Home দগ্ধ প্রেমানল দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ১৩+১৪

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ১৩+১৪

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ১৩+১৪
আনায়া আফরিন

ইউহান ভিলাতে গিয়ে ফারাজের যেনো মাথা ঘুরাচ্ছে!কি হচ্ছে টা কি আসলে।আদিলের ভালোবাসা এরিকের স্ত্রী এখন?মানে তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।আদিলকে জিজ্ঞাসা করার আগেই আদিল বাইক থেকে নেমেই হুরহুর করে চলে গেলো।সে গেস্ট রুমের দিকে পা বাড়ালো।কারণ এতোদিন সে আর ফারাজ গেস্টরুমেই ছিলো।সে যেতেই এরিক আসার আগেই তার রুমে গেলো শার্ট আনতে।আপাতত তার ফ্রেশ হওয়া দরকার।রুমে যেতেই দেখলো দরজা লাগানো।সে দরজাটা খুললো।ভিতরের পরিবেশ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলো।

রুমটা ফুল দিয়ে সাজানো পুরো।বিছানাটা যেনো কাচা ফুলের বাগান।লাল গোলাপের পাপড়ি পুরো মেজেতে ছড়ানো।এতোক্ষণ সব স্বাভাবিক লাগলেও আদিলের এবার চোখ গেলে বিছানার মধ্যিখানিতে।হলুদ গোলাপের পাপড়ি দিয়ে একটা লাভ আকা।মাঝে লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে লিখা মেহেরিক!আদিলের বুকটা ছলাৎ করে উঠলো।আজ তার মেহেরের বাসর রাত।তার মেহের যাকে কিনা সে চেয়েছিলো।অনুভব করলো সে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না।কষ্ট হচ্ছে তার নিঃশ্বাস নিতে।সে দ্রুত শার্ট বের করে হাতে নিয়ে চলে এল গেস্ট রুমে।সে কোনভাবেই শ্বাস নিতে পারছে না।বিছানায় বসলো সে।তার মাথাও ঘোরাচ্ছে প্রচুর।সে হাপাতে লাগলো।এ সময় ফারাজ রুমে প্রবেশ করলো।আদিলের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে সে ঘাবড়ে গেলো।দ্রুত আদিলের কাছে এসে হাটু গেড়ে বসলো।চিন্তিত গলায় জিজ্ঞাসা করলো-

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“আদি কি হয়েছে তোর?এই অবস্থা হলো কি করে?”
আদিল শ্বাসকষ্টের জন্য কিছু বলতেও পারছে না।ফারাজ আবারও চিন্তিত গলায় জিজ্ঞাসা করলো-
“আদি চল ডাক্তারের কাছে যাই।বাসায় আপাতত কেউ নেই।তোর অবস্থা খারাপ হচ্ছে প্রচুর!”
আদিল এবার অত্যন্ত কষ্টে উচ্চারণ করলো-
“প্রয়োজন নেই রাজ।আ-আমি ঠিক আ-আছি।পা-পানি দে!”

ফারাজ দ্রুত পানি দিলো আদিলকে।পানি খাওয়ার বহুক্ষণ পর আদিল কিছুটা স্বাভাবিক হলো।ফারাজ এবার অত্যন্ত গভীর ভাবে দেখলো আদিলকে।ছেলেটার চামড়া শুকিয়ে যাচ্ছে।গায়ে কালচে একটা ভাব আসছে।সে জানে আদিল রাতে ঘুমায়না ঠিকমতো।তার জন্যই কি এমন হচ্ছে?নাকি মেহেরকে হারিয়ে?নাকি অন্য কারণ?সে আপাতত প্রশ্নগুলো নিজের মধ্যেই রাখলো।আদিলকে শুইয়ে শার্ট বদলে দিলো।জুতোজুড়া খুলে দরজার পিছনে রাখলো।আদিল চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো।ফারাজ ফ্রেশ হয়ে এসে এরিদ-এরিক দুইজনকেই কল করলো।এরিদ জানালো তারা প্রায় এসে পড়েছে।আর এরিক এখনো জ্যামেই আটকে আছে।ফারাজ কল কেটে আদিলের পাশে বসলো।আদিল যে আর কোন কথা বলবে না সেটা সে বুঝেছে।তাই কিছু জিজ্ঞাসাও করলো না।প্রায় কিছুক্ষণ পর এরিকরা আসলো।তারই ২০ মিনিট পর এরিকরা আসলো।

আফরিন মেহের,আনায়া,রুদ্ভিকা,ফিহাকে নিয়ে নিজের রুমে গেলো।এরিক তাদের বাসায় পৌছে দিয়ে একটু বাহিরে গিয়েছে।এরিদ নিজের রুমে গিয়েছে।আফরিন রুমে নিয়ে গিয়ে সবাইকে পানি দিলো কারণ তারা সবাই-ই বড্ড ক্লান্ত।মেহের নিশ্চুপ হয়ে খেলো।তার চোখ দিয়ে এখনো পানি পড়ছে।আফরিন,ফিহা ভাবলো বাবার বাড়ির বিদায়ের জন্য বোধহয়।কিন্তু আনায়া-রুদ্ভিকা জানে এখানে তার চোখের জলের অন্য একটি কারণও আছে।আনায়া এবার আলতো করে মেহেরের পিঠে হাত বুলালো।মেহের যেনো এটা আশা করেনি।এতো দিন পর বোনের একটু শান্তনা পেতেই তার চোখের পানির গতি বাড়লো।আনায়া দেখলো আফরিন ওয়াশরুমে গিয়েছে ফ্রেশ হতে।তাই সে এবার মেহেরের কানে কানে বললো-

“কাদছো কেন মেয়ে?যা হারিয়েছো তার ক্ষতিপূরণ পেয়ে গিয়েছো।মহানায়ককে হারিয়ে মহাপুরুষকে পেয়েছো!তোমার মতো ভাগ্য প্রতিটা মেয়ের হোক।প্রেমিক রুপে সুপুরুষ আর স্বামীরুপে মহাপুরুষ কজনই বা পায়?”
মেহের যেনো এবার কণ্ঠে তাচ্ছিল্যতা বজায় রেখে বললো-
“স্বামী কেমন পুরুষ জানি না তবে প্রেমিক ছেড়ে দিলে সে বুঝি সুপুরুষ হয়ে যায়?”
আনায়াও এবার তাচ্ছিল্যতা মিশিয়ে বললো-
“বোকা তুমি মেহের।তুমি ভালোবাসার ফাটল দেখলে অথচ ফাটলের পিছনের কারণ খুজলে না!”

তারপর আর আনায়া ফিরে তাকালো না মেহেরের দিকে।মেহেরও নিশ্চুপ রইলো।রুদ্ভিকা আর ফিহা আফরিনের সাথে ফ্রেশ হতে গিয়েছে।তারা ফ্রেশ হয়ে আসতেই আফরিন রহিমা খালাকে হালকা পাতলা খাবারের ব্যবস্থা করতে বললো।সে বসে বসে গল্প করছে সবার সাথে।পরক্ষণেই প্রশ্ন উঠলো যতক্ষণ না ভাই ফিরে আসছে ততোক্ষণ একটু গান গাওয়া যাক।মেহেরের মনটাও ভালো হবে আর সময়ও কাটবে।যেই কথা সেই কাজ।গান শুরু হলো।সকলেই নিজের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে যেই গানের নাম সেটা গাইতে বলা হলো।মেহেরের যদিও ভালো লাগছিলো না তবে মান রক্ষার্থে সে যোগ দিলো।আফরিন মেয়েটার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলেই তার মন পাতলা হয়ে গিয়েছে।মেয়েটা বড্ড মিশুক আর মিষ্টিও বটে।রুদ্ভিকা গাইলো “রাগ রাগ ও সামায়া মেরে!” ফিহা গাইলো “ফির ভি তুমকো চাহুংগা!” আফরিন গাইলো “আমি তোমার কাছে!”সবাই হাততালি দিলো।পালা এলো এবার মেহেরের।মেহের খুজে পাচ্ছে না।তার ইচ্ছেও নেই তবে আফরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় দু’লাইন গেয়ে উঠলো-

” তুমি ক্রোধের আগুনে জমে থাকা ব্যাথা,
আমার শেষ বিকেলের ধোকা!
কোন রোদেলা দুপুরে তোমার ফিরে পাবো বলে
অর্থহীন খোজা!”
ব্যাস আর গাইতে পারলো না।গানের লাইন নয় এগুলো তো তারই কাহিনি।আর গাইলে যে চোখের পানিরা গড়িয়ে পড়বে।সকলে হাততালি দিলো।আনায়া মুচকি হাসলো।মেহেরের “মোহ” শুনে সকলেই মুগ্ধ হয়েছে।আফরিন তো খুশিতে বলে উঠলো-

“বাহ্‌ কি চমৎকার গলা আমার ভাবির।আমার ভাবি সবদিক থেকেই সেরা।ভাইয়ার পছন্দ তো ১০০/১০০!”
মেহের কোন উত্তর দিলো না।আনায়া মুচকি হেসে বললো-
“তাইতো দুনিয়ার সকল নারী উপেক্ষা করে ডাক্তার সাহেব মেহুকে হৃদয়ে জায়গা দিলো।সত্যি মেহের আমার দেখা এই পৃথিবীর সেরা ভাগ্যবতী স্ত্রী!”
আফরিন অবাক হয়ে বললো-
“ডাক্তার সাহেব?চিনো তুমি ভাইয়াকে?”
আনায়া জবাব দিলো-
“তেমন চিনিনি আবার গোটাটাই চিনি।আদিল ভাইয়ার সাথে দেখেছিলাম।জানলাম ডাক্তার তাই সম্মোধন টাও এভাবেই করলাম!”
আফরিন মাথা নাড়িয়ে বললো “ওহ!”

মেহের আর রুদ্ভিকা তাকিয়ে রইলো আনায়ার দিকে।মেয়েটার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে না কি চলছে মনে।রুদ্ভিকা মেহেরের দিকে তাকালো।মেহেরের মুখেও কোন ভাবান্তর নেই।বোনদের দেখে সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।তার হাতে করার মতো কিছু নেই।বহুক্ষণ গল্প চললো তাদের সবার মাঝে।আনায়া আর মেহের বেশি কিছু বলেনি কেবল তাদের সাথে তাল মিলিয়েছে।

রাত বাজলো ১২:২০।এরিদ কল করলে এরিক বললো সে এইতো বাসার সামনেই।আফরিনই কল করিয়েছে।সে এসে বললো ভাই আসছে।মেহেরকে এরিকের রুমে নেওয়া হলো।পিছনে আনায়াও গিয়েছে।দরজা খুলতেই দেখলো নানা ধরনের ফুল দিয়ে ঘরটা সাজানো।মেহের আর আনায়া উভয়েরই হৃদয় নাড়া দিয়ে উঠলো।মেহেরের চোখ দিয়ে সবার অনজরেই দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো।সেও চেয়েছিলো তার জীবনে এই রাত আসুক তবে যার সাথে আসলো সে যে তাকে চায়নি।সে যাকে চেয়েছে সে হয়তো এখন অন্য কোথাও শুয়ে আছে।আনায়া ভাবলো সেও তো চেয়েছিলো তার জীবনেও এমন এক রাত আসুক।এই ঘরের মালিকের সাথে।ঘরের মালিকের ঘর ঠিকই সাজলো তবে ঘরণী আর হলো না এই মালিকের।চোখের জল গাল বেয়ে পড়ার আগেই আনায় মুছে নিলো।আফরিনের অগোচরে রইলো দুই রমণীর চোখের পানি।মেহেরকে পাড়ার ভাবিরা যদিও শিখিয়ে দিয়েছে সব।মেহেরকে এতোসব ভাবতে হলো না।সে এমনিও যথেষ্ট বড়,তার অনেক কিছুই জানা।আফরিন একটু মজা করে চলে গেলো মেহেরকে রেখে।আনায়া একবার পিছু ফিরে তাকিয়ে বললো-

“তোমার এই রাত সুন্দর হোক।”
আনায়া এটা বলে বের হয়ে গেলো।বের হতেই আফরিনকে জিজ্ঞাসা করলো –
“আফরিন, ভাইয়া বোধহয় তোমাদের বাসায় এসেছে।দেখলাম না যে!”
আফরিন-“সে বোধহয় গেস্ট রুমে আছে আপু।তুমি দেখা করবে?”
আনায়া-“একটু নিয়ে গেলে ভালো হয়।”

আফরিন তাকে গেস্ট রুমের সামনে নিয়ে গেলো।সেখানে আনায়াকে রেখে সে চলে গেলো নিজের রুমে।তার রুম কাছেই।আনায়াকে বললো কথা শেষ করে সে তার রুমে যাবে।আফরিন মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো।আনায়া রুমের ভিতরে ঢুকতেই দেখতে পেলো ঘর পুরো অন্ধকার।বারান্দা দিয়ে একবারেই হালকা চাঁদের আলো ঘরে আসছে।আনায়া বারান্দার দিকে এগোলো।রাত গভীর।বারান্দার অর্ধেক অন্ধকার হয়ে আছে।আর অর্ধেকে চাঁদের আলো সামান্য পড়ছে।আনায়া দেখলো একটি পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে।পিছন থেকে গিয়ে সে কাধে হাত রাখলো।নরম সুরে জিজ্ঞাসা করলো-

“ঠিক আছিস ভাইয়া?”
অপরপক্ষ থেকে কোন উত্তর এলো না।আনায়া এবার কাদো কাদো সুরে বলে উঠলো-
“ভাইয়া একটু জড়িয়ে ধরবি?কান্না পাচ্ছে রে অনেক ভাইয়া!অনেক কান্না পাচ্ছে।”
পুরুষটি পিছনে ফিরতেই আনায়া ঝাপিয়ে পড়লো বুকে।মানুষটার চেহারা দেখেনি।ফুপিয়ে সে বুকের সাথে মিশে কাদতে লাগলো।অপর পাশের মানুষটা আনায়ার এই অসহায়ত্বে যেনো দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলো।আনায়ার প্রতিটা কান্নার শব্দ তার হৃদয়ে তীরের মতো বিধছিলো।সে নিজের হাতটা আলতো করে আনায়ার মাথায় রাখলো।ঘরে থাকা একজন ব্যক্তি কোন মেয়ের ফুপানোর আওয়াজ শুনে দ্রুত উঠে বসলো।সে আওয়াজের উৎস খুজতে দ্রুত বিছানা থেকে উঠে রুমের লাইট ধরালো।আওয়াজটা বারান্দার থেকে আসছে বুঝতে পেরে সে দ্রুত বারান্দার হলুদ লাইটটা ধরালো।বারান্দার চারদিকটা আলোয় ভরে উঠলো।আনায়া মাথা তুলে পিছনে তাকাতেই অবাক হয়ে বললো-

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ১১+১২

“ভাইয়া!”
আনায়া যেনো আকাশ থেকে পড়লো।তাকে ভয়ংকর রকমের বিষাদিনী লাগছে।চোখ দুটো ফুলে গিয়েছে।তার মাথায় ভারি খেলো ভাইয়া এখানে তো সে দুঃখবিলাস করছিলো এতোক্ষণ কার সাথে!

দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ১৫+১৬