দাহশয্যা পর্ব ২৭
Raiha Zubair Ripti
আজকের আকাশটা যেনো অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু বেশিই আলাদা লাগছে। কখনো কালো মেঘ এসে আকাশ ঢেকে দিচ্ছে আর চারপাশটা হয়ে উঠছে ধূসর আর নিঃসঙ্গ। আবার কিছুক্ষণ পরেই সেই কালো মেঘ সরিয়ে আকাশ হয়ে উঠছে স্নিগ্ধ নীল, আর সাদা তুলোর মতো। দেখে মনে হয় মেঘেরা ভেসে বেড়াচ্ছে এক কোণ থেকে আরেক কোণে।
মেঘেদের এই আসা-যাওয়ার খেলা যেন জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। কখনো মনখারাপের ছায়া ঘিরে ধরে, আবার কখনো আশার আলো উঁকি দেয় মনকুঠুরিতে। আজকের দিনটা ঠিক তেমনই চুপচাপ, ধীর আর ভাবনায় ভরা। রোদের চোখ রাঙানি নেই, আবার বৃষ্টির কান্নাও না।
খুব ভোরের দিকে মেহরিন জানতে পারলো আজ তার স্বামী আসছে বাড়িতে। খবর টা শাশুড়ির মুখে শোনার পর থেকেই কি যে ভালো লাগছে মেহরিনের৷ মেহরিন শাশুড়ির থেকে জেনে নিলো উনার কি কি পছন্দ খাবারে৷ মেহরিন সব শুনেই রান্নার তোড়জোড় শুরু করে দিলো। ৯ টায় শুরু করা রান্না শেষ হলো দুপুর দেড় টায়। রান্না শেষ করে টেবিলে খাবার সাজিয়ে নিজের রুমে আসলো মেহরিন। শরীর ঘেমে একাকার। শরীর থেকে ঘামের বাজে গন্ধ আসছে। গোসল না নিলেই নয়। মেহরিন টিয়া রঙের কামিজ নিয়ে ওয়াশরুমে গেলো।
এদিকে ১টা ৪৫ মিনিটে সুলতান ভিলায় এসে পৌঁছায় সোলেমান আর ইব্রাহিম। বাশার সুলতান ঈদের দিন বিকেলে রওনা হবে৷ ঢাকায় কোরবানির কিছু কাজ আছে যা বাশার সুলতান দেখবেন। এজওয়ান হ্যাঁ না কিছুই বলে নি আসবে কি আসবে না। সোলেমান মাথা ঘামায় নি। তার আসার দরকার সে আসবে৷ কে আসলো আর কে না আসলো তাতে কিছু যায় আসে না।
ছেলেকে দেখেই এগিয়ে আসলো আফিয়া সুলতান। সোলেমান মা আফিয়া সুলতানকে জড়িয়ে ধরে চারপাশে চোখ ঘোরাতেই রুমাইসা এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে এগিয়ে এলো। পানিটা শেষ করে সে রুমাইসার কাছেই জানতে চাইল-
-” আমার বউ কোথায়?
রুমাইসা গ্লাস টা নিতে নিতে বলল-
-” রুমে গেছে কেবলই। সেই সকাল থেকে রান্না শুরু করেছিল কেবল শেষ হতেই গোসল করতে গেছে রুমে।
সোলেমান একবার খাবারের টেবিলের দিকে তাকালো। পরিপাটি সাজানো নানা রকম খাবার। তাকিয়ে থেকে আর বসে থাকতে পারলো না। ব্যাগটা হাতে নিয়ে রওনা হলো নিজের রুমের দিকে।
রুমের সামনে দাঁড়িয়ে পুরো রুমে চোখ বুলালো। না মেহরিন নেই। সোলেমান ভেতরে ঢুকে ল্যাগেজ টা এক সাইডে রেখে বিছানায় গিয়ে বসলো। ওয়াশরুম থেকে পানি পড়ার আওয়াজ আসতেছে। বউ তার গোসলে তাহলে। সোলেমান অপেক্ষা করতে লাগলো বউ বের হওয়ার৷ বউ বের হলে সে নিজেও ফ্রেশ হবে।
মিনিট পাঁচেক পর দরজা খোলার শব্দে সোলেমান মাথা ঘুরিয়ে ওয়াশরুমের দিকে তাকালো। টিয়া রঙের কামিজ পড়া মেহরিন, মাথায় টাওয়াল পেঁচানো এক হাতে ভেজা জামাকাপড় নিয়ে বের হচ্ছে । শরীরে ওড়না নেই। মেহরিন ওয়াশরুমের দরজা পেরিয়ে মাথা উঁচু করতেই বিছানায় স্বামী কে দেখে চমকে উঠলো। পড়নে সাদা পাঞ্জাবি। সোলেমান এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে মেহরিনের দিকেই। মেহরিন নিজের দিকে তাকালো। ওড়না নেই শরীরে। ওড়না টা বিছানায় রাখা। সোলেমান মেহরিনের অবস্থা বুঝে চোখ সরিয়ে নিলো।
মেহরিন মাথা থেকে টাওয়াল টা খুলে মেলে নিলো সামনে। ভেজা লম্বা চুল থেকে এবার পানি চুইয়ে পড়নের জামা ভিজতে লাগলো।
মেহরিন দ্রুত পায়ে হেঁটে বেলকনিতে এসে জামাকাপড় মেলে দিলো। বুকের অস্থিরতা আরো দ্রুত হলো। ইশ কি বাজে সিচুয়েশনেই না পড়েছিল মেহরিন। কথাটা ভেবেই বেলকনিতে থাকা অন্য জামার ওড়নাটা শরীরে জড়িয়ে মাথায় দিয়ে রুমে আসলো। ততক্ষণে সোলেমান ওয়াশরুমে ঢুকে গেছে। মেহরিন বিছানায় থাকা ওড়না টা নিয়ে শরীরে থাকা ওড়নাটা খুলে ফেললো। ওড়নাটা ভালো মতো মাথায়,গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ঠোঁট কামড়ে অপেক্ষা করতে লাগলো সোলেমানের।
কয়েক মিনিট পর সোলেমান ভেজা চুল টাওয়াল দিয়ে মুছতে মুছতে বের হলো। পড়নে এখন অফ হোয়াইট টি-শার্ট আর অফ হোয়াইট টাউজার। মেহরিনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। এই প্রথম সদ্য গোসল থেকে বেরিয়ে আসা স্বামী কে দেখলো মেহরিন। বেহায়ার মতন তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু মেহরিন দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। মেহরিন কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সোলেমান মাথা মুছতে মুছতে বলল-
-” আসসালামু আলাইকুম বিবিজান।
মেহরিন আস্তে করে মাথা ঘুরালো। তবে সোলেমানের দিকে তাকালো না। মাথা নত রেখেই বলল-
-” ওয়ালাইকুমুস সালাম।
সোলেমান খেয়াল করলো মেহরিন তার দিকে তাকাচ্ছে না। এ-ও খেয়াল করলো মেহরিনের চুল দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে ফ্লোর ভিজে যাচ্ছে। সোলেমান বউয়ের দিকে এগিয়ে আসলো। এক হাতের মতন দুরত্ব রেখে বলল-
-” স্বামীর দিকে তাকাচ্ছ না যে? কোনো সমস্যা?
মেহরিন এবার স্বামীর দিকে তাকালো। চোখাচোখি হলো একে ওপরের । সোলেমান এক হাত দিয়ে মেহরিনের মাথার ওড়না ফেলে দিলো মাথা থেকে। তারপর মাথা বাঁকা করে পেছনে থাকা চুলের দিকে তাকাতেই নজরে আসলো বউয়ের লম্বা চুল গুলো। সাথে সাথে মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো-
-” মাশা-আল্লাহ!
সোলেমান এর আগে মেহরিনে চুল সেভাবে খেয়াল করে দেখে নি। মেহরিন তো সবসময় মাথায় কাপড় দিয়েই আসতো। সেজন্য জানার উপায় ছিলো না। মেহরিন সোলেমানের এমন কাজে চমকে উঠলো। বুকের ভেতর শুরু হলো ধুকপুকানি। সোলেমান মেহরিন কে ঘুরিয়ে উল্টো দিকে ফেরালো। মেহরিনের পিঠ গিয়ে ঠেকলো সোলেমানের বুকে। সাথে সাথে মেহরিনের মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেলো এক শিহরণ। সোলেমান হাতে থাকা টাওয়াল দিয়ে মেহরিনের লম্বা ঘন ভেজা চুল মুছতে মুছতে বলল-
-” গোসল শেষে চুল ভালোমতো মুছতে হয়। না হলে ঠান্ডা লেগে যাবে। নিজের প্রতি এমন কেয়ারলেস হলে তো চলবে না।
-” আ…আমি করে নিচ্ছি।
-” আমি করে দিচ্ছি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো। হেয়ার ড্রায়ার কোথায়?
-” নেই।
সোলেমান মেহরিন কে ছেড়ে দিয়ে রুমাইসার ঘরে আসলো। রুমাইসা ফোন চালাচ্ছিলো। ভাইকে রুমে দেখে বলল-
-” কিছু লাগবে ভাই?
-” হুমম। তোর হেয়ার ড্রায়ার টা দে।
রুমাইসা ড্রেসিং টেবিল থেকে হেয়ার ড্রায়ার টা বের করে সোলেমান কে দিলো। সোলেমান হেয়ার ড্রায়ার টা নিয়ে নিজের রুমে আসলো। মেহরিন কে ধরে বিছানায় বসিয়ে যত্ন সহকারে চুল গুলো শুঁকিয়ে দিতে লাগলো। লম্বা চুল সোলেমানের ভীষণ পছন্দ। তার মায়েরও লম্বা চুল ছিলো। চুল সব শুঁকানো শেষে সোলেমান মেহরিন কে বলল-
-” লম্বা চুল তোমার স্বামীর ভীষণ পছন্দের বউ। তাই চুলের যত্নে নিবে সব সময়। মনে থাকবে?
-” জ্বি মনে থাকবে।
মেহরিন চুল গুলো হাত খোঁপা করে বেঁধে নিলো। নিচ থেকে আফিয়া সুলতান ডেকে উঠলো মেহরিন আর সোলেমান কে। সোলেমান বউয়ের মাথায় ওড়না দিয়ে বলল-
-” চলো নিচে যাওয়া যাক।
সোলেমান মেহরিনের হাত ধরে নিচে আসলো। খাবার টেবিলে ইব্রাহিম, রুমাইসা আর আফিয়া সুলতান বসে আছে। মেহরিন ইব্রাহিম কে দেখে সালাম দিলো। তবে তেমন একটা চিনে না ইব্রাহিম আসলে কে হয়। সোলেমান নিজের বা পাশের চেয়ার টা টেনে দিলো মেহরিন কে বসার জন্য। মেহরিন বসলো। সোলেমান নিজেও বসে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” বাবা আর দাদুকে দেখছি না যে?
-” উনারা কি আর বাসায় থাকার মানুষ নাকি। তোর মতই এখানে ওখানে দৌড়াচ্ছে। সন্ধ্যার আগে ফিরবে বলেছে।
-” দাদুর তো বয়স হয়েছে। তাকে অন্তত রেস্ট নিতে বলো। ছেলে যখন সামলাচ্ছে তখন ছেলেকে একাই সামলাতে দিক।
-” সেটা তুই নিজেই বলিস। এখন খাওয়া শুরু কর। সব মেহরিন একা রেঁধেছে।
সোলেমান খাবার গুলো দেখলো। পোলাও,গরু,মুরগী,মাছ,ডাল,ভাজি,পায়েস,রোস্ট থেকে শুরু করে সব আছে।
ইব্রাহিম মুখে খাবার তুলেই বেশ প্রশংসা করলো খাবারের। কিন্তু মেহরিন তো তার স্বামীর মুখে প্রশংসা শুনতে চায়। সোলেমান চুপচাপ খাবার খাচ্ছে। মেহরিন তো বারবার আড়চোখে দেখছে৷ মুখের এক্সপ্রেশন শূন্য। বোঝার উপায় নেই ভালো লেগেছে নাকি খারাপ। মেহরিনের মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
খাওয়াদাওয়া শেষে সোলেমান আর ইব্রাহিম বাগানে গিয়ে বসলো। মেহরিন আশায় ছিলো খাওয়া শেষে অন্তত ভালো মন্দ কিছু একটা বলবে । কিন্তু বললো না। মেহরিন এঁটো থালাবাসন গুলো ধুয়ে রেখে রুমে চলে আসলো। রুমে এসে জানালার সামনে দাঁড়াতেই স্পষ্ট দেখা গেলো সোলেমান আর ইব্রাহিম কে। কিছু একটা নিয়ে কথা বলছে তারা।
মেহরিন সরে আসলো জানালা থেকে।
ইব্রাহিম সোলেমানের নীরবতা দেখে বলল-
-” মেহরিন আশায় ছিলো তুই কিছু বলবি খাবার নিয়ে। এত কষ্ট করে রাঁধলো মেয়েটা। ভালোমন্দ কিছুই বললি না!
সোলেমান পাত্তা দিলো না এই কথাকে। সে নিজের মতন ফোন স্ক্রোল করতে লাগলো।
সুলতান নিবাসে এখন আছে বাড়ির ম্যেড, আর এজওয়ান সুলতান। বাশার সুলতান বাহিরে গেছে। এজওয়ান নিজের রুমে বসে ল্যাপটপে জরুরী কোনো একটা কাজ করছিলো। এজওয়ানের বিয়ের কথাটা এখনও সুলতান বাড়ির কেউ জানে না। আকস্মিক নিজের রুম থেকেই এজওয়ান গাড়ির শব্দ শুনতে পেলো। এই সময় কে আসলো? বাহাদুর? না ও আসার আগে ইনফর্ম করে আসে।এজওয়ান বেশি মাথা ঘামালো না। নিজের কাজে মনোযোগ দিলো। যেই উদ্দেশ্যে তার দেশে আসা সেই উদ্দেশ্য তার পূরণ করতেই হবে। না হলে সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। আর এজওয়ান এই ধ্বংসাত্মক চায় না। মাহি কে জাস্ট ধ্বংস করে দিবে এজওয়ান। মাহির সব কেঁড়ে নিয়ে মাহিকে একদম একা করে দিবে এই পৃথীবিতে। তারই ছক কষছে এজওয়ান।
ল্যাপটপে কাজ করার মাঝেই ম্যেড দরজায় করা নেড়ে জানালো একটা মেয়ে এসেছে বাড়ির বাহিরে, ভেতরে ঢুকতে চাইছে।
মেয়ে বলতেই এজওয়ান বুঝে গেলো কে এসেছে। ম্যেড কে বললো ভেতরে আসতে দিতে।
এজওয়ান ল্যাপটপ টা বন্ধ করে রুম থেকে বের হলো। করিডরে এসে নিচে তাকাতে দেখলো সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেছে মাহি। এজওয়ান বাঁকা হাসলো। শিস বাজাতে বাজাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে মাহির সামনে দাঁড়ালো। মাহি আপাদমস্তক এজওয়ান কে দেখলো।
-” এসে পড়েছো স্বামীর টানে বউউউ? স্বামী ছাড়া বুঝি থাকতে পারছিলে না?
মাহি বাঁকা হাসলো।
এজওয়ানের বুকে আঙুল দিয়ে বলল-
-” আসতে তো হতোই মিস্টার এজওয়ান সুলতান। আফটার অল আমি এখন এই সুলতান বাড়ির বউ। এ বাড়ি তো এখন আমারই তাই না?
-” একদম।
মাহি আশেপাশে তাকিয়ে বলল-
-” তা আমার শ্বশুর মশাই ভাসুর ঠাকুর কোথায়?
-” এসেই শ্বশুর আর ভাসুরের খোঁজ নিচ্ছো! ভেরি স্ট্রেঞ্জ! নিয়ত ভালো তো?
-” একদম খাঁটি নিয়ত। ইউ নো না?
-” ইয়েস আই নো তরিকুলের বেটি। আই নো। মারতে এসেছো আমায় তাই তো?
-” একদম।
-” নিজ হাতে মারবে?
-” কোনো ডাউট আছে এতে?
এজওয়ান মাহির আঙুল বুকে চেপে ধরে বলল-
-” কোনো ডাউট নেই সুইটহার্ট । ইউ ক্যান ট্রাই। আই হ্যাভ নো প্রবলেম। কিন্তু তুমি আমায় মা’রতে পারবে তো?
মাহি এজওয়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-
-” নিঃসন্দেহে।
এজওয়ান ঘাড় কিছুটা কাত করে ম্যেড কে ডেকে বলল-
-” তোর ভাবিকে আমার রুম টা দেখিয়ে দিয়ে আয়। অপবিত্র বাপের পবিত্র মেয়ে যাও রুমে যাও। ফ্রেশ হয়ে মেয়েলি পোশাক পড়ে মেয়ে সেজে নাও। অনেক তো জিন্স লেদার জ্যাকেট পড়ে swag ভাব নিয়ে ছিলে। এবার খোলস বদলাও। সুলতান বাড়ির বউরা নম্র ভদ্র হয়।
মাহি ল্যাগেজ টা নিয়ে ম্যেডের সাথে চলে গেলো উপরে।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই ইমন বারবার চেষ্টা করছিলো মাকে কিছু বলার জন্য কিন্তু কেনো যেনো বলতে পারছিলো না। এখন বাজে রাত সাতটা। ইমন মা বোনের জন্য আনা কাপড় গুলো ব্যাগ থেকে বের করলো। মায়ের শাড়ি মা’কে আর বোনের টা বোনের হাতে তুলে দিলো। ঊর্মি তো জামা টা হাতে পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছে। এখই পড়ে দেখবে কেমন লাগে। সেজন্য রুমে চলে গেলো।
ইতি বেগম শাড়িটার কাপড়ের গুণ দেখে একটু থমকালেন।
-“এই শাড়িটা তো কম করে হলেও তিন-চার হাজার টাকা হবে রে! এত দাম দিয়ে কেনার কি দরকার ছিল?
ইমন মৃদু হেসে আরেকটা শাড়ি ব্যাগ থেকে বের করলো। রঙটা ছিল যেন একটু বেশি মায়াবী, একটু বেশি যত্নে বাছাই করা।
-” বেশি নেয়নি মা।
ইমন বললো হালকা স্বরে।
ইতি বেগম ইমনের হাতে থাকা শাড়িটা দেখে আবার প্রশ্ন করলেন-
-” এই শাড়িটা আবার কার জন্য?
ইমন কিছু না বলে বিছানার পাশে বসে পড়লো। তারপর একটুখানি সময় নিয়ে মায়ের পায়ের কাছে মেঝেতে বসে মাথাটা মায়ের কোলে রেখে দিলো। হঠাৎ ছেলেকে এভাবে নিচে বসতে দেখে ইতি বেগম আঁতকে উঠলেন।
– “এমন করে বসতেছিস কেন রে?
ইমন তার সমস্ত আবেগ গলায় নিয়ে ফিসফিস করে বললো –
-“মা, আজ একটা জিনিস চাইবো তোমার কাছে। না বলো না, প্লিজ না বলো না।
ইমনের গালে হাত রেখে মমতায় ভরা কণ্ঠে ইতি বেগম বললেন-
-” সাধ্যের মধ্যে হলে নিশ্চয়ই এনে দেব।
ইমন একটু মাথা তোলে। চোখে ভেসে ওঠে ভরসার টলটলে জল। শাড়িটা হাতে নিয়ে বললো
– “এই শাড়িটা মেহরিনের জন্য এনেছি মা… তুমি দিয়ে দিও ওকে?
ইতি বেগম অবাক হয়ে গেলেন। শাড়িটা হাতে নিলেন ধীরে।
– “আচ্ছা… দিয়ে দেব মেহরিনকে।
-” মা আর একটা কথা।
-” হুমম বল।
ইমন ব্যাকুল হয়ে মায়ের হাত দুটো মুঠোয় নিয়ে বলতে থাকলো-
-” মেহরিনের বাবার কাছে কি মেহরিনের হাত টা চাইতে পারবে আমার জন্য? আমি ভীষণ ভালোবাসি মেহরিন কে মা। একটু কি চাইবা চাচার কাছে মেহরিন কে? আমি সুখে রাখবো মেহরিন কে। কখনও কোনো কষ্ট পেতে দিব না। ঢাকায় আরো পরিশ্রম করবো। চাচা কে গিয়ে একটু বলবে? জানি চাচা কোনো বেকার ছেলের কাছে মেয়ে দিত না সেজন্য আগে বলি নি। এখন তো একটা কাজ করতেছি মা। এখন তো বলাই যায় তাই না? আমি এখন পারবো মা মেহরিন কে সুখে রাখতে। এখন না চাইলে কবে চাইবো বলো?
ছেলের মুখে এমন কথা শুনে ইতি বেগম চমকে উঠলো। তার ছেলে মেহরিন কে ভালোবাসে!কিন্তু মেহরিন তো বিবাহিত। মাকে চুপ থাকতে দেখে ইমন ফের ব্যাকুল হয়ে বলল-
-” কি হলো মা চুপ কেনো? যাবে না চাচার কাছে? চাইতে পারবে না আমার জন্য মেহরিনের হাত টা? কখনও কোনো কিছু চাই নি তোমার কাছে। আজই চাচ্ছি। একটু কথা বলিও চাচার সাথে?
ইতি বেগমের কি ভাবে শুরু করা উচিত বুঝতে পারছে না। তার ছেলে এত ব্যাকুল হয়ে আগে কখনই কিছু চায় নি। কিন্তু আজ যেটা চাইছে সেটা তো এনে দেওয়া সম্ভব না ইতি বেগমের পক্ষে।
-” খুব ভালোবাসিস মেহরিন কে?
-” খুব মা। আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা। কিশোর বয়সের প্রথম ভালো লাগা।
-” আগে কেনো জানাস নি আমায়?
-” এখন তো জানাচ্ছি মা। এখন তো কাজ করি। মেহরিন কে তিন বেলা খাওয়াতে পারবো। সুখে রাখতে পারবো বলেই তো এখন জানাচ্ছি।
ইতি বেগম ইমনের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো। এখন বলে কি লাভ হলো? যা হওয়ার তো হয়েই গেছে আগে।
-” এখন জানিয়ে কোনো লাভ নেই ইমন।
ইমন ভ্রু কুঁচকালো।
-” জানিয়ে লাভ নেই মানে আম্মা!
-” মেহরিন কে তোর পক্ষে পাওয়া অসম্ভব।
ইমনের বুক টা ভয়ে ধক করে উঠলো। অজানা আশঙ্কায় বুকের ভেতর ঝড় বয়ে গেলো।
-” আমার পক্ষে পাওয়া অসম্ভব মানে?
ইতি বেগম শক্ত গলায় বলল-
-” মেহরিন এখন বিবাহিত ইমন।
ইমনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকালো। এই কথাটা যেন ইমনের বুকে ছুরি চালালো।
ইমনকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই একটা বাক্যই যথেষ্ট ছিলো। মেহরিন এখন বিবাহিত! কিন্তু মেহরিন বিবাহিত হতে পারে কি করে? মেহরিনের বিয়ে হলো কবে? বিয়ে হলে ইমন জানতে পারতো না? তার মা নিশ্চয়ই মজা করছে। হ্যাঁ মজাই করছে। ইমনের গলা কাঁপতে শুরু করলো। মায়ের হাত মুঠোয় নিয়ে অসহায় গলায় বলল-
-” আম্মা তুমি মজা করতেছো আমার সাথে তাই না? দেখো মজা করো না আম্মা। আমি মেহরিন কে ছাড়া বাঁচতে পারবো না আম্মা। আমি এখন একটু খানি সুখের মুখ দেখতেছি এমন কথা বইলা আর ভয় দেখাইও না । মেহরিন কে তো আমি ভালোবাসি। তুমি চাচার কাছে যাইতে না পারলে যাওয়ার দরকার নেই আমি যাব মা। তারপরও এমন মজা কইরো না। আমার বুকে ব্যথা করে আম্মা।
-” আমি মিথ্যা বলছি না ইমন। মেহরিনের গত মাসেই বিয়ে হয়ে গেছে।
ইমন ছিটকে দূরে সরে আসলো।
-” আম্মা মিথ্যা বইলো না। আমি সইতে পারতেছি না তো।
ইতি বেগম ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো।
-” সত্যি বলতেছি বাপ। কসম। মেহরিনের বিয়ে হয়ে গেছে।
সারা শরীর ইমনের জমে গেলো। মনে হলে নিঃশ্বাস নিতে সে ভুলে গেছে৷ সত্যি মেহরিনের বিয়ে হয়ে গেছে! এই একটা কথা কি মিথ্যা হতে পারে না?
-” গত মাসে যে ঊর্মির জামা কেনার জন্য টাকা চেয়েছিলাম না? ওটা মেহরিনের বিয়ের জন্যই। মেহরিনের বিয়ে হয়ে গেছে বাপ। তুই তো আমাদের কাউকে জানাস নি যে তুই মেহরিন কে ভালোবাসিস। জানালে আমি ভাই সাহেবের সাথে কথা বলতাম।
ইমনের পাগল লাগতে শুরু করলো নিজেকে। মাথার চুল খামচে ধরলো। তারপর পাগলের মতন মাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতন কেঁদে উঠলো। বুক ভাসানো সেই কান্না। পুরুষ মানুষ তো খুব সহজে কাঁদে না।
-” আম্মা আমার মেহরিনের বিয়ে হয়ে গেলো! আম্মা আমি বাঁচমু কেমনে আম্মা? আমি চাচার কাছে ভিক্ষা চাইলে আমার মেহরিন রে আমার কাছে আইনা দিব না আম্মা? চাচা যা বলবে আমি তাই করবো আম্মা। তারপরও আমার মেহরিন রে আমায় আইনা দাও আম্মা। আমার বুকটা খাখা করে জ্বলতেছে আম্মা। আমার দুঃখ টা বুঝো আম্মা। আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে আম্মা। আমি মরে যাব মেহরিন কে না পেলে।
ছেলের এমন কথা শুনে ইতি বেগম চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলো না। এই কান্নায় ইতি বেগম নিজেও ভেঙে পড়লেন। কিভাবে শান্তনা দিবে, কী বলবে, তার কোনো ভাষা নেই। শুধু আঁকড়ে ধরলেন তার ছেলেকে।
-” আম্মা শুনতে পাচ্ছো? আমার মেহরিন কে চাই। তুমি কোথা থেকে এনে দিবা আমি জানি না। আমার মেহরিন চাই আম্মা।
ঊর্মি জামাটা পড়ে মায়ের রুমে আসে। মা’কে এমনভাবে ভাইকে জড়িয়ে ধরে থাকতে দেখে হতবিহ্বল হয়ে এগিয়ে এসে বলল-
-” কি হয়েছে মা ভাইয়ার?
ইমন বোনের দিকে তাকালো। ঊর্মি দেখলো ভাইয়ের চোখে জল।
-” মেহরিনের বিয়ে হয়ে গেছে ঊর্মি?
ঊর্মি অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলো-
-” ভাইয়া কি হয়েছে তোর? তোর চোখে পানি কেনো?
-” তোকে যা জিজ্ঞেস করছি সেটা বল।
-” হ্যাঁ মেহরিনের বিয়ে হয়ে গেছে।
কথাটা ইমনের কানে আসতেই ইমন বসা থেকে উঠে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। ঊর্মি মা’কে জিজ্ঞেস করলো-
-” মা ভাইয়ার কি হয়েছে? বিয়ের কথা শুনতেই এমন রেগে গেলো কেনো?
-” ইমন জানে না তো সেজন্য রাগ হয়েছে। আমি খুঁজে আনছি।
ইতি বেগম কথাটা বলেই বেরিয়ে গেলো।
এই নিস্তব্ধ রাতেই ইমন বাড়ি থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে চলে এলো গ্রাম ছাড়িয়ে মাঠের দিকে। মাঠে এখন ধান নেই, ধান কাটা হয়ে গেছে বহু আগেই। ফাঁকা মাঠটা, সামনেই নদী। শান্ত, নীরব, অথচ যেন ইমনের ভেতরের তাণ্ডব টাও যেন আঁচ করতে পারছে এই নদী। ইমন আর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না।
এক নিঃশ্বাসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো ফাঁকা মাঠে। দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। এমন কান্না ইমন তার বাপ মরার দিনও কাঁদে নি। ইমনের আজকের কান্নার শব্দটা ভেঙে পড়া হৃদয়ের মতোই করুণ, যেন আকাশ পর্যন্ত কেঁপে উঠলো তার আহাজারিতে। তার প্রিয় মেহরিন আর তার নেই! এই কথাটা বুকের ভেতর এমনভাবে বিঁধে যায়, যেন কেউ ছুরি চালিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
ইমনের মনে হচ্ছিল, বুকটা ফেটে যাচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কষ্টটার নাম যদি কিছু হয়, তবে এটাই, ভালোবেসেও না পাওয়ার যন্ত্রণা। সে তো মেহরিনকে পাওয়ার স্বপ্নে, জীবনের সব দুঃখ সয়ে ঢাকা গিয়েছিলো। রোজগার করে, কিছু হয়ে ফিরে এসে নিজের করে নেবে মেহরিন কে। তাহলে কেনো ফিরে এসে শুনতে হলো, মেহরিন এখন আর তার নেই?
চোখজোড়া অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে এলো। চাঁদ ঢাকা পড়ে গেল তার দৃষ্টিতে। সে মাথা তুলে তাকালো আকাশের দিকে। কণ্ঠে এক হৃদয়বিদারক আর্তি-
-” হে আল্লাহ! এটা তুমি কি করলে আমার সাথে? তুমি তো জানো, আমি কতটা ভালোবাসি ওকে! তাহলে কেনো এমন করলে? আমার কিসের অপরাধ ছিল, যে এই শাস্তি দিলে আমাকে? কেনো তুমি সুখটা কেবল আমার কাছে অসমাপ্ত করে রাখো? আমার সাথে কিসের শত্রুতা তোমার বলো আল্লাহ। আমাকে কেনো সুখের মুখ দেখতে দিতে চাও না? আমার মেহরিনকে ফিরিয়ে দাও, খোদা! আমি আর পারছি না… আমি আর পারছি না এই যন্ত্রণা সহ্য করতে। আমার বুকটা হাহাকার করছে। আমার স্বপ্নগুলো ভেঙে যাচ্ছে টুকরো টুকরো হয়ে।
দাহশয্যা পর্ব ২৬
ইমন মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে ফেললো। এই পৃথিবীর অক্সিজেন, বাতাস, মাটির ঘ্রাণ সব ইমনের অসহ্য লাগতে শুরু করলো। এমন সময় হুট করে ইমন অনুভব করলো কেউ তার পিঠে হাত রেখেছে। ইমন মাথা উঁচু করে দেখলো তার মা এসেছে। ইমন এবারও মা’কে জড়িয়ে ধরলো। নিয়তি বারবার কেনো তার দোরগোড়ায় এসে হাজির হয় দুঃখ নিয়ে? ইমন এবার এমন ভাবে ভেঙে গেলো যে নিজেকে ইমন আর সামলাতে পারছে না। ইমন হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল-
-❝ আমি সুখের আশায় দুঃখ বিক্রি করতে গিয়া অবশিষ্ট সুখ টাও হারাইয়া ফেললাম আম্মা!❞
