Home তোমার নামের রোদ্দুরে তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪১

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪১

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪১
আশফিয়া হিয়া

জানালা দিয়ে আবছা আলো ঘরের ভেতরে প্রবেশ করছে। পর্দাগুলো হালকা বাতাসে দোল খাচ্ছে। আবছা আলোতে আরু চোখ পিটপিট করে তাকাল। নড়া – চড়া করতেই নিজেকে কারোর শক্ত বাহু বন্ধনে আবদ্ধ পেল। রুদ্ধ খুব শক্ত করে তাকে বুকে চেপে ধরে রেখেছে। আরু অনেক চেষ্টা করে রুদ্ধর হাতের বাঁধন থেকে মুক্তি পেল। নড়েচড়ে উঠতেই শরীরে চিনচিনে ব্যথার উপস্থিতি টের পেল। চোখ – মুখ খিঁচে বেড সাইড টেবিল থেকে মোবাইল নিয়ে দেখল ঘড়িতে এখন ৮ টা বেজে দশ মিনিট। তার পরনে রুদ্ধর টি – শার্ট। আরু এবার রুদ্ধর দিকে ফিরে তাকাল। রুদ্ধ উপড় হয়ে ঘুমাচ্ছে। উদাম পিঠে তার নখের দাগগুলো স্পষ্ট ভেসে আছে। আরু নিজের নখের দিকে তড়িঘড়ি তাকাল। বিরবির করে বলল,

– ‘ এমন রাক্ষসীর নখ কবে হয়ে গেল তার? ইশ্ মানুষটা খুব ব্যাথা পেয়েছে নিশ্চয়। ‘ আরু রুদ্ধর পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। এরপর হাত তার রুদ্ধর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। নিজের মনে রুদ্ধর কপালে ঠোঁট ছোয়ানোর ইচ্ছে জাগতেই রুদ্ধর কপালে গভীরভাবে ঠোঁট ছোয়াল। রুদ্ধর ঘুমন্ত মুখখানা দেখে আরু বলল,
– ‘ এখন ঘুমাচ্ছে দেখো যেন কত নিষ্পাপ, অথচ কাল রাতে তাকে একদম শেষ করে দিয়েছে। ‘রাতে তো ঘুমাতেও পারেনি কিছুক্ষণ আগেই চোখটা একটু লেগে এসেছিল শুধু।
নিচ থেকে শব্দ ভেসে আসছে হয়তো মা – চাচীরা উঠে পড়েছে। তারও এবার উঠা উচিত এসব ভেবে মেয়েটা বেড থেকে নামতে গেলেই রুদ্ধ তাকে বিছানায় ফেলে আরুর ওপরে উঠে গেল। ঘটনা এত দ্রুত ঘটেছে যে আরু বুঝতেই পারেনি কি থেকে কি হয়ে গেল। আরু চোখ বড় বড় করে রুদ্ধর দিকে তাকাল। বুকটা ধরফর করে কাঁপছে তার আকস্মিক ঘটনায় ভীষণ ভয় পেয়েছে মেয়েটা। রুদ্ধ তার দিকে ভ্রু উচিয়ে বলল,

– ‘ কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’
আরু আমতা আমতা করে বলল,
– ‘ ফ্রেশ হবো।’
– ‘ আমি ফ্রেশ করিয়ে দেব?’
আরু তড়িঘড়ি করে বলল,
– ‘ না না আমি পারবো।’
রুদ্ধ তার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেই হুট করে মেয়েটার ঠোঁট জোড়া আঁকড়ে ধরল। একেই তার ঠোঁটে প্রচুর জ্বালা করছে তার উপরে রুদ্ধর এহন স্পর্শে মেয়েটা ভীষণ ভীত হলো। রুদ্ধকে বাঁধা দিল। রুদ্ধ বিরক্ত হয়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে তাকিয়ে রইল। আরু তার মুখ দেখে বলল,
– ‘ এখন আবার শুরু করিয়েন প্লিজ। ‘
রুদ্ধ তা কথা শুনলে তো মেয়েটাকে পুনরায় নিজের করে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রুদ্ধর হাত শার্টের বোতাম যেতেই আরুর বোঝা হয়ে গেল এখন আর তার মুক্তি নেই।

ঘড়িতে এখন সকাল দশটার কাটায়। বাড়ির সকলেই উঠে পড়েছে। বাড়ির তিন জা সকলের জন্য নাস্তার আয়োজন করতে ব্যস্ত। আহি সোফায় বসে বসে ঝিমাচ্ছে। তার পাশে বসে রুহানি মোবাইল দেখছে। তাদের ঠিক বিপরীত পাশের সোফায় বসে ইয়াজ চা খাচ্ছে ও আহির ঝিমানো দেখছে। রুমা বেগম সবাইকে টেনে তুলেছে। বিয়ে বাড়িতে এতক্ষণ ঘুমানো উচিত নয়। রুহানিকে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত দেখে ইয়াজ গরম চায়ের কাপটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। একটু নিচু হয়ে বসে আহির এক আঙুল আলতো করে ধরে চায়ের কাপে ডুবিয়ে দিল। আহি আর্তনাদ করে উঠে বসল। ইয়াজ আবার নিজের জায়গায় বসে পড়ল। আহির চিৎকার শুনে রুহানি তড়িঘড়ি তারদিকে তাকাল,

– ‘ কি হয়েছে পাখি?’
– ‘ আঙুলে কেমন গরম ছ্যাঁকা লাগল। কথাটা বলেই তার চোখ গেল ইয়াজ আয়েশ করে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। আহি যা বোঝার বুঝে গেল। সোজা বসে বসে ইয়াজের দিকে কটমট করে চেয়ে বলল,
– ‘ তুমি আমার আঙুলে গরম ছ্যাঁকা দিয়েছো তাই না?’
ইয়াজ অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
– ‘ আমি কেনো তোকে ছ্যাঁকা দিতে যাব আশ্চর্য আমার কি খেয়ে দেয়ে আর কোনো কাজ নেই?’
– ‘ কাজ নেই তো, কাজ নেই বলেই তো এসব আজাইরা কাজ করে বেড়াও।’
– ‘ কি বললি আমি আজাইরা কাজ করি?’
ব্যাস এক কথায় দুই কথায় দুজনের মাঝে ঝগড়া লেগে গেল৷ রুহানি দুজনকে থামতে বললেও কারোর থামাথামির নাম নেই। রুহানি অতিষ্ট হয়ে দুজনের ঝগড়া দেখতে লাগল। তখনি মিতা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার হাতে দু কাপ চা ও বিস্কিট। আহিকে ইয়াজের সাথে এমন কোমর বেঁধে ঝগড়া করতে দেখেই ভদ্রমহিলা রেগে গেলেন। আহিকে এসেই এক ধমক লাগালেন,

– ‘ বড় ভাইয়ের মুখে মুখে ঝগড়া করছিস, দিন দিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস? আমি আর কখনো যেন না দেখতে পাই।’ আহি মুখটা লটকে বসে রইল। ইয়াজের মুখটাও চুপসে গেছে, বড় ভাই কথাটা তার একদমই ভালো লাগেনি। মিতা বেগম রুহানিকে বললেন চা বিস্কিট আরুদের ঘরে দিয়ে আসতে, ও তাদের নিচে নাস্তা করতে আসার জন্য বলতে। রুহানি মাথা নাড়িয়ে ট্রে হাতে নিয়ে উপরে উঠে গেল। মিতা বেগমও নিজের কাজে চলে গেল।
ইয়াজ আহির পাশের সোফায় গিয়ে বসে পড়ল। আহি তাকে দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিল। ইয়াজ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
– ‘ মাথাটা ভীষণ ধরেছে, কেউ কি চুলগুলোতে একটু হাত বুলিয়ে দিবে?’ আহির কোনো সারাশব্দ পাওয়া গেল না। ইয়াজ আবারোও বলল,
– ‘ ঠিক আছে কোনো ব্যাপার না, রুহা মেয়েটা ভীষণ ভালো আমার এক কথাতেই রাজি হয়ে যাবে। ইয়াজ উঠার ভান করতেই আহি তার হাত চেপে আবারোও বসিয়ে দিল। এরপ্র দুহাত দিয়ে ইয়াজের মাথার চুল টেনে দিতে লাগল। এত জোরে চুল টেনে ধরেছে যে ইয়াজের ব্যাথা দ্বিগুণ বেড়ে গেল। ইয়াজের অবস্থা বুঝতে পেরেই আহি নিজের হাত শীথিল করে ফেলল। ধীরে ধীরে চুল টেনে দিতে লাগল। ইয়াজও ভালো লাগায় সোফায় নিজের মাথা এলিয়ে দিল।

রুদ্ধর মিষ্টি অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে পেতে দশটা বেজে গেল। আরু শাওয়ার নিয়ে নিচের ভেজা চুলগুলো মুছসে তখন। আয়নায় নিজের গলার দিকে চোখ যেতেই চোখ দুটো বড়বড় করে ফেলল।ফর্সা গলায় ছোপ ছোপ লাল দাগ। এই জন্যই শাওয়ার নেয়ার সময় পুরো শরীর জ্বলছিল। লজ্জায় হাঁসফাস করে উঠল মেয়েটা। রুদ্ধ ওয়াশরুমে আছে, শাওয়ার নিচ্ছে। যাওয়ার আগে বিছানা পরিপাটি করে গুছিয়ে দিয়ে গেছে সে, সেটা দেখে মুচকি হাসল। রুহানি দরজা নক করতেই আরু মাথায় কাপড় দিয়ে গলা ও ভেজাচুলগুলো ভালোভাবে ডেকে দরজা খুলল। রুহানি তাকে দেখেই ভ্রু নাচিয়ে হেসে দিল। আরু লজ্জা পেল। রুহানি ঘরে উঁকি দিয়ে রুদ্ধকে দেখতে না পেয়ে ভেতরে এল। ট্রে টেবিলের ওপরে রেখে আরুকে ফিসফিসিয়ে বলল,

– ‘ কেমন কাটল ফাস্ট নাইট।’
– ‘ ভা..ভালো।’
– ‘ শুধু ভালো?’
– ‘ হু।’
– ‘ ভাইয়া কোনো গিফট দেয়নি?’
আরু অবুজ স্বরে বলল,
– ‘ কোন গিফটের কথা বলছো?’
– ‘ বাসর রাতে বউকে যে গিফট দিতে হয় জানিস না?’
– ‘ ওহ হ্যাঁ জানি তো, উনি হয়তো ভুলে গেছে, আমার জীবনের খুব মূল্যবান গিফট আমি পেয়ে গিয়েছি আপু আমার আর কিছুর প্রয়োজন নেই।’
– ‘ ওলেহহ বাবারেএ আমার আরুটা কত বড় হয়ে গেছে। পরপরই হেসে বলল,
– ‘ চা খেয়ে ভাইয়াকে নিয়ে নিচে আয় নাস্তা করতে হবে। ‘ আরু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। রুহানি বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আরু বেড এ বসে চায়ের কাপে বিস্কিট ডুবিয়ে মুখে নিল। তার ভীষণ ক্ষিদে পেয়ে গেছে। কাল সারাদিন নার্ভাস থাকার কারণে ঠিক করে খেতেও পারেনি। আরু চাপের কাপে একের পর এক বিস্কিট ডুবিয়ে মুখে দিচ্ছে, তক্ষনি রুদ্ধ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল। উদাম গায়ে শুধুমাএ টাওজার পড়া। চুলগুলো বেয়ে পানি পড়ছে। আরুর খাওয়া দেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল,

– ‘ খুব ক্ষিদে পেয়েছিল?’
– ‘ হুম ভীষণ, চা টা খেয়ে নিচে চলুন আমাদের ডাকছে।’
রুদ্ধ এক হাতে টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে আরুর দিকে এগিয়ে এল। চিন্তিত হয়ে মেয়েটার কপালে হাত ছুঁয়িয়ে বলল,
– ‘ বডিতে পেইন হচ্ছে।’
আরু আরষ্ট কন্ঠে বলল,
– ‘ হুম।’
– ‘ খাওয়া হলে পেইন কিলার দিব সেটা খেলেই ব্যাথা চলে যাবে।’
আরু মাথা নেড়ে চুপচাপ খেতে লাগল। রুদ্ধও তার পাশে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে আরুকে পর্যবেক্ষণ করছে। আরুর পরনে হালকা গোলাপি রঙের থ্রি পিস। দু হাতে সোনার চুড়ি, মাথায় ঘোমটা দেয়া দেখতে একদম পাক্কা বউ বউ লাগছে। রুদ্ধকে এভাবে চেয়ে থাকতে দেখে আরু লজ্জা পেল। উঠে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল,

– ‘ আপনি আসুন, আমি নিচে যাচ্ছি।’
রুদ্ধও উঠে দাঁড়াল সে সময়ে। আরুর হাত টেনে এক হাতে কোমর জরিয়ে ধরল। অন্যহাতে পকেট থেকে একটা বক্স বের করল। আরু তাকিয়ে তাকিয়ে রুদ্ধর কাজ দেখতে লাগল। বক্স খুলতেই খুব সুন্দর একটা হীরের আংটি বেরিয়ে এল। আরু খুব যত্ন করে আঙুলে পড়িয়ে দিল। আরুর দৃষ্টিতে অবাকতা ও মুগ্ধতা আংটিটা ভীষণ সুন্দর আরুর চোখ একদম জুরিয়ে গেল। রুদ্ধ মৃদ্যু হেসে বলল,
– ‘ এটা আমাদের ফাস্ট নাইটের গিফ্ট। এন্ড থ্যাংকস ফর ইয়েস্টারডে নাইট। বলেই চোখ মারল। কথাখানা বুঝতে পেরেই রুদ্ধকে ঠেলে সরিয়ে বিরবির করে বকতে বকতে নিচে চলে গেল।

ফারিশ, তুষার ও সাদমান কাল রাতে শেখ বাড়িতেই থেকে গিয়েছিল। সকলেই একসাথে নাস্তা করতে বসেছে।আরু তাদের ঠিক উল্টো দিকের চেয়ারে বসেছে। আরুকে বার বার হাই তুলতে দেখে সাদমান রুদ্ধর কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
– কিহ মামা কালকে কেমন ঘুম হলো।’
রুদ্ধ আরুরদিকে একপলক তাকিয়ে বলল,
– ‘ অসম্ভব ভালো, আশা করছি এখন থেকে এমন ভালো ঘুম রোজ রাতেই হবে।’
সাদমান ভ্রু কুঁচকে একবার আরুকে দেখল তো একবার রুদ্ধকে অনেকক্ষণ ধরে দুজনকে সূক্ষ্ণ নজরে পরোখ করার পর ছেলেটার চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। রুদ্ধর পিঠে চাপড় মেরে বলল,
– ‘ শালা তুই তো ভীষণ ধুরন্ধর। ভাব করো ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানো না, তলে তলে ঠিকই মাছের কাটাসহ খেয়ে নিলি?’
রুদ্ধ তার দিকে কটমট করে তাকাতেই ছেলেটা হায়-হুতাশ বাদ দিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিল।
আসলাম শেখ গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪০

– ‘ আরুর এখন পড়াশোনা নেই, এই ফাঁকেই ওকে নিয়ে একটু ঘুরে এসো।’ আজাদ শেখ ও একই কথা বললেন। রুদ্ধ সম্মতি দিল। তারও ইচ্ছে ছিল আরুকে নিয়ে কোথাও একটা ঘুরে আসবে। বেড়াতে যাবার কথা শুনেই আরুর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সে আর রুদ্ধ ভাই বেড়াতে যাবে এর থেকে আনন্দের খবর আর কি হতে পারে?

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here