Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ২৩

দাহশয্যা পর্ব ২৩

দাহশয্যা পর্ব ২৩
Raiha Zubair Ripti

সন্ধ্যা নামার আগেই সোলেমান বের হয়েছিল ঢাকার সুলতান নিবাস থেকে। জুলাই মাসের আকাশ, দিনের বেলা যেমন আগুন ঝরায়, সন্ধ্যার পর ঠিক তেমন করেই নিঃশ্বাস ফেলায় সান্ত্বনা মেলে দেয়। কিন্তু আজকের সন্ধ্যায় যেন কোনো প্রশান্তি নেই। তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত রকমের ভারী। গাড়িতে উঠে বসতেই, ঢাকার সড়কের আলো আঁধারির মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে তার যাত্রা। গন্তব্য মহাদেবপুর।
রাস্তায় তখন ব্যস্ততা কিছুটা কমে এসেছে, তবে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে গেলে এখনও শব্দ উঠে, মোটরসাইকেলের গর্জন, হর্ণের কান্না আর শহরের অস্থির নিঃশ্বাস। গাড়ির জানালা অর্ধেক নামানো, হালকা গরম বাতাসে মিশে আছে শহরের ধুলোর গন্ধ।

রাস্তা যখন ফাঁকা হতে থাকে, শহরের আলো পেছনে পড়ে যেতে থাকে। বগুড়া পাড় হওয়ার পর অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। গাঢ় নীল আকাশে তখন কালচে ছায়া, চারপাশে শুধুই রাস্তার পাশে ছুটে চলা গাছের সারি আর মাঝেমাঝে সাদা আলোয় ভেসে ওঠা কোনো চায়ের দোকান।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। স্টিয়ারিং হাত দিয়ে সামলে পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে চোখ রাখে সোলেমান। উপর মহলের এক পরিচিত নাম। এ সময়ে তার ফোন পেয়ে কিঞ্চিত অবাক হলো।
ফোন রিসিভ করে সোলেমান বলল-

-” বলুন।
ওপাশ থেকে ভেসে আসে-
-” আজ রাত বারোটায় একটা মিটিং বসছে। মেইন ডিসিশন হবে আজ। সবাই থাকবে, আপনাকেও আসতে বলা হয়েছে।
সোলেমানের চোখ সোজা রাস্তায়, নিস্তব্ধ এই রাত, গাড়ির হেডলাইটে আলোকিত হয়ে থাকা সরু পথ, আর মোবাইলের ভেতর ছুটে আসা দায়িত্বের ভার,সব একসাথে হুড়মুড় করে মাথায় নেমে আসে।
সোলেমান শান্ত গলায় বলে-
-” আমি এখন ঢাকার বাইরে। মিটিংটা যদি ভোরের পরপর করা যায় তাহলে আমি অ্যাটেন্ড করতে পারবো। আর যদি না করা যায় তাহলে আমাকে ছাড়াই করতে পারেন মিটিংটা।
ওপাশ থেকে অস্থির গলায় ভেসে আসলো।

-” না না আপনার থাকাটা আবশ্যক। প্রধানমন্ত্রী বলেছে আপনাকে থাকতে।
-” ১২ টায় হলে আমার পক্ষে আসা সম্ভব নয়।
ওপাশে কিছুটা বিরক্তি লুকানো নীরবতা। তারপর বলা হলো।
-” ঠিক আছে।আমি জেনে জানাচ্ছি।
কল কেটে গেলে ফোনটা পাশে রেখে দেয় সোলেমান। জানালার বাইরে তাকায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার, মাঝে মাঝে বাড়ির ঘোলাটে আলো, একটা গরুর গাড়ি ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে রাস্তার পাশে।
সোলেমান ভাবতে থাকে, সে ফিরে যাবে, নাকি এগোবে?
শেষমেশ নিজের মনেই বলেন,
-” একবার দেখা তো হোক। এরপর না হয় আবার ফিরবো । রাতটা বড়… ভোরের আগে পৌঁছে যাব।
গাড়ি আবারও চলে, রাতও। দায়িত্ব আর ব্যক্তিগত জীবনের মাঝখানে বসে থাকা সোলেমান এগিয়ে চলে, চুপচাপ, নিজের মতো করে। প্রায় রাত এগারোটার দিকে সোলেমান সুলতান ভিলায় এসে পৌঁছায়। সবাই তখন ঘুমে বিভোর ছিলো। সদর দরজা টা বন্ধ। সোলেমান পকেট থেকে ফোন টা বের করে রুমাইসা কে কল করলো। ফোনের শব্দে রুমাইসার ঘুম ভেঙে গেলো। আকস্মিক ভাইয়ের ফোন পেয়ে হুড়মুড় করে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল-

-” হ্যাঁ ভাইয়া বলো।
-” দরজা খোল তাড়াতাড়ি।
রুমাইসা বুঝলো না।
-” দরজা খুলবো মানে? কিসের দরজা?
-” সদর দরজা। আমি বাহিরে দাঁড়িয়ে আছি।
রুমাইসা চমকে গেলো। তার ভাই এই রাত করে বাড়ি এসেছে! তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে রুম থেকে বের হয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পেলো তার ভাইকে। কেমন বিধ্বস্ত, উষ্কখুষ্ক চুল। পড়নে টাউজার আর সাদা শার্ট। দরজার সামনে থেকে রুমাইসা সরে গিয়ে ভাইকে ঢুকতে দিলো। সোলেমান বাড়ির ভেতরে ঢুকলে রুমাইসা দরজা আঁটকে জিজ্ঞেস করে –

-” ভাই তুমি! আম্মু আব্বু কে ডাক দেই।
সোলেমান বাঁধা দেয়।
-” ডাকিস না। আমি একটু পরই চলে যাব।
-” চলে যাবে মানে?
-” মেহরিন কোথায়?
-” তোমার রুমে৷ ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো।
-” ঠিক আছে। তুই যা তোর রুমে।

কথাটা বলে সোলেমান নিজের রুমে চলে গেলো। রুমের সামনে এসে দাঁড়াতেই একটা আলাদা সুগন্ধ ভেসে আসলো নাকে। সোলেমান কম্পিত বুক নিয়ে রুমের ভেতর প্রবেশ করলো। ড্রিম লাইট জ্বালানো রুমে। জানালা খোলা। জানালা দিয়ে শীতল বাতাস আসছে রুমে।সোলেমানের সর্ব প্রথম চোখ গেলো বিছানার দিকে। খুবই পরিপাটি হয়ে উল্টো হয়ে শুয়ে আছে মেহরিন৷ পরক্ষণে চোখ গেলো ড্রেসিং টেবিলে। ড্রিম লাইটের আলোয় সোলেমানের শুমুখ পারফিউম টা চমকাচ্ছে। দাম প্রায় ১২.৯ লাখ ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৩.৫ কোটি টাকা। সোলেমান পারফিউমের থেকে চোখ সরিয়ে একপা একপা করে বিছানার দিকে এগিয়ে আসলো। মেহরিনের লম্বা কালো ঘন চুল গুলো মেয়েটার মুখের উপর পড়ে আছে। সোলেমান সন্তপর্ণে চুল গুলো সরিয়ে দিলো। পরিষ্কার হলো বউয়ের মুখ টা। কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো অপলক বউয়ের মুখের দিকে। বউকে নিজ থেকে এখন অব্দি সোলেমানের কিছু দেওয়া হয় নি। সোলেমানের একটুও ইচ্ছে করলো না মেয়েটার ঘুম ভাঙতে। কি নিষ্পাপ নিষ্প্রভ লাগছে মেয়েটাকে। মেয়েটা পৃথিবীর সব সুখ ডিজার্ভ করে একমাত একটা জিনিস ছাড়া। আর সেটা হলো…

সোলেমান ঘড়িতে সময় দেখলো ১২ টা বাজতে ৩৫ মিনিট সময় বাকি। যাওয়ার সময় ও হয়ে আসছে। একটু দেখার জন্যই ছুটে আসা সোলেমানের এই লম্বা পথ। যাওয়ার আগে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার জন্য সোলেমান টেবিলের কাছে আসলো। খাতার একটা পেজ নিয়ে লিখতে শুরু করলো। অনেক গুলো বছর পর সোলেমান কোনো চিঠি জাতীয় কিছু লিখছে।
সোলেমান চিঠি টা লিখে মেহরিনের বালিশের পাশে রাখলো। তারপর আবার কিছুক্ষণ মেহরিনের দিকে তাকিয়ে শরীরে চাদর টেনে দিয়ে মাথায় আলতো করে হাত রাখলো। ফিসফিস করে বলল-

-” বড় হও তুমি আমার ল্যাদা বউ। আমার লোড সামলানোর বয়স এখনও হয় নি তোমার। আসছি আল্লাহ হাফেজ।
সোলেমান দরজা চাপিয়ে দিয়ে চলে আসলো। রুমাইসা বসার ঘরেই বসে ছিলো। ভাইকে চলে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
-” চলে যাচ্ছো?
সোলেমান পিছু ফিরলো।
-” রুমে যাস নি এখনও?
-” না যাই নি। তুমি চলে যাচ্ছ কেনো? থেকে যাও না রাত টা।
-” সম্ভব না। থাকার নিয়ত করে বের হলেও থাকা হচ্ছে না।
-” মেহরিন যেতে দিলো!
-” ও ঘুমাচ্ছে, জাগাই নি।

-” তুমি কি মেহরিন কে এখনও মেনে নিতে পারো নি ভাইয়া? মেহরিন কিন্তু অনেক লক্ষী একটা মেয়ে ভাইয়া। ট্রাস্ট মি,ওর সাথে এক মিনিট থাকলেই তুমি মুগ্ধ হয়ে যাবে ওর ব্যবহারে। ও তোমার অপেক্ষায় থাকে রোজ। বিয়ের পরও এমন শূন্যতায় বেঁচে থাকা কোনো মেয়ের প্রাপ্য হতে পারে না ভাইয়া। প্লিজ ভাইয়া মেহরিন কে অন্তত কষ্ট দিও না কখনও। ও ননির পুতুল। ওর হৃদয় টা একদম নরম। মেহরিন ওর বাবার হৃৎপিণ্ড। বিয়ের দিন বিদায়ের সময় বারবার বলে দিয়েছে তার মেয়ে যেন কষ্ট না পায় কখনও। উনি কখনও তার মেয়েকে কষ্ট পেতে দেয় নি। তুমি অতীত ভুলে যেতে পারো না? এখন ও তোমার বউ।
সোলেমান রুমাইসার মাথায় হাত রাখলো। শান্ত গলায় বলল-

-” ও আমার থেকে অনেকটা ছোট মানে অনেকটা। ওর এই বয়স টা সংসার করার বয়স না। ওর উড়ন্ত বয়স,পড়াশোনা করার বয়স। আমি সেটাই করতে দিয়েছি। সাময়িক কষ্ট যদি সুখের হদিস এনে দেয় তাহলে সাময়িক কষ্ট টা গ্রহণ করে নেওয়া উচিত। মেহরিনের পাশে সব সময় থাকবি। ওর খেয়াল রাখবি। এখন আসছি শরীর আমার ভীষণ ক্লান্ত। দুটো রাত ধরে ঘুমাই নি। ঢাকায় ফিরে মিটিং অ্যাটেন্ড করে ঘুমাতে হবে।
রুমাইসা ভাইয়ের হাত ধরলো।

-” খেয়েছো কিছু সারাদিন?
-” মাঝপথে কিছু খেয়ে নিব চিন্তা করিস না।
-” খেয়ে যাও। মেহরিন রেঁধেছে।
সোলেমানের লোভ হলো খাওয়ার। রুমাইসা খাবার বেড়ে ভাইকে বসালো। সোলেমান বসলো খেতে। ক্ষুধার্ত পেট,খাবার গুলো অমৃত মনে হলো।
রুমাইসা চুপ করে মেহরিনের রুমে গিয়ে মেহরিন কে মৃদু স্বরে ডাকলো।
মেহরিন আচমকা কারো আওয়াজ শুনে চোখ মেলে রুমাইসা কে দেখতেই ঘুম সব উবে গেলো। আশেপাশে তাকালো। না সকাল তো হয় নি।

-” কিছু হয়েছে আপু?
রুমাইসা মেহরিনের গালে দু হাত রেখে বলল-
-” ভাইয়া এসেছে মেহরিন।
মেহরিন যেনো নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছে না।
-” উনি এসেছে! কোথায়?
-” ভাইয়া খাবার ঘরে খাচ্ছে।
মেহরিন বিছানা ছেড়ে উঠে ওড়না টা মাথায় নিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে কম্পিত বুকে নিচে নামলো। বসার ঘরে গিয়ে দাঁড়াতেই মুখের হাসি চলে গেলো। নাহ্ কেউ নেই তো এখানে। রুমাইসা কি তাহলে মিথ্যা বললো!
পেছনে তাকাতেই দেখলো রুমাইসা এসেছে। রুমাইসা মেহরিনের পাশে দাঁড়াতেই ফোনে মেসেজ আসলো। সোলেমান পাঠিয়েছে।

-” দরজাটা আঁটকে দিস। আমি চলে এসেছি।
রুমাইসা মেসেজ টা মেহরিন কে দেখালো। মেহরিন দ্রুত পায়ে দৌড়ে দরজার বাহিরে আসতেই দেখলো একটা কালো রঙের গাড়ি সুলতান ভিলার গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। মেহরিন ডাকতে গিয়েও থেমে গেলো। লোকটা আসলো অথচ মেহরিনের সাথে দেখা অব্দি করলো না!
রুমাইসা পাশে দাঁড়াতেই মেহরিন গেটের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” উনি আমার সাথে দেখা কেনো করলেন না আপু? একটু দেখা করতো।
-” ভাইয়া এতক্ষণ তোমার রুমেই ছিলো মেহরিন।
-” তাহলে জাগালো না কেনো?
রুমাইসা এই উত্তর জানে না৷ রুমাইসার রাগ হলো ভাইয়ের উপরে। ভাইকে মেসেজ দিয়ে জানালো-

-” এটা কি করলে ভাইয়া? চলে গেলে! মেহরিন ছুটে এসেছিল তোমায় দেখার জন্য। একটু দেখা করতে পারতে। মেয়েটা এখন দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে।
রুমাইসা মেহরিনের কাঁধে হাত রেখে বলল-
-” হয়তো তোমার ঘুম নষ্ট করতে চায় নি। সেজন্য…
-” আমি আজকেই কি করতে এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম আপু? অন্যান্য দিনের মতন জেগে থাকলে তাকে দেখতে পারতাম।

-” আচ্ছা কাল ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দিব। এখন রুমে চলো মেহরিন। ভাইয়া কে বিধ্বস্ত লাগছিলো।
-” কেনো কি হয়েছে উনার৷
-” রাজনৈতিক কোনো ঘটনা হবে হয়তো। চলো রুমে চলো।
রুমাইসা মেহরিন কে নিয়ে পেছন ফিরতেই বাড়ির গেট দিয়ে গাড়ির শব্দ ভেসে আসে। মেহরিন পিছু ফিরে। কালো রঙের সেই গাড়িটা৷ সেই গাড়ি থেকে সোলেমান কে নামতে দেখা গেলো। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলো মেহরিন তার স্বামী কে। সোলেমান হেঁটে তার দিকেই এগিয়ে আসতেছে৷ মেহরিনের শরীর কাঁপতে লাগলো। সোলেমান মেহরিনের সামনে দাঁড়িয়ে মেহরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল-

-” আসসালামু আলাইকুম বিবিজান।
মেহরিনের গলার স্বর যেনো কেউ আঁটকে ধরেছে। সালামের জবাব টা অতি কষ্টের সহিত উচ্চারণ করতে হলো।
-” ও..ওয়ালাইকুমুস সালাম।
রুমাইসা দু’জন কে কিছু মুহূর্ত একসাথে থাকার জন্য সে ভেতরে চলে গেলো। সোলেমান রুমাইসার মেসেজ টা দেখেই গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়িতে আসে আবার। সোলেমানের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে মেহরিন কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো-

-” আ…আপনি ঠিক আ..আছেন?
সোলেমান হাসলো ।
-” হুমম ঠিক আছি আমি। তুমি আগে শান্ত হও মেহরিন। অস্থির হচ্ছো কেনো!
-” আপনাকে এমন বিধ্বস্ত লাগছে কেনো?
-” কারন জানতে চাও?
-” হুমম।
-” টা দুদিন নাওয়া খাওয়া ভুলে চট্রগ্রাম থেকে আজ বিকেলেই ৭- ৮ ড্রাইভ করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরেছি৷ তারপর তোমার চিঠি টা পেয়েই ছুটে চলে এসেছি ৫- ৬ ঘন্টা ড্রাইভ করে। এখন আবার ফিরতে হবে ৫-৬ ঘন্টা ড্রাইভ করে। সেজন্য বিধ্বস্ত লাগছে।
মেহরিনের কান্না পেয়ে গেলো। একটু খানি জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করলো লোকটাকে৷ গালে দু হাত রাখতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু পারলো না।

-” কেনো আসলেন? আপনার তো রেস্ট নেওয়া উচিত ছিলো।
সোলেমান শান্ত গলায় বলল-
-” বউ আমার এত আকুল হয়ে জানালো সে আমার চেহারা ভুলে গেছে৷ তাই তো সব ভুলে চলে আসতে হলো।
-” আমি আর কখনও পাঠাবো না আপনায় চিঠি। আমি না পাঠাতাম চিঠি টা আর না আপনি এভাবে চলে আসতেন।
-” কেনো আমার আসায় তুমি খুশি হও নি?
-” আপনার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে খুশি হতে পারছি না৷ দোষী মনে হচ্ছে নিজেকে।
-” উঁহু, কোনো দোষ তুমি করো নি। তুমি কি আমায় একটু জড়িয়ে ধরতে চাও?
মেহরিন মাথা নত করে রাখলো।
-” আসবে আমার বুকে? সময় নেই হাতে। চলে যেতে হবে ঢাকায়। আসবে একটু?
মেহরিন জড়িয়ে ধরলো সোলেমান কে। সোলেমানের বুকে ঠেকলো মেহরিনের মাথা। সারা শরীর প্রশান্তিতে বয়ে গেলো। মেহরিনের মাথায় আলতো করে হাত রাখলো।
মেহরিন শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। মানুষটাকে প্রথম জড়িয়ে ধরা। তার পুরুষটার শরীরের ঘ্রাণ শুঁকে নিলো মেহরিন। কিছুক্ষণ জড়িয়ে থাকার পর সোলেমান মেহরিন কে ছাড়িয়ে চোখের পানি মুছে দিলো।

-” তোমার চোখে জল মানায় না মেহরিন৷ কাঁদবে না, অনেক দামী এই জল। কোনো এক দিনের জন্য বাঁচিয়ে রাখো আমার জন্য৷ সব এখনই ফুরিয়ে ফেলো না। শুনলাম সামনের মাসে কলেজে ভর্তির ডেট দিয়েছে। ভর্তি হয়ে নিবে। আর ঈদে আমি আসবো আগেই ঠিক আছে?
মেহরিন মাথা নাড়ালো। মাথা থেকে পড়ে যাওয়া ওড়না টা সোলেমান উঠিয়ে দিয়ে বলল-
-” আসছি তাহলে। নিজের খেয়াল রেখো।
সোলেমান চলে আসলো। মেহরিন দাঁড়িয়ে থাকলো যতক্ষণ সোলেমান কে দেখা গেলো। চোখের অদূরে যেতেই রুমাইসা মেহরিন কে নিয়ে ভেতরে আসলো।
মেহরিন নিজের রুমে আসলো। ঘুম আর তার আসবে না এখন। সেজন্য রুমের লাইট জ্বালিয়ে বিছানায় আসতেই বালিশের পাশে কাগজ দেখে ভ্রু কুঁচকালো। কিসের কাগজ এটা? মেহরিন খুলো। সর্বপ্রথম চোখ গিয়ে আটকালো বিবিজান নামটায়। তার স্বামীর লেখা এটা। মেহরিন পড়তে লাগলো—
বিবিজান…

তোমার চিঠি একবার না,অনেকবার আমি পড়েছি৷ বুকের মধ্যে খানে চেপে ধরে রেখেছিলাম কতক্ষণ তার হিসাব কষি নি। তোমার চিঠিটা পেয়েই চলে এসেছিলাম সুলতান ভিলায়। কিন্তু তোমার ঘুমন্ত চেহারা টা দেখে আর জাগাতে ইচ্ছে করলো না। সেজন্য আমাকে এটা লিখতে হচ্ছে।
চিঠিতে তুমি যা লিখেছো, তা আমি অস্বীকার করিনা। আর যা বলিনি, তার দায়ও নিচ্ছি না।
আমার ভাষা খুবই ক্ষীণ, কিন্তু আমার অনুভব নির্বাসনে পাঠানো নয়। সেটা আমাতেই সীমাবদ্ধ আছে।
তুমি আমার স্ত্রী, এটুকুই অনেক কথা।
তবে সম্পর্ক কাগজে না, সেটা জানি।
তাই বলছি তুমি সময় দিলে, আমি শুনবো।
বোঝার চেষ্টা করবো।
তুমি লিখেছো, আমি হয়তো তোমায় ভালোবাসি না। এটা নিয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না।
এইসব কথা সময় বলে, মুখ না।
সব সম্পর্কের শুরুতে ভালোবাসা থাকে না,
কখনো কখনো শুরুতে শুধু দায়িত্ব এসে দাঁড়ায় দরজায়,

আর মানুষ চুপচাপ সেই দরজা খুলে দেয়। আমিও দিয়েছি। আমি কখনও চাই নি আমার জীবনে কোনো নারী প্রবেশ করুক। কিন্তু তুমি ওতপ্রতভাবে জড়িয়ে গিয়েছো আমার জীবনের সাথে। সুলতান বংশে পুরুষ দের বিয়ে একবারই হয়। তবে একটা কথা মনে রেখো সুলতান বংশের পুত্রবধূ তুমি। তোমার এখন একটাই পরিচয় তুমি নওয়াজ সোলেমান সুলতানের একমাত্র স্ত্রী। আর সুলতান বংশের পুত্রবধূদের সম্মান থাকে সর্ব উঁচু তে মিনারের মতন। আমার জীবনে তোমার স্থানটা এখন ঠিক সেই পর্যায়ে। আর মৃত্যুর আগ অব্দি সেখানেই থাকবে এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই মনে।
তোমার আরো কিছু কথা ছিল সরল, নির্দ্বিধা,
যেগুলোর জবাব সরাসরি দেওয়া যায় না।
কারণ সব প্রশ্নের উত্তর হয় না, কিছু প্রশ্ন কেবল শোনার জন্য হয়। তুমি কী চাও, সেটা আমি আন্দাজ করতে পারি। তবে বাস্তবতা অন্য কিছু জানান দেয়। সেই বাস্তবতার কাছে আমি তুমি দু’জনেই বাঁধা । সর্বপ্রথম তুমি আমার দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব মৃত্যুর আগ অব্দি আমি পালন করে যাব ইনশাআল্লাহ।
ইতি তোমার
~ অপেক্ষা।

চিঠিটা মেহরিন বুকের মাঝে চেপে ধরলো। যত্ন সহকারে রেখে দিবে এটা মেহরিন।
সোলেমান ভোর ৬ টার দিকে ঢাকা ফিরে মিটিং অ্যাটেন্ড করে। মিটিং টা হলো গণভবনে। আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী শুধু একমাত্র বিএনপি না,তার সাথে যুক্ত আছে জামায়াতে, সহ আরো কিছু দল। এবারের মতন যেন আর চোখ রাঙাতে না পারে সেজন্য কঠোর এক পদ্ধতি তোলা হয়েছে মিটিংয়ে। এবং সেটাই সামনে বাস্তবায়িত হবে। সোলেমানের এসব নিয়ে কোনো ইন্টারেস্ট নেই। সোলেমান এক কান দিয়ে শুনে অপর কান দিয়ে বের করে দেয়। কারন প্রধানমন্ত্রী কে সোলেমান খুব ভালো মতই চিনে। যখন যাকে প্রয়োজন হয় তখন তাকে ব্যবহার করে ব্যবহার শেষে মে’রে ফেলেন। উনি এমন এক মানুষ যে যেদিন কারো হ’ত্যার কথা থাকে সেদিন তিনি মৃত্যুর নিউজ শোনা না অব্দি খাবার খান না। পাগলের মতন নিজের কক্ষে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকেন। যেই মুহূর্তে তার কানে আসে কাঙ্ক্ষিত মানুষজন ম’রেছে তখন তিনি পেট ভরে ভাত খান। উল্লাস করেন। মনে হয় তার ঈদ লেগেছে। তারপর চোখে জল মিশিয়ে সেজেগুজে সেই স্থানে যান মিডিয়ার সামনে শোক প্রকাশ করতে। লোকজন কে জানাতে আসলে তিনি কতটা ব্যথিত হয়েছেন।

সোলেমান এই নিউজ গুলো দেখে আর হাসে। মিডিয়ার সামনে প্রধানমন্ত্রীর কমন এক ডায়লগ সব সময় থাকে— স্বজন হারানোর ব্যথা কেমন হয় সেটা আমি জানি।
অথচ তিনি যে কত স্বজনের বুকের হাড়গোড় চিবিয়ে খেয়েছে ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যেত৷ সেই ইতিহাস যারা ঘেঁটেছে তাদেরই মৃত্যু হয়েছে।
সেজন্য সোলেমান প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলে না। নিজের দলের প্রধান তো। সয়ে যেতে হয়।

ডিজি‌এফ‌আই-তে আজ বহুদিন হয়ে গেল A.J.-এর উপস্থিতি নেই। হঠাৎ করে তার এমন অনুপস্থিতি A.J – এর সাথে কাজ করা অনেকের চোখে লেগেছে। প্রথমদিকে কেউ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি, ভাবা হয়েছিল হয়তো কোনো বিশেষ মিশনে রয়েছেন অথবা অন্য কোনও ডিপার্টমেন্টে আছে।
কিন্তু দিন যেতে না যেতেই কানাঘুষো শুরু হলো। অনেক দিন হয়ে গেল, কোনো খবর নেই!
নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের মধ্যে সন্দেহ জমতে লাগল। তারা নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় বলতে লাগল, A.J. কি সত্যিই ডিজি‌এফ‌আই-তে নেই?

দাহশয্যা পর্ব ২২

শেষমেশ সেই সন্দেহই সত্যি হলো। ইউনিট প্রধান নিজেই একটি সংক্ষিপ্ত নিশ্চিত বার্তা দিলেন।
যে A.J এখন দেশের বাইরে রয়েছেন। প্রয়োজনীয় কারণেই তার যাত্রা। আগামী আরো কিছুদিন তিনি এই অফিসে আসতে পারবেন না। তবে দেশে ফিরে নিজেই যোগাযোগ করবেন।

দাহশয্যা পর্ব ২৪