দাহশয্যা পর্ব ৫৩
Raiha Zubair Ripti
কুয়াশাচ্ছন্ন এক বিকেল। রোদের ছিটেফোঁটা নেই অলংকারপুর গ্রামে। সোলেমান ব্লু রঙের শার্ট পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাতা ফোল্ড করছে। পাশেই মেহরিন বোরকা পড়ে হাতে হিজাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোলেমানের শেষ হলে সে হিজাব টা বাঁধবে আয়নায় দেখে দেখে। কিন্তু মহাশয়ের এখনও শেষ হচ্ছে না। হাতা ফোল্ড করে এখন মাথার চুল গুলো সেট করছে তো নিজের ফেস টাকে দেখছে। মেহরিন সরু চোখে দেখতে লাগলো। সোলেমান আয়নায় থাকা মেহরিনের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ দাঁড়িয়ে আছো কেনো মিসেস সুলতান ? রেডি হও। যেতে হবে তো নাকি? ”
মেহরিন হাতের হিজাব টা দেখিয়ে বলল-
“ আপনি না সরলে বাঁধবো কি করে? আর রেডিই বা হবো কি করে? ”
সোলেমান বা হাত দিয়ে মেহরিনের কোমর টেনে পাশে দাঁড় করিয়ে বলল-
“ নাও রেডি হও। ”
মেহরিন ড্রেসিং টেবিলের উপরে রাখা বক্স থেকে সুঁচ পিন নিয়ে হিজাব বাঁধতে লাগলো। পাশ থেকে সোলেমান দেখতে লাগলো বউয়ের হিজাব বাঁধা।
হিজাব বাঁধা শেষে মেহরিন হিজাবের উপর দিয়ে নিকাব টাও বেঁধে নিলো। তারপর আয়নায় শরীর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো পেছন দিকে সব ঠিকঠাক আছে কি না। নাহ্ সব ঠিকঠাকই আছে। মেহরিন হাতে পায়ে ময়েশ্চারাইজার মেখে নিলো।
সোলেমান ময়েশ্চারাইজার দেখে বলল-
“ আমাকেও দাও। আমিও নেই হাত পায়ে। ”
মেহরিন নেভিয়া ময়েশ্চারাইজারের কৌটা টা বাড়িয়ে দিলো। সোলেমান মূলত তার ফেসের জন্য ব্যবহার করে -ডিওর ল’অর দে ভি এর ময়েশ্চারাইজার ক্রিম টা। আর বডির জন্য- লা মের দ্য বডি ক্রিম।
নেভিয়া টা জাস্ট হাতে মাখলো সোলেমান। শার্টের উপর দিয়ে ব্লাক ব্লেজার টা পড়ে জুতাটা পড়ে নিলো।
দুজনে সম্পূর্ণ রেডি হয়ে তারপর রুম থেকে বের হলো। মোতালেব ভুঁইয়া, সানজিদা বেগম, সেরিন,ইব্রাহিম, ইয়াসিন বসার ঘরে বসে অপেক্ষা করছিলো। দু’জন আসতেই মোতালেব ভুঁইয়া দাঁড়িয়ে গেলেন। মেয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে আদুরে গলায় বললেন-
“ খারাপ লাগলে আব্বুকে ফোন কইরো। আমি চলে আসবো কেমন?”
মেহরিন ছোট্ট করে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। মোতালেব ভুঁইয়া সোলেমান কে বলল-
“ সাবধানে যাইও বাবা। সুযোগ সময় পেলে আইসো। ”
সোলেমান মেহরিনের হাত মুঠোয় নিয়ে বলল-
“ জ্বি সময় পেলে আসবো। আপনি ঢাকায় গেলে অবশ্যই বাড়িতে আসবেন। ”
সোলেমান আর মেহরিন কে এগিয়ে দিতে মোতালেব ভুঁইয়া গাছ বাগান অব্দি আসলো গাড়ির কাছে।
ঊর্মি মেহরিনের চলে যাওয়ার খবর শুনে সেও গাছ বাগানে আসে। ইব্রাহিমের সাথে চোখাচোখি হয়। সন্তপর্ণে চোখ সরিয়ে ঊর্মি মেহরিনের সাথে দেখা করে।
সোলেমান মেহরিন পেছনের সিটে গিয়ে বসে। ইয়াসিন ভুলেও ঊমির দিকে তাকায় নি। খালাম্মার চাহনি কড়া। লজ্জা পাচ্ছে ইয়াসিন। ইব্রাহিম গাড়িতে উঠার সময় ঊর্মির গা ঘেঁষে গেলো। ঊর্মি ঘাড় বেঁকিয়ে তাকায়। ইব্রাহিম চোখ মেরে বলল- ” খোদা হাফেজ বেয়াইন। ভেরি সুন দেখা হবে।
ঊর্মি আশেপাশে তাকায়। অসভ্য লোক একটা। ইয়াসিন গাড়ি স্টার্ট দেয়।
কয়েক মিনিটের মধ্যে তারা সুলতানপুর এসে পড়ে। রুমাইসা তখন বসার ঘরে বসে টিভি দেখছিলো। ভাই ভাবি এসেছে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলো।
আফিয়া সুলতান ও নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। আজ রাত টা থেকে কাল সকালে চলে যাবে সোলেমান, ইব্রাহিম আর ইয়াসিন।
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে রুমে চলে গেলো। যাওয়ার আগে বলে গেলো এক কাপ চা আর এক মগ কফি দিতে।
ইব্রাহিম ইয়াসিনও চলে গেলো নিজেদের রুমে।
সন্ধ্যার পর এজওয়ান নিবাসে ফিরে হাতে দুটো প্যাকেট নিয়ে । এই শীতের ভেতরও তার শরীর ঘামে ভিজে আছে। মাহি রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলো। এজওয়ান রুমে ঢুকেই সারা রুমে চোখ বুলিয়ে মাহি কে খুঁজে। নাহ্ নেই। ক্লান্ত দেহ নিয়ে গায়ের জ্যাকেট টা খুলতে খুলতে চেঁচিয়ে বলল-
“ তরিকুলের বেটি কইরে? এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে আসো। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গেছে। ”
মাহি এজওয়ানের ডাক শুনে বেলকনি থেকে রুমে আসলো। এজওয়ানের হাতের কাছেই পানির জগ। অথচ হাত বাড়িয়ে না নিয়ে তাকে ডাকছে! বিরক্তিকর। মাহি পানি গ্লাসে ঢেলে এগিয়ে দিলো। এজওয়ান ঢকঢক করে খেয়ে গ্লাস টা বাড়িয়ে দিলো। মাহি গ্লাস টা জায়গা মতো রেখে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে এজওয়ান ডেকে বলল-
“ এই তরিকুলের বেটি কই যাও? ”
মাহি দাঁড়িয়ে গিয়ে দাঁত চেপে বলল-
“ মরতে যাই। যাবেন? ”
“ আমাকে মা’রতে এসে নিজেই ম’রতে চাচ্ছো! ভেরি স্ট্রেঞ্জ। ভালো টালো বেসে ফেললা নাকি আবার? ”
“ ভালোবাসা মাই ফুট। ”
“ মাই হার্ট। ”
কথাটা বলে বসা থেকে উঠে মাহির হাত টেনে রুমে নিয়ে আসলো। ফ্লোরে বিছানা ঘেঁষে থাকা দুটো প্যাকেট মাহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ ফর ইউ মিসেস এজওয়ান সুলতান। ”
মাহি ভ্রু কুঁচকালো। জানতে চাইলো।
“ কি আছে এর ভেতরে? ”
এজওয়ান প্যাকেট দুটো হাতে ঠেসে ধরিয়ে দিয়ে বলল-
“ মুরগির পটি আর ছাগলের পটি আছে, রুটি দিয়ে ভরিয়ে ভরিয়ে খাও। ”
মাহি প্যাকেট দুটো ফেলে দিতে চাইলে এজওয়ান চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল-
“ ফেলে দিলে খবর আছে। একদম তুলে আছাড় মে’রে ভর্তা বানিয়ে ফেলবো বলে রাখলাম। ”
মাহি সোফায় বসে প্যাকেট টা খুললো। একটা ব্লাক কালারের জর্জেট শাড়ি। মাহি কোনোদিন শাড়ি পড়ে নি। ইনফিউচার কোনো দিন পরবে কি না এতেও সন্দেহ। শাড়িটা পাশে রেখে অন্য প্যাকেট খুললো। সেখানে লাল রঙের ছোট্ট একটা বক্স। মাহি বক্সটা খুললো। ছোট্ট সাদা ডায়মন্ডের একটা নাক ফুল আছে সেখানে।
মাহি দুটো জিনসের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ এইসব কার জন্য? ”
এজওয়ান বিছানায় চিৎ করে শুয়ে বলল-
“ আমার একটা আ’গুন সুন্দরী বউ আছে তারজন্য নিয়ে এসেছি। পছন্দ হয়েছে কি না জানানো হোক।
“ ভীষণ বাজে দেখতে। ”
এজওয়ান মাহির দিকে ঘুরে হাতে ভর দিয়ে মাথা ঠেকিয়ে বলে-
“ ঠিক তোমার মতন তাই না? ”
“ শাট-আপ। ”
“ ইউ শাট-আপ তরিকুলের বেটি। কাল পড়বে শাড়ি টা। তোমায় শাড়ি পড়া অবস্থায় দেখিনি কোনোদিন। আমার খুব ইচ্ছে তোমায় কালো রঙের শাড়িতে দেখবো। আর নাকফুল টা আনো পড়িয়ে দেই। বিবাহিত নারী তুমি। অথচ তার কোনো লক্ষণ নেই চেহারায়। না হাতে চুড়ি পরো আর না নাকে নাক ফুল। ”
“ জীবনেও পড়বো না। এই শাড়িটা দিয়ে ঘর মুছবো। আর নাক ফুল টা বেচে আপনার কাফনের কাপড় কিনবো। বুঝেছেন?”
“ বুঝলাম। এতটাও সৌভাগ্যবান হইনি যে ম’রার পর কাফনের কাপড়টাও জুটবে কপালে। হয়তো এখানে ওখানে ম’রে পঁচে গলে থাকবো। যাই হোক ত্যাড়ামি করো না। ঝগড়ার মুডে নেই আমি। অনেক কাজ করেছি আজ। নাক ফুল টা পড়ে নাও। সুন্দর দেখাবে। ”
মাহি নাকফুল টা বক্সে ভরে রুম থেকে চলে গেলো। এজওয়ান তপ্ত শ্বাস ফেললো। উপর হয়ে শুয়ে পড়লো। শরীর টা আর চলছে না। এত চাপ! শরীর কুলাচ্ছে না।
মাহি নিচে নেমে দেখলো বাশার সুলতান চেয়ারে বসে চা খাচ্ছে। মাহির ইচ্ছে করলো গরম চা পুরোটা মাথায় ঢেলে দিতে। অসভ্য বর্বর লোক একটা।
বাশার সুলতান মাহিকে দেখে একটা হাসি উপহার দিলো। মাহি সেই হাসি উপেক্ষা করে চলে গেলো বাহিরে। বাশার সুলতানের মুখটা চুপসে গেলো। ছেলে বলে দিয়েছে তার বউয়ের সাথে বাজে ব্যবহার করলে ছেড়ে দিবে না। সেজন্য একটু ভালো ব্যবহার করছিলো। কিন্তু মেয়েটার অহং বেশি। একটুও পছন্দ না। ছেলে কি দেখে পাগল হলো আল্লাহই জানে।
মাহি বাহিরে এসে আশেপাশে তাকালো। গেটের বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। মাহি এগিয়ে গেলো। বেলকনিতে যখন দাঁড়িয়ে ছিলো মাহি তখনই সাফওয়ান জানিয়েছে সে দেখা করতে চায়। বাড়ির বাহিরে আছে সে। এরমধ্যেই এজওয়ান চলে আসে বলে তখন বের হতে গিয়েও এজওয়ান থামিয়ে দিয়েছিল।
মাহি সাফওয়ানের পেছনে দাঁড়ালো।
“ এই অসময়ে দেখা করতে চাওয়ার মানে কি?”
সাফওয়ান মাহির কন্ঠ শুনেই পেছন ফিরে ঘুরে দাঁড়ায়। মাহি লক্ষ্য করলো সাফওয়ানের হাতে দুটো প্যাকেট। মাহি ভ্রু কুঁচকালো। সাফওয়ান একটা প্যাকেট মাহির হাতে ধরিয়ে দিয়ে হাসি মুখে বলল-
“ এডভান্স হ্যাপি বার্থডে মাহি। রাত পোহালেই তোমার জন্মদিন। আমি তো আর চাইলেই আগের মতন যখন তখন চলে আসতে পারবো না। তাই ১২ টা বাজার আগেই আসতে হলো। ”
মাহির নিজেরও মনে নেই যে আগামীকাল ৪ ই জানুয়ারি তার বার্থডে। অথচ সাফওয়ানের ঠিকই মনে আছে। গত বারের বার্থডে টায় সাফওয়ান মাহিকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ থেকে কানাডা গিয়েছিল। কত এনজয় করেছে সেই দিন গুলোতে। আর এখন জীবনে সুখ নেই। সাফওয়ান কেকের বক্স টা খুললো। মাহির ফেবারিট চকলেট কেক এনেছে। সাফওয়ান মোমবাতি জ্বালালো। মাহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ ফু দিয়ে কাটা যাক। ”
মাহির মুখে হাসি আসলো চলে। হাসি মনেই ফু দিতে গিয়ে বেলকনিতে চোখ আঁটকে গেলো। এজওয়ান দু হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে তার দিকেই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।। মাহি তাকাতেই এজওয়ান চলে গেলো বেলকনি থেকে।
মাহির মুখের হাসি উবে গেলো। এই একটা লোক তার জীবনে না আসলে কি এমন ক্ষতি হতো? মন বিষিয়ে গেলো মূহুর্তে। সাফওয়ানের হাতে থাকা কেকের মোমবাতি গুলো ফু দিয়ে নিভিয়ে দিয়ে বক্সটা বন্ধ করে দিলো ঠাস করে।
সাফওয়ান কিছুটা ভরকে গেলো। একটু আগেও তো ঠিক ছিলো মাহি। সাফওয়ান জিজ্ঞেস করলো-
“ ঠিক আছো তুমি? ”
“ না ঠিক নেই আমি। আপনি কেনো এসেছেন এখানে? আমি আপনাকে বলেছি আপনি মুভ অন করে ফেলুন। কাউকে বিয়ে করে ফেলুন। আমায় মনে করবেন না। তারপরও আপনি এই রাতে চলে এসেছেন আমায় বার্থডে উইশ করতে! আপনাকে আমি ঠকিয়েছি সাফওয়ান। ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। ”
সাফওয়ান মৃদু হাসলো। মাহি অবাক না হয়ে পারছে না। এখনও হাসছে!
“ আপনি হাসছেন সাফওয়ান! আপনার আমাকে ঘৃণা করা উচিত। ”
“ ভালোবাসার মানুষ কে কখনও ঘৃণা করা যায় না মাহি। আমি জানি তুমি আমায় ঠকাও নি। আমার বিশ্বাস এটা। এজওয়ান এমন কিছু করেছিল যার জন্য তুমি তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছো। তুমি ডিভোর্স দিয়ে দাও এজওয়ান কে মাহি। ”
“ আমি এজওয়ান কে ডিভোর্স দিয়ে দিলেও তারপর কি হবে? ”
” আমরা বিয়ে করে নিব। ”
“ মাথা ঠিক আছে আপনার? নাকি পাগল হয়ে গেছেন? বাস্তবতা মেনে নিন। এজওয়ানের সাথে আমার সংসার জীবন টা যে খুব দীর্ঘ হবে না এটা আমিও জানি। কিন্তু তার মানে এই না যে আমি এজওয়ান কে ছাড়ার পর আপনার কাছে চলে আসবো। ”
“ কেনো আসবে না? দরকার পড়লে আমি সারাজীবন অপেক্ষায় থাকবো তোমার । তুমি আমার জীবনে ফিরে আসো প্লিজ। আমি তোমায় ছাড়া থাকতে পারবো না মাহি। প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো। ঐ এজওয়ান কে ছেড়ে দাও। ফিরে এসো আমার কাছে। ”
“ আমার দ্বারা কোনোভাবেই আপনাকে মিথ্যে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখানো সম্ভব নয়, সাফওয়ান। আমাদের পথ আর কখনো এক হবে না। অ্যা’ম সরি… আমার জন্য আর অপেক্ষা করবেন না। ”
কথাগুলো বলে মাহি লম্বা এক শ্বাস টানলো। কি হবে মিল না হলে? সাফওয়ান ম’রে যাবে নাকি মাহি ম’রে যাবে? কেউ কাউকে না পেলে কেউই ম’রবে না। অভ্যাস হয়ে যাবে। মাহি জীবনে আর কাউকে চায় না। কাউকে না মানে কাউকেই না।
“ সত্যি আমাদের আর এক হওয়ার কোনো
সম্ভাবনা নেই?… বলো না..সত্যিই আর কোনো
সম্ভাবনা নেই এক হওয়ার? ”
মাহি নিশ্চুপ হয়ে রইলো। ফেরার সম্ভাবনা থাকলেও মাহি আর ফিরতে চায় না।
মাহির নীরবতা দেখে সাফওয়ান ফের জিজ্ঞেস করলো-
“ এখন আর আমাকে ভালোবাসো না তাই না? ”
মাহি আশেপাশে তাকালো। চোখে জল জমতে চাইছে, কিন্তু আটকালো। ধীরে বললো—
“ ভালোবাসি…অনেক ভালোবাসি….অনেক ভালোবাসি আমি আপনায়। কিন্তু নিজের ভবিতব্য নিয়েও আমাকে ভাবতে হবে। আমরা আর কখনো এক হতে পারবো না, সাফওয়ান। কারণ দ্বিতীয়বার আমার জীবনের সাথে আপনাকে জড়িয়ে আর কোনো কষ্ট দিতে চাই না। আপনি আর কখনও ভালোবাসার দাবি নিয়ে আমার সামনে আসবেন না। আমার খারাপ লাগে আপনাকে ফিরিয়ে দিতে। আসছি ভালো থাকবেন। ”
মাহি চলে আসলো। সাফওয়ান নির্নিমেষ চোখে চেয়ে দেখলো মাহির যাওয়া। কি পাষাণ হৃদয়ের নারী এটা! সাফওয়ান তারপরও অপেক্ষায় থাকবে মাহির।
মাহি রুমে ঢুকে দেখলো এজওয়ান বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে মাথা ঝুঁকে আছে। মাহি এসেছে টের পেয়ে এজওয়ান ঘাড় বেঁকিয়ে তার দিকে তাকালো। মাহির হাতে একটা প্যাকেট। এজওয়ান বুঝলো এটা সাফওয়ান দিয়েছে। এজওয়ান নিজের আনা প্যাকেট গুলোর দিকে তাকালো। কালো শাড়িটা ফ্লোরে পড়ে আছে। আর নাক ফুল টা সোফার এক কোনে পড়ে আছে অবেহলায়।
এজওয়ান বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। মাহি পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে এজওয়ান বলে উঠলো-
“ কেক টা কেটে খেয়ে আসলেও পারতে। গিফট টা যখন সাথে করে নিয়েই এসেছো ছোটলোকের মতন। ”
মাহি নিজের হাতের দিকে তাকালো। তার খেয়ালই নেই এটা যে তার হাতে। এজওয়ান বেরিয়ে চলে গেলো। মাহি গিফট টা খুলে দেখলো। একটা টিয়া রঙের শাড়ি দিয়েছে সাফওয়ান। সাথে চিরকুট ও আছে। মাহি চিরকুট টা খুলে দেখলো। তাতে ছোট্ট করে লেখা —
“ কখনও ইচ্ছে হলে পড়ে আমায় একটু জানিও। তোমায় শাড়িতে দেখার বড্ড ইচ্ছে আমার। চেয়েছিলাম সেই ইচ্ছে টা আমাদের বিয়ের দিন পূরণ হবে। বিয়েটাও হলো না আমাদের আর দেখাটাও হলো না। পৃথিবীর সব সুখ তোমার হোক মাহি। ভালোবাসায় বেঁচে থেকো আজন্ম আমার হৃদয়ে। ”
মাহি শাড়ি টা যত্ন সহকারে আলমারি তে তুলে রেখে দিলো। ভবিষ্যতে কোন একদিন অবশ্যই পড়বে। রুমের লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লো মাহি।
মধ্য রাতে এজওয়ান রুমে আসলো। মাহি তখন ঘুমে বিভোর। শালি ধড়িবাজ মহিলা একটা। জামাই রেখে এক্সের সাথে দেখা করতে চায়। খালি একটু ভালোবাসে বইলা শালির এত জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করে। তা না হলে কবেই থা’পড়াইয়া কানপট্টি গরম করে ফেলতো।
এজওয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ল্যাপটপ টা নিয়ে টেবিলে বসলো। অনেক কাজ বাকি এখনও। অস্ট্রেলিয়া যাবে খুব শীগ্রই এজওয়ান। তার আগে এই কাজগুলো সম্পূর্ণ করার দরকার।
আকস্মিক চোখে আলো এসে পড়ায় মাহির ঘুম ভেঙে গেলো। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো এজওয়ান ল্যাপটপে কিসব যেনো করছে। মাহি ফোন হাতরে দেখলো এখন বাজে ২ টা ৪০। মাহি শোয়া থেকে উঠিয়ে এগিয়ে আসলো। এজওয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে বলল-
“ কি করছেন এত রাতে ল্যাপটপে? ”
মাহির গলা শুনেই সাথে সাথে এজওয়ান ল্যাপটপ টা বন্ধ করে ফেললো। মাহি ভ্রু কুঁচকালো। এজওয়ান বসা থেকে উঠে মাহি কে নিজের কাছে টেনে ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল-
“ শুভ জন্মদিন তরিকুলের বেটি। ধন্যবাদ না দিয়ে আইলাভিউ বলো। জীবনেও শুনি নাই এই শব্দ টা তোমার মুখে। ”
মাহি নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো।
“ কথায় কথায় শুধু টেনে ধরেন কেনো? ”
এজওয়ান আবার টেনে ধরলো। বাঁকা চোখে শরীর দেখিয়ে বলল-
“ তুমি চাইলে আরো অনেক কিছু ধরে টানতে পারি। টানবো? ”
মাহি দাঁত কিড়মিড় করে বলল-
“ অসভ্য একটা আপনি। ”
“ আই নো দ্যাট। নিউ কিছু বলো। ”
“ ছাড়ুন আমায়। ”
“ ছাড়লে কি ১০ কোটি টাকা পাব?”
“ উফ ছাড়ুন। আপনার ছোঁয়ায় এলার্জি আছে। ”
“ ক্যান্সার বাঁধিয়ে তারপর ছেড়ে দিব । ”
কথাটা শেষ করে এজওয়ান মাহিকে পাঁজা কোলে নিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেলো। মাহি বুঝলো লোকটা কি করতে চাইছে। সেজন্য ছোটাছুটি করতে করতে বলল-
“ দেখুন একদম ঐসব করার চেষ্টা করবেন না। আপনি কাছে আসলে আমার অসহ্য লাগে। যন্ত্রণা হয়। ”
এজওয়ান মুখ টা মাহির কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল-
“ প্রথম দিন ছিলো সেজন্য অসহ্য যন্ত্রণা লেগেছে। ট্রাস্ট মি আজ একটুও যন্ত্রণা দিব না। সুখে ভরিয়ে দিব। আরাম পাবা। ”
মাহি দাঁত চেপে বলল-
“ দেখেন একদম ভালো হবে না বলে রাখছি। সেদিনের মতন…. ”
এজওয়ান সাথে সাথে ঠাস করে ফেলে দিলো বিছানায় মাহি কে। মাহি ভরকে গেলো। এজওয়ান মাহির উপরে উঠে দু হাত চেপে মাহির ঠোঁট জোড়া নিজের আয়ত্ত্বে নিয়ে নিলো। বেশ কিছুক্ষণ পর ঠোঁট ছেড়ে মাহির গলার কাছে মুখ ডুবিয়ে ফিসফিস করে বলল-
“ আই ওয়ান্ট বেবি মাহি। আই ওয়ান্ট ওয়ান বেবি। ”
“ জীবনেও সম্ভব না। আমি কোনোদিন আপনার সন্তান আমার গর্ভে আসতে দিব না। এরজন্য যা যা করার দরকার হয় আমি তাই করবো। দরকার পড়লে জরায়ু কে’টে ফেলবো, বন্ধ্যাত্বকরণ কে আপন করে নিব। তারপরও কোনো পাপের ফসল আমি জন্ম দিব না। ”
কথাটা কানে আসতেই এজওয়ান মাহির উপর থেকে সরে গিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। আজ কি যেন হলো হুট করে এজওয়ান একটা বাচ্চার অভাব বোধ করছে।
সুলতান পরিবারের একটা বাচ্চাও সুস্থ ভাবে বড় হয়নি। না সোলেমান না রুমাইসা আর না এজওয়ান। তাদের সবার শৈশব টাই কেটেছে অত্যন্ত নিকৃষ্ট ভাবে মা বাবা বিহীন অনাদরে। এজওয়ান বিরবির করে উচ্চারণ করলো একটা নাম যাকে সে আজ পর্যন্ত দেখে নি চোখে।
“ আই হেট ইউ এমিলা সুলতান, আই হেট ইউ…”
সকালের নাস্তা সেরে সোলেমান রা ঢাকায় ফিরে আসে। আসার আগে সোলেমান মেহরিন কে বলেছে খুব শীগ্রই আবার আসবে। আর এসে দেশের বাহিরে নিয়ে যাবে। মেহরিন অপেক্ষায় থাকবে জানিয়েছে তার আসার। যতদূর সোলেমানের গাড়িটাকে দেখা যায় ততোদূর পর্যন্ত মেহরিন দাঁড়িয়ে দেখলো। কথায় আছে—
যেতে নাহি দিব, হায়!
তবুও যেতে দিতে হয়,
তবুও চলে যায়…..
রুমাইসা মন খারাপ করে বসে আছে নিজের রুমে। সোলেমান রা চলে যেতেই মেহরিন গুটিগুটি পায়ে রুমাইসার রুমে আসে। রুমাইসাকে মুখ ভার করে বসে থাকতে দেখে পাশে বসে বলল-
“ কি হয়েছে রুমু আপুর? মন খারাপ? ”
রুমাইসা মেহরিন কে দেখে বলল-
“ হুমম একটু একটু। ”
“ কিসের জন্য মন খারাপ? ”
“ আমি কখনও ঘুরতে যাই নি মহাদেবপুরের বাহিরে এক ঢাকা ছাড়া ভাবি। তোমাকে তো ভাইয়া সুইজারল্যান্ড নিয়ে যাবে। আমি কি করবো তখন? আমি ঘুরতে যেতে চাই। অনেক ঘুরতে চাই। ভাইয়া আমাকে একটুও ঘুরতে যেতে দেয় না। ”
“ তুমিও চলো আমাদের সাথে। ”
“ নাহ্ তোমাদের মাঝে কাবাব মে হাড্ডি হতে চাই না। এরচেয়ে এজওয়ান ভাইকে বলি। দেখি কি বলে। ”
রুমাইসা এজওয়ান কে ফোন করলো। এজওয়ান ভোর হতেই স্টাডি রুমে এসেছিল ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করার জন্য। রুমাইসার ফোন পেয়ে ফোনটা রিসিভ করে বলল-
“ কিরে সব ঠিকঠাক? নাসিরের পোলা আর কিছু করে নি তো?”
“ ঐ ছেলের খোঁজ থাকলে তো কিছু করবে। পুলিশ এসেছিল ধরতে পায় নি খুঁজে। ”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো এ কথা শুনে। পায়নি মানে! কই গেলো শু’য়োরের বাচ্চাটা? ভাইজান কিছু করছে নাকি?
এজওয়ান জানতে চাইলো—
“ পায় নি মানে?”
“ বোধহয় গা ঢাকা দিয়েছে। ”
“ দ্বিতীয় বার সামনে পড়লে ওটাকে মে’রেই ফেলবো আমি। ”
“ আচ্ছা বাদ দাও ঐ ছাগলের কথা। যার জন্য ফোন করা শুনো। ”
“ বল শুনছি। ”
“ ভাইজান তো হানিমুনে সুইজারল্যান্ড যাচ্ছে ভাবি কে নিয়ে। আমি তো আর ভাইজান কে বলতে পারি না আমায়ও নিয়ে চলো সাথে। তো তোমায় বলতেছি ভাই ঘুরতে নিয়ে যাও। তোমরা এদেশ ওদেশ ঘুরো, অথচ তোমাদের বোন কে ঘুরতে দাও না। দ্যিস ইজ নট ফেয়ার ভাই। চলো সুন্দরবন যাই। ”
এজওয়ান চমকালো। ভাইজান সুইজারল্যান্ড যাচ্ছে! কি দরকার? হানিমুন তো রুমেই করা যায়। তারজন্য সুইজারল্যান্ড যেতে হয়!
অথচ এই এজওয়ান ই সেদিন তার বাবার সাথে নিজের হানিমুনে কোথাও যাওয়া নিয়ে কথা বলছিলো।
“ সুন্দরবন কেনো ম’রতে যাব আমরা? ভাইজান সুইজারল্যান্ড গেলে আমরা যাব নেদারল্যান্ড। ”
“ না ভাই সুন্দরবন যাব। নিজের দেশ থাকতে বিদেশ ছুটবো কেনো ট্যুর দিতে? তুমি নিয়ে যাইবা নাকি তাই বলো। আমি তুমি, মাহি ভাবি,ইব্রাহিম ভাই,ইয়াসিন ভাই যাব। মজা হবে। ”
“ আচ্ছা ডেট ফিক্সড করে জানা। আমি সব ব্যবস্থা করে রাখবো। ”
রুমাইসার মন খুশিতে ভরে গেলো। ফোনটা কেটে রীতিমত নাচানাচি শুরু করলো। এইবার সে তূর্ণ কে দেখতে পারবে। রুমাইসা জানতে পেরেছে তূর্ণ খুব শীগ্রই সুন্দরবনে যাবে ঘুরতে। আজ সকালে পেজে পোস্ট করেছে তূর্ণ — সুন্দরবন অ্যা’ম কামিং ভেরি সুন।
সেই থেকে রুমাইসার মন খারাপ ছিলো। এখন মন ভালো।
এক নজর এই লোকটাকে সে দেখতে চায়। লোকটা কি দেখতে অসুন্দর? সেজন্য ফেস দেখায় না? কিন্তু যার কন্ঠ এত সুন্দর সে কি দেখতে খারাপ হতে পারে?
মেহরিন রুমাইসার উরাধুরা নাচ দেখে ভ্রু কুঁচকালো। সামান্য সুন্দরবনে যাওয়া নিয়ে মেয়েটা এত খুশি!
বিকেলের দিকে মাহির ফোনে একটা মেসেজ আসলো। মেসেজ টা কোনো ইনভাইটেশনের। মাহি ওপেন করলো।
দাহশয্যা পর্ব ৫২
Dear Ms. Mahi,
You are cordially invited to an Exclusive Evening Celebration at InterContinental Dhaka.
📍 Venue: InterContinental Dhaka – Grand Ballroom
🕖 Time: 7:00 PM, Today Evening
🎀 Dress Code: Elegant
Your arrival will make the night brighter…
For some moments are meant to be created for only one person.
With warm regards,
Event Concierge
InterContinental Dhaka
মাহি আশ্চর্য হলো। কে ইনভাইটেশন পাঠালো তাকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের তরফ থেকে?
