দাহশয্যা পর্ব ৫৪
Raiha Zubair Ripti
ঢাকা শহরের বুকজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রাজকীয় সেই ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল। বিশাল গেট, ঝলমলে লাইট, ভেতরে প্রবেশ রাখলেই চোখে পড়ে চকচকে ফ্লোর আর সুবাস মাখা পরিবেশ।
মাহি আশেপাশে তাকিয়ে ভেতরে পা রাখতেই এক স্টাফ এগিয়ে এলো। হাতে কালো রঙের এক গ্রাউন এগিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল—
“ ম্যাডাম, ভেতরে প্রবেশের জন্য দয়া করে এটা পড়ে নিন। ”
স্টাফ তাকে ভদ্রভাবে একটি চেঞ্জ রুমের দিকে ইশারা করল। মাহি ভ্রু কুঁচকালো। নিজের দিকে তাকালো। পরনে তার জিন্স প্যাট,লেডিস শার্ট আর উপর দিয়ে ব্লাক লেডিস জ্যাকেট।
“ আমি কি ড্রেস পড়ে আসি নি? আপনাদের দেওয়া ড্রেস কেনো পড়তে যাব আমি? ”
“ সেটা বলতে পারবো না আমি। ভেতরে যেতে হলে এটা পড়ে দ্যান ঢুকতে হবে। ”
মাহি গ্রাউনটা হাতে নিয়ে চেঞ্জিং রুমে ঢুকল। পরনের পোশাক বদলিয়ে গ্রাউন টা পড়ে নিলো। মুহূর্তের মধ্যেই মাহি নিজেকে এক অন্য আভিজাত্যের আবরণে আবিষ্কার করল। ফর্সা ধবধবে গায়ের রং। গোলাপি রাঙা ঠোঁট, আসার আগে লিপবাম দিয়ে এসেছিল। মেকআপের প্রয়োজন পড়ে না। মেক-আপ ছাড়াও মাহির সৌন্দর্যের কোনো হেরফের হয় না।
মাহি দরজা ঠেলে বের হয়ে হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমের ভেতরে পা রেখে চারপাশটা তাকিয়ে দেখল।
ঝলমলে ঝাড়বাতি থেকে নেমে আসা সোনালী আলো, চারপাশে মানুষের ভীড়, মিডিয়াম স্লো ভলিউমে গান বাজছে। লাল আর সোনালী রঙের লাইটিংয়ে পুরো বলরুম। কারও হাতে শ্যাম্পেন গ্লাস, কেউ আবার হালকা হেসে আলাপ করছে।
মাহি সম্পূর্ণ ভাবে কিছুটা এগিয়ে আসতেই হুট করে তার মাথার উপরে ফুলের পাপড়ি পড়তে শুরু করলো। মাহির কানে আসলো করতালির শব্দ। আর মুখে মুখে ভেসে আসলো-
“ হ্যাপি বার্থডে টু ইউ । ”
মাহি ভরকে গেলো। সামনে তাকাতেই হঠাৎই ভীড়ের মাঝখানে তার চোখ থেমে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে করতালি দিচ্ছে মাহির বোন মোহনা আর তার দুলাভাই শাকিল। বোনের কোলে কয়েক মাসের মেয়ে মায়া।
সবার মুখে হাসি। মাহি ভীষণ চমকালো এদের এখানে দেখে। তার বোন আর দুলাভাই এসব আয়োজন করেছে! মাহি এগিয়ে গেলো। মোহনা বোন কে জড়িয়ে ধরলো। মাহি মায়া কে কোলে নিলো। জান বাচ্চাটার দাঁত উঠেছে। কি গুলুমুলু হয়েছে। মাহি টসটসে গাল দুটোয় চুমু খেয়ে বোনের উদ্দেশ্যে বলল-
“ এসব করার কি দরকার ছিলো আপু? বাসাতেই তো করা যেত। ”
মোহনা বুঝলো না কথার মানে টা। তাই জিজ্ঞেস করলো-
“ আমরা কি করেছি? ”
মাহি এবার সন্দিহান চোখে বলল-
“ এই আয়োজন তোমরা করো নি? ”
“ নাহ্। আমাদের ফোনে মেসেজ এসেছিল। মেসেজ টা তো তোর নাম করেই আসা। সেজন্যই তো আসলাম আমরা। তোর জন্মদিন আমি তোকে সারপ্রাইজ দিতে তোর শ্বশুর বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম। পরে মেসেজ টা আসায় এখানেই এসেছি। কিন্তু তুই কেনো প্রশ্ন করছিস উল্টা আমাদের? তুই পাঠাস নি মেসেজ? ”
“ না। বরং আমার কাছেও মেসেজ এসেছে। ”
মাহি ফোন টা বের করে মেসেজ টা দেখালো। শাকিল আর মোহনা একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করলো। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো সাদা স্যুটে সাফওয়ান। মাহির মনে প্রশ্ন জাগলো সাফওয়ান ই কি তাহলে তাদের ডেকে এনেছে মেসেজ দিয়ে?
সাফওয়ান ও বেশ চমকালো মাহি কে দেখে। তার ফোনেও মেসেজ এসেছে। সেজন্যই আসা। কিন্তু এসে যে মাহিকে দেখতে পারবে তা কল্পনাতেও ভাবতে পারে নি। ব্লাক গ্রাউনে কাঁধ অব্দি সোজা ছোট স্ট্রেট চুলে পরির চেয়ে কম লাগছে না।
মাহিও তাকিয়ে আছে সাফওয়ানের দিকে। মানুষ টা সব সময়ই পরিপাটি হয়ে গুছিয়ে চলাফেরা করে। এজন্য সাফওয়ান কে তার বেশি ভালো লাগতো। গোছগাছ প্রকৃতির একটা মানুষ। এমন পুরুষই মেয়েরা চেয়ে থাকে তাদের জীবনে।
মাহির থেকে ঠিক কিছুটা দূরেই ভীড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলো এজওয়ান। হাতে তার ড্রিংকসের গ্লাস। মাহিকে পরখ করছিলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু বউ তার এভাবে এক্স কে মুগ্ধ চোখ দেখছে দেখে তড়িঘড়ি করে ভীড় ঠেলে সামনে আসলো। হাতে থাকা ড্রিংকসের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে সম্পূর্ণ টা শেষ করলো। তারপর কিঞ্চিৎ ঘাড় বাঁকিয়ে হাতে তুড়ি বাজিয়ে মাহির উদ্দেশ্যে বলল-
“ Tera Dhyaan Kidhar Hai? Yeh Tera villain Idhar Hai ”
আকস্মিক এজওয়ানের গলার স্বর শুনে ঘাড় বাঁকিয়ে পাশে তাকালো। ব্লাক কালারের স্যুট পরিহিত এজওয়ান মাহির দিকে তাকিয়ে আছে। মাহি বিরক্ত হলো এটাকে এখানে দেখে। এটাকে আবার কে ইনভাইট করেছে?
ততক্ষণে সাফওয়ান চলে এসেছে মাহির কাছে। মাহির পাশে দাঁড়িয়ে বলল-
“ মাহি তুমি এখানে! ”
মাহি ছোট্ট করে হুম বলল।
এজওয়ান এগিয়ে এসে মাহিট হাত টেনে নিয়ে মাঝখানে সবার মাঝে দাঁড়ালো। একটা স্টাফ এসে মাইক দিয়ে গেলো এজওয়ানের হাতে। এজওয়ান ফু দিয়ে বলতে লাগলো-
“ হ্যালো সুন্দরী সুন্দরী লেডিস এন্ড হ্যান্ডসাম হ্যান্ডসাম জেন্টলম্যান, গুড ইভনিং। আপনারা সবাই আমার ইনভাইটে এসেছেন আমি খুব খুশি হয়েছি। এত খুশি হয়েছি যে খুশির ঠেলায় মনে হচ্ছে আমি গর্ভবতী হয়ে গেছি। সে যাই হোক। আজ আমার ওয়ান এন্ড ওয়ানলি লাভলি ওয়াইফ তরিকুলের বেটির বার্থডে। আপনারা প্রাণ মন জান খুলে আমার তরিকুলের বেটির জন্য দোয়া করবেন। সে যেন আরো ১০০ বছর আমার সাথে সংসার করতে পারে। ”
মাহি হাত ছাড়িয়ে নিলো। দাঁত চেপে বলল-
“ আপনি এমন মেসেজ পাঠিয়েছেন জানলে জীবনেও আসতাম না। ”
এজওয়ান চুমু ছেড়ে দিয়ে বলল-
“ এসে যখন গেছোই। তখন এনজয় দ্যিস পার্টি। ”
একটা কেক নিয়ে আসা হলো। অনেক বড় কেকটা। চকলেট ফ্লেভারের। এজওয়ান চাকু টা মাহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ ভদ্র মেয়ের মতন কেটে ফেলো তো তরিকুলের বেটি। সব আখাইয়া কেক খাওয়ার জন্য এসেছে। ”
মাহি বেশি সিনক্রিয়েট না করে কেকটা কাটলো। এজওয়ান অপেক্ষায় ছিলো মাহি তাকে কেক খাইয়া দিবে। হা ও করেছিলো কিন্তু মাহি হাত টা ঘুরিয়ে সাফওয়ান আর মোহনা কে খাইয়ে দিয়েছে। সাফওয়ান মোহনা,শাকিল মাহিকে কেক খাইয়ে দিলো। এজওয়ান আর খাওয়ালো না কেক টা আলাদা করে। মাহিও অপেক্ষা করলো না এজওয়ানের। স্টাফ এসে কেক টা কেটে সবাইকে সার্ভ করতে লাগলো।
কেক খাওয়া শেষে স্লো ভলিউম মোডে গান চলতে শুরু করলো। এজওয়ান মাহির হাত টেনে নিয়ে ডুয়েট নাচ নাচতে শুরু করলো। আশেপাশে সবাই তার কাপল নিয়ে নাচতে শুরু করেছে। এক মেয়ে এসে সাফওয়ানের হাত টেনে এজওয়ান মাহির পাশে দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করলো। সাফওয়ান মাহির দিকে তাকিয়ে আছে। মাহি থেকে থেকে সাফওয়ানের দিকে তাকাচ্ছে। নাচের মাঝে সাফওয়ান তার সাথে নাচ থাকা মেয়েটাকে ঘুরিয়ে এজওয়ানের দিকে পাঠিয়ে দিলো। মাহি সাফওয়ানের দিকে চলে আসলো। সাফওয়ান মাহি কে নিয়ে নাচতে শুরু করলো। এজওয়ান বাঁকা হেঁসে মেয়েটাকে ফ্লোরে ছুঁড়ে মেরে সাফওয়ানের হাত থেকে মাহিকে টেনে নাচতে শুরু করলো। সাফওয়ানের চোখ মুখ শক্ত হয়ে আসলো। এজওয়ান সাফওয়ান কে দেখিয়ে মাহির হাতে গালে চুমু খেলো। সাফওয়ান জোরে জোরে শ্বাস টানলো। শরীর জ্বলে যাচ্ছে রাগে।
মাহি বিরক্ত হয়ে এজওয়ানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বাহিরে চলে আসলো। এজওয়ান সেটা দেখে মোহনার দিকে এগিয়ে গেলো। শাকিলের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ হ্যালো বউয়ের দুলাভাই। ভালো আছেন তো?”
শাকিল জবাবে বলল-
“ জ্বি ভালো আছি। ”
এজওয়ানের নজর গেলো ছোট্ট মায়ার উপর। অনেক বড় হয়ে গেছে। কেমন ড্যাপড্যাপ করে তাকিয়ে দেখছে এজওয়ান কে। এজওয়ান মোহনার কোল থেকে মায়াকে নিজের কোলে নিলো। শাকিল ভয়ে চমকে উঠলো। সেটা দেখে এজওয়ান বলল-
“ ডোন্ট ওয়ারি কিচ্ছু করবো না। ”
এজওয়ান মায়াকে নিয়ে চলে গেলো। মায়া এজওয়ানের স্যুটের বোতাম টানছে তো এজওয়ানের দাঁড়ি তে হাত বুলচ্ছে। আর কিসব বুলি আওড়াচ্ছে। এজওয়ান এই প্রথম কোনো বাচ্চার গালে চুমু খেলো। মায়ার মুখটা জুড়ে মায়ায় ঘেরা। মায়া এজওয়ান গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে শান্ত হয়ে পড়লো। এজওয়ান সেটা দেখে বাঁকা হেঁসে বলল-
“ মেয়ে তুই জানিস? তোকে আমি ব্যবহার করে তোর খালাম্মা কে বিয়ে করেছি। তুই না থাকলে তোর খালাম্মা কে বিয়ে করতে আরো কষ্ট হতো। তাই যা তোরে আমি সবসময় আদর করবো। তুই বড় হ। তোরে পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন হ্যান্ডসাম আমার ছেলের সাথে তোর বিয়ে দিব। যদিও তোর জুনিয়র হবে সে হোক। জুনিয়র রা বউ আদর করে বেশি বুঝছিস? আমার পুতের বউ হবি তুই। ”
কথাটা বলতে বলতে এজওয়ান বাহিরে চলে আসলো। মাহি একা একা পায়চারি করছে এ মাথা থেকে ও মাথা। এজওয়ান শিস বাজাতে বাজাতে এগিয়ে গেলো। মাহি ঘাড় ঘুরিয়ে এজওয়ানের কোলে মায়া কে দেখে আৎকে উঠলো। তড়িঘড়ি করে এজওয়ানের কোল থেকে মায়াকে আনতে গেলে মায়া আসতে চাইলো না। মাহি আশ্চর্য হলো। জোর করে নিতে চাইলে মায়া কেঁদে ফেলে। সেটা দেখে এজওয়ান বলে-
“ বে’য়াদব মেয়ে জোর করে নিতে চাইছো কেনো? দেখছো না ও যাবে না তোমার কাছ থেকে? ”
মাহি কোমরে দু হাত গুঁজে বলল-
“ ও আসতে চাইছে না কেনো? ও তো আপনাকে চিনে না। তাহলে আমি ওর খালা হয়েও ও আমার কাছে আসতেছে না কেনো? ”
“ বিকজ আমি তোমার বোনের মেয়েকে ঘুষ দিয়ে পটিয়ে ফেলেছি। ”
“ কিসের ঘুষ দিছেন? উল্টাপাল্টা কিছু করেন নি তো? ”
“ আরে রিলাক্স। তোমার বোনের মেয়েকে আমি প্রস্তাব দিয়েছি। তাকে আমি আমার ছেলের বউ বানাবো। সেটাই মেনে নিছে বোধহয় সেজন্য দেখো না কেমন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। বড় হইলে আমার পুতের বউটা সেই লেভেলের ভদ্র হইবো। আমার ছেলেকে লেলিয়ে দিয়ে বলবো- যা পুত যা, তোর খালাতো বোন টাকে আমার পুতের বউ বানিয়ে আন। এই মাইয়াটার জন্যই আমি তোর মা’কে বিয়ে করতে পেরেছি। এই মেয়ের উছিলায় তুই এই পৃথিবীতে জন্ম নিতে পারছোস,যা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য মেয়েটাকে বিয়ে করে আন। ”
মাহি জাস্ট স্পিচলেস হয়ে গেলো এ কথা শুনে। মানুষ কতটা তাড়ছেড়া হলে এসব কথা বলে! মায়া মা মা করে বুলি আওড়াতে শুরু করলো। এজওয়ান কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল-
“ মাইয়া বা বা বল। আমি তোর শ্বশুর হই। বাপ বলে ডাক। আর সামনের টাকে নো খালাম্মা অনলি শাশুমা বলে ডাকবি। ”
মায়া নিজের মতন এজওয়ানের স্যুটের বোতাম টানতে লাগলো।
ইব্রাহিম বাড়ি ফিরেই ঊর্মি কে ফোন করলো। ইতি বেগম ঊর্মির সামনেই ছিলো। ফোন বেজে উঠায় দু’জনই ফোনের দিকে তাকায়।
“ কে ফোন দিছে রে ঊর্মি? দেখ তো। ”
ঊর্মি ইব্রাহিমের নম্বর দেখে কেটে দিয়ে বলল-
“ রং নম্বর মা। ”
“ ওহ্ আচ্ছা। ”
কথাটা বলে ইতি বেগম কাজে মনোযোগ দেয়। চাউল ঝাড়ছেন কুলো তে নিয়ে। আবার ফোন আসলো। ইতি বেগম আবার জিজ্ঞেস করলো-
-“ কেডা? ”
“ আমি চিনি না মা। বললাম তো রং নম্বর। ”
“ বারবার ফোন দিতাছে ধইরা দেখ। ”
ঊর্মি ফোন টা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল-
“ এ ভাই কে আপনি? ফোন কেনো দিচ্ছেন বারবার? কাকে চান? ”
ইব্রাহিম ভ্রু কুঁচকে বলল-
“ এই মেয়ে আমার নম্বর চিনো না? ভণ্ডামি করতেছো আমার সাথে? ”
“ কার কাছে ফোন দিছেন? কারে চান আপনি? ”
“ ঊর্মি মালা কে। ”
“ দুঃখিত এই নামের কেউ এখানে থাকে না। আম্মা বললাম না এটা রঙ নম্বর। দেখো রূপালী নামের কারে যেনো খুঁজতেছে। ”
মায়ের কথাটা শুনেই ইব্রাহিম বুঝতে পারলো ভণ্ডামি করার আসল মানে। শাশুমা বসে আছে মেয়ের সামনে। ইব্রাহিম ছোট্ট করে বলল-
“ পরের বার ফোন দিলে যেন এমন ভণ্ডামি মার্কা কথা না শুনি। রাখছি। ”
ঊর্মি ফোন কেটে দিলো। বাপরে বেঁচে গেছে এবারের মতন। ইতি বেগম ড্রামের কাছে গেলেন চাউল ঢালতে।
রুমাইসা আজ অনেক খুশি। অনেক মানে অনেক। তার ক্রাশ তূর্ণ তার কমেন্টের রিপ্লাই দিয়েছে। কিন্তু রিপ্লাইয়ের নোটিফিকেশনে ঢুকেই সব খুশি এক নিমিষে চলে গেলো। রুমাইসা কমেন্টে লিখেছিল- “ আমি বারংবার প্রতিবার আপনার কন্ঠের প্রেমে পড়ে যাই। একটা মানুষের কন্ঠ এতটা সুন্দর কি করে হতে পারে! আপনাকে এক নজর দেখার খুব ইচ্ছে আমার। দেখা কি হবে আমাদের কখনও? ”
তূর্ণর রিপ্লাই টা হচ্ছে — “ আপনার জন্য এই ইচ্ছে টা নিষিদ্ধ করা হলো। ”
ব্যাস এই রিপ্লাই টা দেখেই রুমাইসার মন টা বিষিয়ে গেলো। নিষিদ্ধ কেনো করলো? দেখা করতে চাওয়াটা কোনো পাপ? নাকি তূর্ণর কোনো গফ আছে!
হাতটা আপনা-আপনি বুকে চলে আসলো। এটা স্বাভাবিক একটা বিষয় গফ থাকতেই পারে। কিন্তু রুমাইসার এত খারাপ লাগছে কেনো? রুমাইসা সোজা তূর্ণর পার্সোনাল আইডির ইনবক্সে চলে গেলো। পেজে দিলে যদি কোনো মডারেটর দেখে ফেলে এই ভয়ে।
ইনবক্সে লিখে পাঠালো—
“ নিষিদ্ধ কেনো বললেন? আপনার উচিত আপনার ফ্যানদের ইচ্ছে পূরণ করা। ”
মেসেজ ডেলিভারি হলো। কিন্তু সিন হলো না। রুমাইসা অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু সিন হওয়ার নাম ও নিচ্ছে না! টানা আড়াই ঘন্টা অপেক্ষা করার পর মেসেজ টা সিন হলো। রুমাইসার বুক টা ধুকপুক করে উঠলো। কিছু টাইপ হচ্ছে ওপাশ থেকে। রুমাইসা অধীর আগ্রহ নিয়ে রইলো মেসেজের কিন্তু। টাইপিং থেমে গেলো। কিচ্ছু আসলো না। রুমাইসা মন ভার করে ফোন টা বিছানায় রেখে বেলকনিতে আসলো। মিনিট পাঁচেক পর নোটিফিকেশন আসার শব্দ পেয়ে উৎফুল্লতার সহিত রুমে এসে ফোনটা হাতে তুলে নিলো। চোখকে বিশ্বাস করতে পারতেছে না। তূর্ণ রিপ্লাই দিয়েছে। রুমাইসা লাফালাফি শুরু করে দিলো। ইনবক্সে ঢুকে দেখলো তূর্ণ লিখেছে—
“ অনেক ফ্যান তো ইচ্ছে পোষণ করে আমায় তাদের বিয়ে করার জন্য। তাহলে কি আমার সবাইকেই বিয়ে করে নেওয়া উচিত মিস রুমাইসা খাতুন? ”
নিজের নামের শেষে খাতুন শব্দ টা দেখে রুমাইসা হতবিহ্বল হয়ে গেলো। হোয়াট খাতুন! এসব সার নেইম তো হয় বুড়ি লোকদের। রুমাইসা রিপ্লাই করলো পাল্টা।
“ রুমাইসা সুলতান আমার নাম। খাতুন নয়। আর আপনি কেনো সবাইকে বিয়ে করতে যাবেন? ”
মিনিট দুয়েক পর সিন হয়ে রিপ্লাই আসলো। তূর্ণ তার মেসেজটা দেখিয়ে কুয়েশ্চন চিহ্ন দেখালো।
রুমাইসা জবাব দিলো-
“ দেখা করা আর বিয়ে করা এক জিনিস? ”
তূর্ণ রুমাইসার কথার প্রেক্ষিতে বলল-
“ আমার কাছে দেখা করাটা মানেই বিয়ে করে ফেলা। তাই ম্যাডাম দেখার বায়না করবেন না। ”
“ আমার খুব ইচ্ছে আপনাকে দেখার। দু বছর ধরে আপনাকে আমি আমার ফেক আইডি দিয়ে ফলো করি। একটু দেখা দিন মশাই। প্রমিজ আমি আপনার ফেস রিভিল করবো না। ”
তূর্ণ হাসির ইমোজি পাঠালো।
“ আমাকে দেখে কি করবেন শুনি? ”
“ নিশ্চয়ই জামাই বানানোর প্ল্যান করবো না। একজন ফ্যান হিসেবেই ট্রিট করবো। ভরসা করতে পারেন। ”
“ কিন্তু নিজেকে নিয়ে আমার ভরসা নেই। দেখা গেলো আপনাকে দেখতে গিয়ে আমার আপনাকে পছন্দ টছন্দ হয়ে গেলো। তখন তো আরেক বিপদ।
রুমাইসা ছোট ছোট করে চোখ বুজে থাকার ইমোজি পাঠালো। আর রিপ্লাই আসলো না। রুমাইসা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলো কিন্তু আর আসলোই না।
সোলেমান কে অর্থমন্ত্রী ডিনারে ডেকেছে জানুয়ারির শেষের দিকে। সোলেমান ব্যস্ততায় যেতে পারে নি। ফেব্রুয়ারীর শুরুতে গেলো। সোলেমান আসায় অর্থমন্ত্রী টেবিল জুড়ে সব ধরনের খাবার থেকে শুরু মদেরও ব্যবস্থা করলো। সোলেমানের সাথে এসেছে বাশার সুলতান ও। মূলত তিনিই নিয়ে এসেছেন সোলেমান কে। সোলেমান কে দেখে অর্থমন্ত্রী হাত বাড়িয়ে দিলো কুশলাদি করার জন্য। কিন্তু সোলেমান তাকে তার বাড়িতেই পাশ কাটিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে বসলো। টেবিল থেকে রিমোট টা নিয়ে এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো। তারপর ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“ কিসের জন্য ডেকেছেন আমায়? ঝটপট বলে ফেলুন। বেশি অপচয় করার মত সময় হাতে নেই আমার।
অর্থমন্ত্রী কিছুক্ষণ নিশ্চুপ। তার আঙুলের ফাঁকে ধরা কাঁটাচামচ টেবিলে বাজতে থাকে ঠকঠক শব্দে। অবশেষে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
“ সোলেমান তোমার প্রভাব-প্রতিপত্তি তো দেশের সবাই জানে। কয়েক মাস আগে একটি বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে একটা প্রকল্পের জন্য টাকা আনা হয়েছিল। সরকারি ফান্ডে দেখানো হয়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা, কিন্তু বাস্তবে এসেছে মাত্র দেড় হাজার কোটি। বাকি টাকাটা কোথায় গেছে এই প্রশ্ন সংসদে তুলেছে কয়েকজন তরুণ এমপি। তাদের পেছনে কারা আছে, আমি জানি না। কিন্তু খবর পাচ্ছি আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থাও এ ব্যাপারে নড়েচড়ে বসেছে। যদি ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে যায়, শুধু আমার মন্ত্রণালয় নয়, পুরো সরকার হুঁশিয়ারিতে পড়ে যাবে। ”
অর্থমন্ত্রী হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিঃশব্দে বললেন-
“ আমি চাই… তোমার লোকদের দিয়ে ওই এমপিদের মুখ বন্ধ করে দাও। সরাসরি হুমকি নয় তাদের চারপাশ এমনভাবে ঘিরে ফেলতে হবে, যেন তারা সংসদে এই প্রসঙ্গ আর তুলতে না পারে। প্রয়োজনে তাদের পরিবারকেও টার্গেট করতে হবে। এটা আইনসিদ্ধ না, আমি জানি। কিন্তু আমার আর কোনো পথ নেই। ”
বাশার সুলতান চুপচাপ সোলেমানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরটা হঠাৎ আরও ঠাণ্ডা হয়ে উঠল।
সোলেমান ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে সামনের দিকে ঝুঁকল। তার চোখের দৃষ্টি ধারালো।
“ তা আপনি আমাকে কী করতে বলছেন জানেন তো? এমপিদের গলা চেপে ধরা মানে গোটা সংসদের স্নায়ু চেপে ধরা। আপনি চান আমি সেই কাজ করি? কেন ভাবলেন আমি এতে রাজি হব?”
অর্থমন্ত্রী মরিয়া গলায় বললেন—
“কারণ আপনি ছাড়া আর কেউ এটা করতে পারবে না। আপনি জানেন কাকে কোথায় চাপ দিতে হয়, কোন ফাইল কার হাতে তুলে দিতে হয়, কোন সংবাদপত্রের পাতায় কোন ছবি ছাপাতে হয়। আপনি সাহায্য না করলে আমি বাঁচব না। ”
সোলেমান ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসল।
“ অর্থমন্ত্রী হয়ে আমার কাছে ভিক্ষে চাচ্ছেন! ভালোই লাগছে। কিন্তু আমি আপনার জন্য কাজ করব কেন? দেশের টাকা আপনি হজম করবেন, আর ঝুঁকি নেব আমি? ”
“ এর বিনিময়ে তুমি যা চাইবে আমি সব করতে রাজি আছি। ”
“ বেশ তাহলে আগামী তিন মাস আপনার কোনো সিদ্ধান্ত আমার অনুমতি ছাড়া হবে না। বাজেটের খাত থেকে শুরু করে বিদেশি লোন সব কিছুর চাবি আমার হাতে দিতে হবে। পারবেন?”
“ এটা একটু বেশিই বলে ফেললে না সোলেমান? ”
“ আমাকে দিয়ে অনৈতিক কাজ করাতে চাইলে দাম তো একটু বেশিই দিতে হবে মন্ত্রী মহোদয়। আমি যে আপনার চেয়ার টা চাই নি এটাই কি যথেষ্ট নয়?
এই কথায় অর্থমন্ত্রী টেবিলে রাখা গ্লাসটা শক্ত করে চেপে ধরলো। হাতি গর্তে পড়লে চামচিকাও লাত্থি মা’রে।
“ তুমি আমার চেয়ার ধরে টান মারতে চাও সোলেমান! ”
“ মারতেও পারি বলা যায় না। ”
ভীষণ রকমের রেগে গেলো অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান। কিন্তু রাগ দেখালে চলবে না। সোলেমান কে এখন তার দরকার। কাজ টা সোলেমান কে দিয়ে করিয়ে ফেলার পরই সোলেমানের কোনো একটা ব্যবস্থা করবে সে।
“ আমি ডেকেছিলাম তোমায়, কারণ ভেবেছিলাম তুমি বুঝদার। কিন্তু আমি দেখছি তুমি অতিরিক্ত দাম্ভিক হয়ে গেছো সোলেমান। ”
“ আপনার এই দেখাদেখিতে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নাই। আমি শুধু শুধু আপনায় তো আর সাহায্য করবো না। যদি না এতে আমার ফায়দা হয়। ”
“ আচ্ছা ডিনার টা শেষ করো। তারপর আগাচ্ছি কথায়।
ঘরজুড়ে পিনপিনে নিরবতা শুরু হলো। আবুল হাসান বেশ কিছুক্ষণ নিরব থেকে বলে উঠলেন-
“ তা শুনলাম তুমি নাকি বিয়ে করেছো, সোলেমান?”
সোলেমানের কপালে তীব্র ভাঁজ গড়ালো এ কথা কানে আসতেই। ধীরেসুস্থে আবুল হাসানের দিকে তাকালো।
“ কার থেকে পেলেন এ খবর?”
আবুল হাসান হালকা হাসি দিয়ে বলল—
“এই খবর তো আর লুকিয়ে রাখার মতন খবর না। সব মন্ত্রীর কাছে পৌঁছে গেছে এ খবর। তুমি তো তোমার বউ দেখাইলা না আমাদের। দাওয়াত ও তো দাও নি বিয়েতে।
সোলেমানের চোখ চেপে ধরা রাগে লাল হয়ে উঠল। দাঁত চেপে বলল—
“পরের বউ দেখার এত আগ্রহ কেনো ? নিজের বউ কি আরেক ব্যাটার সাথে ভেগে গেছে? নাকি খাদ্য মন্ত্রীর কাছে ডিনার করতে পাঠানো হয়েছে? কোনটা? ”
আবুল হাসান ধীরে ধীরে এগোলো।
“ আমার বউ যেখানেই যাক, তোমার বউয়ের সাথে পরিচয় করাবা না আমাদের? ”
সোলেমান রাগ কমানোর চেষ্টা করলো। বাশার সুলতান পাশ থেকে সোলেমান কে শান্ত রাখার চেষ্টা করলো। সোলেমান কিড়মিড় করতে করতে হাতা ফোল্ড করতে করতে বলল-
“ আমার বউ দেখে তুই কি করবি সেটা বল আগে। তারপর উত্তর দিচ্ছি তোকে আমার বউয়ের সাথে দেখা করাবো নাকি অন্য কিছুর সাথে দেখা করাবো। ”
আপনি থেকে সোজা তুই তে চলে যাওয়ায় আবুল হাসানের শরীরে রাগ উঠে গেলো। এক এমপি হয়ে তার মতন মন্ত্রী কে তুই তুকারি করতেছে! এত বড় সাহস!
“ তুই তুকারি করতেছো সোলেমান! তাও আবার আমার সাথে আমার বাড়িতেই দাঁড়িয়ে!”
সোলেমান দাঁত পিষে বলল-
“ তুই যে এখনও জীবিত আছিস আমার সামনে দাঁড়িয়ে, একটা চ’ড় থা’প্পড় ও খাস নি। এটাই তো তোর চৌদ্দ গুষ্টির সাত কপালের ভাগ্য। ”
আবুল হাসান ভীষণ রকমের রেগে গেলো।
“ তুমি আমাকে মা’রার হুমকি দিচ্ছ সোলেমান! এত সাহস তোমার! তুমি জানো আমি তোমার কি করতে পারি? ”
সোলেমান এগিয়ে আসতে আসতে বলল-
“ তুমি আমার বা’ল টাও ছিঁড়তে পারবা না। আমার বউ নিয়ে তুই কথা বলবি আর আমি তোরে ওসব এমপি মন্ত্রী দের মতন ধুয়ে ধুয়ে পানি খাব? তোরা পশুর জাত সেজন্য একজন আরেক জনের বউ এক্সচেঞ্জ করে ব্যবহার করিস। তোদের মতন রাস্তার মেয়ে বিয়ে করছি রে আমি? তোর জিভ আমি টেনে রেখে দিব আমার বউ নিয়ে একটা কথা বলবি তো। ”
আবুল হাসান বাশারের দিকে তাকালো।
“ বাশার সোলেমান কে থামাও। তোমার ভাইস্তা আমায় হুমকি দিচ্ছে! ”
“ তে আপনি ওর বউ কে টেনে আনতেছেন কেনো এখানে? ওর বউ দেখে আপনি কি করবেন? ”
“ দেখতে চাওয়া টা কি পাপ? বউ কি সিন্দুকে তুলে রাখার জিনিস? বউ দেখাবে না আমাদের? শুনছি, কচি বউ বলে বিয়ে করেছে তোমার ভাইস্তা… তা আমাদের দেখতে হবে না? ”
সোলেমান তেড়ে আসলো। মন্ত্রীর গলা চেপে বলল-
“ তোরে আমি বলছি না আমার বউ নিয়ে যেন একটা কথাও না শুনি তোর মুখে? তারপরও আমার বউ নিয়ে কথা বলেই যাচ্ছিস। আমার বউয়ের দিকে নজর দেওয়ার চেষ্টা করলে তোর চোখ দুটো আমি উপড়ে ফেলে দিব কসম। এমন অবস্থা করবো যে আয়নার নিজেকে দেখে নিজেই শিউরে উঠবি। ”
বাশার সুলতান ছাড়িয়ে আনলো সোলেমান কে। আবুল হাসান কাশতে শুরু করেছে। সোলেমান টেবিল থেকে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে বলল-
“ নেক্সট নির্বাচন যেন কবে? ”
বাশার সুলতান বলল-
“ ২০২৪ সালে। ”
সোলেমান আবুল হাসানের দিকে তুড়ি মেরে তর্জনী তুলে বলল-
দাহশয্যা পর্ব ৫৩
“ নেক্সট নির্বাচন ২০২৪ সালে তোর ঐ মন্ত্রী ট্যাগ টাকে আমি জাস্ট উপরে ফেলে দিব। ফের জনগণের ভোটে আমি এমপির আসনে জয়ী হয়ে তারপর তোর অর্থমন্ত্রীর জায়গায় আমি বসবো। পারলে আঁটকে দেখাস। যা করার এই ৩ বছরের মধ্যে করে ফেল। ২৪ আসলেই তোর কপালে দুর্ভোগ নামতে শুরু করবে। তোর প্রতিটি কর্মের তখন হিসাব নিব আমি। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ। ”
