দাহশয্যা পর্ব ৩
Raiha Zubair Ripti
কালো মেঘে ঢাকা মহাদেবপুরের অলংকারপুর গ্রামটা। যেন এক গভীর নিরবতার মধ্যে ঢেকে গেছে। আকাশে উড়ন্ত চিলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েক দল বাউণ্ডুলে মেঘ। চারপাশে অন্ধকার টা যেন এক অসীম শূন্যতার মতো গ্রামটিকে চেপে ধরে আছে। খালের পানি পূর্ণ, বর্ষার বৃষ্টি তার অভ্যন্তরে জমে থাকা স্রোতের সুরে ধ্বনিত হচ্ছে। পানির ওপর ভাসমান পাতাগুলো একে একে আসছে এবং চলে যাচ্ছে, যেন জীবনের মতোই এক প্রকার অনিশ্চিত পথ।
পথের সীমানা ঘিরে অন্ধকারের এক ঝাপসা অবয়ব দাঁড়িয়ে, বাতাসে মিশে থাকা মেঘের গর্জন গ্রামটির হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। গাছপালা যেন নিজস্ব কাঁপনে মিশে গেছে অমাবশ্যার রাতের অন্ধকারের মতো। বর্ষার জল থমকে দাঁড়িয়ে আছে, ভিজে গাছের ডালগুলো নিচে ঝুঁকে পড়ছে। গ্রামের পুরনো বাড়িগুলোও যেন তাদের আঁধারে নিজেকে লুকিয়ে রাখছে, কিছুটা ভাঙা, কিছুটা চুপচাপ। পানিতে দু পা ডুবিয়ে নৌকায় বসে আছে মেহরিন। পাশেই বসা প্রাণ প্রিয় বান্ধবী ঊর্মি। ঊর্মি কিছুক্ষণ হলো জেনেছে ২৫ তারিখে এই মেয়েটির বিয়ে। ইশ মেয়েটাকে ছাড়া সে থাকবে কি করে? ও কি শ্বশুর বাড়ি গিয়ে ভুলে যাবে তার সখী কে? কথাটা ভাবতেই বুক জুড়ে বয়ে গেলো এক চাপা ব্যথা। দু হাতে মেহরিন কে জড়িয়ে ধরে বলল-
-“ স্বামীর বাড়ি গিয়ে ভুলে যাস না আমাকে মেহু।
মেহরিন হাসলো। হাসিটায় কি ছিলো? কষ্ট নাকি অভিমান বোঝা গেলো না। ঊর্মির চুলের ভাজে হাত রেখে বলল-
-“ জীবনেও ভুলবো না তোকে ঊর্মিমালা। ভীষণ ভালোবাসি তোকে।
-“ আমিও মেহু। তোর বিয়ের কথা শুনেই আমার বুক অসার হয়ে আসছে।” কথাটা বলেই ঊর্মি মেহরিন কে ছেড়ে মুখের দিকে তাকিয়ে বলল- “ দুলা ভাই কেমন মেহু? অনেক সুন্দর তাই না? নাম কি? কোথায় থাকে? তোর সাথে আমাকে মাঝেমধ্যে দেখা করতে দিবে তো?
মেহুর মুখের হাসি প্রসারিত হলো।
-“ দেখিনি আমি তাকে।
-“ সে কি দেখিস নি?
-“ উঁহু।
-“ নাম কি তার?
-“ জানি না।
-“ কি জানিস তাহলে?
-“ শুধু জানি সে আমার থেকে বয়সে ১৫ বছরের বড়। আপার শ্বশুর বাড়ির পাশের এলাকায় তাদের বাড়ি। আর লোকটা রাজনীতি করে ঢাকায়।
ঊর্মির মুখ চুপসে গেলো। মন খারাপ করে বলল-
-“ আঙ্কেল শেষ অব্দি তোর বিয়ে এক বুড়ো লোকের সাথে ঠিক করলো! আর তুইও রাজি হয়ে গেলি? পড়াশোনা করতে দিবে তো? এরচেয়ে আমার ভাইয়ের বউ হয়ে যেতি।
মেহরিন হাসলো।
-“ আপা বলেছে আব্বা কথা বলছে এটা নিয়ে। তারা বলেছে আমাকে পড়াবে। আর বয়স তো কেবল একটা সংখ্যা। লোকটা ভালো আর সৎ হলে কাটিয়ে দেওয়াই যায়।
-“ লোকে কি বলবে জানিস? বলবে বাবার বয়সী লোকের সাথে তোর বিয়ে ঠিক হয়েছে।
-“ তেমন তো আহামরি বয়স না তার। কত হবে ৩২ বোধহয়।
-“ তোর বয়স কত জানিস? ১৭।
-“ বয়স ডাজেন্ট ম্যাটার৷ মনের মিল. একে ওপরের প্রতি শ্রদ্ধা বিশ্বাস এসবই ম্যাটার করে।
-“ হয়েছে, বিয়ে হয় নি তাকে দেখিসও নি। নামও জানিস না আর তাতেই এত স্বামী ভক্ত। পরে তো দেখা যাবে স্বামী বলতে অজ্ঞান হয়ে যাবি।
মেহরিন হেঁসে ফেললো শব্দ করে। ঊর্মি দেখলো সেই হাসি। মেয়েটা হাসলে কতই না সুন্দর লাগে।
-” স্বামী বড়ো ধন আজীবনের বন্ধন বুঝলি? আম্মাকে দেখি তো আব্বার প্রতি তার কত ভালোবাসা। তাহলে আমি কেনো বাসবো না ভালো আমার স্বামী কে।
-“ বিয়ে অব্দি তো অপেক্ষা করতেই পারতি।
-“ অপেক্ষা!” নাম টা বিরবির করে উচ্চারণ করলো মেহরিন। লোকটার নামও সে অপেক্ষা রেখেছে।
-“ আচ্ছা বল তোর ভাইয়ে খবর কি? চাকরি হয়েছে?
ঊর্মি মন খারাপ করে বলল-
-” এখনও হয় নি। চেষ্টা করছে।
-“ ইনশাআল্লাহ হয়ে যাবে। বাড়ি যাবি?
-“ না সন্ধ্যা হয়ে আসলো। অন্য দিন যাব নি।
-“ আচ্ছা তাহলে গেলাম।
-“ কি হয় জানাস আমাকে। আচ্ছা লোকটার ফোন নম্বর রাখিস নি?
-“ না।
-“ বলদ নাকি তুই। আচ্ছা বাড়ি যা৷ রাতে কথা বলবো নি।
বাসায় ফিরতে ফিরতেই সন্ধ্যা নেমে আসে। আকাশে সূর্য ডুবন্ত, অন্ধকারের আগে দিনের শেষ আলো মাখানো। আশেপাশ থেকে ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ ভেসে আসছে। কানে বাজে, যেন এক মেলোডি, যা থামে না। হালকা শীতল বাতাসে সেই আওয়াজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ডোবা থেকে ধান পচার বিদঘুটে এক গন্ধ ভেসে আসছে, কাঁঠালগাছের শাখা-প্রশাখা যেন বাতাসের সাথে মিশে সুর তুলছে।
এর মধ্যে হঠাৎ, এলোমেলো হয়ে ওঠে পরিবেশ। পরিবেশের আগাম বার্তা বুঝেই কারেন্ট চলে যায়। পুরো বাড়ি অন্ধকারে কিছুক্ষণ ডুবে থাকে। মেহরিন মায়ের বাটন ফোনটা বের করে টর্চ জ্বালিয়ে রুমে আসে। বড় বোন সেরিন হারিকেন জ্বালায়। পুরো রুম হলদেটে আলোয় জ্বলে ওঠে, ছোট ছোট শিখা ঝলমলিয়ে উঠেছে অন্ধকারে। বোন কে দেখে সেরিন বলল-
-“ কটা দিন একটু বাহিরে কম বের হোস মেহু। আর সন্ধ্যা হলে তো বেরই হবি না বাসা থেকে।
সেরিন হারিকেন টা নিয়ে বাড়ির বারান্দায় আসলো। হারিকেনের আলোতে বারান্দা আলোকিত হলো। সানজিদা বেগম রুম থেকে বের হলেন পাটি নিয়ে। মোতালেব ভুঁইয়া এখনও বাড়ি ফিরে নি। কখন ফিরবেন জানা নেই। পাটি টা বিছিয়ে তাতে বসলেন। মেহরিন রুম থেকে বের হয়ে মায়ের কোলে মাথাটা রেখে শুয়ে পড়লো পাটিতে। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। সানজিদা বেগম মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল-
-“ গতকাল বাজার থেকে শাড়ি কিনে এনেছি তোর জন্য। তোর বাপ নিজে পছন্দ করে কিনে দিয়েছে। দেখবি?
মেহরিন হাসলো। বাধ্য মেয়ের মতো উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে জানালো সে দেখবে। সানজিদা বেগম সেরিন কে বলল শাড়ি টা নিয়ে আসতে। সেরিন মায়ের রুম থেকে শাড়ি টা নিয়ে আসলো। সানজিদা বেগম খুলে দেখালেন শাড়ি টা। মেহরিন শাড়ির দিকে তাকাতে ভুলেই গেলো মায়ের মুখে হাসি দেখে। মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলো তার বাবা মায়ের প্রতিটি দিন এমন হাসি মুখেই কাটুক। খুবই সাধারণের মাঝে অসাধারণ এই মানুষ গুলো। মেহরিন প্রতি নিয়ত নামাজে শুকরিয়া আদায় করে আল্লাহর কাছে এমন দুটো মানুষ কে তার বাবা মা বানিয়ে দেওয়ার জন্য৷ নিজেকে সুখী সুখী লাগে মেহরিনের।
-“ পছন্দ হয়েছে?
মেহরিন শাড়ির দিকে এক নজর তাকিয়ে বলল-
-“ খুউউব। ” কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফের মেহরিন বলে উঠল- “ একটু জড়িয়ে ধরি তোমাকে মা?”
সানজিদা বেগম হাসলেন।
-“ অনুমতি নেওয়ার কি আছে। আয়।
মেহরিন ন্যানো সেকেন্ড সময় ও ব্যয় করলো না। মাকে জড়িয়ে ধরলো। নোনাজল গড়ালো চোখ বেয়ে। কি করে থাকবে তার বাবা মা কে ছেড়ে সে?
সানজিদা বেগম কাঁধে ভেজা অনুভব হতেই মেহরিনের মাথায় হাত রেখে বলল-
-“ কাঁদছিস?
-“ তোমাদের খুব মনে পড়বে আমার মা।
-“ পাগলি মেয়ে। কাছেই তো বাড়ি। যখন খুশি ফোন করবি তোর বাবা কে পাঠিয়ে দিব নিয়ে আসার জন্য।
মেহরিন চুপ করে থাকলো। কথা বলে মোটেও এই সময়টাকে নষ্ট করতে চায় না। মায়ের বুকে মাথা রেখে পাওয়া শান্তিটার মূহুর্ত থাক না এমনই নিশ্চুপ।
-” মেহু আমাদের কিন্তু একটু ঢাকায় যেতে হবে।
মেহরিন মাথা উঁচু করে বলল-
-” কেনো মা?
-” তোর খালার বাসায়। আর ভুলে গেছিস তোর বাবাকে ডাক্তার ও দেখাতে হবে।
-” ওহ্ একদম ভুলে গেছি। কবে যাবে?
-” সামনের সপ্তাহে।
-” মা একটা কথা বলি।
-” বল।
-” ঊর্মি কেও সাথে নিয়ে যাই? ও কখনও ঢাকা যায় নি। ওর খুব ইচ্ছে ঢাকা দেখার। নিয়ে যাই না।
-” ওর মা যদি যেতে দেয় তাহলে নিয়ে চল।
মেহরিন মাকে আবার জড়িয়ে ধরলো। গালে চুমু খেয়ে বলল-
-” ইউ আর দ্যা বেস্ট মা।
পড়ন্ত বিকেলের রোদ যখন কোমল হয়ে আসে, সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ে, তখন চারপাশে একটা মায়াবী স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে। দিনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়, বাতাসের মধ্যে অলসতা মেশানো এক মধুর বিষাদ ছড়িয়ে পড়ে।
গ্রামের পথ ধরে গরু-ছাগল ফিরতে থাকে আপন গৃহে, নদীর ধারে জেলেরা নৌকা বাঁধে, কাশবনের ফাঁক দিয়ে অস্তগামী সূর্য জলসীমায় লালচে আভা ছড়িয়ে দেয়। পুরনো আমগাছের ছায়ায় বসলে মনে হয়, সময় যেন থমকে আছে, কেবল বাতাসের দোলায় হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতি এসে মনের দরজায় কড়া নাড়ে।
কিন্তু শহরের পরন্ত বিকেল ভিন্ন এক রঙে আঁকা। এখানে বিকেল মানেই ব্যস্ততার বিরতি, দিনের ক্লান্তি সরিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়। অফিসফেরত মানুষের ভিড়ে ফুটপাত গমগম করে, রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে জমে আড্ডা। ট্র্যাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির হেডলাইটে সূর্যাস্তের আভা মিশে যায়। পার্কে বসে গল্পে মেতে ওঠে বন্ধুরা, কেউ বা নির্জনে কানে হেডফোন গুঁজে হারিয়ে যায় নিজের জগতে।
শহরের পরন্ত বিকেল কোলাহলময়, কিন্তু তার মাঝেও এক ধরনের প্রশান্তি আছে—নিয়মের মধ্যে বন্দি এক শান্তি, একটুখানি অবসর।
ঢাকার জনসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে সমস্যাও। পানি সংকট, যানজট, বায়ুদূষণ—এসব তো আছেই, তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বৃষ্টির পর রাস্তাগুলো জলমগ্ন হয়ে পড়া। দুপুরে সংসদ অধিবেশনে গিয়ে কেবল বাড়ি ফিরলো সোলেমান। গত সপ্তাহে খবর পেছে সে এলাকার কিছু লোক ক্লাবে এসে জানিয়ে গেছে
এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। আর ফুটপাত দখল হয়ে গেছে। হাঁটতে গেলেই রাস্তায় নামতে হয়, গাড়ির ধাক্কা লাগার ভয় থাকে! তারা এও বলেছে যে
— “শুধু ভোটের সময় আসে, তারপর কারও খবর থাকে না!
ইব্রাহিম মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনে, সব অভিযোগ নোট করে রেখেছিল। এলাকাবাসী দের আস্বস্ত করে বলেছি তাদের এমপি সংসদ অধিবেশনে বিষয়টা তুলে ধরবে অতিদ্রুত , আর সাথে সাথে ব্যবস্থা নিতে বলবে।
আজ সোলেমান সংসদ অধিবেশনে গিয়েছিল এটার জন্যই। সিটি করপোরেশনের মেয়র ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা আলোচনা করে জানিয়েছে সামনের সপ্তাহের মধ্যেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার করা হবে আর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে। আর ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন পাবে।
ক্লান্ত দেহ টাকে টেনে পাশে বসে থাকা ইব্রাহিমের দিকে তাকালো সোলেমান। গম্ভীর গলায় বলল-
-“ ইয়াসিন কে মোবাইলে কল লাগা তো। ওর ঈদ খাওয়া কি এখনও শেষ হয় নাই নাকি। নাকি ঈদের নাম করে হা’ঙ্গা করতে গেছে ? আজকের রাতের মধ্যেই ঢাকায় আসতে বল ওরে।
ইব্রাহিম মাথা নেড়ে বলল-
-“ সে না হয় বলছি আসতে। তুই বরং ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নে। শুনলাম তুই বাড়ি যাবি তা আসবি কবে?
সোলেমানের কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো।
-“ বাড়ি যাব কেনো?
-“ তোর নাকি বিয়ে শুনলাম।
সোলেমানের মনে পড়লো।
-” বিয়ে টা আমি করছি না।
-” কিন্তু কেনো?
-” কেনো তা তুই ভালো করেই জানিস। আমাদের বিয়ে করার অধিকার নেই। আমরা শুধু ফুলের সুভাস নিতে পারি কিন্তু নিজ বাড়িতে সেই ফুলের গাছ স্থাপন করতে পারি না। এ ঘোর অন্যায়।
-” ঘরের জন্য ঘরণী লাগবে না?
-” নাহ্ আমার ঘর ঘরণী ছাড়াই সুন্দর। ঘরণী আসলে ঘরে আমার শোকের ছায়া বইবে।
-” তোর মা তো ডেট ফিক্সড করে রেখেছে। না গেলে মানসম্মান কি থাকবে আর?
-” তোর এত মায়া লাগলে তুই গিয়ে কর বিয়ে জ্ঞানের ভাণ্ডারের নাতি।
কথাটা বলে উঠে চলে গেলো রুমে সোলেমান । লম্বা একটা শাওয়ার নিলো। ড্রয়িং রুমে ম্যেড ফ্লোর পরিষ্কার করছে। ম্যেড সোলেমান কে দেখে সালাম দিলো। সালামের জবাব দিয়ে সোলেমান জিজ্ঞেস করে-
-“ চাচা কি বাসায় নেই? রুমে নেই দেখলাম যে।
-“ স্টাডি রুমে আছেন স্যার।
সোলেমান সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে করিডর পেরিয়ে একেবারে শেষ মাথায় থাকা স্টাডি রুমে গেলো। পুরো রুম জুড়ে বই আর বই। শেষের এক টেবিলের সামনে বসে খুব মনোযোগ সহকারে বই পড়ছে বাশার সুলতান । বাশার সুলতান আবার ভীষণ বই প্রেমিক মানুষ। তার সংগ্রহে বুকসেল্ফে না হলেও হাজার খানেকের উপরে হবে বই আছে। মাঝেমধ্যে সোলেমান কে বই পড়তে বলে বাশার সুলতান । আগে অবশ্য সোলেমান নিজেও বই প্রেমি ছিলো যখন রাজনীতি মারপিট বুঝতো না বয়স অল্প ছিলো । রাত জেগে বই পড়তো। কোনো একজন কে রাত জেগে কবিতা পড়ে শুনাতো।বই প্রেমি হয়েছিল সেই মানুষটার জন্যই। লোকে বলে বই প্রেমি মানুষদের নাকি মন স্বভাব সব স্বচ্ছ থাকে। কিন্তু একজন না অনেক জনই তা ভুল প্রমাণ করে দিলো। সেই দলে সোলেমান স্বয়ং নিজেও। এখন এক যুগের বেশি হলো সোলেমান বই ছুঁয়ে দেখে না। চাচাকে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার জন্য সোলেমান কেশে নিলো। বাশার সুলতান বইটা বন্ধ করে পেছন ফিরলো। ইশারায় পাশে এসে বসতে বলল সোলেমান কে। সোলেমান চেয়ার টেনে বসলো।
-“ দেখা করতে বলেছিলে।
-“ হু খুব ব্যস্ত ছিলে নাকি?
-“ হ্যাঁ তেমন টাই।
-“ শুনলাম মহসিন আলী বাগড়া দিচ্ছিলো সংসদে।
-“ হ্যাঁ তবে টিকতে পারে নি।
-“ তোর সামনে টিকতেও পারবে না এ আমি বেশ জানি। তা যা বলার জন্য আসতে বলা তোকে।
-“ বলো। সেটা শুনতেই আসা।
-“ আমি কদিনের জন্য বাড়ি যাচ্ছি সামনের সপ্তাহে। তোকে সাথে করে নিয়ে যেতে বলেছে। এখন তোকে তো আর হাত পা বেঁধে সাথে নিয়ে যেতে পারি না। যাবি আমার সাথে?
সোলেমান ঠিক বুঝতে পেরেছিল এমন কিছু কথাই তার চাচা বলবে। সেজন্য গতকাল আসে নি।
-“ আপাতত ব্যস্ত সময় যাচ্ছে আমার। যেতে পারবো না। সামনে এক সভা আছে ছেলেপেলের। ওখানে উপস্থিত থাকতে হবে। তার উপর আবার ত্রাণ বিতরণও করতে হবে।
-“ সামনে তোর বিয়ে সোলেমান। মেয়েটাকে দেখে তো নে।
-“ দেখার মুড নেই।
-“ তারমানে আমার সাথে যাচ্ছিস না?
-“ না।
-“ তাহলে যাবি কবে?
-“ জানি না। এজওয়ান কোথায়? ওকে আজকাল দেখা যায় না কেনো?
-” ও ঢাকার ভেতরে থাকলে তো দেখবি।
-” কোথায় গেছে?
-” চট্টগ্রাম।
-” ওহ্ আচ্ছা,একটু সাবধানে চলাফেরা করতে বলো ওকে। এজওয়ানের জন্য আমাকে বেশ বিপদে পড়তে হয়।
-” তারজন্য তো আমিও কম বিপদে পড়ি নি। ছেলেটা এমন হয়েছে যে ঘাড়ত্যাড়া।
-” ঘাড় সোজা করতে বলো। আমার চেয়ে নিশ্চয়ই বেশি ঘাড়ত্যাড়া নয় সে।
-” তুই বলে দেখ। তোকে মানে, আমাকে তো মানেই না।
-” কেমন বাবা তুমি যে ছেলে তোমাকে মানে না?
-” তোরই তো ভাই। তোর মতই হয়েছে। শুধু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য টাই পায় নি। তাছাড়া সব পেয়েছে।
-” ওটাই চেঞ্জ করতে বলো। ওর ওটার জন্যই আমাকে সমস্যায় পড়তে হয়। এখন আসছি। ওকে তাড়াতাড়ি চট্টগ্রাম থেকে ফিরতে বলো ঘোরাঘুরি শেষ হলে।
সোলেমান উঠে দাঁড়ালো। চলে যেতে নিলে বাশার সুলতান বলল-
দাহশয্যা পর্ব ২
-“ কোথাও যাচ্ছিস?
-“ হু।
-” কোথায়?
-” বেডে লম্বা একটা ঘুম দিতে।
-“ আচ্ছা গিয়ে ঘুমা। সকালে দেখা হবে।
