Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৫৬

দাহশয্যা পর্ব ৫৬

দাহশয্যা পর্ব ৫৬
Raiha Zubair Ripti

ঊর্মি হাতে করে ইব্রাহিমের দেওয়া একগাদা প্যাকেট নিয়ে এলোমেলো পায়ে হেঁটে বাড়ির দিকে ফিরছে। মাঝেমধ্যে হাঁটা থামিয়ে রাস্তায় বসে পড়তেছে। তার রীতিমত কান্না আসতেছে। এগুলো বাসার ভিতর ঢোকাবে কি করে? তার যেই মা দেখলে মারবে।
ঊর্মি ১০ মিনিট রাস্তার পথ আধঘন্টার ও বেশি সময় নিয়ে বাড়ি আসলো। উঠানের বাহিরে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলো তার মা আছে কি না। নাহ উঠানে তো দেখা যাচ্ছে না। ঊর্মি গুটিগুটি পায়ে আশেপাশে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে গেলো। তার মা বোধহয় ক্ষেতে গেছে। ঊর্মি এই ভেবে স্বস্তির শ্বাস ফেলতেই বাড়ির পেছন থেকে ইতি বেগমের গলার স্বর ভেসে আসলো। ঊর্মি পায়ের জুতাটা খুলেই রুমের ভেতর দৌড় দিলো। তাড়াতাড়ি করে শপিং ব্যাগ গুলো একে একে খাটের নিচে ঢুকাতে লাগলো।
ইতি বেগম কাঁচি হাতে নিয়ে বাড়ি এসে দেখলেন রুমের দরজা খোলা। এগিয়ে এসে দেখলেন ঊর্মি ফ্লোরে বসে আছে খাটের নিচে মাথা ঢুকিয়ে। ইতি বেগম জিজ্ঞেস করলো-

“ কিরে ওভাবে খাটের নিচে মাথা ঢুকিয়ে বসে আছিস কেনো? কি করতেছিস?
মায়ের গলা শুনে ঊর্মি তড়িঘড়ি করে খাটের নিচ থেকে মাথা বের করতে গিয়ে ধুরুম করে খাটের সাথে বাড়ি খেলো। সাথে সাথে মাথায় হাত দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো ব্যথায়। ইতি বেগম এগিয়ে আসতে নিলে ঊর্মি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ আমি ঠিক আছি। তোমার মাজায় ব্যথা দয়া করে নিচু হইয়ো না। ”
ঊর্মি বেরিয়ে আসলো খাটের নিচ থেকে। ফুলে গেছে জায়গা টা। ইতি বেগম নিকাব খুলে দেখে বলল-
“ খাটের নিচে কি করতে গিয়েছিলি? ইশ ফুলে গেছে মাথাটা। বরফ ঢলতে হবে। ”
ঊর্মি কে ধরে বরফ ঢলতে নিয়ে গেলেন ইতি বেগম।
বাশার সুলতানকে যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হলো তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ।
স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা বাশার সুলতানের চোখ আধখোলা, ঠোঁট নীলচে, বুক ওঠানামা করছে অস্বাভাবিকভাবে।
ডাক্তার নার্স কে বলল-

“ দ্রুত রক্তচাপ পরীক্ষা করো এখনই।”
নার্স দ্রুত কাফ দিয়ে বাশার সুলতানের বাহু জড়িয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চাপ মেপে নার্স বলল-
“একশো আশি বাই একশো বিশ, পালস ভীষণ অনিয়মিত স্যার।”
ডাক্তার একবার তাকালেন মনিটরের দিকে, আবার রোগীর দিকো।
“হৃদযন্ত্রের তাল ঠিক নেই। এটা মনে হচ্ছে হার্ট অ্যাটাক। সিসিইউতে পাঠাও।”
বাশারকে দ্রুত নতুন ভবনের হৃদযন্ত্র পরিচর্যা কক্ষে নেওয়া হলো। চারপাশে মনিটরের বীপ বীপ শব্দ, কোথাও অক্সিজেন সিলিন্ডার, কোথাও শয্যায় শুয়ে থাকা অন্য গুরুতর রোগী।
বাশার সুলতান কে অক্সিজেন মাস্ক পরানো হলো, শিরায় স্যালাইন দেওয়া হলো। রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হলো। ডাক্তাররা প্রথমে ধরে নিলেন এটা সাধারণ হার্ট অ্যাটাক।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বিভ্রান্তি তৈরি হলো।
এক ইন্টার্ন ডাক্তার বললেন-

“স্যার, সাধারণ হার্ট অ্যাটাকে সাধারণত প্রথমেই প্রচণ্ড বুকে ব্যথা হয়, হাত অবশ হয়ে যায়। কিন্তু এই রোগীর বুকে তেমন ব্যথা নেই, বরং মাথা ঘুরছে, বমি হচ্ছে।”
সিনিয়র ডাক্তার প্রকাশ বাবু বললেন-
“হুম… ঠিক বলছো। আর ইসিজির রেখাচিত্রও সাধারণ হার্ট অ্যাটাকের মতো নয়। এখানে হৃদযন্ত্রের সঙ্কোচন-বিস্তার তাল কেমন যেন অস্বাভাবিক।”
“তাহলে এটা কি বিষক্রিয়া হতে পারে?”
“এখনই বলা যাবে না। আপাতত ওষুধ দিয়ে তাল ঠিক রাখো।
এজওয়ান বাপের হার্ট অ্যাটাকের কথা শুনে পাগলের মতো ছুটে আসে হসপিটালে। অফিসে গিয়েছিল সে। শোনামাত্রই কাজকর্ম ফেলে দৌড়ে আসে। করিডরে পায়চারি করছে সোলেমান, ইব্রাহিম, ইয়াসিন। এজওয়ান সোলেমান কে দেখেই দৌড়ে এগিয়ে আসলো। হাঁপাতে হাঁপাতে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“ কি অবস্থা ভাই? ডক্টর কি বলছে? তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে তো? বলো না ভাইজান। ঠিক হয়ে যাবে তো? ”
সোলেমান শান্ত হতে বলল এজওয়ান কে। এজওয়ান কি শান্ত হওয়ার মানুষ? এজওয়ান সিসিইউ এর কাঁচারে জানালা দিয়ে দেখলো। তার বাপ অচেতন হয়ে শুয়ে আছে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। হাতে স্যালাইন। এজওয়ান বাপের উদ্দেশ্যে বলল-

“ মরলে কিন্তু খবর আছে তোমার বুইড়া। একদম মরতে পারবা না। তাড়াতাড়ি সুস্থ হও। এত চিন্তা করতে কে বলে তোমায়? আমি তোমারে বিয়ে দিব। নিজ হাতে বিয়ে দিব। আর চিন্তা করতে হবে না । বিশ্ব সুন্দরী অল্প বয়সী মেয়ে খুঁজে এনে দিব। সুস্থ হও শুধু।
ডাক্তাররা হৃদযন্ত্রের তাল সামলানোর চেষ্টা করলেন। কখনও হৃদস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছিল, আবার কখনও থেমে যাচ্ছিল। সাধারণ হার্ট অ্যাটাক হলে যেখানে রক্ত জমাট বাঁধার ছাপ পাওয়া যায়, সেখানে এ রোগীর ক্ষেত্রে জমাটের কোনো চিহ্ন নেই। বরং পুরো শরীর কেমন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
অবস্থা আরও খারাপ হলো। বমি শুরু হলো, চোখের মণি ছোট হয়ে এলো, ঠোঁট সাদা হয়ে গেল। ডাক্তাররা স্তম্ভিত।
ডাক্তার প্রকাশ বাবু বাহিরে এসে জিজ্ঞেস করলো-
“ উনার এমন অবস্থা কি করে হলো?
ইয়াসিন বলল-

“ বাশার স্যার চা খাচ্ছিলো। তারপরই হঠাৎ করেই শরীর খারাপ করে।”
ডাক্তাররা একে অন্যের দিকে তাকালেন। এখন বিষয়টা কিছুটা পরিষ্কার হলো।
ডাক্তার প্রকাশ বাবু ইন্টার্ন ডাক্তার কে ফিসফিস করে বলল-
“তাহলে চায়ের সাথে কিছু মেশানো হয়েছিল। পাকস্থলী ধুয়ে নমুনা ল্যাবে পাঠাও।”
রোগীর পাকস্থলী ওয়াশ করা হলো। যা বের হলো তা বিশেষ কন্টেইনারে ভরে টক্সিকোলজি ল্যাবে পাঠানো হলো।
আনোয়ার সুলতান ছেলের হার্ট অ্যাটাকের খবর শুনে নিজেও কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমিরুল সুলতান একটু পর পর ফোন করে আপডেট নিচ্ছে ছোট ভাইয়ের। মেহরিন চাচা শ্বশুরের শরীর খারাপের কথা শুনে চমকালো। রুমাইসা আফিয়া সুলতানের পাশে ঘাপটি মেরে বসে আছে। মেহরিন দাদা শ্বশুরের রুমে চলে গেলো। লোকটার ওখানে কেউ নেই।
রাত অনেক হওয়ায় সোলেমান এজওয়ান কে বাসায় পাঠিয়ে দিলো। সে সামলে নিবে। দরকার পড়লে ফোন দিবে তাকে।
এজওয়ান নিবাসে ফিরে নিজের রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলো মাহি ঘুমাচ্ছে। এই মেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে কি করে? এজওয়ান রুমে আর না ঢুকে স্টাডি রুমে চলে আসলো।
সোলেমান ডক্টর দের সাথে কথা বলছে। রিপোর্ট চলে এসেছে ২৪ ঘন্টার ভেতরই। রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—

“পাকস্থলীর ভেতরে ডিজিটালিস নামের বিষাক্ত উপাদান পাওয়া গেছে সোলেমান । এটি মূলত হার্টের ওষুধ, কিন্তু বেশি মাত্রায় গেলে হৃদযন্ত্রকে অস্থির করে দেয়। ফলে চাপ বেড়ে যায়, তারপর তাল ভেঙে মৃত্যু ঘটে। আপনার চাচাকে চায়ের সাথে মিশিয়ে এটা খাওয়ানো হয়েছে। ”
সোলেমান কথাটা শুনে ভ্রু কুঁচকালো। নিবাসের ভেতরই চায়ের সাথে এটা মিশিয়ে কে খাওয়ালো?
সোলেমান কথাগুলো শুনে ইয়াসিনের দিকে তাকালো।
” চা কে বানিয়েছিল? ”
ইয়াসিন আশেপাশে একবার তাকিয়ে বলল-

“ মাহি ভাবি। ”
কথাটা সুঁচের মতন ঢুকলো সোলেমানের কানে। এত বড় দুঃসাহস এই মেয়ের! কিসের জন্য এমন টা করলো? চ’ড়িয়ে দাঁত ফেলে দিবে এই মেয়ের।
সকালে এজওয়ান বাপের জ্ঞান ফিরেছে শুনে তড়িঘড়ি করে রেডি হতে লাগলো। মাহি জিজ্ঞেস করলো-
“ বেঁচে গেছে ? ”
এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো এ কথা শুনে।
“ কেনো মরার দোয়া করছিলে নাকি তুমি? ”
“ প্রতিটি সেকেন্ডে সেকেন্ডে করেছি। ”
এজওয়ান কিছু বললো না। পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। মাহি রাগে ফুঁসতে লাগলো। বেঁচে গেলো কি করে! মৃ’ত্যু তো নিশ্চিত ছিলো।
এজওয়ান হসপিটালে এসে সোজা বাপের সাথে দেখা করতে গেলো। এজওয়ান এখনও জানে না হার্ট অ্যাটাক এর আসল কারন। এজওয়ান এটাই ভেবেছে যে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার কারনে এই হার্ট অ্যাটাক। সোলেমান বলে নি এখনও। এজওয়ান বাশার সুলতানের দিকে তাকালেন।।সেন্স ফিরেছে। কিন্তু শরীর দূর্বল। এজওয়ান দাঁত চেপে বলল-

“ অক্সিজেন মাস্ক টা খুলে মে’রে ফেলি তোমায়? এই বুড়ো বয়সে এত চিন্তা কে করে ভাই? এই বয়সে তুমি ডিস্কোতে যাবা,ট্যুর দিবা,খাইবা দাইবা,আর ঘুমাবা। এত স্ট্রেস কে নেয় ? নিজেও মরবা দুশ্চিন্তা করে করে আর আমাদের ও মারবা দুশ্চিন্তা করিয়ে করিয়ে। ভালো হয়ে যাও বাশার সুলতান ভালো হয়ে যাও। তোমার বুড়ো বাপ অসুস্থ হয়ে গেছে তোমার এই অবস্থা হয়েছে শুনে। ”
বাশার সুলতান আধো আধো চোখে শুধু ছেলেকে দেখলো।
দুপুরে আমিরুল সুলতান ও আসলো নওগাঁ থেকে ভাইকে দেখতে। তবে নিবাসে গেলো না। রাত টা একটা হোটেলে থেকে তার পরের দিন বাশার কে বাসায় নেওয়া হলে আমিরুল সুলতান নওগাঁ চলে আসে।
বাশার সুলতান কিছুটা সুস্থ, কথা বলতে পারে। এজওয়ান জিজ্ঞেস করলো-
“ কোন বা’ল নিয়ে চিন্তা করে শরীরের এই হাল করছিলা? বলো আমায়। ”
বাশার সুলতানও বলে দিলেন।

“ তোর বউয়ের জন্য। বে’য়াদব মেয়ে একটা। আমাকে মা’রার প্ল্যান করেছিল! ভাগ্যিস সব টুকু চা খাই নি। সেজন্য বেঁচে আছি। নইলে তোর বউ তো আমাকে কবরেই পাঠিয়ে দিচ্ছিলো! ”
এজওয়ান অবিশ্বাস্য চাহনি নিয়ে তাকালো বাশার সুলতানের দিকে।
“ অসুস্থ হয়ে মাথা হ্যাঙ হয়ে গেছে নাকি? ”
“ না আমার মাথা ঠিকই আছে। তোর মাথা আর মাথার জায়গায় নাই। আমি কি তোর বাপ হয়ে মিথ্যা কথা বলবো তোকে? সেদিন আমি বাগানে বসে ইয়াসিনের সাথে কথা বলতেছিলাম। তোর বউ মিষ্টিমুখে এগিয়ে এসে বলল, আঙ্কেল এই নিন চা খান। বিকেলে চা ছাড়া কথাবার্তা ঠিক জমে না। আমিও ভালো মনে চা টা খাইছিলাম এই ভেবে পুতের বউ প্রথমবার আমার জন্য চা বানিয়ে আনছে। কিন্তু নাহ্ তোর বউ আমারে বিষ দিছে। কি ডেঞ্জারাস এই মাইয়া। জেলে যে পাঠাই নাই এটাই তোর বউয়ের সাত কপালের ভাগ্য। বউ নিয়ে বাড়ি ছাড় তাড়াতাড়ি। ”
এজওয়ান ভাইয়ের কাছে আসলো। জিজ্ঞেস করলো-

“ ভাই মাহিই কি বাবাকে বিষ দিয়েছিল? ”
সোলেমান ল্যাপটপে চোখ রেখে বলল-
“ হুম। ”
এজওয়ান দাঁত চেপে বলল-
“ আগে কেনো বললে না আমায়? ”
“ বললে কি হতো? কি করতি তুই? কি করার ক্ষমতা আছে তোর? ”
এজওয়ান কথা বাড়ালো না। সোজা নিজের রুমে গিয়ে মাহির হাত শক্ত করে চেপে ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলো। গাড়ি চলতেছে ফুল স্পিডে। কিন্তু মাহির মনে কোনো ভয় নেই। মাহি জিজ্ঞেস করলো-
“ জেনে গেছেন তাহলে সত্যি টা? ”
এজওয়ান নিশ্চুপ। রাগে শরীর কাঁপতেছে। ইচ্ছে করতেছে মাহি কে জাস্ট মে’রে ফেলতে। মাহি ফের বলতে লাগলো-
“ বেঁচে গেলো কি করে আপনার ঐ খু’নি বাপ? আমি তো অনেকটাই মিশিয়েছিলাম চায়ে। তাহলে? নো প্রবলেম বেঁচে যখন গেছেই নেক্সট টাইম আরো শক্তপোক্ত ভাবে মা’রবো।
এজওয়ান জোরে ব্রেক কষলো। মাহির গাল চেপে ধরে সিটের সাথে ঠেসে ধরে গর্জন তুলে বলল-

“ বা’ন্দির বাচ্চা অনেক সহ্য করছি তোরে আমি। এই এজওয়ান জীবনে কাউকে এতটা সহ্য করে নি। তোর এত বড় কলিজা হয় কি করে আমার বাপ রে মারার চেষ্টা করার? কি করছে কি আমার বাপ তোর? তোর মায় রে মারছে? আরেহ্ তোর মা তো নিজেই আত্মহ’ত্যা করছে। তোর নিজের বাপ বইলা বেড়ায়ছে যে প’রকীয়া করে ধরা খাইছিলো বলে লজ্জায় ম’রে গেছে। সেখানে তুই আমার বাপরে কি করে দোষী ভাবস? তোর বাপ রে মা’রতে পারস নাই? ”
মাহি এজওয়ানের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই এজওয়ান আরো চেপে ধরলো। মাহি থেমে থেমে বলল-
“ তোর বাপের জন্যই আমার মা আত্মহত্যা করছে। তোর বাপের কাছে সাহায্য চাইতে গেছিলো আমার মা।তোর বাপের বন্ধু ছিলো ঐ তরিকুল। তোর বাপ আমার মায়ের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে আমার মায়ের সাথে…”
এজওয়ান বাকি কথাটা আর বলতে দিলো না। গাড়ি স্টার্ট দিলো। গাড়িটা গিয়ে সোজা থামলো চৌধুরী বাড়ি। এজওয়ান গাড়ি থেকে নেমে মাহিকে টেনে নিয়ে ভিতরে ঢুকলো। তরিকুল চৌধুরী খবরের কাগজ পড়ছিলো বসার ঘরে আকস্মিক সদর দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো মাহিকে টেনে টেনে নিয়ে আসতেছে এজওয়ান। তরিকুল চৌধুরী বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। এজওয়ান মাহিকে ছেড়ে সোজা তরিকুল চৌধুরীর দিকে এগিয়ে গিয়ে কোনো কথা না বলেই মা’রতে শুরু করলো। বাহিরে শোরগোলের আওয়াজ শুনে রুম থেকে বেরিয়ে আসলো তরিকুল চৌধুরী ছেলে সাদাত। বাপকে মারতে দেখে এগিয়ে এসে এজওয়ান কে থামাতে চাইলে এজওয়ান সাদতকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল-

“ তুই আর একবার থামাতে আসবি তো বাপ ব্যাটা দুটোকেই পিটাবো আমি। বাচ্চা বাচ্চার মতন থাক। একদম ঢুকবি না এসবের মধ্যে। ”
এজওয়ান তরিকুল চৌধুরীর নাক মুখে ঘুষি মা’রতে মা’রতে বলল-
“ তোর বউয়ের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে আমার বাপ তোর বউরে রে*প করছে? তুই জানার পরও তাহলে আমার বাপরে কিছু করলি না কেনো? আমার বাপের সাথে বিজনেসে যুক্ত ছিলি কেনো? তোর বউয়ের না আসামি আমার বাপ? পুলিশ তাহলে ধরলো না কেনো আমার বাপরে? বল উত্তর দে। ”
তরিকুল চৌধুরীর স্ত্রী লুবনাও বেরিয়ে এলেন এবার রুম থেকে। স্বামী কে ছাড়াতে গেলে এজওয়ান হাত উঁচু করে আসতে মানা করে দেয়। আসলে অবস্থা খারাপ করে ছাড়বে। তরিকুল চৌধুরীর নাক মুখ দিয়ে র’ক্ত বের হচ্ছে। আর কুলাতে পারছে না যন্ত্রণা। শ্বশুর হয়ে মেয়ের জামাইয়ের হাতে মা’ইর খাচ্ছে!
“ কি হলো বল? তোর বউয়ের সাথে আমার বাপ কিছু করছে? যদি করে থাকে সেট বল। আমি মাহির মা কে ইনসাফ পাইয়ে দিব আমার বাপ রে হাজতে পাঠিয়ে। প্রুফ দে জাস্ট। আমি মেনে নিব। মেনে নিব আমার বাপ একজন ধ’র্ষক। যদি বলতে না পারিস তাইলে তোর আমি এমন হাল করবো যে তুই ভাবতেও পারবি না। ”
তরিকুল চৌধুরী নাকের র’ক্ত মুছতে মুছতে বলল-

“ আমি বলছি,আমি বলছি। আর মে’রো না আমায়। সেদিন মেরিলিন সুলতান নিবাসে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল ঠিকই কিন্তু নিবাস অব্দি পৌঁছাতে পারে নি। তার আগেই আমি মেরিলিন কে মাঝ রাস্তা থেকে উঠিয়ে নিয়েছিলাম। মেরিলিন আমার নামে বিচার দিতে চাইছিলো বাশারের কাছে। আর বাশার সেসব জানতে পারলে আমাকে বিজনেস থেকে বের করে দিত। আমি তখন রাস্তায় বসে যেতাম সেজন্য মেরিলিন কে ধরে নিয়ে বোঝাতে চাইছিলাম যেনো বাশার কে কিছু না বলে। কিন্তু মেরিলিন তার কথায় অটল ছিলো। সে আমার সব কুকর্ম ফাঁস করতে চাইছিলো তাই আমিই নিজ হাতে তাকে মে’রে ফেলি। মা-রা শেষে ওর বডি টা রুমে এনে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে রাখি যাতে আত্মহ’ত্যা বলে প্রমাণ হয়। হলোও তাই। মেরিলিনের হত্যার যেন তদন্ত না হয় সেজন্য আমি পুলিশ দের কে টাকা খাইয়েছি। ডক্টর দের রিপোর্ট বানাতে বলেছি মিথ্যা আত্মহ’ত্যার।

মাহির পায়ের নিচের মাটি সরে গেলো। তার মা কে এই লোকটা নিজ হাতে হ’ত্যা করেছে! মাহির বুকের ভেতরটা এফোড় ওফোড় হতে লাগলো। তেড়ে আসলো। তরিকুল চৌধুরীর গলা চে’পে ধরে বলল-
“ শয়তানের বাচ্চা তুই মে’রেছিস আমার মা’কে! নিজ হাতে মেরেছিস! তোকে আজ আমি মে’রেই ফেলবো। তুই মানুষ নামে জা’নোয়ার। তোর বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। ”
পাশ থেকে ফলের ছুরি টা নিয়ে মারতে নিলে এজওয়ান থামিয়ে দেয়। মাহি হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল-
“ ছাড়ুন হাত। আমি এটাকে মে’রেই ফেলবো। ও মে’রে ফেলছে আমার আম্মাকে! আমি এত বছর ধরে জেনে এসেছি আমার আম্মুর আত্মহ’ত্যার পেছনে আপনার বাবার হাত। কিন্তু আমার মা তো আত্মহ’ত্যাই করে নি। এই শয়তানের বাচ্চা মে’রে ফেলেছে। আমি নির্দোষ একটা লোকের প্রাণ নিতে যাচ্ছিলাম যেখানে আমার জন্মদাতা পিতা নামের একটা কুলাঙ্গার কিট আসল হ’ত্যাকারি! ”
এজওয়ান মাহির হাতে থাকা ছু’রিটার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ এই ফল কাটার ছু’রি দিয়ে মা’রলে বড়োজোর আহত হবে আমার মতন। ম’রবে না। মা’রতে হলে রাম দা দিয়ে কু’পিয়ে কু’পিয়ে মা’রতে হবে। ”

“ তাহলে সেটাই এনে দিন। আমি এটাকে নিজের হাতে মে’রে জেলে যাব। ”
“ উঁহু সুইটহার্ট। খুনের দায়ে যদি জেলে যেতেই হয় তাহলে শুধুমাত্র আমার খুনের দায়ে যাবে জেলে। এটার ব্যবস্থা আমি করতেছি। এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সারাজীবন জেলে পঁচে ম’রতে হয়। চলো এখন শ্বশুরের পা ধরে ক্ষমা চাইবে। তোমার এই গর্দভ মাথার জন্য আমার বাপ মরতে মরতে বেঁচে গেছে। ”
পুলিশ এসে তরিকুল চৌধুরী কে নিয়ে গেলো। সেই ২৬ বছর আগের আত্মহ’ত্যা কেসের আবার পূনরায় তদন্ত করা হবে। কেস টার দায়িত্ব এসে পড়েছে হাবিবের উপর।
বাশার সুলতান তরিকুল চৌধুরীরর ব্যপারে সব জেনে আশ্চর্য হয়েছে। রেগে বলেছে— হা’রামজাদার যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়। হা’রামজাদার জন্য হা’রামজাদার মাইয়া আমায় মা’রতে আসছিলো।
এজওয়ান মাহিকে নিয়ে নিবাসে ফিরেছে। সোলেমান আঁড়চোখে ছোট ভাইয়ের কার্যকলাপ দেখতে লাগলো। বাপের খু’নিকে ফের নিবাসে নিয়ে আসা? সোলেমান কিচ্ছু বললো না। মাহির উপর থেকে তার এক্সপেকটেশন সব উঠে গেছে। এত পড়াশোনা করা শিক্ষিত মেয়ের দ্বারা এত বড় ভুল! নিজের ঘরে খু’নি কে রেখে পরের ঘরের মানুষ কে এসেছে খু’ন করতে!

বাশার সুলতান মাহিকে নিবাসে দেখে একটুও খুশি হলেন না। কেই বা নিজের হ’ত্যাকারী কে দেখে খুশি হয়? মাহি কিছু বলতে আসলেই বাশার সুলতান এড়িয়ে যাচ্ছে। ভরসা নেই আবার না কখন মিষ্টি হাসি দিয়ে মেরে ফেলে। নারী বড় ছলনাময়ী। জীবনের দাম অনেক। এত তাড়াতাড়ি মরতে চায় না বাশার সুলতান।
মাহিও জোর দিয়ে কথা বলার তেমন চেষ্টা করতেছে না। এতবড় ব্লান্ডার কি করে করতে পারলো সে! মাহির উচিত ছিলো শুধু বোনের কথার উপর বিশ্বাস না করে নিজেরও অনুসন্ধান করা।
বাশার সুলতান এখন ভালোই আছে শুনে মেহরিন স্বস্তির শ্বাস ফেললো। কিন্তু ভিলার কেউ জানে না মাহি বাশার সুলতান কে মা’রার চেষ্টা করেছে। এজওয়ান মানা করেছে বলতে। ভিলার সবাই জানলে মাহি কে সবাই খারাপ বলবে।

আফিয়া সুলতান সোলেমান কে ফোন করলো। অনেক দিন হলো আফিয়া সুলতানের মা আফসানা বেগম নাতবউ কে দেখতে চাইছেন। বিছানায় পড়ে গেছেন তিনি। বয়স তো অনেক হলো। আফিয়া সুলতান চাইছেন সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে একটু দেখা করে আসুক। সোলেমান জানিয়েছে আগামীকাল আসবে মেহরিন কে নিয়ে যাবে। আর সেখান থেকে ঘুরে সোজা সুইজারল্যান্ড যাবে। আগষ্টের আগে ফিরবে না। মেহরিন যেন নিজের সব কিছু গুছিয়ে রাখে।
আফিয়া সুলতান আচ্ছা বলে মেহরিন কে জানালো সোলেমান আসবে। আর এসে তাকে বরিশাল নিয়ে যাবে। মেহরিন স্বামী আসবে শুনে খুশি হলো। কিন্তু কবে আসবে সেটা বললো না।
বাশার সুলতান সোলেমানের চলে যাওয়ার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকালো। আশ্চর্য ১৭ মার্চের আগে কি করে দেশের বাহিরে যাচ্ছে! ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ৫০ বছর পূর্তি হবে। সেটা নিয়েও এলাহি আয়োজন করা হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আসবে। দেশে আরেক বিস্তার গন্ডগোল হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মুসলিম লোকজন ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে বাংলাদেশে ঢুকতে দিবে না বলেছে। জায়গায় জায়গায় আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। দেশে রণক্ষেত্র হতে যাচ্ছে। সেই সবের ভেতরে বাশার সুলতান কে একা রেখে ভাইস্তা তার দেশের বাহিরে যাচ্ছে!
সোলেমান চাচার এহেন কথা শুনে বলল-

“ নিজের জন্মদিনে জীবনে দশ টাকার একটা কেক কিনে খাই নাই সেখানে আমি অন্যের জন্মদিনে এত নাটক করবো? সরি সম্ভব নয়। তুমি সামলিও। আমি বাহিরে থেকে পালন করবো স্বাধীনতা। ইব্রাহিম আছে তোমার সাথে এজওয়ান আছে তারা সামলাবে। গণ্ডগোল হলে তোমার যা করণীয় তাই করবে। উপর মহল থেকে যা বলবে তাই শুনবে। ১৫ আগষ্টের পর আসবো আমি। ততদিন ক্ষমতা তোমার হাতে। ”
বাশার সুলতান এজওয়ান আর ইব্রাহিমের দিকে তাকালো। এজওয়ান বলল-
“ আমি ভাই যাওয়ার পর পর চলে যাচ্ছি। রুমাইসা সুন্দরবন যাবে বলেছে। সেখানে যাব বউ বোন নিয়ে। আমি থাকতে পারবো না। ”
ইব্রাহিম এবার নিজের দিকে বাশার সুলতান কে তাকাতে দেখে বলল-

“ আমার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই চাচা। আমিও এজওয়ানের সাথে চলে যাব। অনেক দিন হলো ঘুরতে যাই না কোথাও। আপনি একাই জন্মদিন পালন করেন ছেলেপেলে নিয়ে। ”
বাশার সুলতান হতাশ..আজ একটা বউ নেই বলে সেও বলতে পারতেছে না আমিও থাকতে পারবো না। দেশের বাহিরে চলে যাব।
পরের দিন দুপুরে সোলেমান নওগাঁ আসলো। মেহরিন তখন দুপুরের নামাজ টা পড়ে ভাতঘুম দিয়েছে। হুট করে খুব পরিচিত পারফিউমের ঘ্রাণ পেতে লাগলো নাকে। কিন্তু চোখ মেলতে পারতেছে না ঘুমের কারনে। আকস্মিক মাথায় কারো হাতের স্পর্শও পেলো। নাহ্ আর চোখ বন্ধ করে রাখতে পারলো না মেহরিন। চোখ মেলে তাকাতেই কালো শার্টে স্বামীকে দেখে মেহরিন চমকে উঠলো। ভুল দেখছে নাকি? পরপর কয়েকবার চোখ ঝাপটানি দিলো। নাহ্ ঠিকই দেখছে। তার স্বামী এসেছে! মেহরিন বোঝা মাত্রই শোয়া থেকে উঠে বসলো। অবিশ্বাস্য গলায় বলল-

“ আপনি! ”
সোলেমান মেহরিনের মুখে এসে পড়া এলোমেলো চুল গুলো কানের পাশে গুঁজে দিয়ে বলল-
“ হুমম আমি। ”
“ মনে হচ্ছে ভ্রম। ”
সোলেমান মেহরিনের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু খেয়ে বলল-
“ ইট’স ট্রু মিসেস সুলতান। আমি এসেছি। এখনও বিশ্বাস না হলে নাও ইউ ক্যান কিস মি। ”
মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
“ আর ইউ শিওর? ”
সোলেমান মেহরিনের কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে বলল-
“ ইয়াহ্ অ্যাম শিওর, কিস মি। ”
মেহরিন তার নরম দু হাত সোলেমানের গালে রেখে অসংখ্য চুমুতে ভরিয়ে দিলো মুখটা। সোলেমান আলগোছে মেহরিনের কোমর চেপে নিজের সাথে চেপে নিলো। মেহরিনের এক একটা চুমুই প্রকাশ করতেছে কতটা তৃষ্ণার্ত সে ছিলো। মেহরিন চুমু খেয়ে সরে আসতে নিলে সোলেমান আসতে দিলো না। মেহরিনের ঠোঁটের দিকে এগোতে এগোতে বলল-

-“ নাও মাই টার্ন মিসেস সুলতান। ”
পরম যত্নে আঁকড়ে ধরলো মেহরিন ওষ্ঠ সোলেমান, নিজের ওষ্ঠদ্বয় দ্বারা। মেহরিন গ্রহণ করে নিলো স্বামীর এই আদর টুকু। সোলেমানের বা হাত মেহরিনের কামিজ ভেদ করে উন্মুক্ত কোমরে বিচরন করছে। বেশ অনেকক্ষণ পরই সোলেমান মেহরিন কে ছাড়লো। মেহরিন ছাড়া পেয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে স্বামীর বুকে মাথা রেখে শরীর ছেড়ে দিলো। সোলেমান চেপে ধরলো মেহরিনের মাথাটা।
তার পরের দিন সকালে সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো বরিশালের উদ্দেশ্যে। মেহরিন কে সোলেমান বলেছে-

-“ জাস্ট দুই এক সেট জামাকাপড় নাও। আমরা একদিন বরিশাল থেকে তারপর সুইজারল্যান্ড যাচ্ছি। ”
মেহরিন গাড়িতে উঠতেই সোলেমান সিট বেল্ট বেঁধে দিতেই মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
“ আমরা বরিশাল কেনো যাচ্ছি? ”
সোলেমান গাড়ি চালাতে চালাতে বলল-
“ তোমার শাশুড়ির মায়ের সাথে দেখা করতে। ”
মেহরিন গাড়ির জানালা দিয়ে বাহির টা দেখতে লাগলো। মনে মনে ভাবতে লাগলো, সুলতান সাহেবের কোনো আত্মীয় কে সে এখনও দেখে নি। মেহরিনের তো বউভাতের অনুষ্ঠান টাই হয় নি। কিন্তু বিয়েতে তো কোনো আত্মীয় কে দেখলো না।
এক ঘন্টা পর মেহরিন আর সোলেমান গাড়ি থেকে নামল, শাহ মখদুম বিমানবন্দরে।
সোলেমান মেহরিনের হাত ধরে গাড়ি থেকে বের হয়ে তার প্রাইভেট জেটের দিকে আগালো। এই জেট টা অন্য জেটের তুলনায় ছোট।
জেটের সামনে দাঁড়িয়ে, সোলেমান পাইলটের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“সব ঠিকঠাক তো?”
পাইলট বিনম্রভাবে মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন-
“জি, স্যার। সব প্রস্তুত, উড়ান নিরাপদ।”
মেহরিন জেটের দিকে এগোল। তারা প্লেনে করে যাবে! মেহরিন কখনও প্লেনে চড়ে নি। সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চড়ে ভিতরে ঢুকলো।
পাইলট ককপিটে বসে সমস্ত যন্ত্র পরীক্ষা করলেন। ইঞ্জিন গর্জন শুরু হলো। জেট ধীরে ধীরে রানওয়েতে এগোতে লাগল। হালকা কুয়াশা আর ধুলো মিশ্রিত বাতাসে সামান্য কাঁপুনি অনুভূত হলো। মেহরিন সিটে চেপে বসে গভীর শ্বাস নিল, সোলেমান পাশ থেকে সব কিছু নজর রাখল।
উড়াল শুরু হলো। মেহরিন প্লেনের জানালা দিয়ে দেখতে পেলো সবুজ ক্ষেত, নদী, ছোট গ্রামীণ রাস্তা। কি অপূর্ব সেই দৃশ্য।

প্রায় ৫৫ মিনিট পর উড়াল শেষে জেট বরিশাল বিমানবন্দর এ অবতরণ করল।
বরিশাল বিমানবন্দর থেকে গাড়ি নিয়ে তারা দুপুরের লাঞ্চ করে পিরোজপুরের বহরমপুরের দিকে রওনা দিল। প্রায় ২ ঘন্টা শেষে তারা এসে পৌঁছাল সেই কাঙ্খিত বাড়িটায়। মেহরিন দেখলো শেওলা রঙের এক তালা বিশিষ্ট বাড়ি। চারিদিকে এরকম এক তালা করে আরো দুটো বাড়ি দু পাশে। লম্বা উঠান, কি সুন্দর বাড়িটা! একপাশে গরুর ঘর, ছোট পুকুর। পুকুরে মাছ ধরছে কেউ জাল দিয়ে।
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতেই দুজন মহিলা বেরিয়ে আসলো। জানালা দিয়েই সোলেমানদের দেখা মাত্রই ছুটে এসেছে ।
মহিলা দুটো সোলেমানের দিকে এগিয়ে এসে বলল-
“ আসলে তাহলে বউ নিয়ে সোলেমান! ”
সোলেমান মৃদু হেঁসে বলল-

“ এত করে বললেন আসতে। না এসে পাড়া যায়? ”
মহিলা দুটো মেহরিনের দিকে তাকালো। একটা সোলেমানের ছোট মামি ময়না। আর পাশের টা উনার মেয়ে মিম। সাথে সোলেমানের বড় মামু খালেক মোল্লার ছেলে খায়রুলের বউ । ছোট ভাইয়ের মেয়েকেই ছেলের বউ বানিয়েছে খালেক মোল্লা। তারা এখনও মুখ দেখতে পারে নি মেহরিনের মুখে নিকাব থাকায়। পুকুর থেকে মোল্লা বাড়ির বড় ছেলে খালেক মোল্লা উঠে আসলেন। সোলেমান মামাকে দেখে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ ভালো আছেন মামা? ”
খালেক মোল্লা বললেন-
“ এই তো বাবা ভালো আছি। তোমার মা রে সেই কবে থেকে বলতেছিলাম সোলেমান যেন বউমা রে নিয়ে আসে। তোমার তো সময়ই হচ্ছিলো না। কত ব্যস্ত মানুষ। এখন যে আসছো এক সপ্তাহের আগে যেতে দিব না। ”
“ কালই রওনা দিতে হবে মামা। আসলে দেশের বাহিরে যাব তো। থাকা সম্ভব নয়। ”
খালেক মোল্লা হতাশ হলো। ছেলেটা আসলে একদিনের বেশি থাকেই না।
ময়না বেগম সামনে থেকে সরে বলল-

“ ভেতরে চলো। জিরিয়ে নাও। কথাবার্তা পরে হবে। বউমা কে নিয়ে রেস্ট নাও। আমি নাস্তা পাঠাচ্ছি। ”
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে ভেতরে চলে আসলো। সোলেমান এসেছে শুনে তার ছোট মামা মালেক মোল্লা বাজার থেকে বড়বড় মুরগী মাছ, মিষ্টি দই নিয়ে এসেছে।
মেহরিন বোরকা টা খুলে ফ্রেশ হয়ে নিলো। মেহরিনের হতেই সোলেমান গেলো ফ্রেশ হতে। এর ভেতরে মিম আসলো নাস্তা নিয়ে। দরজায় টোকা দিতেই মেহরিন গিয়ে দরজা খুলতেই মিম জাস্ট হা হয়ে গেলো মেহরিন কে দেখে। কি সুন্দর দেখতে এই মেয়েটা। চোখ ধাধানো সুন্দর। মেয়েটার গায়ের রঙের সামনে মিমের গায়ের রঙ কে কালো বলতেও দ্বিধা করবে না কেউ। যদিও মিম শ্যামলা।
মেহরিন অস্বস্তি তে পড়ে গেলো মিমের এমন চাহনিতে। সোলেমান ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে মিম কে এভাবে তার বউয়ের দিকে তাকাতে দেখে বলল-

“ নজর কম দাও আমার বউয়ের উপর মিম। ”
মিম হেঁসে ফেললো।
“ আপনার বউ কিন্তু মেলা সুন্দর ভাই। আপনে জিতছেন। ”
“ আমার বউ হেরেছে বলছো? ”
“ এমা না না ভাবিও জিতছে। আপনাগো দুজনরে সেই মানইছে। যাকে বলে ইংরেজি তে ম্যেডিং ফর ইচিং আদার। খাবার খাইয়া ভাবিরে নিয়ে দাদির কাছে আইসেন। দাদি দেখতে চাইতাছে আপনেগো। ”
“ আচ্ছা যাও আসতেছি। ”
মিম চলে গেলো। মেহরিন মৃদু হাসলো মিমের ম্যেডিং ফর ইচিং আদার শব্দ টা শুনে। মেহরিন দরজা টা চাপিয়ে দিয়ে খাবার নিয়ে বিছানায় আসলো। সোলেমান ভেজা টাওয়াল সোফায় ফেলে এগিয়ে আসলো। মেহরিনের হাতে থাকা খাবারের প্লেট উঁচু করে দেখলো ভাত,মাংস দেওয়া হয়েছে।
খেতে ইচ্ছে করলো না সোলেমানের। আসার পথেই খেয়ে এসেছে পেট ভরে। মেহরিন কে বলল-

দাহশয্যা পর্ব ৫৫

“ তুমি খেয়ে নাও। ”
মেহরিন খাবার গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল-
“ পেট ভরা তো আমার। এত খাবার কি করে খাব? ”
সোলেমান এক প্লেট দেখিয়ে বলল-
“ এটা থেকে নিজে খাও আর আমাকেও খাইয়ে দাও। খাবার নষ্ট করলে বিষয় টা বাজে দেখাবে। ”
মেহরিন হাত ধুয়ে সোলেমান কে খাইয়ে দিয়ে নিজেও খেতে লাগলো। এমন সময় হুট করে দরজা ধাক্কা দিয়ে একজন ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে লল-
“ আমি নতুন মামি দেখবো। আমি নতুন মামি দেখবো….

দাহশয্যা পর্ব ৫৭