দাহশয্যা পর্ব ১
Raiha Zubair Ripti
নিজের থেকে গুনে গুনে ১৫ বছরের বড় এক পুরুষের সাথে বিয়ে ঠিক হলো মেহরিনের। বাবা মায়ের ছোট সন্তান মেহরিন। পুরো নাম মেহরিন তাবাসসুম । বয়স তার সবে সতেরো। মাধ্যমিক এক্সামের গণ্ডি পেরিয়েছে তিন মাসের কাছাকাছি হবে । এতদিনে রেজাল্ট বের হয়ে যেত। কিন্তু করোনার জন্য তা থমকে গেছে। তাই এখন অপেক্ষায় ছিলো রেজাল্টের। অথচ রেজাল্ট আসার আগেই তার দোরগোড়ায় বিয়ে এসে হাজির । নওগাঁ জেলার মহাদেবপুরে বসবাস করে মেহরিন। মেহরিনের বাবা মোতালেব ভুঁইয়া একজন ব্যবসায়ী।
আর মা সানজিদা বেগম একজন গৃহিণী। মেহরিনের পরিবারে মা বাবা বড় বোন সেরিন আর সে। সেরিনের বিয়ে হয়ে গেছে প্রায় বছর দুয়েক আগে। গ্রামে বসবাস করায় স্কুলের গণ্ডি পার হলেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া নিয়ে বাবা মায়ে মাঝে একটা তোড়জোড় দেখা যায়। সেরিনের বেলাতেও এমন টাই হয়েছিল। সেরিনের মাধ্যমিক শেষ হতেই তার ফুপি একটা প্রস্তাব নিয়ে আসে। সেখান থেকে দেখা সাক্ষাৎ কথাবার্তা বলে বিয়ে অব্দি আগায়। বিয়েতে অবশ্য মেয়েদের মতামত খুব একটা নেওয়া হয় না। যার দরুন বিয়ে ঠিক হবার পর জানিয়ে দেওয়া হয়। মেহরিনের বেলাতেও সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটলো। তার ফুপি কদিন ধরেই মেহরিন দের বাসায় ঘুরঘুর করছিলো। বাবা মায়ের সাথে ফিসফাস করতো। পরে অবশ্য মেহরিন জানতে পারলো তাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে৷ কথাটা শোনা মাত্রই মন ভার হয়ে গিয়েছিলো মেহরিনের। খুব ইচ্ছে ছিল তার পড়াশোনা করার। কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চমাধ্যমিক টা শেষ করে ম্যাডিকেলের জন্য পড়বে। কিন্তু সেই স্বপ্ন টা বোধহয় এ জনমে আর পূরণ হবার নয়।
রোজার ঈদের পরের দিনই মেহরিনের ফুফু আসলো পাত্রপক্ষ কে সাথে নিয়ে । পাত্রের মা বাবা আর ছোট বোন এসেছে। পাত্র আসে নি। পাত্রের মা হাতে এক জোড়া বালা পড়িয়ে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে গেছে। আজ থেকে গুনে গুনে এক মাস পর তার বিয়ে। মেহরিন ক্যালেন্ডারের সামনে দাঁড়িয়ে আজ থেকে ৩০দিন পরের তারিখ টা বারবার দেখছে।
আজ মে মাসের ২৪ তারিখ সাল ২০২০। জুনের ২৬ তারিখে তার বিয়ে। যার সাথে বিয়ে তাকে মেহরিনের দেখা হয় নি। লোকটা কেমন হবে? আচ্ছা লোকটা কি খুব বুড়ো? মাথার চুল দাড়ি পেকে গেছে? তার সাথে দাঁড়ালে কি মেহরিন কে খুব বেমানান লাগবে?
কথা গুলো ভাবতেই বুক টায় চিনচিনে ব্যথা করলো। চোখ দিয়ে বের হলো নোনা জল। ছোট থেকেই চাপা স্বভাবের মেহরিন। বাবা মা যা বলে তা বিনাবাক্যে মেনে চলে। কিছুটা ঘরকুনো তবে সে কল্পনাপ্রবণ মেয়ে। ভদ্র মেয়ের যা যা গুন থাকা উচিত সেসব সব বিদ্যমান মেহরিনের মাঝে। বাবা মায়ের এতটাই বাধ্য মেয়ে সে যে জীবনে কোনো ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়ায় নি। জড়াবে কি করে বুঝ হবার পর থেকেই তার মা প্রায়সময় বলেছে প্রেম ভালোবাসা বিয়ের আগে ভালো নয়। তাছাড়া প্রেম ভালোবাসা করলে বাবা তাকে আস্ত রাখবে না। যার দরুন ভয়ে হোক আর বাবার মায়ের বাধ্য মেয়ে হয়ে হোক প্রেম করাটা আর হয়ে উঠে নি। সে সব প্রেম ভালোবাসা জমাতে শুরু করলো তার ব্যক্তিগত পুরুষের জন্য। কখনও ডায়েরির পাতার ভাজে তো কখনও আটপৌরে শাড়িতে আয়নায় নিজে কে দেখে।
সেজন্য তো আজ একটা টু শব্দ ও করে নি বিয়ে নিয়ে। আপার মুখে শুনেছে লোকটা রাজনীতির সাথে জড়িত। ঠিক কি করে রাজনীতি তে তা জানা হয় নি মেহরিনের। নাম কি সেটাও জানে না। শুধু জানে তার থেকে বয়সে বড় এক লোকের সাথে তার বিয়ে।
মেহরিন বারান্দায় এসে দাঁড়াল। পড়নে তার লাল জামদানী শাড়ি। শাড়ি টা গত মাসে মেহরিনের বাবা নিজে পছন্দ করে এনেছিল। মোতালেব ভুঁইয়া বড় মেয়ের তুলনায় ছোট মেয়েকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। মেহরিন ও বাবা বলতে পাগল। হাতে এখন বিদ্যমান স্বর্ণের বালা জোড়া। বেশ স্বর্ণ আছে এতে। বড় ঘরে যে তার বিয়ে হচ্ছে তা আর বুঝতে বাকি নেই। আচ্ছা বড় ঘরের লোকেরা কি স্নেহময় হয়? তারা কি বুঝবে মেহরিন কে? কি জানি কি আছে কপালে। মেহরিন কিছু চায় নি এই জীবনে,, না টাকা পয়সা আর না ধন দৌলত, শুধু একটা সুন্দর জীবন তার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে আর একটু ভালোবাসা ব্যাস। মেহরিনের আর কিছুই চাওয়ার ছিলো না এই সতেরো বছর জীবনে। এখন না হয় সবটা ভাগ্যের উপরই ছেড়ে দিলো সে। হয়তো একটা সুন্দর জীবন অপেক্ষা করছে তার জন্য অপরিচিত কারো নামের পাশে।
পেছন থেকে বোনের গলা ভেসে আসলো। সে মেহরিন কে ডাকছে৷ মেহরিন চোখে আসা জল টুকু মুছে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো। সেরিন হাতে চায়ের কাপ নিয়ে বোনের পাশের খালি চেয়ার টায় বসলো। চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল-
-“ নে খা।
চা প্রিয় মেহরিনের আজ আর চা খেতে মন সায় দিলো না। সেজন্য কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল-
-“ খাবো না। তুমি খাও।
সেরিন অবাক হলো বোনের কথায়। কপালে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চেক করে বলল-
-“ শরীর ঠিক আছে তো তোর?
মেহরিন বোনের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল-
-“ শরীর একদম ঠিক আছে।
-“ তাহলে?
-“ মন ঠিক নেই। কথাটা বলার সময় গলা কেঁপে উঠলো মেহরিনের। সেরিন ঠিক বুঝলো বোনের কিছু একটা হয়েছে৷ সেজন্য বারান্দায় গ্রিলে চায়ের কাপ রেখে বোনের গালে আলতো করে দু হাত রেখে বলল-
-“ কি হয়েছো সোনা। বিয়েটায় খুশি না তুই?
ভীষণ নরম মনের মেয়ে মেহরিন। কেউ একটু মন খারাপের সময় ভালো করে কথা বললেই মেহরিনের চোখে জল চলে আসে। একদম ননীর পুতুল। এবারও ব্যতিক্রম হলো না। মায়াবী চোখ দুটোয় এবার বর্ষণ নেমে আসলো। হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল-
-“ খুব কি দরকার ছিলো বিয়েটার আপু? আমার কি পড়াশোনা করা আর হবে না? বাবা যে বলেছিল আমায় পড়াবে।
বোনের কথা শুনে সেরিন হেঁসে ফেললো। বুকের মাঝে বোনের মাথাটা চেপে ধরে বলল-
-“ আব্বা কথা বলেছেন উনাদের সাথে। তোকে পড়াবে উনারা। আন্টি ভীষণ ভালো মানুষ। তার পরিবারের সবাই শিক্ষিত। আন্টি অনেক দিন ধরেই তোকে পছন্দ করে রেখেছিল।
মেহরিনের মন টা যেনো এক মূহুর্তে ভালো হয়ে গেলো। খুশিতে চোখের জল মুছে বলল-
-“ সত্যি পড়তে দিবে?
-“ হ্যাঁ। এখন ও মন খারাপ?
-“ উঁহু।
-“ তাহলে চা খাওয়া যাক?
মেহরিন চায়ের কাপ টা হাতে তুলে নিলো। দু বোন মিলে চা বিলাস করলো এই সন্ধ্যায়।
সুলতান বাড়ির বসার ঘর জুড়ে চলছে পিনপিনে নীরবতা আর গুমোট ভাব। বয়সের ভারে চুপ হয়ে গেছেন আনোয়ার সুলতান, তার মেঝ ছেলে আমিরুল সুলতান বসে আছেন পাশের চেয়ারটায়, দুজনের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আমিরুল সুলতানের বউ আফিয়া সুলতান। জানালা দিয়ে ঢুকছে কিছু মৃদু বাতাস আর বাইরের গাছগুলোর পাতার এক ধরনের অস্বস্তিকর শব্দ। ঘরের মাঝখানে টেবিলটা যেন কিছুটা ক্লান্ত, তার ওপর পড়ে থাকা ফোন টার দিকে তাকিয়ে আছে তিন জোড়া চোখ। ফোনের রিং হচ্ছে কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না। এই নিয়ে চার বার করলো। শেষের বেলায় রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে পুরুষালী ভরাট কণ্ঠে ভেসে আসলো সালাম। আফিয়া সুলতান সালামের জবাব দিলো ছেলেকে। ওপাশ থেকে তার বড় ছেলে বলে উঠল-
-“ সব ঠিকঠাক আছে আম্মা?
আফিয়া সুলতান হাসার চেষ্টা করে বলল-
-“ হ্যাঁ বাপ সব ঠিক আছে। ঈদের আগে তো বাড়ি আসলা না। এখন তো আসো।
-” সম্ভব না মা।
-” কেনো?
-” কাজ আছে অনেক।
-” কাজ শুধু তোমারই থাকে। আর লোকজন ও তো রাজনীতি করে নাকি।
-” কিছু বলবে নাকি?
-‘ তুমি কি ফ্রী আছো? তাহলে কথাটা বলতাম।
-“ বলো ফ্রী আছি।
-“ বলছি তোমার তো বয়স হচ্ছে।
-” কত হলো বলো তো বয়স আমার?
-“ জানো না কত হলো?
-“ আসলে হিসেব করার সময় পাচ্ছি না। তুমি করেছো হিসেব?
-“ ৩২ বছর শেষ হবার পথে। ৩৩ এ পা রাখবে ৫ মাস গেলে।
-“ ওহ আচ্ছা। এরপর?
-“ বিয়ে শাদি কি করবে না?
-“ সময় হয় নি বিয়ে করার।
-“ সময় হয় নি? আর কত পরে বিয়ে করতে চাও? কদিন পর তোমার ছোট ভাই বোন গুলোর বিয়ে দিতে হবে।
-“ তোমার কিছু কথা কি এটাই ছিলো? তাহলে আমি আপাতত ব্যস্ত আছি। পার্টি অফিসে আছি।
-” সব সময়ই তো ব্যস্ত থাকো। যখনই ফোন দেই তখনই বলো ব্যস্ত।
-” আসলেই ব্যস্ত আমি।
-“ তাহলে বললে কেনো ফ্রী আছো? যাই হোক বাসায় ফিরে ফোন দিও তাহলে। কথা আছে।
-“ ঠিক আছে রাখছি তাহলে।
ছেলে তার ফোন কেটে দিলো ওপাশ থেকে। আফিয়া সুলতান প্রলম্বিত শ্বাস ছাড়লেন। ছেলেকে বলাই হলো না বিয়ের কথাটা। উফ ছেলেটাও না একদম যাচ্ছে তাই। বিয়ে তে কেনো এতো এলার্জি থাকবে? পুরুষ মানুষ হবে বিয়ে পাগলা। তা না হয়ে তার ছেলে হলো বিয়ে বিদ্বেষী।
আফিয়া সুলতান ফোন থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাতেই দু জোড়া চোখ তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল-
-“ তাকিয়ে আছেন যে এভাবে?
আমিরুল সুলতান সূক্ষ্ণ চোখে স্ত্রী কে পর্যবেক্ষণ করে বলল-
-“ আগ বাড়িয়ে তো বিয়ের তারিখ ঠিক করে আসলে। এখন যদি তোমার ছেলে বিয়েতে রাজি না হয় তখন?
-“ আহা নেতিবাচক জিনিস চিন্তা করিও না তো। ইতিবাচক জিনিস চিন্তা করো। ঠিক রাজি হবে। বাবা আছে তো।
আনোয়ার সুলতান ভরকে গেলো।
-“ আমি আছি মানে? আমাকে দিয়ে কি করাতে চাইছো বউমা?
-“ আপনি শেষ ভরসা বাবা। আমি যদি রাজি করাতে না পারি তাহলে আপনি অসুস্থ হবার ভান করে ব্ল্যাকমেইল করে হলেও নাতী কে রাজি করাবেন। কতদিন আর কুমার থাকবে আমার ছেলে বলুন? নিজ থেকে তো বলবে না বিয়ের কথা।
আমিরুল সুলতান হতাশার শ্বাস ফেলে বলল-
-“ তাই বলে বাবা মিথ্যা অভিনয় করবে?
-“ তাহলে তুমি করো। একজন করলেই হবে। ছেলেমেয়ে দের বিয়েতে রাজি করানোর জন্য এই ট্রিকস টা বেশ কাজের।
আমিরুল সুলতান বসা থেকে উঠে যেতে যেতে বললেন-
-“ ভেবে দেখবো। আগে বলে দেখো বিয়ের কথাটা। মনে হয় না রাজি হবে।
