Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ১৭

দাহশয্যা পর্ব ১৭

দাহশয্যা পর্ব ১৭
Raiha Zubair Ripti

মেহরিনের রুমে ভেজা শরীরে বসে আছে সোলেমান। সানজিদা বেগম স্বামী কে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলেছে ফোন করে,তার মেয়ের জামাই এসেছে বলে। পুরো বাড়ি এখনও বিদ্যুৎ বিহীন। মেহরিনের রুমে একটা হারিকেন আর দুটো মোমবাতি জ্বালানো আছে টেবিলের উপর। জানালা দিয়ে ফুলের ঘ্রাণ আসছে। সোলেমানের ঘ্রাণ নাকে আসতেই বুঝতে পারলো এটা বেলি ফুলের ঘ্রাণ। সোলেমান এবার পুরো রুমে চোখ বুলালো। খুবই সাধারণ রুমের সাজ,বেশ পরিপাটি। রুমে আসবাব বলতে আছে একটা খাট,ড্রেসিং টেবিল,ওয়ারড্রব, পড়ার টেবিল আর একটা চেয়ার,ব্যাস। পড়ার টেবিল জুড়ে একাডেমিক নন-একাডেমিক বই দিয়ে ভরা। সোলেমান এগিয়ে গেলো টেবিলের দিকে, বেশিরভাগই হুমায়ুন আহমেদের বই। আর বিভূতিভূষণ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই আছে কিছু। বই পড়ুয়া এ মেয়ে! সেজন্যই ফোনে এত ম্যচিউর কথা শুনেছিল।

মেহরিন এখনও মায়ের রুমে দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জায় সামনে যায় নি সোলেমানের। সানজিদা বেগম মেয়ের হাতে সাদা লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবি ধরিয়ে দিলেন। নতুন লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি এটা। মোতালেব ভুঁইয়া কেনার পর একদিন ও পড়ে নি। মেহরিনের হাতে দিয়ে বললেন-
-” সোলেমান কে এটা দিয়ে আয় মেহরিন। ছেলেটা এখনও ভেজা শরীরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি খাবার বাড়ছি।
মেহরিন মাথা নেড়ে লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি টা নিয়ে নিজের রুমের দিকে আসতে লাগলো। যতই পা বাড়াচ্ছে ততই বুকের ভেতরটা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। গলাও শুকিয়ে আসছে৷
মেহরিন দরজার সামনে এসে উঁকি দিলো। দেখলো তার স্বামী তার পড়ার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে পিছু ফিরে। মেহরিন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলো। সোলেমানের পেছনে দাঁড়িয়ে বলল-

-” আপনি তো ভিজে গেছেন। পোশাক টা পাল্টে নিন।
স্নিগ্ধ এক কন্ঠস্বর শুনে সোলেমান পেছন ফিরলো। চোখ পড়লো মেহরিনের উপর৷ মাথা নিচু করে পাঞ্জাবি লুঙ্গি ধরে রাখা হাত টা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই মেয়েটাকেই তো তখন দেখলো দরজার সামনে৷ কে এই মেয়ে? যে-ই হোক তাতে সোলেমানের কি? সে এসেছে বউকে দেখতে৷ সে কোনো পিচ্চি মেয়ের সাথে সংসার করবে না। মেয়ের বাবা আসলে মেয়ের বাবাকে বলবে কথাটা।
সোলেমান মেহরিনের হাত থেকে পাঞ্জাবি লুঙ্গি টা নিলো। সে ভেবেছিলো হয়তো পাঞ্জাবির সাথে প্যান্ট আছে৷ কিন্তু না লুঙ্গি নিয়ে এসেছে৷ লুঙ্গি খুব কমই পড়া হয় সোলেমানের৷ বলা চলে কয়েক বছরে হয়তো দু এক বার পড়ে। সোলেমান গম্ভীর গলায় বলল-

-” লুঙ্গি! প্যান্ট নেই?
-” বোধহয় নেই।
সোলেমান কিছু না বলে ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে ওয়াশরুমে গেলো পোশাক বদলাতে। মেহরিনের দম যেন এতক্ষণ আঁটকে ছিলো। রুমের বাহিরে এসে হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
সানজিদা বেগম গরুর গোস, ভাজি,ডাল,মিষ্টি প্লেটে সাজিয়ে টেবিলে রাখলো। সোলেমান ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে নিজেকে আয়নায় দেখলো। না ভালোই দেখাচ্ছে। সানজিদা বেগম রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল-
-” বাবা সোলেমান খাবে চলো।
সোলেমান এগিয়ে এসে বলল-
-” আঙ্কেল এসেছেন? উনার সাথে দরকারি কথা ছিলো আমার।
শ্বশুর মশাই কে বাবা ডাকার বদলে আঙ্কেল ডাকছে! ডাক টা শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো সানজিদা বেগম।
-” না,,বৃষ্টি টা ছাড়লেই চলে আসবে। তুমি খেয়ে নাও।
প্রচুর ক্ষুধাও লেগেছে। সেই সকালে খেয়েছে। সেজন্য দ্বিরুক্তি না করে খেতে বসলো। খাবার টেবিলে গরুর গোস দেখে বলল-

-” গরুর মাংসে আমার এলার্জি আছে।
সানজিদা বেগম লজ্জায় পড়ে গেলেন। এখন তাহলে মেয়ের জামাই কি দিয়ে খাবে ভাত? শুধু ডাল আর ভাজি দিয়ে! ইশ আগে জেনে নিতে পারতো।
-” আসলে জানতাম না তোমার গরুর মাংসে এলার্জি বাবা। ১০ টা মিনিট সময় দাও আমি মুরগী রেঁধে আনছি।
সোলেমান সাথে সাথে মানা করলো। শুধু শুধু উনাকে প্যারা দেওয়ার মানেই হয় না। একটা রাতই তো। সকাল হলেই তো সম্পর্ক শেষ করে দিবে। ভাজি আর ডাল দিয়েই কোনো রকমে খেলো। গলা দিয়ে নামতে চাইছিলো না খাবার। জোর করে খেলো কয়েক লোকমা। মুখের এক্সপ্রেশন টাও স্বাভাবিক রাখলো। অথচ মুখের ভেতর এক প্রকার যুদ্ধ করে খেলো খাবার টা। সাধারণত একমাত্র দুপুর ছাড়া সোলেমান ভাত খায় না। তাও অল্প পরিসরে ভাত খায়। খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে বেশ বাছাই করে খায় সোলেমান।
খাওয়া শেষে সোলেমান হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়ালো। সেরিন বললো-

-” ভাইয়া আপনি রুমে যান, আমি মেহরিন কে পাঠিয়ে দিচ্ছি। সোলেমান রুমের দিকে যাচ্ছিলো,মাঝপথে আবার সেই মেয়ের সাথে দেখা। মেয়েটা সোলেমান কে দেখেই এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করতে চাইলো-
-” আপনার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?
কিন্তু বলতে পারলো না। এগিয়ে আসতেই ফ্লোরে পড়ে থাকা পানিতে পা পিছলে পড়ে যেতে নিলে সোলেমান হাত বাড়িয়ে মেহরিনের হাত ধরে ফেলে। পড়তে পড়তেও মেহরিন বেঁচে যায়। মেহরিন সোজা হয়ে দাঁড়ালে সোলেমান মেহরিনের হাত ছেড়ে বলল-

-” সাবধানে চলাফেরা করুন।
কথাটা বলেই রুমের দিকে চলে গেলো। এই প্রথম তাদের একে ওপরে স্পর্শ করা হলো। মেহরিন নিজের বাহ হাতটা স্পর্শ করলো। লোকটার কথার টোন টা আজ এমন কেনো? আপনি করে বলছে কেনো?
সোলেমান রুমে এসে অপেক্ষা করতে লাগলো তার বাচ্চা বউয়ের। মেহরিন খাবার টেবিলে এসে দাঁড়ালো। মায়ের মুখ কালো দেখে জিজ্ঞেস করলো-
-” কিছু হয়েছে মা?
-” সোলেমানের গরুর মাংসে এলার্জি। ইশ ছেলেট শুধু ভাজি আর ডাল দিয়ে কোনো রকম খেলো। একটু জিজ্ঞেস করিস তো সোলেমান কি কি খায়। সকালে সেসব রাঁধবো।
-” আচ্ছা চিন্তা করো না। আমি জেনে জানাবো তোমায়।
-” হুমম৷ এখন রুমে যা সোলেমানের কাছে।

মেহরিন ছোটো করে হুমম বলে নিজের রুমে আসলো। সোলেমান মাথা নিচু করে বসে আছে। মেহরিন দরজাটা লাগাতে গিয়ে শব্দ হলো৷ সোলেমান মাথা উঁচু করে তাকালো। অপরিচিত এক মেয়েকে দরজা লাগাতে দেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
-” আশ্চর্য আপনি দরজা কেনো লাগাচ্ছেন! কে আপনি? দেখেন নি আপনি, আমি রুমের ভেতরে আছি? দরজা খুলুন তাড়াতাড়ি, বাড়ির লোকজন কি ভাববে জানেন সেটা? আর আমার ল্যাদা বাচ্চা বউ কোথায়? ডেকে আনুন তাকে। আসার পর একবারের জন্যও তার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয় নি। তাকে ডাকুন,তার সাথে কথা আছে আমার।
মেহরিন স্তব্ধ,হতবিহ্বল হয়ে হলো স্বামীর মুখে এমন কথা শুনে। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই নিজের দু হাত কচলাতে কচলাতে বলল-

-” আমাকে আপনি চিনতে পারছেন না?
-” কে আপনি? আপনাকে চিনে কি করবো আমি?
-” আমি মেহরিন।
কথাটা কানে আসতেই সোলেমান কুঁচকে থাকা কপাল আরো কুঁচকালো।
-” মজা করছেন আমার সাথে? আপনি মেহরিনের বোন টোন হবেন তাই তো? দেখুন মজার মুডে নেই আমি। প্লিজ আপনার বোন কে পাঠিয়ে দিন রুমে।
-” মজা কেনো করবো আমি? আমিই মেহরিন৷ আপনি চিনছেন না কেনো আমায়?
-” আপনি কি করে মেহরিন হতে পারেন? আমার বিয়ে তো অন্য এক মেয়ের সাথে হয়েছে। দেখি সরুন তো। রুমের দরজা খুলতে দিন।
সোলেমান দরজা খুলে বাহিরে আসলো। সেরিন বসার ঘরেই ছিলো। সোলেমান কে বের হতে দেখে বলল-

-” ভাইয়া কিছু লাগবে?
সোলেমান সোজাসাপটা উত্তর দিলো-
-” আপনার বোন কে লাগবে আমার। আপনার বোন কোথায়?
মেহরিন রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। সেরিন একবার মেহরিনের দিকে তো আরেকবার সোলেমানের দিকে তাকাচ্ছে। না তার বোন তো কালো না যে আঁধারে সোলেমান দেখতে পারবে না। তার বোন তো চাঁদের মতন উজ্জ্বল করছে। তারপরও সোলেমানের নজরে পড়ছে না!
-” ভাইয়া মেহরিন তো আপনার পাশেই।
সোলেমান আশেপাশে তাকালো। সেই মেয়েকে দেখে বলল-
-” কোথায় মেহরিন আমার পাশে?
সেরিন মেহরিনের বাহু ধরে সামনে এনে বলল-

-” এই যে মেহরিন। দেখতে পাচ্ছেন না ওকে?
সোলেমান বুঝতে পারছে না এই মেয়েকে কেনো মেহরিন বলা হচ্ছে?
-” ও মেহরিন?
-” আপনি কি বিয়ের আগে দেখেন নি মেহরিন কে?
-” দেখেছিলাম তো৷ কিন্তু তখনকার মেহরিন আর এখনকার মেহরিনের তো কোনো মিল নেই। এক মিনিট সেদিন যে শাড়ি নিতে যাকে পাঠানো হয়েছিল সে কে ছিলো তাহলে?
মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
-” কোন শাড়ি?
-” বিয়ের শাড়ি।
সেরিন বলল-
-” ওটা তো ঊর্মি ছিলো ভাইয়া। মেহরিনের বান্ধবী।

সোলেমান যে এমন সিচুয়েশনে পড়বে তা কল্পনাও করতে পারে নি। এতদিন ধরে যাকে বউ ভেবে এসেছে সেটা বউয়ের বান্ধবী ছিলো! কেনো সেদিন বউয়ের ছবি দেখলো না। ঢং করে বলেছিল দেখা লাগবে না। সেদিন দেখলে তো আর আজকে এমন বাজে সিচুয়েশনে পড়তে হতো না। কি লজ্জার বিষয়,স্বামী তার বউকে চিনতে পারে নি।
সোলেমান চুপচাপ রুমে ঢুকে পড়ল। তার মুখে কোনো শব্দ নেই, মনে যেন শত শব্দের কোলাহল।
মেহরিন সেরিন কে দেখছি বলে রুমে আসলো। ভাগ্যিস সানজিদা বেগম তার রুমের ভেতর ছিলো৷ সোলেমান রুমাইসা কে হোয়াটসঅ্যাপে নক দিলো৷ মেসেজ দিয়ে বলল-

-” মেহরিনের ছবি থাকলে একটা ছবি পাঠা তো।
রুমাইসা ভাইয়ের মেসেজ পেয়ে মেহরিনের সাথে তোলা বিয়ের ছবি আর বাড়িতে তোলা ছবি দুটো পাঠালো। সোলেমান দেখলো। কত বড় বেকুবের বেকুব সে৷ রাজনীতির মাঠে কখনও ঘোল না খেলেও বউকে নিয়ে ঠিকই ঘোল খেয়ে নিলো। মেহরিন এগিয়ে আসতেই সোলেমান দম নিয়ে বলল-
-” অ্যা’ম এক্সট্রিমলি সরি ফর এভ্রিথিং। আসলে আমি এতদিন ধরে তোমার বান্ধবী কে…অ্যা’ম রিয়েলি রিয়েলি ভ্যেরি সরি।
মেহরিনের অনুভূতি টা বলে বোঝানোর মতন না। প্রথম দেখাতেই স্বামীর মুখে শুনতে হচ্ছে তার প্রাণপ্রিয় বান্ধবী কে তার স্বামী বউ ভেবে এসেছে৷ ঘটনা টা এক্সিডেন্টলি হলেও এর প্রভাব টা মারাত্মক লাগলো মেহরিনের। এক বুক বিষাদ নিয়েও মেহরিন স্মিত হেসে বলল-

-” জ্বি বুঝতে পেরেছি।
সোলেমানের মনে হলো মেহরিন সহজ ভাবে নেয় নি বিষয় টা। সেজন্য মেহরিনের হাত ধরে বিছানার উপর বসিয়ে বলল-
-” জানি বিষয় টা সহজ ভাবে নাও নি। আমি বলছিও না সহজ ভাবে নিতে। আসলে সেদিন তোমার আম্মু বলেছিল মেহরিন কে পাঠাচ্ছি, তো আমি ভেবেছি ওটাই তাহলে মেহরিন। এখানে আমার নিজেরও তো কোনো ভুল দেখছি না আমি।
মেহরিন চুপচাপ শুনলো কথাগুলো৷ সোলেমান তাকিয়ে আছে মেহরিনের মুখের দিকে৷ সে তো এসেছিল বউ তালাক দিতে। কিন্তু এখন তো দেখছে বউ ই তো পাল্টে গেছে তার। কিভাবে যেনো মনের ডিকশনারি থেকে তালাক নাম একটা শব্দ মুছে গেলো। ক্ষণিকের জন্য নাকি পারমানেন্ট সেটাও মনে করার প্রয়োজন বোধ করলো না।

-” বয়স কত তোমার?
মেহরিন ভাবনায় ছিলো। তাই কথাটা মস্তিষ্ক অব্দি পৌঁছায় নি। সেজন্য জিজ্ঞেস করলো-
-” জ্বি?
-” তোমার বয়স কত?
-” ১৭ বছর।
-” আমি তোমার থেকে কত বছরের বড় জানো?
-” হুমম।
-” কত বলো?
-” ১৫ বছরের।
-” তাহলে ভাবতে পারছো তুমি আমার চেয়ে কত ছোট? তুমি নিত্যান্ত একটা ছোট পিচ্চি বাচ্চা মেয়ে মেহরিন। তোমার বাবা তোমাকে বিয়ে দিলো কেনো? তোমার এখন পড়াশোনা করার বয়স,বাড়তি উড়ন্ত বয়স। উড়তে না দিয়ে তোমাকে বিয়ে দিয়ে শিকলে বেঁধে দিলো। যদি বিয়ের আগে জানতাম আমি বাল্যবিবাহ করতে যাচ্ছি তাহলে ক…

-” তাহলে কি বিয়েটা করতেন না?
-” ঠিক বলেছো। একদমই বিয়েটা করতাম না। আজ জানলাম আমি এক পিচ্চি ল্যাদা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করেছি। ঠিক সময়ে বিয়ে করলে তোমার মতন একটা বাচ্চা থাকতো আমার।
মেহরিনের মুখ টা চুপসে গেলো বাচ্চা ল্যাদা শব্দ গুলো শুনে। তার কাছে তো বয়স ডাজেন্ট ম্যাটার। আর উনি কথায় কথায় সেই কথাগুলোই বলছে।
-” বিয়ে টা তো হয়েই গেছে। এখন তাহলে কি করতে চাচ্ছেন?
সোলেমান ভেবে বলল-
-” আজ একটা জিনিস ভেবে এসেছিলাম বুঝলে তো৷ কিন্তু মনে হচ্ছে এখন সেটা কার্যকর হবে না। তাই সেটা আপাততঃ ভাবছি না আর। কিন্তু অন্য একটা কথা ভাবছি।
-” কি কথা?
-” পড়াশোনা করার ইচ্ছে আছে?
-” জ্বি।
-” কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হবে। মন দিয়ে পড়াশোনা করো। তারপর দেখছি কি করা যায় তোমার সাথে। নিজেকে দিয়ে একটা কথা আজ ভীষণ মানলাম বুঝলে মেহরিন।

-” কি সেটা?
-” এতদিন শুনেছি বুড়ো বয়সে বিয়ে করলে কচি সুন্দর মেয়ে কপালে জুটে। দেখো আমাকে দিয়ে সেটার আজ প্রমান পেলাম। আমি এক বুড়ো ব্যাটা পেলাম কচি বাচ্চা বউ ছ্যা কি কপাল আমার! লোকে বলবে আমি এক এমপি হয়ে বাচ্চা বিয়ে করছি!
-” বিয়েই তো করেছেন৷ অপরাধ তো করা হয় নি।
-” আমার কাছে এটা অপরাধই। আমি সবাইকে জ্ঞান দেই যে বাল্যবিবাহ যেখানেই দেখবে সেখানেই রুখে দাঁড়াবে। তাহলে ভাবতে পারছো কত বড় বেঈমানী করেছি আমি! আমি আশ্চর্য হচ্ছি আমার বিয়েতে কেউ কোনো রুখে দাঁড়ালো না!

-” এখন আর এসব বলে কি হবে? আমি তো মেনেই নিয়েছি।
-” কিন্তু আমি মানতে পারছি না বুঝলে? আমার একটা সামাজিক অবস্থান আছে। ঢাকায় কারো কানে এসব গেলে এটা নিয়ে নিউজ হবে। আর আমি টোটালি চাই না এসব৷ কাল সকালেই আমি ঢাকা ব্যাক যাব। তুমি এখানেও থাকতে পারো আবার ও বাড়িতেও থাকতে পারো। তোমার ইচ্ছে।
-” কালই চলে যাবেন!
-” জ্বি কালই। বাচ্চা বউয়ের সাথে সংসার করার ইচ্ছে নাই। তুমি পড়াশোনা করে বড় হও আগে। তারপর…
-” কত বড় হতে হবে?
-” তুমি এখন আমার হার্ট বরাবর। কাঁধ বরাবর হও আগে।
-” মনে হয় না আর লম্বা হবো।

-” তাহলে শোনো মেয়ে তোমাকে আমি স্বাধীনতা দিব। তোমার উড়ন্ত বয়স,,কদিন গেলেই মনে হবে তুমি আমার সাথে আর থাকতে পারবে না। এই বয়সে আজ একে তো কাল আরেকজন কে পছন্দ হয়ে যায়। প্রেম করার বয়সে তোমার বাপ তোমার বিয়ে দিয়ে বসে আছে৷ শোনো একদম ভয় পাবা না। এই বয়সে যদি তোমার মনে প্রেম আসে, সেটা অস্বাভাবিক কিছু না। এটা তোমার বয়সের অধিকার। তোমার যদি কখনও কাউকে পছন্দ হয় নির্দ্বিধায় আমায় বলবে। আমি নিজ দায়িত্বে তোমার বিয়ে দিব তার সাথে।
মেহরিন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো স্বামীর মুখে এহেন কথা শুনে। কি বলছে সে! নিজের বউয়ের আবার বিয়ে দিবে! এই স্বাধীনতা তো মেহরিন চায় নি। কান্না পেয়ে গেলো মেহরিনের।
সোলেমান ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখলো তার চাচা ফোন করছে। ফোনটা কেটে বলল-

-” ঘুমাবে তো?
-” হুমমম।
-” ঘুমাও।
সোলেমান বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। মেহরিন সেটা দেখে বলল-
-” আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
-” আমি একটু আসছি।
সোলেমান বেলকনিতে চলে আসলো। চাচাকে কল ব্যাক করলো। ওপাশ থেকে বাশার সুলতান বলল-
-” কতদূর? ব্যবস্থা হবে তো?
-” ঢাকায় ফিরে জানাচ্ছি।
সোলেমান ফোনটা কেটে দিয়ে ধীর পায়ে রুমে ঢুকলো। ভিতরে আসতেই চোখ গেল বিছানার দিকে। মেহরিন ঘুমিয়ে পড়েছে। সাদামাটা এক পজিশনে শরীরটা গুটিয়ে রেখেছে। আলো-আঁধারির এই ঘরে মেয়েটাকে এক অদ্ভুত শান্ত, নরম ছায়ার মতো লাগছে।
প্রথম দেখায় এক প্রকার মুগ্ধ হলেও তা গুরুত্ব দেয়নি খুব একটা। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, মেয়েটি সত্যিই সুন্দর। ভীষণভাবে সুন্দর।
তবে তার চেয়েও যেটা সোলেমানকে ভাবায়, তা হলো নিজের ভিতরের দ্বন্দ্ব।

মনের কোণে এখনও একরকম শূন্যতা, একধরনের অনাগ্রহ জমে আছে,সংসার নিয়ে, এই সম্পর্ক নিয়ে। মেহরিন এখনো কিশোরী মনের অধিকারিণী। বয়সে টিনএজ পার করছে ঠিকই, কিন্তু আবেগ আর বাস্তবতার ভারসাম্য গড়ার বয়স এটা নয়। আজ সে আবেগে ডুবে সোলেমানের পাশে থাকতে চাইছে। কিন্তু ক’দিন পর, হয়তো কয়েক মাস বা বছর পর, যখন বাস্তব জীবনের রূঢ়তা তাকে ছুঁয়ে যাবে, তখন তার বিবেক প্রশ্ন তুলবে,তখন মেহরিনের মনে হবে সে ভুল করেছে। মেয়েটা এখনো বাচ্চা। এবং সে তার মতো একজন মানুষের সাথে সংসার করার অধিকার রাখে৷ কবছর গেলে সোলেমানের বয়স আরো বাড়বে। তখন মেহরিন যৌবনে পদার্পণ করবে। তার চাহিদা আকাঙ্খা বাড়বে। মেহরিনে এখন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সঙ্গে জীবন কাটানোর মতো মানসিক পরিপক্বতায় পৌঁছায়নি।
সোলেমান এসে পাশে শুয়ে পড়লো উল্টোদিকে ফিরে। মেহরিন তাকালো। সোলেমান বুঝলো মেহরিন জেগে আছে৷ আর তাকিয়েও আছে তার দিকে। সেজন্য না ঘুরেই বলল-

-” না ঘুমিয়ে জেগে থাকার কোনো মানেই হয় না। আমি তো সময় দিয়েছি তোমায়। ইন্টার পাশ করো আগে। এখন সংসার করার জন্য অনুপযোগী তুমি। একটু পরিপক্ব হও৷ বাস্তবতা বুঝো। আমাকে সামলানো তোমার মতন বাচ্চা মেয়ের পক্ষে এখন একেবারেই সম্ভব নয়৷ আমি অপেক্ষা করতে পারলে আশা করি তুমিও পারবে।
এদিকে আফিয়া সুলতান সানজিদা বেগম কে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছেন-
-” ভাবি সোলেমান গিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি করে নি তো?
সানজিদা বেগম বুঝলেন না কথাটার মানে। বাড়াবাড়ি কেনো করবে?
-” না তো ভাবি। সোলেমান তো মেহরিনের সাথে রুমে আছে।

আফিয়া সুলতান শান্তির শ্বাস ফেললেন। তারমানে এখনও হম্বিতম্বি করে নি তার ছেলে। আর কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ফোন কেটে দিলো।
মোতালেব ভুঁইয়া ১০ টার পর আসলেন ঝড় বৃষ্টি ছাড়লে। এসে মেয়ের জামাইয়ের সাথে দেখা করতে চাইলে দেখে ঘুমিয়ে গেছে তারা। তাই আর জাগায় নি।
ইমন ফোনে কথা বলছে ঊর্মির সাথে। বোনের প্লাস আসে নি। ইমন শুধু শুনলো বোনের কথা গুলো। ঊর্মি বলছে-
-” খুব চেষ্টা করেছিলাম ভাইয়া। হয়তো ত্রুটি থেকে গিয়েছিল চেষ্টায়। সেজন্য পাই নি। জানো মেহু এলাকার মধ্যে ২য় হয়েছে।
মেহরিনের রেজাল্ট শুনে ইমনের মুখে কিঞ্চিত হাসি ফুটলো,তবে প্রসারিত হলো না। বোন কে বুঝালো-

-” প্লাস টাই জীবনের সব না ঊর্মি। কেউ জীবনে প্লাস পেয়েও শেষে শূন্য হয় আর কেউ প্লাস না পেয়েও জীবনে পূর্ণ হয়। এখন কলেজের জন্য প্রিপারেশন নে,ভাইয়া আছে সবসময় তোর সাথে। আর মেহরিন কে আমার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাস। মেয়েটার অনেক বড় স্বপ্ন ডাক্তার হবে৷ আল্লাহ ওর মনের সকল ইচ্ছে পূরণ করুক।
-” হুমম আমিও তাই চাই। আচ্ছা খেয়েছিস রাতে?
-” সন্ধ্যার সময় খেয়েছি। আচ্ছা কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো তোদের?
-” না ভাইয়া।
-” রাখছি তাহলে। কোনো কিছুর দরকার হলে জানাবি আমায় ততক্ষণাৎ।
-” আচ্ছা।

রাত টা কোনো রকমে পাড় করেই সকাল সকাল ঢাকায় ব্যাক করেছে সোলেমান। আসার পথে মেহরিনের সাথে খুব বেশি কথা বলে নি। শুধু বলেছি নিজের যত্ন নিতে। খাবার খেয়েছে। সানজিদা বেগম রুটি, মুরগির মাংস রেঁধেছিলেন। মোতালেব ভুঁইয়া আর দুটো দিন থেকে যেতে বললেন৷ সে তো মেয়ের জামাই কে সেভাবে আপ্যায়ন করার সুযোগ টা পেলোই না৷ সোলেমান বলেছে আবার আসবে আজ তাকে যেতেই হবে।
মেহরিনের ভীষণ মন খারাপ হলো সোলেমানের চলে যাওয়ায়৷ মেহরিন তপ্ত শ্বাস ফেললো৷ কথা গুলো খুব একটা মন্দও বলেন নি তিনি৷ মেহরিন কে পড়াশোনায় ফোকাস হতে হবে। ইন্টার লাইফ টা হেলাফেলা করলে মেডিক্যালে চান্স পাবে কি করে!
সোলেমান ঢাকায় ফিরতেই আগে দেখা হলো চাচার সাথে। তার চাচা ক্লাবের কক্ষে অপেক্ষা করছিলো তার। সোলেমান গা এলিয়ে দিয়ে চেয়ার টেনে বসে বলল-

-‘ কিছু বলবে নাকি?
-” এটা কি করলি তুই? তোকে বলেছিলাম..
সোলেমান গম্ভীর গলায় বলল-
-” হবে না। অন্য কোথাও থেকে ব্যবস্থা করো। আর তা না পারলে ডাবল টাকা দিয়ে দাও সেই ক্ষতিপূরনের।
-” মাথা ঠিক আছে তোর? কথা কিন্তু এটা ছিলো না সোলেমান।
-” কথা যেটাই থাকুক শুরুতে। এখন যেটা বলেছি সেটাই ফাইনাল। শ্বশুর বাড়ি থেকে ফিরেছি ডিস্টার্ব করো না। বউয়ের রেশ এখনও মাথা থেকে বের হয় নি। বহুত কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে এসেছি। মা এতদিনে একটা ভালো কাজ করছে আমার বিয়েটা দিয়ে। কথা ছিলো গিয়ে তালাক দিব। উল্টো…
-” উল্টো কি? বউ দেখে ফিদা হয়ে গেছিস?
-” বিষয় টা হয়তো তেমনই। যদিও মেয়ের বয়স কম। তবে দু বছর অপেক্ষা করতে তেমন একটা কষ্ট হবে না তাই না চাচা?
বাশার সুলতান বিরক্ত হলো।

-” বউ পাগল হয়ে ফিরলি শেষমেশ? বিয়েই তো করতে চাস নি।
-” শেষ পর্যন্ত তো করেই ফেললাম। আর করেই তো ফেঁসে গেলাম।
-” তালাকের কি হলো?
-” আপাততঃ ভাবছি না এটা নিয়ে। যদি ভাবার প্রয়োজন হয় তাহলে আবার ভাববো।
-” যা ইচ্ছে হয় তাই কর। আমি গেলাম। এক দেখাতেই এত বউ পাগল কে হয়?
সোলেমান গলা উঁচিয়ে বলল-
-” নওয়াজ সোলেমান সুলতান ছাড়া আবার কে?
বিকেলের দিকে এজওয়ান বাড়ি ফিরলো। বাশার সুলতান সোফাতে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। ছেলের দিকে তাকালেন। সারাদিন টইটই করে এখানে ওখানে চলে যায়। বাবার সাথে লাস্ট কবে কথা বলেছে একদণ্ড বসে মনে নেই। বাশার সুলতান খবরের কাগজ টা রেখে ছেলেকে ডেকে বলল-

-” এজওয়ান সারাদিন কই থাকিস তুই? ঘরে থাকতে পারিস না?
এজওয়ান পিছু ফিরে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল-
-” ঘরে কি এমন আছে যেটার লোভে আমি ঘরে থাকবো?
-” তো কি সারাদিন এভাবেই টইটই করে ঘুরবি? তোর বের হবার কথা শুধু রাতে। তুই দিনেও বের হচ্ছিস।
-” আমার পেছন লাগলে কেনো আজ? আমাকে আমার মতন থাকতে দাও৷ আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি৷
-” তোর ভাই শ্বশুর বাড়ি থেকে ফিরে পাল্টে গেছে।
-” কেমন পাল্টে গেছে?
-” বউ পাগল হয়ে গেছে।

দাহশয্যা পর্ব ১৬

-” এতে তোমার হিংসা হওয়ার কারন কি বুঝলাম না৷ বউ পাগল হবে না তো কি হবে? এখন আমাকেও বিয়ে দিয়ে দাও। বউ পাগল হয়ে যাই ভাইজানের মতন। তোমার একা লাগলে বলো বাপ ব্যাটা তাহলে একই দিনে বিয়ে করে ফেলি,কি বলো? মেয়ে দেখবো তোমার জন্য? তাহলে আর মিঙ্গেল দের দেখে তোমার হিংসা করবে না।
বাশার সুলতান রেগে গেলেন।
-” হা’রামজাদা হতচ্ছাড়া বাপ কে বিয়ে দিতে চাচ্ছিস তুই! পেটের শত্রু কোথাকার।
-” ভুল বললে কথাটা,তোমার পেটে হই নি আমি। তোমার বউয়ের পেটে হয়েছিলাম।

দাহশয্যা পর্ব ১৮