দাহশয্যা পর্ব ১৮
Raiha Zubair Ripti
দিনটা আজ শুক্রবার জুলাই মাসের ৩ তারিখ। সকালের ব্রেকফাস্ট করছে সুলতান নিবাসের লোকজন। সোলেমান একবার চাচার দিকে তাকালো। তার চাচার মুখ টা কালো দেখে বলল-
-” ২৮ দিন পর কোরবানি ঈদ,চাচা খেয়াল আছে সে কথা?
বাশার সুলতান মুখ গোমরা করে খেতে খেতে বলল-
-” আমার মনে আছে। তোরই তো নেই মনে।
সোলেমান কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল-
-” মনে না থাকলে বলছি কিভাব? আর এমন পানসে মুখে কথা বলছো কেনো? কোনো রস টস নেই কথায়।
পাশ থেকে এজওয়ান টেবিল থেকে আপেল তুলে নিয়ে বলল-
-” বাবার মুখে রস কিভাবে থাকবে ভাইজান? তার জীবনেই তো রস নেই। যৌবন কালে সব রস ফুরিয়ে গেছে। এখন তো বুড়ো হচ্ছে । দেখছো না দাঁড়ি চুল সাদা হয়ে গেছে।
বাশার সুলতান নিজের চুল দাঁড়ি তে হাত বুলিয়ে বলল-
-” সেদিন না কলব লাগালাম। হেরে এজওয়ান কলব টা কি উঠে গেছে?
-” শাক দিয়ে কি আর মাছ ঢাকা যায় বাবা? যায় না তো। তেমনই তোমার পাকা চুলও ঢাকা যাবে না। ফেক মানুষ কোথাকার।
-” তো কি করবো? পাকা চুল দাঁড়ি নিয়ে চলাফেরা করবো লোকজনের মাঝে? লোকে আমাকে বুড়ো ভাববে।
রেগে বললো বাশার সুলতান। এজওয়ান বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল-
-” তো তুমি কোথাকার কোন যুবক যে লোকে তোমাকে হ্যান্ডসাম হিরো ভাববে? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখো বয়স কত তোমার। এক পা তো কবরে চলে যাওয়ার দিকে। আর আরেক পা আমার ঘাড়ে দিয়ে বসে আছো।
বাশার সুলতান ছেলের এহেন কথায় রেগে গেলো। সোলেমানের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” দেখছিস তোর ভাই আমার সাথে কিভাবে কথা বলে! আমি ওর চেয়ে সুন্দর হ্যান্ডসাম বলে আমাকে হিংসা করছে।
এজওয়ান হো হো করে হেঁসে ফেললো।
-” সিরিয়াসলি আমি করবো তোমাকে হিংসা বাবা! তা কি নিয়ে হিংসা করবো তোমার পাকা চুল দাঁড়ি নিয়ে! নাইস জোক্স। তোমার চেয়ে বেশি হ্যান্ডসাম,ড্যাশিং আমি এজওয়ান। বরং তুমিই আমাকে হিংসা করো। তুমি জেলাশ আমাকে নিয়ে, আমার ইয়াং নেস নিয়ে। ছিঃ বাবা ছিঃ নিজের ছেলেকে তুমি হিংসা করো বুড়ো বয়সে। তোমার চেয়ে চাচা বেশি ইয়াং। সে বললে তাও মানাতো।
-” দেখ এজওয়ান একদম বুড়ো বলবি না আমাকে বলে রাখলাম।
-” বুড়ো কে বুড়ো বলবো না তো কি বলবো?
-” খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু বলে রাখলাম।
সোলেমান বিরক্ত হলো ভাই আর চাচার এহেন কথায়। ধমক দিয়েই বলল-
-” আহ্ থামবে তোমরা? কি বাচ্চাদের মতন ঝগড়া করছো বলো তো? আর চাচা নিজেকে খোকা ভাবা বাদ দাও। আর এজওয়ান তুই চাচা কে খেপানো বাদ দে।
বাশার সুলতানের চোখ মুখে রাগ স্পষ্ট হলো। সোলেমান ইনিয়েবিনিয়ে এজওয়ান কেই সমর্থন করে ইডিরেক্টলি বুঝালো বাশার সুলতান বুড়ো!
-” শোনো চাচা যে কথা বলা। গরু গুলো কে ঠিকমতো পৌঁছে দিবে কিন্তু ঈদের আগে। যেই একটা বাদ ছিলো সেটা পেয়েছো?
বাশার সুলতান ছোট্ট করে বলল-
-” হুমম।
-” গুড। উনাদের ১৬ টা গরু দরকার ছিলো। এখন যেহেতু ১৬ টাই আছে খামারে তাহলে খাইয়ে দাইয়ে মোটাতাজা করে পাঠিও ঈদের আগে। উনারা তো হাঁটে নিবে গরু গুলো।
-” আচ্ছা। আর তোর কাছে থাকা গ…
সোলেমান অদ্ভুত এক দৃষ্টি তাক করলো চাচার দিকে।
-” ওটা আমার গরু। এখনও বাচ্চা। বড় হোক। ওটাকে আমি কোরবানি দিব। চোখ তুলেও তাকাবে না ঐ গরুর দিকে। ওটা সুলতান ভিলায় থাকবে।
-” ঈদে কি ও বাড়িতে থাকবি?
-” আমি একা না তোমরাও থাকবে।
এজওয়ান উঠতে উঠতে বলল-
-” আমি যেতে পারবো না ভাই। গ্রাম ট্রামের পরিবেশ বোরিং লাগে।
বাশার সুলতান রেগে বলল-
-” তো তুই কি ঢাকায় থাকবি এর ওর পাছায় বাঁশ ঢোকানোর জন্য?
এজওয়ান নাক ছিটকিয়ে বলল-
-” ছি ভাষার কি অধপতন তোমার। তোমার বাবা কি তোমায় স্কুল কলেজে পড়ায় নি নাকি? ছেলের সাথে এভাবে কেউ কথা বলে?
-” ওরে আমার সোনার চান্দু পিতলার ঘুঘু জানবাচ্চা টা আসো তোমাকে কোলে নিয়ে ঘুরি।
এজওয়ান যেতে যেতে বলল-
-” দরকার নেই। কোলে তো নিতেই পারবে না৷ উল্টো ফেলে দিয়ে আমার কোমর ভেঙে দিবে।
-” যাচ্ছিস টা কোথায়?
-” দেখি কোথায় যাওয়া যায়। আসছি, বাসায় ফিরলে আবার ঝগড়া হবে।
এজওয়ান চলে গেলো। বাড়ি থেকে বের হয়ে বাহাদুর কে কল দিয়ে আসতে বললো। বাহাদুর এজওয়ানের হুকুম পেয়ে চলে আসলো। বাহাদুর গাড়ি নিয়ে সোলেমান দের বাড়ির সামনে আসে। এজওয়ান গাড়িতে উঠে বসলো। বাহাদুর জিজ্ঞেস করলো-
-” কোথায় যাবি?
-” কোথাও না।
-” তাহলে ডাকলি কেনো?
-” ঘুরতে।
-” কোথায় ঘুরবি?
-” জানি না।
-” কোন বা’ল জানিস তাহলে?
-” বেয়াদব অশ্লীল ব্যাডা গাড়ি চালা। সোজা যেতে থাকবি শুধু।
-” সীমানা নাই?
-” না সীমাহীন।
বাহাদুর গাড়ি চালানো শুরু করলো। শাহবাগ দিয়ে এসে কলাবাগানে আসতেই জ্যামে আটকে পড়লো গাড়ি। এজওয়ান বিরক্ত হলো। আকস্মিক গাড়ির জানালা দিয়ে বাহিরে তাকাতেই দেখতে পেলো মাহি কে। ভ্রু কুঁচকে আসলো তার। মাহি একা না। মাহির একটা ছেলের বাইকে বসে আছে জ্যামে উল্টোপথে। কে এই ছেলে? একদম জড়িয়ে ধরে আছে একদম। খুব ঘনিষ্ঠ কেউ? ছেলেটা দেখতে শুনতে তো যথেষ্ট হ্যান্ডসাম।
এজওয়ান নিজের ফোনটা দিয়ে ওদের একটা ছবি তুলে নিলো। জ্যাম ছাড়তেই মাহিদের বাইক চলে গেলো। এজওয়ান বাহাদুরের দিকে ছবিটা দিয়ে বলল-
-” চিনিস এই লোকটা কে?
বাহাদুর দেখলো জুম করে ছবি টা।
-” হ্যাঁ চিনি তো।
-” কে এই লোক?
-” সিআইডি অফিসার সাফওয়ান মির্জা।
-” সিআইডি উনি?
-” হুমম। বেশ নাম ডাক তার।
-” ওর সাথে নূর জাহানের কি সম্পর্ক?
-” সেটা বলতে পারবো না।
-” খোঁজ নিয়ে জানা তো।
-” আচ্ছা জানাবো নি।
এজওয়ান বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো। সামনের দিকে তাকাতেই দেখলো জ্যাম ছেড়ে গেছে। বাহাদুর গাড়ি স্টার্ট দিলো। এজওয়ান ফোন টা পকেটে ভরতে গিয়ে দেখলো ফোনে একটা নোটিফিকেশন এসেছে। নম্বর টা অস্ট্রেলিয়ার খুবই পরিচিত৷ বাংলাদেশে আসার পর আজই আসলো প্রথম মেসেজ। মেসেজে লেখা আছে।
-” On a trouvé un indice pour le retrouver. Elle est au Bangladesh. Et elle est à Dacca. Je t’envoie sa photo, regarde-la.[ তাকে খোঁজার একটা ক্লু পাওয়া গেছে। সে বাংলাদেশে আছে। আর সে ঢাকাতেই আছে। তার ছবি পাঠাচ্ছি দেখে নিও।]
মেসেজ টা পড়ার সাথে সাথে একটা ছবি আসলো। কিন্তু সেই মুহূর্তেই ফোনের ডাটা শেষ হয়ে যাওয়ায় ছবি টা আর দেখা হলো না। এজওয়ান বাহাদুর কে জিজ্ঞেস করলো-
-” তোর ফোনে ডাটা আছে?
-” না কেনো?
-” যেহেতু নেই তাহলে বলে মুখ ব্যথা করে লাভ নেই। ভালো লাগছে না বাসায় দিয়ে আয়।
সাফওয়ান মাহিকে নিয়ে তার অ্যাপার্টমেন্টে চলে আসলো। এখানে মাহি একাই থাকে। যখন দরকার হয় তখন বোনের কাছে তো কখনো ও বাড়িতে চলে যায়। অ্যাপার্টমেন্টের গেটের সামনে বাইল থামাতেই মাহি বাইক থেকে নেমে পড়লো। সাফওয়ানের দিকে তাকালো। দীর্ঘ ৪ বছরের সম্পর্ক তাদের। ছেলেটা এত ভালো এত কেয়ারিং যা বলার বাহিরে।
-‘ আসছি তাহলে।
সাফওয়ান বাইক থেকে নেমে মাহির কাছে আসলো। দু হাত মুঠোয় নিয়ে বলল-
-” সাবধানে থাকবে মাহি। কোনো সমস্যা হলে আমায় জানাবে। আর পরিশেষে ভালোবাসি তোমায়।
মাহি স্মিত হাসলো। সাফওয়ানের গালে হাত রেখে বলল-
-” আমিও তোমায় ভালোবাসি সাফওয়ান। কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই তোমায় জানাবো। সাবধানে বাসায় ফিরো। আর ফিরে…
-” ফিরে ফোন দিয়ে জানাবো ম্যাডাম।
মাহি হাসলো। তারপর সাফওয়ান কে জড়িয়ে ধরলো। সাফওয়ান মাহির চুলের ভাজে হাত রেখে বলল-
-” আমাদের এবার বিয়ে টা করে নেওয়া উচিত মাহি।
মাহি কিছুটা চুপ হয়ে গেলো বিয়ের কথা শুনে। মাহির রেসপন্স না পেয়ে সাফওয়ান ফের বলল-
-” কি হলো শুনছো কি বললাম?
-” হুমম শুনলাম।
-” তোমার কি মতামত?
-” আমি রাজি।
সাফওয়ান মাহির কপালে চুমু খেলো। তারপর বলল-
-” বাসায় যাও তাহলে।
মাহি একবার সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে চলে আসলো। এসেই মাহি আগে ফ্রেশ হয়ে নিলো৷ তারপর বেলকনিতে বসে ল্যাপটপ টা খুলতেই নোটিফিকেশন আসলো৷ মাহি দেখলো ই-মেইলে অনেক গুলো নোটিফিকেশন এসে জমা হয়েছে৷ সেগুলোর ভেতর কয়েকটা দেখেই একটায় চোখ আঁটকে গেলো। সেখানে বড়বড় করে লেখা আছে-
-” সাবধানে থাকবেন। বিপদ আপনার চারপাশে কিলবিল করছে। সো বি কেয়ার ফুল।
ই-মেইল আইডি টা অচেনা। আজই প্রথম এই লেখা পাঠানো হয়েছে।
মাহি কিছুক্ষণ চুপ থেকে ল্যাপটপ টা পাশে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে কাউকে ফোন দিলো।
এজওয়ান বিকেলের দিকে বাড়ি ফিরে সোজা নিজের রুমে গেলো। কারো সাথে কোনো কথা বলে নি এজওয়ান। রুমে ঢুকেই দরজা আঁটকে দিয়েছে।
সোলেমান আর ইব্রাহিম রাস্তা দিয়ে হাঁটছে আর দোকান গুলো তে জিজ্ঞেস করছে কোনো অসুবিধা হচ্ছে নাকি। কেউ চাঁদা চাইতে আসছে নাকি। একজন বিচার দিলো ছাত্র লীগের কিছু ছেলেপেলে এসে চাঁদা নিয়ে যায়। আর ভয়ভীতি দেখায় যদি বিচার দেই তাহলে নাকি জানে মেরে ফেলবে। সোলেমান কথাটা শুনে রাগে চোখ মুখ লাল হয়ে গেলো।
-” নাম জানেন সে কে?
-” বল্টু।
-” ফিউচারে আর আসবে না কেউ চাঁদা নিতে। তার দায়িত্ব আমি নিলাম।
সোলেমান ইব্রাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” ছাত্র লীগের বল্টু কে আবার? ধরে আনার ব্যবস্থা কর ক্লাবে। চাঁদা ওর পা’ছা দিয়ে ভরা হবে।
ইব্রাহিম পকেট থেকে ফোন টা বের করে ইয়াসিন কে ফোন করে বল্টু নামের ছেলেটাকে ধরে ক্লাবে নিয়ে আসতে বললো।
ইয়াসিনের সাথে কথা বলার মাঝেই ইব্রাহিম দেখলো সোলেমান কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে। ইব্রাহিম ফোনটা কেটে হাঁটা ধরতেই আকস্মিক পেছন থেকে এক ডাক শুনে চমকে গেলো।
পুরুষালী গলায় কেউ ঊর্মি বলে কাউকে ডাকছে। ঊর্মি! সোলেমানের বউয়ের বান্ধবী টার নাম ঊর্মি না! মেয়েটা কি ঢাকা এসেছে? ইব্রাহিম চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। দেখলো এক ছেলে অন্য একটা মেয়েকে ঊর্মি বলে ডাকছে। ইব্রাহিম তপ্ত শ্বাস ফেললো। আশ্চর্য হলো নিজের করা কর্মকাণ্ডে। মেয়েটার নাম শুনতেই ওমন দাঁড়িয়ে গেলো কেনো সে?
ইব্রাহিম সকল চিন্তা গুলো একসাথে ডাস্টবিনে ফেলে হাঁটা ধরলো।
ইয়াসিন ঠিক সন্ধ্যা সাতটার দিকে বল্টু নামের ছেলেটাকে খুঁজে নিয়ে এসেছে ক্লাবে। চেয়ারে বাঁধা হয়েছে৷ সোলেমান এসেই আগে এ রুমে ঢুকলো। মোটাসোটা খাটো এই ছেলে। সোলেমান চেয়ারে বসেই আগে ছেলেটার গালে চ’ড় দিয়ে বলল-
-” চাঁদা কেনো তুলেছিলি?
বল্টু নামের লোকটা ভয়ে কেঁদে দিয়ে বলল-
-” ভাই মাপ করে দেন। আর হবে না।
-” কত দিন ধরে চাঁদা তুলছিস?
-” ৩ মাস।
-” আর আমি আজ জানতে পারলাম! শালা মারবো এখানে তোর লা’শ পড়বে গিয়ে কবরে। খাটা মাইনষের শয়তানি বুদ্ধি এমনি বলে না লোকে। ৩ মাসে কত টাকা নিয়েছিস?
-” ৭০ হাজার।
-” ৭০ হাজার কে ৩ ডাবল কর। কত হয়?
-” দুই লক্ষ দশ হাজার।
-” এই টাকা গুলো কালকের মধ্যে ঐ লোকগুলো কে দিয়ে দিবি।
-” ভাই এত টাকা কই পাবো?
-” জানের দাম বড় নাকি এই টাকা বড়?
বল্টু ভয়ে ঢোক গিলে বলল-
-” আমি দিয়ে দিব ভাই টাকা গুলো। দয়া করে আমারে ছাইড়া দেন।
-” ইয়াসিন ওরে ছেড়ে দে। আর ওর সাথে গিয়ে টাকা গুলো নিয়ে ঐ দুস্থ লোকজন দের দিয়ে দিবি। ওরা কর্ম করে খায় আর তোরা মাদার** সারাদিন ভাদাইম্মাগিরি করে সাধারণ মানুষদের টাকা লুটপাট করিস! এবারের মতন লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম। দ্বিতীয় বার নজরে বা খবরে আসবি তো সোজা জানে মে’রে মাটি চাপা দিয়ে রেখে দিব বলে রাখলাম। তোর লা’শ তো দূরে থাক তোর অস্তিত্ব টাও খুঁজে পাওয়া যাবে না পৃথিবীতে।
ইয়াসিন বল্টুর হাত পায়ের বাঁধন খুলে নিয়ে গেলো।
রাত ১২ টার দিকে রুম থেকে বের হলো এজওয়ান। আর বের হয়েই সোজা বাবার রুমে ঢুকলো। বাশার সুলতান ফোনে কারো সাথে কথা বলছিলেন। ছেলেকে নিজের রুমে দেখে ফোন কেটে বলল-
-” কিছু বলবি?
-” হ্যাঁ।
-” কি বল।
-” তরিকুলের মাইয়াডারে চিনো?
-” কোন তরিকুল?
-” ধানমন্ডির।
-” ও হ্যাঁ মনে পড়েছে। ওর তো একটা মেয়ে আছে জানি। শাকিলের বউ।
-” আমি ওর কথা বলি নাই। নূর জাহানের কথা বলছি।
-” কে নূর জাহান?
-” তরিকুলের মেঝো মেয়ে।
-” আমার জানামতে তো ওর এক মেয়ে এক ছেলে। আর ছেলেটা দ্বিতীয় ঘরের।
-” না ওর দুই মেয়ে এক ছেলে। আর ঐ বেডায় দুই বিয়ে করছিলো?
-” হ্যাঁ।
-” প্রথম বউ কোথায়?
-” শুনছি মারা গেছে। তারপরই তো দ্বিতীয় বিয়ে করছে।
-” দুই বিয়ে করুক আর তিন বিয়ে করুক। ওর বাপের বিয়ে নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নাই। আমার ঐ নূর জাহান রে লাগবে। ওর বাপের সাথে কথা বলো।
-” মাথা ঠিক আছে তোর?
-” আছে ঠিক।
-” তাহলে এসব আবল তাবল বকছিস কেনো?
-” আবল তাবল বকি নাই। আমি বলছি ঐ মাইয়ারে আমার লাগবে মানে লাগবে ব্যাস। আর কোনো কথা না। ভাইজানের সাথে কথা বলো। বলো প্রস্তাব নিয়ে যাইতে। যদি না পারো তোমরা প্রস্তাব নিয়ে যাইতে তাহলে বলতে পারো আমি নিজেই নিয়ে যাব প্রস্তাব।
-” হঠাৎ বিয়ে করার ভূত উঠলো কেনো মাথায়? কি হয়েছে?
-” আমি বড় হয়েছি৷ আমার বউ লাগবে। তোমার বাপ হিসেবে কর্তব্য ছেলের বিয়ে দেওয়া। জেরা করা না।
-” তুই তো বিয়ে করতে চাস নি কখনও। বিয়ের নাম শুনলেই নাক ছিটকাতি।
-” রুচি বদলাইছি। এত কথা বইলো না। মেজাজ খারাপ আছে৷ কালকের ভিতরে ঐ তরিকুল রে যেনো এ বাড়ির বসার ঘরে দেখি। ওর মাইয়ার বিয়া একমাত্র আমার সাথেই হবে।
-” যদি রাজি না হয়?
-” তাহলে মে’রে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দিবে। ওর বেঁচে থেকে লাভ নাই।
কথাটা বলেই এজওয়ান চলে গেলো। রাত ১ টার দিকে বাড়ি ফিরে সোলেমান। চাচাকে বসার ঘরে এখনও জেগে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
-” এখনও এখানে যে? ঘুমাও নি কেনো?
-” তোর ভাই তো আমার ঘুম কেড়ে নিছে সোলেমান।
-” আবার কি করলো?
-” বিয়ে করতে চাইতেছে।
-” তো দাও বিয়ে করিয়ে।
-” কারে করতে চায় জানিস? তরিকুলের মাইয়া রে।
-” তাতে সমস্যা কি? পরক্ষণেই সোলেমান ফের বলল-” ওর মেয়ে না বিবাহিত? বিবাহিত মেয়েকে বিয়ে করতে চাচ্ছে এজওয়ান?
-” তরিকুলের আরেক মেয়ে আছে যেটা আমরা জানি না। ওটারে কই যেনো দেখছে। আর আজ বলতেছে ঐ মেয়েরে ও বিয়ে করতে চায়।
-” কথা বলে দেখো। আমি আসছি এখন। ভীষণ টায়ার্ড ।
ইব্রাহিম বাসায় ফিরে দেখলো ইমন বসে আছে সোফায়। আগের তুলনায় এখন সুস্থ অনেকটা। ইব্রাহিম সামনের সোফায় বসে বলল-
-” কেমন আছো এখন?
-” জ্বি ভাইয়া ভালো আছি।
-” খেয়েছো?
-” হ্যাঁ।
-” পরিবারের সবাই ভালো আছে?
-” হ্যাঁ সবাই ভালো আছে। গত ৩০ তারিখে আমার বোনের রেজাল্ট বের হয়েছে।
-” কিসের?
-” এসএসসির।
-” ওহ্ রেজাল্ট কি?
-” জ্বি ৪.৯২।
-” রেজাল্ট তো ভালোই।
-” ঐ আরকি।
-” তোমার বোন কে শুভেচ্ছা জানিও। তা কলেজে পড়াবে?
-” জ্বি ইচ্ছে আছে বোন কে পড়াশোনা করানোর অনেকদূর।
-” গুড। কোনো হেল্প লাগলে আমায় জানাবে। লজ্জা পাবে না।
ইমন বিনিময়ে কিছু বললো না। তার কারো কাছে সাহায্য চাইতে নিজেকে ছোট লাগে। সেজন্যই তো ঢাকায় এসে না খেয়ে থেকেছিল তারপরও কারো কাছে সাহায্য চায় নি।
মেহরিন নিজের রুমের পড়ার টেবিলে বসে আছে। বাহিরে চাঁদের আলো। সামনেই নীল রাঙা ডায়েরি আর চায়ের কাপ। কিছু একটা লিখেছে আজ সে। এ বাড়ির আসার পর থেকেই রুমাইসা, আফিয়া সুলতান নিয়ম করে রোজ দু’বার ফোন দিয়ে কথা বলে। মেহরিনের দাদা শ্বশুর মেহরিনের চা কে খুব মিস করছে। সোলেমান বলে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে মেহরিন কে কলেজে ভর্তি করানোর কথা। মহাদেবপুরের সবচেয়ে ভালো কলেজে ভর্তি করানো হবে। মেহরিন চুপচাপ শুনেছে সে কথা। কথার ছলে তো রুমাইসা বলে ফেলেছিল- সোলেমান নাকি সেদিন মেহরিন কে তালাক দিতে এ বাড়ি এসেছিল। কথাটা শোনার পরই মেহরিনের শরীর বেয়ে এক অজানা ব্যথা প্রবাহিত হয়। তার স্বামী তাকে তালাক দিতে এসেছিল! কিন্তু কেনো? আর এসেছিলোই যখন তাহলে বললো না কেনো সে কথা? সোলেমানের সাথে কি সংসার করা হবে না মেহরিনের এজনমে? তাকে যে মনের অন্তঃস্থলে খুব বাজে ভাবে জায়গা দিয়ে ফেলছে মেহরিন৷ মেহরিন তো পড়াশোনা করার পাশাপাশি সংসার ও করতে চায় তার এমপি সাহেবের সাথে। সব মেয়েরই তো স্বপ্ন থাকে তার একটা সংসার হবে,একটা কাছের মানুষ থাকবে। যার কাছে নির্দ্বিধায় মনের অব্যক্ত কথা গুলো বলতে পারবে। দিন শেষে বুকে মাথা রাখলে শান্তি মিলবে। মেহরিন তো সেসব মেয়ে ব্যতিত নয়। মেহরিন সর্বদা এই দোয়া করে। আল্লাহ কি মেহরিনের এই দোয়া পূরণ করবে না?
দাহশয্যা পর্ব ১৭
মেহরিনের বুক ভার হয়ে আসে। নাম্বার টাও নেই তার যে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করবে। এজন্যই কি সে বারবার বলছিল সংসার করবে না? সংসার তো জোরকরে করা যায় না৷ মেহরিন চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার কাছে এসে জানালার শিক ধরে মাথা ঠেকিয়ে বেলি ফুলের গাছের দিকে তাকিয়ে রইলো। রাত টা তার এভাবেই কেটে গেলো জানার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে।
