দাহশয্যা পর্ব ২০
Raiha Zubair Ripti
৭ জুলাই সকাল টা যে এমন হবে তা কল্পনাও করতে পারে নি কেউ। মাহি যেভাবে এজওয়ান কে গ্রেফতার করিয়েছিল ঠিক তার বিপরীতে গিয়ে সোলেমানের এক ভিডিও বাধ্য করলো মাহিকে জেলের ভেতর ঢোকাতে৷
সোলেমান গতকাল রাতেই চৌধুরী বাড়ির বসার ঘরের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ এনেছে৷ এবং সেটাকে এমন ভাবে এডিটিং করা হয়েছে যে তা ধরা একেবারেই অসম্ভব যে মাঝখান থেকে কিছু অংশ কাটা হয়েছে। ভিডিত তে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মাহি তার জন্মদাতা পিতাকে গু’লি করছে। উকিলের মাধ্যমে এজওয়ানের বেল হলো। সোলেমান এজওয়ানের শরীরের দিকে তাকাতেই রাগে তার হাত শক্ত হয়ে আসলো। হাঁটতে পারছে না ঠিক মতো। খোঁড়াচ্ছে। ঠোঁটের পাশে দাগ। সব মিলিয়ে বাজে অবস্থা। সোলেমান একবার হাবিবের দিকে তাকিয়ে এজওয়ান কে নিয়ে চলে গেলো।
তরিকুল চৌধুরীর জবানবন্দি তে মাহিকে গ্রেফতার করা হলো যা এজওয়ান এখনও জানে না। সুলতান নিবাসে ফিরেই সোলেমান শাসিয়েছে এজওয়ান কে। তার করা এসব ভুলের জন্য সোলেমান কে সাফার করতে হচ্ছে। আর সোলেমান এসব টলারেট করবে না দ্বিতীয় বার। বাশার সুলতান কে বলে দিলো এজওয়ান যেনো দ্বিতীয় বার একই ভুল রিপিট না করে।
বাশার সুলতান আশ্বাস দিতে পারলো না। সোলেমান চলে গেলো। বাশার সুলতান এজওয়ান কে বিছানায় ধরে বসিয়ে বলল-
-” সোলেমান ভীষণ রেগে আছে এজওয়ান। দয়া করে আর রাগাস না ওকে।। ভাইয়ের কথা গুলো শোন।
-” তার কথা শুনলে মাহি কে এনে দিবে?
-” আবার মাহির নাম মুখে তুলছিস! এজওয়ান বুদ্ধি সুদ্ধি কি সব লোপ পেয়েছে তোর?
-” রুম থেকে বের হও।
কথার প্রেক্ষিতে এমন কথা শুনে বাশার সুলতানের ভ্রু কুঁচকে আসলো।
-” কি?
-” বলেছি রুম থেকে বের হও। একা থাকতে দাও কিছুক্ষণ।
বাশার সুলতান তপ্ত শ্বাস ফেলে চলে গেলেন। বাশার সুলতান যেতেই এজওয়ান ফোন টা নিয়ে বাহাদুর কে ফোন করলো। বাহাদুর এজওয়ানের ফোন পেয়ে জিজ্ঞেস করলো-
-” ফিরেছিস বাসায়?
এজওয়ানের রাগ হলো বাহাদুরের গলা শুনে।
-” শা’লার ব্যাটা খোঁজ তো নিস নি আমার।
-” সারা রাত তোদের বাড়িতেই ছিলাম। ভিডিও এডিট করেছি।
-” কিসের ভিডিও?
-” কেনো জানিস না?
-” কিসের ভিডিও সেটা বল।
-” মাহি যে ওর বাবা কে খুন করেছে সেটার ভিডিও।
-” সেটাকে কি এডিট করেছিস?
-” সব কেটে-কুটে জাস্ট গুলি করার টা রেখেছি৷ এখন বোধহয় মাহি লোকাবে আছে।
-” লোকাবে আছে মানে!
-” তরিকুল চৌধুরী বয়ান দিয়েছে যে তার মেয়ে তাকে গুলি করেছে সেজন্য খু’নের দায়ে লোকাবে।
-” শালার ব্যাটা তুই সামনে আয় আমার,এডিটিং তর পা’ছা দিয়ে দিব। মাহিকে জেলে ঢুকালি কোন সাহসে?
-” আমি ঢুকাইছি নাকি? ঢুকাইছে তো ওর বাপে।
এজওয়ান ফোন টা কেটে দিলো। অসুস্থ শরীর নিয়েই উকিল নিয়ে থানায় গেলো। থানা থেকে জানানো হলো তরিকুল চৌধুরী অভিযোগ উঠালে তবেই ছাড়া হবে মাহিকে। এজওয়ান তরিকুল চৌধুরী কে ফোন দিলো সাইডে গিয়ে। আর বললো এখনই পুলিশের সাথে কথা বলে অভিযোগ তুলতে তা না হলে এবার গুলিটা এজওয়ান নিজে মেরে আসবে।
তরিকুল চৌধুরী পুলিশ কে দিতে বললো ফোন টা। এজওয়ান তাই করলো। তরিকুল চৌধুরী অভিযোগ উঠাতে বললে পুলিশ জানায় তরিকুল চৌধুরী কে নিজে থানায় আসতে হবে এবং তারপর ওঠাবে।
তরিকুল চৌধুরী কাল আসতে চাইলো। সেটা শুনে এজওয়ান ফোনটা কেড়ে নিয়ে দাঁত চেপে বলল-
-” এখনই আসবি তুই।
-” আমার অবস্থা তো জানো।
-” তোর অবস্থা জেনে আমার কাজ নেই। তোর একপা কবরে চলে গেলেও তোকে এখনই আসতে হবে।
তরিকুল চৌধুরী নিজের কোনো রিস্ক নিতে চাইলো না এজওয়ানের জন্য আর। সেজন্য অসুস্থ শরীর নিয়ে আসলো থানায়। এবং অভিযোগ উঠালো। থানার সব কাজ শেষ হতেই তরিকুল চৌধুরী চলে গেলো। এজওয়ান মাহি কে দেখতে চাইলো। মহিলা কনস্টেবল মাহিকে নিয়ে আসলো। মাহি লোকাব থেকে বের হয়েই সর্বপ্রথম দেখতে পেলো এজওয়ান কে। শরীরে বাজে অবস্থা। মাহি পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে এজওয়ান সামনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে পথ আঁটকে বলল-
-” সি,লুক অ্যাট মি। তোমার জন্য আমার কি হাল দেখছো?
মাহি দাঁত চেপে বলল-
-” মরে যেতে পারলেন না?
-” শ’য়তানদের মৃত্যু এত তাড়াতাড়ি হয় নাকি?
-” হয়, পথ ছাড়ুন। আপনার মতন নিকৃষ্ট লোক কে আমার চোখের সামনে দেখতে চাই না।
-” কিন্তু আমি তো দিন রাত ২৪ ঘন্টা থাকতে চাই তোমার সামনে৷
মাহি ধাক্কা দিয়ে চলে গেলো। থানার বাহিরে আসতেই দেখা হলো সাফওয়ানের সাথে। সাফওয়ান উকিল নিয়ে আসতেছিলো। বাহিরে মাহিকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। গালে আলতো করে হাত রেখে বলল-
-” ঠিক আছো তুমি?
-” হুম ঠিক আছি।
-” তোমার জামিন করালো কে?
মাহির পেছন থেকে এজওয়ান থানার দরজা দিয়ে বের হতে হতে বলল-
-” আমি করিয়েছি।
সাফওয়ানের চোখ মুখে রাগ ভেসে উঠলো। মাহির হাত ধরে এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” চলো।
চলে গেলো তারা। এজওয়ান দেখলো সেই চলে যাওয়া। তারপর মনে মনে বলল-
-” এই তো আর কয়টাদিন তারপর এই প্রেম ভালোবাসা চিরকালের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। তুমি মাহি সাপের লেজে পা দিয়েছো নিজ দায়িত্বে, আর সাপের ছোবল খাবে না তা কি করে হয়! তোমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল আমার সামনে আসা। আর এসেই নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনলে। তুমি বললে তোমাকে আমি ইহজনমে কেনো কোনো জনমেই চিনতে পারবো না। অথচ তোমাকে আমি এমন বাজে ভাবে চিনেছি যে তুমি তা কল্পনাও করতে পারবে না কখনও। এজওয়ান এমনি এমনি কাউকে চায় না। তুমি আমার জেদ এখন। তোমার জীবন নষ্ট করার জন্য দায়ী একমাত্র তুমি নিজেই৷ জাস্ট তচনচ করে দিব তোমার জীবন টা। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ।
এজওয়ান বাসায় ফিরলো। মাহি নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরেই খবর পেলো তার বোনের পেইন শুরু হয়েছে। এবং তাকে হসপিটালে নেওয়া হয়েছে। প্রেগন্যান্সি টা ভীষণ কম্পলিকেট ছিলো। ডেলিভারির ডেট আরো এক সপ্তাহ পরে ছিলো। মাহি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে সোজা হসপিটালে চলে যায়। হসপিটালের করিডরে দাঁড়িয়ে ছিলো শাকিল। মাহিকে দেখলো। মাহি এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
-” আপা কেমন আছে?
-” ভেতরে আছে৷ সার্জারী করাতে হচ্ছে।
-” কি করে হলো?
-” তোমার জন্যই হয়েছে৷ তোমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর টা শুনেই মোহনা অস্থির হয়ে গিয়েছিল৷ সেই চাপ থেকে ব্যথা শুরু হয়েছে।
মাহি নুইয়ে গেলো। নিজের উপর এত প্রেসার কেনো ক্রিয়েট করতে হবে বোনের?
দু ঘন্টা পর খবর জানানো হলো মেয়ে হয়েছে মোহনার৷ মা এবং মেয়ে দু’জনেই সুস্থ আছে।
মাহির অস্থির বুক টা এবার শান্ত হলো। যাক মা মেয়ে সুস্থ আছে। মেয়েটাকে নিয়ে শাকিলের কোলে দেওয়া হলো। মাহি পাশ থেকে দেখলো। ইশ কি আদুরে কিউট বাচ্চা। বাবার কোলে আছে অথচ তাকিয়ে আছে মাহির দিকে। মাহির ইচ্ছে করলো কোলে নিতে। কিন্তু চাইলো না। বাবা আগে তার মেয়েকে দুচোখ ভরে দেখুক।
মোহনা কে কেবিনে শিফট করা হয়েছে৷ এখনও সেন্স ফিরে নি। শাকিল বাচ্চা টাকে মাহির কোলে দিয়ে বাহিরে গেছে মেডিসিন সহ যাবতীয় জিনিসপত্র আনতে।
মাহি বাচ্চা টাকে কোলে নিয়ে মোহনার পাশেই বসে আছে। মাহি চুমু খেলো বাচ্চা টার। কানে কানে ফিসফিস করে বলল-
-” জান বাচ্চা টা তোমাকে স্বাগতম আমাদের জীবনে আসার জন্য। তোমার খালামনি সবসময় তোমার সাথে থাকবে। তোমাকে প্রটেক্ট করবে।
বাশার সুলতান এবার রাগের চরম পর্যায়ে চলে গেছে। ছেলে তার মাহিকে ছাড়িয়ে দিলো! এই মেয়ের জন্যই তো আজ ওর এমন অবস্থা তারপর ও নিজে গিয়ে বল করালো।
-” তোরে মনডায় কি চাচ্ছে করতে জানিস?
এজওয়ান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল-
-” জানার ইন্টারেস্ট নেই।
-” তা থাকবে কেনো? তোকে বলা হয়েছে ওর থেকে দূরে থাকতে? সোলেমানের কানে কিন্তু চলে গেছে এ খবর।
-” যাক। আমি না ছাড়ালেও ও মেয়ে বেরিয়ে আসতো নিজ থেকে।
-” কিভাবে?
এজওয়ান মাথার চুল গুলো ঠিক করে বলল-
-” তোমার না জানলেও চলবে।
সোলেমান নিজের বাগান বাড়িতে এসেছে আজ। ধবধবে সাদা একটা গরু ছিলো এখানে। যেটা সোলেমান আলাদা করে রেখেছিল কোরবানির জন্য। সেটাকে গাড়ি করে সুলতান ভিলায় পাঠালো ১০ টার দিকে। কোরবানি তে গিয়ে এটা কোরবানি দিবে। বাগান বাড়ির দোলনায় বসলো। অনেক দিন হলো বউয়ের সাথে তার কথা হয় না।
-” বুঝলি ইব্রাহিম বউকে একটা বাটন ফোন কিনে দিতে হবে৷ যাতে যখন তখন ফোন দিয়ে বউয়ের কন্ঠ শুনতে পারি। আজ অনেক দিন হলো কথাবার্তা হয় না।
ইব্রাহিম ভ্রু কুঁচকালো। তাই বলে বাটন ফোন কিনে দিবে!
-” বাটন ফোন!
-” হুমম।
-” স্মার্ট ফোন কিনে দিতে কি সমস্যা?
-” আজকাল কার যুগে স্মার্ট ফোন দিয়ে বিশ্বাস নেই। জাস্ট ইমাজিন স্মার্ট ফোন কিনে দিলাম বউকে,তারপর বউ আমার ফেসবুক খুললো,হোয়াটসঅ্যাপ খুললো, কলেজে যাওয়া শুরু করলো। কাউকে সত্যি সত্যি পছন্দ করে বসলো। টিনএজের মেয়েছেলে তো। হতেই পারে অস্বাভাবিক নয়। পরপুরুষের সাথে কথাবার্তা চলতে লাগলো। তারপর ফোনের মাধমে ভিডিও কলে কথা হচ্ছে তাদের মাঝে রাত জেগে। একে ওপর কে ছবি আদানপ্রদান করছে। বউ আমার, ফোনও আমার, আর সেই ফোনে বউ আমার প্রেমালাপ জুড়ছে আরেক ব্যাডার সাথে। তারপর দিন শেষে দেখা যাবে বউ আমার ভেগে গেছে পর পুরুষের সাথে ছ্যা। তখন আমি মুখ দেখাবো কি করে সমাজে! রিস্ক নেওয়ার কোনো মানে হয় বল তো? এমনিতেই তো হাজার চিন্তা মাথায়,তখন আরেক চিন্তা এসে জুটবে না?
ইব্রাহিম বুঝলো না সোলেমানের কথার মানে। কদিন আগেই না বউকে বলে আসলো বউয়ের কাউকে পছন্দ হলে সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিবে। আজ তাহলে মুখে অন্য কথা কেনো?
-” তুই না সেদিন তোর বউকে এই স্বাধীনতা দিয়ে এসেছিস। আজ তাহলে রিস্কের কথা বলছিস কেনো?
-” সিরিয়াসলি আমি বউয়ের আরেক বিয়ে দিব? হায়রে এত বড় মন আমার! এত সাধু পুরুষ আমি! ও মাই গড! কবে থেকে হলাম ভাই?
-” তুই কি মেহরিন কে ভালোবাসিস সোলেমান? সত্যি করে বলবি কিন্তু ।
সোলেমান আশেপাশে চোখ ঘুরালো। তারপর শান্ত গলায় বলল-
-” এটার উত্তর আমার নিজেরই জানা নেই। যেদিন জানবো সেদিন বলবো। তবে এভাবে বউ দেখতে গিয়ে পাল্টি খেয়ে যাব যে আসলেই ভাবতে পারি নি।
-” মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং আমারও হয়েছিল তোর বউ নিয়ে। আমিও ভেবেছিলাম ঊর্মি তোর বউ।
-” হু ইজ ঊর্মি?
-‘ তোর বউয়ের বান্ধবী।
-” বাব্বাহ নামও মনে আছে দেখি।
-” থাকবে না আবার? অসহায় ভেবে ত্রান দিয়েছিলাম সেদিন।
-” আবার নিজে অসহায় হয়ে যাইস না। এখন চুপ থাক বউয়ের সাথে কথা বলি আগে। আর তুই পাশ থেকে জেলাশ ফিল কর।
সোলেমান ফোন করলো রুমাইসা কে। গতকাল শুনেছে বউ তার এ বাড়ি এসেছে। রুমাইসা ভাইয়ের ফোন পেয়েই ফোন টা মেহরিন কে দিয়ে আসলো। মেহরিন স্কিনে দেখলো ভাইয়া লেখা নাম টা। অনেক দিন পর ফোন দিয়েছে। মনে পড়লো তাহলে আজ তার যে একটা বউ আছে? মেহরিন ফোনটা রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো-
-” আসসালামু আলাইকুম বিবিজান।
স্বামীর মুখে বিবিজান এই একটুকু শব্দ যেন একফোঁটা শীতল বাতাস হয়ে ছুঁয়ে গেল মেহরিনের অস্তিত্বজুড়ে। অবচেতনভাবে তার শরীর বেয়ে নেমে এলো এক প্রশান্তির স্রোত, যেমনটা হয় হেমন্তের শেষ বিকেলে হঠাৎ করে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পড়লে, অথবা শিশিরভেজা সকালে দূরের বাঁশবাগান থেকে ভেসে আসা পাখির মৃদু কূজনে। হৃদয়ের গভীরে ছড়িয়ে পড়লো এক মায়াবী আলো। কি যে ভালো লাগা কাজ করলো তখন,তা শব্দে বলা ভার। হয়তো এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে স্নিগ্ধ সম্বোধন। নাকি এর চেয়েও আরও কোনো স্নিগ্ধ ডাক আছে, যা সে এখনো শোনেনি?
মেহরিন মুখে হাসি ঝুলিয়ে জবাব দিলো-
-” ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছেন?
-” ভা…না না আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি৷ তুমি কেমন আছো?
-” জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।
-” কি করছো?
-” রুমে বসে আছি। আপনি?
-” হাওয়া খাচ্ছি দোলনায় বসে।
মেহরিন ভ্রু কুঁচকালো।
-” হাওয়া খাচ্ছেন?
-” হুমমম।
-” আমার জানা মতে তো হাওয়া খাওয়া যায় না।
-” কে বললো খাওয়া যায় না? তুমি তাহলে জানই না। তোমাকে শিখিয়ে দেই তাহলে৷ তুমি বাতাস গড়াগড়ি খাচ্ছে এমন জায়গায় দাঁড়াবে। তারপর দু হাত মেলে হা করে থাকবে। দেখবে বাতাস খাওয়া হচ্ছে।
মেহরিন শব্দ করে হাসলো এবার।
-” হাওয়ার সাথে সাথে পৃথিবীর সমস্ত ময়লা ধুলোবালি আমার পেটে চলে যাবে আপনার কথা শুনে এটা করলে।
সোলেমান এই প্রথম মেহরিনের হাসির শব্দ শুনতে পেলো। আহা কি চমৎকার সেই হাসির শব্দ।
-” মেহরিন শব্দ করে হাসবে না একদম।
সোলেমানের এমন গম্ভীর সুরে বলা কথাটা শুনে মেহরিন ভীত হয়ে গেলো।
-” আমার হাসির শব্দ বাজে শোনায়?
-” ভীষণ বাজে লাগে…..তবে হাসির শব্দে না।
-” তাহলে বারন করলেন যে?
-” বুকের ভেতর ছলাৎ করে উঠে। আজ একটা জিনিস পাঠানো হচ্ছে সুলতান ভিলায়।
-” কি?
-” গরু। ভালোমতো খেয়াল রাখবে তার বুঝেছো?
-” আচ্ছা।
-” আর হ্যাঁ শোনো।
-” হুমম বলুন।
-” কোরবানি ঈদ টা তোমার সাথে কাটাবো।
মেহরিনের মুখ থ হয়ে গেলো। উনি আসবে বাড়িতে ঈদে!
-” আপনি আসবেন!
-” হুমম। বেশি খুশি হয়ো না। চাঁদ রাতে গিয়ে ঈদের পরের দিন চলে আসবো। আচ্ছা রাখছি তাহলে। নিজের খেয়াল রেখো,আর হ্যাঁ স্বামী কে নিয়ে চিন্তা কম করে পড়াশোনায় ফোকাস করো।
-” যাতে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে দিতে পারেন সেজন্য তাই তো?
সোলেমান হাসলো।
-” হ্যাঁ হ্যাঁ সেজন্যই।
-” আপনি আমাকে তালাক দিতে চেয়েছিলেন কেনো?
সোলেমানের কপালে দু ভাজ পড়লো।
-” কে বলেছে?
-” শুনেছি আমি।
-” কোনো একদিন নিরালায় বসে ধীরস্থির হয়ে চা খেতে খেতে বলবো এই কথা। আজ মুড নেই বলার।
-” আচ্ছা সাবধানে থাকবেন। রাখছি।
মেহরিন ফোন টা কেটে দিলো। ইব্রাহিম পাশ থেকে এতক্ষণ চুপচাপ শুনলো। বউয়ের সামনে তো সিংহ দেখছি নরম সফট এক হরিণ। কেউই বলবে না এই সোলেমান কে দেখে যে সে এক ভয়ঙ্কর মানব।
-” বউয়ের সামনে এত সফট তুই!
সোলেমান ফোন টা পকেটে ভরে বলল-
-” তাহলে তোর বউয়ের সামনে গিয়ে সফট হবো নাকি? ওপস মিস্টেক তোর তো বউই নেই।
-” বেশ পরিবর্তন হয়েছে তোর।
-” তাই না?
-” হুমমম।
-” বোকা ছেলে।
বিকেলের রোদটা ঠিক যেন সোনালি রঙে ধোয়া, গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আলো গলে এসে পড়েছে ধানমন্ডি লেকের বেঞ্চের ওপর। লেকের পানিতে সূর্যের প্রতিবিম্ব কাঁপছে হালকা বাতাসে। আশেপাশে মানুষের কোলাহল থাকলেও, একটা জায়গায় সময় থমকে গেছে সেখানেই বসে আছে মাহি সাফওয়ানের কাঁধে মাথা রেখে।
ঠিক ৪ বছর আগে আজকের দিনে তাদের দেখা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার কিংস ক্রস শহরে। সাফওয়ানের সেই দিন টা এখনও স্পষ্ট মনে আছে।
সেই দিন টা ছিলো মঙ্গলবার,সন্ধ্যা নামছিল। শহরটার রঙ তখন ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে,দিনের কোলাহল মিশে যাচ্ছে রাতের আলো-ছায়ায়। নানান ভাষার কথা ভাসছে রাস্তায়, ক্যাফেগুলোর ভেতর থেকে আসছে কফির গন্ধ, দূর থেকে ভেসে আসছে স্যাক্সোফোনের সুর। সিডনির কিংস ক্রস সবসময়ই একটু উচ্ছৃঙ্খল, একটু বেশি জীবন্ত।
এমন এক সন্ধ্যায় রাস্তার ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছিল মাহি।
ফেইড ব্লু ডেনিম, কালো টার্টলনেক টপ আর ওপরে একটা মাটিরঙা জ্যাকেট। চুলগুলো এলোমেলোভাবে বাধা, হাতে এক কাপ গরম কফি, কানে ইয়ারফোন তবে গানের দিকে মন নেই। চোখে তাকিয়ে ছিল সামনের রাস্তার আলোর ঝিলিকে।
সে তখন একা,ঠিক সেই সময় হঠাৎই ঘটে ঘটনাটা। একটা বাইসাইকেল হুড়মুড় করে চলে আসে পাশ দিয়ে, এবং হ্যাঁচকা টানে তার কাঁধের ব্যাগটা ছিনিয়ে নেয়। সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যায় যে মাহি শুধু হেই! বলে চিৎকার করেই থেমে যায়।
বাকি লোকজন শুধু তাকিয়ে থাকে, কেউ আগায় না। তবে ভিড়ের মধ্যে এক জন থামে না।
লম্বা, গাঢ় নীল সোয়েটশার্টে মোড়া এক ছেলেটা ততক্ষণে বাইকের পেছনে দৌড় শুরু করে দিয়েছে। মাহি হতবাক। তার চারপাশে শব্দ, আলো, শ্বাস-প্রশ্বাস, সব থেমে যায়।
শুধু দেখে ছেলেটা বাইকটার পেছনে ছুটে যাচ্ছে।
দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসে সে।
হাতে সেই ব্যাগটা।
হাপাতে হাপাতে এগিয়ে এসে বলে-
-“ আপনার ব্যাগটা…
মাহি কাঁধ উঁচিয়ে বলল-
-” থ্যাঙ্ক ইউ।
সাফওয়ান হা হয়ে তাকিয়ে রইলো মাহির দিকে। মনে হচ্ছে এই প্রথম কোনো এত সুন্দর নারী কে সে দেখলো যাকে দেখে তার হৃৎস্পন্দন টা থেকে গেলো।
-” ব্যাগ টা হারালে আমাকে ভীষণ বিপদে পড়তে হতো।
মাহির কথায় ঘোর ভাঙে সাফওয়ান কিছু বলার জন্য উদ্যোত হওয়ার আগেই মাহি ব্যাগটা চেক করতে করতে চলে গেলো। সাফওয়ান তপ্ত শ্বাস ফেললো। মেয়েটা এভাবে চলে গেল! নাম কি? থাকে কোথায় মেয়েটা? একটা কফি তো অফার করতে পারতো।
তাদের আবার দ্বিতীয় বার দেখা হয়। সাফওয়ান দ্বিতীয় বার মাহি কে দেখতে পাবে তা একদমই কল্পনা করতে পারে নি।
পরের দিন দুপুরে সিডনি, ডার্লিং হারবারে সাফওয়ান হেঁটে যাচ্ছিল। একা, হাতে একটা ছোট ক্যামেরা, চোখে হালকা ঘুমটান ক্লান্তি। হুট করে ছবি তোলার মাঝেই মাথা ঘোরাতেই আকস্মিক মাহিকে দেখতে পায়। গতকাল রাতে এমন ভাবে চেহারা টা মনে গেঁথে গিয়েছিল যে সাফওয়ান এক দেখাতেই চট করে চিনে ফেললো। মাহি বসে আছে কাঠের বেঞ্চে।
রোদে চোখ ঢেকেছে সানগ্লাসে, পাশে ব্যাগ, হাতে কফি। সাফওয়ান হাতের ক্যামেরা টা দিয়ে মাহির কয়েকটা ফটো তুলে নেয়। তারপর দুটো সেকেন্ড নিজের মনকে বোঝায় এগিয়ে যাবে কি যাবে না। মনকে শান্ত করে এগিয়ে গেলো। হাল্কা কেশে গলা ঝেড়ে বললো-
-” কেমন আছেন মিস?
মাহি চমকে তাকায়। চোখ সরু করে বলে,
-“সরি?
-” চিনতে পারেন নি আমায়?
-” আমাদের আগে কোথায় দেখা হয়েছিল?
-” এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন আমায় মিস? গতকাল রাতে যে আপনার ব্যাগ নিয়ে চলে গিয়েছিল দুষ্কৃতকারীরা তারপর কেউ একজন ব্যাগ টা নিয়ে আসলো।
-” আপনিই সেই লোক?
-” জ্বি। এবার চিনেছেন?
-” হুমম চিনলাম। ধন্যবাদ।
-” শুধু ধন্যবাদ দিলেন মিস? পাশে বসতে পারি?
-” জ্বি বসুন।
সাফওয়ান পাশে বসলো।
-” আপনার নাম কি?
মাহি কাটকাট জবাব দিলো-
-” নাম দিয়ে কাজ কি?
-” রুড হচ্ছেন মনে হচ্ছে? বিরক্ত আমার উপর?
-” না। মাহি, মাহি নাম আমার।
-” আমি সাফওয়ান। সাফওয়ান মির্জা। আপনি কি এখানেই থাকেন?
-” আপাতত এখানেই আছি।
-” তারপর কোথায় যাবেন?
-” ঠিক নেই। দেশ বিদেশ ঘুরি তো। কখন কোথায় যাই ঠিক থাকে না।
-” ভ্রমন পিপাসু আপনি?
-” জ্বি।
-” আপনার ফোন নম্বর টা পাওয়া যাবে? না মানে বুঝতে পারছি বিষয়টা অস্বাভাবিক লাগছে কিন্তু কিছু করার নেই। আপনার অসুবিধা না থাকলে দরকার নেই দেবার।
-” আমার ফোন নম্বরের ঠিক ঠিকানা নেই। বিভিন্ন কান্ট্রির বিভিন্ন নম্বর ইউজ করতে হয়৷ তাই পাবেন না আমায়।
-” হোয়াটসঅ্যাপ,ফেসবুক?
-” মাহি চৌধুরী লিখে সার্চ দিন৷ ব্লাকমুনের ছবি দেওয়া প্রোফাইলে। আসছি।
মাহি চলে গেলো। সাফওয়ান সার্চ করে অনেক নিচুতে গিয়ে এমন আইডি পেলো। ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠালো। অপেক্ষা করলো এক্সেপ্ট করার। কিন্তু সেদিন আর হলো না। টানা তিনদিন পর এক্সেপ্ট হলো। সাফওয়ান নিজে থেকেই আগ বাড়িয়ে মেসেজ দিয়েছিল। কথাবার্তা সাফওয়ান ই বেশি বলতো। কিংস ক্রসে এক সপ্তাহ কাটার পর বাংলাদেশে আসার দিন মাহির সাথে দেখা করে মাহির হোটেলে গিয়ে। মাহি জানতো না সাফওয়ান তার কাছে আসবে। সাফওয়ান মাহিকে সেদিন ফাস্ট জড়িয়ে ধরে তার মনের কথা বলে দেয়।
মাহি কিছুটা বিরক্ত প্রকাশ করেছিল। সাফওয়ান সময় দিয়েছিল। মাহি সম্মতি প্রকাশ করে এক বছর পরে। এবং শর্ত দেয়,তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন না করতে,এবং বেশি ডিস্টার্ব না করতে। সাফওয়ান তাতেই রাজি হয়। জীবনের প্রথম ভালো লাগা এটা। সাফওয়ান চায় পূর্ণতা পেতে। তাদের পরিচয়ের চার বছর হলেও তাদের প্রেমের সম্পর্ক ৩ বছরের। এই ৩ বছরে বোধহয় এইবারই তারা এত কাছাকাছি আসলো। তাছাড়া তো মাহিকে পাওয়াই যায় না। কখন কোথায় চলে যায়। ৪ বছরে সামনা-সামনি দেখা হয়েছে তা গনেই বলা যাবে৷ ১০ বারও হয় নি।
-” বাবুর নাম কি রাখা হলো মাহি?
সাফওয়ানের কথায় মাহি কাঁধ থেকে মাথা সরিয়ে সোজা হয়ে বসলো।
-” মায়া। মায়া ইসলাম।
-” নাইস নেম তো।
-” হুমম।
-” তুমি আছো কতদিনের জন্য বাংলাদেশে?
-” এবার লং টাইম থাকতে হবে।
-” সময়সীমা বাঁধা নেই?
-” না।
-” তাহলে আমরা মাস দুয়েকের মাঝে বিয়ে টা করে ফেলি?
-” তুমি ভেবে বিয়েতে আগাতে চাচ্ছো তো? দিনশেষে ঠকে গেলে কি হবে তখন?
সাফওয়ান মাহির হাত দুটো মুঠোয় নিলো। শান্ত গলায় বলল-
-” জানি ঠকাবে না আমায়। এটুকু বিশ্বাস আমার ভালোবাসা কে নিয়ে আছে আমার।
-” হাই লেভেলের কনফিডেন্স দেখছি তোমার।
-” তা তো আছেই।
-” শুনলাম তোমার বাবা রাজি না।
-” তাতে কি আসে যায়?
-” বাবার কথা শুনলেও তো পারো।
-” বাবার অনুমতি নিয়ে তো আর তোমায় ভালোবাসি নি। তাহলে এখন কেনো তার কথাকে প্রাধান্য দিব।
-” তাহলে আগামী চারদিনের মাঝে তোমায় আমায় বিয়ে করতে হবে। তোমার কোনো সমস্যা হবে?
-” সমস্যা তাও আবার আমার! কখনই না৷ আজ বললে আমি আজই করবো তোমায় বিয়ে।
-” আপু,আর ভাইয়ার সাথে কথা বলবে আগামীকাল। পরশু বিয়ে করবো আমরা। আর খুবই সাদামাটা ভাবে। কোনো আয়োজন হবে না। কাজি এসে বিয়ে পড়িয়ে দিবে।
-” ওকে,আমি চলে আসবো।
মাহি কিছুক্ষন চুপ থেকে তারপর মুচকি হাসলো। সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” তুমি চতুর প্রখর সিআইডি হলেও তুমি ভীষণ ইনোসেন্ট একটা পুরুষ জানো সেটা?
-” শুধু ইনোসেন্ট?
-” সাথে বোকাও।
-” তোমার কাছে সবই হতে পারি। আচ্ছা এজওয়ান কেনো তোমার পেছন লেগেছে বলোতো?
এজওয়ানের নাম শুনতেই মাহির মুখ কঠিন হয়ে আসে।
-” চরম লেভেলের বে’য়াদব একটা ছেলে সে। নারী বাজ।
-” নারীবাজ! তুমি জানলে কি করে?
মাহির মুখ নরম হয়ে আসলো।
-” কমনসেন্স থেকে জেনেছি। আমার যদি কখনও সুযোগ আসে তাহলে এটাকে গু’লি করে হ’ত্যা করতাম।
-” রিলাক্স। বাদ দাও। চলো বাসায় দিয়ে আসি।
-” না লাগবে না। তুমি চলে যাও। আমি একা যেতে পারবো।
-” আচ্ছা সাবধানে যেও। চলো রিকশাতে উঠিয়ে দেই।
একটা রিকশা ডেকে সাফওয়ান মাহি কে উঠিয়ে দিলো। তারপর সে তার নিজের গন্তব্যের দিকে চলে গেলো।
এজওয়ান বেলকনিতে বসে হুইস্কি খাচ্ছিলো। এরমধ্যে বাহাদুর খবর দিয়ে জানালো মাহির বড় বোনের মেয়ে বাচ্চা হয়েছে। এজওয়ান খবর টা শুনে খাওয়া থামিয়ে দিলো। গ্লাস টা নিচে নামিয়ে ভাবলো তার উচিত বাচ্চা টাকে দেখতে যাওয়া। হবু শালি বলে কথা। এজওয়ান জ্যাকেট টা গায়ে নিয়ে বেড়িয়ে গেলো।
শাকিল মেয়েকে কোলে নিয়ে মেয়ের সাথে কথা বলছিলো। অনেক সাধনার পর পেয়েছে তারা এই বাচ্চা। আকস্মিক দরজায় কলিংবেলের আওয়াজ শুনে মেয়েকে বউয়ের কাছে দিয়ে দরজার কাছে এসে দরজা খুলে দরজার পাশে এজওয়ান কে দেখে কিছুটা চমকে। মুখে হাসি আসছে না। তারপর ও হাসি টেনে বলল-
-” এজওয়ান তুমি!
এজওয়ান পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে বলল-
-” হুমম তোমার মেয়েকে দেখতে আসলাম।
-” আমার মেয়েকে দেখতে এসেছো মানে!
-” আহা আগে আনো তো তোমার মেয়েটা কে। তারপর তো বলছি।
শাকিল ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো। মুখে কিছুটা দুশ্চিন্তার রেশ। এজওয়ান শাকিল কে এখনও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফের বলল-
-” কি হলো? যাও নিয়ে আসো।
শাকিল বউয়ের কাছ থেকে মেয়েটাকে নিয়ে আসলো। এজওয়ান শাকিল কে মেয়ে নিয়ে আসতে দেখে প্যান্টের পকেট থেকে একটা জিনিস বের করলো। শাকিল পাশে বসতেই এজওয়ান হাতে থাকা জিনিস টা মেয়েটার গলায় পড়িয়ে দিলো।
শাকিল চমকে উঠলো। এজওয়ান চেন টা পড়ানোর শেষে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” নাম কি রেখেছো মেয়ের?
-” জ্বি মায়া ইসলাম।
-” মুখ জুড়ে মায়াই খেলা করছে। আমার পক্ষ থেকে তোমার মেয়ের জন্য এই স্বর্ণের চেন। বলবে তার খালুজান দিয়েছে তাকে।
-” খালুজান!
-” হ্যাঁ আমি ওর খালুজান। এখন উঠছি,মেয়েকে সাবধানে সতর্কতার সাথে বড় করো। যে অবস্থা আজকাল দেশের। কোথা থেকে কি হয়ে যায় বলা যায় না।
এজওয়ান চলে গেলো। শাকিল চেন টার দিকে তাকালো, পিউর গোল্ড। গোল্ডের মাঝে আবার ডায়মন্ডের স্টোন ও বসানো। দাম যে অনেক হবে সেটা বুঝা গেলো।
খুব ভোরে মেহরিন ফজরের নামাজ শেষ করে ছাঁদে হাঁটাচলা করছিলো। স্নিগ্ধ বাতাস,মেঘলা আকাশ,গুমোট পরিবেশ, আহা কি সুন্দর অনুভূতি। এ বাড়িতে কোনো ফুলের গাছ নেই। মেহরিন ঠিক করলো বেলি ফুলের চারা এনে লাগাবে একটা তার রুমের জানালার কাছে। গাছ টা বড় হলে যেনো বেলি ফুলের সুবাসে তার রুম টা ভরপুর থাকে। মেহরিন ছাঁদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ালো। পুরো বাড়ির চারপাশ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ পাঁচিলের বাহিরে সামন্তরাল মেঠোপথ। মেঠোপথের সামনেই সবুজ ঘাসের একটা ছোট খালি জায়গা৷ সেই খালি জায়গা শেষে বালুচর,আর বালুচর শেষে একটা ছোট নদী। নদীর তীরে সারি সারি নৌকা ভিড়ানো। যাত্রী রা পাড় হয়ে যায় নৌকা দিয়ে নদিটা। কি সুন্দর সেই জায়গা। তাকালেই চোখ ভরে যায়। মেহরিন ভাবছে একদিন যাবে সেই নদীর ধারে। কিছুক্ষণ একাকী বসে থাকবে বালুর চরে। নদীর পানিতে পা ভিজাবে।
কথাগুলো ভাবতেই মেহরিনের চোখ আঁটকে গেলো বাড়ির সামনের সরু মাটির রাস্তায়।
একজন বৃদ্ধ ডাকপিয়ন সাইকেল চালিয়ে চলে যাচ্ছেন সে পথে। গায়ে খাকি রঙের ইউনিফর্ম হাতা গুটানো শার্ট, সামান্য কুঁচকে থাকা প্যান্ট, মাথায় টুপিটা কিছুটা হেলে পড়েছে একপাশে। কাঁধে বাদামি রঙের মলিন চামড়ার ব্যাগ, যা সময়ের ভারে খানিকটা ঝুলে পড়েছে। সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে বাঁধা দু একটা খাম আর সরকারী কাগজপত্র।
লোকটার চলন ধীর, সাইকেলের চেইনের ঘর্ষণে একটানা শব্দ উঠছে ক্লিং-ক্লিং-ক্লিং…
মেহরিনের বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠলো।
একটানা কাজ করে যাওয়া এই মানুষটার বয়স কত? সত্তর হবে হয়তো। মজবুত শরীর নয়, বরং হাড়গোড় বেরিয়ে থাকা পাতলা শরীর। তবুও দায়িত্বে ঘাটতি নেই। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়, কোনো কিছুই হয়তো তাকে থামাতে পারে না। তা না হলে এত ভোরে কেউ বের হয়? অফিস তো খোলে ৯ টার দিকে।
মেহরিন আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত নিচে নামলো। মাথার ওড়না টেনে একটু বড় করলো, একপাশ দিয়ে মুখটা ঢেকে ফেললো। তারপর আঙিনা পেরিয়ে রাস্তায় বের হয়ে গলা ছেড়ে ডাকলো-
-“চাচা! একটু দাঁড়ান না!
বৃদ্ধ লোকটা হঠাৎ পেছনে ফিরে তাকালেন। কণ্ঠটা চেনা নয়, কিন্তু কাঁধে ঝোলা ব্যাগের ওজন সামলে সাইকেলটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মেহরিনকে এগিয়ে আসতে দেখে তিনি সাইকেল থেকে নামলেন না, শুধু দাঁড়িয়ে রইলেন।
মেহরিন কাছে যেতেই তিনি এক দৃষ্টিতে তাকালেন ওর মুখের দিকে।
-“কিছু বলবা মা? নরম কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন ডাকপিয়ন।
-” হ্যাঁ চাচা, মেহরিন হালকা শ্বাস নিয়ে বললো। -” চিঠি পাঠাতে চাই, চিঠি কোথায় কোথায় পাঠানো যায়?
-” তুমি যেই জায়গায় পাঠাতে চাইবা, সেখানেই পাঠানো যাবে মা।
চোখেমুখে কোনো বিরক্তি নেই তার, বরং শান্ত এক ধৈর্য।
-” ঢাকায় পাঠানো যাবে?
-” “হ যাবে। বাংলাদেশে যেকোনো জায়গায় পাঠানো যায়।
-”তাহলে একটা চিঠি পাঠিয়ে দিবেন চাচা?
-” নিশ্চয় দিব। কবে দিবা?
-” কাল।
-” আচ্ছা। রেডি কইরা রাইখো। আমি আইসা নিয়ে যামু। ওই যে বড় বাড়িটা,সেখানেই তো থাকো না?
-” হ্যাঁ চাচা।
-” আচ্ছা। চিনে রাখলাম। কাল আসব।
মেহরিন একটু হাসলো, খুব মৃদু হাসি।
দাহশয্যা পর্ব ১৯
-” আচ্ছা চাচা। আল্লাহ হাফেজ।
-” আল্লাহ হাফেজ মা।
বলেই ধীরে ধীরে আবার প্যাডেল ঘুরাতে লাগলেন ডাকপিয়ন।
সাইকেলটা আবার ছুটলো সরু পথে। মেহরিন স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। একজন মানুষ, বয়সের ভার, ক্লান্ত শরীর তবুও প্রতিদিন মানুষের অপেক্ষার ভার কাঁধে নিয়ে চলে যান নিজের দায়িত্বের গন্তব্যে। আচ্ছা ব্যাগ গুলোর মাঝে কত গুলো চিঠি থাকতে পারে? প্রতিটি চিঠির ভেতর লুকিয়ে আছে কি একেক জনের জীবনের অসংখ্য গল্প? কোনোটা সুখের, কোনোটা দুঃখের, আবার কোনোটা অব্যক্ত ভালোবাসার?
