তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪৩
আশফিয়া হিয়া
কক্সবাজারের প্রধান আকর্ষণ সমুদ্র সৈকত। সমুদ্রের ঢেউগুলো বারবার তীরে এসে আছড়ে পড়ছে , যেন হাজারো না বলা গল্প শুনিয়ে যায়। লবণাক্ত বাতাসে মিশে থাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, আর সূর্য যখন ধীরে ধীরে সাগরের বুকে হারিয়ে যায়, তখন পুরো আকাশ রঙিন ক্যানভাসে পরিণত হয়। পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত এই জায়গাটি শুধু একটি ভ্রমণস্থল নয়, বরং প্রকৃতির সৌন্দর্যের এক জীবন্ত ছবি। কক্সবাজারে সকলের পৌছাতে পৌছাতে বেলা গড়িয়ে রাত নেমে এল। সকলেই ভীষণ ক্লান্ত ছিল বিধায় খাওয়া – দাওয়া করেই ঘুমের রাজ্যে পারি জমিয়েছে। কারোরই হোটেল ঘুরে দেখার ইচ্ছে হয়নি।
সবমিলিয়ে চারটে রুম বুক করা হয়েছে। দুই কাপলের জন্য দুটি রুম, ইয়াজ সাদমান ও তুষারের জন্য একটি রুম এবং রুহানি আহি ও তিশার জন্য একটি রুম বুক করা হয়েছে।
ঘড়ির কাটায় এখন ভোর ৫ টার ঘরে। আরুকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা দিয়ে আরামসে ঘুমাচ্ছে রুদ্ধ। হঠাৎ মোবাইলের কর্কশ কন্ঠে কপালে ভাঁজ পড়ল তার। আরুর কোনো হুশ নেই সে ঘুমাতে ব্যস্ত। একের পর এক ফোণ বাজতে বিরক্ত হয়ে রুদ্ধ এবার উঠে বসল। আরুরদিকে এক পলক তাকিয়ে কল রিসিভ করেই গালি ছুঁড়ল। ওপাশ থেকে সাদমান পাল্টা গালি ছুঁড়ে বলল,
– ‘ হারামি এখনো ঘুমিয়ে আছিস, আমরা সবাই সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি তোদের জন্য সূর্যদোয় দেখতে যাব বলে।
রুদ্ধ আসছি বলে কল কেটে দিল। আরুর মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো স্বরে ডেকে তুলল। আরু চোখ – মুখ কুঁচকে বলল,
– ‘ এখন তো মাএ ভোর পাঁচটা বাজে এখন কেনো ডেকে তুললেন।’
– ‘ আমরা সূর্যদোয় দেখতে যাব, সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নে।’
আরু ঘুমে জড়ানো কন্ঠে বলল,
– ‘ আগে আপনি জান এরপর আমি যাচ্ছি।’ রুদ্ধ ঠিক আছে বলে চলে গেল ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে আসতেই দেখল আরু আবারও ঘুমিয়ে পড়েছে। রুদ্ধ তার হাত ধরে টেনে তুলল। আরু চোখ খুলেই তাকাতে পারছে না, চোখ দুটো পিটপিট করে খুলে আবারও বন্ধ করে নিচ্ছে। তার অবস্থা দেখে রুদ্ধ ফিক করে হেসে দিল। আরুর হাত ধরে তাকে ওয়াশরুমের বেসিনের সামনে নিয়ে গেল। কল চালু করে পানির জাপটা দিতেই আরুর হুশ ফিরল। চোখ দুটো অনেক কষ্টে খুলে ফ্রেশ হয়ে নিল।
হোটেল থেকে বেরোতেই দেখল সবাই আগে থেকেই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। রুদ্ধদের আসতে দেখেই ফারিশ তুষার এক চোট গালাগালি দিল। রুদ্ধ চোখ রাঙাতেই দুজনেই চুপ হয়ে গেল। আরু রুহানিদের সঙ্গে মিশে গেল। আরু আহিকে বলল,
– ‘ কাল রাতে ঘুম কেমন হয়েছে?’
– ‘ দারুণ এত নরম বিছানা আমার তো ঘুমই ভাঙতে চাচ্ছিল না এই ইয়াজের বাচ্চা আমাদের রুমে গিয়ে আমাকে টেনে তুলেছে।’
পাশ থেকে ইয়াজ বলল,
– ‘ গাঁধারা ঘুরতে এসেছিস নাকি ঘুমাতে এসেছিস, ঘুমাতে তো বাড়িতেও পারবি তবে এখানের সৌন্দর্য সেখানে পাবি না।’ আহি ভেংচি কেটে মুখ ঘুরিয়ে নিল৷ ইয়াজের কথায় যুক্তি আছে তাই আহি আর কিছু বলল না।
তাদের হোটেলটি সমুদ্রের একদমই কাছেই। বেলকনি থেকে সম্পূর্ণ হোটেলের ভিউ পাওয়া যায়। তাই সমুদ্রের নিকট পৌছাতে খুব একটা সময় লাগেনি। সমুদ্রের তীরে পৌছাতেই সকলের চোখে – মুখে একরাশ মুগ্ধতা এসে ভীর করল। ভোরের আলো সবেমাএ ফুটতে শুরু করেছে। ভোরের আলো ফুটতেই সমুদ্র যেন নতুন রূপে সেজে উঠল। পূর্ব দিগন্তে লাল আভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মুহূর্তের মাঝেই সমুদ্রের বুক চিরে সোনালি সূর্য মাথা তুলে দাঁড়াল। সূর্যের প্রথম কিরণ নীল জলের ওপর পড়ে চারদিকে আলো ছড়িয়ে দিল, যেন হাজারো হীরের টুকরো ভেসে আছে ঢেউয়ের বুকে। কিছু দূরে জেলেদের নৌকা ও সীগালের উড়াউড়ি সকালের দৃশ্যকে আরও অনেক বেশী মুগ্ধক করে তুলল। স্নিগ্ধ বাতাস, ঢেউয়ের মৃদু শব্দ আর উদীয়মান সূর্যের সৌন্দর্যে তাদের সকলের নিকট এই ভোর যেন এক অপার্থিব সৌন্দর্য ও শান্তির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল।
সকলের মুখ থেকেই ওয়াও শব্দটা বেরিয়ে এল। সাদমান তৎক্ষনাৎ তাদের এই সুন্দর মুহুর্তটুকু ক্যামেরায় বন্দি করে নিল।
সূর্যদয় দেখেই সকলে আবারও হোটেলে ফিরে এসেছে। রুদ্ধ বেলকনিতে কফি নিয়ে পরিবেশটা উপভোগ করছে। আরু কিছুক্ষণের জন্য রুহানিদের রুমে গিয়েছিল। রুদ্ধকে বেলকনিতে দেখতে পেয়ে সে পা টিপে টিপে বেলকনিতে গিয়ে রুদ্ধকে পেছন থেকে দু হাত দিয়ে জাপটে ধরে পিঠে মুখ গুজে দিল। রুদ্ধ একটুও চমকাল না সে একদম স্বাভাবিক ভাবেই কফি মগে চুমুক দিতে দিতে মুচকি হাসল। রুদ্ধর কোনো সারাশব্দ না পেয়ে আরু তার পিঠে মুখ ঘোষল। এবারও রুদ্ধর রেসপন্স না পেয়ে আরু রেগে গেল রুদ্ধর পিঠে কাম*ড় বসিয়ে দিল। রুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে তার দিকে ফিরতেই আরু কোমরে হাত ঠেকিয়ে বলল,
– ‘ আমি এসেছি আপনি দেখছেন না?’
– ‘ হুহ
আরু অবাক হয়ে বলল,
– ‘ দেখেছেন তো সারা দিচ্ছিলেন না কেনো?’
রুদ্ধ কাঁধ উঁচিয়ে বলল,
– ‘ ইচ্ছে হয়েছে তাই। ‘
– ‘ ঠিক আছে আমিও চলে যাচ্ছি আর আসবো এই রুমে।’
আরু চলে যাওয়ার ভান করতেই রুদ্ধ তার হাত ধরে বেলকনির রেলিং এ চেপে ধরল। আরুর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,
– ‘ লাভ বাইট দেয়া শিখে গিয়েছিস?’
– ‘ কো.. কোথায়?’
রুদ্ধ নিজের পিঠের টি শার্ট উঁচু করে আরুর দিকে পিঠ ফিরিয়ে দেখাল। দেখা মাএই আরু লজ্জায় হাঁসফাঁস করে উঠল। রুদ্ধের পিঠের বিভিন্ন জায়গায় তার দেয়া লাভ বাইটের চিহ্ন। রুদ্ধ এবার আরুর দিকে ঘুরে ভ্রু নাচাল। আরু মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলল,
– ‘ আপনার থেকেই তো শিখেছি।’
– ‘ আমার থেকে?’
আরু গলার ওড়নাটা সরিয়ে দিয়ে বলল,
– ‘ এসব কি?’
রুদ্ধ হেসে তাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। আরুর গলায় সাইড করতে করতে বলল,
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৪২
– ‘ দাগগুলো কেমন হালকা হয়ে যাচ্ছে না? এরমানে দাগগুলো আবারও গাঢ় করার সময় এসে গিয়েছে। ‘ আরু আঁতকে উঠে রুদ্ধ ঠেলে সরিয়ে ঘরের দিকে দৌড় লাগল। রুদ্ধ তার হাত ধরতে গিয়েও পারল না উল্টে আরুর সম্পূর্ণ ওড়না তার হাতের মুঠোয় চলে এল। রুদ্ধ ওড়না ডিভানের ওপরে ফেলে আরুর পেছনে ছুটল। পালানোর জায়গা না পেয়ে আরু বেডের ওপরে উঠে এক কণায় দাঁড়িয়ে পড়ল। রুদ্ধ বেডের একপাশে দাঁড়িয়েই আরুর পা ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। মুহুর্তের মাঝেই মেয়েটা বেডে পড়ে গেল রুদ্ধও তার ওপরে উঠে গেল। রুদ্ধ চোখ টিপ মেরে বলল,
– ‘ আমার থেকে পালানো তোর সাধ্যের বাইরে বুঝেছিস পিচ্চি?’ বলেই আরুর গলায় মুখ ডুবিয়ে মেয়েটাকে নিজের সঙ্গে চেপে ধরল।
