Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৫১

দাহশয্যা পর্ব ৫১

দাহশয্যা পর্ব ৫১
Raiha Zubair Ripti

জেলখানার ভেতরে মশার কামড়ে এজওয়ানের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়ছে। হাত দিয়ে সারা শরীরে মশা থা’পড়াচ্ছে তো কখনও জ্যাকেট দিয়ে শরীরে বসা মশা তাড়াচ্ছে। শেষমেশ আর না পেরে এজওয়ান গলা উঁচু করে ডাকলো—
“ এই হাবিলদার, মশা কামড়াচ্ছে কেনো? একটা মশা মা’রার স্প্রে নিয়ে আসেন। বসা যাচ্ছে না। আমার শরীরের সব তাজা বড়লোকি র’ক্ত গুলো খেয়ে দিচ্ছে এই ছোটলোকি মশার দল। ”
হাবিব এগিয়ে আসলো।

“ এই সমস্যা কি? বারবার চেঁচাচ্ছেন কেনো ষাঁড়ের মতন?”
এজওয়ান হাত বাড়িয়ে দেখিয়ে বলল—
“ দেখুন কামড়ে ফুলিয়ে দিচ্ছে শরীর। স্প্রে না থাকলে ১০ টাকা দিয়ে অন্তত একটা কয়েল তো এনে দিন। এত অমানবিক কেনো আপনারা? একটু মানবিক হোন।”
হাবিব কনস্টেবল কে বলে একটা কয়েল ধরিয়ে দিলো। এজওয়ান কনস্টেবল কে ডেকে বলল—
“ কনস্টেবল শুনুন।”
কনস্টেবল দাঁড়িয়ে পড়লো।
“ বলুন।”
“ আপনার তো এখন কোনো কাজ নেই তাই না?”
কনস্টেবল ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো—
“ কেনো বলুন তো?”
“ আমি খুব একাকিত্ব বোধ করছি। একটু কোম্পানি দিন আমায়। ভালো লাগছে না একা একা। ”
“ আমার কাজ আছে।”
“ পরে করবেন। এখন কোম্পানি দিন। জেল থেকে বের হবার পর পকেট গরম করে দিব ট্রাস্ট মি।”
“ কি কোম্পানি দিব আপনাকে?”
“ যা ইচ্ছে হয় প্রশ্ন করুন। আমি শুধু পায়ের উপর পা তুলে জবাব দিব।”
“ আচ্ছা ভাববার সময় দিন।…….আপনার নাম কি?”
এজওয়ান তপ্ত শ্বাস ফেললো।

“ লেডি কিলার রোমিও।”
“ বাড়ি?”
“ উগান্ডা। ”
“ প্রিয় খাবার?”
“ বাংলা মাল।”
“ প্রিয় নায়ক?”
“ শিরায় শিরায় রক্ত আমি দেবের ভক্ত।”
কনস্টেবল খুশি হয়ে গেলো। সে নিজেও দেবের ভক্ত।
“ আসস। প্রিয় সিঙ্গার? ”
“ নার্গিস আপা।”
কনস্টেবলের কপালে দু ভাজ পড়লো। এত সিঙ্গার থাকতে এই বেডার পছন্দ নার্গিস রে!
“ তার গান ভালো লাগে আপনার?”
“ সেই লেভেলের ভালো লাগে। শুনবেন? বলি? শালার শালা বুইড়া শালা.. তেল মাইরা দে যৌবনের তালায়… বাসর ঘরে দুইজনে..কইতে আমার শরম করে…খেতার নিচে বাত্তি জ্বলে…..
কনস্টেবল সাথে সাথে সরে গিয়ে বলল—
“ এ্যই মিয়া থামুন । নাউজুবিল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ.. ছি ছি কি গান এসব।”
এজওয়ান থেমে গেলো। কিছুক্ষণ পর বাশার সুলতান আসলো খাবার নিয়ে ছেলের জন্য।
এজওয়ান তেহারি টা খেয়ে একটা কোক খেলো। বাশার সুলতান ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-

“ চিন্তা করিস না বাপ। সকাল হলেই বের করে নিয়ে যাব।”
এজওয়ান বাপের হাত সরিয়ে দিলো মাথা থেকে। বিরক্ত হয়ে বলল-
“ আহ্ মাথায় হাত দিও না তো। চুল গুলো নষ্ট হয়ে যাবে। আয়নার বা’লও নেই জেলে যে দেখে ঠিক করবো। কি গরম শা’লার জেলে। এরপর কেউ ধরতে আসলে তাদের বলে দিবে ভিআইপি সেলে নিয়ে রাখে যেন। আর হ্যাঁ তোমায় আমাকে বের করা নিয়ে ভাবতে হবে না। সকাল হলে আমি এমনিতেই বেরিয়ে যাব। তুমি নাকে সরিষা তেল দিয়ে ঘুমাও গিয়ে। ”
বাশার সুলতান শুধু তাকিয়েই রইলো ছেলের পানে। সে ছেলের জন্য অস্থির পাগল হয়ে আছে। আর তার ছেলে তার এই অস্থিরতা কে জাস্ট পাত্তাই দিলো না!

সোলেমান মধ্য রাত অব্দি উকিল আর বাহাদুরের সাথে কথাবার্তা বললো। সকাল হলেই এজওয়ান কে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা যাবে। তারই ব্যবস্থা করলো সোলেমান। যাক এজওয়ান আগে থেকেই সতর্ক ছিলো। সেজন্য বাহাদুর কে বলে চত্বরের সিসিটিভি ফুটেজ টা আগেই সরিয়ে নিয়েছিল। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নাজিম কিভাবে অশ্লীল আচারন করছে রুমাইসার সাথে। রুমাইসার চেহারা টা ব্লার করে দিতে বলল সোলেমান যখন পাবলিশ হবে তখন।
সব ঠিকঠাক করে কাজ সারতে সারতে প্রায় রাত ৩ টা বেজে যায়। ইদানিং সে ভীষণ ব্যস্ত। দু’দিন পর পরই সিক্রেট মিটিং হচ্ছে। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী আসবে বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশের জনগণ বেশ ক্ষিপ্ত তার উপর। কোনো বড় ধরনের হাঙ্গামা বাঁধতে পারে।

তার উপর নতুন একটা শাখা দাঁড় করালো বিজনেসের। সব দিক দৌড়াদৌড়ি করে ঠিক মতো খাওয়া গোসলেরই সময় পায় না সোলেমান । ব্যক্তিগত ফোন টাও রুমে বন্ধ হয়ে আছে। বউয়ের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সোলেমান আজ একটু ফ্রী হলো। কাল ছোট লাগাবে মহাদেবপুর। বউকে একটু দেখার লোভে। না জানি তার ল্যাদা বউটা অভিমান করে বসে আছে। তাছাড়া পরশু নিউ ইয়ার। ২০ গিয়ে ২১ আসবে। বউয়ের সাথে থাকা দরকার। সোলেমান ফোনটা চার্জে দিয়ে অন করলো। মেহরিনের ১৩২ টা ফোন কল। সোলেমান খারাপ লাগতে শুরু করলো। উপন্যাসে যেভাবে বলা হয় লেখা হয় নায়ক যতই ব্যস্ত থাকুক দিনশেষে নায়েকার জন্য সময় বের করে। বাস্তবে এটা মোটেও সম্ভব হয় না। রাজনীতি তে ঢুকার নীতি হচ্ছে রাজনীতিতে নিজের দাপট চালাতে হলে ফ্যামিলি স্যাক্রিফাইস করতে হবে। ফ্যামিলি নিয়ে ভাবলে রাজনীতি টা আর করা হয় না।
সোলেমান দুটোকে ব্যালেন্সে ঠিক রেখে চলতে চায়। কিন্তু হিমশিম খেয়ে যায়। হয়ে আর উঠে না। পরিবার বুঝে বলে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু তার ল্যাদা বউ নতুন। এসবে অভ্যস্ত হতে সময় লাগবে।
সোলেমান গ্যালারি থেকে মেহরিনের ছবি বের করলো। তার সাথে সোলেমানের কোনো ছবি নেই। রুমাইসা পাঠিয়েছিল হোয়াটসঅ্যাপে। সেটাই আছে ফোনে। সোলেমান ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলো। তারপর ফোন টা রেখে বেলকনিতে এসে সিগারেট ধরালো। সিগারেট দু আঙুলের ফাঁকে ধরে মুখে নিয়ে টান দিয়ে ধোঁয়া বাতাসের সাথে ছড়িয়ে দিয়ে গলা ছেড়ে গাইলো-

~ মন মাঝি খবরদার
আমার তরী যেনো ভেড়ে না
আমার নৌকা যেনো ডুবে না
মন মাঝি খবরদার….
ভোরের দিকে মেহরিনের ঘুম ভাঙে। আস্তেধীরে আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেলতেই নিজেকে পড়ার টেবিলে আবিষ্কার করলো। রাত টা তাহলে সে এভাবেই ঘুমিয়ে কাটিয়েছিল! মেহরিন এলোমেলো পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে উঠোনে আসলো। এখনও আলো ফুটে নি। মোতালেব ভুঁইয়া দাঁত মিসওয়াক করছিলেন। মেহরিন কে দেখে এগিয়ে আসলো। শরীরে শীতের কাপড় নেই। শুধু ওড়না জড়ানো।
“ কি হইছে আম্মা? এভাবে দাঁড়ায় আছো ক্যান? শরীরে চাদর কই? ঠান্ডা লাগবে তো। ”
কথাটা শেষ করে নিজের শরীরের চাদর টা মেয়ের শরীরে জড়িয়ে দিলো। মেহরিন চাদর টার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ এখন তো তোমার শীত লাগবে আব্বু। দাঁড়াও এখানে, আমি চাদর আনতেছি।”
মেহরিন নিজের রুমে এসে চাদর টা নিয়ে বাবার শরীরে জড়িয়ে দিলো। মোতালেব ভুঁইয়া কল পাড়ের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল-

“ আম্মা নামাজ পড়ে শুয়ে থাকো কম্বলের তলে। আমি মসজিদে যাব। দরজা আঁটকায় দিও।”
মেহরিন চলে আসলো। রুমে ঢুকে ওজু করে নামাজ পড়ে শুয়ে পড়লো।
সকালে ৯ টার দিকে এজওয়ান জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসে। নিউজ চ্যানেল গুলো তে এখন ব্রেকিং নিউজে এজওয়ান সুলতান। গতকাল যারা বাজে মন্তব্য বাজে কথা বলছিলো আজ তারাই বলছে—“ এমন ভাই সব মেয়ের হোক।
এজওয়ান সেসব নিউজ পোস্ট দেখে থুথু ফেললো। ভণ্ড দেশের ভণ্ড ফুটেজ খোর লোক। কালই তাকে পচাচ্ছিল আর আজ সাধু সাজছে।
মাহি এজওয়ান কে ঘুরে ঘুরে দেখছে। সেটা দেখে এজওয়ান ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো—
“ জেলে থেকে সুন্দর হয়ে ফিরেছি নাকি? এত দেখছো যে ঘুরেফিরে। ”
মাহি হাতের ফোন টা টেবিলে রেখে বলল-

“ কাশ আমার একটা ভাই থাকতো।”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো।
“ কেনো? ভাইয়ের শখ জেগেছে নাকি? তরিকুলের না একটা ছেলে আছে। তরিকুল কে কি বলবো আরেকটা ছেলে পয়দা করতে? ”
“ শাট-আপ। আজ আমার একটা আপন ভাই থাকলে সে-ও আপনাকে সেদিন কু’ত্তার মতন পেটাতে পারতো।”
এজওয়ান বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে এসে দু হাত বুকে গুঁজে বলল—
“ মাই ফল্ট? ”
“ আমায় কিভাবে বিয়ে করেছেন ভুলে গেছেন? ”

“ বিয়ে করেছি জোর করে। ব্ল্যাকমেইল করে তোমার ভাগ্নি কে ব্যবহার করে। তোমায় কখনও বলেছি তোমায় কু’ত্তার মতন খুবলে খাবো? কখনও বলেছি তোমাকে এক রাতের জন্য হলেও বিছানায় আনবো বিছানা কাঁপানোর জন্য? ”
“ দুটো কোনো টাই কোনোটার থেকে কম নয়। আমার ভাগ্নির বয়স কতই বা ছিলো? নিজের বেলায় ষোল আনা আর পরের বেলায় চার আনা! নাজিমের চেয়েও বেশি দোষী আপনি এজওয়ান সুলতান। ”
“ ওকে মেনে নিলাম। যা শাস্তি দিবে তা মাথা পেতে নিব ম্যাডাম। ”
মাহি মুখ বাকালো। কবে যে এটাকে আর এটার বাপ কে তাদের উপর্যুক্ত শাস্তি দিতে পারবে। তখন কলিজা টা ঠান্ডা হবে।

ইব্রাহিম ক’টাদিন বেশ ছোটাছুটি করলো। ঊর্মির সাথে মাঝেমধ্যে হুটহাট কথা বলে ইব্রাহিম। নিজ থেকেই দেয় ফোন। শুনেছে আজ সোলেমান মহাদেবপুর যাবে। ইব্রাহিম ও বলে দিয়েছে সে-ও যাবে। পেছন পেছন ইয়াসিন ও বলেছে সেও যাবে। সে এখনও সোলেমান ভাইয়ের বউ কে দেখে নি।
সোলেমান রাজি হলো দুটো কে সাথে নিতে।
ইব্রাহিম পড়নের পাঞ্জাবি পাল্টে ব্লু টি-শার্ট পড়ে নিলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ঊর্মির নম্বর কল দিলো।
আজকাল ঊর্মি মায়ের ফোন টা বেশির ভাগ সময় নিজের কাছেই রাখে। কখন হুট করে ইব্রাহিম ফোন দিয়ে বসবে আর তার মা ধরে ফেলবে এই ভয়ে।
ঊর্মি ফোনটা টেবিলে রেখে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে ছিলো। ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠতেই চমকে উঠে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে তার মা আছে কি না। না নেই। উঠানে পাতা ছড়িয়ে দিচ্ছে শুকানোর জন্য। ঊর্মি কম্পিত বুক নিয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিলো। লোকটা ফোন দিলে কি যে অদ্ভুত কাঁপনি আর অস্থিরতা শুরু হয় তা বলে বোঝানো যাবে না।
ফোনের ওপাশ থেকে শান্ত গলায় ভেসে আসলো—

“ ঊর্মি। ”
ঊর্মি চোখ বুজে ফেললো। ছোট করে বলল—
“ হুমম। ”
“ আমি মহাদেবপুর আসছি আজ। ”
কথাটা শুনে কিঞ্চিৎ চমকে উঠলো ঊর্মি।
“ কি জন্য আসবেন?”
ইব্রাহিমের ঠোঁটের কোনে হাসি খেলে গেলো।
“ শান্ত হও। মেহরিন দের বাড়িতে যাব। সোলেমান যাবে তো। ”
ঊর্মি শ্বাস নিলো আস্তেধীরে।
“ ওহ্ আচ্ছা। সাবধানে আসবেন। ”
ইব্রাহিম কিছুক্ষণ চুপ থেকে জানতে চাইলো—
“ দেখা হচ্ছে তাহলে আমাদের? ”
ঊর্মি মৃদু হেঁসে বলল—
“ ইনশাআল্লাহ। ”
“ রাখছি তাহলে?”
“ হুমম। ”

ইব্রাহিম কেটে দিলো ফোন। ঊর্মি আয়নায় নিজেকে দেখলো। আশ্চর্য উনার আসার কথা শুনে তার গাল গুলো লাল হয়ে যাচ্ছে কেনো? কি আশ্চর্য কারবার।
সোলেমান অফ হোয়াইট শার্ট পড়েছে। বা হাতে ব্লাক ঘড়ি। ঘড়িতে সময় দেখলো এখন বাজে সাড়ে ১০ টা। ইয়াসিন গর্দভ টা এখনও আসছে না কেনো? শ্বশুর বাড়ি কার? সোলেমানের নাকি ইব্রাহিমের নাকি ইয়াসিনের? দুটো কেমন সেজেগুজে নায়ক সেজে এসেছে।
সোলেমান ইয়াসিনের মাথায় গাট্টা মে’রে বলল—
“ মেক-আপ ঘষতেছিলি নাকি ফেসে যে এতক্ষণ লাগলো তোর আসতে।”
ইয়াসিন ড্রাইভিং সিটে বসে বলল-
“ আপনার শ্বশুর বাড়ি প্রথম যাচ্ছি ভাই। একটু তো সেজেগুজে যেতেই হবে। বাই এনি চান্স যদি কোনো বাপের বেটি পছন্দ টছন্দ করে ফেলে আমাকে তাহলে আপনারা ধরে বিয়ে দিয়ে দিবেন আমার। ”
সোলে চোখ পাকিয়ে বলল—

“ একটা থা’প্পড় দিব। কিসের বিয়ে হু? অবিবাহিত থাকবি। তাহলে চিন্তা মুক্ত, ফ্রী থাকতে পারবি। কাজে মন বসবে ভালো। ”
ইয়াসিন এই কথার ঘোর বিরোধিতা করে বলল-
“ এ্যাহ আপনি তাইলে বিয়ে করছেন কেনো? আপনি করছেন এজওয়ান ভাই করছে,কদিন পর তো ইব্রাহিম ভাইও করে ফেলবে। আমি কেনো তাহলে একা একা সিঙ্গেল থাকবো?”
সোলেমান ইব্রাহিমের পানে তাকালো।
“ কি রে ইবু তুই বিয়ে করবি ক’দিন পর! আমি জানি না! আর ইয়াসিন জানে! বাহ্! নাইস! হঠাৎ বিয়ে করতে যাবি কেনো?”
ইব্রাহিম চোখ দিয়ে গিলে খেলো ইয়াসিন টাকে। বলদের বাচ্চা একটা।

“ শোন সোলেমান হাদিসে অবিবাহিত নারী-পুরুষদের মিসকিন বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রাপ্ত বয়সেও যারা বিয়ের নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হাদিসের ভাষায় তারা হচ্ছে করুণার পাত্র। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে বিবাহের দ্বারাই মানুষের জীবনের পূর্ণতা লাভ পায়। আর আমি ভাই এত ছোটলোক, মিসকিন,করুণার পাত্র হয়ে আর বেঁচে থাকতে চাই না। এখন তোর মতন আমিও বিয়ে করে বড়লোক হতে চাচ্ছি। ”
সোলেমান জানতে চাইলো—
“ কোন বাড়ির মাইয়ার কপাল পুড়তে যাচ্ছে? কাকে দেখে এমন বিয়ে পাগল হলি?”
ইব্রাহিম একটু ভাবুক হয়ে বলল—
“ আই থিংক তোর শালি…ভেরি সুন আমার ঘরওয়ালি।
“ বে’য়াদব আমার শালি বিবাহিত। কদিন পর বাচ্চার মা হবে। শেষ পর্যন্ত বিবাহিত নারী কে দেখে এসব পুষলি মনে! ছিঃ। ”

“ আরেহ তোর আপন শালি না। সৎ শালি।”
সোলেমান অবাক হয়ে বলল—
“ আমার সৎ শালি আবার কে? আমার শ্বশুর তো বিয়ে করেছে একটাই।”
“ আরে ধূর তোর বউয়ের বান্ধবী। বাহিরে আর মেয়ে দেখতে যাব কেন বল? নিজেদের মধ্যেই তো আছে। ”
সোলেমান বাঁকা চোখে তাকালো।
“ বয়সের ডিফারেন্ট জানিস কত তোদের? ”
“ বয়স ডাজেন্ট ম্যাটার। তোর আর মেহরিনের মতনই হবে পার্থক্য। ”
সোলেমান ইব্রাহিমের ঘাড় চেপে বলল-
“ শালা বয়স ম্যাটার করে। বাসর ঘরে বউ ছুঁতে গেলে বউ যখন তোর লোড নিতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যাবে তখন বুঝবি বয়স ম্যাটার করে কি না।”
ইব্রাহিম সরু চোখে তাকালো।
“ বাই এনি চান্স এটা কি তোর সাথে ঘটছে সোলেমান ?
সোলেমান সরে বসলো। ঘটনা টা মনে পড়ে গেলো।

“ শাট-আপ এটা কমনসেন্স থেকে বলেছি। ”
“ তারপরও আমি কম বয়সী ঊর্মি কেই করবো। আমার লোড নিতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যাবে? যাক। দরজার বাহিরে ডাক্তার এনে দাঁড় করিয়ে রাখবো। ”
সোলেমান বিরবির করে ছা’গল বললো ইব্রাহিম কে।
সন্ধ্যার আগ দিয়ে তারা আসলো মহাদেবপুর। মেহরিন তখন বোনের রুমে বসে ছিলো বোনের সাথে। বাহির থেকে মায়ের গলা ভেসে আসায় মেহরিন বাহিরে বেরিয়ে দেখলো তার স্বামী আর ইব্রাহিম আসছে হেঁটে। পাশে ইয়াসিন কেও দেখতে পেলো। তবে লোকটাকে বেশ চেনা চেনা লাগতে শুরু করলো। কোথায় দেখেছে? মনে পড়ছে না তেমন।
চোখাচোখি হলো সোলেমান আর মেহরিনের। মেহরিন সন্তপর্ণে চোখ সরিয়ে নিলো। যখনই মন খারাপ হয় লোকটার শূণ্যতা ভেবে,তখনই লোকটা কিভাবে যেন চলে আসে শূণ্যতা ঘুঁচাতে।
সোলেমান বেশ বুঝতে পারলো বউয়ের মনের অবস্থা। সানজিদা বেগম মোতালেব ভুঁইয়া কে খবর দিয়ে জানালো মেয়ের জামাই এসেছে।
সোলেমান মেহরিনের রুমে চলে আসলো। ইব্রাহিম আর ইয়াসিন কে পূর্ব দিকের একটা রুম দেখিয়ে দিলো। রুমের ভেতর ওয়াশরুম আছে। সানজিদা বেগম বলল—

“ ফ্রেশ হয়ে নাও তোমরা। আমি নাস্তার ব্যবস্থা করছি।
ইয়াসিন ঘুরে সব দেখছে জানালা দিয়ে। গ্রাম টা দারুন তো। ইয়াসিন ইব্রাহিম কে বলল-
“ ভাই আমাকেও এই গ্রামে একটা বিয়ে দিয়ে দিয়েন।”
সোলেমান ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতেই মেহরিন গামছা এগিয়ে দিলো। সোলেমান বউয়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে গামছাটা নিয়ে হাত মুখ মুছে নিলো। মেহরিন রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে সোলেমান মেহরিনের হাত টেনে ধরলো। এগিয়ে বউয়ের কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বলল-
“ কথা বলবে না আমার সাথে?”
মেহরিন আগের ন্যায় চুপ করে রইলো।
“ রেগে আছো? রাগ টা জায়েজ। আমি মাথা পেতে মেনে নিলাম সব। প্লিজ চুপ করে অন্তত থেকো না। টক টু মি ল্যাদা বউ। ”
মেহরিন তবুও চুপ। সোলেমান মেহরিনের কোমরে হাত চেপে ধরতেই মেহরিন সোলেমানের দিকে ঘুরলো এবার।

“ আপনি আমাকে উপেক্ষা করিয়ে আশা করছেন আমি আপনার সাথে কথা বলবো! ”
সোলেমান কোমর ছেড়ে এবার মেহরিনের দু গালে হাত রাখলো।
“ এটা তোমার ভুল ধারণা মেহরিন।”
মেহরিন এ কথা শুনে হাসলো। হাসিতে প্রাণ নেই।
“ মানুষ এক অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় সুলতান সাহেব। শরীরের ১০৩° ডিগ্রি জ্বর টের পায় না। কখনও কখনও কঠিন রোগ বেঁধে ফেলে তারপরও টের পায় না। কোন বেলার ঔষধ কোন বেলায় খেয়ে ফেলে সেটাও টের পায় না। কিন্তু কেউ তাকে উপেক্ষা, অবহেলা করলে ঠিকই তা টের পায়। ”
সোলেমান বুঝতে পারলো বউ এবারে বেশি আহত হয়ে গেছে। কপালে কপাল ঠেকালো বউয়ের। নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে মেহরিনের মুখে।

“ নিজেকে উপেক্ষা করতে পারি,কিন্তু তোমাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা তোমার স্বামিজানের নেই বিবিজান। ”
মেহরিন নিশ্চুপ। নিজেকে তার সুলতান সাহেবের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে রান্নাঘর থেকে কফি নিয়ে ফের রুমে আসলো। সোলেমানের হাতে ধরিয়ে দিলো। সোলেমান একবার মেহরিনের দিকে আহত দৃশ্য নিক্ষেপ করে কফির মগে চুমুক দিলো।
মেহরিন বিছানা ঠিক করতে করতে জানতে চাইলো—
“ ফোন বন্ধ ছিলো কেনো এতদিন? কম ফোন যায় নি আমার ফোন থেকে। ”
“ ফোনটা বন্ধ হয়ে রুমে পড়ে ছিলো। খুব ব্যস্ত ছিলাম এ কদিন ট্রাস্ট মি। ঠিক মতো খাওয়ার সময় টাও পাই নি।”
“ মহাদেবপুর আসার সময় টা ঠিকই হয়েছিল। অথচ ১০ মিনিটের রাস্তাও না আমাদের এখানে আসার। ”
সোলেমান ধারণা করলো বউ তাহলে রুমুর বিষয় টা জানে না।
“ আসলে এজওয়ান কে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল। সেটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছি। ”
মেহরিন চকিতে পেছন ফিরলো।

“ ভাইয়াকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল কেনো?”
“ রুমাইসার সাথে চত্বরে এক ছেলে অশ্লীল আচারন করেছিল,সেটা শুনেই এজওয়ান এখানে এসে ছেলেটাকে মা’রে। তো সেজন্য এজওয়ান কে আটকাতে আমার এখানে আসা। এজওয়ান কে নিয়ে ঢাকা ফিরতেই আবার ওকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। খুব ছোটাছুটি করতে হয়েছে। ট্রাস্ট মি ইচ্ছে করে তোমার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করি নি আমি,কসম। ”
মেহরিন ভাবতে লাগলো। এত কিছু হয়ে গেল অথচ ও বাড়ি থেকে তাকে কিছুই জানানো হলো না!
সোলেমান কফিটা সম্পূর্ণ খেয়ে মেহরিনের দিকে বাড়িয়ে দিলো কাপ টা। মেহরিন কাপ টা নিয়ে বলল-
“ আবার চলে যাবেন কবে? ”
“ পরশু। ”
রাতের দিকে মোতালেব ভুঁইয়া ফিরলে সবাই মিলে রাতের ডিনার টা সেরে ফেলে। সানজিদা বেগম গরুর গোস,মুরগীর গোস,ডিম,ডাল,আলু ভাজি রেঁধেছিল। ইয়াসিন তৃপ্তি নিয়ে খেলো। অনেক দিন পর মনে হলো বাড়ির রান্না খাচ্ছে।
ডিনার শেষে মোতালেব ভুঁইয়া সোলেমান কে নিজের রুমে নিয়ে আসলো। একটু কথা বলা দরকার। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবে তা বুঝতে পারতেছে না। সোলেমান নিজ থেকে শুরু করলো।

“ আমি জানি আপনি কি বলতে চাচ্ছেন। কিন্তু আঙ্কেল মেহরিনের বয়স কম। আপনি এত কম বয়সে বিয়ে দিয়ে ঠিক করেন নি। আমার মনে হয় ওর পড়াশোনা নিয়ে ভাবা উচিত এখন। সংসার সংসার করে আমি চাই না আপনার দেখানো স্বপ্ন টা অপূর্ণ থেকে যাক। মেহরিন কে এখনই ঢাকায় নিয়ে গেলে ও আরো একা হয়ে যাবে। সুলতান নিবাসে তেমন কেউ নেই। আমি প্রতি নিয়ত এখানে ওখানে দৌড়াদৌড়ি করছি।
মহাদেবপুর থাকলে কখনও আপনার কাছে তো কখনও ও বাড়িতে থাকতে পারবে। একা লাগবে না। দেখে রাখার লোক আছে এখানে।
সংসার পড়াশোনা দুটো এক সাথে কন্টিনিউ করা খুব কঠিন। আপাতত পড়াশোনা টা মনোযোগ দিয়ে করুক। এইচএসসি টা শেষ হলে এমনিতেও এডমিশনের জন্য ঢাকায় যেতে হবে। তখন না হয় একেবারে নিয়ে যাব। আর তাছাড়া কয়েক মাস পর মেহরিন কে নিয়ে আমি একটু দেশের বাহিরে যাব। তো ওর কাগজপত্র গুলো আমাকে একটু দিয়েন। পাসপোর্ট করবো তো।

মোতালেব ভুঁইয়া তপ্ত শ্বাস ফেললো। সোলেমান আশ্বস্ত করে আসলো। জাস্ট এইচএসসি অব্দিই,তারপর সে নিজের সাথে নিয়ে আসবে মেহরিন কে।
সোলেমান রুমে ঢুকে দেখলো মেহরিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সোলেমান ধীর পায়ে এগিয়ে মেহরিনের পাশে দাঁড়ালো। মেহরিন হাল্কা পাতলা শুনেছে বাপ আর স্বামীর কথা শুরুর দিকে। সোলেমান জড়িয়ে ধরলো মেহরিন কে পেছন থেকে। গালে গাল ঘেঁষে বলল-
“ রেগে আছো এখনও?”
মেহরিন ছোট্ট করে জবাবে বলল-
“ না। ”
“ তাহলে কথা বলো। ”
“ বলার মতন তো কিছু নেই আর। সব তো বলেই দিয়েছেন। ”
“ তোমার নিজের বলার মতন কিছুই নেই?”
“ ছিলো। ”

“ তাহলে বলছো না কেনো? তুমি আমার কাছে আজ যা চাইবে আমি তোমায় তাই দিব প্রমিস। শুধু মুখ ফুটে বলে দেখো তোমার এই স্বামীর কাছে।
মেহরিন স্মিত হাসলো। লম্বা একটা শ্বাস টানলো। সবাই তো স্বামীর কাছে ভালোবাসা চায় মেহরিনও তাই চেয়ে এসেছে এতদিন। আজ না হয় অন্য কিছু চাওয়া যাক। ভালোবাসা চেয়ে নেওয়ার মতন জিনিস না৷ সেটা আসে অন্তঃস্থল থেকে আপনা-আপনি ভাবে। তার সুলতান সাহেব কি তাকে ভালোবেসে? বোধহয় না। মেহরিন আর চাইবে না ভালোবাসা। ভালোবাসা চাইলে অপেক্ষায় থাকতে হয়। এমনিতেই মেহরিনের অপেক্ষারা ফুরায় না। আজ ভালোবাসার দাবি চাইলে অপেক্ষা টা আরো দীর্ঘ হবে।
সোলেমান মেহরিনের মুখে মৃদু হাসি দেখে বলল-

“ হাসছো কেনো মেহরিন? কিছু চাওয়ার নেই?”
মেহরিন হাসি থামালো।
“ আপনার কাছে তো চাওয়ার অনেক কিছুই ছিলো সুলতান সাহেব।”
“ চাও তাহলে সবই।”
“ নাহ্ সব চাইবো না। তবে একটা জিনিস অবশ্যই চাইবো।”
“ বলো।”
“ আপনার আর আমার কবরটা যেনো পাশাপাশি হয়। আমার মৃত্যুর পর আমার কবর টা যেনো আপনার কবরের ডান পাশে খোঁড়া হয়। এই পৃথিবীতে আপনার সাথে আমার পথচলা কতটুকু তা আমি জানি না। বেঁচে থাকতে যা পাওয়া হয়নি,অন্তত মৃত্যুর পর সেটুকু যেন আমার হয়। সেখানে অন্তত আমাদের মাঝে আর কোনো দূরত্ব না থাকুক।”
সোলেমানের মুখ কালো হয়ে গেলো। গম্ভীর গলায় বলল-
“ এত কিছু থাকতে তুমি এটা চাইলে মেহরিন? আমাদের এই দূরত্ব কমে যাবে খুব শীগ্রই। তবে তুমি যেহেতু চেয়েই ফেলেছো আমার কবরের পাশে যেনো তোমার কবর হয়। আমি সোলেমান তোমার এই ইচ্ছে অবশ্যই পূরণ করবো। ঢাকায় নাকি মহাদেবপুর? ”

“ মহাদেবপুর। ”
পরেরদিনের সকালটা নতুন বছর।
সাল টা ২০২১,জানুয়ারির ১ তারিখ…
সোলেমান মহাদেবপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে আসলো। এই কবরস্থান যার তত্ত্বাবধানে চলছে তার সাথে কথা বলে অগ্রীম নিজের আর মেহরিনের কবরের জন্য কিছুটা জায়গা কিনে নিলো। সুলতানপুরের চেয়ারম্যানের ছেলে আবার ঢাকার এমপি সেজন্য বলা মাত্রই ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো। সোলেমান কবরস্থানে ঢুকে মেহগনি গাছের নিচে ১০০ বর্গফুট জায়গা ক্রয় করে নিলো। সব সময় ছায়া থাকে এই জায়গা টায়। চারিপাশে শতশত কবর। কত মানুষের প্রিয়জনরা চির নিদ্রায় শায়িত হয়ে আছে। সোলেমান সেই কবর গুলোর দিকে একবার তাকালো।

দাহশয্যা পর্ব ৫০

কবরের শেষের দিকে এক টা লোক বসে আছে । হয়তো খুব কাছের কেউ তার সামনের কবরে শুয়ে আছে। সোলেমান চোখ সরিয়ে নিলো। মৃ’ত্যু এক চিরন্তন সত্য। এই সত্য থেকে চাইলেও পালানো সম্ভব নয়। একদিন মেহরিন আর সে নিজেও পরকালের বাসিন্দা হবে। কিন্তু কে আগে এই ইহকালের মায়া ত্যাগ করে ঐ পরকালের যাত্রী হবে? সোলেমান? নাকি মেহরিন আগে? কেউ কাউকে ছাড়া বেঁচে থাকতে পারবে না।
সোলেমান কবর কর্তৃপক্ষদের বলে আসলো তাদের জায়গায় যেন ভবিষ্যতে কাউকে কবর দেওয়া না হয় সোলেমান আর মেহরিন কে ব্যতিত। তাদের মৃত্যুর পর তাদের এখানেই কবর দেওয়া হবে।

দাহশয্যা পর্ব ৫২