Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ২৪

দাহশয্যা পর্ব ২৪

দাহশয্যা পর্ব ২৪
Raiha Zubair Ripti

সুলতান নিবাসের লাইব্রেরি কক্ষে বসে আছে সোলেমান ও বাশার সুলতান।
ঘরের বাতাসে বইয়ের গন্ধ আর কফির হালকা গন্ধ মিশে আছে। বাতিল করা কোনো পুরোনো ইতিহাসের পাতার মতন নীরব এই ঘরটিতে আচমকা বাশার সুলতান বললেন-
-“এজওয়ান অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে।
শব্দটা শুনেই সোলেমান কফির মগে ধীরে চুমুক দিল। সামান্য হাসি খেলে গেল ঠোঁটের কোণে। বাশার সুলতান তখন ইতস্তত করে একটা পুরোনো মলাটের বই তুলে নিয়ে চোখ বুলাতে লাগলেন।
সোলেমান কফির মগটা টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসল। চোখে নিঃশব্দ সন্দেহের ছায়া।

-” এজওয়ান একটু বেশিই লাফাচ্ছে না চাচা?
বাশার সুলতান ধীরে বই থেকে চোখ তুলে তাকালেন। দৃষ্টি কঠিন, ঠাণ্ডা।
-” আবার কি করেছে?
-” সে যে অস্ট্রেলিয়া যায়নি, সেই খবর আমার কান পর্যন্ত এসেছে। কোথায় গেছে সে? তুমি জানো, তাই না চাচা?
বাশার সুলতান গলা কাঁপিয়ে বললেন-
-” আ… আমি ক…কি করে জানবো কোথায় গেছে? বলল তো অস্ট্রেলিয়াতেই যাচ্ছে।
সোলেমানের কণ্ঠ এবার কঠিন হয়ে উঠল,
-” তাহলে নিবাসের বাইরে সিআইডি’র লোক কেন বসানো হয়েছে নজরদারিতে? কী করেছে এজওয়ান?
-” কিছুই করেনি সে। তুই চাইলে ফোন করে নিজেই জিজ্ঞেস কর। আমাকে কেন জেরা করছিস?
-” ওর ফোন সুইচ অফ কেন চাচা?
-” জানি না।
সোলেমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল-

-” আমি যদি পরে জানতে পারি, যে তোমার ছেলে কিছু ঘটিয়েছে আর তুমি সব জানতে, তাহলে কিন্তু আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না বলে রাখছি।
সোলেমান ধীরে কফির মগটা হাতে তুলে নিল। আর একবারও চাচার দিকে না তাকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
পকেট থেকে ফোনটা বের করে দ্রুত ডায়াল করল ইয়াসিনের নাম্বারে।
-” পাঠিয়েছিস মহাদেবপুর?
ওপাশ থেকে ইয়াসিন বলল-
-” হ ভাই, পাঠাইছি।
-” গুড।
কল কেটে দিয়ে নিজের রুমে ফিরে এলো সোলেমান। আজ আর কিছু ভাববে না, এখন একটা লম্বা ঘুম দেবে।
পুরনো এক পরিত্যক্ত গোডাউন। ছাদ চুঁইয়ে পড়ছে পানি, দেয়ালে ছোপ ছোপ ছাঁচ, বাতাসে ধুলো আর দুঃস্বপ্নের গন্ধ। মাঝখানে একটা কাঠের মোটা টেবিল, তার দুই পাশে মাহি আর এজওয়ান।
দু’জনের সামনে রাখা খাবারের প্যাকেট এখনো ছোঁয়া হয়নি। এজওয়ানের দৃষ্টি মাহির দিকে স্থির।
মাহি সেই দৃষ্টি টের পেয়ে গর্জে উঠল। রেগে বলল-

-” লুইচ্চা! কিরে, গিলে ফেলবি নাকি? তাকিয়ে আছিস কেন?
এজওয়ান ঠান্ডা, ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি। সে ধীরে মাহির কাছে এগিয়ে এসে, মুখটা তার একদম কাছে এনে, ঠাণ্ডা সুরে বলে-
-” তুই জানিস না, তুই কতোটা সুন্দর। তুই জানিস না, তোকে দেখলে আমার ভিতর টা কেমন যেন করে। নেশা চড়ে যায়। ইউ আর সো বিউটিফুল, সুইটহার্ট…
মাহির মুখ পুড়ে যাওয়ার মতো তাপে গরম হয়ে ওঠে। সে চিৎকার করে ওঠে-
-” একটা থা’প্পড় মেরে বিউটিফুল বলা বের করবো বলে রাখলাম।
এজওয়ান তখনও হাসছে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল-
-” আগে বিয়ে হোক। তারপর যা ইচ্ছা করিস। তখন তো আমি তোর স্বামী। সবই বৈধ হবে, তাই না?
-” আবার বিয়ের কথা! আমি একবার ছাড়া পেলে তোর জীবনটা একদম হারাম করে দিবো ট্রাস্ট মি।
-” আমার জীবন হালাল-ই বা ছিল কবে? আমার মতো মানুষের জীবনে সবকিছুই হারাম। আর তোর মতো মেয়েরা আমার গুনাহর পুরস্কার।

-” ভালোয় ভালোয় বলছি, ছেড়ে দে আমাকে। নয়তো যা হবে, সেটা তোর দুঃস্বপ্নেও আসবে না।
-” আর আমি বলছি,রাজি হয়ে যা। চুপচাপ কবুল বল, নয়তো আজ তোর দুনিয়াটা একেবারে উল্টে দিব।
– কি করবি তুই?
-” কিছু না। খাবারটা কি খাইয়ে দিব?
-” তোর হাতে খাওয়ার চেয়ে বিষ খেয়ে ম’রে যাওয়া অনেক ভালো।
-” না সোনা, মরে গেলে চলবে না। তোরে বেঁচে থাকতে হবে আমার বউ হয়ে।
-” জীবনেও না। মরে গেলেও না।
-” ওকে। তাহলে জোর করেই কবুল বলাবো। বাহাদুর, কাজি আন। এখনই এই মেয়েটাকে আমার স্ত্রী বানাবো। ভালো মতন বুঝিয়েছি,বুঝে নি।
বাহাদুর বাইরে গিয়ে একসময় ফিরল, সঙ্গে এক বৃদ্ধ কাজি। কাঁপা কাঁপা হাতে টুপি ঠিক করতে করতে ভিতরে এলেন। গোডাউনের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠলো। কাজি মাহির দিকে একবার তাকালো। মেয়েটার হাত পা বাঁধা। এ আবার কেমন বিয়ে? এজওয়ান হুকুম দিল।

-” বিয়ে পড়ানো শুরু কর কাজি।
কাজি জড়ানো গলায় বলল-
-” কিন্তু মেয়েটার তো হাত পা বাঁধা। এভাবে কি বিয়ে…
এজওয়ানের চোখ ধূসর মেঘের মতো গাঢ় হয়ে উঠলো। সে পকেট থেকে ঠাণ্ডা মাথায় বন্দুক বের করে কাজির দিকে তাক করে বলল-
-” তুই শরিয়া আইন শিখাতে আসছিস নাকি? যা বলছি, তাই কর।
কাজির ঠোঁট শুকিয়ে গেল। সে মাহির দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই মাহি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে-
-” এই বৃদ্ধটারে সরা আমার সামনে থেকে! আমি কবুল বলবো না! কোনো বিয়ে হবে না।
-” মেয়ে তো রাজি না,বিয়ে করবে না বলছে। কাজির কণ্ঠ আরও দুর্বল।
এজওয়ান থেমে যায় না।
-” মাহি, শেষবার বলছি কবুল বলে দে।
-” তোকে বিয়ে করতে বলছিস? তোকে? আমি তোর মতো নোংরা মানুষের ছায়াও মাড়াবো না। বিয়ে করতে হলে সাফওয়ানকেই করবো।
সাফওয়ানের নাম শুনে যেন এজওয়ানের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। সে মুহূর্তেই মাহির গাল চেপে ধরে, চোখে ভয়াবহ দৃষ্টি নিয়ে গর্জে উঠলো-

-” একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ। আমি তোর জীবনের হিরো নই। আমি তোর জীবনের ভিলেন। আর ভিলেনরা কখনো হাতজোড় করে ভালোবাসে না, কান্না করে ভালোবাসার মানুষকেও নিজের করে নেয় না। ভিলেনরা ছিনিয়ে নেয়, হৃদয় ভেদ করে, আত্মা চুরমার করে, ভাঙা হৃদয়ের রক্ত ঝরিয়েও, চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও, মুখে না শোনার পরও তারা জোর করে লিখে নেয় নিজেদের নাম, কপালের ঠিক মাঝখানে। ভিলেনরা অপেক্ষা করে না, ভিলেনরা হাত চায় না, তারা হাত ধরে টেনে নেয়। ভিলেনরা ভালোবাসে না কারো ইচ্ছেমতো,তারা ভালোবাসে নিজেদের শর্তে। আর আমি? আমি ঠিক সেইরকমই।
তোর না, কে হ্যাঁ বানানোর সব মন্ত্র জানি,তোর পিছু আমি ছাড়বো না। আমি ছিনিয়ে নেবো তোকে, চোখের সামনে থেকে, নিয়তির বুক চিরে। আর রইলো সাফওয়ান, ওর সাথে তোর মিল এই জনমে অন্তত হবে না। তাই বলছি কবুল টা বলে দে। আমাকে হিংস্র করে তুলিস না। তাহলে এমন সব কাজ করে বসবো তাতে তোরই সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে।

-” তুই হুমকি দিচ্ছিস?
-” না মাহি, সাবধান করছি। কবুল বল, নইলে তোর জীবনে এমন কিছু ঘটবে আজ, যেটা তুই কল্পনাও করতে পারবি না।
-” বলবো না। যা পারিস কর।
-” ওকে। বাহাদুর, ওকে নিয়ে আয়।
-” কাকে? মাহির কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।
এরপর সে যা দেখল, তা দেখে শরীর জমে গেল। বাহাদুর কোলে করে আনল একটা ছোট শিশু। কাছে আসতেই স্পষ্ট হলো, ওটা… মায়া!
-” মায়া! তুই… তুই মায়াকে এখানে আনলি কেনো?
-” তোকে বাগে আনতে।
-” জানোয়ার! ওকে ওর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দে! ও শিশু, একটা দুধের শিশু, কাঁদছে ও।
-” তুই রাজি হলেই দিব। না হলে…
-” না হলে কি করবি?
-” কি করবো?… বেশি কিছু করবো
না তো। প্রথমে মায়ার ছোট্ট দেহটাকে টগবগে গরম পানিতে ফেলে দিব। তেমন বেশি কিছু হবে না মায়ার জাস্ট ঝলসে ম’রে যাবে। তারপর..

-” তারপর কি?
-” তারপর তোর হাড্ডি গুড্ডি ভাঙমু
তরিকুলের বেটি তাড়াতাড়ি কবুল বল বলছি মাথা
না খেয়ে।
-” বলবো না।
-” বাহাদুর বাচ্চাটারে ঐ টগবগে গরম পানির ভেতর ফেলে দিয়ে আয়। শুনছি অনেক সাধনার পর বাচ্চার মুখ দেখছে শাকিল আর ওর বউ। এখন এই বাচ্চাকে হারালে তার জন্য দায় থাকবে মাহি।
বাহাদুর মেয়েটাকে কোলে নিয়ে ফুটন্ত পানির কুয়ার পাশে এগিয়ে যায়।
মাহির বুকটা কেঁপে উঠে । নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। চোখের সামনে ফুটফুটে ছোট্ট মুখটা মায়া। সেই একফালি হাসির শিশু, এখন কাঁদছে। কাঁদছে বুকফাটা আর্তিতে।

মাহির কণ্ঠ শুকিয়ে আসে। গলা দিয়ে যেন কোনো শব্দই বের হতে চায় না। শরীর কাঁপে। মাথা ঝিমঝিম করে। মায়া কে কী করে আনলো? মনে মনে ঘুরতে থাকে অসংখ্য প্রশ্ন, কিন্তু জবাব একটাই- এজওয়ান সব পারে। হৃদয় নেই তার, মায়াকে মে-রে ফেলতে তার হাত কাঁপবে না। মায়া তার কাছে কিছু না, কেবল একটা অস্ত্র মাত্র মাহিকে বিয়ে করার। মাহি কি করবে? সে তো ভালোবাসে সাফওয়ান কে। এই লোক কে বিয়ে অসম্ভব। কিন্তু মায়া! মায়া কে ছাড়া তার বোন বাঁচতে পারবে না। অনেক সাধনার মায়া তাদের।
বাহাদুর কুয়ার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। তার হাত ধরতে যাচ্ছে গরম পানির ওপরে।
মাহি কেঁপে ওঠে সেটা দেখে। আকস্মিক কণ্ঠ ফেটে চিৎকার করে বলে উঠে-

-” আ… আমি রাজি। আমি রাজি । মায়ার কিছু করিস না।
এজওয়ান স্থির চোখে তাকিয়ে বলে-
-” সত্যি বলছিস?
মাহির চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ঠোঁট কাপছে। ঘৃণা বুকটা টনটন করছে।
-” হ্যাঁ… ওকে ফেরত দিয়ে আয় ওর মায়ের কাছে। ওর কোনো দোষ নেই…
-” আগে কবুল বল। তারপর। কাজি, পড়ানো শুরু কর বিয়ে।
কাজি কাঁপা কণ্ঠে বলে-
-” মোহরানা… কত বাঁধা হবে?
এজওয়ান মাথা উঁচু করে বলল-
-” সুলতান বাড়ির বউয়েরা যা চায়, তাই বাঁধা হয়। মাহি যা চাইবে তাই বাঁধবি।
কাজি মাহির দিকে তাকিয়ে বলল-
-” আপনি কত টাকা চান মোহরানায়?
মাহি জ্বলন্ত চাহনি নিয়ে এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” আমি যা চাইবো তাই দিবি?
-” দিবো। কথা দিলাম।
-” তোর মৃত্যু। তোর একটা জঘন্য মৃত্যু চাই আমি। আমার হাতে।
এজওয়ান হেসে ওঠে। সেই ঠান্ডা, হাড় কাঁপানো হাসি।
-” তাই সই। কাজি, লিখে দে মোহরানা হিসেবে আমার মৃত্যু।
কাজি থতমত খেয়ে গেল।
-” মোহরানায় টাকা, সম্পদ… এসবই বৈধ হয় । মৃত্যু তো…
এজওয়ান হাত উঁচা করে কাজিকে থামিয়ে দিয়ে বলল-

-” তোকে যা বলছি, সেটাই লিখ।
-” আপনি বুঝতে পারছেন না। মৃত্যু এটা কি করে মেহরানা হতে পারে? এটা কিভাবে পরিশোধ করবেন?
-” আমার মৃত্যু দিয়েই। তুই চুপচাপ বিয়ে পড়ানো শুরু কর। আমার মৃত্যু আমি মাহিকে মোহরানা হিসেবে উৎসর্গ করলাম। সেটা পূরণ করে দিয়েই যাব। তার সাথে লিখ ৫ টাকা। আপাতত পকেটে ৫ টাকারই নোট আছে একটা।
কাজি মনে মনে এজওয়ান কে পাগল ছাগল বলে গালি দিলো। কথা না শুনলে আবার তাকেও মে’রে ফেলতে পারে। নিজের জীবন কে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার কোনো মানেই হয় না। কাজি মোহরানা হিসাবে এজওয়ানের মৃত্যু আর ৫ টাকা লিখে মাহিকে কে কবুল বলতে বলল।
মাহি চুপ। স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। তার সামনে চিৎকার করছে মায়া। একটা একটা কান্না যেন গলার ভেতর ছুরি চালিয়ে দিচ্ছে।
মাহির চোখ আটকে আছে মায়ার চোখে। বুক ফেটে কান্না আসছে, কিন্তু সে কাঁদে না। ঠোঁট কামড়ে ধরে বসে আছে।
এজওয়ান হঠাৎ এগিয়ে আসে, চোখ লাল।

-” কি রে? কবুল বলছিস না কেন? বল! এখনই বল! না হলে আমি ছুঁড়ে ফেলে দেব বাচ্চাটাকে বলে রাখলাম।
এজওয়ান হাত বাড়ায়। মায়ার দিকে এগিয়ে যায়…মাহির সমস্ত জেদ, ঘৃণা, আত্মসম্মান সেই মুহূর্তে অসহায়ভাবে ভেঙে পড়ে।
মাহি চিৎকার করে বলে ওঠে-
– “শুয়োরের বাচ্চা! কুত্তার বাচ্চা! কবুল! কবুল! কবুল!
তার কণ্ঠে কান্না, রাগ, ঘেন্না, আর অসীম অসহায়ত্ব। এজওয়ান দাঁড়িয়ে থাকে, ঠোঁট বাঁকানো সেই নিকৃষ্ট বিজয়ের হাসি নিয়ে। তারপর এগিয়ে এসে নিজেও কবুল বলে। বিয়ে পড়ানো শেষ করে বাহাদুর কে বলে কাজিকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে দিয়ে দিতে। বাহাদুর মায়াকে এজওয়ানের কোলে দিয়ে কাজি কে নিয়ে চলে গেলো। মাহি মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে৷ বয়স তার কত হবে ২০ দিনও হয় নি। এই দুধের বাচ্চা কে নিয়ে মাহিকে হারিয়ে দিলো!
এজওয়ান মাহির হাত পায়ের বাঁধন খুলে মায়াকে মাহির কোলে দিলো। মাহির চোখ দিয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু গড়ালো। অনেক গুলো বছর পর আজ মাহির চোখে জল আসলো। এজওয়ান মাহির চোখের জল মুছে দিতে চাইলে মাহি হাত দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলল-

-” আমাকে একা থাকতে দেওয়া হোক।
এজওয়ান কিছুক্ষণ মাহির দিকে তাকিয়ে চলে গেলো।
মাহি মায়াকে জড়িয়ে ধরে এবার ডুকরে কেঁদে দিলো। সাফওয়ান কে কি জবাব দিবে সে? বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে নিলো! মাহির নিজেকে সবচেয়ে জঘন্য ব্যক্তি মনে হচ্ছে। কথা দিয়ে কথা রাখে নি সে। মায়াকে বাঁচাতে করতেই হলো এটা। তবে এজওয়ান কে সে ছাড়বে না। নিজেকে সে প্রতিজ্ঞা করলো সবচেয়ে জঘন্যতম নিকৃষ্ট এক মৃত্যু সে এজওয়ান কে দিবে। মাহি বিরবির করে বলে উঠলো-
-” আমাকে ক্ষমা করে দিও সাফওয়ান।
সন্ধ্যার পরপরই সুলতান ভিলায় একটা পার্সেল এসেছিল। পার্সেল টা এসেছিল মেহরিনের নামে। রুমাইসা পার্সেল টা নিয়ে মেহরিনের রুমে এসে দেখলো মেহরিন তখন পড়ার টেবিলে বসে ছিলো। রুমাইসা পার্সেল টা বিছানার উপর রেখে বলল-

-” ভাবি তোমার পার্সেল আসছে।
মেহরিন অবাক হলো।
-” কিসের পার্সেল আপু?
-” জানি না। খুলে দেখো। আমি আসছি
রুমাইসা চলে গেলো। মেহরিন পার্সেল টা খুলতে শুরু করলো। খোলা শেষ হতেই মেহরিন দেখতে পেলো একটা ফ্রেম জাতীয় কিছু। মেহরিন ফ্রেম টা সোজা করতেই মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠলো একজনের ছবি। মেহরিনের বুক ধরফর করতে লাগলো। মুখে ফুটলো হাসি।
নিচ থেকে শাশুড়ির ডাক আসায় ছবিটা বিছানার উপর রেখেই নিচে নেমে গেলো।
এখন বাজে রাত দশটা,চারপাশে নিস্তব্ধতা। দূরে গাছপালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় জোছনায় ভেসে যাওয়া গ্রামের রাস্তা। আকাশে জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য তারা, মাঝখানে পূর্ণিমার চাঁদ, সব যেন এক অপার্থিব আলোয় ঢেকে দিয়েছে পৃথিবীকে।

বেলকনির এক কোণে বসে আছে মেহরিন। পড়নে তার সাদা জর্জেট সেলোয়ার কামিজ, মাথায় হালকা করে ওড়না। লম্বা চুল পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে। মেহরিন দু পা এক পাশে দিয়ে, দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে বেলকনির ফ্লোরে। সামনে গ্রিলের ওপারে খোলা আকাশ আর কোলে আঁকড়ে ধরে রাখা দুপুরে আসা সেই ছবির ফ্রেম টা।
মেহরিন অপলক তাকিয়ে আছে ছবিটার দিকে,মুগ্ধ, আবেগে ভেজা চোখে। তখন ঠিক মতন স্থির হয়ে দেখতে পারে নি ছবিটা। তাই এখন দেখছে নয়ন ভরে। চোখের কোণে জমে থাকা জল,চোখ জুড়ে মুগ্ধতা, হৃদয়ের প্রশান্তি গুলো বলে দিচ্ছে মেহরিন এই মানুষ টাকে ঠিক কতটা ভালোবাসে। মানুষ টার পড়নে মেহরিনের মতই সাদা রঙের পোশাক। তিনিও কি সাদা পছন্দ করেন মেহরিনের মতন? মানুষটার শরীরে সাদা পাঞ্জাবি,এক হাত গালে, অন্য হাত টেবিলের ওপর রাখা। ইশ কি সুন্দর লাগছে লোকটাকে। মেহরিন ছবিটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো। কিয়ৎক্ষন এভাবে থাকার পর ছবিটা সামনে এনে গাঢ় এক চুম্বন একে দিয়ে অশ্রু ভেজা নয়নে ছবিটার উপর আলতো করে হাত বুলালো। তারপর নরম গলায় গেয়ে উঠলো-

দাহশয্যা পর্ব ২৩

Tum hi ho, tum hi ho
zindagi ab tum hi ho
Chain bhi, mera dard bhi
Meri aashiqui ab tum hi ho….

দাহশয্যা পর্ব ২৫