Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ২৬

দাহশয্যা পর্ব ২৬

দাহশয্যা পর্ব ২৬
Raiha Zubair Ripti

পরের দিন সকালে সোলেমান বসুন্ধরা শপিংমলের দিকে রওনা হলো। ইব্রাহিম ইমন কে সাথে নিয়ে এসেছে। ইব্রাহিমের তো পরিবারে কেউ নেই। ইব্রাহিম চাচ্ছে এবারের ঈদে ইমনের পরিবারের জন্য শপিং করিয়ে দিতে। ইমন কে মলের ভিতরে নিয়ে বলল-
-” ইমন তোমার পরিবারের জন্য যা যা ইচ্ছে হয় সব কিনে নাও এখান থেকে।
ইমন আশেপাশে তাকালো। এখানে কেনাকাটা করলে বাড়িতে কি নিয়ে যাবে? সব টাকা তো মার্কেটের পেছনই চলে যাবে। সামনের মাসে তো ঊর্মির কলেজেরও ভর্তির ডেট।

-” না না ভাইয়া। আপনারা করুন। আমি বাড়ি গিয়ে করবো মাকে সাথে নিয়ে।
-” এখানে করলে কি সমস্যা ইমন?
-” ভাইয়া এখানকার দাম অনেক টা বেশি। আমাদের মতন মধ্যবিত্তদের জন্য এই মল না। আমি বাড়ি ফিরেই করবো নি কোনো সমস্যা হবে না।
ইব্রাহিম ইমনের কাঁধে হাত রেখে বলল-
-” টাকার চিন্তা করো না। আমার তরফ থেকে তোমার পরিবারের জন্য তোফা।
বিষয় টা ইমনের মোটেও ভালো লাগলো না। কারো দয়া বা বিনা শ্রমের বাহিরে বারতি কোনো সুযোগ সুবিধা বা সাহায্য ইমন চায় না কারো থেকে।

-” আপনারা করুন ভাইয়া। আমি আমার সাধ্যের মধ্যে নেওয়ার চেষ্টা করছি।
ইব্রাহিম বুঝে গেলো ইমন নিবে না। ইব্রাহিম জোর করলো না।
সোলেমান মলের বাহিরে থেকে ইব্রাহিম কে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-” কোথায় তুই?
ইব্রাহিম জবাব দিলো-
-” ভেতরে আমি আয়।
সোলেমান ভেতরে গিয়ে ইব্রাহিমের কাছে গেলো। ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করলো-
-” বউয়ের জন্য কি নিবি? শাড়ি?
সোলেমান মেয়েদের পোশাকের দিকে যেতে যেতে বলল-

-” বাচ্চা ল্যাদা বউ আমার। শাড়ি পড়ার বয়স নাকি এটা? থ্রি-পিস জাতীয় কিছু নিতে হবে। সব সময় ক্যারি করতে পারবে।
-” বিয়ে হয়ে গেছে সোলেমান। এখন শাড়ি পড়বে না তো কখন পড়বে?
-” বড় হলে পড়বে। তখন আলমারি ভরে শাড়ি কিনে দিব।
-” আচ্ছা চল।
-” তোর ড্রাইভার কই?
-” শপিং করতেছে। ছেলেটার ভীষণ আত্মসম্মান রে। বললাম আমি করে দেই। মানা করে দিলো। নিজের বেতনের টাকার মধ্যে করার চেষ্টা করছে।
-” বেতন বাড়িয়ে দিস।
-” হুমম।
সোলেমান আশেপাশে চোখ বুলালো ড্রেসে। কিছুই তো পছন্দ হচ্ছে না। সব গর্জিয়াছ। সোলেমান দু বার দেখাতেই বুঝে গিয়েছে মেহরিন তার নিজের মতই সিম্পল ঢিলাঢালা পোশাক পড়ে। সোলেমান সেলসম্যান কে বলল-

-” সিম্পলের মধ্যে কিছু থ্রি-পিস কালেকশান দেখান।
দোকানদার দেখালো। সোলেমানের বাকি কালার গুলোর থেকে সাদা কালারে গিয়ে চোখ আটকালো। পাকিস্তানি থ্রিপিস,তার উপরে সাদা সাদা সিম্পল স্টোন বসানো। সোলেমান সাদা টা প্যাক করতে বললো। তারপর সেই দোকানের আশেপাশে তাকালো। সাদা আরো কিছু ড্রেসের কালেকশান দেখতে পেলো। একটা গ্রাউন আছে। সোলেমান সেটাও নিয়ে নিলো।
ইব্রাহিম সোলেমানের কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগলো। নিজে সাদা রঙের জামাকাপড় পড়ে বলে বউয়ের জন্যও শুধু সাদা রঙই নিচ্ছে। আর কি কালার নেই নাকি? আশেপাশে আরো কত সুন্দর সুন্দর কালার আছে৷ কিন্তু না তার সাদাতেই চোখ আটকাচ্ছে।

এদিকে ইমন মা আর বোনের জন্য সাত হাজার টাকার মধ্যে একটা ড্রেস আর শাড়ি কিনেছে। নিজের জন্য বাড়ি গিয়ে কিনবে। এখন মেহরিনের জন্য কিছু কিনবে ইমন। মেহরিনের তো শাড়ি ভীষণ পছন্দ। ইমন বিয়ের পর মেহরিন কে প্রতি মাসে একটা করে হলেও শাড়ি উপহার দেওয়ার চেষ্টা করবে। নারীর খুশি শাড়িতে। কিন্তু ইমন এটা জানতে পারলো না মেহরিনের খুশি এখন তার স্বামীতে।
ইমন অন্য শাড়ির দোকানের দিকে আসলো। দেখলো ইব্রাহিম আর সোলেমান দাঁড়িয়ে আছে শাড়ির দোকানে। সোলেমানের সাথে এখনও কোনো কথাই তার হয় নি। ইমন এগিয়ে গেলো। ইব্রাহিমের পাশে দাঁড়াতেই ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করলো-

-” সব কেনা শেষ?
ইমন প্যাকেট গুলো দেখিয়ে বলল-
-” হ্যাঁ মা বোনের জন্য শেষ। এখন আরেক জনের জন্য কিনবো।
-” কার জন্য? দাদি?
-” না দাদি নেই আমার। খুব কাছের কারোর জন্য।
-” স্পেশাল?
ইমন মুচকি হেঁসে বলল-
-” হ্যাঁ তেমনটাই।
ইব্রাহিম বুঝে নিলো স্পেশালের মানে টা। ইমন শাড়ির কালেকশন একটু দূর থেকে চোখ বুলাতে লাগলো। হঠাৎ হোয়াইট রঙের একটা শাড়িতে চোখ আঁটকে গেলো ইমনের। মেহরিনের ফর্সা গায়ে দারুন মানাবে। কথাটা ভেবেই শাড়ির দিকে এগোতে নিলে সোলেমান সেই সেম শাড়ি টার দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিয়ে বলল-

-” ঐ শাড়িটা বের করুন তো।
সোলেমান শাশুড়ি, মা আর শালির জন্য শাড়ি কিনতে গিয়ে হঠাৎ করে এই শাড়িটায় চোখ আটকে গেলো। । বউয়ের জন্য কোনো শাড়ি নিবে না বলেও এই শাড়িটা রাখতে ইচ্ছে করলো না। সোলেমান প্যাক করতে বলল।
ইমনের মন খারাপ হয়ে গেলো। দোকানদারের কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-” সেম শাড়ি আর নেই?
দোকানদার জানালো নেই। ইব্রাহিম ইমন কে দোকানদারের সাথে কথা বলতে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
-” কোনো প্রবলেম ইমন?
-” না না ভাইয়া কোনো প্রবলেম না।
-” ওহ্ শাড়ি পছন্দ হয়েছে?
-” দেখছি ভাইয়া।

ইমন ৫ হাজারের ভেতর মেরুন রঙের একটা শাড়ি কিনে নিলো।
মল থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে দুপুর ৩ টা বেজে গেলো সোলেমান দের। রুমাইসার জন্য কিনে নি সোলেমান। রুমাইসা নিজের মার্কেট নিজে মার্কেটে গিয়ে পছন্দ করে কিনে আনে।
ইমন ইব্রাহিমের সাথে বাগান বাড়িতে ফিরে জামা কাপড় গুছিয়ে নেয় ব্যাগে। সন্ধ্যার পর রওনা হবে। ইব্রাহিম বলেছিল আগামীকাল তাদের সাথেই যেতে। কিন্তু ইমন শোনে নি। তার জানপ্রাণ আঁটকে আছে তার বাড়িতে। কতো মাস হয়ে গেলো কতোদিন ছুঁয়ে দেখা হয় নি নিজ বাড়ির মাটিকে।
মাটির একটা আলাদা গন্ধ থাকে,নোনতা মমতার মতো। সে গন্ধ শহরের কার্পেটের নিচে নেই, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের বাতাসে নেই। সেই মাঠের ধানের গন্ধ, শীতল বাতাসের মধ্যে একটা শান্তি মাখানো। সেই গন্ধ সেই অনুভূতি এই শহরে নেই। তারচেয়ে বড় কথা তার আম্মা,তার মেহরিন,তার বোন যে নেই।
পাখির ডাক, হালকা বাতাস সব মিলিয়ে এক ধরণের শান্ত পরিবেশ হলেও তার সাথে যোগ হয়েছে ভারী নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতার মাঝে একা বসে আছে সাফওয়ান। চোখে ক্লান্তি, মুখে অপেক্ষার রেশ। মাহি এখনও আসেনি।
পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই দূর থেকে দেখতে পেলো মাহি আসছে।
তাড়াতাড়ি ফোনটা পকেটে রেখে উঠে দাঁড়ায় সাফওয়ান। মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বলল—

-” অনেক টা দেরি করিয়ে আসলে।
মাহি তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল-
-” আর কখনও আপনায় দেরি করাবো না সাফওয়ান। এই শেষ বার। আপনাকে আজ কিছু কথা বলার জন্য এখানে ডাকা।
-” হুমম বলো না। আমি তো শুনতেই চাই।
কথাটা বলেই সাফওয়ান মাহির গালে দু হাত রাখে। মাহির নিশ্বাস দ্রুত হয়। সাফওয়ানের হাত গাল থেকে সরিয়ে দিয়ে বলে-
-” আমাকে ভুলে যান সাফওয়ান।
-” কি বললে?
-” ভুলে যান আমায়।
সাফওয়ান অবাক হলো।
-” ভুলে যাব মানে?
-” মানে আপনার জীবন থেকে চিরতরে আমাকে মুছে ফেলবেন। আপনার হৃদয়ে আমাকে আর রাখবেন না। আপনার হৃদয়ে থাকার যোগ্য আমি নই।
সাফওয়ান মাহির বাহু চেপে ধরলো।

-” এই তুমি আবোল তাবোল কি বলছো কি মাহি এসব? তোমাকে ভুলে যাব মানে? নিজেকে ভুলতে পারবো কিন্তু তোমাকে ভুলতে পারবো না।
-” ভুলতে হবে আমাকে সাফওয়ান। আমি আর আপনার নেই। আমার আশায় থাকবেন না।
-” আমার নেই মানে? কি হয়েছে কি মাহি? এমন কথা বলছো কেনো?
-” আ…আমার ব..বিয়ে হয়ে গেছে সাফওয়ান।
কথাটা কানে আসতেই সাফওয়ানের হাতের বাঁধন ঢিলে হয়ে গেলে। পায়ের তলার মাটি সরে গেলো। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল-
-” ম..মিথ্যা কথা বলছো তাই না মাহি? মিথ্যা বলে না জান। জানো তো আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি? প্লিজ লক্ষীটি কষ্ট দিও না আর।
-” আমি মিথ্যা বলছি না সাফওয়ান। সত্যি বলছি। আমার বিয়ে হয়ে গেছে।
সাফওয়ান এবার উচ্চস্বরে বলল-

-” কি তখন থেকে বাজে কথা বলছো হু? তোমার বিয়ে হয় কি করে? আমাদের বিয়ে তো হয় নি সেদিন৷ তুমি তো ট্যুরে গিয়েছিলে তাই না?
-” আমি কোনো মিথ্যা বলছি না। আমি কোনো ট্যুরে যাই নি সেদিন।
-” তাহলে কোথায় গিয়েছিলে? কাকে বিয়ে করেছো তুমি?
-” এ.. এজওয়ানের কে।
এজওয়ানের নামটা শুনেই সাফওয়ান মাহির হাত ধরে বলল-
-” কিভাবে তুমি এজওয়ান কে বিয়ে করতে পারো মাহি? তোমার তো এজওয়ান পছন্দ না। তাহলে? এজওয়ান বাধ্য করেছে তাই না?
-” না আমি নিজেই করেছি।
-” মিথ্যা বলছো তুমি। তোমার চোখ বলে দিচ্ছে সেটা।
মাহি চোখ সরিয়ে নিলো।
-” এত কথা বলতে চাচ্ছি না। আপনাকে বলে দিয়েছি আমি বিবাহিত এখন। আমার অপেক্ষায় আপনি থাকবেন না ব্যাস।

-” কি নির্দ্বিধায় তুমি কথা গুলো বলছো মাহি! প্লিজ এসব বলো না। বিয়ে হয়েছে তাই তো? ওকে ফাইন আই হ্যাভ নো প্রবলেম৷ ডিভোর্সের ব্যবস্থা করছি আমি।
-” পাগলামি করবেন না সাফওয়ান। আপনি বাসায় যান। ভালো কোনো মেয়ে দেখে বিয়ে করে ফেলুন আসছি।
কথাটা বলেই সাফওয়ানের কোনো কথা না শুনেই মাহি চলে আসলো। বুকে কি ব্যথাটাই না করছিলো কথা গুলো বলার সময়। মাহি বুকে হাত ঘষতে ঘষতে রিকশা ডেকে চলে গেলো বাড়ির দিকে।
এদিকে সাফওয়ান মাটিতে হাটু ভেঙে বসে পড়েছে। এতক্ষণ ধরে এটাই বিশ্বাস করছিলো মাহি মিথ্যা বলছে। সাফওয়ান হতভম্ব! সে কখনো মাহিকে কষ্ট দেয়নি। এই মাহি তো তার সেই আগের মাহি না৷ মাহি ঠকালো সাফওয়ান কে! সাফওয়ান তো কম ভালোবাসে নি মাহি কে। মাহির কোনো কাজে তাকে বাঁধা দেয় নি। সব সময় সাপোর্ট করেছে৷ তাহলে মাহি কি করে বিয়ের কথা বলে অন্যজন কে বিয়ে করে নিলো! এখন সাফওয়ান বাঁচবে কি করে? কত স্বপ্ন সে সাজিয়েছে মাহিকে ঘিরে,তার কি হবে? সাফওয়ান এক বিকট শব্দ করে চিৎকার করে উঠলো। এটা মাহি কি করে করতে পারলো!
ইমন সন্ধ্যা হতেই বেরিয়ে যায় মহাদেবপুরের উদ্দেশ্যে। ইব্রাহিম এসেছে সুলতান নিবাসে। সোলেমান কাজের লোক কে বলে দিয়েছে প্যাকেট গুলো গুছিয়ে দিতে ল্যাগেজে। সন্ধ্যা সাতটার দিকে সদর দরজা দিয়ে এজওয়ান কে ঢুকতে দেখে বাঁকা চোখে একবার দেখলো সোলেমান। পড়নে লেদার ব্লাক জ্যাকেট। হাতে সিগারেট।

-” বিয়ে খাওয়া শেষ নাকি?
এজওয়ান সোলেমানের দিকে তাকালো। সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে দিয়ে বলল-
-” হুমম।
সোলেমান আর কিছু বললো না। এজওয়ান নিজের রুমে আসলো। রুমে ঢুকে বিছানার মাঝে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো। সিগারেটে টান মেরে ভাবতে থাকলো মাহির কথা। এবার জমবে খেলা। বাঘ আর শিকারী এখন একই ছাঁদের নিচে থেকে একে ওপরকে শিকার করবে। জোশ হবে এবার খেলাটা। এজওয়ান পকেট থেকে ফোনটা বের করে মাহির নম্বরে কল লাগালো।
মাহি বেলকনিতে বসে ছিলো। আকস্মিক ফোন টা বেজে উঠায়,নম্বর টা না দেখেই ফোনটা কানে নিয়ে বলল-
-” হ্যালো কে বলছেন?
মাহির গলার আওয়াজ শুনে ফোনের এপাশে থাকা এজওয়ান শোয়া থেকে উঠে বসে বলল-

-” তিন কবুলে শু’য়োরের বাচ্চা কু’ত্তার বাচ্চা বলা আপনার ভা’তার বলছি। আপনি কি সেই তিন কবুলে বলা শু’য়োরের বাচ্চা কু’ত্তার বাচ্চার বউ বলছেন?
মাহির চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো।
-” ফোন কেনো দিয়েছেন? কি চাই এখন?
-” শ্বশুর বাড়ি আসবে না বউ? তোমার জামাইটা তোমাকে মিস করছে অনেক। তাড়াতাড়ি এসে পরো স্বামীর বুকে। এই বুক তুমি ছাড়া শূন্য যে।
মাহি শক্ত গলায় বাঁকা হেঁসে বলল-
-” ভেরি সুন, এজওয়ান সুলতান, আই’ল বি দেয়ার টু মেইক ইয়োর এম্পটিনেস একো লাউডার। জাস্ট বি রেডি।
-” আই’ম ওয়েইটিং। ডোন্ট কিপ মি ওয়েইটিং টু লং সুইটহার্ট…
মাহি ফোনটা কেটে দিলো। লম্বা করে শ্বাস টেনে নিলো। পুরোনো কিছু বকেয়া হিসেব এবার চুকানোর পালা। সুলতান পরিবারের জন্য যা যা হারিয়েছে মাহি তার প্রতিটির হিসাব নিবে মাহি। ১৯৯৫ সাল টার কথা মাহি এখনও ভুলে নি। মস্তিষ্কে গেঁথে আছে সেই সালের কথা। তার হিসাব মাহি নিবে না? এত সহজে ছেড়ে দিবে তাদের? সুলতান পরিবারের প্রতিটি মানুষ কে মাহি নিঃশেষ করে দিবে।

রাত ১২ টার দিকে নিজের গ্রামে পা রাখলো ইমন। আশেপাশে বাড়ি ঘরের সব লাইট নেভানো। গ্রাম মানেই ১০ টার আগেই ঘুমানোর তোড়। ইমনের মনে শান্তি বয়ে যাচ্ছে। মা বোন কে বলে নি যে সে আজ আসছে৷ ইমন ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে বাড়ির পথ ধরে হাঁটছে। পাশের কোনো এক খাল থেকে পঁচা পানির গন্ধ ভেসে আসছে৷ এই পঁচা গন্ধতেও ইমন শান্তি অনুভব করছে। বাড়ির সামনের বাঁশের বেড়ার দরজা টা খুলে ইমন পা রাখলো উঠানে। মুখের হাসি আরো চওড়া হলো। কাঁধের ব্যাগ টা আরো চেপে উঠান পেরিয়ে দরজার সামনে এগিয়ে গিয়ে কড়া নাড়লো।
ইতি বেগম সবেই সেলাইমেশিন ছেড়ে উঠে শুয়েছিল। আকস্মিক এত রাতে দরজা ধাক্কার শব্দ শুনে চমকালো। চোরের যা উৎপাত বেড়েছে। হাতে লাঠি নিয়ে এগিয়ে আসলো দরজার দিকে। দরজার হাতল ধরে বলল-

-” কে দরজার বাহিরে?
সামনা-সামনি কত মাস পর মায়ের গলা শুনলো ইমন! ইশ কি যে ভালো লাগছে ইমনের। ইমন অস্থির গলায় বলল-
-” মা আমি ইমন।
আচমকা ছেলের গলা শুনে ইতি বেগম তাড়াতাড়ি করে দরজা খুললো। উঠানের আবছা আলোয় দেখতে পেলো কাঁধে ব্যাগ চেপে দাঁড়িয়ে আছে তার ইমন। ইতি বেগম ইমনের গালে মাথায় হাত বোলালো। ইমন মা’কে জড়িয়ে ধরে বলল-
-” ভালো আছো মা?
ইতি বেগম ছেলেকে ছেড়ে বলল-
-” হ বাপ ভালো আছি৷ আয় ভেতরে আয় বাপ। তুই যে আসবি বলিস নি কেনো?
ইমন ভেতরে ঢুকলো। রুমের ভেতরে থাকা ঊর্মি মায়ের গলা শুনে দরজা খুলে বাইরে এসে ভাইকে দেখে চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। ছুটে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল-

-” তুই এসেছিস ভাইয়া! বিশ্বাস হচ্ছে না আমার।
ইমন মা বোন কে দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে রুমের ভেতরে আসলো। ইতি বেগম ইমন কে হাত মুখ ধুতে বলল। ইমন কলপাড় থেকে হাত পা ধুয়ে নিলো। প্রচুর ক্ষিদে পেয়েছে৷ মায়ের হাতের রান্না করা খাবারের লোভ জাগছে৷ ইমন গামছা দিয়ে হাত মুখ মুছতে মুছতে বলল-
-” আম্মা ক্ষুধা লাগছে। ভাত দিবে খেতে?
ইতি বেগম তাড়াতাড়ি ছুটে গেলেন ভাতের রুমের দিকে। ভাতের পাতিলে হাত দিয়ে ঢাকনা উঁচু করতেই দেখে ভাতে পানি ঢালা। পানি কে ঢাললো ভাতে? ইমন মায়ের দেরি হতে দেখে ভাতের রুমে এগিয়ে গিয়ে দেখলো তার মা পাতিলে চাল ঢালছে৷ ইমন সামনে থাকা টেবিলের উপর ভাতের ঢাকনা উঁচু করে দেখে ভাতে পানি দেওয়া। এর আগেও তো পান্তা খেয়ে দিন কাটিয়েছে ইমন। ইমনের তো কোনো সমস্যা নেই পান্তা খেতে৷ ইমন মায়ের উদ্দেশ্যে বলল-

দাহশয্যা পর্ব ২৫

-” মা আমি কিন্তু পান্তা ভাতটাই খাব। রাঁধতে যেওনা এখন। আমি কোনো অতিথি নই যে এত আপ্যায়ন করছো। যা আছে ভাতের সাথে তাই দাও৷ এতেই আমার হয়ে যাবে।
ইতি বেগম ভাত গুলো প্লেটে ঢেলে আলু ভর্তা আর ডাল এগিয়ে দিলো। ইমন তৃপ্তির সাথে খেলো। মায়ের হাতের সব কিছুই অমৃত।
খাবার টা খেয়ে ইমন নিজের রুমে চলে আসলো। সকাল হলে প্রেয়সীর খবর নিবে। এখন ঘুম প্রয়োজন। নিজ বাড়িতে আজ শান্তির মতন একটা ঘুম দিলো ইমন।
বেচারা ইমন জানতে পারলো না এই তার শেষ শান্তির ঘুম।

দাহশয্যা পর্ব ২৭