে লাল হয়ে আছে সেদিকে পরপর অগনিত চুমু দিতে থাকলো।
আলিশা এই চুমুর অত্যাচার সইতে না পেরে বলে উঠলো –
“হয়েছে এবার থামো। এতো ব্যাথা ও পাইনি তবে তোমার চুমুর ঠেলায় অবশ্যই ব্যাথা হয়ে যাবে। সরো এখান থেকে।”
আরহাম থামতেই আলিশা ওড়না দিয়ে নিজের গাল মুছতে আরম্ভ করলো। আরহাম সেদিকে চেয়ে ওড়নাটা কেড়ে নিলো।
“ওড়না নিলে কেন? দাও।”
“দিবোনা। তুই গাল মুছলি কেন?”
“মুছবোনা তো কি করবো? পুরা গাল ভিজিয়ে দিয়েছো।”
“বরের চুমুতে ভিটামিন থাকে বুঝলি? আর মুছবিনা।”
“এ্যাঁ, প্রতি সেমিস্টারে রিটেইক খাওয়া পাবলিক আসছে ডাক্তারি করতে। সরো।”
বলেই আরহাম এর কোল থেকে উঠে গেলো আলিশা।
“এই এই তুই কি বললি? তুই কি কোনোভাবে আমাকে ইনসাল্ট করলি?”
“কোনোভাবে না বরং সোজাভাবেই ইনসাল্ট করেছি তোমাকে।”
“বেয়াদব মহিলা। আমি রিটেইক খেলে তোর কি? লাস্ট সেমিস্টারে একটা রিটেইকও আসেনি আমার।”
“এর আগেরবার এসেছিলো কিন্তু।”
“চুপ। নিজে তো অকর্মার ঢেকি আবার আসছে আমাকে রোস্ট করতে।”
তাদের কথার মাঝেই কান্নারত ডোরাকে কোলে নিয়ে রুমের দরজায় নক করলেন শাইনা।
আরহাম দরজা খুলতেই শাইনা রুমে প্রবেশ করে আলিশাকে তাড়া দিলো ডোরাকে খাইয়ে দিতে।
আলিশা ডোরাকে কোলে নিতেই শাইনা চলে গেলেন কিচেনের দিকে – তার মেলা কাজ আছে। বাড়িতে গেস্ট আছে, এখনো দুপুরের খাবারের সব আয়োজন করা বাকি।
আলিশা ডোরাকে কোলে নিয়ে ফিড করাতে শুরু করলো। আরহাম সেদিকে চেয়ে আবারও দরজা লাগিয়ে এসে বিন ব্যাগের উপর বসে ফোন চালাতে চালাতে বললো – “লিশা, রেগে আছিস?”
“না, কেন?”
“এইযে তোর চুড়িগুলা ফেলে দিলাম।”
“না, তাতে রেগে থাকবো কেন? ইটস ওকে।”
“আমি তোকে এমন হাজারটা চুড়ি বানিয়ে দেবো। কালই জুয়েলার এর কাছে চল।”
“চুড়ি বলে কিছু বলিনি। অন্যকিছু হলে আমিও তোমাকে ছাড়তাম না। গোল্ড আমার পছন্দ না আর তেমন একটা পড়াও হয়না তাই সমস্যা নেই।”
একটু আগে আরাফের কল এসেছিলো আরহামের কাছে। প্রেজেন্টেশন এর জন্য স্লাইড রেডি করতে হবে তাই আরহাম ভার্সিটি যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে সাথে গুনগুনিয়ে গান করছে মনের সুখে।
তার এমন সুখ যেন সহ্য হচ্ছেনা আলিশার, সে এই গন্ডারের ছানার জন্য কোথাও বাহিরে যেতে পারছেনা, এদিকে এর বাপ মনের সুখে গান গাইছে – এত্ত শাহস! আলিশা তো এই অন্যায় সইবেনা, সে কটমটিয়ে চেয়ে আছে আরহাম এর দিকে যা দেখে আরহাম আরো জোড়ে গান গাওয়া শুরু করে – তার বড্ড মজা লাগছে এই অকর্মার ঢেকিকে জ্বালাতে।
তোমার আমার গল্প পর্ব ৩১
আলিশাও আজ বাহিরে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু ডোরা সকাল থেকেই আলিশার বুকের সাথে চিপকে আছে, একটু ও সরানো যাচ্ছেনা, সরালেই গলা উঁচিয়ে কাঁদা শুরু করে – তাই আলিশা চেয়েছিলো গন্ডার এবং তার ছানাকেও সাথে নিয়ে যাবে কিন্তু বাবু এখনো বেশ ছোট হওয়াই মেহরোজা আক্তার সাফ মানা করে দিয়েছেন এবং এতে আলিশার মেজাজ অনেক চড়ে আছে এর উপর এই গন্ডারের এতো সুখ সহ্য হচ্ছেনা তার। না, এভাবে বসে থাকলে চলবেনা – কিছু একটা তো করা লাগবে।
