Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ২৫

দাহশয্যা পর্ব ২৫

দাহশয্যা পর্ব ২৫
Raiha Zubair Ripti

সুলতান ভিলার বসার ঘরের এক কোণে বসে আছে মেহরিন লম্বা, কোমল চুল গুলো মেলে দিয়ে। আফিয়া সুলতান নিজের হাতে মেহরিনের মাথায় নারকেল তেল ঘষে দিচ্ছেন, নরম হাতে, যত্নে।
এমন সময় শোনা গেলো কলিং বেলের আওয়াজ। আফিয়া সুলতান রহিমা কে ডেকে বলল-
-” রহিমা, দরজাটা খুলে দেখ তো।
কাজের মেয়ে রহিমা দ্রুত গিয়ে দরজা খুলে দেয়।
সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করে সেরিন আর সেরিনের স্বামী অনিক। সাথে আরো একজন আছে। মেহরিন বোন কে দেখে দৌড়ে এগিয়ে আসে। সেরিন জড়িয়ে ধরতেই মেহরিন জিজ্ঞেস করে

-” কেমন আছো আপা?
-” আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি৷ তুই?
-” আলহামদুলিল্লাহ আমিও ভালো আছি।
আফিয়া সুলতান এগিয়ে আসলো। হাসি মুখে বলল-
-” আরে অনিক সেরিন যে৷ আসো ভেতরে আসো দাঁড়িয়ে কেনো।
অনিক সেরিন ভেতরে আসলো। মেহরিনের চোখ গেলো বোন আর দুলাভাইয়ের পাশে থাকে একজনের দিকে। মেহরিন ওড়না দিয়ে মুখের একপাশ ঢেকে মাথা নত করে সরে গেলো। অস্বস্তি হচ্ছে তার। অনিক, ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল-

-” দাঁড়িয়ে পড়লি কেনো মেহেদি।
মেহেদি মেহরিনের থেকে নজর সরিয়ে ভাইয়ের সাথে সোফায় গিয়ে বসলো।
আফিয়া সুলতান আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে গেলে সেরিন থামিয়ে দিয়ে বলে-
-” আন্টি ব্যস্ত হবেন না। আমরা এখনই চলে যাব। আপনাদের নিমন্ত্রণ জানাতে এসেছি।
আফিয়া সুলতান মৃদু হেঁসে কৌতূহল হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-” কিসের নিমন্ত্রণ সেরিন?
-” মেহেদির বিয়ে ঠিক হয়েছে আন্টি। ঈদের দু’দিন পর বিয়ে। আপনারা সকলে আসবেন।

মেহরিনের কানে আসলো কথাটা। মেহেদি সেরিনের চাচি শাশুড়ির ছেলে। এক বছর আগে মেহেদির মা সম্বন্ধ নিয়ে এসেছিল মেহরিনের বাবার কাছে মেহরিনের জন্য। মোতালেব ভুঁইয়া মানা করে দিয়েছিল মেহেদি বেকার ছিলো বলে। তার উপর ছেলের পড়াশোনা কম। মাত্র এসএসসি পাশ। বন্ধু বান্ধবের সাথে ঘুড়ে বেড়ায়। পড়ার মোরে আড্ডা দেয়। সব মিলিয়ে মোতালেব ভুঁইয়ার মনে হয়েছে এমন ছেলের কাছে মেয়ের হাত দেওয়া যায় না।
এ নিয়ে সেরিনের চাচি শাশুড়ি বেশ রেগে ছিলেন মেহরিনের বাবার উপর। সেজন্য এখন মেহেদির বিয়ে ঠিক হতেই সেরিন কে দিয়ে নিমন্ত্রণ পাঠালো এ বাড়িতে। এবার মোতালেব ভুঁইয়া আর মেহরিন রা এসে দেখে যাক তার এই বেকার ছেলের কত বড় বাড়ির মেয়ের সাথে বিয়ে হচ্ছে। অথচ সেরিনের চাচি শাশুড়ি বোকা মহিলা বোধহয় জানে না যাকে এসব দেখাতে চাইছে তার স্বামীর সিকি ভাগ ও ঐ বাড়ির নেই।
আফিয়া সুলতান নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলো। যেহেতু এলাকার চেয়ারম্যান আমিরুল সুলতান। তার উপর আত্মীয় এখন তো যাওয়াটা আবশ্যিক।

চা নাস্তা না খেয়েই সেরিন রা চলে গেলো। পুরোটা সময় মেহরিন মাথা নত করেই রেখেছিল। মেহেদি কে দেখলে তার অস্বস্তি হয়। আপা কেনো যে তাকে নিয়ে আসলো। কেমন করে তাকিয়ে ছিলো। সেখান থেকে চলেও যেতে পারছিলো না। মেহরিন ভেবে নিয়েছে বিয়েতে সে যাবে না। মেহেদির মায়ের মুখ ভালো না। মুখে কিছু আঁটকায় না। যা ইচ্ছে হয় বলে দেয়।
কয়েক টা দিন হলো সাফওয়ানের নিজেকে পাগল পাগল লাগছে৷ মাহির কোনো খোঁজই তো পাচ্ছে না সে। এজওয়ান টাও তো দেশের বাহিরে চলে গেছে। তাহলে মাহি কোথায় গেলো? মাহি কি না বলে তাহলে ট্যুরে চলে গেছে? কিন্তু এটাও বা কিভাবে সম্ভব?
নিজের অফিস রুমে বসে হাসফাস করে কথাগুলে ভাবছিলো সাফওয়ান৷ এমন সময় সাফওয়ানের নম্বরে কল আসে তার সহকারী সিদ্দিকের। সাফওয়ান ফোনটা রিসিভ করে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে সিদ্দিক বলে-

-” স্যার মাহি ম্যাডাম বাড়ি ফিরেছেন। উনার অ্যাপার্টমেন্টে আছে।
সাফওয়ান কথাটা শুনেই মাহির বাড়ির পথে রওনা হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো সাফওয়ান কে সিকিউরিটি গার্ড ভেতরে যেতে দিচ্ছিলো না। মাহি ম্যাডামের অর্ডার তার সাথে কেউ দেখা করতে আসলে যেনো তাকে ঢুকতে দেওয়া না হয়।
সাফওয়ান মাহির ল্যান্ডফোনে ফোন করলো কিন্তু মাহি ফোন রিসিভ করলো না। কয়েক বার ট্রাই করার পর রিসিভ হলো। সাফওয়ান অস্থির গলায় বলল-

-” সিকিউরিটি গার্ড কেনো ভেতরে ঢুকতে দিতে চাইছে না আমায় মাহি?
মাহি জাস্ট একটা কথা বলল-
-” চলে যান এখান থেকে।
তারপর কেটে দিলো ফোন। সাফওয়ানের রাগ হলো। পকেট থেকে সিআইডি কার্ড বের করে দেখালো। বলল-
-” এবার অন্তত বাঁধা দিবেন না।
গার্ড ভেতরে ঢুকতে দিতে বাধ্য হলো। সাফওয়ান মাহির রুমের সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দিলো। কলিং বেল বাজালো। কিন্তু মাহি খুললো না। সাফওয়ান দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে বলল-
-” কি হয়েছে কি তোমার মাহি? এমন ব্যবহার করছো কেনো? তোমায় দেখি না আজ কত দিন হলো। দরজাটা খোলো মাহি। প্লিজ লক্ষীটি খোলো না। কোথায় চলে গিয়েছিলে না বলে?
মাহি দরজা খুললো না। সাফওয়ান দরজার বাহিরে এবার বসে পড়লো। অভিমানী গলায় বলল-

-” তুমি দরজা না খুললে আমি কিন্তু এখান থেকে যাব না মাহি। এখানেই থাকবো। এখানেই বসে অপেক্ষা করবো তোমার।
সাফওয়ানের প্রতিটি শব্দ মাহির ভেতরটাকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কোন মুখ নিয়ে সে সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? সাফওয়ানের চোখে চোখ রাখার সাহসটাই তো তার নেই। কি করে বলবে তার সাথে ঘটা কথা গুলো? কি করে বলবে সে এখন বিবাহিত? বিবাহিত? না মাহি এই বিয়ে মানে না। আর মাহি দরজাও খুলবে না । একটা সময় ঠিক চলে যাবে সাফওয়ান।
রাত ১ টার সময় মাহি দরজা খুললো। সামনে তাকিয়ে দেখলো না সাফওয়ান নেই। তপ্ত শ্বাস ফেলে দরজা আটকাতে নিলে দরজার পাশে বসে থাকা সাফওয়ান উঠে দাঁড়িয়ে দরজা আটকাতে বাঁধা দিলো। মাহি চমকে উঠলো। কেমন বিধ্বস্ত লাগছপ সাফওয়ান কে। সাফওয়ানের মুখ মাহির মুখের কাছে। একে ওপরের নিশ্বাস পড়ছে মুখে। সাফওয়ান মাহির গালে হাত রাখলো। মাহি কেপে উঠলো।

-” দেখা করছো না কেনো আমার সাথে? কি হয়েছে কি তোমার মাহি?
মাহি নিজেকে শক্ত করলো। গাল থেকে সাফওয়ানের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল-
-” আপনি এখনও এখানে কেনো? আমি না চলে যেতে বলেছি?
-” তুমি যেতে বললেই আমি চলে যাব? কোথায় গিয়েছিলে চলে?
-” জাহান্নামে, আপনার কোনো সমস্যা?
-” রেগে যাচ্ছ কেনো? একটু জানিয়ে যেতে। দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো ভীষণ।
মাহির কান্না পেয়ে গেলো সাফওয়ানের এমন শান্ত নরম কথা শুনে। কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না।
-” আপনি বাসায় যান এখন।
-” থাকি না এখানে?
-” না। আপনি বাসায় যান। সকালে কথা বলছি।
-” কোথায় মিট করবো?
-” ধানমন্ডির লেকে আসবেন দুপুর তিনটায়।
-” আচ্ছা। আমি অপেক্ষায় থাকবো।
-” হুমম এখন আসুন।
মাহি সাফওয়ানের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো। সাফওয়ান কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে রইলো দরজার পানে। কেমন যেনো এই মাহিকে অচেনা লাগলো তার। কি হয়েছে মাহির? এমন অস্বাভাবিক আচারণ কেনো করছে? সাফওয়ানের যে খারাপ লাগছে এমন মাহিকে দেখে। একটুও বললো না আজ, বাসায় ফিরে জানাবেন। এই কয়েকদিনের মাঝে এত পরিবর্তন!
গুলশানের ক্লাবে বসে এজওয়ান স্কচ খাচ্ছে। পাশেই বসা বাহাদুর। বাহাদুরের মাথায় ঢুকছে না। এজওয়ান এত কাহিনী করে মাহি কে বিয়ে করে ছেড়ে দিলো কেনো?

-” মেয়েটাকে ছেড়ে দিলি কেনো?
-” ডিভোর্স দিয়েছি?
-” না। কিন্তু যেতে দিলি যে তখন?
-” তাহলে কি করবো? আমার বউ কে বেঁধে রেখে দিব?
-” বিয়ে করলি কেনো?
-” বউ দরকার সেজন্য।
-” মাহি যদি পালিয়ে যায় তখন?
-” ডোন্ট কল হার মাহি। সম্মানের সহিত ভাবি বল। আর মাহি পালাবে না। পালানোর মেয়ে মাহি নয় সুলতান নিবাসে ঠিক চলে আসবে।
-” বুঝতেছি না তোর কাহিনী।
-” তোরে বুঝতে বলছি আমি? বউ আমার মাথা ব্যথাটা আমাকেই করতে দে৷ তোর করার তো দরকার নেই। এখন আমাকে শান্তি মতন গিলতে দে।

-” একটা স্কচ ঢাল।
কথাটা বলেই এক চেংরা ছেলে এসে এজওয়ানের সামনের চেয়ারে বসলো। এজওয়ান বাহাদুরের থেকে চোখ সরিয়ে ঠান্ডা চোখে তাকালো ছেলেটার পানে। ছেলেটা ফের বিরক্ত হয়ে বলল-
-” কি হলো কথা কানে যায় না? স্কচ টা ঢাল।
বাহাদুর তেড়ে যেতে নিলে এজওয়ান থামিয়ে দেয়। হাতে থাকা স্কচের বোতল টা টেবিলের নিচে এনে প্যান্টের চেইন খুলে অর্ধেক থাকা বোতল টা ফুল করে। তারপর প্যান্টের চেইন লাগিয়ে বোতল টা টেবিলের উপর নিয়ে সেটা ঐ ছেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে-
-” টেক ইট।
ছেলেটা নিলো। স্কচের বোতল মুখের সাথে লাগিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে মুখ মুছে বলল-
-” আজকের স্কচ টা এত গরম লাগলো কেনো!
এজওয়ান সাথে সাথে কিছু বললো না। মুচকি হেঁসে বসা থেকে উঠে বলল-
-” আজকের স্কচ টা আমার হাঙ্গা উপলক্ষে ভীষণ স্পেশাল করে বানানো হয়েছে সেজন্য গরম লেগেছে। টেস্ট টা ভালো ছিলো না?
ছেলেটা আরেক ঢক গিলে বলল-

-” হ্যাঁ ভালো ছিলো।
-” আরো চাই?
-” আর এক বোতল হলে মন্দ হয় না।
এজওয়ান অন্য আরেকটা বোতল বাহাদুরের কাছে দিয়ে বলল-
-” স্পেশাল করে বানিয়ে দে তো।
বাহাদুর দাঁত কেলিয়ে প্যান্টের কাছে নিয়ে স্পেশাল করে দিলো স্কচ টা।
এজওয়ান ট্যিসু দিয়ে বোতল টা ধরে ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল-
-” এনজয় ইউর টাইম উইথ স্কচ।
ছেলেটা স্কচের বোতলের গায়ে চুমু দিয়ে বলল-
-” ধন্যবাদ ভাই।
বাহাদুর পারছে না এখানে হেঁসে ব’মি করে ভাসিয়ে দিতে। ছি ছি কি কান্ডই না তারা করে বসলো। এও নাকি আবার টেস্ট লাগছে ছ্যা!

মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেদনার বিষয়গুলোর একটি হলো আমরা যাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, যাদের খুব করে চাই, যাদের জন্য অন্তরের গভীরে প্রার্থনা করি, একটা সময়ে এসে তাদেরই আমরা আর পাই না। এ যেন জীবনের এক নির্মম ব্যাকরণ, এক ধ্রুব সত্য যেটা যতবার অস্বীকার করতে চাই, ততবারই বাস্তবতা এসে প্রমাণ করে দেয় যে এটাই নিয়তির খেলা।
এই সত্যটা আমরা সবাই কমবেশি অনুভব করি। জীবনের বাঁকে বাঁকে দেখা মেলে চাওয়ার আর না-পাওয়ার এক বিষাদময় দূরত্বের।

যাকে হৃদয়ের গহীন থেকে চাওয়া যায়, তাকে হারিয়ে ফেললে বাঁচাটা একটা অভিশাপের মতো লাগে। প্রতিটা সকাল তখন নিষ্প্রাণ, প্রতিটা রাত অসহ্য দীর্ঘ। আশেপাশের সব কিছু চলতে থাকে, শুধু থমকে যায় নিজের ভেতরের সময়। বুকের ভেতর যেন প্রতিনিয়ত কেউ একটা শূন্যতা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। হাসলেও চোখ ভিজে থাকে, কথা বললেও কণ্ঠে জড়ানো বিষণ্ণতা। চারপাশে যত আলোই থাকুক, তার না থাকা যেন এক স্থায়ী অন্ধকার। আচ্ছা জীবনটা এত নিষ্ঠুর কেন? যাকে এত ভালোবাসি তাকেই কেন হারিয়ে ফেলি আমরা?
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে তাকিয়ে থাকে প্রেমা। চোখে একরাশ হতাশা, মুখে বিষণ্নতা। আয়নার ফ্রেমে ভেসে ওঠে শত শত কল্পনা, জল্পনা, না-পাওয়ার হাহাকার। বাঁকা চোখে একবার তাকায় দেয়ালের ক্যালেন্ডারটার দিকে।২৮ জুলাই, মঙ্গলবার। প্রেমার জন্মদিন। ২৯তম জন্মদিন।
প্রেমা দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ছাড়ে। নিঃশ্বাসে যেন জমে থাকা জীবনের শত যন্ত্রণা। কালো বোরখাটা তুলে পরে নেয় ধীরে ধীরে। আজ বাড়িতে কেউ নেই, না শেখর, না মহসিন আলী, আর না ছোট দেবরটা। এই সুযোগ বাড়ি থেকে বের হওয়ার। প্রেমা একশো টাকার একটা নোট নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

ধানমন্ডি ২ থেকে প্রেমা আজিমপুর আসে। এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে পড়েছে। ঢাকার পুরনো এই আজিমপুর কবরস্থানের বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে প্রেমা ধীর পায়ে প্রবেশ করে। চারপাশ জুড়ে অসংখ্য কবর। কারও পাশে প্লাস্টিক ফুল, কোথাও শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ, কোথাও মাটিতে ঠেকানো নামহীন ফলক।
প্রেমা হাঁটতে হাঁটতে ভেতরের দিকের এক কবরস্থানের পাশে এসে দাঁড়ায়। বছরে এই একটা দিনই আসা হয় প্রেমার এখানে। এই দুনিয়ায় প্রেমা এতিম। কেউ নেই তার । বাপ থাকতেও বাপ নেই। আর মা সে আজ অনেক বছর হলো তার কাছে নেই। একটুও কি প্রেমার কথা ভাবলো না তার মা? এভাবে একা এই শকুন দের মাঝে ফেলে রেখে স্বার্থপরের মতন চলে গেল! প্রেমাকেও সাথে নিয়ে যেত। এই জীবন যে তার আর ভালো লাগে না। প্রেমা নরম হাত রাখে কবরের মাটিতে।

কবরের সামনে মায়ের নাম খোদাই করা পাথরটার ওপর ধুলা জমেছে। প্রেমা নিজের ওড়না দিয়ে ধুলোগুলো মুছে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে কবরের পাশে।
হঠাৎই তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে অঝোর ধারায় অশ্রু। বুকের ভেতরের জমে থাকা কষ্ট গলে গলে মাটিতে মিশে যায়। প্রেমা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে-
-“কেমন আছো মা? দেরি করে এলাম বলে মন খারাপ করোনি তো? লুকিয়ে আসতে হয়েছে বলে একটু দেরি হলো। কিন্তু এসেছি মা, এসেছি। এই একটা দিনই তো তোমার সাথে আমার দেখা হয় বলো মা। তারপরও দেরি হয়ে গেলো। আজ ২৯ এ পা রাখলাম মা। জানো মা, আমি না ভালো নেই। আমার শরীর ভরা দুঃখ আর দুঃখ। কি অসহ্য সেই দুঃখ! আচ্ছা মা আল্লাহ কি পৃথিবীর সব দুঃখ আমাকেই দিয়ে দিয়েছে? সবার দুঃখ ফুড়ায় কিন্তু আমার দুঃখ তো ফুরায় না মা।

তোমাকে আমি রোজ ডাকি মা। কিন্তু তুমি তো আসো না আমার ডাকে। আমি ডাকতে ডাকতে হাঁপিয়ে যাই৷ আকাশের দিকে তাকাই এই ভেবে যে তুমি আসবে,আমায় জড়িয়ে ধরে বলবে – কাঁদিস না আমি আছি তো। জানো কেউ না আমার মাথায় হাত বুলিয়ে একটু কথা বলে না মা। কেউ যদি একটু মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো আমি আছি তো প্রেমা। আমি সেদিন সুখের লোভে একটু কাঁদতাম মা। আচ্ছা মা আমার এই অসহ্য কষ্ট কি তুমি দেখতে পাচ্ছো না? তুমি খোদা কে বলো না আমায় নিয়ে নিতে তোমার কাছে। অনেক বছরই তো বাঁচলাম এই পৃথিবীতে। এই পৃথিবী আমায় দুঃখ ছাড়া আর কিছুই দেয় নি মা।
প্রেমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে উঠলো-

-” আচ্ছা মা আমার চাওয়া সব জিনিস গুলোই কেনো অবৈধ, নিষিদ্ধ, দামী নয়তো অন্য কারো হয়? সেগুলো আমার কেনো হয় না বলো মা৷ আমি তো খুব করে বাঁচতে চেয়েছিলাম পৃথিবীতে। একটা সুন্দর জীবন কল্পনা করেছিলাম। আমার বিয়ে হবে, একটা সুন্দর সংসার হবে। কিন্তু আমার সাথে এটা কি হলো মা? জানো মা আমার সোলেমান না বিয়ে করেছে। কথাটা শুনে কি যে কষ্ট হলো বুকে সেদিন, দম বন্ধ হবার মতন অনুভূতি। মা আমি কি এতই দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্মেছি? এত দুঃখ কি আমি ডিজার্ভ করি? একটু সুখ কি আমার ভাগ্যে নেই? ইশ যদি সেদিন একটু স্বার্থপর হতে পারতাম৷ তুমি তো আমার কথা ভাবো নি। সেদিনও যদি তোমার কথা না ভেবে নিজেকে নিয়ে ভাবতাম তাহলে বোধহয় সুখ জিনিসটা আমার ভাগ্যে থাকতো। কিন্তু পারি নি স্বার্থপর হতে। সেজন্যই সুখ নেই আমার কপালে। জানো আমি অপেক্ষায় আছি তোমার কাছে চলে যাওয়ার। সেই দিনটা যেন খুব শীগ্রই আসে মা। সেদিন আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো মা? তোমার কোলে মাথা রেখে কাঁদবো।
প্রেমার কথাটা শেষ হতেই শুনতে পেলো মাগরিবের আজান। আর থাকা যাবে না। বাড়ি ফিরতে হবে। প্রেমা চোখ মুখ মুছে কবরের দিকে তাকিয়ে বলল-

-” আজ আসি তাহলে মা। আবার আসবো। বাসায় এসে আমায় না পেলে জানোই তো কি হয় আমার সাথে। আসি ভালো থেকো।
প্রেমা চলে আসলো কান্না চেপে।
সুলতান নিবাসের নিজের কক্ষের বেলকনিতে বসে সোলেমান গাইছে গলা ছেড়ে –
-” আমার জনম গেলো ভুলে ভুলে
কইরা পিরিতি
প্রেমের হাটে মন হারাইলাম
না জেনে ক্ষতি…
ইব্রাহিম সোলেমানের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলো গান শুনে। দেখলো সোলেমান বেলকনি তে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছে।
হাতে তার বেশ কিছু পুরনো ছবি। আর জ্বলন্ত সিগারেট। পাশেই রাখা মদের বোতল। ইব্রাহিমের মনে পড়লো আজ তো ২৮ তারিখ। প্রেমার জন্মদিন। ইব্রাহিম ভাবলো- সোলেমান কি এখনও প্রেমাকে ভালোবাসে তাহলে?
ইব্রাহিমের ভাবনার মাঝেই সোলেমান সিগারেট মুখে নিয়ে এক টান দিয়ে ধোয়া উড়িয়ে দিতে দিতে বলল-
-” কিরে এসেছিস তুই?
ইব্রাহিম চেয়ারে বসে বলল-

-” হুমমম।
ইব্রাহিমের চোখ গেলো সোলোমনের হাতে। প্রেমার আর সোলেমানের পুরোনো ছবি।
-” তুই কি এখনও ভালোবাসিস প্রেমা কে সোলেমান?
সোলেমান কথাটা শুনেই হো হো করে হেঁসে দেয়। হাতে থাকা প্রেমার ছবিটা লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে বলল-
-” ভালোবাসা! ওর প্রতি আমার ভালোবাসা সেদিনই মরে গেছে৷ এখন যা আছে তা হলো ঘৃণা।
-” ছবি গুলো পুড়িয়ে ফেলছিস!
সোলেমান বাকি ছবি গুলোতে আ’গুন ধরিয়ে দিয়ে বলল-

-” অতীতের ছাপ জীবনে রাখা ঠিক না। বউ দেখলে মাইন্ড করবে।
-” এতদিন পর!
-” হুমমম,এখন তো বিবাহিত সেজন্য।
-” বউকে ঢাকায় নিয়ে আসবি নাকি?
-” আনতেও পারি বলা যায় না।
-” সব ছবি পুড়িয়ে ফেলেছিস?
সোলেমান কিছু বললো না।বসা থেকে উঠে মদের বোতলে চুমুক দিয়ে বলল-

দাহশয্যা পর্ব ২৪

-” পরশু আমরা মহাদেবপুর যাচ্ছি। তুইও যাবি। একাএকা এখানে থেকে কি করবি?
-” সে না হয় গেলাম। শ্বশুর বাড়ির জন্য বউয়ের জন্য কিছু কিনবি না?
-” হুমম কিনবো তো। কাল যাব শপিংয়ে। তোর ঐ ড্রাইভার কে ছুটি দিস নি?
-” কাল দিব।

দাহশয্যা পর্ব ২৬