Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ২২

দাহশয্যা পর্ব ২২

দাহশয্যা পর্ব ২২
Raiha Zubair Ripti

দুপুরটা যেন আগুনের মতো জ্বলছে আজ।
রাস্তায় মানুষের চলাফেরা প্রায় নেই বললেই চলে। গরমে কুকুরটাও ছায়ার নিচে জিভ বের করে শুয়ে আছে। বাতাস নেই একফোঁটা হাওয়া পর্যন্ত যেন গিলে ফেলেছে আকাশ।
রোদের তেজ এত বেশি যে দূরের গাছপালাও কেমন বিবর্ণ লাগে চোখে। টিনের ছাউনি যেন সোজা মাথার ওপর আগুন ঢেলে দিচ্ছে। কাকগুলোও ডাকছে না, কেবল হাঁ করে বসে আছে বিদ্যুৎ খুঁটির পাশে।
ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে সুলতান নিবাসে প্রবেশ করে সাফওয়ান। সদর দরজার পেরিয়ে বসার ঘরে ঢুকেই এজওয়ানের নাম ধরে ডাকতে থাকে। এজওয়ান এই দুপুরে ভাতঘুম দিয়েছিল। আকস্মিক নিজের নামে কাউকে ডাকতে শুনে রুম থেকে বেরিয়ে দোতলা থেকে নিচে বসার ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখলো সাফওয়ান কে। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে আসলো তার। হাই তুলতে তুলতে নিচে নেমে গিয়ে সোফায় পা তুলে বসলো।

-” কি হয়েছে ভাই এভাবে ষাঁড়ের মতন চেঁচাচ্ছেন কেনো?
সাফওয়ান হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসলো। দাঁত চেপে বলল-
-” মাহি কোথায়?
এজওয়ান বিরক্ত গলায় বলল-
-‘ কেনো হারিয়ে গেছে নাকি মেয়েটা?
-” আপনি জানেন মাহি কোথায়।
-” পাগল নাকি আমি জানবো কি করে মাহি কোথায়?
-” আপনি না জানলে কে জানবে?
-” আপনি জানবেন। কজ আপনিই তো মাহির উডবি ছিলেন। আপনাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। তো অন্যের বউ সরি হবু বউ কোথায় সেটা আমি কি করে জানবো বলুন তো?

-” আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর আপনি জানেন মাহি কোথায়।
-” কোনো প্রুফ আছে এটার?
-” প্রুফ নেই সেজন্যই তো এখনও বাহিরে এসির তলে ঘুমাতে পারছেন।
-” জান প্রমান নিয়ে আসুন,তারপর ডায়লগ ছাড়বেন। আর এটা কোনো চিড়িয়াখানা নয় যে যখন তখন পশু শিকারে চলে আসবেন৷ এরপর থেকে আসলে ওয়ারেন্ট নিয়ে আসবেন। তা না হলে চাকরির মায়রে বাপ করে দিব।
সাফওয়ান আর নিজেকে আটকাতে পারলো না। এজওয়ানের শার্টের কলার ধরে বসা থেকে দাঁড় করিয়ে গাল বরাবর ঘুষি দিতে উদ্যত হলে এজওয়ান বা হাত দিয়ে হাতটা ধরে ফেলে। পাল্টা সাফওয়ানের বুকে জোরে ধাক্কা মেরে বলে-

-” এই সিআইডি এটা তোর অফিস না,এটা সুলতান নিবাস। সেদিন মে’রেছিস আমি টু শব্দটুকুও করি নি তাই বলে ভাবছিস যখন তখন যেখানে খুশি সেখানে মা’রতে পারবি! আর আমি চুপচাপ খাব তোর মা’র! তুলে একটা আছাড় মেরে তোর বি’চি গালিয়ে দিব বলে রাখলাম। বের হ সুলতান নিবাস থেকে। তা না হলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিব। এখনও সম্মানের সহিত বলতেছি।
-” আমি আপনাকে ছাড়বো না।
-” সরি আমি গে* নই। কোনো মেয়েকে গিয়ে এই ডায়লগ বলবেন সে মহাখুশি হবে। বাট আমি হচ্ছি না,একটা বউ থাকলে সে এ কথা বললে মহাখুশি হতাম। এখন আসছি ভাই আমার ঘুমটার চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে দিছেন।
সাফওয়ান পারলো না নিজের ক্লাস টা এজওয়ানের মতন নিচে নামাতে। আইনের দৃষ্টি কোন থেকে এজওয়ান কে নির্দোষ দেখা গেলেও সাফওয়ান বেশ জানে এজওয়ান আছে এসবের ভেতরে।
তাই সুলতান নিবাস থেকে বের হয়ে কিছু লোক লাগালো সুলতান নিবাসের বাহিরে৷ এজওয়ান তো এক সময় না এক সময় বের হবেই।

দুপুর কেটে গিয়ে রাত চলে আসলো কিন্তু এজওয়ান কে সুলতান নিবাস থেকে বের হতে দেখা গেলো না।
রাত বাজে ১০:৪৫। একটা সিঁড়িঘরের নিচে, অন্ধকারের মধ্যে ফিসফিসে বাতাস। ধুলোমাখা কংক্রিটের মেঝেতে একটা লোহার চেয়ার, আর তাতে হাত-পা-মুখ বাঁধা মাহি। ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত মুখ। চোখে মুখে ভয় নেই বললেই চলে, তীক্ষ্ণ নজর। ও চেষ্টা করছে হাত পায়ের বাঁধন ছিঁড়তে, কিন্তু দড়িগুলো এমন শক্ত করে বাঁধা যে একটু নড়লেই রগে রক্ত জমে আসছে।
তিন দিন আগে বিয়ের শপিং শেষ করে ক্লান্ত মাহি অ্যাপার্টমেন্টে এসে দরজা বন্ধ করে, লাইট জ্বালিয়ে ওয়াশরুমে যায়। একটু পরে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরুতেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে ডোরভিউ দিয়ে দেখে সিকিউরিটি গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। একটু অবাক হয়। দরজা খুলে জিজ্ঞেস করে-

-“কিছু বলবেন চাচা?
সিকিউরিটি কিছু বলে না। একপাশে তাকায়। চোখে একরকম ভয়ার্ত অব্যক্ত সংকেত।
মাহি কিছু বুঝে উঠার আগেই মাথা ঘোরায় পাশে
তিনজন লোক দাঁড়িয়ে, পুরো কালো পোশাকে। মুখ ঢাকা, চোখে সানগ্লাস।
মাহি জিজ্ঞেস করে-
-” আপনারা কারা?
কোনো উত্তর নেই। দুজন লোক হঠাৎ এগিয়ে আসে। একটা হাত মাহির দিকে বাড়ে।
মাহি ঝটকা দিয়ে দরজা বন্ধ করতে যায়। কিন্তু ততক্ষণে ওরা ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়ে।
প্রথম লোকটা ফের মাহির হাত ধরতে চাইলে মাহি সরে গিয়ে লোকটার হাত ধরে বাঁকিয়ে ফেলে দেয়। লোকটা ব্যথায় ককিয়ে উঠে।
মাহি দৌড়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরে আসে। লোকগুলোও পেছন পেছন আসে।
দ্বিতীয় লোকটা পিছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাহি দেয়ালে ঠেকে যায়। মাহি ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। প্রথম লোকটা ঘুষি মারতে আসলে মাহি নিচু হয়ে এড়িয়ে যায়, পেটের নিচে কিক করে লোকটাকে মেঝেতে ফেলে দেয়।
তৃতীয় নম্বর লোক সামনে থেকে পাঞ্চ ছোঁড়ে মাহি দু’হাতে ব্লক করে এরপর লোকটার থুতনিতে পাঞ্চ মারে,চোয়াল ঘুরে যায়। লোকটা বেঁকে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়।

দ্বিতীয় লোকটা পেছন থেকে মাহিকে ধরে ফেলে।
মাহি ছটফট করে, পেছনে মাথা দিয়ে আঘাত করে লোকটার নাকে। রক্ত ঝরে পড়ে লোকটার নাক দিয়ে। প্রথম লোকটা আবার পেছন থেকে দৌড়ে এসে মাহির পিঠে লাথি মারে।
মাহি ছিটকে পড়ে মেঝেতে। কিন্তু মাহি পড়ে গিয়ে থেমে থাকেনা। শুয়ে থেকেই পা দিয়ে লোকটাকে টেনে ফেলে দেয়। মাহি উঠে দাঁড়ায়, এবার তিনজনেই তাকে ঘিরে ফেলে।
কিছুক্ষণ টানটান নিঃশব্দ। তৃতীয় নম্বর লোকটা ফুসতে ফুসতে বলে-
-‘তোর কনফিডেন্সটা মেরে ফেলবো, সুন্দরী।
মাহি ঠান্ডা স্বরে বলে-

– “চেষ্টা করে দেখতে পারিস।
একজন মাহির পেছনে গিয়ে চুল টেনে ধরে। মাহি সোজা পেছনে কনুই মারে
লোকটা কাশতে কাশতে পড়ে।
আরেকজন মাহিকে কোণঠাসা করে দেয়ালের কাছে। মাহি দেয়াল ধরে উঠে গালিতে গালিতে লোকটার গালে থাপ্পড় মারে – তারপর কিক।
তৃতীয়জন পেছন থেকে ধরতে আসে। মাহি এবার শরীর ঘুরিয়ে তার কাঁধে চড় বসিয়ে ফেলে দেয়।
তিনজনই জোরে হাঁপাচ্ছে, রক্ত ঝরছে ঠোঁট আর নাকে।
মাহির চোখে আগুন, কাঁধে একটু আঁচড় লেগেছে, নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে, কিন্তু টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ঠিক তখনই সিঁড়ি থেকে চাপা পদধ্বনি ভেসে আসে।একজন লম্বা ছায়ামূর্তির। লোকটা আর কেউ না এজওয়ান। মুখে কালো মাস্ক, শরীরে কালো পোশাক। এতক্ষণ ধরে এজওয়ান সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দেখছিলো ঝাঁছিকি রানির ঝাঁঝ। বেশ প্রশংসা করছিলো মাহির ফাইটিং এর বাহাদুরের কাছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার রাগে শরীর কেঁপে উঠে।
মাহি ঘুরে তাকানোর আগেই এজওয়ান একটা রুমাল মাহির মুখে চেপে ধরে
মাহি চোখ বড় করে ফেলে, গলা দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ… হাত-পা ছটফট করছে…ধীরে ধীরে… সব ঝাপসা… মাহি আর মুখ টা দেখতে পারে না তখন।

এখন মাহি ভাবছে কে এমন টা করলো তার সাথে? ভাবনায় মস্তিষ্ক নাড়া দিয়ে জানান দিলো এজওয়ান! কথাটা ভাবতেই দরজা খুলে কেউ প্রবেশ করলো অন্ধকার কক্ষে। বাহিরের করিডরের আলো এসে রুমটা একটু আলোকিত হলো। কেউ চেয়ার টেনে বসলো মাহির পাশে৷ মাহি মুখটা স্পষ্ট দেখতে পারছে না। আলোর বিপরীতে লোকটার মুখ। খুব কাছাকাছি আসলো লোকটা। গলার কাছে মুখ টা নিয়ে ফিসফিস করে বলল-
-” হাই সুইটহার্ট… হাউ আর ইউ?
কন্ঠ টা শুনেই মাহি চিনে ফেললো একদণ্ডে লোকটা কে হতে পারে। মূহুর্তে চিৎকার দিয়ে বলল-
-” শ’য়তানের বাচ্চা তুই করেছিস এসব।
এজওয়ান আয়েশ করে বসলো চেয়ারে। হাতের ইশারায় কাউকে বললো লাইট জ্বালিয়ে দিতে। সাথে সাথে রুম আলোকিত হলো। এজওয়ান দেখলো গালের সাইডে রক্ত শুঁকিয়ে আছে এখন মাহির। ঠোঁট কামড়ে তা দেখলো।
-” কি চাচ্ছিস তুই? কিসের জন্য এমন করছিস?
-” আমার তোকে চাই। বিয়ে করবো তোকে৷ বউ হবি তুই আমার।
-” আমাকে বিয়ে করে কি পতিতালয়ে ব্যবসা খুলবি?
এজওয়ান বাঁকা হাসলো।

-” আমি কুলাঙ্গার নাকি যে বউ দিয়ে ব্যবসা করবো? আমার যা টাকা পয়সা জায়গা সম্পত্তি আছে তাতে তোর মতন হাজার টা মেয়ে কে পাললেও এজওয়ান সুলতানের টাকার এক ভাগও শেষ হবে না। তাই বাজে বকা বন্ধ কর।
-” তাহলে আমার পেছনে কেনো লেগেছিস? তোর আশেপাশে তো মেয়ের অভাব নাই। তাদের ভেতরে কাউকে ধরে বিয়ে করে ফেল না। ওপ্স তোর আবার বিয়ে করতে হয় নাকি? প্রতিদিন ড্রেস চেঞ্জের মতন মেয়ে চেঞ্জ করিস।
-” একদম ঠিক বলেছিস। কারেক্ট, এর জন্য তোকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত।
-” বাঁধন খুলে দে বলছি।
-” দিব না। আগে বিয়ে হবে তারপর তুই ছাড়া পাবি।
-” বিয়ে তাও আবার তোকে! মরে গেলেও করবো না বলেছি না?
-” তাহলে আমিও তোকে ছাড়বো না। তুই এখানে থাকবি। আমার কাছে বন্দী হয়ে।
-” হাতের বাঁধন ঢিলে কর। কষ্ট হচ্ছে।
-” মামার বাড়ির আবদার? নাকি মামার বাড়ি ঘুরতে এসেছিস। নাকি আমি তোর চাকর? কোনটা? রাজি হয়ে যা বিয়েতে।

-” রাজি আমি হবো না।
-” ওকে ফাইন। আই হ্যাভ নো প্রবলেম।
-” তোকে ইচ্ছে করছে মাটির নিচে পুঁ’তে ফেলতে।
-” তার জন্য হলেও তোর বিয়ে করতে হবে আমাকে। করবি আমাকে বিয়ে?
-” না করছি কানে যায় না তোর? নাকি কানে ময়লা জমে গেছে।
-” তোর চেয়ের পরিষ্কার কান আমার বুঝলি। চাপাচুপা ব্যথা হয়ে গেছে তোর সাথে বকবক করে।
-” তুই জানিস না আমি সাফওয়ান কে ভালোবাসি?
-” হ্যাঁ জানি তো সুইটহার্ট।
-” জানার পরও এরকমটা কেনো করছিস? তোর জীবনে তো মেয়ের অভাব নেই। ওদেরই বিয়ে কর না। আমার পেছনেই কেনো পড়লি? হোয়াই?
এজওয়ান হাই তুলতে তুলতে ফোনে সালমান খানের একটা গান ছাড়লো৷ তারপর গানের সাথো সুর মিলিয়ে গাইলো-

-” Ek jagah pe kabhi ruka nahin
Ek jagah pe kabhi tika nahin
Jaisa maine chaha mujhe
Waisa koyi dikha nahi
Par jabse dekha tujhe
Jo huaa nahi wo hone lagaa
Dil mera mujhe jaga ke
Khud seene mein sone laga
Meri fitrat badal rahi hai
Jaise barqat koyi huyi hai
Bas ab toh duaa yahi hai
Ki dil se kabhi na utre (utre.. utre..)
এজওয়ান কে এভাবে গা ছাড়া ভাব নিয়ে গান গাইতে দেখে মাহি দাঁত চেপে বলল-

-” ক্যারেক্টারলেস একটা ছেলে তুই।
এজওয়ান গানটা বন্ধ করে বলল-
-” তাতে তোর বাপের কি?
-” এ্যা তুই আমার সামনে থেকে সর তো। তোর চেহারা দেখলেই আমার শরীর কিড়মিড় করে উঠছে।
-” কেনো সুইটহার্ট? আমি তো দেখতে সাফওয়ানের চেয়েও বেশি হ্যান্ডসাম। অবশ্য সুন্দরী মেয়েদের চয়েস তো অলওয়েজ ছাপড়ি মার্কাই হয়ে থাকে,তাই মাইন্ড করছি না।
-” সাফওয়ানের সাথে তোর মতন নর্দমার কিটের তুলনা হয় না।
-” কে করছে ঐ চেঙ্গিস খানের সাথে৷ আমার তুলনা ? আমি! সিরিয়াসলি! আমার লেভেলেই নেই তোর সাফওয়ান। কিন্তু আমাদের নামের কিন্তু একটা মিল আছে মাহি। আমি এজওয়ান আর ও সাফওয়ান। ওয়ান ওয়ান মিল আছে৷ তাই তুই তোর জীবন থেকে সাফ কে বাদ দিয়ে এজ কে গ্রহণ করবি।

-” সেটা তোর স্বপ্নেই।
-” এখন চুপ থাক। ক্ষুধা লাগছে তোর? খাবি কিছু?
-” তোর র’ক্ত খাব বের করে দে।
-” সেটা তো জীবনেও পাবা না সুইটহার্ট। খাওয়ার কথা বলেছিলাম তুই উড়িয়ে দিলি। পরে ক্ষুধার তাড়নায় মা’রা গেলে তার দায়ভার কিন্তু আমার না।
মাহি কিছু বললো না। হাসফাস করতে লাগলো বাঁধন টা খোলার জন্য। এজওয়ান মাহির বৃথা চেষ্টা দেখে বলল-
-” এখন চলে যাব আমি?
মাহি দাঁত চেপে ধরে বলল-
-” যা তো যা এখান থেকে।
এজওয়ান গা ছাড়া ভাব নিয়ে ওকে বলে ঐ কক্ষ থেকে বের হয়ে আসলো। মাহি পারছে না এখন নিজেকে চড়াতে। আর একটু সতর্ক থাকলেই আজকেরই এই দিনটা তাকে দেখতে হতো না। সাফওয়ান কে মনে পড়ছে বারবার। সাফওয়ান কি পাবে মাহির খোঁজ টা? নাকি এখান থেকেই তাদের পথ ভিন্ন হতে থাকবে।
এজওয়ান মাহির কক্ষ থেকে বের হয়ে করিডর পেরিয়ে অন্য আরেক কক্ষে আসে। এখানে চেয়ারে হাত পা বাঁধা তিনজন লোক বসা। এজওয়ান তাদের সামনে চেয়ার টেনে বসলো। শরীরের অবস্থা তাদের ভীষণ খারাপ। টানা দুই দিন পেটানো হয়েছে তাদের। এখন লোকগুলো এজওয়ান কে দেখে ভয়ে কেঁপে উঠলো। একজন তো কেঁদে বলে উঠলো-

-” আমাদের দোষ টা কি স্যার। কি করেছি আমরা?
এজওয়ান পায়ের উপর পা তুলে বসে বলল-
-” কি করেছিস জানিস না? আমি বারবার বলি নি মাহির গায়ে একটা টোকাও না দিতে।
-” ও তো আমাদের মারছিলো। আমরা নিজেদের প্রটেক্ট করার জন্য…
-” হুঁশ! তোদের মারছিলো তোরা মার খাবি। টাকা নেওয়ার সময় কি বলেছিলি? টাকা কম দিয়েছিলাম আমি? মাহির শরীর দিয়ে র’ক্ত কেনো বের হলো? ওর উপর যা ইচ্ছে তাই করবো একমাত্র আমি,আর কেউ না। এখন অপরাধ যখন করেছিস তার খেসারত তো দিতেই হবে। বাহাদুর দরজা টা খুলে দে। অনেকদিন হলো ওদের ভালোমতন ভোজন হয় না।
একটা পুরনো লোহার দরজার তালা খুলে যায়। মুহূর্তেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ঘন গর্জনের মতো এক আওয়াজ। যেন কেউ শিকল ছিঁড়ে ছুটে আসতে চাইছে। লোকগুলো আঁৎকে ওঠে।

-” কী আছে ওই ঘরে?
এজওয়ান উঠে দাঁড়িয়ে বলে-
-” মাত্র তিনটা কুকুর। ওরা মাংস খেতে ভীষন পছন করে… তবে সব মাংস না, শুধু মানুষের মাংস টা পেলে ভীষণ খুশি হয়।
দরজা খুলতেই কালো তিনটি কুকুর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওদের চোখে রক্ত লেগে লাল হয়ে আছে, থাবা গাঢ় লাল দাগে ভিজে আছে।
প্রথমেই তারা চ্যাঁচামেচি করা লোকটির গলার ওপর লাফিয়ে পড়ে। কামড়ে রানের থেকে মাংস আলাদা করে ফেলে। বাকিরা চিৎকার করতে থাকে, নিজেদের বাঁচাতে চেষ্টা করে, কিন্তু বাঁধা পায়ের রশি নড়ে না।
চোয়ালের শব্দ, কান্না, হাড় চূর্ণ হওয়ার ভয়ংকর সুরে কক্ষটা রক্তে ভাসে। কিন্তু কক্ষ টা সাউন্ড প্রুফ থাকায় কক্ষের বাহিরে আওয়াজ টা বের হতে পারে না।
এজওয়ান চেয়ে দেখলো কুকুর গুলোর খাওয়া। কি আয়েশ করে হিংস্রতা নিয়ে খুবলে খুবলে নাড়ি’ভুড়ি খু’বলে ছিঁ’ড়ে খাচ্ছে। অন্য কেউ থাকলে এতক্ষণে বোধহয় ভয়ে ব’মি করে ভাসিয়ে দিত। চোখে দেখাতো দূরে থাকে। এজওয়ান বাঁকা হেসে পেছন ফিরে হেঁটে যেতে যেতে বলে।

-“ওদের দুইটা দিন কিছুই খেতে দিইনি। আজ ওদের পার্টি। ডিস্টার্ব করা উচিত নয়।
নির্জন, নেমেসিস আর ব্লিটজ,এই তিন কুকুরকে এজওয়ান ইউক্রেনের আন্ডারগ্রাউন্ড সামরিক গবেষণা ল্যাব থেকে কিনে এনেছে।
তাদের স্নায়ু-মাংসপেশি শক্তিশালী করার জন্য কৃত্রিম হরমোন ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে তাদের খেতে দেওয়া হয় মাংস। হতে পারে সেটা মানুষের বা অন্য কিছু। এজওয়ান এদের খুব বিশেষ বিশেষ কাজে ব্যবহার করে। সব সময় এদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। আর যেদিন যায় সেই দিনটা একদম ভয়ংকর হয়ে থাকে।
এই কুকুরগুলো আর কুকুর নেই, এরা হিংস্র আর নিয়ন্ত্রিত নরখাদকতার অস্ত্র।
ঠিক দু’দিন পর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরেছে সোলেমান। এজওয়ান কে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-

-” কোথায় যাচ্ছিস?
-” এই তো গাঁ’জা খেতে। তুমি খাবে?
সোলেমান বিরক্ত হলো।
-” ভাইজান শোনো।
-” বল।
-” আমি অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছি আগামীকাল।
-” কেনো?
-” আমার এক ফ্রেন্ডের বিয়ে। সেজন্য।
সোলেমান মাথা ঘামালো না। এমনেই শরীর বড্ড খারাপ। রুমে চলে আসলো। ফোনে এক ফোঁটাও চার্জ নেই। সোলেমান ফোনটা চার্জে দিয়ে ওয়াশরুমে গেলো লম্বা একটা শাওয়ার নিতে। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। ম’রবে একজন আর তার জন্য গলা ফাটাতে হবে পুরো গুষ্টি কে বিরক্তিকর। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা।
সোলেমান লম্বা শাওয়ার নিয়ে টাওয়াল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বের হয় ওয়াশরুম থেকে। এক হাত দিয়ে মাথা মুছে অন্য হাত দিয়ে ফোনটা অপেন করতেই দেখলো রুমাইসার ফোন কল। গতকাল দুপুরের দিকে ফোনটা তার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর আজ বাজে বিকেল চারটা। পুরো একটা দিন নেটওয়ার্কের বাহিরে ছিলো সোলেমান। সোলেমান ফোন দিলো রুমাইসা কে।
রুমাইসা বাড়ির বাহিরে এসেছে। ভার্সিটি থেকে এসাইনমেন্ট দিয়েছে তারজন্য পেপার কিনতে। ভাইয়ের ফোন পেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। ফোনটা রিসিভ করে কানে নিলো ফোনটা।

-” হ্যালো ভাইয়া।
সোলেমান গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো-
-” ফোন দিয়েছিলি? কোনো দরকার?
-” ফোনে কেনো পাচ্ছিলাম না তোমায়? কোথায় গিয়েছিলে?
-” চট্টগ্রাম। আর ফোনে চার্জ ছিলো না। কি বলবি বল। মাথা ব্যথা করছে,ঘুম হয় নি। খেয়ে ঘুমাবো এখন।
-” তোমাকে যে মেহরিন একটা খাম পাঠিয়েছিলো পাওনি সেটা?
সোলেমানের কপালে দু ভাজ পড়লো।
-” কিসের খাম?
-” সেটা তো জানি না। মেহরিন পাঠিয়েছে। তোমার ঠিকানায় যায় নি এখনও? যাওয়ার তো কথা।
-” কই আমি তো কো…..সোলেমান থেমে গেলো। মনে পড়লো বাড়ির ম্যেড সেদিন একটা খামের কথা বলেছিলো। নাম ছিলো না বলে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে বলেছিল। -” আমি পরে ফোন দিচ্ছি তোকে।
সোলেমান ফোন টা কেটে,ফোনটা পকেটে ভরে টাওয়াল টা বিছানায় ফেলে নিচে নেমে আসলো। ম্যেড কে ডেকে বলল-

-” রফিক এ্যাই রফিক কোথায় গেলি। তাড়াতাড়ি আয়।
রফিক দৌড়ে আসলো রান্নাঘর থেকে।
-” জ্বি স্যার।
-” সেদিনের ঐ খাম টা কোথায় ফেলেছিস?
-” ডাস্টবিনে স্যার।
-” তুলে নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি।
-” ময়লা তো নেই।
-” নেই মানে!
-” বাহিরে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
-” বাহিরে কোথায় ফেলছিস বলদ?
-” বাগানের কিনারে পুড়ানোর জন্য নিয়ে গেছে শফিক ভাইয়া।
সোলেমান অস্থির বুক নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে বাগানে আসলো। বাগানের এক কোনায় ময়লা কাগজ পত্রের স্তুপ জমে আছে। তারপাশেই শফিক দাঁড়ানো। লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে কগজ গুলো তে। সোলেমান দৌড়ে আসলো। আ’গুন ছড়িয়ে যাচ্ছে কাগজ গুলোর মাঝে। সোলেমান শফিক কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে পা দিয়ে আ’গুন নেভানোর চেষ্টা করতে করতে শফিক কে বলল-

-” গাধার বাচ্চা কি করলি এটা।
পুড়ে যাওয়া কাগজ ছাই হয়ে উড়ছে। আগুনের তাপে সোলেমানের পায়ের চামড়া লাল হয়ে উঠছে, সেদিকে সোলেমানের হুঁশ নেই। একটা একটা করে পুড়তে থাকা কাগজ সরিয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ একটা জিনিস তার চোখে পড়ল।একটা খাম। আধা পোড়া, কিনারাগুলো জ্বলছে, কিন্তু মাঝখানটা এখনো অক্ষত।

সোলেমান সঙ্গে সঙ্গে সেটা দু’আঙুলে চেপে তুলে আনল আগুন থেকে। সঙ্গে সঙ্গে হাতের আঙুল পুড়ে গেল খানিকটা, কিন্তু সোলেমান তোয়াক্কা করলো না তা। সোলেমান খাম টা নিয়ে চলে আসলো। আধা পুড়ে যাওয়া সেই খাম, যেটা কিনা অগোচরেই ছিল ধ্বংসের খুব কাছাকাছি এখন তার হাতের তালুতে শীতল বাতাসের মতো নিঃশব্দ আশ্বাস হয়ে ঠাঁই নিয়েছে। হাত আর পা লাল হয়ে পুড়ে গেছে। মেডিসিন লাগানো দরকার। কিন্তু সোলেমান ভাবলো না মেডিসিন নিয়ে। সে খামটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। ভেতরের জিনিস টা অক্ষত আছে তো?
খামটা খুলে সোলেমান ধীরে ধীরে ভেতর থেকে কাগজটা বের করল। কিছু লেখা আছে। পাতার কিনারা পোড়া, কোথাও কোথাও ছাই হয়ে গিয়েছে লেখার পাশঘেঁষে। তবু মাঝখানের লেখা এখনো অক্ষত।
তার ল্যাদা বউ তাকে চিঠি পাঠিয়েছে!
এই যুগে, যেখানে মানুষের মনের কথাও ইমোজিতে আটকে থাকে, সেখানে তার সেই সরল, মেঘলা চোখের মেয়েটা তাকে চিঠি লিখেছে!

সোলেমান খামটা হাতে নিয়ে উঠে এল বাড়ির বারান্দায়। পশ্চিমের আলো তখন ম্লান হয়ে এসেছে, বাতাসে ঘুমঘুম একটা গন্ধ। সে কাঠের চেয়ারটায় বসে শরীর এলিয়ে দিল। এক পায়ে অন্য পা তুলে বুকের কাছে কাগজটা খুলে ধরল।
প্রিয় অপেক্ষা।
চিঠির শুরুতে সালাম জানাচ্ছি। আশা করি ভালোই আছেন। যদি জিজ্ঞেস করেন আমি কেমন আছি তাহলে বলবো এই তো চলছে জীবন যেভাবে চালাচ্ছে।
প্রিয় অপেক্ষা বলায় কিছু মনে করবেন না। আসলে বিয়ের আগে আপনার নাম দিয়েছিলাম অপেক্ষা। তাই নাম টা আর চেঞ্জ করা হলো না। আজও তো আপনার অপেক্ষাতেই থাকা হয়। তাই এই নামটাই মানানসই লাগছে। তবে আজ ইচ্ছে হলো আপনাকে চিঠি লিখতে। লেখার মাঝে আলাদা একটা প্রশান্তি আছে। প্রায় লেখালেখি করি তো ডায়েরিতে। ভাবতে পারেন আমি একটু সেকেলে টাইপের সৌখিনও একটু-আধটু। এর আগে একটা লিখেছিলাম। কিন্তু ডাকপিয়ন না আসায় সেটা পাঠাতে পারি নি। অগ্যত সেই চিঠির ঠাই হলো বৃষ্টির পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে ছিঁড়ে গিয়ে। তাই আবার নতুন করে লিখতে হলো।

এই চিঠিতে কোনো অভিযোগের ছোঁয়া নেই। এই চিঠি শুধুই একটা উপস্থিতির… আমি আছি, আপনি আছেন আর আমাদের অস্তিত্বের একটা ক্ষীণ দলিল মাত্র।
আমরা এক ছাদের নিচে নেই, তবু একই নামের সঙ্গে বাঁধা পড়েছি।
এই বাঁধনের কোনো অভ্যস্ততা এখনো আসেনি আমাদের মাঝে। আপনি আমায় মেনেছেন কি না স্ত্রী হিসেবে এটাও অস্পষ্ট এখনও আমার কাছে। তাই গভীর কোনো আলোচনায় যেতে পারছি না। আপনি আমায় ভালো বোধহয় বাসেন না। তাই না? এটা না একটু আধটু স্পষ্ট হয় আমার কাছে। তবে আমরা কেউ কাউকে ভালোভাবে চিনি না এখনও, এটা চিরন্তন একটা সত্য।

তারপরও আমার দিন শুরু হয় আপনার নাম দিয়ে, আর দিন শেষ হয় আপনার অনুপস্থিতির হিসেব কষে। বিয়ের পর আমাদের দেখা হয়েছিল একবার। সেদিন আপনার চোখে আমি তেমন গভীর কিছু দেখিনি। না প্রত্যাখ্যান, না আকর্ষণ। কেমন যেন একটা দোটানার ছাপ দেখেছি। আশা করি বিষয় গুলো একটু হলেও ক্লিয়ার করবেন। এটা আমার ভ্রম নাকি বাস্তব। আমার জীবনে দুটি পুরুষের বিচরণ ঘটেছে। এক আমার বাবা আর এক আপনি। বুঝতেই পেরেছেন তাহলে এই সপ্তদশী আপনাকে ঠিক কোথায় ঠাই দিয়েছে?

আচ্ছা শুনুন….আপনি তো ঈদে বাড়ি আসবেন বলেছেন। একটু আগে আসা যায় না? আমি বোধহয় আপনার চেহারা টা ভুলতে বসেছি। এ বাড়িতে একটাও ছবি নেই আপনার। যে একটু সময় অসময়ে ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তাকাবো। একটা ছবি বাঁধিয়ে দিয়ে যাবেন? খোঁজ খবর তো নেন না। আমি না হয় ছবির সাথে কথা বলেই মনের ভাব প্রকাশ করবো। এতে আমার মনটাও ভালো থাকবে। অনেক বলে ফেলেছি। আসলে লিখতে বসলেই আমার সব কথা মনে পড়ে। আর গড়গড় করে লিখে যাই। ভালো থাকবেন।
ইতি আপনার সহধর্মিণী
~ মেহরিন।

দাহশয্যা পর্ব ২১

সোলেমান চিঠিটা পড়ে বুকের মাঝে চেপে ধরলো। তার বউয়ের বলা একটা কথাও মিথ্যা নয়৷ বুকের অস্থিরতা আরো বেড়ে গেলো। সোলেমান আর বসে থাকতে পারলো না। বারবার চোখের সামনে একটা লাইনই ভাসছে— একটু আগে আসা যায় না? আমি বোধহয় আপনার চেহারা ভুলতে বসেছি।
সোলেমান উঠে দাঁড়ালো। অসুস্থ শরীর নিয়েই শরীরে সাদা শার্ট পড়ে বেরিয়ে গেলো মহাদেবপুরের উদ্দেশ্যে বউয়ের দোরগোড়ায় । তার বউ তার চেহারা ভুলে যাওয়ার পথে! এদিকে যে এক দেখায় সোলেমান মেহরিনের চেহারা মুখস্থ করে রেখেছে৷ এই মেয়ে তাহলে কেনো ভুলবে স্বামীর চেহারা?

দাহশয্যা পর্ব ২৩