Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৫

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৫

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৫
নওরিন মুনতাহা হিয়া

কাঁপা কাঁপা হাতে মেঘ আদ্রিয়ানের গালে হাত ছুয়াঁয়। সারা শরীর বরফ পাথর খণ্ডের ন্যায় ঠান্ডা যেন কোন মৃত ব্যক্তির শরীরের তাপমাত্রা। মেঘের কলিজা কেঁপে উঠে অজানা ভয়ে মন আঁতকে উঠে কণ্ঠে জড়তা নিয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে বলে উঠে
“আদ্রিয়ান ! কথা বলুন। আদ্রিয়ান? আপনার হাতে রক্ত কেন? আদ্রিয়ান।”
মেঘের কণ্ঠ স্বর শুনে আদ্রিয়ানের মুখের আদলে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। দুই চোখ বন্ধ করে শরীর ছেড়ে দিয়ে বাথ টবে নিথর দেহ পড়ে রইল। মেঘের সারা শরীর অজানা ভয়ে কেঁপে উঠে। আদ্রিয়ান কথা বলছে না কেন? মেঘ একটু এগিয়ে গিয়ে বাথ টবে থাকা আদ্রিয়ানের কাছে গিয়ে তার গালে হাত দিয়ে শব্দ করে পুনরায় ডাক দেয়

“আদ্রিয়ান কথা বলুন? আদ্রিয়ান প্লিজ সাড়া দেন? এই দেখুন আপনার মেঘ এসেছে? দয়া করে কথা বলুন আদ্রিয়ান। আমার ভয় করছে।”
মেঘের এই কথার ও কোন উত্তর দিল না আদ্রিয়ান। মেঘ বলে
“আদ্রিয়ান‚ আপনি আমার উপর রাগ করেছেন তাই না? এই জন্য কথা বলছেন না। বিশ্বাস করুন আমি ফারহানকে ভালোবাসি না। আমি শুধু আপনাকে ভালোবাসি! এই মেঘ তার জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি শুধু মাএ আদ্রিয়ানকে ভালোবেসে এসেছে। প্লিজ আদ্রিয়ান চোখ খুলুন। আমায় ছেড়ে কোথাও যাবেন না আপনি? ছোটবেলায় মা বাবা সবাইকে হারিয়েছি এখন আর আপনাকে হারাতে পারব না। আপনি ছাড়া আমি নিঃশ্ব হয়ে যাব। আদ্রিয়ান কথা বলুন। দয়া করে উঠুন। আপনার মেঘের ভয় করছে। আদ্রিয়ান।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মেঘ কান্না মিশ্রিত কণ্ঠ এক দমে সব কথা বলে শেষ করে। তার চোখ বেয়ে অজস্র পানি গড়িয়ে পড়ছে। মেঘ চাই আদ্রিয়ান যেন শাস্তি বা কষ্ট পায় কিন্তু আদ্রিয়ানের মৃত্যু সে চাই না! যত রাগ‚ অভিমান‚ ঘৃণা থাকুক না কেন আদ্রিয়ানের উপর। তবুও ভালোবাসে সে আদ্রিয়ানকে! ছোটবেলা থেকে সব প্রিয় মানুষদের হারিয়ে এখন মেঘ ক্লান্ত! তার দ্বারা আর কাউকে হারিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। আর আদ্রিয়ানকে তো একদম নয়। মেঘ বলে
“আদ্রিয়ান কথা বলুন। আমি আপনাকে ভালোবাসি আদ্রিয়ান। প্লিজ আমায় একা রেখে যাবেন না। আমি আপনাকে হারাতে পারব না আদ্রিয়ান। আপনার মেঘ মরে যাবে আপনাকে ছাড়া। আদ্রিয়ান একবার সাড়া দেন।”

কান্নারত মেঘের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানির কয়েক ফোঁটা বেখেয়ালি ভাবে আদ্রিয়ানের চোখের পাপঁড়ির উপর। হাতের কনুই বেয়ে এখন চুয়ে চুয়ে র*ক্ত বাথ টবে পড়ছে। আদ্রিয়ান নিভু নিভু চোখে তাকায় মেঘের দিকে তবে তার নিথর দেহে শক্তির পরিমাণ খুবই কম। হাত থেকে অতিরিক্ত রক্ত পরায় শরীর নিস্তেজ হয়ে গেছে। একটু আগে যখন মেঘ আর ফারহান গাড়ি থেকে বাড়ির দরজায় নামল তখন আদ্রিয়ান ফ্লোরে বসে ছিল। প্রায় অর্ধ শতাধিক সিগারেট সে মেঝেতে বসে খেয়েছে! আজ অবধি এতো সিগারেট সে কখন ও খায়নি। কিন্তু আজ মনের সব দুঃখ কষ্ট এই সিগারেটের নিকেট ধোঁয়ার মাধ্যমে উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে হল।

ফ্লোরে বসে থাকায় সময় আদ্রিয়ান শুনতে পায় বাহিরে গাড়ির আওয়াজ। আদ্রিয়ানের মেঘের কথা মনে! নবীন বরণ অনুষ্ঠানের পর সে রাগ করে একা গাড়ি করে চলে এসেছে। কিন্তু মেঘ? মেঘ সবসময় তার গাড়ি করে একসাথে বাসায় ফিরে। আজ একা একা কি করে আসল? রাতে একা আসতে মেঘের কোন অসুবিধা হয়নি তো? মেঘের করা সকল অবজ্ঞা‚ অবহেলা আর ঘৃণা ভুলে গিয়ে ফ্লোর থেকে উঠে বসে এরপর দ্রুত এগিয়ে যায় বেলকনির দিকে। মেঘ তখন ফারহানের গাড়ি থেকে মাএ নেমে বাড়ির গেইটে দাঁড়ায়।

প্রথম দেখায় গাড়িটা যে ফারহানের তা আদ্রিয়ান বুঝতে পারেনি। কিন্তু মেঘ যখন গেইটে দাঁড়ায় তখন ফারহান তার পাশের জানালার কাচঁ নামায়। বেলকিন থেকে স্পষ্ট সাদা স্বচ্ছ কাচেঁর জানালায় ঘাড় ঘুরিয়ে বসে থাকা ফারহানের হাসি মাখা মুখশ্রী ভেসে উঠে। আদ্রিয়ান বুঝতে পারে‚ মেঘ ফারহানের গাড়ি করে বাসায় ফিরেছে! হঠাৎ আদ্রিয়ানের বুকে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব হল! অবশ্য তার নিজের উপর ভীষণ রাগ ও হয়! সে কেন মেঘের জন্য টেনশন করছিল এতোখন? মেঘ তার হবু স্বামীর গাড়ি করে বাসায় ফিরে এসেছে! মেঘ এখন ফারহানকে ভালোবাসে! মেঘ তার গাড়ি করে বাসায় ফিরবে এইটা কি স্বাভাবিক নয়? আদ্রিয়ান কেন এতোখন মেঘের চিন্তায় পা’গ’ল হয়ে যাচ্ছিল? কে হয় আদ্রিয়ান মেঘের? কি অধিকার রয়েছে তার মেঘের উপর?

আদ্রিয়ান তার নিজ দোষ সব হারিয়েছে! তার বাবার ভালোবাসা ‚ পরিবারের সাথে কাটান একান্ত মুহুর্ত সব । দীর্ঘ নয় বছর আদ্রিয়ান মেঘকে অবহেলা করেছে! তার স্ত্রীর থেকে দূরে থেকেছে। এই শাস্তি স্বরূপ তার এই কষ্ট প্রাপ্য। আজ মেঘ ফারহানকে ভালোবাসে! তার সাথে সুখে থাকতে চাই। তবে আদ্রিয়ান কেন বাধা দিবে। সবার সুখী থাকার অধিকার রয়েছে ‚ মেঘের ও আছে। কিন্তু আদ্রিয়ানের শুধু সবার ঘৃণা আর শাস্তি পাওয়ার জন্য জন্ম হয়েছে। তবে না হয় আদ্রিয়ান শাস্তিই পাবে। আদ্রিয়ান নিজেই নিজেকে শাস্তি দিবে! বিশাল বড় শাস্তি দিবে!

দূরে বেলকনি থেকে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ান মেঘের মায়া ভরা মুখশ্রীর দিকে তাকায়। ওই বাড়ির গেইটে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরী মেয়েটা তার বউ! “বউ” শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠে আদ্রিয়ানের। দুই চোখ ভরে বেশ কিছুক্ষণ মেঘের মুখের আদল পর্যবেক্ষণ করল। হঠাৎ কি মনে করে শব্দ করে হাসল‚ আদ্রিয়ানের ব্যবহার আজ ভীষণ অদ্ভুত। গম্ভীর‚ রাগী মুখে কেমন চাপা কষ্ট আর অভিমান লুকিয়ে রাখা রয়েছে। মেঘ যখন বাড়ির গেইট অতিক্রম করল তখন আদ্রিয়ান বেলকনি থেকে দূরে সরে যায়। এরপর রুমে প্রবেশ করে ড্রয়ার থেকে ধারাল ছুরি বের করে। আদ্রিয়ান এখন কি করছে তা হয়ত সে নিজে ও যানে না মানুষ যখন অতিক্রম মানসিক চাপে থাকে। তখন নিজের ক্ষতি করার জন্য আত্মাহত্যার মতো মারাত্মক পথ বেছে নেয়! হয়ত আদ্রিয়ানের সাথে তাই হল। সবার অবহেলা আর ঘৃণার থেকে নিজেকে মুক্তি করতে চাইল!

হাতে থাকা ধারাঁল ছুরি নিয়ে আদ্রিয়ান পা বাড়ায় ওয়াশরুমের দিকে। ওয়াশরুমের বাথ টবের পানির উপর বসল তার মাথা এখন কাজ করছে না। শুধু মনে হচ্ছে তার জীবনের সকল কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হল মৃত্যু। আদ্রিয়ান এতো বড়ো হার্ট সার্জন হলে ও তার মানসিক অবস্থা উপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। আদ্রিয়ান কাঁপা কাঁপা হাতে ধারাঁল ছুরি দিয়ে হাতের কবজির উপর শিরায় এক টান দিন। সাথে সাথেই র’ক্তে সারা হাত লাল হয়ে যায় ‚ বিন্দু বিন্দু র’ক্তকণা গড়িয়ে পড়ল বাথ টবের। বাথ টবের পানি ধীরে ধীরে ঘোটালে হয়ে লাল র’ক্ত বর্ণ ধারণ করল। আদ্রিয়ান তার সমস্ত শরীর পানির নিচে ডুবিয়ে নেয়। তার বাঁচার আর কোন আগ্রহ নাই‚ তার একটু শান্তি চাই। সবার অবহেলা আর অভিযোগ থেকে তার মুক্তি চাই।

_______( বর্তমান) ____
ধীরে ধীরে পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায় আদ্রিয়ান। তার দুই চোখ দিয়ে মেঘের কান্নারত মুখশ্রীর উপর নজর বুলায়। মেঘের বলা প্রতিটা কথা আদ্রিয়ান শুনেছে। খুব দীর্ঘ সময় ধরে আদ্রিয়ান হাত কাটে নাই‚ তাই এখন ও অজ্ঞান হয়ে যায়নি! মেঘের বলা সব কথার মধ্যে যে কথা আদ্রিয়ানের মন ছুঁয়ে গিয়েছে তা ছিল “ভালোবাসি আদ্রিয়ান” এই মেঘ শুধু মাএ আপনাকে ভালোবাসে!

মেঘ অনাবরত কান্না করে যাচ্ছে। প্রথমবার মেঘের কান্না দেখে আদ্রিয়ানের হাসি পায়। কারণ মেঘ তাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে কান্না করছে! আদ্রিয়ান তার র’ক্ত মাখা কাঁপা কাঁপা হাতে মেঘের গাল স্পর্শ করে। হঠাৎ ঠাণ্ডা শীতল হাতের ছোঁয়ায় মেঘের ঘোর কাটে! কান্না করা বন্ধ করে বাথ টবে বসে থাকা আদ্রিয়ানের দিকে তাকায়। আদ্রিয়ান দুই জোড়া ভেজা নেএপল্লব মেঘের উপর স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকা মেঘ শ্বাস ফিরে পায়। মেঘ কোন কথা না ভেবে দ্রুত হাত বাড়িয়ে আদ্রিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে৷ কাঁধে মুখ ডুবিয়ে ধুক করে কান্না করে উঠে আর বলে
“আদ্রিয়ান‚ কেন করলেন এমন? বাথ টবে যখন আপনার র”ক্তা’ক্ত হাত দেখেছিলাম তখন আত্মা কেঁপে উঠছিল আমার। আর যখন চোখ বন্ধ করে ছিলাম তখন আমার কি অবস্থা হয়েছিল? আমি মনে করেছিলাম আপনি হয়ত!”
মেঘের অসম্পূর্ণ কথাটা পূর্ণ করে দিয়ে আদ্রিয়ান বলে উঠে

“কি মনে করেছিলে? আমি মারা গেছি?”
আদ্রিয়ানের কথা শেষ করার আগেই মেঘ মুখ চেপে ধরে আর বলে
“চুপ করুন আদ্রিয়ান। কি বলছেন এইসব? আপনার কিছু হবে না?”
আদ্রিয়ান চুপ হয়ে যায়। মেঘ শক্ত করে আদ্রিয়ানের বাহুদ্বয় জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মুখ গুঁজে দেয়। দুই হাতের শক্ত বাঁধনে আদ্রিয়ান আগলে ধরে তার প্রেয়সীর উষ্ণ শরীর।
ডান হাতের কবজির উপর থেকে এখন ও র’ক্ত’ গড়িয়ে পড়ছে। আদ্রিয়ানের শরীর ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। তার কাঁধে মুখ গুঁজে থাকা মেঘের হঠাৎ মনে পড়ে আদ্রিয়ানের হাতের কথা। দ্রুত আদ্রিয়ানের বাহুদ্বয় ছেড়ে তার হাত দিয়ে আদ্রিয়ানের হাত ধরে। মেঘ বলে উঠে

“আদ্রিয়ান‚ আপনার হাত থেকে এখন র’ক্ত পড়ছে! চলুন রুমে যায়। হাতে ব্যান্ডেজ করতে হবে।”
মেঘ চিন্তিত কণ্ঠ স্বর শুনে আদ্রিয়ান হাসে আর বলে
“না‚ মেঘ এখুনি রুমে যেতে চাই না। তুমি আর একটু সময় ধরে আমায় জড়িয়ে ধরে রাখ।”
“আগে হাতের ব্যান্ডেজ করি। এরপর সারারাত আপনাকে জড়িয়ে ধরে থাকব।”
মেঘের কথা শুনে আদ্রিয়ান খুশি হয়ে যায় বাচ্চাদের মতো আবদার করে বলে উঠে
“সত্যি বলছ মেঘ? তুমি আমায় সারারাত জড়িয়ে ধরে রাখবে? তুমি আজ রাতে আমার সাথে থাকবে?”
বর্তমানে আদ্রিয়ানের মানসিক অবস্থা যথেষ্ট খারাপ। তার ব্যবহার কোন রোগীর মতো! এখন যদি আদ্রিয়ানের সাথে মেঘ কড়া কণ্ঠে কথা বলে বা ধমক দেয়। তবে হয়ত আদ্রিয়ান জেদি হয়ে উঠবে। তাছাড়া আদ্রিয়ানের হাত থেকে অজস্র র”ক্ত গড়িয়ে পড়ছে। যদি খুব দ্রুত বেন্ডেজ করে ঔষধ না লাগান হয় তবে হয়ত খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে! আদ্রিয়ানের মানসিক অবস্থা বুঝে মেঘ বলে

“হুম‚ অবশ্যই থাকব।”
আদ্রিয়ান তার হাত মেঘের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠে
“প্রমিজ কর আমায়। তুমি আমায় ছেড়ে কোথাও যাবে না মালিহা।”
“হুম প্রমিজ।
“ওয়েট” আদ্রিয়ান কি বলে ডাকল আমায় মালিহা? মানে আদ্রিয়ান মেঘের আসল পরিচয়! যে মেঘই মালিহা? মেঘ অবাক হয়ে যায়।এইজন্য কি আদ্রিয়ানে এই কয়েকদিন মেঘকে কেয়ার করত! কিন্তু মেঘ কখন তার আসল পরিচয় আদ্রিয়ানকে বলেনি! তবে কি করে আসল সত্যি জানল আদ্রিয়ান? মেঘ আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে
“আদ্রিয়ান‚ আপনি মালিহা বলে ডাকলেন কেন আমায়? আমার নাম মেঘ?”
“হুম‚ তোমার নাম মেঘ। সম্পূর্ণ নাম মালিহা জান্নাত মেঘ। আমার বউ।”

আদ্রিয়ানের মুখে বউ শব্দটা শুনে মেঘ অবাক হয়ে যায়! মানে মেঘের সন্দেহ ঠিক ছিল? আদ্রিয়ান সত্যি জানে যে‚ মালিহা মানে মেঘই তার বউ। কিন্তু কে বলল আদ্রিয়ানকে এই কথা! মেঘ প্রশ্ন করে
“আদ্রিয়ান‚ আপনি কি করে জানলেন যে আমিই মালিহা? আপনার বউ! কে বলেছে এই কথা আপনাকে?”
“আমার ছোট বোন সৃষ্টি বলেছে। তুমিই মালিহা। আমার মিষ্টি বউ।”
আদ্রিয়ান মেঘের আসল পরিচয় জানে? এই সন্দেহ মেঘের অনেক আগেই হয়েছিল। কিন্তু আজ তা সত্যি হল। কিন্তু সৃষ্টি কি করে জানল আমেরিকায় আসার পর মেঘের আদ্রিয়ানের সাথে দেখা হয়েছে? সৃষ্টি কি মেঘকে দেখেছে? মেঘ যখন নিজের ভাবনায় মগ্ন ছিল তখন আদ্রিয়ান মেঘের গাল ছুঁয়ে বলে

“বউ‚ হাতে খুব ব্যাথা করছে।”
“বউ” ছোট এই শব্দটা যেন মেঘের মনে প্রশান্তির কারণ ছিল। মেঘ আদ্রিয়ানের উপর রাগ করে বরং মৃদু হেঁসে বলে
“রুমে চলুন হাতে ঔষধ লাগিয়ে দেয়। ব্যাথা সেরে যাবে।”
গালে রাখা হাত সরিয়ে আদ্রিয়ান একটু এগিয়ে গিয়ে মেঘের গালে এইবার ঠোঁট ছুঁয়িয়ে দিয়ে বলে
“তুমি খুব ভালো বউ। খুব খুব মিষ্টি।”
বাচ্চাদের মতো কণ্ঠ করে বলা প্রতিটা কথা যেন মেঘের মন ছুঁয়ে যায়। আদ্রিয়ান তখন প্রায় শতখানিক সিগারেট খেয়েছে যার ফলে তার হয়ত একটু নেশা ধরেছে। সিগারেট যথেষ্ট দামী আর ব্যান্ডের ছিল।

বাথ টবের পানি থেকে হাত ধরে আদ্রিয়ানের সমগ্র শরীর উপরে উঠায় মেঘ। কিন্তু আদ্রিয়ানের বলিষ্ঠ দেহের ভার সয্য করার মতো শক্তি মেঘের শরীরে ছিল না। তবুও ধীরে ধীরে আদ্রিয়ানকে উঠায় মেঘ। কিন্তু সমগ্র বাথ টবের পানি লাল র”ক্ত বর্ণ ধারণ করায়‚ আদ্রিয়ানের চোখে মুখে রক্তের বিন্দু বিন্দু পানি জমা হয়। এখন একবার আদ্রিয়ানের গোসল করা উচিত। কিন্তু আদ্রিয়ান একা একা তা করতে পারবে না। তাছাড়া যদি একবার হাতে বেন্ডেজ করা হয়ে যায় এরপর হাত ভেজান যাবে না! তাই মেঘ আদ্রিয়ানের হাত ধরে ঝর্ণার কাছে নিয়ে যায়। এরপর আদ্রিয়ানকে দাঁড় করিয়ে পাশে থাকা সুইচ অন করে ঝর্ণা ছেড়ে দেয়।
উপরে ঝর্ণা থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ন্যায় টপটপ পানির ফোঁটা পড়ছে আদ্রিয়ানের শরীরে। মেঘ দূরে দাঁড়িয়ে ছিল! দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মেঘ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। আদ্রিয়ানের বলিষ্ঠ দেহের ভার সামলাতে গিয়ে মেঘ বেশ কষ্ট হয়েছে! পানির বিন্দু বিন্দু ফোঁটা যখন ছুরির আঘাতে কেটে যাওয়া কবজির উপর পড়ে। তখন ব্যাথায় আত্মানাথ করে আদ্রিয়ান বলে উঠে

“আহ্”
আদ্রিয়ানের মুখে ব্যাথাত্তুক ধ্বনি শুনে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘ কাছে আসে তার। মেঘ আদ্রিয়ানের কাছে এগিয়ে এসে বলে
“আদ্রিয়ান‚ কি হয়েছে আপনার? হাতে ব্যাথা করছে?”
বাধ্য ছেলের ন্যায় এপাশ _ ওপাশ মাথা নাড়িয়ে আদ্রিয়ান সম্মতি দেয়। তার হাতে ব্যাথা করছে! মেঘ দ্রুত আদ্রিয়ানের কাটা হাত তার হাতের তালুর মধ্যে নেয়। এরপর তার পরহিত সিল্কের শাড়ির কোণা টান দিয়ে ছিঁড়ে‚ আদ্রিয়ানের হাতের কবজির কাটাঁ স্থানে পড়িয়ে দেয় আর বলে
“একটু কষ্ট করে পানির নিচে থাকুক। এরপর আমরা রুমে চলে যাব।”

মেঘ এই কথা বলে পুনরায় আদ্রিয়ানের কাছ থেকে দূরে সরে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু তার আগেই আদ্রিয়ান পিছন থেকে মেঘের শাড়ির আঁচল টেনে ধরে এক টানে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। হঠাৎ করে আদ্রিয়ান এমন করায় মেঘ ধমকে যায়। আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে তার ভেজা হাত দিয়ে মেঘের হাত স্পর্শ করে। এরপর মেঘের পিছনে পিঠে লেপ্টে থাকা ভেজা চুল কাঁধের এক পাশে সরিয়ে নেয়। আদ্রিয়ানের হাতের উষ্ণ স্পর্শে মেঘ কেঁপে উঠে তার কণ্ঠে দ্বয় যেন রুদ্ধ হয়ে যায়। আদ্রিয়ান মেঘের পিঠে স্পর্শ করার সাথে সাথে মেঘ চোখ বন্ধ করে নেয়। মেঘের সাড়া পেয়ে আদ্রিয়ানের সাহস একটু বাড়ে‚ সে তার ভেজা ঠোঁট ছুঁয়ে দেয় মেঘের উন্মুক্ত পিঠে। এরপর বেশ কয়েক কিছুক্ষণ ঠোঁটের রাজত্ব চালায় সেখানে!

অপর দিকে মেঘের অবস্থা খুব করুণ। আদ্রিয়ানের ঠোঁটের ছোঁয়ায় তার স্বাঙ্গনে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায়! মেঘ তার পড়নের শাড়ি দুই হাত দিয়ে চেপেঁ ধরে আদ্রিয়ানের ঠোঁটের গভীরতা উপলব্ধি করছে। আদ্রিয়ান যখন মেঘের পিঠ থেকে মুখ তুলে ধীরে ধীরে মেঘের কানের পিঠে চুমু খায়। তখন একবার চোখ খুলে তাকায় মেঘের দিকে! চোখ বন্ধ করে থাকা অবস্থায় মেঘ ও তাকায় আদ্রিয়ানের দিকে। হঠাৎ দুইজনের চোখ মিলিত হওয়ায় উভয়ই বেশ লজ্জা পায়। আদ্রিয়ান যখন মেঘের অধিক নিকটে যাওয়ার জন্য অগ্রসর হবে‚ তখন মেঘ থামিয়ে দেয়। মেঘ বলে
“আদ্রিয়ান‚ হাতের বেন্ডেজ করতে হবে রুমে চলুন।”

থমকে যায় আদ্রিয়ান। এখন আদ্রিয়ানের হুঁশ না থাকলে ও সে মেঘের সম্মতি ছাড়া তার কাছে যেতে চাই না। মেঘ ঘুরে আদ্রিয়ানের দিকে ফিরে তাকায় এরপর ওর হাত ধরে ওয়াশরুম থেকে বের করে নিয়ে আসে।
বিছানায় বসিয়ে গরম উষ্ণ টাওয়াল দিয়ে আদ্রিয়ানের মাথার উস্ক খুস্ক চুল সযত্নে মুছিয়ে দেয়। এরপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে ব্যন্ডেজ আর ঔষধ বের করে আদ্রিয়ানের পাশে বসে যায় মেঘ। ভদ্র ছেলের ন্যায় আদ্রিয়ান মেঘের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়‚ মেঘ মুচকি হেঁসে ধীরে ধীরে আদ্রিয়ানের কেটে যাওয়া স্থান থেকে র”ক্ত পরিস্কার করে। এরপর ঔষধ লাগায়‚ আদ্রিয়ান ব্যাথায় চোখ _ মুখ কুঁচকে ফেলে। মেঘ আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে

“হাতে যদি এতো ব্যাথা করে! তবে হাত কাটলেন কেন?”
মেঘের কথার উত্তরে আদ্রিয়ান বলে
“তুমি ওই ফারহানের প্রপোজে রাজি হয়ে ছিলে কেন? তোমাদের দুইজনকে একসাথে দেখে আমার হিংসা হয়েছিল তাই হাত কেটেছি।”
“এতো জেলাসি আপনার? কিন্তু আপনি কি আমার প্রেমিক হন যে প্রেমিকাকে অন্য কারো দেখে হাত কাটবেন।?”
“প্রেমিক না হয় বর তো হয়”

সযত্নে আদ্রিয়ানের হাতে বেন্ডেজ করে দেয় মেঘ। এরপর আদ্রিয়ানকে বিছানায় শুয়িয়ে তার বালিশের কাছে বসে মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। আদ্রিয়ান মাথা উঁচু করে মেঘের মুখের দিকে পিটপিট করে তাকায়। তার ব্যান্ডেজ করা হাত উপরে তুলে মেঘের চুলে হাত ছোঁয়ায়। মেঘ মুচকি হেঁসে বলে
“আপনি ঘুমান এখন আদ্রিয়ান। আমি রুমে যায়। ড্রেস চেঞ্জ করে আসি।”
মেঘ বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতে যাবে তখনই আদ্রিয়ান পিছনে থেকে হাত ধরে টান দিয়ে তার উপর ফেলে দেয়। এরপর মেঘের বাহু ধরে ধাক্কা দিয়ে অপর পাশের বালিশে ছুড়েঁ মারে। আদ্রিয়ান মেঘের উপরে উঠে পড়ে। মেঘ বলে
“আদ্রিয়ান কি করছেন?”

মেঘ আর তার বলা কথা সম্পূর্ণ উচ্চারণ করতে পারল না। তার আগেই আদ্রিয়ান মেঘের ঠোঁট চেপে ধরে। মেঘ চুপ হয়ে যায়। আদ্রিয়ান মেঘের ঠোঁটে রাখা তার আঙ্গুল স্লাইড করতে থাকে। মেঘের থুতনি ধরে তার চিবুক উপরে উঠিয়ে নিজের ঠোঁট নিচু করে চুমু দেয় মেঘের কপালে। এরপর ধীরে ধীরে মেঘের গালে আলতো ঠোঁটের ছোঁয়া দেয়। মেঘ আদ্রিয়ানের পড়নের শার্ট শক্ত করে ধরে রাখে! আদ্রিয়ান মেঘের ভেজা অধর জুড়ার দুই পাশে ঠোঁট ছুঁয়িয়ে। অল্প করে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় মেঘের অধরে। মেঘ আদ্রিয়ানের মাথার পিছনের চুলে শক্ত করে চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়।

উন্মুক্ত মেঘের কোমড়ে আদ্রিয়ান তার হাত নিয়ে। শাড়ির ভাঁজে হাত গলিয়ে মেঘের পেট স্পর্শ করে। মেঘের শরীর অজানা শিহরণে কেঁপে উঠে। আদ্রিয়ান প্রথমে ধীরে ধীরে চুম খেলে ও একটু পর এগ্রেসিভ হয়ে যায়! মেঘের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তবুও সে সয্য করে নেয়। আদ্রিয়ানের সাথে তাল মিলায়। হঠাৎ আদ্রিয়ান মেঘের ঠোঁট ছেড়ে দেয় ধীরে ধীরে ঢলে পড়ে মেঘের উপর। হঠাৎ আদ্রিয়ানকে থেমে যেতে দেখে মেঘ আদ্রিয়ানের মুখ উঁচু করে দেখে। কোন সাড়া শব্দ নাই! তার মানে কি আদ্রিয়ান অজ্ঞান হয়ে গেছে! হয়ত শরীর থেকে অধিক পরিমাণ রক্তক্ষরণ হওয়ায় এমন হয়েছে। মেঘ আদ্রিয়ানকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয় আর বলে

“আদ্রিয়ান জানেন এই মেঘ না বড্ড বেহায়া। মানুষের সামান্য ভালোবাসায় অতীতের সব অবেলায় ভুলে যায়! কি করব বলেন ছোটবেলা থেকে কখন কেউ ভালোবাসেনি আমায়। তাই হয়ত লোভ হয় একটু ভালোবাসা পাওয়ার। আপনি দীর্ঘ নয় বছর ধরে আমায় কতো অবহেলা করেছেন তবুও আজ দেখুন আমি আপনার ভালোবাসায় ডুবে যেতে চাই। খুব ইচ্ছা করে আপনাকে শাস্তি দিতে কিন্তু পারি না। যতবার আপনাকে কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করি ততবার নিজে কষ্ট পায়। কেন হয় এমন বলুন তো?”
মেঘ পুনরায় বলে উঠে

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৪

“আপনি আমার কাছে শেষ সুযোগ চেয়েছিলেন না। যান দিলাম একটা শেষ সুযোগ আপনাকে। শেষ বার মতো স্বামী হওয়ার সুযোগ দিলাম। যদি এইবার আপনি ব্যর্থ হন আমায় আবার অবহেলা করেন। তবে মৃত্যু আপনার না হলে ও মেঘের হবে! এই এক জীবনে এতো অবহেলা বা কষ্ট আর সয্য করার মতো শক্তি আমার নাই। বড্ড ক্লান্ত আমি। একটু শান্তি চাই ভালোবাসা চাই। দিবেন আমায়। এই বেহায়া মেঘকে এক বিন্দু ভালোবাসা দিবেন? আমি ও সুখী হতে চাই। কিন্তু সুখ কি সত্যি আমার মতো দুঃখী মানুষের ভাগ্য লেখা আছে?”

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৪৬