Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৫২

দাহশয্যা পর্ব ৫২

দাহশয্যা পর্ব ৫২
Raiha Zubair Ripti

সোলেমান মহাদেবপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থান থেকে বেরিয়ে কাঁচারীপাড়া রোড দিয়ে হেঁটে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আসলো। মন মেজাজ কেমন অস্থির হয়ে আসতেছে। বউ তার হুট করে এমন আবদার চেয়ে বসলো কেনো? সংসার টা হওয়ার আগেই মৃ’ত্যু অব্দি চলে গেলো! শহিদ মিনারে কিছুক্ষণ বসে থেকে অলংকারপুরের দিকে রওনা দিলো।
ইব্রাহিম আর ইয়াসিন ঊর্মি দের বাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরঘুর করছে। দু’বার ফোন দিয়েছিল কিন্তু রিসিভ হয় নি। ঊর্মি দের বাড়ির সামনে বিভিন্ন সবজির গাছ লাগানো। ইয়াসিন সবদিক ঘুরে ঘুরে দেখছিলো। হুট করে প্রস্রাবের চাপ পায়। ইয়াসিন আশেপাশে তাকালো। নাহ্ কেউ নেই। ইব্রাহিমের ফোনকল আসায় কানে ব্লুটুথ দিয়ে একটু সাইডে চলে গেলো। ইয়াসিন কচু গাছের কাছটায় বসে পড়লো।

ঊর্মি রান্না ঘরের মাটির উনুন থেকে ছাই উঠিয়েছে দুধ কচু গাছের গোঁড়ায় দিবে বলে। সেই ছাই গামলায় নিয়ে কচু গাছের দিকে যাওয়ার জন্য উঠানে আসতেই দেখতে পেলো কোথাকার কোন অসভ্য ছেলে যেন তাদের কচু গাছে নিচে বসে হিশু করতেছে। রাগে শরীর জ্বলে উঠলো ঊর্মির। এই কচু গুলো দিয়ে তারা মুরগির গোস, মাছ,ভাজি করে খায়। আর কোথাকার কোন বেয়াদব সেখানে বসে পরিবেশ দূষণ করছে!
ঊর্মি সাইড থেকে শোলার ঝাড়ু টা নিয়ে তেড়ে যেতে যেতে গলা হাঁকিয়ে বলল—
“ এই কে রে ওটা? বে’য়াদব ছেলেপেলে, বাসায় টয়লেট নাই? নাকি টয়লেটের টাঙ্কি ভরে গেছে? দাঁড়া আসতেছি,জন্মের হিশু করাচ্ছি। ”

ইয়াসিন মনের সুখে প্রকৃতির ডাকে সারা দিচ্ছিলো। আকস্মিক পেছন থেকে এমন গলার স্বর ভেসে আসায় ইয়াসিন ত্বরিত গতিতে পেছন ফিরে। একটা মেয়ে ঝাড়ু নিয়ে এগিয়ে আসতেছে। এদিকে প্রস্তাব টাও শেষ হয় নি। উঠে পড়াও সম্ভব নয়। জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যাবে। ইয়াসিন পড়ে গেলো মাইনকার চিপায়। কোনো রকমে বলল-
“ খালা আর একটু পড়ে আসেন। শেষ করে নেই।”
খালা বললো ঊর্মি কে! ঊর্মি দেখতে খালার বয়সী! ঊর্মি আরো জোরে তেড়ে আসতে লাগলো। ইয়াসিন পেছন ফিরে সেটা দেখেই তড়িঘড়ি করে বসা থেকে উঠে প্যান্টের চেইন লাগাতে লাগাতে দৌড় দিতে গিয়ে প্যান্টের চেইন তার মেন পয়েন্টের সাথে লেগে গেলো। ইয়াসিন ব্যথায় চিৎকার করে উঠলো দু হাত সেখানে চেপে।
ঊর্মি দাঁড়িয়ে গেলো। ঝাড়ু দেখিয়ে বলল-

“ উচিত হইছে। একদম উচিত কাজ হইছে। আরো যেখানে সেখানে প্রস্রাব করতে বসবেন? ”
ইয়াসিন ইব্রাহিম কে ধড়ফড় করে ডাকতে লাগলো—
“ ভাই ও ভাই,কই আপনি। ম’রে গেলাম আমি। ”
ইব্রাহিম ইয়াসিনের ডাক শুনে সাইড থেকে এগিয়ে আসলো। ইয়াসিন কে দু হাত চেপে মুচড়া মুচড়ি করতে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“ সাপের মতন এমন করতেছিস কেনো? সমস্যা কি?”
ইয়াসিন জায়গা দেখিয়ে কান্নার মতন করে বলল-
“ ভাই আমার টুনটুনি মনে হয় শ্যেষ। জলদি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ব্যথায় মরে গেলাম। ”
ইব্রাহিম এগিয়ে আসতে আসতে একবার সামনের দিকে তাকিয়ে ফের ইয়াসিনের দিকে তাকাতে গিয়েও ফের সামনে তাকায়। মনে হলো ঊর্মি কে দেখলো! হ্যাঁ ঊর্মিই তো! ঊর্মি দাঁড়িয়ে আছে ঝাড়ু নিয়ে। ইব্রাহিমের মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটলো। এগিয়ে গেলো ঊর্মির দিকে।

“ আরে বেয়াইন যে। ”
ঊর্মি ইয়াসিনের দিকে ঝাড়ু তাক করে বলল-
“ এই লাফাঙ্গা কে চিনেন?”
ইব্রাহিম ইয়াসিন কে দেখে বলল-
“ হুমম চিনি। কেনো কি করেছে?”
“ আমাদের কচু গাছের নিচে হিশু করতে বসেছিল। কতবড় নির্লজ্জ ছেলে। দিনদুপুরে যার-তার বাড়ির সামনে বসে পড়ে। ”
ইব্রাহিম চোখ পাকিয়ে তাকালো ইয়াসিনের দিকে। ইয়াসিন সেটা দেখে বলল-
“ আপনে চোখ পাকায় তাকান ক্যা? এনে আহেন। আমারে ডাক্তারের কাছে নিয়া যান। ঐ খালা আম্মা আমারে দৌড়ানি দিছে বলেই আমার এই হাল। ”
খালাম্মা ডাক শুনে আরো রেগে গেলো ঊর্মি। তেড়ে যেতে গেলে ইব্রাহিম আঁটকে দেয় হাত ধরে। ঊর্মি ধস্তাধস্তি করে ঝাড়ু ইয়াসিনের দিকে তাক করে বলে-

“ একদম মে’রে ফেলবো বুইড়া দামড়া খচ্চর বেডা আমায় খালা বললে। ”
ইব্রাহিম ইয়াসিন কে বলল-
“ বেয়াদব ও তোর ভাবি হয়।”
এ কথা কানে আসতেই ঊর্মি শান্ত হয়ে যায়। ইব্রাহিমের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল-
“ আমি ওর ভাবি হই মানে? ”
ইব্রাহিম ঊর্মির বাহু ধরে ঊর্মি কে বাড়ির দিকে ঘুরিয়ে বলল-
“ সময় হলে বুঝবা। এখন বাসায় গিয়ে মাথা ঠান্ডা করো। বৃষ্টি আসলে সব ধুয়ে চলে যাবে। এখন রাস্কেল টা কে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেত দাও। সম্পদ টা নষ্ট হয়ে গেলে বেচারার আর বিয়ে হবে না। ”
ইব্রাহিম ইয়াসিনের ঘেটি টা ধরে আগাতে লাগলো। মাঝপথে দেখা হলো সোলেমানের সাথে। সোলেমান অন্যমনষ্ক হয়ে হাঁটছিল। পাশ দিয়ে ইব্রাহিম ইয়াসিন যাচ্ছিলো তারপরও সে বুঝলো না! ইব্রাহিম সোলেমানের হাত টেনে বলল-

“ কি রে মন কোথায় তোর? আর কোথায় গিয়েছিলি তুই?”
সোলেমানের হুঁশ ফিরলো। আনমনে বলল-
“ কবরস্থানে। ”
ইব্রাহিম ভ্রু কুঁচকালো।
“ করস্থানে কেনো? ”
“ নিজেদের কবর ঠিক করে আসলাম। ”
ইব্রাহিমের এই কথার কোনো মর্মার্থ বুঝতে পারলো না।
“ ঠিক বুঝলাম না। ”
“ মেহরিন আমার কাছে এই প্রথম কিছু চেয়েছে। ”
“ সেটা তো খুশির কথা। ”
“ জানিস কি চেয়েছে? ”
“ কি চেয়েছে? ”

“ তার নামে কিছু মাটি চেয়েছে। যাতে মৃত্যুর পর তার দাফন টা আমার কবরের পাশে হয়। পৃথিবীতে এত কিছু থাকতে আমার বউ এটা চাইলো! আমি মেলাতে পারছি না। ও এটা কেনো চাইলো? আমি নাও করতে পারি নি। প্রথম মুখ ফুটে কিছু চেয়েছে। সারা রাত আমার নির্ঘুমে কেটেছে। বছরের প্রথম দিনটায় আমি, আমার আর আমার বউয়ের জন্য কবরের জমি কিনে আসলাম! ”
“ আচ্ছা অস্থির হোস না। মেহরিন কে জিজ্ঞেস কর এত কিছু থাকতে এটা কেনো চাইলো? নিশ্চয়ই বলবে। ”
“ হুমম।” কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইয়াসিনের দিকে চোখ গেলো। ইয়াসিন দু হাত চেপে মোচড়াচ্ছে দেখে বলল— “ এটার আবার কি হলো? ”
-“ মেন পয়েন্টে চেন আঁটকে গিয়েছিল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি। ”
সোলেমান যেতে যেতে বলল—

“ নষ্ট হয়ে যাক ওর মেন পয়েন্ট। ছা’গলের চার নাম্বার বাচ্চা একটা।
ফ্রেন্ড দের সাথে গতকাল রাতে বাসার ছাঁদে থার্টি ফার্স্ট নাইট সেলিব্রেট করে ভোরের দিকে রুমে এসে ঘুমিয়েছিল তেহরান। তানভীর ভীষণ রেগে আছে ভাইয়ের উপর। তার ফ্রেন্ড’দের মাঝে তানভীর কে ঢুকতে দেয় নি তেহরান। কিসব যেনো দামি দামি বোতল এনেছিল। তানভীর ছাদের দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিল এই আশায় ভাই তাকে ঢুকতে দিবে। ওসব খেতে দিবে। কিন্তু না! একটা মুরগির রান ধরিয়ে দিয়ে মুখের উপরে দরজা আঁটকে দিয়েছে! ভাইয়ের বন্ধুরা পর্যন্ত বলেছে তানভীর কে আমাদের সাথে নে। কিন্তু তেহরান তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলো। সে নিবে না মানে নিবে না। সেই রাগে তানভীর তেহরানের ল্যাপটপ টা ওয়াশরুমের বালতি তে পানির সাথে গুড়া পাউডার মিশিয়ে উপর দিয়ে আধোয়া জামাকাপড় ভিজিয়ে রেখে বাহিরে চলে গেছে। আর কাজের বুয়া কে বলে গেছে জামাকাপড় গুলো ধুয়ে দিতে কাজ সেরে।

তেহরান ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে এক কাপ কফি নিয়ে টেবিলে চেয়ার টেনে বসে। অনলাইনে কিছু কাজ আছে। বলাবাহুল্য তেহরান বড্ড ভ্রমণ পিপাসু একজন মানুষ। এই নিয়ে ১০-১২ টা দেশ ঘুরা হয়েছে। ইন ফিউচার সে আরো ঘুরবে। করোনার জন্য আপাততঃ সব স্থগিত থাকলেও গতকাল রাতে ফ্রেন্ড’দের সাথে আলোচনায় এসে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা খুব শীগ্রই বাংলাদেশের কোনে এক জায়গায় ট্যুর দিবে। হরর টাইপের কোনো প্লেসে যাবে। কিন্তু টেবিল জুড়ে ল্যাপটপের ছিটেফোঁটাও নেই।
হাঁক ছেড়ে মা কে ডেকে জিজ্ঞেস করলো-

“ মা আমার ল্যাপটপ টা কোথায়? ”
তানজিলা বেগম টিভি দেখছিলো। ছেলের ডাক শুনে মনোযোগ হারলো বলে রেগে বলল-
“ তোর ল্যাপটপ কোথায় সেটা আমি কিভাবে জানবো? তোর রুমে আমি থাকি?”
“ কেউ না নিলে কি ল্যাপটপ একা একাই গায়েব হয়ে যাবে? হাত পা আছে ল্যাপটপের? ”
“ কি জানি হয়তো আছে তোর ল্যাপটপের হাত পা। ”
তেহরান রুম টা তন্ন তন্ন করে খুঁজলো না ল্যাপটপ নেই। তেহরান মায়ের রুমে এসে বলল-
“ তোমার নবাবজাদা ছোট ছেলে কোথায়? নিশ্চয়ই ও লুকিয়েছে ল্যাপটপ টা। তাড়াতাড়ি বের করতে বলো। ”
তানজিলা চ্যানেল বদলাতে বদলাতে বলল-
“ বাসায় নাই। নবাবজাদা কোথায় যেন বেরিয়েছে। ”
পেছন থেকে কাজের বুয়া জরিনা তার ভেজা হাতে ল্যাপটপ টা নিয়ে এসে বলল-
“ খালা গো আপনাগো লটপট না এটা? ”
তেহরান আর তানজিলা বেগম দুজনেই দরজার দিকে তাকালো। জরিনার হাতে নিজের ল্যাপটপ টা দেখে এগিয়ে এসে হাত থেকে নিয়ে দেখলো ঠিক আছে কি না। কিন্তু না একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো কাজ করছে না।
তেহরান রেগে বলল-

“ এটার গায়ে পানি আসলো কি করে জরিনা? ”
“ এটা তো পানিতেই আছিলো। আমি জামাকাপড় ধুইতে গিয়া দেখি নিচে গাপটি মাইরা লুকায় আছে। আপনে খুঁজতাছেন দেখে নিয়ে আইছি তুলে। ”
তেহরান ল্যাপটপ টা তানজিলা বেগমের কোলে দিয়ে বলল-
“ দেখছো কি অবস্থা করছে ল্যাপটপ টার? একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। ”
তানজিলা বেগম জরিনার উপর চড়াও হয়ে বলল-
“ ল্যাপটপ গেলো কি করে জলে? জামাকাপড় দেখেশুনে ভেজাবি না? ”
“ আমি ভিজাই নাই তো খালা। তানভীরে আমারে বলে গেছে জামাকাপড় গুলো ধুয়ে দিতে। আমি তো সেই কথা শুনেই ওয়াশরুমে ঢুইকা জামাকাপড় ধুইতে গিয়া দেখি জামাকাপড়ের তলে এটা। ”
তেহরান রাগে ফেটে যেতে লাগলো।
“ তোমার ছেলে ইচ্ছে করে এটা করছে, গতকাল রাতে নেই নি বলে। আজ তোমার ছেলের একদিন কি আমার একদিন। ল্যাপটপ টায় নিউ প্রজেক্টের এডিটিং কাজ চলছিলো। তোমার ছেলে সব টা শেষ করে দিলো! ওরে আজকে আমি কে’টে টু’করো টু’করো করে বুড়িগঙ্গায় ভা’সিয়ে দিয়ে আসবো। চেনে নাই তো আমাকে এখনও। বাসায় আসুক খালি একবার।
তানজিলা বেগম বিরক্তিতে চ বর্গীয় উচ্চারণ করলো। ছোট ছেলেটা এত পাজি যা বলার বাহিরে। সব সময় বড়টার পেছন লাগে। আজ আসুক বাসায় সেও দুমুড় দামুড় বসাবে পিঠে। ফাজিলের হাড্ডি একটা।

সোলেমান বাড়িতে ফিরে সোজা মেহরিনের রুমে ঢুকে দেখলো মেহরিন পড়ার টেবিলে বসে আরিফ আজাদের প্যারাডক্সিকাল সাজিদ বইটা পড়ছে। সোলেমান বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলো। মেহরিন একবার আড়চোখে সোলেমান কে দেখে ফের পড়ায় মনোযোগ দিলো।
সোলেমান অপেক্ষা করতে লাগলো মেহরিনের পড়া শেষ হবার। কিন্তু নাহ্ মেহরিন প্যারাডক্সিকাল সাজিদ বইটা শেষ করে হুমায়ুন আহমেদের মধ্যাহ্ন বইটা হাতে তুলে নিয়েছে। সোলেমান আর অপেক্ষা করতে না পেরে বসা থেকে উঠে এগিয়ে এসে বলল-
“ কথা আছে তোমার সাথে আমার। বইটা পরে পড়লে হবে না?”
মেহরিন বইটা বন্ধ করলো। সোলেমানের দিকে ঘুরে বলল-
“ এত অস্থির দেখাচ্ছে কেনো? সব ঠিকঠাক? ”
“ কিচ্ছু ঠিকঠাক নেই। আর্জেন্ট কথা বলা দরকার তোমার সাথে। ”
মেহরিন বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
“ কফি নিয়ে আসবো? ভালো লাগবে খেলে। ”
-“ আই ডোন্ট নিড কফি। আই নিড টু টক টু ইউ মেহরিন। ”
মেহরিন সোলেমানের হাত টেনে চেয়ারে বসালো। তারপর সে টেবিলে এক হাত ঠেকিয়ে কিছুটা কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে বলল-

-“ বলুন আমি শুনছি। ”
-“ তুমি কবর কিনে রাখতে বললে কেনো তোমার জন্য? আমি কি খুব খারাপ? আমার সাথে থাকার ইচ্ছে নেই তোমার? ”
মেহরিন স্মিত হাসলো। এই বিষয় টা নিয়ে এত অস্থিরতা বহন করছে তার সুলতান সাহেব! মেহরিন জানতে চাইলো-
“ মানুষ গড়ে বাঁচে কত বছর সুলতান সাহেব?”
“ সত্তর, খুব টেনেটুনে আশি বছর। ”
“ আমার কাছে এই সত্তর আশি বছরের জীবন টাকে খুব ছোট মনে হয়। মানব জীবন টা আরো বেশি হওয়া উচিত ছিলো। এই ধরুন একশোর বেশি। তাহলে জীবনটাকে লম্বা বলতে পারতাম। এই সত্তর বছরের জীবনে আমার আপনার অপেক্ষা করতে করতেই কেটে যাবে। ”
সোলেমান মেহরিন কে টেনে নিজের কোলে বসালো। ঘাড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল-
“ মোটেও অপেক্ষা করাবে না আর তোমার সুলতান সাহেব।”
“ আমার অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। আর সমস্যা হবে না অপেক্ষা করতে। আপনার কাজকর্ম শেষ হলে ইচ্ছে করলে আসবেন। আমি অপেক্ষায় থাকবো। ”

“ এত অভিমান! ”
“ উঁহু। বাস্তব অর্থে বললাম। ”
“ তোমাকে ছাড়া থাকাটা তোমার সুলতান সাহেবের জন্য কতটা কষ্টের যদি তুমি বুঝতে…।”
“ কষ্টের হবে কেনো? ভালো তো বাসেন না আমায়। তাহলে কষ্ট তো হওয়ার কথা নয়? আমি বাসি বলেই তো কষ্ট হয় আমার। ”
“ এই যে তোমাকে দেখলে আমার ভালো লাগে,অশান্ত বুকের ভেতরটায় শান্তি লাগে,চোখ জুড়ায় এটা কি যথেষ্ট নয় বোঝার জন্য? ”
“ মোহ কে আবার ভালোবাসা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন না তো?”
“ যদি তাই হয়! তাহলে আমি নওয়াজ সোলেমান সুলতান এই মোহ তেই আজীবন আঁটকে থাকতে চাই। ”
“ তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। যদি আমি ব্যতিত আপনার নজর তো দূরে থাক,আপনার ছায়াও যদি অন্য কোনো নারীর উপর পড়ে তাহলে সেদিনই আপনার আর আমার পথ চিরকালের জন্য আলাদা হয়ে যাবে। আমি সব পারবো,দরকার পড়লে সারা জীবন অপেক্ষা করবো আপনার জন্য। তারপরও আপনাকে আমি অন্য কারো সাথে শেয়ার তো দূরে থাক,অন্য কারো নামের পাশেও সহ্য করবো না। ”
সোলেমান মেহরিন কে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল-

“ এমন দিন আসার আগে আমার মরণ হোক,তারপরও তুমি ব্যতিত অন্য কোনো নারীর দিকে আমার নজর না পড়ুক। এখন কবরের বিষয় টা ক্লিয়ার করো। কেনো চাইলে ওটা?”
“ মৃ’ত্যু যে চিরন্তন সত্য মানেন তো এটা?”
“ ভীষণ ভাবে মানি। ”
“ অথচ এই চিরন্তন সত্য নিয়ে আমরা ক’জন ভাবি? আমরা ভোগ বিলাস ধনসম্পদ এসবের পেছন ছুটে চলি। কিন্তু বলা হয়েছে দুনিয়া হচ্ছে একটা মৃতদেহ, আর যারা এর পিছনে দৌড়ায় তারা কুকুর। আমরাও সেই কুকুরের মতন এই দুনিয়ার পেছন ছুটে চলছি অথচ আমাদের শেষ গন্তব্য মৃত্যুর পরে আখিরাতে। যেটার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। আমরা কি নিয়ে যাব ঐ দুনিয়ার জন্য? সব তো কামাচ্ছি এই দুনিয়ার ভোগ বিলাসের জন্য।
মৃত্যুর পর রবের সামনে দাঁড়িয়ে তখন আমরা কি বলবো? বলবো- দুনিয়ার পেছন ছুটতে গিয়ে আমাদের আমল ছুটে গেছে! সময় পাই নি!

তখন তো আল্লাহ বলবে- তোমাদের কি দুনিয়ায় শুধু এসবের পেছনে ছোটার জন্য পাঠানো হয়েছিল? আমি মানুষ জ্বিন তৈরি করেছি আমার ইবাদত করার জন্য। দিন রাত ২৪ ঘন্টায় তোমাদের আমায় স্মরণ করার জন্য একটুও সময় হয় নি? ১০ টা মিনিট বের করে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার সময় হয় নি! এত টাকা পয়সার পেছন ছুটলে অথচ তার একটা পয়সাও যাকাতে দান হয় নি!
আমরা তখন কি জবাব দিবো? আমাদের তখন কিচ্ছু করার থাকবে না আর। আমরা দুনিয়ার জীবন কে ভালোবাসতে গিয়ে আখিরাত কে ভুলে যাচ্ছি!
ইসলামে আরো বলা হয়েছে, কারো মৃত্যু হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করা উচিত।

অযথা দেরি করা বা দাফন বিলম্বিত করা শরীয়তে অপছন্দনীয়।
সেখানে কবরের জায়গা আগে ঠিক করা থাকলে মৃত্যু হলে ঝামেলা কম হয়, দাফন দ্রুত করা যায় যেটা সুন্নাহ। মৃত্যুর পর আত্মীয়রা দিশেহারা হয়ে যায়, তখন জায়গা খোঁজা, কবর কিনতে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। নিজের কবরের জায়গা জানা থাকলে মাঝে মাঝে সেটা দেখে মানুষ নিজের শেষ পরিণতি মনে করতে পারে। এতে গুনাহ থেকে বাঁচার অনুপ্রেরণা আসে। কবর বেশি বেশি স্মরণ করা উচিত, কারণ এটা মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
তাই আমি চাই না সুলতান সাহেব আমার মৃত্যুর পর আমার কবর কোথায় হবে,কোথায় দাফন হবে এসব নিয়ে কথাবার্তা বলে সময় নষ্ট করা হোক। এই যে আপনাকে আমার ইচ্ছে টা আমি জানিয়ে দিয়েছি। আশা করি আপনি অথবা আপনারা তখন সেই মোতাবেক আমার দাফন সম্পূর্ণ করবেন। এই আরকি। আমি তো মুসলিম পরিবারের মেয়ে। আমাকে আমার এই জনমের সাথে সাথে আমার আখিরাত কে নিয়েও ভাবতে হবে। যদিও সব পাই টু পাই সব কিছু পালন করা আমার দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না বা আমি পারছি না। যতটুকু পারা উচিত ততটুকু অন্তত করে যাওয়া উচিত বলে মনে করি।

সোলেমান নিশ্চুপ হয়ে শুনে গেলো কথাগুলো।
তার জীবনে নামাজ নামমাত্র। বছরে হাতে গোনা দু-একদিন হয়তো পড়ে,তাও দায়সারা ভঙ্গিতে।
আল্লাহর কাছে সর্বশেষ কী চেয়েছিল সোলেমান ? মনে করার চেষ্টা করলো। মনে পড়লো সাত বছর বয়সে মায়ের প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল সোলেমান । কিন্তু আল্লাহ বাঁচায় নি তার মা কে। তারপর আর কোনো কিছু চাওয়া হয় নি আল্লাহর কাছে।
মানুষ বলে,সুখে দুঃখে, প্রেমে পড়লে বা কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসলে মানুষ আল্লাহর কাছে অশ্রুসিক্ত হয়ে প্রার্থনায় তার প্রিয়জনকে চায়। অথচ সোলেমান কখনও তা করে নি। প্রেমাকে ভীষণভাবে ভালোবেসেছিল, প্রচণ্ডভাবে, কিন্তু জায়নামাজে বসে তাকে চায় নি কখনও। এমনকি প্রেমা চলে যাওয়ার পরও আল্লাহর কাছে সে কোনোদিন নালিশ করে নি। বরং, ঘৃণা আর অভিমানেই ডুবে থেকেছে এতটা, যে অভিযোগ জানানোর কথাই মনে আসে নি।

সোলেমানের যুক্তি সহজ। তার ভাষ্যমতে, সে কেনো চাইবে? একবার তো চেয়েছিল, মায়ের প্রাণ ভিক্ষা। কিন্তু সে প্রার্থনা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই চাওয়ার অভ্যাসই ছেড়ে দিয়েছে।
এখন আর কিছু চায় না সোলেমান। নামাজ পড়ে কারণ বলা হয়েছে, যাকাত দেয় কারণ বিধান দেওয়া হয়েছে। রমজানে রোজা রাখে, কারণ এটাই নিয়ম। কিন্তু হৃদয়ের গভীর থেকে কিছু চাওয়া? তা সোলেমানের জীবনে নেই। যা কিছু করে তা দায়সারা ভঙ্গিতে করে। না আছে ভক্তির উষ্ণতা,না আছে প্রার্থনার আকুলতা,না আছে কোনো প্রত্যাশার ঝলক।
সোলেমানের জীবন এক নিরাসক্ত যাপন। বাহ্যিকভাবে সব কিছু পালন করলেও অন্তরের ভেতরটা রয়ে গেছে শুন্য, একরোখা অভিমান আর চিরস্থায়ী নালিশহীনতার অন্ধকারে।

রুমাইসা সেই সন্ধ্যা থেকে ফোন হাতে নিয়ে বসে আছে। অনলাইনে তার বাপ ভাইদের ব্যতিত সে একজন কে ফলো করে। আজ একটা নিউ ভিডিও আসার কথা ছিলো তার। কিন্তু আসছে না। সে একজন ব্লগার। খুব পপুলার একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তবে দুঃখের বিষয় এটা যে তাকে কেউ দেখে নি এখনও। শুধু তার ভয়েজ শোনা হয়েছে। আবছা পেছন থেকে দেখা হয়েছে। তবে সামনা-সামনি স্পষ্ট কোনো ছবি বা ভিডিও নেই।
পেজের নাম TAT। টিএটি মানে কি তা রুমাইসা জানে না। যেহেতু ভ্রমণ সংক্রান্ত ব্লগিং করে তাই রুমাইসা টিএটি এর মানে ধরে নিয়েছে- ট্রাভেলার এজেন্সি তূর্ণ। হ্যাঁ লোকটার নাম তূর্ণ। রুমাইসা তার ফেক আইডি দিয়ে তার পেজ, আইডি,ইউটিউব ফলো করে। TAT ব্লগিং পেজের ফলোয়ার ৩ মিলিয়ন ক্রস করেছে কদিন আগে। ইউটিউবে সাবস্ক্রাইবার ২.৫ মিলিয়ন। পেজ ইউটিউবের নাম টা কি অদ্ভুত! TAT পেজ থেকে একটা আইডি কে ফলো করা। নাম তূর্ণ। আগে পরে কিচ্ছু নেই। নামটা ভীষণ পছন্দ রুমাইসার। তূর্ণ আইডি তে ফলোয়ার ৮৯৯ কে। রুমাইসা ধরেই নিয়েছে এই পেজের ওনার তূর্ণ।

অপেক্ষা করতে করতে রাত ১২ টা বেজে যাওয়ার পরও যখন আর কোনো ভিডিও আসলো না তখন অধৈর্য্য রুমাইসা তার ফেক আইডি লগইন না করে রিয়েল আইডি দিয়েই তূর্ণর আইডির লাস্ট পোস্টের নিচে কমেন্ট করলো-
“ ভিডিও কি আর আসবে না? কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। ১২ টা পাড় হয়ে এখন ১ টা বাজতে চললো। না আসলে বলে দেন আর অপেক্ষা করবো না। ঘুমিয়ে পড়বো। ”

দাহশয্যা পর্ব ৫১

যদিও তার থেকে রিপ্লাই আসার সম্ভাবনা নেই। তারপরও রুমাইসা অধৈর্য হয়ে করেই ফেললো। ফেক আইডি দিয়ে কত-শত কমেন্ট করেছে। রিপ্লাই তো আসা দূর,একটা রিয়াক্ট ও দিত না লোকটা। তারপরও শুধু মাত্র লোকটার ভয়েস শোনার জন্য মরিয়া হয়ে যায় রুমাইসা।

দাহশয্যা পর্ব ৫৩