Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪১

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪১

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪১
নওরিন মুনতাহা হিয়া

মাথায় চাপ প্রয়োগ করার পর বেশ দীর্ঘক্ষণ পর মেঘের মনে পড়ে ফারহানের কথা। ফারহান চৌধুরী এই নাম সে আগে শুনেছে। বাংলাদেশে থাকাকালীন সময় জামান সাহেব প্রায়ই তার প্রিয় বন্ধুর কথা বলত, মাঝে মধ্যে ওরার ছেলের প্রশংসা করত। জামান সাহেবের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর একমাত্র ছেলের নাম ফারহান! মেঘ কথাটা মনে মনে ভেবে আতঙ্কে উঠে তবে কি তার বড় আব্বু যার সাথে তার বিয়ে ঠিক করেছে ও কি এই ফারহান! মেঘের মাথায় হাত পড়ল, সর্বনাশ হয়ে গেছে!

বড় আব্বু কাল ফোনে বলেছিল ওনার বন্ধুর ছেলে আমেরিকায় অবস্থান করছে! তবে কি ফারহানের কথা বলছিল? এমনি মেঘের জীবনে অশান্তি আর প্রবলেমের শেষ নাই এখন নতুন বিপদ হয়ে এই ফারহান এসেছে! আদ্রিয়ান হয়ত এখন ও জানে না তার বউ মালিহা হলো মেঘ। কিন্তু যদি এখন ফারহান তার পরিচয় দিয়ে দেয় তবে নিশ্চয়ই আদ্রিয়ান সব জেনে যাবে! আর ফারহানের সাথে মনে হয় কখন আদ্রিয়ানের দেখা হয়নি। আদ্রিয়ান যে জামান সাহেবের ছেলে আর মেঘের স্বামী তা মনে হয় ফারহান জানে না। যদি একবার আদ্রিয়ানের আসল পরিচয় ফারহান জেনে যায় তবে সবকিছু বড় আব্বুকে বলে দিবে। তখন বড় আব্বু হয়ত দুইদিনের মধ্যে ডিভোর্স পেপার রেডি করে আমেরিকায় চলে আসবে! না মেঘ এখনই এইসব ঝামেলা চাই না।
আদ্রিয়ানের প্রশ্ন শুনে ফারহান এগিয়ে এসে তেজদীপ্ত কণ্ঠে বলে উঠে

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“ মেঘ আমার কারণ আমি মেঘের হবু—”
ফারহান কথা শেষ করার আগেই মেঘ থামিয়ে দেয় আর দ্রুত বলে উঠে
“ফারহান আপনার পরিচয় আমার মনে পড়ে গেছে। আমি আর আপনি তো পূর্ব পরিচিত?”
মেঘের কথা শুনে ফারহান খুশি হয়ে যায়! ফারহানের রাগী আর তেজী কণ্ঠে ধীরে ধীরে শীতল হয়ে যায়। ফারহান হাসি মুখে মেঘের দিকে তাকিয়ে বলে
“মেঘ‚ তুমি সত্যি আমাকে চিনতে পারছ মেঘ? তুমি জানো আমি কে?”
মেঘ সম্মতি জনক মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর প্রদান করল
“হুম জানি।”

মেঘ আর ফারহানের কথার মানে এখন অবধি আদ্রিয়ান বুঝতে পারল না।ফারহান মেঘের পূর্ব পরিচিত! কিন্তু কে এই ফারহান? আর এতো মেঘের প্রতি এতো অধিকার কি করে দেখাচ্ছে? ফারহানের আসল পরিচয় জানার প্রয়োজন আদ্রিয়ানের। মেঘের সাথে কি সম্পর্ক এই ফারহানের? আদ্রিয়ান পুনরায় ফারহানকে কোন প্রশ্ন করতে যাবে‚ কিন্তু এর আগেই মেঘ থামিয়ে দেয় আর দ্রুত ফারহানকে অনুরোধ করে বলে
“ফারহান‚ এখন কলেজ গাউনে অবস্থান করছি আমরা। সবাই তাকিয়ে দেখছে আমাদের। আপনি মঞ্চে যান ‚ আমি আসছি।”

“কিন্তু মেঘ‚ তোমার সাথে আমার প্রয়োজনীয় কথা আছে! তুমি ও চলো না মঞ্চে একসাথে যায়।”
ফারহানের কথায় মেঘ বিরক্ত বোধ করল তবুও বাধ্য জয়ে হাসি মুখে বলল
“আপনি আগে মঞ্চে যান। আমি পরে আসছি।”
পিছনে থাকা ছাত্র ছাএীদের ডাক দিল মেঘ তাদের বলল ফারহানকে মঞ্চে নিয়ে যেতে। ফারহান আর কথা বাড়ায় না সে পা বাড়ায় মঞ্চের দিকে। ফারহান চলে যেতেই মেঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল কিন্তু ঠিক তখনই হঠাৎ করে পিছন থেকে শক্ত করে মেঘের হাত চেপে ধরল আদ্রিয়ান। খুব শক্ত করে চাপ প্রয়োগ করায় মেঘ ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠল
“আহ্‚ আদ্রিয়ান স্যার ছাড়ুন। ব্যাথা করছে আমার হাতে।”

—– মেঘের ব্যাথাতুর আত্মানাথ আদ্রিয়ানের কান অবধি পৌঁছায় না! তার শরীর এখন রাগে আগুনের ন্যায় জ্বলছে। আদ্রিয়ান তার হাতের বাঁধনে খুব শক্ত করে মেঘের বাহুদ্বয় আঁকড়ে ধর ‚এরপর মৃদু টান দিয়ে তার কাছে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। মেঘ আর আদ্রিয়ান খুব কাছাকাছি থাকায় দুইজনের শরীর স্পর্শ করল ‚ একে অপরের সাথে। মেঘের শরীরের শীতল ছোঁয়ায় আদ্রিয়ানের রাগের পরিমাণ একটু কমে যায় ‚ কিন্তু শেষ হয়ে যায় না। আদ্রিয়ান বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠে

“আমি তোমার হাত ধরলে খুব ব্যাথা লাগে তাই না! অথচ প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে ফারহান তোমার হাত ধরেছিল ‚ কোথায় তখন তো ব্যাথা লাগেনি? হাত ছাড়ুন ফারহান? এই শব্দটা মুখ দিয়ে উচ্চারণ হয়নি! তবে এখন কেন হচ্ছে? কে হয় এই ফারহান তোমার মেঘ? উত্তর দাও কি সম্পর্ক তোমার আর ফারহানের? আই নিড আনসার মেঘ?”
আদ্রিয়ান বেশ জোরে উচ্চ শব্দে মেঘকে প্রশ্ন করছিল। ভাগ্যক্রমে আশেপাশে এখন কোন ছাএ ছাএী নাই ‚ সকলে প্রধান অতিথি আর অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু যদি কোন ছাএ ছাএীর নজর তাদের দুইজনের উপর পড়ে তখন কি হবে? মেঘ তার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে তার বাহুদ্বয় থেকে আদ্রিয়ানের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তার চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়‚ আদ্রিয়ানের শক্তির তুলনায় তার শক্তি খুব সামান্য বলে প্রমাণিত হয়। মেঘ বেশ বিরক্তি নিয়ে আদ্রিয়ানের কথার উত্তর দিল

“ফারহান আমার কি হয়? তা প্রশ্ন করার অধিকার কে দিয়ে আপনাকে ‚আদ্রিয়ান স্যার? আপনি কে হন আমার?
আমার আর আপনার মধ্যে কি সম্পর্ক রয়েছে বলুন?”
মেঘের এমন পাল্টা প্রশ্নে যেন আদ্রিয়ানের রাগের পরিমাণ দিগুণ হয়ে যায়। মেঘের বাহুদ্বয়ে শক্ত চাপ করে তার বাহু চেপে ধরে রাগী কণ্ঠে বলে
“আমার তোমার প্রতি কি অধিকার আছে তা তুমি জানো না মেঘ? তুমি কে হও আমার? তা কি নতুন করে বলতে হবে আমার?”
আদ্রিয়ানের কথার উত্তরে মেঘ পুনরায় বলে
“হুম‚ বলতে হবে? কে হয় আমি আপনার? কি অধিকার রয়েছে আমার প্রতি আপনার?”
মেঘ করা প্রশ্ন আদ্রিয়ানের রাগের আগুনে ঘি ঢালার মতো ছিল! আদ্রিয়ান দাঁত কটমট করে বলে

“কারণ তুমি আমার ব — ”
আদ্রিয়ান সম্পূর্ণ কথা উচ্চারণ করল না‚ বা ইচ্ছা করেই উচ্চারণ করতে চাইল না! রাগের মাথায় কি বলে ফেলছিল তা সে বুঝতে পারে। কিন্তু মেঘ আদ্রিয়ানের সম্পূর্ণ কথা বলার অপেক্ষা রইল‚ আদ্রিয়ানের চুপ হয়ে যাওয়া দেখে মেঘ বলল
“বলুন‚ আদ্রিয়ান স্যার কে হয় আমি আপনার? উত্তর দেন?”

কিন্তু তবুও আদ্রিয়ান আর কোন উত্তর দিল না। তার অসম্পূর্ণ কথাটা আর পূর্ণ করল না‚ বরং তার রাগ নিয়ন্ত্রণ করল দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ল। বেশ কিছুক্ষণ পর তার হাতের বাঁধন থেকে মেঘের বাহুদ্বয় মুক্ত করল‚ মেঘ এখন উৎসুক দৃষ্টিতে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে! আদ্রিয়ান শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে মেঘকে শাসিত কণ্ঠে বলে উঠে
“মেঘ‚ এই আদ্রিয়ান রোদায়ান কখন ও নিজের জিনিস অন্য কারো সাথে ভাগ করে না। যা আমার তা শুধুমাএ আমার। তুমি আমার মেঘ‚ তোমার ছোঁয়ার অধিকার ‚ ভালোবাসার অধিকার‚ সব শুধু আমার থাকবে। এরমধ্যে অন্য কারো ভাগ হবে না। তাই ফারহানের থেকে দূরে থাকবে! আর না হলে আজীবনের জন্য ফারহানকে হারাবে! চয়েজ ইজ ইউরস মেঘ?”

আদ্রিয়ানের শান্ত কণ্ঠের হুমকি শুনে মেঘ অবাক করা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। তখনই কলেজ গাউনে উপস্থিত হয় নূহা! মেঘ আর আদ্রিয়ান উভয়কে একে অপরের কাছাকাছি অবস্থান করতে দেখে বেশ অবাক হয়! তাদের দুইজনের মধ্যে দুরত্বর পরিমাণ খুব সামান্য। নূহা এগিয়ে আসে মেঘের কাছে ‚ এরপর বলে
“মেঘ‚ তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কি করছ? ফারহান স্যার তোমায় ডাকছে? তাড়াতাড়ি যেতে বলছে তোমাকে তার কাছে।”

ফারহানের নাম শুনে আদ্রিয়ানের দমে থাকা রাগ দিগুণ বেড়ে যায়। রাগে দাঁত কটমট করে তাকায় মেঘের দিকে! কিন্তু মেঘ যথেষ্ট শান্ত আর স্বাভাবিক কণ্ঠে পাশে থাকা নূহার কথার উত্তর দেয়
“হুম নূহা‚ চলো ফারহান স্যারের কাছে যাব আমি।”
মেঘের কথার ধরণ আদ্রিয়ান বুঝতে পারল! যদি এখন নূহা তাদের দুইজনের সামনে না থাকত। তবে হয়ত মেঘকে খুন করে ফেলত! খুন না করলে ও ‚ মেঘের দুই গালে ঠাট্টিয়ে দুইটা থাপ্পড় দিত। অতিরিক্ত সাহস হয়েছে মেঘের! খুব শখ না নিজের স্বামী রেখে অন্য পুরুষের কাছে যাওয়ার! একবার অনুষ্ঠান শেষ হলে বাড়িতে শুধু যাক ‚ এরপর বুঝাবে আদ্রিয়ান রোদায়ান কি জিনিস!
আদ্রিয়ান রাগ তার চোখ মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠছে। কিন্তু মেঘ তা দেখে ভয় পেল না বরং সে আদ্রিয়ানের রাগের পরোয়া না করে! মঞ্চে যাওয়ার উদ্দেশ্য নূহার সাথে পা বাড়ায়। আদ্রিয়ান রক্তিম চোখে মেঘের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

কলেজের নবীন বরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। সকল ছাএ ছাএী ট্রুলে বসে স্টেজর উপর মনোযোগ সহকারে দৃষ্টি রাখে। ফারহান চৌধুরী প্রধান অতিথি ‚ তবে ওনি ছাড়া আরো বেশ কয়েকজন অতিথি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছে! সকল অতিথিদের এখন পুষ্পস্তবক দিয়ে বরণ করা হবে। যার জন্য পাঁচ থেকে সাত জন শিক্ষার্থী সিলেক্ট করা হয়েছে এবং তাদের হাতে গোলাপ ফুলের তুরা রয়েছে। আর এই শিক্ষার্থীর মধ্যে মেঘ ও উপস্থিত ছিল। তার হাতে গোলাপ ফুল রয়েছে!

রঙিন আলোর ঝলমলে মঞ্চে উঠে আদ্রিয়ান ডান পাশে রাখা মাইকের কাছে যায়। উপস্থিত সকল অতিথিকে পুষ্প সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য ছাএ ছাএীর উদ্দেশ্য ঘোষণা দিয়ে বলে
“অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল অতিথিকে প্রথমে পুষ্প সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য ছাএীরা সকলে ফুল নিয়ে এগিয়ে আসেন। এরপর এক এক করে সকলে অতিথির হাতে ফুল দিয়ে তাদের বরণ করেন।”
আদ্রিয়ান একজন একজন করে স্টুডেন্টর নাম বলে আর তারা দিয়ে অতিথিদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়। কিন্তু সবার শেষে যখন প্রধান অতিথি মানে‚ ফারহান চৌধুরী কে বরণ করার সময় আসল। তখন পুনরায় খাতায় লেখা শিক্ষার্থীর নাম দেখল। খাতায় স্পষ্ট মেঘের নাম ভেসে উঠল। আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায় খাতায় লেখা মেঘের নামের দিকে। তার মানে কি ফারহান চৌধুরীকে গোলাপ ফুল দিয়ে মেঘ বরণ করবে!

আদ্রিয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল খাতার উপর থেকে চোখ সরিয়ে সামনে ফারহানের দিকে তাকাল। ফারহান স্টেজে ঘটা অনুষ্ঠানের দিকে না তাকিয়ে ‚ খুব মনোযোগ সহকারে মেঘকে দেখে যাচ্ছে! ফারহানের মেঘের উপর মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে আদ্রিয়ানের শরীর রাগে‚ হিংসায় জ্বলে উঠে। খুব কষ্টে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে কারণ এখন অনুষ্ঠান চলছে! এখানে কোন প্রকার সিনকিয়েট করতে চাই না! প্রিন্সপাল স্যার খুব ভরা করে সমগ্র অনুষ্ঠানের দায়িত্ব আদ্রিয়ানকে দিয়েছে। নিজের ব্যক্তিগত কারণের জন্য কলেজের সম্মান নষ্ট করতে চাই না আদ্রিয়ান। তাই বাধ্য হয়ে খাতায় থাকা মেঘের নাম ঘোষণা করে। ফারহান চৌধুরীকে ফুল দিয়ে বরণ করার আর্দেশ দেয়।মেঘ ধীর পায়ে এগিয়ে যায় ফারহান চৌধুরীর কাছে এরপর মুখে মিষ্টি হাসি বজায় রেখে তার হাতে থাকা ফুল দেয় ফারহানকে। ফারহান ট্রুলে বসে থাকা অবস্থায় থেকে উঠে দাঁড়াল এরপর মেঘের হাত থেকে ফুল নেয়। অনুষ্ঠানের সকলে হাততালি দিয়ে উঠে! মেঘের মুখের হাসি আর ফারহানের তাকিয়ে থাকা সবকিছু আদ্রিয়ান মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেখছে। রাগে শরীর কাঁপতে থাকে তার ‚ দাঁত কটমট করে তাকায় দুইজনের দিকে।
মেঘ যখন ফারহানের হাতে ফুল দিয়ে চলে আসতে যাবে। তখন ফারহান পিছন থেকে মেঘকে ডাক দেয়

“মেঘ‚ একটু দাঁড়া ও।”
পিছন থেকে ফারহানের ডাক শুনে মেঘ আবার ঘুরে সামনের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। মেঘ জিজ্ঞেস করে
“কি হয়েছে ফারহান স্যার? হঠাৎ দাঁড়াতে বললেন কেন?”
মেঘের প্রশ্ন শুনে ফারহান তার হাতে থাকা ফুলের তুরা থেকে একটা গোলাপ তার আঙুলের ভাঁজে নিয়ে নেয়। এরপর একটু এগিয়ে দিয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলে
“মেঘ‚ তোমার সাজসজ্জায় অপূর্ণ থেকে যায় শুধুমাএ একটা ক্ষুদ্র জিনিসের জন্য?”
ফারহানের প্রশ্ন শুনে মেঘ বেশ অবাক হয়ে বলে
“কি জিনিস?”

ফারহান তার হাত বাড়িয়ে মেঘের কপাল স্পর্শ করে এরপর মেঘের কপালে জমা বাবড়ি চুল কানের পিঠে গুঁজে দেয়। আর তার আঙুলের ভাঁজে রাখা গোলাপ ফুল ‚ মেঘের কানের উপরে থাকা চুলের উপর গেঁথে দেয়। মেঘ ফারহানের এমন ব্যবহারে অবাক হয় আর ভয় ও পায়। কারণ উপরে মঞ্চে আদ্রিয়ান দাঁড়িয়ে রয়েছে। মেঘ অন্য পাশে ঘুরে থাকায় আদ্রিয়ানের মুখ দেখতে পাচ্ছে না এখন সে! ফারহান বলে
“এখন পারফেক্ট লাগছে তোমায় মেঘ।”
আদ্রিয়ানের ভয়ে মেঘের মুখ দিয়ে কোন শব্দ উচ্চারণ হয় না। কিন্তু তবুও সৌজন্য রক্ষায় বলে
“ধন্যবাদ ফারহান স্যার। আমি এখন আসি।”

ফারহানকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মেঘ দ্রুত পিছন দিকে ঘুরে সেখান থেকে চলে আসে। আদ্রিয়ান মঞ্চে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল! ফারহানের ব্যবহার এখন তার সয্য সীমানার বাহিরে চলে গেছে। আদ্রিয়ান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে! আদ্রিয়ান মনে মনে বলে
“ফারহান‚ আর একবার শুধু তুই আমার বউয়ের গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে দেখ। তোকে যদি আমি খুন না করে ফেলি তবে আমার নাম আদ্রিয়ান রোদায়ান না।”
[ ওহ্ বেচারা আদু বেইবি জেলাস]

নবীন বরণ অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে সকল ছাএ ছাএীরা আনন্দ করছে। মঞ্চে গান‚ নাচ ‚পারফর্ম করা হচ্ছে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলের মনোযোগ এখন স্টেজের উপর। ফারহান বেশ মনোযোগ সহকারে অনুষ্ঠান উপভোগ করছে তার চোখ বারবার মেঘকে খুঁজে যাচ্ছে। কিন্তু মেঘ আশেপাশে কোথাও নাই বিধায় চুপচাপ চেয়ারে বসে থাকল।

কলেজের করিডরে দাঁড়িয়ে মেঘ দূর থেকে অনুষ্ঠান দেখে যাচ্ছে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকার প্রধান কারণ ফারহান। মেঘ জানে যদি সে অনুষ্ঠানের জায়গায় উপস্থিত থাকে তবে সবসময় ফারহান তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আর এই নিয়ে আদ্রিয়ান রাগ করবে! তাছাড়া কলেজের অন্য শিক্ষার্থীরা ফারহান আর মেঘকে নিয়ে সন্দেহ করতে পারে! শুধু শুধু অহেতুক ঝামেলা এখন মেঘ চাই না। মেঘের এখন ও আদ্রিয়ানের সাথে ডিভোর্স হয়নি‚ সে এখন ও বিবাহিত! একজন বিবাহিত নারীর এমন করে পরপুরুষের সাথে কথা বলা উচিত নয়।

মেঘ দূরে দাঁড়িয়ে থাকার পর ও তার চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। যার প্রধান কারণ হল তার শাড়ি। মেঘের পড়নে থাকা লাল শাড়ি সুতির নয় বরং সিল্কের তৈরি‚ যার ফলে শাড়ির কুঁচি গুলো বারবার খুলে যাচ্ছে! মেঘ বারবার শাড়ির কুঁচি কোমড়ে খুঁজে দিচ্ছে ‚ কিন্তু প্রতিবার খুলে যাচ্ছে। মেঘ বেশ বিরক্ত হয়। এখন শাড়ির কুঁচি ঠিক না করলে যেকোন সময় খুলে যাবে! আর এতগুলো মানুষের মধ্যে যদি শাড়ি খুলে যায় তবে বিষয়টা সত্যি খুব লজ্জাজনক হবে।

কলেজ গাউনে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ান প্রিন্সিপাল সহ অনান্য টির্চারদের সাথে কথা বলছিল। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন খরচ‚ খাবার ‚ প্রোগ্রাম নিয়ে ‚ কথা বলার মাঝে দূরে করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘকে লক্ষ্য করছিল আদ্রিয়ান। মেঘ তার শাড়ির কুঁচি ঠিক করার উদ্দেশ্য ফাঁকা এক রুমের ভিতরে চলে যায়। আদ্রিয়ান তা দেখল! মেঘ হঠাৎ ক্লাস রুমে কেন গেছে? আদ্রিয়ান যখন মেঘের কথা ভাবছিল তখন হঠাৎ পাশে থাকা প্রিন্সিপাল বলে উঠে
“আদ্রিয়ান‚ অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে চলো সেখানে যায়।”
“স্যার আপনারা যান। আমি এখুনি আসছি।”
“ওকে দ্রুত চলে এসো।”

প্রিন্সিপাল সহ অনান্য টির্চারা সকলে মঞ্চের দিকে অগ্রসর হয়। মেঘ কোথায় গিয়েছে তা দেখার জন্য আদ্রিয়ান কলেজ গাউন পেরিয়ে করিডরের দিকে এগিয়ে যায়।
ফাঁকা ক্লাস রুমে প্রবেশ করে মেঘ। সকল শিক্ষার্থী এখন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকায় ক্লাস রুম সম্পূর্ণ ফাঁকা। মেঘ তার শাড়ির কুঁচি ঠিক করার জন্য প্রথমে তা খুলে ‚ এরপর ধীরে ধীরে কোমড়ে গুজার চেষ্টা করে। কিন্তু শাড়ির নিজের কুঁচি এলেমেলো হয়ে যায় আর সিল্কের শাড়ি পড়ার অভ্যাস মেঘের নাই। বাংলাদেশ থেকে খুব সামান্য পরিমাণে আবিহার উপলক্ষে শাড়ি কিনে নিয়ে এসেছিল! তাই লাল কোন সুতির শাড়ি না থাকায় বাধ্য হয়ে এই সিল্কের শাড়ি পড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু এখন এই শাড়ির কুঁচি বারবার খুলে যাচ্ছে।
মেঘের একা দ্বারা এই শাড়ি পড়া অসম্ভব! অন্য একজনের সাহায্য প্রয়োজন তার। মেঘ শাড়ির কুঁচি হাত দিয়ে ধরে নূহাকে ডাক দেওয়ার উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। কিন্তু তখনই রুমের দরজা খুলে প্রবেশ করে আদ্রিয়ান। হঠাৎ আদ্রিয়ানকে দেখে মেঘ থমকে বা ভয় পেয়ে যায় তার হাতে থাকা শাড়ির কুঁচি ছুটে যায়। শাড়ির নিচের অংশ মেঝেতে পড়ে যায়‚ মেঘ বলে

“আদ্রিয়ান স্যার‚ আপনি এখানে কি করছেন?
মেঘের কথার উত্তর না দিয়ে আদ্রিয়ান উল্টো তাকে একই প্রশ্ন করে উঠে
“মেঘ‚ তুমি এখানে কি করছ? এই ফাঁকা ক্লাস রুমে! একা একা এসেছ কেন?”
“আমার শাড়ির কুঁচি খুলে গিয়েছিল তাই এসেছি ঠিক করতে।”
মেঘের মুখে শাড়ির কথা শুনে আদ্রিয়ান তার শাড়ির দিকে তাকায়। মেঘ নিজে ও তাকায়! মেঘের নিচের শাড়ির কুঁচি মেঝেতে পড়ে আছে তার পেটের কিছু অংশ উন্মুক্ত হয়ে গেছে। যা দেখে মেঘ দ্রুত তার শাড়ির কুঁচি ধরে হাতে গুটিয়ে নেয়‚ আদ্রিয়ান হয়ত নিজে ও অসস্তি বোধ করল। তাই সে বলে

“মেঘ‚ তুমি শাড়ির কুঁচি ঠিক করে রুমে থেকে বের হও। আমি বাহিরে অপেক্ষা করছি।”
আদ্রিয়ান যখন কথাটা বলে রুম থেকে বের হয়ে যাবে তখন পিছন থেকে মেঘ বলে উঠে
“আদ্রিয়ান স্যার‚ আমি একা শাড়ি পড়তে পারব না। তাই দয়া করে একটু নূহাকে ডাক দিয়ে দিবেন?”
“কিন্তু মেঘ। নূহা এখন স্টেজে ডান্স করবে ও কি করে আসবে?”
আদ্রিয়ানের কথা শুনে মেঘের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে! এখন সে কি করবে? নূহা ছাড়া আর কে তাকে সাহায্য করবে? মেঘের বিচলিত মুখ দেখে আদ্রিয়ান বলে উঠে
“মেঘ‚ আমি তোমায় সাহায্য করব কি?”
আদ্রিয়ানের কথা শুনে মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলে
“কি আপনি কি করে শাড়ি পড়াতে সাহায্য করবেন?

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪০

অনুষ্ঠানে মঞ্চে ফারহান বেশ অনেক সময় ধরে বসে ছিল। কিন্তু কোথাও মেঘকে দেখতে না পায়ে সে বিচলিত হয়! কোথায় চলে গেছে মেঘ? ফারহান পাশে থাকা একজন ছাএীর কাছ থেকে জানতে পারে মেঘ কলেজের করিডরে দাঁড়িয়ে ছিল। ফারহান ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে কলেজ করিডরে মেঘের কাছে যায়।
কিন্তু করিডরে মেঘ বা আদ্রিয়ান কাউকে খুঁজে না পেয়ে। ফারহান আশেপাশে খুঁজতে থাকে। হঠাৎ এক ফাঁকা রুম থেকে কোন আওয়াজ শুনে ফারহান সেখানে যায়। দরজা খোলা দেখে ফারহান ভিতরে প্রবেশ করে বলে
“মেঘ?”

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪২

1 COMMENT

Comments are closed.