দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ২৭
আনায়া আফরিন
মাঘের শেষ দিক।শীতের আমেজটা তেমন একটা নেই।আনায়াদের বাসা থেকে সবাই পরদিন রাতেই এসে পড়েছে।আফরিন আজ বহুদিন পর ভার্সিটিতে যাবে।রেডি হয়ে নিচে নামতেই দেখলো এরিদ বসে আছে সোফায়।আজ আর কোনো খোচাখোচি করলো না আফরিন।আফরিন এখন অনেকটাই শান্ত হিয়ে গিয়েছে।ব্যাগটা কাধে নিয়ে আফরিন গাড়িতে গিয়ে বসলো।এরিদ এসে গাড়িটা স্টার্ট করার আগে আফরিনের সিট বেল্ট বেধে দিলো।আফরিন এটা লাগায় না নিজের থেকে।এরিদ আপন মনে গাড়ি চালালো শুরু করলো।আফরিন বাহিরে তাকিয়ে আছে।এরিদ অত্যন্ত নরম সুরে ডাকলো-
“এলি”
আফরিন বোধহয় শুনলো না।এরিদ এবার আফরিনের মাথায় আলতো করে টোকা দিতেই আফরিন এরিদের দিকে তাকালো।ভ্রু কুচকে জিজ্ঞাসা করলো-
“কি হয়েছে?”
এরিদ-“কিছু নিয়ে আপসেট?”
আফরিন-“উঁহু”
হয়তো আফরিনের দুঃখটা এরিদকে বলার মতো না তাই বলছে না।এরিদ তাই আর ঘাটলো না।ভার্সিটির সামনে পৌছাতেই এরিদকে বিদায় জানিয়ে আফরিন চলে যেতেই এরিদ ডাকলো-
“আফরিন শোন!”
আফরিন পিছনে ঘুরলো।এরিদ বললো-
“জলদি ছুটি হলে ফোন দিস।বো*কামি করিস না।যার জন্য দেরি করতি তার আসল রুপ দেখেছিস নিশ্চয়ই।জলদি ছুটি হলে ফোন দিস!”
আফরিন পুরোই হতবাক হয়ে গেলো।এরিদ ততোক্ষণে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছে।আফরিন যেনো কথা বলতে ভুলে গেলো।তার মানে তার ভাই কি সব জানে!গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে এটা ভাবতে ভাবতেই পিছন থেকে রুদ্ভিকা ডাক দিলো-
রুদ্ভিকা-“আফরিন আপু,এখানে দাঁড়িয়ে যে?তোমার অপেক্ষাই করছিলাম!”
আফরিন-“চলো ভিতরে যাই”
পাশ থেকে ফিহা বললো-
“ঠিক আছো তুমি আপু?”
আফরিন মুচকি হেসে জবাব দিলো-
“হ্যাঁ”
ফিহা আর আফরিন সামনে এগোতেই রুদ্ভিকা পিছনে চাইলো।সে যার জন্য পিছনে তাকিয়েছে সেও তার দিকেই তাকানো।এরিদ গাড়ি ঘুড়িয়ে এখানেই তাকিয়ে ছিলো।চোখাচোখি হতেই রুদ্ভিকা দ্রুত চোখ সরিয়ে এগিয়ে গেলো।এরিদ সরালো না।তাকিয়ে রইলো একইভাবে।মনে মনে বললো-
“কবে তোমাকে নিজের করে পাবো হৃদয়হরণী?আমার বুক যে তোমার পিপাসায় খা খা করছে!”
রুদ্ভিকা তো শুনেনি এই কথাগুলো!
আনায়া এখন অনেকটাই সুস্থ।আদিল অফিসে গিয়েছে।সবিতা বেগম আনায়াকে নাস্তার জন্য ডেকে এনলো।ইরফান সাহেব বসে আছেন মেয়ের অপেক্ষায়।আনায়া এসে বাবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।খাওয়া শুরু করলো তারা দুইজন।সবিতা বেগমের মেজা*জ হয়তো কিছুটা খা*রাপ।ইরফান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন-
“কী ব্যাপার? তোমার মুখটা এমন হয়ে আছে কেনো?”
সবিতা বেগম যেনো এবার একটা রাগ দেখিয়ে বললেন-
“কেমন হয়ে আছে?এখন তোমাদের জন্য কী মুখও বানাতে পারবো না!”
ইরফান সাহেব বুঝলেন আজ স্ত্রীর মেজাজ বেশ গরম।তাই আমতা আমতা করে বললেন-
“আরেহ না আমি সেটা বলেছি নাকি।মানে বলতে চাইছি তোমার মন খারাপ?”
সবিতা-“না আমি কেন মন খারাপ করতে যাবো।আমার কাজই তো মানুষের কথা শোনা!”
আনায়া আর ইরফান সাহেব দুজনেই ভ্রু কুচকে তাকালো।আনায়া জিজ্ঞাসা করলো-
“কেউ কিছু বলেছে মা?”
সবিতা বেগম উত্তর দিলেন না।ইরফান সাহেন আবার জিজ্ঞাসা করতেই একটু রাগ দেখিয়ে বললেন-
“আজ সকালে পাশের বাসার ভাবি এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে নাকি।এখন আমি কি আর বলতে পারি এই পরিবারে আমার মতের কোন দাম নেই।মহিলা বলে গেলো এই বয়সী মেয়েকে ঘরে রেখে দিলে তো অঘটন ঘটবে।কয়েকদিন আগেও নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলো।আমাকে আরো কতো কি বললো।”
ইরফান সাহেব বিরক্তির সুরে বললেন-
“মানুষ অনেক কথাই বলবে।তাই বলে কি তাদের কথা কানে নিতে হবে নাকি?আমার মেয়ে,আমি সিদ্ধান্ত নিবো তারা কেন কথা বলবে?”
সবিতা-“শোনো সমাজে চলতে হলে সমাজের দিকটাও দেখতে হয়।আমরা বাচবো কয়দিন তার সময় জানা আছে?ছেলেটা তো আর শুনবে না কিছু।বিয়ের কথা শুনলেই কেটে পড়ে।মেয়েটাকে একটু সামলে দিয়ে যাও।ম*রেও শান্তি পাবো!”
ইরফান সাহেব এবার আর কোনো জবাব দিলেন না।আনায়ার খাবার যেনো গলায় আটকে যাচ্ছে।ইরফান সাহেব বললেন-
“আচ্ছা আমি ভেবে দেখবো!”
আনায়ার ভেতরটা ভেঙে গেলো বোধহয়।বাবার থেকে এই উত্তরটা আশা করেনি।আদিল থাকলে এই প্রসঙ্গই উঠতো না এই জায়গায়।বাবাও বোধহয় এবার সমাজের দিকটা ভাবলেন।আনায়া আর খেলো না।তার বেশি অভিমান হলো মায়ের প্রতি।না খেয়ে চলে গেলো সে।পিছন থেকে সবিতা বেগম বললেন-
“না খেয়ে কোথায় যাচ্ছিস?আবার অসুখ বাধানোর ইচ্ছা আছে?”
আনায়া পিছন না ফিরে শান্ত ভঙ্গিতে জবাব দিলো-
“সমাজকে খাইয়ে দাও আম্মু!”
সবিতা বেগমের মেজা*জ পুরোই বিগ*ড়ে গেলো।আনায়ার এই এক অভ্যাস।সে কথা কম বলে তবে যাই বলে বা*রুদের মতো কাজ করে।ইরফান সাহেব স্ত্রীকে ঠান্ডা করার প্রচেষ্টায় রইলেন!
অধরা দৌড়াচ্ছে খাবার নিয়ে।দুপুরে তার কাজে যেতে হবে।একটা ক্যাফে শপেই সে পার্ট টাইম জব করে।দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।প্রথমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো মুনতাহাকে নিয়ে যাবে।কিন্তু আনায়া বলেছে মুনতাহা কোথাও যাবে না।সে রাখবে তাকে।এবং আনায়া মেয়েটাকে অনেক যত্নেই রাখে।আনায়ার পরিবারের প্রতিটা মানুষই যেনো মুনতাহাকে বেশ স্নেহ করে।অধরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।অধরা ছুটতে ছুটতে মুনতাহাকে ধরে কোলে বসায়।মুনতাহা খিলখিলিয়ে হাসছে।
অধরা:-“তুমি এমন দুষ্টুমি করছো কেন মুনতাহা?আজকে কিন্তু তোমাকে আনায়া ফুপ্পির কাছে নিয়ে যাবো না!”
মুনতাহা এবার মুখ ফোলালো।অধরা মুচকি হাসলো।
-“বলো তাহলে আর এমন করবে?”
মুনতাহা গাল ফুলিয়েই মাথা নাড়লো না বোধক।অধরা নরম সুরে ডাকলো-
“মা”
মুনতাহা ঘেষে বললো-“হ্যাঁ”
অধরা-“আমার সাথে আজীবন থাকবেন মা?আমার যে আপনি ছাড়া কোথাও কেউ নেই!”
মুনতাহা দু’গাল ভরে হেসে জবাব দিলো-
“হ্যাঁ আম্মা সারাজীবন ঠাকবো তোমাল সাথে”
অধরা হাসলো।জড়িয়ে ধরে মেয়েকে কপালে চু*মু খেলো।মুনতাহাও পরপর কয়েকবার অধরার গালে চু*মু খেলো।অধরা মুনতাহাকে খাইয়ে আনায়ার কাছে আসলো।আনায়ার মুখটা ভার।তাই জিজ্ঞাসা করলো-
“কিছু হয়েছে অনু?আন্টিরও মুখটা ভার দেখলাম”
আনায়া ছোট্ট করে উত্তর দিলো-
“না”
অধরা জোরাজোরি করলো না।সে জানে আনায়া নিজ থেকে না চাইলে কখনো মুখ খুলবে না।মুনতাহা পাশ থেকে জিজ্ঞাসা করলো-
“ফুপ্পি তোমার মন খারাপ?”
আনায়া এবার হালকা হেসে বললো-
“যেখানে স্বয়ং আমার মুনতাহা পাখিই আমার সামনে,সেখানে মন খারাপের প্রশ্ন আসে কোথা থেকে?”
মুনতাহা-“তুমি কিন্তু বলেছিলে আমালে তকলেট খাওয়াবে!”
আনায়া-“তোমার আনায়া ফুপ্পি কথা দিয়ে কথা রাখতে জানে পাখিই!”
মুনতাহাকে কোলে তুলে নিলো সে।অধরা আনায়াকে পরখ করে বললো-
“আন্টি নিশ্চয়ই কিছু বলেছে!”
আনায়া এবার শ্বাস ছাড়লো।বললো-
“বর্তমান যুগের বাবা-মা দের সবচেয়ে বড় চিন্তা হলো সমাজ।তারা ভয় পায় সমাজকে।সমাজের পরোয়ায় তারা সন্তান চিনে না।”
অধরা-“আন্টি বিয়ে নিয়ে কিছু বলেছে?”
আনায়া-“এখন মা বললে আর খারাপ লাগে না।আজ অবাক হয়েছি বাবা প্রতিবাদ করেনি তাই!”
অধরা-“তারা তোরও চিন্তা করে আনায়া”
আনায়া হাসলো।কিছু বললো না।অধরা আবার বললো-
“আমি চাই কেউ আমার জন্য এতোটুকু চিন্তা করুক।কিন্তু দেখ কেউ কোথাও নেই আমার!”
আনায়া বুঝলো অধরার মন বিষণ্ণ হয়েছে।কথা ঘুরানোর জন্য বললো-
“আচ্ছা অধুউ তোকে যদি তোর কোনো তিনটে ইচ্ছের কথা জিজ্ঞাসা
অধরা মুনতাহার দিকে তাকিয়ে নির্দ্বিধায় বললো-
” আমার মুনতাহা দীর্ঘ আয়ু পাক,
আমার মুনতাহা সর্বসুখী হোক,
আমার মুনতাহা সর্বদা সুস্থ থাক!”
আনায়া-“আর নিজের জন্য কি চাই?”
অধরা-“আমি আমার জন্যই চেয়েছি।আমি আমার বলতে কেবল মুনতাহাকেই বুঝি।আমার বেচে থাকা কেবল ওর জন্য!”
আনায়া অধরার হাত ধরে বললো-
“ঠিক আছিস তুই?”
অধরা সব হারানোর পর কেউ মনে তাকে এটা জিজ্ঞাসা করেনি।এই ভাবে কেউ তাকে বলেনি,জানতে চায়নি তার অবস্থা।হুট করে আনায়ার এহেন প্রশ্ন তার চোখ দুইটা জলে ভরে উঠলো।ঢোক গিললো।কান্না দমানোর চেষ্টায় আছে।আনায়া বুঝলো।মুনতাহা দ্রুত অধরা কোলে উঠে বসলো।অধরার গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তেই মুনতাহা ঠোঁট ফুলিয়ে ফুপিয়ে কেদে উঠলো।আনায়া ভড়কে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-
“এমা মুনতাহা কী হয়েছে তোমার ফুপ্পি?”
মুনতাহা ফুপাতে ফুপাতে বললো-
“আমাল ফুপ্পি কে কী বলেতো তুমি?”
আনায়া-“আরেহ্ পাখি আমি তো কিছু বলিনি!”
অধরা মেয়েকে বুকে জড়য়ে বললো-
“আম্মু কান্না করো না।আমার কিছু হয়নি বা আনায়া ফুপ্পিও কিছু বলেনি!”
মুনতাহা-“তুমি কাদো কেন?”
দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ২৬
অধরা-“চোখে কি যেনো গিয়েছে মা।আর কান্না করবো না আমি।তুমি শান্ত হও!”
মুনতাহা সেভাবেই মিশে রইলো অধরার সাথে।অধরা বললো-
“আমি ঠিক আছি অনু।ধন্যবাদ জানতে চাওয়ার জন্য।কেউ এতো বছরে জানতে চায়নি।হুট করে তোর মুখে শুনে বুক টলে উঠলো!”
আনায়া-“কখনো ঠিক না থাকলে আমার সঙ্গ দিস।আমি আর মুনতাহা তো আছি তোকে ঠিক রাখার জন্য!”
অধরা হাসলো।মুনতাহাকে আনায়ার কাছে দিয়ে চলে গেলো সে।
