Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ২৮

দাহশয্যা পর্ব ২৮

দাহশয্যা পর্ব ২৮
Raiha Zubair Ripti

রাত এখন ঠিক ১১ টা। বাগানের এক কোণে চেয়ারটায় এখনও নিঃশব্দে বসে আছে সোলেমান। চারপাশটা নিঝুম। দশটা পেরোনোর কিছু পরেই ইব্রাহিম রুমে ফিরে গিয়েছিলো, কিন্তু সোলেমান আর যায় নি। সময়ের ভার যেন তাকে চেয়ার থেকে তুলতেই চায় না।
তবু কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে এক সময় সে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে। তার মন বলে মেহরিন হয়তো এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। ভাবনার শেষে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ায় সে। সামনের টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নেয়। তারপর নিঃশব্দে রুমের দিকে রওনা হয়।

রুমে ঢুকতেই চোখে পড়ে, বিছানার একপাশে ঘাপটি মেরে ঘুমিয়ে আছে মেহরিন। হয়তো সোলেমানের জন্য অপেক্ষা করতেই ঘুমিয়ে পড়েছে সে। সোলেমানের ঠোঁটের কোণে একরাশ কষ্টমাখা দীর্ঘশ্বাস। তার চোখে অনুচ্চারিত এক অপরাধবোধ।
ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে এসে কিছুক্ষণ মেহরিনকে তাকিয়ে দেখে সে। নিঃশব্দ ঘুমের মতো শান্ত কিছু কি হয়?

সোলেমানের মনে পড়লো মেহরিন কে এখনও তার প্রাপ্য জিনিস টা সে দেয় নি। আজ দিয়ে দেওয়া উচিত। সেজন্য আলমারির দিকে এগিয়ে গেলো। আলমারির পাল্লা টা খুলে সোলেমানের জামা কাপড়ের পেছনে থাকা বোর্ডে হাল্কা করে ফিঙ্গার ছোঁয়াতেই ছোট একটা দরজা খুলে গেলো। সোলেমান সেই দরজা দিয়ে হাত ঢুকালো। হাতের সাথে কাঠের বাক্সের ছোঁয়া লাগতেই সোলেমান সেই বাক্স বের করে আনলো। তারপর আলমারির পাল্লা টা বন্ধ করে বাক্স টা হাতে করে টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে টেবিলে রাখলো৷ আজ অনেক গুলো বছর পর সোলেমান বাক্স টা হাতে নিয়েছে। শরীরে কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে।

সোলেমান আস্তে-ধীরে বাক্স টা খুললো। লাল কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা কাঙ্খিত জিনিস টা সোলেমান বের করে হাতে নিলো। নীল পাথরের আংটি। এই আংটির ইতিহাস আজ থেকে প্রায় একশো পঁচিশ বছর আগে। তৎকালীন সময়ের সুলতান পরিবারের কর্তা,আনোয়ার সুলতানের দাদার বাবা হুমায়ুন সুলতান নিজ হাতে চয়ন করেছিলেন এর পাথর। একটি প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যীয় খনিতে পাওয়া হয়েছিল এই গাঢ় নীল রঙের দুর্লভ পাথর। যার নাম ছিল লাজুলি। সোনা দিয়ে তৈরি ফ্রেমে পাথরটি বসিয়ে দেওয়া হয়। আংটির ভিতরের দিকটায় নীল পাথরের নিচে খোদাই করে লেখা হয় ওয়াফাদার। অর্থাৎ,বিশ্বস্ত। এই আংটির মূল্য কয়েকশো বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই আংটি বহন করে একমাত্র সুলতান বাড়ির বড় বউরা। এর আগে এই আংটির শেষ মালিক ছিলো সোলেমানের মা। এখন এই আংটির বর্তমান মালিক হতে যাচ্ছে মেহরিন। মেহরিনের পর এই আংটির মালিক হবে ভবিষ্যতে সোলেমান আর মেহরিনের ছেলে হলে সেই ছেলের বিয়ে করে আনা বউ।
সোলেমান আংটি টা নিয়ে মেহরিনের দিকে এগিয়ে গেলো। মেহরিনের পাশে বসে মেহরিনের মাথায় আলতো করে হাত রেখে ডেকে বলল-

-” মেহরিন শুনছো? একটু উঠবে?
ডাক শুনে প্রথমে হাল্কা করে চোখ মেলে তাকালেও পরক্ষণে সোলেমানের মুখ দেখেই তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো মেহরিন। মেহরিনের এমন তাড়াহুড়ো দেখে সোলেমান বলল-
-” রিলাক্স তাড়াহুড়োর কিছু হয় নি।
মেহরিন জামা ঠিক করতে করতে বলে-
-” ক.. কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতে পারি নি। আপনি এসেছেন কখন?
-” কিছুক্ষণ হলো এসেছি।
-” অনেকক্ষণ অপেক্ষায় ছিলাম আপনার।
-” দুঃখিত..
-” দুঃখিত বলার কিছু হয় নি। আপনার কি কিছু লাগবে?
-” উঁহু। তোমাকে একটা জিনিস দেওয়া ছিলো আমার।
মেহরিন কিছুটা অবাক হলো। কি দিবে উনি? সোলেমান ইশারায় মেহরিনের হাত চাইলো। মেহরিন ডান হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলে সোলেমান নিষেধ করে বলে-

-” ডান না বাম।
মেহরিন বাম হাত বাড়িয়ে দিলো৷ সোলেমান হাতের তালুতে মেহরিনের হাত টা নিয়ে আংটি টা সযত্নে পড়িয়ে দেয়।
ঘরের ড্রিম লাইটের আলোয় আংটি টা চকচক করছে। মেহরিন আংটির দিকে তাকিয়ে বলল-
-” কিসের আংটি এটা?
সোলেমান মেহরিনের আংটি পড়া হাত টা দেখতে দেখতে জবাবে বলল-
-” সুলতান দের আংটি এটা। সুলতান পরিবারের বড় বউদের জন্য। এই আংটির মালিক পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন হয়। আংটি টার মালিক আগে আম্মা ছিলো। এখন তুমি। সব সময় পড়ে থাকবে আংটি টা। খুলবে না।
মেহরিন আংটি টা খুঁতিয়ে দেখতে লাগলো। অসম্ভব সুন্দর আংটি টা। কই আফিয়া সুলতানের হাতে তো কখনও আংটি টা দেখে নি মেহরিন। উনি কি তাহলে খুলে রেখেছিল আংটি টা?

-” মায়ের হাতে আগে দেখি নি আংটি টা। আংটি টা কি উনি খুলে রেখেছিলেন?
-” বড় বউ ব্যতিত এই আংটি কারো পড়ার অধিকার নেই। তাই মায়ের হাতে দেখো নি আংটি।
কথাটা বলেই সোলেমান উঠে দাঁড়ালো। দু হাতে আলতো করে মেহরিনের বাহু ধরে মেহরিন কে দাঁড় করালো। মেহরিন উঠে দাঁড়াতেই সোলেমান ওড়না টা মেহরিনের মাথায় ঠিক করে দিয়ে গালে আলতো করে দু হাত রাখলো। ঠোঁটে কোনায় কিছু একটা বিরবির করে উচ্চারণ করে মেহরিনের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। এই প্রথমবার সোলেমানের ঠোঁটের স্পর্শ পেলো মেহরিন। শরীর তার বরফের ন্যায় জমে যাচ্ছে। কি অদ্ভুত সেই স্পর্শ। শরীরের ভেতরটা কাঁপিয়ে তোলে। মেহরিন নিজের জামা খামচে ধরে।
তারপর মেহরিন কে ছেড়ে দিয়ে মেহরিনের দু হাত ধরে বলে-

-” তোমার রান্নার হাত দারুন মেহরিন। রান্না করা খাবার গুলো অনেক সুস্বাদু ছিলো৷ তোমার হাতের রান্নার টানে কয়েক দিন পরপরই দেখছি ছুটে আসতে হবে মহাদেবপুর।
মেহরিন লজ্জা পেলো। এই প্রশংসা টার জন্যই তো সে তখন মরিয়া হয়ে যাচ্ছিলো শোনার জন্য। আর এখন শুনে কেমন লজ্জা পাচ্ছে। সোলেমান মূলত লোক দেখিয়ে কারো প্রশংসা করতে পছন্দ করে না। বউয়ের প্রশংসা তো নয়ই। তার যখন বলার দরকার মনে পড়বে তখন বলবে।
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে বিছানায় বসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো-
-” রাগ হয় না আমার উপর তোমার মেহরিন?
মেহরিন সোলেমানের চোখের দিকে চেয়ে মিষ্টিমুখে বলল-

-” উঁহু।
-” কেনো?
-” জানি না।
-” তুমি কি জানো তাহলে?
-” কিছুই জানি না।
-” আমার মতন এই পুরুষটি যে তোমায় ডিজার্ভ করে না। এটা মানো?
-” হঠাৎ এ কথা বলছেন যে? আমি কি আপনায় ডিজার্ভ করি না?
-” আমার থেকেও বেটার ডিজার্ভ করো তুমি মেহরিন।
-” আমি তো বেটার কাউকে চাই না। আমি আমার এই বেস্ট কে নিয়েই সারাজীবন থাকতে চাই।
-” ভালোটালো বেসে ফেললে নাকি আমায়?
-” স্বামী আপনি আমার। ভালোবাসা টা কি দোষের?
-” দোষের না। আমার ভালোবাসার ভাগ চাইছো?
-” চাইলেই পাওয়া যাবে?
-” তাহলে ভেবে চিন্তে তারপর ভালোবাসতে এসো আমায়।
-” ভেবে চিন্তে ভালোবাসা হয়?
সোলেমান এবার একটু গম্ভীর হয়েই বলল-

-” আমাকে ভালোবাসতে হলে ভেবে চিন্তেই ভালোবাসতে হবে। সময় নাও। ভাবো। তারপর সিদ্ধান্ত নাও। আমার ভালোবাসার ভাগ চাইলে আমার পাপের ভাগটাও কিন্তু আপনা-আপনি তোমার নামে চলে আসবে।
-” নিলাম।
-” সময় ?
-” উঁহু।
-” তাহলে?
-” আমি মেহরিন তাবাসসুম যেদিন তিন কবুলে আপনাকে গ্রহণ করেছি সেদিন থেকেই আপনার সব কিছুর অর্ধেক মালিকানা হয়ে গেছি। আজ না হয় আপনার পাপের ভাগও নিজের নামে গ্রহণ করে নিলাম।
-” ভেবে বলছো তো? আমার পাপের ভার সইতে পারবে তো? আমার মাথার চুলের থেকেও আমার পাপের সংখ্যা বেশি। পরে পিছিয়ে গিয়ে আমাকে ছেড়ে দিবে না তো?

-” মরন ব্যতিত আপনাকে ছেড়ে দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব।
-” ভালোবাসায় মজে গিয়েছো মেহরিন।
-” হয়তো।
-” চলো ঘুমাবে। রাত অনেক হয়েছে।
সোলেমান মেহরিন কে ধরে শুইয়ে দিয়ে চাদর টেনে দিয়ে নিজেও মেহরিনের পাশে শুয়ে পড়লো। পাশাপাশি দুজন বিবাহিত যুগল শুয়ে আছে তারপরও তাদের মাঝে বিস্তার দূরত্ব। এই দূরত্ব কে আগে ঘুচাবে? মেহরিন নাকি সোলেমান?
মেহরিনের ইচ্ছে করলো একটু সোলেমানের বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরার। কিন্তু যেতে পারছে না মেহরিন। একটা গরম শ্বাস ফেলতেই আচমকা শরীরে হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠলো। সোলেমান মেহরিনের কোমরে হাত রেখেছে। মেহরিন ফিরে তাকালো। সোলেমান তার দিকেই তাকিয়ে আছে। দু’জনের চোখ একে ওপরের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। মেহরিনের ভেতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। উনি কি কিছু বলবে? এভাবে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে কেনো?
সোলেমান মেহরিনের কানের কাছে মুখ টা নিয়ে বলল-

-” আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমালে কোনো সমস্যা হবে? বউ হও তো, সমস্যা হওয়ার তো কথা না।
মেহরিন যেনো নিজের লোভ পূরণ করার অনুমতি টা পেয়েই গেলো। মাথাটা উঁচু করে সোলেমানের বুকে রাখলো। সোলেমানের হৃদয়ের স্পন্দন যেনো মেহরিন গুনতে পারছে।কেমন দ্রিম দ্রিম করে বাজছে দ্রুত। ঠিক যেমন টা মেহরিনের হচ্ছে। ঐ যে মানুষ নার্ভাস হলে যেমন করে না? ঠিক তেমনই হচ্ছে।
সোলেমান আলতো করে জড়িয়ে ধরে হাত ডুবালো মেহরিনের চুলের ভাজে। অনুভূতি টা একদমই মন্দ না। এভাবে কাটিয়ে দেওয়াই যায় ২ টা বছর।

সকালে ঘুম থেকে চোখ মেলতেই মেহরিন আবিষ্কার করলো নিজেকে সোলেমানের বুকে। ঠিক রাতে যেভাবে ছিলো সেভাবেই। সোলেমান এখনও ঘুমে। মেহরিন আলতো করে হাত ছাড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠলো। খুলে যাওয়া চুল গুলো হাত খোঁপা করলো। সোলেমানের ঘুমন্ত চেহারার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ওয়াশ রুমে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। সোলেমানের ঘুম যেনো না ভাঙে সেজন্যে জানালার পর্দা গুলে নামিয়ে দিয়ে দরজা চাপিয়ে রান্না ঘরে চলে আসলো।

আফিয়া সুলতান রান্না করছে। মেহরিন গিয়ে সাহায্য করলো।
৯ টার দিকে ঘুম ভাঙলো সোলেমানের। আড়মোড়া ভেঙে চোখ ডলতে ডলতে বিছানার পাশে তাকালো। মেহরিন নেই। মেয়েটা বুঝি এখন রান্না ঘরে। সোলেমান ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলো। আজ বিকেলের দিকে মেহরিনদের বাড়িতে যাবে। শ্বশুর শাশুড়ির জন্য আনা জামাকাপড় গুলো দিয়ে আসবে।
নিচে এসে দেখলো মেহরিন খাবার টেবিল সাজাচ্ছে । এই টুকু একটা বাচ্চা মেয়ে অথচ তার ম্যাচিউরিটও হাই লেভেলের। অন্য কোনো মেহরিনের জায়গায় থাকলে সে-ও কি মেহরিনের মতন এত শান্ত থাকতে পারতো?
বোধহয় না। সোলেমান চেয়ার টেনে বসতেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসলো আনোয়ার সুলতান আর আমিরুল সুলতান। গতকাল সন্ধ্যায় ফেরার কথা থাকলেও তাদের আসতে আসতে ১ টার মতন বেজে গেছিলো। যার কারনে সোলেমানের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় নি। তবে জেনেছে সোলেমান এসেছে বাড়ি।
আমিরুল সুলতান টেবিলের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল-

-” ভালো আছিস?
সোলেমান আমিরুল সুলতানের দিকে তাকালো।
-” হুমম ভালো আছি তোমরা কেমন আছো?
আনোয়ার সুলতান সোলেমানের সামনের চেয়ারে বসে বলল-
-” ভালো আর থাকতে দিলে কখন আমাদের।
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো।
-” কেনো তোমাদের আমি খারাপ ভাবে রেখেছি?
-” তা রাখো নি। তবে ভালোও তো রাখো নি। শুনলাম সেদিন রাতে এসেছিলে। দেখা তো করো নি আমাদের সাথে।
সোলেমান স্যান্ডউইচ মুখে দিতে দিতে বলল-
-” বউয়ের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম তোমাদের সাথে নয়। সেজন্য দেখা করার প্রয়োজন বোধ করি নি।
সোলেমানের এমন কথা শুনে মেহরিন চকিতে সোলেমানের দিকে তাকালো।
রান্না ঘর থেকে আফিয়া সুলতান আসলো জুশের জগ নিয়ে। সোলেমান তার পাশের চেয়ার টেনে বলল-

-” মেহরিন তুমিও বসো৷ ব্রেকফাস্ট করে নাও। আর মা তুমিও।
মেহরিন আপত্তি জানিয়ে বলল-
-” আপনারা খেয়ে নিন পরে খেয়ে নিব আমি।
সোলেমান ঘাড় বেঁকিয়ে মেহরিনের দিকে তাকালো।
-” বসতে বলেছি বসো।
মেহরিনের বাম হাত টেনে বসালো সোলেমান। আমিরুল সুলতানের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” নিজের বউকে বসতে বলো পাশে। একা একাই খাচ্ছ কেনো? দাদর না হয় জোড়া নেই। তাই বলে কি তোমার ও নেই?
আমিরুল সুলতান চেয়ার টেনে দিলো। আফিয়া সুলতান বসলো চেয়ারে। এরমধ্যে ইব্রাহিম আর রুমাইসাও চলে আসলো। সবাই মিলে ব্রেকফাস্ট করে নিলো।

ইমনের সারাটা রাত কেটেছে নদীর সামনে খোলা মাঠে। ভোরের আজান আসতেই এলোমেলো পায়ে বিধ্বস্ত হয়ে বাসায় ফিরে। এই জীবন তার বিতৃষ্ণা লাগছে। মনে হচ্ছে জীবনের শেষ পর্যায়ে সে চলে এসেছে। ঐ যে মৃত্যুকে সামনে দেখলে যেমন লাগে না? ঠিক তেমনই লাগছে। ইতি বেগম সকালের রান্না করে খাবার বেড়ে বসে অপেক্ষা করছিল ইমনের। কিন্তু ইমন সেই যে ভোরে এসে রুম বন্ধ করেছে আর খুলছে না। এখন ১১ টা বেজে আসলো। ইতি বেগম দরজা ধাক্কাচ্ছে কিন্তু ইমন খুলছে না।
ছেলেটা আবার উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে নি তো? ইতি বেগমের ভেতর টা কেঁপে উঠলো। ফের দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে বলল-

-” দরজাটা খোল বাপ। আমার চিন্তা হচ্ছে তোকে নিয়ে। মায়ের কথাটা শুনবি না বাপ? পায়ে পড়ি বাপ দরজাটা খোল।
ইমনের জবাব আসলো এবার ভেতর থেকে।
-” উল্টাপাল্টা কিছু করি নি মা। ভয় পেও না। একা থাকতে দাও আমাকে।
ইতি বেগম আঁচলে মুখ ঢেকে উঠানে চলে আসলো। ঊর্মি গিয়েছে দোকানে ডিম আনতে। ডিম নিয়ে ফিরে বাড়ির উঠানে মা’কে কাঁদতে দেখে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
-” কি হয়েছে মা কাঁদছো কেনো?
ইতি বেগম কান্না থামিয়ে দিলো। চোখ মুছে বলল-
-” ভাত বেড়ে রাখা আছে খেয়ে নিস। আমি ক্ষেতে গেলাম।
ইতি বেগম চলে গেলো। ঊর্মি রান্না ঘরে ডিম রেখে খাবার খেয়ে নিলো।

বিকেল ৪ টার দিকে সোলেমান আর ইব্রাহিম আসলো ভুঁইয়া বাড়ি। মোতালেব ভুঁইয়া নিজের রুমে শুয়ে চিলেন। স্ত্রীর ডাকে মোতালেব রুম থেকে বেরিয়ে দরজার কাছে মেয়ের জামাইকে দেখে চমকালো। গতকাল অনিক এসেছিল। জামাকাপড় দিয়ে গেছে। মোতালেব ভুঁইয়া আজ সন্ধ্যার পরই যেত মেয়েদের বাড়িতে গিয়ে ঈদ উপলক্ষে জামাকাপড় দিতে। সোলেমান ভেতরে ঢুকে সালাম দিলো মোতালেব কে। সানজিদা বেগম শরবত আর মিষ্টি নিয়ে আসলো। সোলেমান শরবত টা খেলো। খাওয়া শেষে সাথে করে নিয়ে আসা প্যাকেট গুলো সানজিদা বেগমের হাতে তুলে দিলো। সোলেমান এও বলল ঈদের দিন বিকেলে মেহরিন কে নিয়ে সে আসবে। আরো বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে সোলেমান রা চলে আসতে চাইলে সানজিদা বেগম বাঁধা দেয়। মেয়ের জামাইকে সে ডিনার করিয়ে তারপর ছাড়বে৷ এ কথা বলেই সানজিদা বেগম রান্নার তোড়জোড় শুরু করলো। ইব্রাহিম আর সোলেমান বাহিরে চলে আসলো মোতালেব ভুঁইয়ার সাথে। অলংকারপুর গ্রাম টা অনেক সুন্দর। ইব্রাহিম আশেপাশে তাকাচ্ছিল। এমন সময় দূরে হুট করে ঊর্মিকে দেখে চমকালো। ক্ষেত থেকে সবজি তুলছে। ইব্রাহিম আর মোতালেব ভুঁইয়া গল্প করছে। ইব্রাহিম হাঁটা ধরে ঊর্মির দিকে চলে আসলো।
ঊর্মি বেগুন গামলায় রেখে পেছন ফিরতেই হুট করে রাস্তায় বুকে হাত গুঁজে ইব্রাহিম কে দেখে চমকে উঠলো। এ তে সেই লোকটা। মেহরিনের বর ভেবেছিল। ঊর্মি পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে ইব্রাহিম সালাম দিয়ে বলে উঠে-

-” কেমন আছেন বেয়াইন সাহেবা?
ঊর্মি দাঁড়িয়ে গেলো।
-” আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি?
-” জ্বি ভালো।
-” চিনেছেন আমায়?
-” হুমম চিনেছি।
-” তাহলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন কেনো?
-” রান্না করতে হবে বাসায় গিয়ে। সেজন্য…
-” আপনাদের বাসা কোনটা?
-” আপনার পেছনে থাকা নীল রঙের বাড়িটা আমাদের।
ইব্রাহিম পেছন ফিরে দেখলো বাড়ি টা।
-” আচ্ছা যান বাসায়। পরে আবার কখনও আসলে আপনাদের বাসায় যায়৷ কোনো সমস্যা এতে?
-” না না সমস্যা কেনে থাকবে৷ আজই চলুন না হয়।
-” না আজ না। অন্য কোনোদিন।
-” আচ্ছা তাহলে আজকের জন্য আল্লাহ হাফেজ।
-” জ্বি আল্লাহ হাফেজ।
ঊর্মি চলে আসলো বাসায়। ইতি বেগম ঊর্মিকে দেখে বলল-
-” এত দেরি হলে কেনো?
ঊর্মি বেগুন গুলো নামিয়ে বলল-

দাহশয্যা পর্ব ২৭

-” মেহরিনের শ্বশুর বাড়ির লোক এসেছিল। কথা বলতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছে।
কথাটা ঠিক ইমনের কানে চলে গেলো। বুকের ভেতরটায় কি যে কষ্ট হচ্ছে। ইশ আজ যদি বাবা বেঁচে থাকতো! তাহলে জীবন টা আজ অন্য রকম হতো। না সে শহরে যেত চাকিরের খোঁজে আর না সে এভাবে মেহরিন কে হারিয়ে ফেলতো। ইমনের জীবন থেকে এক এক করে তার সব প্রিয়জনরা জবা ফুলের মতন ঝরে পড়ে যাচ্ছে… এই ক্ষত সামলাবে কি করে ইমন?

দাহশয্যা পর্ব ২৯