Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ২১

দাহশয্যা পর্ব ২১

দাহশয্যা পর্ব ২১
Raiha Zubair Ripti

দুপুর তিনটে বাজে। সূর্যের কড়া রোদ টা এখনও বিদ্যমান। সাফওয়ান বাবার সামনে সেই কখন থেকে বসে আছে কিন্তু তার বাবা শামসুল মির্জার কোনো হেলদোল নেই। তার যেখানে মাহি কে পছন্দ না সেখানে বিয়ের বিষয়ে কথা বলার তো কোনো প্রশ্নই উঠে না। শামসুল মির্জা খবরের কাগজ টা রেখে উঠে চলে যেতে চাইলে সাফওয়ান পথ আঁটকে দাঁড়ায়। শামসুল মির্জা শান্ত গলাতেই বললেন-

-” পথ ছাড় সাফওয়ান।
সাফওয়ান এবার দু হাত দু দিকে মেলে দিয়ে বলল-
-” ছাড়বো না পথ। তুমি এতো ত্যাড়া কেনো বলোতো বাবা? ছেলে বিয়ে করতে চাইছে সেদিকে কি তোমার কোনো হুঁশ নেই? হুঁশে ফিরো। আর চলো মাহির বোন দুলাভাইয়ের সাথে কথা বলবে।
শামসুল মির্জা এবার তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন-
-” সম্ভব না আমার পক্ষে। আমি কারো সাথে গিয়ে কথা বলতে পারবো না। আর মাহি কে তুই বিয়ে করতে চাস? ওকে ফাইন। যা কর গিয়ে বিয়ে মাহি কে। আমি বাঁধা দিব না।
-” তোমাকে ছাড়া কিভাবে বিয়ে করি আমি বলোতো?
-” আমাকে ছাড়া যেভাবে এতদিন প্রেম করেছিস সেভাবেই। আর বিরক্ত করিস না তো আমাকে।
-” তাহলে তুমি সত্যি যাবে না?
-” না।
-” মাহি কে মেনেও নিবে না?
-” না।

-” ওকে ফাইন লাগবে না তোমার যাওয়ার। আর হবেও না মানতে মাহি কে। আমি একাই গিয়ে কথা বলবো।
সাফওয়ান রুমে গিয়ে পোশাক বদলে একটা ব্লু টি-শার্ট আর ব্লাক টাওজার পড়ে বের হলো। বাড়ি থেকে বের হয়ে ও বাড়ির জন্য মিষ্টি ফল নিয়ে চলে গেলো।
সুলতান ভিলায় আসা সাদা ধবধবে গরুর টার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেহরিন। গত পরশু এসেছে গরু টা। রুমাইসা গরু টার সাথে এ নিয়ে ১০০ টা হবে ছবি তুলেছে বোধহয়। গরুটা এত শান্ত যা বলার বাহিরে। আনোয়ার সুলতান বলেছেন গরু টা কোরবানি দেওয়া হবে। মেহরিনের মন ভার হয়ে আসলো এ কথা শুনে। গরুটা তো এখনও ছোট। মেহরিন গরুটার শরীরে আলতো হাত রেখে আদুরে গলায় ডাকলো— শাহজাদা।
রুমাইসা চমাকলো।

-” শাহজাদা!
মেহরিন ভরকে গেলো।
-” তুমি কি গরু টাকে শাহজাদা বলে ডাকলে ভাবি?
-” হুমম। কেনো সুন্দর না নাম টা?
-” জাস্ট ওয়াও নামটা। ভাবি দাঁড়াও একটা ছবি তুলি তোমার আর শাহজাদার।
রুমাইসা তুললো। সাদা শাহজাদা আর সাদা রঙের সেলোয়ার-কামিজ পড়া স্নিগ্ধ মেহরিনের। তাদের কম্বিনেশন টা দারুন। রুমাইসা ছবি টা সোজা ভাইয়ের হোয়াটসঅ্যাপে সেন্ট করে দিলো।
সোলেমান বের হয়েছিল মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে। সেখানে আজ একটা কাজ আছে৷ পথিমধ্যে আচমকা ফোনে নোটিফিকেশন পেয়ে চেক করে দেখলো উপর থেকে রুমাইসার মেসেজ। একটা ছবি পাঠিয়েছে৷ সোলেমান আর ভেতরে গিয়ে দেখলো না ছবি টা।

ইব্রাহিমের বাগান বাড়ির বাগানে বসে আছে ইমন। মন আজকাল তার ভীষণ বিষন্ন থাকে। কিন্তু কেনো সে তা জানে না। হঠাৎ হঠাৎ কেনো জানি বুকটা তর মোচড় দিয়ে উঠে,তীব্র যন্ত্রণা হয়। বুক ফেটে কান্নার দলা বেড়িয়ে আসে। ইমন বুঝতে পারে না৷ এমন যন্ত্রণা কেনো হয় বক্ষপটে। তারপর পর মূহুর্তে মেহরিনের কথা ভাবলেই ব্যথা টা ধীরে ধীরে নিরাময় হয়ে যায়। মেহরিন নামটা যেমন মধুর তেমনই মেয়েটাও। একদম ফুলের মতন নিষ্পাপ ধার্মিক ও বটে। যাকে বলে পবিত্র হৃদয়ে মোড়া একটা শান্ত ভদ্র মেয়ে। ইমন মাঝেমধ্যে নিজেকে ভীষণ সৌভাগ্যবান মনে করে মেহরিনের মতন এমন একটা চমৎকার মেয়ের সাক্ষাৎ তার সাথে হয়েছে বলে। এখন এই সাক্ষাৎ টাকে ইমন একটা নাম দিয়ে বাঁধাই করে রাখতে চায়। মেয়েটার মতই পবিত্র নাম হবে তার। বিয়ে! হ্যাঁ বিয়ের চেয়ে পবিত্র আর কোনো নাম সম্মান হতেই পারে না। এবার ঈদে বাড়িতে গিয়েই মা’কে বলবে। তারপর মেহরিনের বাবার কাছে প্রস্তাব নিয়ে যাবে। ইমন আশা করছে এবার মোতালেব ভুঁইয়া অন্তত নাকচ করতে পারবে না। সে এখন একটা জব করছে। এখন সে মেহরিন কে ভালো রাখতে পারবে। এরপরও যদি চাচা রাজি না হয় তাহলে ইমন হাতে পায়ে ধরবে ভিক্ষা চাইবে তার কাছে। বড্ড ভালোবাসে মেহরিন কে সে। এ জীবনে যদি মেহরিন কে সে না পায় তাহলে বোধহয় মরেই যাবে।

ইমনের আচমকা চোখ ভিজে আসলো। বুঝলো না বোকা ইমন এ জল কিসের! সে তো পূর্ণতার স্বপ্ন দেখছে। তাহলে চোখে জল কেনো? ওহ্ আনন্দের জল বুঝি এটা? তাহলে হৃদয় কেনো এত অশান্ত? ইমনের ইচ্ছে করলো মেহরিন কে এক নজর দেখার। কিন্তু তা সম্ভব নয়। মেহরিনের পার্সোনাল ফোন নেই। আর মেহরিনের মায়ের নম্বরে কারন ছাড়া ফোন দেওয়াটাও স্বাভাবিকভাবে ভালো দেখায় না।
ইমন দমে গেলো। আর তো কয়টা দিন। ঈদের ছুটি পেলেই ছুটে চলে যাবে অলংকার পুর। তারপর মেহরিন কে দু-চোখ ভরে দেখবে।

মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করতো ইমনের মেহরিন কে একটু ছুঁয়ে দেখতে। ছোঁয়াটা একদমই তেমন গভীর না। মেহরিনের নরম হাত টা ধরে ছোঁয়ার ইচ্ছে। ইমনের হয়তো এত এত টাকা পয়সা নেই, কিন্তু মেহরিন কে তার চেয়ে বেশি ভালো এই পৃথিবীতে আর কেউ-ই বাসতে পারবে না। এটা ইমন চোখ বন্ধ করে বাজি ধরে বলতে পারবে। ইমনের ভালোবাসা তার মেহরিনের মতই স্নিগ্ধ। অপবিত্র? না না অপবিত্র হয় কি করে? ভালোবাসা অপবিত্র জিনিস নাকি? ভালোবাসা তো হয় পবিত্র।
ইমন বসা থেকে উঠে দাঁড়াল গাড়ির হর্ণের আওয়াজ শুনে। ইয়াসিন এসেছে নিশ্চয়ই। আজ কথা ছিলো বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার। ইয়াসিন জানিয়েছে সোলেমান সাহেবের একটা বৃদ্ধাশ্রম ও অনাথাশ্রম আছে৷ তার নাম Child & Old Age Care। অনাথ বাচ্চারা আর বৃদ্ধ লোক গুলো একত্রে এই আশ্রমে থাকে।
ইয়াসিন গাড়ি থেকে ডাক দিলো ইমন কে।

-” ইমন ভাই আসেন।
ইমন এগিয়ে আসলো। ছোট্ট পিক-আপের পেছনে চাল ডাল,তেল,সাবান,বেবি ফুড সহ আরো অসংখ্য জিনিস।
ইমন গাড়িতে উঠে বসলো। ইয়াসিন গাড়ি স্টার্ট দিলো। গাড়িটা এসে থামলো কল্যাণপুর।
আশ্রমে থাকা সিকিউরিটি গার্ড গুলো এসে জিনিসপত্র গুলো নিয়ে যেতে লাগলো ভেতরে।
ইমন গাড়ি থেকে নেমে চারপাশটা দেখতে লাগল। চোখের সামনে যে দৃশ্যটা খুলে গেল, তাতে মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর কেমন যেন এক কোমল অনুভূতি খেলে গেল।

আশ্রমের বড়ো গেট পেরিয়ে ঢুকতেই দু’পাশে সারি সারি ফুলের টব গাঁদা, গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা আর নাম না জানা আরও কত ফুল! সবুজ ঘাসে মোড়ানো একটি ছোট্ট বাগান, মাঝখানে এক চকচকে সাদা বেঞ্চ, যেখানে দুটি বৃদ্ধা গল্পে মগ্ন। বাচ্চারা এক কোণে রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা নিয়ে খেলা করছে। কারো হাতে ছোট্ট ট্রাক, কারো হাতে পুতুল। এদের মধ্যে কেউ পথশিশু, কেউ এতিম কেউ রেলস্টেশন থাকতো, কেউ ফুটপাতে থাকতো, কেউবা ঢাকার কোন এক নাম না জানা হাসপাতালের সামনে পড়ে ছিল।
ভবনের একপাশে হুইলচেয়ারে বসে আছেন এক বৃদ্ধ, যার একটি পা নেই। আরেকজন সেবিকা তার হুইলচেয়ার ঠেলছেন। কারো বা এক চোখ অন্ধ। কারোর আবার দু চোখই অন্ধ। কারো সন্তান রা তাদের বের করে দিয়েছে বাড়ি থেকে। আবার কেউ নিঃসন্তান।

ইমন চারপাশে তাকিয়ে দেখল, তিনতলা বিশিষ্ট ভবনটি আধুনিক নকশায় তৈরি, তবে কোথাও কোনো কৃত্রিমতা নেই। প্রতিটি কোণে মানুষের স্পর্শ, যত্ন, ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। ভবনের দেয়ালে টাঙানো কিছু ছবি হাস্যোজ্জ্বল মুখের শিশু আর বৃদ্ধদের মিলিত মুহূর্ত। কোথাও একজন ছোট্ট মেয়ে এক বৃদ্ধার কোলে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে, কোথাও এক বৃদ্ধ তার হুইলচেয়ারে বসে ছোটদের গল্প শুনাচ্ছেন।
ইমন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। একটা টিনের ছাউনির নিচে অনেকগুলো চেয়ারে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা বসে আছেন। কেউ গল্প করছেন, কেউ সেলাই করছেন, কেউবা আঙুলে তাসের প্যাকেট নিয়ে ব্যস্ত। তাদের পাশেই একটি লম্বা কাঠের দোলনা, যেখানে দুইটা ছোট ছেলে-মেয়ে পাশাপাশি বসে দুলছে।
ইয়াসিন এগিয়ে এসে বলল-

– “এই জায়গাটার নাম দিয়েছে সোলেমান ভাই Child & Old Age Care। আগে অন্য নাম ছিলো। ছোটরা যেমন বড়দের সহায়তা ছাড়া চলতে পারে না,তেমনই বৃদ্ধরাও এই সময়ে অন্যের সাহায্য ছাড় চলতে পারে না। সেজন্য বাচ্চা আর বৃদ্ধ দের এক সাথে রাখা হচ্ছে। এতে বৃদ্ধ লোক গুললোর একাকিত্ব গুলো কমবে। আর শিশু গুলো দাদা দাদির সমবয়সী লোকের আদর স্নেহ ও পাবে।
আগে সবাই আলাদা ছিলো।
ভবনের পেছন দিকে একটা ছোট্ট পাঠাগার আছে। কাঠের তাকভর্তি বই, শিশুদের জন্য গল্পের বই, বৃদ্ধদের জন্য ধর্মীয় বই, উপন্যাস আর স্মৃতিচারণমূলক লেখাগুলোর বিশাল সংগ্রহ। পাঠাগারের জানালা খুললেই বাগানের একটা অংশ দেখা যায়, যেখানে পাখিরা ঘোরে, প্রজাপতিরা উড়ে বেড়ায়।
ভবনের পাশে ছোট্ট একটা চিকিৎসাকেন্দ্রও আছে। সপ্তাহে তিন দিন ডাক্তার আসেন। মেডিকেল রুমের জানালায় শিশুর আঁকা একটা চিত্র, একজন বৃদ্ধ আর একজন শিশু হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে সূর্য ডোবার আলোর নিচে।
ইমন হাঁটতে হাঁটতে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। হঠাৎ এক বাচ্চা ছুটে এসে বলল,

-” আঙ্কেল,আপনি খেলবেন আমার সাথে?
ইমন না করতে পারলো না। বাচ্চা মেয়েটার সাথে ব্যাট বল খেলতে লাগলো।
ইমন লক্ষ্য করল, আশ্রমের প্রতিটি কোণেই একেকটা জীবনের ভাঙা কাহিনি। এই বাড়িটা এক বিশাল মানবজমিন যেখানে কেউ সন্তানহীন, কেউ সন্তানপালনে অবহেলিত,কেউ পিতৃহারা, কেউ মাতৃহারা, কেউ দুই-ই। কেউ জন্মেই পরিচয়হীন, কেউ বয়সের শেষে পরিচিতদের কাছে বোঝা হয়ে উঠেছে।
এক বৃদ্ধ চুপচাপ একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছেন। ইমন জানতে পারলো তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। মুখে চুপচাপ গাম্ভীর্য, চোখে অদ্ভুত এক ক্লান্তি। তার পাশে বসা এক ছয় বছরের বাচ্চা তাকে জিজ্ঞেস করল,
-“দাদু, তোমার ছেলেরা কোথায়?
তিনি কেবল আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বিষাদের সহিত বললেন,

-“তারা খুব ব্যস্ত রে…।
ইমনের বুক ভারী হয়ে আসে। কেউ বাবা মায়ের জন্য নিজের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দেয় তো কেউ বাবা মাকে বোঝা ভেবে আশ্রমে ফেলে রেখে যায়। তারা কি জানে না মায়ের পায়ের নিচে যে সন্তানের বেহেস্ত? দিন দুনিয়ার পেছনে ছুটতে গিয়ে যে তারা পরকালের নরকের দিকে চলে যাচ্ছে ক্রমশঃ।
ইয়াসিন বেবি ফুডের বক্স টা নিয়ে দোতলায় গেলো। আজ তিন মাস হবে একটা বাচ্চা এসেছে৷ বয়স ৩ মাস। কোন এক অমানুষ তার পাপ ঢাকতে ফুলের মতন শিশু টাকে ডাস্টবিনে ফেলে রেখে গিয়েছিল। সোলেমান খবর পেতেই আশ্রমের ম্যানেজার কে বলে বাঁচ্চাটাকে নিয়ে আসে। ইয়াসিন খাবার টা মিস রাফসার কাছে দিলো। বাচ্চা মেয়েটার ঠান্ডা লেগেছে। ইয়াসিন কোলে তুলে নিলো। আশ্রমের সবচেয়ে ছোট্ট সদস্য সে৷ সোলেমান নাম রেখেছে জুঁই। ইয়াসিন আদর করলো বাচ্চাটকে। মিস রাফসা কে বলল মেয়েটার যত্ন নিতে। ঠান্ডা লাগে কি করে?
মেয়েটিকে রাফসার কাছে দিয়ে পেছন ফিরে হাঁটতে গিয়েই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল ইয়াসিন। কোনো এক বৃদ্ধ মহিলা গান গাইছে।

-” ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার
মস্ত ফ্লাটে যায়না দেখা এপার ওপার
নানান রকম জিনিস আর আসবার দামী দামী
সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি
ছেলে আমার,আমার অগাধ সমভাম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধশ্রম….
গানটা শুনে ইয়াসিনের মন কেঁদে উঠলো। গানটা শুনেই ইয়াসিনের হৃদয় ব্যাকুল হলো বৃদ্ধা মহিলার নিশ্চয়ই বুক ফেটেছে,চোখে জল এসেছে। ইয়াসিনের ইচ্ছে করলো গিয়ে মহিলা টাকে দেখতে। কিন্তু দেরি হয়ে যাওয়ায় আর দেখতে পারলো না তাকে। চলে আসলো।
এজওয়ান নিজের রুমে বসে একের পর এক হুইস্কি খেয়ে চলছে। জানতে পেরেছিল পরশু মাহি আর সাফওয়ান বিয়ে করতে যাচ্ছে। এই কথাটা একদম কানে গরম সুঁচ ফোটার মতন ফুটে গেছে। বিয়ে করার শখ না মাহির? এজওয়ান সেই শখ পূরণ করাবে এখন মাহির।
বাশার সুলতান কিছুক্ষণ আগেই শুনেছে এজওয়ানের কর্মকাণ্ডের কথা। আর শুনেই তার মাথাটা গরম হয়ে গেছে। রেগে হন্তদন্ত হয়ে ছেলের রুমে আসলো। রাগে শরীর কাঁপছে তার।

-” এসব কি শুনছি আমি?
এজওয়ান শান্ত মস্তিষ্কে জবাব দিলো-
-” যা শোনার তাই শুনেছো।
-” এটা কিন্তু একদম বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।
-” হলে হচ্ছে।
-” সোলেমান কিন্তু রেগে যাবে।
-” তুমি না জানালে জানবে না আর রাগবেও না। তুমি জাস্ট চুপ থাকো।
-” যা ইচ্ছে হয় তুই কর। পরে হিতে বিপরীত হলে তার দায়ভার সব তোর। তোর কারনে যেনো পলিটিক্সে কোনো প্রভাব না আসে বলে রাখলাম।
-” আসবে না। এখন আসতে পারো।
বাশার সুলতান চলে গেলেন। এজওয়ান হুইস্কির বোতলের দিকে তাকিয়ে বোতলে চুমু খেয়ে গাইলো—

-” যদি তোমায় না পায় মন
শুন্য আমার এই ভুবন
ধংস করবো সব কিছু
ছাড়বোনা তোমার পিছু….
মেহরিন গতকাল রাতে একটা চিঠি লিখেছে তার প্রিয় পুরুষটির জন্য। লোকটা ফোনই দেয় না। সেদিন বললো রাতে ফোন দিবে। কিন্তু আর দেয় নি ফোন। তার নিজেরও ফোন নেই। রুমাইসার কাছে চাইতেও শরম করে। তাই এই উদ্দ্যোগ। মেহরিনের যান্ত্রিক ফোনে কথা আদানপ্রদান করার চেয়ে চিঠিতে প্রকাশ করাটাই শ্রেয় মনে হয়। নব্বই দশকের একটা ভাইব আনে।
এখন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে ডাকপিয়নের। বৃদ্ধ লোকটা আসলে মেহরিন চিঠির খাম টা তাকে দিয়ে বলবে তার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে।
মেহরিন অপেক্ষা করতে লাগলো কিন্তু সেদিন আর ডাকপিয়ন আসলো না। মেহরিনের মন খারাপ হয়ে গেলো। রুমাইসার থেকে ঠিকানা নিয়ে চিঠি লিখলো অথচ পৌঁছে দেওয়ার মানুষটাই আসলো না! মেহরিনের আর পাঠানো হলো না সেই চিঠি টা। নিচ থেকে আফিয়া সুলতানের ডাক ভেসে আসায় মেহরিন চিঠির খাম টা বেলকনির চেয়ারে রেখেই চলে গেলো।

বিকেলের পর ঝড় উঠলো। ঝড়ের সাথে ভারি বৃষ্টিপাত হলো। মেহরিন রুমে এসে তড়িঘড়ি করে বেলকনিতে গিয়ে দেখলো চিঠিখানা ভিজে জলে ডুবু ডুবু হয়ে আছে। মেহরিন সতর্কতার সহিত খাম টা উঠাতে গেলেও পারলো না। ছিঁড়ে গেলো। মেহরিন দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। চিঠির টুকরো গুলো ফেলে দিলো বাহিরে।
পরেরদিন আরো একটা চিঠি লিখলো মেহরিন। কিন্তু অপেক্ষা করলো ডাকপিয়নের। সেদিনও আসলো না আর ডাকপিয়নে। মেহরিন বুঝতে পারলো না ডাকপিয়ন চাচা টা কেনো আসছে না?
টানা আরো দুদিন অপেক্ষা করার পর এক ডাকপিয়নের দেখা মিললো। তবে সেই ডাকপিয়ন আগের সেই বয়স্ক লোক না। এবার ভিন্ন কেউ। মেহরিন ওড়না টেনে মুখ ঢেকে নিচে নেমে সেই ডাকপিয়ন কে পেছন থেকে ডাকলো। লোকটা দাঁড়ালে মেহরিন এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

-” আসসালামু আলাইকুম, এই কয়দিন ঐ চাচা টা আসলো না কেনো?
-” আগে যিনি এই পাড়ায় চিঠি দিত?
-” হ্যাঁ।
-” উনি তো আজ তিনদিন হলো মা-রা গেছেন।
মেহরিন চমকে উঠলো এ কথা শুনে। মুখে চলে আসলো ইন্না-লিল্লাহ।
-” কিভাবে মা-রা গেলেন?
-” হার্ট অ্যাটাক করে।
-” আপনি একটু দাঁড়ান। আমার খাম টা নিয়ে আসছি।
মেহরিন বাড়ির ভেতরে ঢুকে নিজের রুম থেকে খাম টা এনে লোকটার হাতে দিয়ে বলল-
-” কাঙ্খিত ঠিকানায় খাম টা পৌঁছে দিবেন।
-” আচ্ছা আপু।
লোকটা চলে গেলো। মেহরিন ভারী একটা শ্বাস ফেললো।
বিকেলের পর পরই সুলতান নিবাসে ডাকপিয়ন কড়া নাড়ে। বাড়ির দারোয়ান ডাকপিয়নের থেকে চিঠিটা নিয়ে বাড়ির ম্যেডের কাছে দিয়ে আসলো। বাড়িতে বাশার সুলতান ও নেই আর সোলেমান ও নেই।
সোলেমান বাসায় ফিরলো রাত নয়টার দিকে ক্লান্ত শরীরে। মন মেজাজ বেশ তুঙ্গে। সোলেমান কে দেখেই ম্যেড এগিয়ে আসলো খাম টা নিয়ে। আর বলল-

-” স্যার আপনার একটা খাম এসেছে।
-” কোথা থেকে?
-” ঠিকানা নাম কিছুই দেওয়া নেই উপরে। শুধু আপনার ঠিকানা দেওয়া।
সোলেমান মাথা ঘামালো না। যেতে যেতে বলে গেল-
-” তাহলে ডাস্টবিনে ফেলে দে।
মেহরিনের চিঠিটা সোলেমানের হাতে ঠাই না পেয়ে পেলো সুলতান নিবাসের এক ডাস্টবিনে।
পুরো তিনদিন ধরে মাহির কোনো খোঁজ খবর নেই। অথচ গতকাল সাফওয়ান আর মাহির বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো। সাফওয়ান ফোনে কনটাক্ট করার চেষ্টা করলো মাহির সাথে কিন্তু ফোন সুইচ অফ। ভয় ও হতে লাগলো। মাহি গেলো কোথায়? আবার কোথাও চলে গেল না তো? কিন্তু মাহি তো বলেছে এবার অনেক দিন থাকবে বাংলাদেশে৷ আর বিয়ের তারিখ তো সে নিজেই ঠিক করলো। সাফওয়ান মাহির অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিল৷ সিকিউরিটি গার্ড বললো মাহি নাকি দুদিন আগে কোথাও একটা চলে গেছে ব্যাগপত্র গুছিয়ে।
সাফওয়ান চিন্তায় পড়ে গেলো। মাহির লোকেশন লাস্ট তার নিজের অ্যাপার্টমেন্টেই ছিলো। তারপর থেকেই ফোন বন্ধ। আচ্ছা মাহি কোনো বিপদে পড়ে নি তো?
সাফওয়ান মাহির অ্যাপার্টমেন্টের সিসিটিভি ক্যামেরা চালু করলো। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে গত ছয় দিন ধরে অ্যাপার্টমেন্টের সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট। পাগল পাগল লাগছে নিজেকে সাফওয়ানের। আচ্ছা এজওয়ান কিছু করে নি তো?

বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতি সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে স্বাধীনতার পর ছাত্র রাজনীতির ধারা পরিবর্তিত হতে থাকে। আদর্শিক রাজনীতির জায়গায় আসে দলীয় আনুগত্য, ক্ষমতার লড়াই, হল দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং সহিংসতা। এই পরিবর্তনের ফলে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেড়ে যায়।

১২ জুলাই,
চট্টগ্রামের আকাশে তখন মেঘ জমছে, কিন্তু শহরের বাতাস আরও গাঢ় ছিল রাজনৈতিক উত্তেজনায়। চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ছাত্রলীগ আর ছাত্রশিবিরের টানাপোড়েন তখন চরমে। কেউ জানত না, সেই দিন বিকেলটা শহরের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর বিকেলে রূপ নেবে।
চট্টগ্রামের একটি কলেজের ছাত্র লীগের সদস্যদের একটা মিছিল বের হয়। মিছিলের উদ্দেশ্য ছিল ক্যাম্পাসে সহিংসতা ও অস্ত্রের রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো।

চট্টগ্রামের শেরশাহ পলিটেকনিক এলাকা থেকে মাইক্রোবাসে করে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে অংশ নিতে বাকলিয়াস্থ সরকারি কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে যাচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন,রায়হান সায়েম, সংগঠনের নগর শাখার সাধারণ সম্পাদক। রাফিদ চৌধুরী,সাংগঠনিক সম্পাদক। মিজান রাহি বুদ্ধিজীবী মস্তিষ্ক। তানভীর আলম,ক্রীড়া সম্পাদক। মাসুম ইকবাল,প্রাক্তন সভাপতি। ইলিয়াস জাবেদ, রায়হানের ঘনিষ্ঠ সহচর। বাবু শেখ, মাঠকর্মী।মজনু ভাই,মাইক্রোবাস চালক। গাড়িটি বহদ্দারহাট পুকুরপাড় এলাকায় আসলে আরেকটি মাইক্রোবাস তাদের সামনে এসে গতিরোধ করে। গতিরোধ করার মুহূর্তের মধ্যে ব্রাশফায়ার শুরু করা হয়। সেকেন্ডের মধ্যে সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
আকাশে রক্তের গন্ধ ভেসে বেড়ায়।

মাইক্রোবাসের কাঁচ ভেঙে ছিটকে পড়ে। কারো মুখে আর কথা নেই, কারো হাতে প্রাণ নেই।
গাড়ির ভেতরে লুটিয়ে পড়েন ছাত্রলীগের ছয় নেতা, তাদের মাইক্রোবাসের চালক ও একজন অটোরিকশার চালক। নিহতদের শরীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায়। শহরের বাতাসে শোকের গন্ধ। দোকানিরা পাশ থেকে এমন হ’ত্যাকাণ্ড দেখে তড়িঘড়ি করে দোকানপাট বন্ধ করে চলে যায়। পথে থাকা যাত্রী রা উল্টো পথে হাঁটা ধরে। পিচঢালা রাস্তার উপর পড়ে থাকে তারা ৮ জন। ঘন্টা খানেক পর পুলিশ বাহিনী আসে। এম্বুলেন্স করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় হসপিটালে। সেই ৮ জনের মাঝে ৭ জন ঘটনাস্থলেই মা-রা যান। আর অন্য একজন কে হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসক রা জানান মৃত।

পুরো বাংলাদেশ ছড়িয়ে গেলো এই হ’ত্যাকাণ্ডের ঘটনায়। খবরের কাগজে গোটাগোটা অক্ষরে লেখা হলো চট্টগ্রামের এইট মার্ডারের নিউজ। সোলেমান নিউজ টা শুনে থ হয়ে গেলো। সকল আসনের এমপিকে চট্টগ্রামে গিয়ে এই পরিকল্পিত হ’ত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর মিছিল বের করতে বলা হলো উপর মহল থেকে। সোলেমান কেউ যেতে হলো চট্টগ্রাম তার পরের দিন। প্রায় আওয়ামী লীগের সকল নেতাই এসেছে।
এই এইট মার্ডারের খবর শুনে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও আসলেন চট্টগ্রাম। আর এসেই চটে গেলেন তার দলের লোকদের উপর। আলাদা করে একটা মিটিং হলো। সেই মিটিংয়ে সোলেমান ও উপস্থিত হলো।

দাহশয্যা পর্ব ২০

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল এর সুষ্ঠু তদন্তের নির্দেশ দান এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু তিনি এর বিপরীত আচরণ করতে লাগলেন। বিনা তদন্তে তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করে তার দলের লোকদের এজন্য ভর্ৎসনা করলেন যে, তারা এর প্রতিক্রিয়ায় কেনো ৮ জনের বদলে ৮০ জনকে খুন করলো না। তিনি তাদেরকে লজ্জা দেবার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন যে তারা কি শাড়ি চুড়ি পড়ে বসে আছে? তিনি নির্দেশ দিলেন যেন একটি লাশের বদলে ১০ টি লাশ ফেলা হয়। সোলেমান চুপচাপ শুনলো। প্রধানমন্ত্রীর উপরে কথা বলার সাহস কারোরই নেই।
সে দিন বিকেলেই ধর্মঘট হলো। মিডিয়াকে বিশ্বাস করানো হলো এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে শিবিরের লোক।

দাহশয্যা পর্ব ২২