দাহশয্যা পর্ব ৫০
Raiha Zubair Ripti
রাত তিনটার দিকে একটা ফোন কল আসলো। ফোনের ওপাশ থেকে জানানো হলো—
“ কাঙ্ক্ষিত নারী টির খোঁজ পাওয়া গেছে। তাকে কি করবো আমরা?”
ফোনের এপাশ থেকে কেউ একজন বলল—
“ জায়গা মতো চালান করে দেওয়ার ব্যবস্থা কর। বাংলাদেশের ত্রিসীমানায় যেন না দেখি। তারপর বাকিটা আমি দেখছি। ভেবেছি ম’রে যাবে। কিন্তু না কৈ মাছের প্রাণ এখনও ম’রার নাম ও নিচ্ছে না! ওকে দেশে নিয়ে আসাটাই ভুল হয়েছে। ঐ দেশেই বন্ধ করে রাখা উচিত ছিলো পতিতা-দের ওখানে ।”
ফোনটা কেটে গেলো।
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকার শাহবাগে নতুন বিল্ডিংয়ের উদ্বোধন করা হয়।
নাম ইনফিনিটি গ্লোবাল লজিস্টিক কর্পোরেশন।
সিউলের হেডকোয়ার্টারের কাঁচের টাওয়ার সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। লবিতে মার্বেল ফ্লোর, ঝলমলে লাইট আর দেয়ালে বিশ্বের বড় বড় শহরের ছবি দুবাই, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, সিঙ্গাপুর, সিডনি, জেনেভা, চট্রগ্রাম প্রতিটি ছবি কোম্পানির আন্তর্জাতিক উপস্থিতির প্রমাণ।
ইনফিনিটি গ্লোবাল মূলত একটি আন্তর্জাতিক শিপিং ও লজিস্টিক কর্পোরেশন। তারা পণ্য উৎপাদক থেকে গ্রাহকের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত সম্পূর্ণ লজিস্টিক চেইন তৈরি করে।
এয়ার কার্গো, সি কার্গো, ট্রান্সপোর্ট সবই তাদের নিয়ন্ত্রণে। গুদাম, লজিস্টিক হাব, অফিস প্রতিটি জায়গা নিখুঁতভাবে পরিচালিত।
কর্মীরা প্রতিদিন একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে। অফিসে কাস্টমার সার্ভিস চ্যাটে নতুন ক্লায়েন্টের চাহিদা জানে, হিসাব বিভাগ পেমেন্ট নিশ্চিত করে, মার্কেটিং দল আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের সঙ্গে চুক্তি সই করায়। পোর্ট ও গুদামে কর্মীরা পণ্য লোড-আনলোড করে, স্টক আপডেট রাখে, এবং জাহাজ, ট্রাক, বা এয়ার কার্গো নির্ভুলভাবে চালনা হয়।
প্রতিটি শাখা দক্ষ কর্মীদের দিয়ে পূর্ণ। তারা জানে, প্রতিটি শিপমেন্ট ঠিক সময়ে পৌঁছানো, ক্লায়েন্টের আস্থা বজায় রাখা, আর আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা ইনফিনিটির পরিচয়।
ঢাকার এই অফিসের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এজওয়ান কে। এজওয়ান সিও।
এজওয়ান চায় নি এই সব অফিস টফিসের দায়িত্ব নিতে কিন্তু ভাইজানের ভয়ে না ও করতে পারে নি।
তার সাথে তার বাপ ও ছিলো। পুরাই র’ক্তের শত্রু। ভাইজান কে খেঁপিয়ে দিয়ে বলে—
“ সারাদিন বউয়ের সাথে না চিপকে অফিস সামলা। অন্তত দুমুঠো ভাত পাবি। মাইনসে আর বিয়ে করে নি? এক ছেলে বউ দূরে রেখে এলাকা সহ দেশ বিদেশ ভেজে খাচ্ছে আর আরেক পোলা রুম থেকেই বের হয় না বউ রেখে। কি আশ্চর্য রকমের ভণ্ড আমার ছেলে।”
এজওয়ান সোলেমান সামনে থাকায় শুধু গিলে গেছে কথা। এজওয়ান ভাইকে বলেছে —
“ ভাই মাহি কেও নেই আমার সাথে? কোনো একটা নিম্ন পদ দিয়ে দাও মাহি কে। বউ কে ছাড়া সারাদিন থাকবো কি করে আমি? ”
সোলেমান ভ্রু কুঁচকে জানতে চায় —
“ এডুকেশন কোয়ালিটি কি?”
এজওয়ান নিজেও তো জানে না। কি কোয়ালিটি এডুকেশনের?
এজওয়ান গিয়ে মাহি কে জিজ্ঞেস করলো—
“ এই তরিকুলের বেটি তোমার এডুকেশন কোয়ালিটি কি?”
মাহি জামাকাপড় গোছাচ্ছিল।
“ কেনো জেনে কি করবেন?”
“তোমায় একটা হাইফাই জবের ব্যবস্থা করে দিব। তুমি ইনকাম করবা আর আমি বসে বসে বউয়ের টাকায় খাবো।”
“ অনার্স শেষ। মাস্টার্স করবো।”
“ ভর্তি হও নি?”
“ না হবো।”
“ তাহলে চলো মেলবোর্নে ভর্তি করিয়ে দেই। এত কম শিক্ষিত বউ নিয়ে রাস্তায় চলাচল করলে লজ্জায় ম’রে যাব।”
মাহি এ কথা শুনে ব্যাঙ্গ করে বলল—
“ তা আপনার এডুকেশন কোয়ালিটি কি? কোন নর্দমা থেকে পড়াশোনা করেছেন? কতদূর করেছেন?”
এজওয়ান পা তুলে বসে বলল—
“ এই তো অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন গ্রামার স্কুলে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স- মাস্টার্স শেষ করে পিএইচডি করছিলাম। তো হুট করে করোনা খালা এসে তা বন্ধ করে দিলো।”
মাহির কপাল কুঁচকে আসলো।
“ আপনি বাংলাদেশে পড়াশোনা করেন নি? ”
“উঁহু।”
“ কেনো? আমি যতদূর জানি সোলেমান সাহেব তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। ইব্রাহিম পাশা ও।”
“ হুমম। ভাইজান বাংলাদেশে থাকে সেজন্য বাংলাদেশে পড়েছে। আমি তো আর এখানে থাকি না। থাকি অস্ট্রেলিয়ায়।”
“ তো দেশে এসে কেনো আমার জীবন নিয়ে এমন টানাহেঁচড়া করলেন?”
“ তারজন্য দায়ী তুমি সুইটহার্ট। এখন বলো কি করবে? অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা শুরু করবে নাকি ঢাবিতে কথা বলবো? নাকি কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কথা বলবো ? ”
“ আমার তো আজাইরা এত টাকা নেই যে বিদেশে দৌড়াবো সামান্য মাস্টার্স করার জন্য।”
“ আমার আছে তো। কোনো টাকা পয়সা লাগবে না পড়তে।”
“ নো নিড।”
“ তাহলে ঢাবিতে কথা বলি?”
“ আমার মুখ নেই? আমি বলতে পারবো।”
“আচ্ছা শোনো খুব শীগ্রই আমি একটু অস্ট্রেলিয়া যাব। তো তোমায়ও আমি নিয়ে যাব সাথে। ”
“ আমি যেতে পারবো না।”
“ তোমায় জিজ্ঞেস করি নি যেতে পারবে কি পারবে না। তোমাকে আমি রেখে যাবো না। না জানি আমার অবর্তমানে তুমি আবার প’রকীয়ার লিপ্ত হয়ে যাও তখন আমি বউ হারনোর শোকে আধপাগল হয়ে যাব। তাই তুমি যাবে আমার সাথে। তোমার তো পাসপোর্ট ভিসা আছে। সমস্যা হওয়ার কথা না। এখন আসি ভাইজান ইয়া বড় কাজ ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে।”
মাহি জানতে চাইলো—
“ কিসের কাজ?”
“ জানো না? সেদিন যে অফিস উদ্বোধন হলো তার সিও আমি।”
মাহি ব্যাঙ্গ সুরে বলল-
“ সোলেমান সাহেব নিজের পায়ে নিজে কোরাল মারতে ভীষণ পছন্দ করে বোধহয়?”
“ এটা বললে কেনো?”
“ আপনার মতন একটা বেয়াদব কে কি করে অফিসের দায়িত্ব দেয়?”
এজওয়ান বসা থেকে উঠে মাহির মুখের উপর তার ঘর্মাক্ত শার্ট ছুঁড়ে দিয়ে বলল—
“ ভাইয়ের বেশিরভাগ কোম্পানি আমি এজওয়ান নিজে সামলাই। ডোন্ট আন্ডারএস্টিমেট মি।”
মাহির মুখের উপর থেকে শার্ট টা সরিয়ে ফেললো রাগে সাথে সাথে। ততক্ষণে এজওয়ান চলে গিয়েছে।
ডিসেম্বরের কনকনে শীত। গায়ে শাল জড়িয়ে মহাদেবপুরের বক চত্বরের থানা রোড দিয়ে ফ্রেন্ডের সাথে হেঁটে বাড়ির দিকে ফিরছে রুমাইসা। রুমাইসার ফ্রেন্ড লিমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। তো দুজন সেই টপিক নিয়েই কথা বলছে। লিমা কথার ছলে জানতে চাইলো—
“ তুই কবে বিয়ে করবি রুমু? বয়স তো কম হলো না। ”
রুমাইসা বিরক্ত হলো নিজের বিয়ের কথা শুনে।
“ হবে না রে বিয়ে আমার।”
“ কেনো?”
“ দুনিয়ার সবচেয়ে ঝুঁকি পূর্ণ কাজ হলো বিয়ে করা। ”
“ তো সারাজীবন আবিয়াইত্তা থাকবি নাকি?”
“ সেটা কি সম্ভব নাকি মেয়ে হয়ে? ”
“ তাহলে করে ফেল বিয়ে তাড়াতাড়ি।”
“ পছন্দ হয় না কাউকে। সব ভাদাইম্মা গুলো এসে ভীড়ে আমার কাছে। আমার ভাইদের মতন স্মার্ট, হ্যান্ডসাম দায়িত্বশীল কাউকে পেলে তখন করবো। ”
“ দাওয়াত দিতে ভুলিস না।”
“ পুরো সুলতানপুরের সবাইকে দাওয়াত দিব আমার বিয়েতে । সবচেয়ে বড়,বিশাল আকারে ধুমধাম করে বিয়ে হবে আমার। শুধু একবার শাশুড়ির পু’তের দেখাটা পাই।”
“ ইনশাআল্লাহ পেয়ে যাবি দেখিস। বড়লোক দের বিয়ে মানেই হরেক রকমের খাওয়া দাওয়া। আমি দোয়া করে দিব।”
বক চত্বরে এসে রাস্তা পাড় হয়ে উপজেলা রোডের দিকে আসতেই রুমাইসা দের সামনে এসে দাঁড়ালো একটা কালো বাইক। রুমাইসা ভ্রু কুঁচকালো। সাইড দিয়ে সরে যেতে নিলে পাশ থেকে বাইক ওয়ালা রুমাইসার চাদর টেনে ধরলো। রুমাইসা চমকে উঠলো। চত্বরের সবাই তাকালো। রুমাইসা একবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বাইকের দিকে তাকালো।
“ কোন ধরনের অসভ্যতামি এটা? চাদর টেনে ধরে রেখেছেন কেনো? ছাড়ুন।”
লোকটা ছেড়ে দিলো চাদর। মাথা থেকে হেলমেট টা সরিয়ে রুমাইসার দিকে তাকালো। সাদা ফর্সা গায়ের রঙ। হাল্কা চিকন। রাগে কপাল কুঁচকে আছে। একদম কড়া মাল মনে হলো লোকটার কাছে।
লোকটার চাহনি দেখে রুমাইসার উল্টি এসে পড়ার উপক্রম। জোয়াখোরের থেকে কম না দেখতে।
লোকটা বাইক থেকে নেমে রুমাইসার সামনে দাঁড়ালো। একটু ঝুঁকে বলল—
“ হাই সে’ক্সি।”
কথাটা কানে আসা মাত্রই রাগে শরীর কেঁপে উঠলো রুমাইসার। হাত উঁচু করে চ’ড় বসাতে নিলে লোকটা হাত ধরে ফেলে। রুমাইসা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। লোকটা উল্টো রুমাইসার হাতে চুমু খেয়ে বলল—
“ সুলতান বাড়ির মেয়ে না তুমি? তোমাকে আমি এক রাতের জন্য হলেও আমার বিছানায় নিয়ে আসবো আমার বিছানা কাঁপানোর জন্য। ভার্জিন তো তুমি?”
রুমাইসার কান গরম হয়ে আসলো। তীব্র রাগে মুখ থেকে থুথু বের করে ছিটিয়ে দিলো লোকটার মুখে। তারপর সজোরে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে বলল—
“ চিনিস আমার ভাইদের? তোকে কে’টে কু’ত্তাদের খাওয়াবে। ”
“ চিনতেই এসেছি। তোকে কু’ত্তার মতন খুবলে খাবো আমি। জাস্ট ওয়েট এন্ড সি। ”
লোকটা রুমাইসার চাদর দিয়ে মুখের থুথু মুছে চলে গেলো। রুমাইসা শরীর থেকে চাদর ছুঁড়ে ফেলে দিলো রাস্তায়। রাগে ক্ষোভে শরীর জ্বলে যাচ্ছে তার। চত্বরের একটা মানুষও এগিয়ে এলো না!
রুমাইসা বাড়িতে ফিরেই বাপ দাদা কে সব খুলে বলেছে। এত বড় সাহস! ভরা চত্বরের সামনে তার সাথে এমন অশ্লীল আচারন করলো! তাকে ওসব নোংরা নোংরা কথা বললো। আর লোকজন তামাশা দেখলো!
আমিরুল সুলতান ফোন করে সোলেমান কে সব জানালো। সোলেমান শোনা মাত্রই রাগে ফেটে উঠলো। এত বড় কলিজা! তার বোন কে বিছানায় নিয়ে যাবে! কু’ত্তার মতন খুবলে খাবে! এত সাহস!
সোলেমান আধঘন্টার মধ্যে ঐ ছেলের আমল নামা বের করলো।
সোলেমান দের বিরোধী দলের শত্রু নাসির উদ্দীনের ছেলে নাজিম ছিলো সে। এক সপ্তাহ হয়েছে দেশে এসেছে। আর এসেই সুলতান বাড়ির পেছনে লেগেছে।
তার পরের দিনই সকাল হতে না হতেই এজওয়ান বাহাদুর কে ফোন করে মহাদেবপুর আসে। বেপরোয়া এজওয়ান ভাইয়ের উর্ধে গিয়ে নাসির উদ্দীনের ছেলে নাজিম কে খুঁজে বের করে ঐ বক চত্বরেই কু’ত্তার মতন পিটায় । নাজিমের এক পা ভেঙে দিয়ে আসে এজওয়ান। চেয়েছিলো চোখই গালিয়ে দিতে। কিন্তু ইব্রাহিম জানা মাত্রই চত্বরে গিয়ে এজওয়ান কে সরিয়ে নিয়ে আসে।
এজওয়ান তো চত্বরে থাকা লোকদের ও পিটাতে চেয়েছিল। ওর বোন অসম্মান হচ্ছিলো এখানে আর এই কু’ত্তার বাচ্চারা আমজনতা রা তামাশা দেখছিলো!
সোলেমান চেয়েছিল লুকিয়ে এনে আড়ালে শাস্তি দিতে। কিন্তু এই এজওয়ান আগ বাড়িয়ে সব ভেস্তে দিলো। বে’য়াদব টা আরো কাজ বাড়িয়ে দেয়। এজওয়ান মহাদেবপুর এসেছে শুনেই সোলেমান ও চলে আসে এজওয়ান কে থামাতে।
নাসির উদ্দীন মারাত্মক খেপে গিয়েছে সুলতান দের উপর। তার ছেলেকে চত্বরে পেটানো! ছেড়ে দিবে সে! এত সহজে? এর বদলা সে নিয়েই ছাড়বে। চত্বরের একজন এজওয়ানের মা’রার ভিডিও করেছিল। নাসির উদ্দীন সেটা দেখে ঐ ছেলেকে বলল—
“ ফেসবুকে ছেড়ে দে। কড়া ক্যাপশন দিয়ে লিখবি ঐ এমপির ভাই কিভাবে আমার ছেলেকে পিটিয়েছে। দরকার পড়লে পোস্ট বুস্ট করে ছড়িয়ে দে। তারপর বাকিটা আমি দেখছি।”
ছেলেটা তাই করলো। অনলাইনে ছড়িয়ে দিলো ভিডিও টা।
মেহরিন সন্ধ্যার দিকে জানতে পারে তার স্বামী মহাদেবপুরে এসেছিল। কিন্তু তার সাথে দেখা না করে ঢাকায় চলে গেছে শুনে মন খারাপ হলো। কেনো এসেছিল জানে না। ও বাড়ি থেকে আফিয়া সুলতান বলে নি। শুধু বলেছিল দরকারে এসেছিল।
কি এত দরকার যে একটু দেখা করে যেতে পারলো না বউয়ের সাথে? খুব বেশি সময় লাগে সুলতানপুর থেকে অলংকারপুর আসতে? এত সময় হয় অথচ মেহরিনের জন্যই তার কোনো সময় হয় না! মেহরিন তার জন্য অপেক্ষা করতেই থাকে করতেই থাকে এই ভেবে যে তার অপেক্ষার পালা শেষ করিয়ে তার সুলতান সাহেব তার নিকট আসবে। কিন্তু নাহ্! মেহরিন ভুল! তার অপেক্ষারা এত সহজে শেষ হবার নয়।
মেহরিন এগিয়ে গেলো জানালার দিকে। জানালার পাশে থাকা বেলি ফুলের গাছটার দিকে তাকালো। জীবন টা কি অদ্ভুত তার, কখনও শ্বশুর বাড়ি কখনও স্বামীর বাড়ি তো কখনও বাবার বাড়ি। কেমন যেন জলে ভাসা সংসার তার। এক কূল থেকে আরেক কূলে ভেসে চলে। কোনো স্থায়িত্ব নেই।
জানালার শিকে দু হাত চেপে মাথা ঠেকালো মেহরিন। বিয়ের অনেক মাস হলো তাদের। কি পেলো এই ক’মাসে? শুধু এখান থেকে ওখানে থাকা ছাড়া? ভাত কাপড় তো তার বাবারও দেওয়ার সামর্থ্য আছে। শুধু ভাত কাপড়ের জন্য তো মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয় না। সুলতান সাহেবের সাথে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ মেহরিন একটা চমৎকার মানুষের সাথে থাকে। তখন তার সুলতান সাহেব সবসময় মেহরিনের আশেপাশে থাকে। যত্ন করে। কিন্তু যেই মেহরিন দূরে সরে আসে তখনই সাক্ষাৎ হয় অচেনা অজানা এক পুরুষের সাথে। যে ঠিকমতো যোগাযোগ করে না। ফোন দিলে ফোন সুইচ অফ বলে। এ জীবন তার ভীষণ অদ্ভুত, বিষন্ন রকমের লাগে।
মেহরিনের সুলতান সাহেব খুব সাধারণ একটা মানুষ হত! একটা ছোট্ট দুই কামরার উপরে টিনের চালের ঘর থাকতো তাদের। সুলতান সাহেব একটা ছোটখাটো চাকরি করতো। রোজ সকালে কাজে যেত সন্ধ্যার আগ দিয়ে ঘর্মাক্ত ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরতো। মেহরিন রান্নাবান্না শেষ করে জলের গ্লাস নিয়ে অপেক্ষা করতো তার ফেরার। সোলেমান ফিরতেই মেহরিন তার শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘর্মাক্ত চেহারাটা মুছে দিত। সপ্তাহের একটা দিন, বৃহস্পতিবারের রাত টা বারান্দায় বসে কাঁধে মাথা রেখে মধ্য রাত অব্দি চাঁদ তারা দেখতো। শুক্রবারের বিকেলে একটু ঘুরতো। বৃষ্টি পড়লে তারা টিনের চালে পড়া বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ শুনে তারা বারান্দায় এসে দাঁড়াতো। মেহরিন হাত বাড়িয়ে সেই পানি ছুঁয়ে দিত। পা ভেজাতো। তার সুলতান সাহেব তখন পাশে থেকে মেহরিন কে দেখে যেত। জীবন টা কি এতেই সুন্দর হতো না? জীবন বলতে তো এটাই সুন্দর। খুব সাধারণ একটা জীবন। কোনো জঞ্জাল নেই। খুব বিলাসিতা বড়লোক হাইফাই জীবন ওসব উপন্যাসে শুনতেই ভালো লাগে। বাস্তবে এই জীবন বড় বিতৃষ্ণার। মেহরিন বেলি গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে দেখতে পাওয়া চাঁদের পানে তাকালো। কালো মেঘ গুলো থেকে থেকে বারবার চাঁদ টাকে ঢেকে দিচ্ছে। মেহরিন মনের বিতৃষ্ণা থেকে গুনগুন করলো—
~মাঝে মাঝে তব দেখা পাই,
চিরদিন কেন পাই না?
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে,
তোমারে দেখিতে দেয় না?
ক্ষণিকের আলোকে আঁখির পলকে
তোমায় যবে পাই দেখিতে
হারাই-হারাই সদা হয় ভয়,
হারাইয়া ফেলি চকিতে…….
মেহরিনের পরক্ষণেই মনে পড়লো—
“ মানুষ বাঁচে অপেক্ষায়, আর তার অপেক্ষারা বাঁচে আশায়..!”
মেহরিন বিরবির করে বলল-
“ আপনার আর আমার দূরত্ব সুরা বাকারার মতো দীর্ঘ সুলতান সাহেব। আমাদের এই দূরত্ব একদিন সুরা কাউসারের মতো ছোট,সূরা রহমানের মতো মধুর,সূরা ইয়াসিনের মতো শক্তিশালী, আর সূরা আদ-দোহার মতো উজ্জ্বল হবে,ইনশা আল্লাহ। আমি এই দিনের অপেক্ষায় আছি….”
সোলেমান এজওয়ান কে নিয়ে ঢাকায় ফিরে তার পরের দিন সকালে জানতে পারলো নেট দুনিয়ায় রীতিমতো তোলপাড় এজওয়ানের ঐ ভিডিও টা নিয়ে। এমন ক্যাপশন দিয়েছে যে সেখানে বলা হচ্ছে এজওয়ান শুধু শুধু একটা নিরীহ ছেলেকে মেরেছে বাপ ভাইয়ের ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
উপর মহল থেকে ফোনের উপর ফোন আসতে শুরু করলো সোলেমানের কাছে। সোলেমান বোঝানো চেষ্টা করলো শুধু শুধু মারে নি তার ভাই। কিন্তু কে শোনে কার কথা? প্রমান কি যে এজওয়ান এমনি এমনি মারে নি?
মাহিও নিউজ টা দেখে কিছু টা চমকালো। সেও শুনেছে রুমাইসার বিষয় টা। সে নিজে থাকলে সেও গিয়ে দুটো চ’ড় মে’রে আসতো।
এদিকে এজওয়ান নিশ্চিন্তে ভাত ঘুম দিচ্ছে। মাহি স্পিচলেস। কিভাবে এত নিশ্চিন্তে থাকতে পারে? হাউ ইজ দ্যিস পসিবল? এদিকে উপর মহল থেকে এজওয়ান কে এরেস্ট করার জন্য বলা হয়েছে প্রশাসন কে। যেহেতু বিপরীত পক্ষের দলের বিষয়। এখন এটা নিয়ে হাঙ্গামা হবেই। সন্ধ্যার পর পুলিশ আসলো এজওয়ান কে ধরে নেওয়ার জন্য।
সোলেমান চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। বাশার সুলতান রীতিমত পুলিশদের উপর চড়াও হওয়া শুরু করছে! যত টাকা লাগবে দিবে তারপরও ছেলে কে নিয়ে যেতে দিবে না।
পুলিশ রা বলে দিলো সাফ সাফ—
“ আমাদের হাতে কিছুই নেই। আমাদের উপর মহল থেকে হুকুম দিয়েছে। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য।
বাশার সুলতান সোলেমানের দিকে এগিয়ে এসে বলল—
“ তুই চুপ কেনো? তুই কিছু বল। দরকার পড়লে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বল।”
সোলেমান ভ্রু কুঁচকালো।
“ প্রধানমন্ত্রী আমার খালা লাগে না যে সাহায্য করার জন্য বসে থাকবে। উল্টো তার থেকে আমি দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করি। চাই না তার নজর আমার উপর পড়ুক। আর তিনি আমাকে তার ফায়দার জন্য ব্যবহার করুক। ”
সোলেমান এজন্য জনসম্মুখে তেমন কিছু করে না। জনসম্মুখে করা মানে নিজের ইমেজ নষ্ট করা। কিন্তু এই বেয়াদব তাকে এভাবেই ডোবাচ্ছে।
এজওয়ান যাওয়ার সময় মাহির দিকে তাকালো।
মাহি তাকিয়ে আছে তার দিকে। এজওয়ান মাহির দিকে তাকিয়ে বলল—
“ কেঁদো না আমার জন্য মাহি। আমি ঠিক বেরিয়ে আসবো।”
মাহি ভ্রু কুঁচকালো। সে কাঁদতে যাবে কোন দুঃখে?
“ মাথা ঠিক আছে? আমি কাঁদতে যাব কেনো?”
এজওয়ান গাল ফুলালো।
“ আমি তো স্পষ্ট দেখছি চোখে জল টইটম্বুর করছে”
“ জেলে যাচ্ছেন তার পরও ফাজলামো বাদ দিচ্ছেন না! আশ্চর্য হচ্ছি আমি। আপনাকে কি দিয়ে বানানো হয়েছে?”
“ পিওর মাটি দিয়ে। আমি জেলে চলে যাচ্ছি বলে আবার প্রাক্তনের কাছে চলে যেও না যেন। তাহলে দুটো কে কবর দিয়ে আসবো বলে রাখলাম।”
পুলিশ টেনে নিয়ে গেলো এজওয়ান কে। কয় ঘন্টা আঁটকে রাখবে এজওয়ান কে? সর্বোচ্চ ২৪ ঘন্টা! তারপর ঠিক বেরিয়ে আসবে।
সাফওয়ানের কানে এসেছে এজওয়ান কে পুলিশ ধরেছে মহাদেবপুরে বিরোধী দলের নাসির উদ্দীনের ছেলে নাজিম কে পেটানোর দায়। সাফওয়ান তার পুলিশ ফ্রেন্ড হাবিব কে কল করে বলল—
-“ ঘটনা সত্যি?”
ওপাশ থেকে হাবিব বলল—
“ হুম খুব মা-রা মে’রেছে। ”
“ বিনা কারনে?”
“ ঠিক শিওর না। তদন্ত করলে জানা যাবে।”
সাফওয়ান দাঁত চেপে বলল-
“ যদি বিনা কারনে মে’রে থাকে। আর সেটা প্রুফ হয় তাহলে ওর শাস্তির এমন ব্যবস্থা করবি যাতে কয়েক মাসে বের হতে না পারে।”
“ ঠিক আছে। ”
“ রাখছি,আপডেট দিতে থাকিস। ”
সাফওয়ান ফোন টা কেটে কাজে মনোযোগ দিলো।
এজওয়ান হাবিব কে এতক্ষণ ধরে কথা বলতে দেখছিলো। ফোনটাও কেঁড়ে রেখেছে তার। এসেছে জেলে আধ ঘন্টাও হয় নি। এজওয়ান হাবিব কে ডেকে বলল—
“ এই কনস্টেবল শুনন।”
হাবিব ভ্রু কুঁচকালো। কনস্টেবল! সিরিয়াসলি! সে ইন্সপেক্টর। হাবিব বিরক্ত হয়ে এগিয়ে এসে বলল—
“ কি সমস্যা? ”
“ একটা এসির ব্যবস্থা করুন তো। গরমে ঘেমে যাচ্ছি। ”
“ বাপের বাড়ির আবদার? ”
এজওয়ান তার পড়নের জ্যাকেট টা খুলে রেখে বলল—
“ না মামুর বাড়ির আবদার। প্লিজ ভিআইপি সেলে নিয়ে রাখুন আমায়।”
“ সরি সম্ভব নয়। ”
“ তাহলে ফাইভ স্টার হোটেল থেকে আমার খাবার আনার ব্যবস্থা করুন। অ্যা’ম ভেরি হাঙ্গরি নাও।”
হাবিব কনস্টেবলের দিকে তাকিয়ে বলল—
“ ক্যান্টিন থেকে ঢাল আর রুটি এনে দাও। ”
এজওয়ান দাঁত চেপে বলল—
“ আমি বলেছি ফাইভ স্টার হোটেল থেকে আনতে খাবার। জেলের পাতি কেন্টিন থেকে নয়।”
“ জেল থেকে ছাড়া পেলে বাপের টাকায় কিনে খাবেন ফাইভ স্টার হোটেলে গিয়ে। এখানে আপনার বাপ টাকা দিয়ে রাখে নি। ”
এজওয়ান জেলের শিক দিয়ে হাত বের করে বলল—
“ আমার ফোন দিন। আমি টাকা দিয়ে আপনার গরম মাথা ঠান্ড করার ব্যবস্থা করছি।”
হাবি উল্টো ফিরে চলে যেতে যেতে বলল—
“ ফোন দেওয়া সম্ভব নয়।”
দাহশয্যা পর্ব ৪৯
এজওয়ান পারছে না এই হাবিবের বাচ্চা গাবিব কে একটা উষ্টা দিতে। গলার স্বর উঁচু করে এজওয়ান বলল—
“ ফোন দিন। তরিকুলের বেটির সাথে কথা বলবো আমি। তরিকুলের বেটির গলার স্বর অনেকক্ষন হলো শুনি না। কি হলো দিন ফোন টা। গরীব দেশ একটা। এসিও লাগাতে পারে না কারাগারে। বাহিরের দেশে গিয়ে দেখে আসুন জেলে কত ফ্যাসিলিটি দেওয়া হয় অপরাধী দের। বাহিরের দেশের মানুষ জেলে থাকার জন্য উল্টো আরো বেশি অন্যায় করে। আর আপনাদের এই বাঙ্গু দেশে দোষী দের শাস্তি দিলে পুরষ্কার দেওয়া বদলে উল্টো ধরে নিয়ে আসেন জেলে! ফালতু দেশের ফালতু আইন কোথাকার। আমি মুতে দিলাম আপনাদের এই ফালতু সিস্টেমের উপর।”
