দাহশয্যা পর্ব ৫৭
Raiha Zubair Ripti
লাল টুকটুকে জামায় মেহরিনের কোলে গুটিশুটি হয়ে বসে আছে ছোট্ট জ্বিম। বয়স তার হবে ৪ এর মতন। আধোআধো হাতে মেহরিনের গাল ছুঁইয়ে দিচ্ছে থেকেথেকে । মেহরিন মুগ্ধ হয়ে দেখছে বাচ্চা মেয়েটাকে। কি কিউট মাশা-আল্লাহ, মাশা-আল্লাহ । মায়ের চেয়েও উজ্জল গায়ের রঙ হয়েছে মেয়েটার। মেহরিন চুমু খেলো জ্বিমের হাতে। জ্বিম তার মিষ্টি গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“ বালো আতো তুমি? ”
মেহরিন হাসলো এ কথা শুনে। দু গালে হাত রেখে বলল-
“ হ্যাঁ মা ভালো আছি আমি। তুমি ভালো আছো? ”
“ হু বালো আতি। ”
মিম হতাশ হচ্ছে মেয়েকে নিয়ে। মেয়ের হাত ধরে টানলে আরো জাপ্টে জড়িয়ে ধরে জ্বিম মেহরিন কে। মেহরিন বলল-
“ আপু থাকুক না। ”
“ ওয় অনেক জ্বালাবে তোমারে ভাবি। খুব দুষ্টুমি করে। ”
“ সমস্যা নেই। ”
মিম চলে গেলো। পাশেই দাঁড়িয়ে সোলেমান দেখছিল বউ আর মেয়েটাকে।মিমের যে মেয়েও হয়েছে জানতো না সোলেমান। জানলে আসার পথে মেয়েটার জন্য কিছু নিয়ে আসতো।
সোলেমান মেয়েটার দিকে ঝুঁকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ নাম কি? ”
জ্বিম সোলেমানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ জ্বিম। ”
মেহরিন বলল, “ মাশা-আল্লাহ সুন্দর নাম তো তোমার। ”
সোলেমান সোজা হয়ে বলল-
“ চলো নানুর সাথে দেখা করবে। ”
মেহরিন বসা থেকে উঠে জ্বিম কে কোলে নিতে চাইলে সোলেমান বলল-
“ হাঁটিয়ে নিয়ে আসো। কোলে নেওয়ার দরকার নেই। দেখতে নাদুসনুদুস লাগছে। পড়ে যেতে পারো। ”
“ আমি পারবো…”
সোলেমান গম্ভীর গলায় বলল-
“ যেটা বলছি সেটা করো। হাঁটিয়ে নিয়ে এসো। হাঁটতে জানে তো। ”
মেহরিন হাত ধরে হাঁটা ধরলো জ্বিমের।
দক্ষিণ দিকের রুমে বিছানায় শুয়ে আছে আফসানা বেগম। বয়স তার ৭৯ ছুঁই ছুঁই। কমাস ধরেই সে বিছানায় পড়া। প্রস্রাব পায়খানা আসলে ছেলের বউ,নাতনি ধরে নিয়ে যায়। তারাই গোসল করিয়ে দেয়। চোখেও আজকাল ঝাপ্সা দেখেন তিনি।
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে রুমে ঢুকলো। মেহরিন দেখলো আফসানা বেগম কে। খালেক মোল্লার বউ লিপি বেগম বলল-
“ আম্মা সোলেমান আর সোলেমানের বউ আইছে। ”
আফসানা বেগম মাথা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে বলল-
“ কই আমার সোলেমান আর সোলেমানের বউ? আমারে একটু দেখতেও আসে না সোলেমান। ”
সোলেমান এগিয়ে গিয়ে পাশে বসলো। নানির হাত ধরে বলল-
“ এই তো আমি। ”
আফসানা বেগম উঠতে চাইলেন শোয়া থেকে। সোলেমান উঠিয়ে বসালো। আফসানা বেগম সোলেমানের মুখ খুঁজে মুখে হাত বুলিয়ে বলল-
“ নানিরে একটুও দেখতো আসো না নানুভাই। আপন নানি না বলে দেখতে আসো না তাই না? ”
মেহরিন ভ্রু কুঁচকালো। আপন নানি না মানে? তাহলে কি আফিয়া সুলতানের সৎ মা উনি?
“ ব্যস্ততার জন্য আসা হয় না নানু। ” লিপি বেগমের দিকে তাকিয়ে সোলেমান বলল-“ নানুর চিকিৎসা হচ্ছে তো? ”
লিপি বেগম বলল-
“ হ্যাঁ হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে ডাক্তার আসে। ”
আফসানা সুলতান তার নাতবউ কে দেখার জন্য বলল-
“ নাত বউ কই? সে আসে না ক্যান আমার কাছে? ”
মেহরিন এগিয়ে গেলো। সালাম দিয়ে বলল-
“ এই তো আমি নানু। ভালো আছেন আপনি? ”
আফসানা বেগম হাত বাড়ালেন। মেহরিন হাতটা ধরতেই আফসানা বেগম পাশে বসিয়ে বলল-
“ তোর মুখটা আমি ঝাপ্সা দেখতেছি রে নাতবউ। শুনছি পরীর মতন বউ আনছে আমাগো সোলেমান। ইশ তোরে দেখতে পারতেছি না আমি। ”
মেহরিন হাত ধরে বসে রইলো। বেশ কিছুক্ষণ গল্প গুজব করলো তারা। রাতে খায়রুল আসার পর সোলেমান খায়রুলের সাথে উঠানে গিয়ে কথাবার্তা বলতে লাগলো। জ্বিম মেয়েটা মেহরিন কে ছাড়ছেই না সাথে সাথে থাকছে। মেহরিনও সাথে সাথেই রাখছে। রাতে সবাই বড় ডাইনিং টেবিলে বসে একত্রে খেয়ে যা যার রুমে চলে গেলো ঘুমাতে।
সকাল ভোরের দিকে মেহরিন ফজরের নামজ টা শেষ করতেই সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে ধানসিঁড়ি নদীর কাছে আসলো। মেহরিন জীবনানন্দ দাশের কবিতায় পড়েছিল এই ধানসিঁড়ি নদীটা কে। খুব ইচ্ছে জেগেছিল দেখার। তবে সেই সৌন্দর্য এখন আর তেমন নেই যেমনটা কবি তার লেখায় প্রকাশ করেছিলো। ভরাট হয়ে আসতেছে নদী টা। সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে হাঁটলো নদীর পাশ দিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে তারা বহরমপুর চলে আসলো। সকালের খাবার খেয়েই তারা সকলের থেকে বিদায় নিয়ে বরিশাল বিমানবন্দরে চলে আসলো। এখান থেকেই তারা সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে উড়াল দিবে।
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে ঠিক দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে প্রাইভেট জেটে চড়ল।
প্রায় ৮ ঘণ্টার ফ্লাইটের পর, সন্ধ্যার দিকে তারা পৌঁছালো সুইজারল্যান্ডের Engadin Airport, Samedan, যা সেন্ট মরিট্জের খুব কাছে। সোলেমান জেট থেকে নেমেই মাস্ক পড়ে নিয়েছে মুখে। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে মেহরিন দেখলো তাদের জন্য আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল লাক্সারি প্রাইভেট গাড়ি। গাড়ির আগে পিছে আরো চারটি গাড়ি। সোলেমান মেহরিনের হাত ধরতেই দু’জন এসে মেহরিন দের ল্যাগেজ টা তুলে রাখলো গাড়ি তে। সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে গাড়ির কাছে আসতেই সেই দু’জন দরজা খুলে দিলো। সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। সোলেমানের ড্রাইভার রিয়ম গাড়ি চালাচ্ছে। মেহরিন জানালা দিয়ে পেছন তাকিয়ে দেখলো তাদের গাড়ি পেছনে সেই গাড়ি গুলো আসতেছে। সামনে গাড়ি দুটো যেদিকে যাচ্ছে তাদের গাড়িটাও সেদিকে যাচ্ছে। সোলেমান মেহরিন কে এভাবে বারবার পেছন ফিরতে দেখে বলল-
“ আমার গার্ড ওরা। ডোন্ট ওয়ারি। ”
গাড়িটি ধীরে ধীরে চলে গেল এংগাডিন ভ্যালির বিশাল, শান্ত সবুজ মাঠের দিকে। চারপাশে কোনো বাড়ি নেই, শুধু পাহাড়, খোলা ঘাসের মাঠ এবং দূরে ছোট ছোট ঝরনাস্বর। মার্চ মাসের হালকা ঠাণ্ডা বাতাস মুখে লাগে, আর সূর্য পশ্চিমে ঢলে যাচ্ছে।
ভ্যালির একেবারে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সোলেমানের বিশাল ক্রিম কালারের ভিলা। কংক্রিট ও মার্বেল দিয়ে তৈরি, দুই তলা, বাইরে থেকে বিশাল কাঁচের জানালা আর বারান্দা চোখে পড়ে। ফ্রন্টে চকচকে লন, আর ভিলার চারপাশে ৮–১০ জন গার্ড পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে।
সোলেমান গাড়ি থেকে নামলো মেহরিনের হাত ধরে। গার্ডরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিলার চারপাশে অবস্থান নিল। সোলেমান ভিলার ভেতরে হাটা ধরলো। সুলতান নিবাসের থেকেও বিশাল আকৃতির বাড়ি এটা। বাহিরে বাড়ির গেটের দেওয়ালে লেখা সোলেরা হাউস।
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে সোজা নিজের কক্ষে চলে আসলো। বিশাল বড় সেই কক্ষ। একদম পরিপাটি। ড্রেসিং এরিয়াটা জাস্ট দেখার মতন ছিলো। রুমের একপাশে একটা দেওয়ালে লুকানো আর্মর কেসেট, যা কেবল সোলেমানই খুলতে পারে। এটা সোলেমান ছাড়া কেউ জানে না।
সোলেমান শার্টের ওপরে পড়া ভেস্ট টা খুলতে খুলতে বলল-
“ মেহরিন ড্রিসিং এরিয়ায় তোমার পোশাক রাখা আছে নিয়ে ফ্রেশ হও কুইক। ”
মেহরিন বোরকা টা খুলে ড্রেসিং এড়িয়ায় গিয়ে দেখলো পোষাকের কারখানা বোধহয়। সব কালারের ড্রেস আছে এখানে। সব গুলো লং গ্রাউন শিফন কাপড়ের ফুল হাতার। মেহরিন একটা ব্লু কালারের গ্রাউন নিয়ে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। সোলেমান অন্য রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসলো। দু’জনে ফ্রেশ হলে নিচে আসে খাবার খেতে। খাবার টেবিলে হরেক রকমের খাবার সাজানো। তিনজন মহিলা সার্ভেন্ট আছে দাঁড়িয়ে । সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে চেয়ার টেনে বসলো। টেবিলে খাবারের তালিকা হচ্ছে চিকেন কনসোমে,বেকড ভেজিটেবলস,মিক্সড গ্রীনস স্যালাড,চকলেট মুফিন,ফ্রুট টার্ট,গ্রিলড রিবাই স্টেক,বেকড ল্যাম্ব চপস, স্পার্কলিং ওয়াটর।
মেহরিনের দিকে প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলল খাওয়া শুরু করো। মেহরিন খেতে লাগলো। খাওয়াদাওয়া শেষে সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে রুমে আসলো। মেহরিন রুমে এসে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো আর সোলেমান ল্যাপটপ নিয়ে বসলো। মেহরিনের ইচ্ছে করছে এই রাতে খোলা মাঠে গিয়ে হাঁটতে। সোলেমান ল্যাপটপ থেকে মুখ সরিয়ে মেহরিনের দিকে তাকাতেই পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। সোলেমান ফোন বের করে দেখলো লুকা ফোন দিয়েছে। সোলেমানের ম্যানেজার সে। সোলেমান রিসিভ করে বলল-
“ হ্যাঁ লুকা বলো। ”
“ স্যার আগামীকাল একটা পার্টিতে আপনাকে ইনভাইট করা হয়েছে। তারা চাচ্ছে আপনি যেনো অংশগ্রহণ করুন। ”
“ ওকে আই উইল ট্রাই। ”
“ শুনলাম স্যার আপনি বলে বিয়ে করছেন? ঘটনা সত্যি? ”
“ হ্যাঁ। আর কোনো কথা আছে? ”
“ না স্যার। শুভ রাত্রি। ”
সোলেমান ফোন কেটে ল্যাপটপ টা কোল থেকে নামিয়ে বসা থেকে উঠে বেলকনিতে এসে মেহরিনের পেছনে দাঁড়িয়ে মেহরিন কে জড়িয়ে ধরে ঘাড় মুখ গুঁজে দেয়। সোলেমান আকস্মিক এভাবে ধরায় মেহরিন চমকে উঠে। সোলেমান সেটা বুঝে নাক ঘাড়ে ঘঁষে বলল-
“ আমি..চমকে উঠো কেনো? অভ্যস্ত হও আমার ছোঁয়ায়। এখন তো জাস্ট ঘাড়ে মুখ ডুবিয়েছি একটু পর তো অন্য কোথাও মুখ ডুবাবো। তখন কি করবে? ”
মেহরিন সোলেমানের হাতের উপর হাত রাখলো। ভালো লাগছে তার। সোলেমান গলার কাছে নিজের মাথা ঠেকিয়ে নিজের সম্পূর্ণ ভর ছেড়ে দিলো। সোলেমান এক হাতে পাঁজা কোলে নিয়ে কাউচে বসলো মেহরিন কে তার কোলে বসিয়ে। মেহরিন সোলেমানের শার্টের বোতাম নাড়াচাড়া করছে।
আকাশে চাঁদ টা আজ সুন্দর। সোলেমানের ইচ্ছে হলো বউ নিয়ে হাঁটতে। সেজন্য আর বসে না থেকে কোলে নিয়ে নিচে মাঠে আসলো। গার্ড রা সোলেমানের আসা দেখেই মাথা নত করে পেছন ঘুরে সরে দাঁড়ালো। সোলেমানের কড়া আদেশ আছে তার বউ যেদিকে থাকবে সেদিকে যেনো তাদের ছায়াও না থাকে। সব সময় মাথা নত থাকবে। চোখ তুলে তাকানো বারন। সোলেমান মেহরিন কে নামিয়ে হাত ধরে হাঁটা ধরলো। সবুজে ঘেরা মাঠ,জায়গায় জায়গায় ছোটছোট ঝর্ণা আর ছোট একেবারেই ছোট্ট ছোট্ট লেক। তার উপর মৃদু লাইট আর ঠান্ডা শীতল বাতাস, কি শান্তি।
মেহরিনের ভালো লাগছে এভাবে হাঁটতে। হাঁটতে হাঁটতে সোলেমানের মনে হলো বউয়ের ছবি তোলা যাক। সেজন্য সোলেমান মেহরিন কে লেকের পাশে বসতে বলল। মেহরিন বসলো। সোলেমান একটু দূরে দাঁড়িয়ে মেহরিনের ছবি তুললো। ছবি তোলা শেষে মেহরিন কে নিয়ে সোলেমান লেকের পানি তে পা ভিজিয়ে বসলো। মেহরিনের মাথা সোলেমানের কাঁধে। সোলেমান মেহরিনের মাথায় চুমু খেয়ে বলল-
“ ভালো লাগছে? ”
মেহরিন শান্তির সহিত বলল-
“ খুউউউব। ”
“ খুউউউব? ”
“ হুমম। ”
“ কাল একটা পার্টিতে যেতে হবে। তোমায় নিয়ে যাব ভাবছি। ”
“ আমি অভ্যস্ত না ওসবে। ”
“ সমস্যা নেই। তুমি তোমার মতন করেই যাবে। ”
“ না গেলে হয় না? ”
“ উঁহু হয় না। আমার সাথে সাথেই রাখবো। সেই ব্যবস্থা করা আছে। ”
“ আচ্ছা ঠিক আছে। এখন একটা গান শোনান তো সুলতান সাহেব। ভালো লাগছে। আকাশটাও সুন্দর পরিবেশ টাও সুন্দর। ”
সোলেমান ঠিক আছে বলে মেহরিন কে নিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। তারপর হাঁটতে হাঁটতে মাঝেমধ্যে মেহরিনের তর্জনী আঙুল টা ধরে মেহরিন কে ঘুরিয়ে গাইতে লাগলো-
~আগুনের দিন শেষ হবে একদিন
ঝরনার সাথে গান হবে একদিন
এ পৃথিবী ছেড়ে চল যাই
স্বপ্নের সিড়ি বেয়ে সীমাহীন….
গান শেষে মেহরিন সোলেমানের পেছনে পিঠে হাত দিয়ে জড়িয়ে বুকে মাথা ঠেসে দিয়ে সোলেমানের পায়ের সাথে পা মিলিয়ে রুমে আসলো। রুমে এসে মেহরিন কে জড়িয়ে ধরে ঘুম দিলো সোলেমান।
এজওয়ান মাহিকে বলে দিয়েছে তারা দু’দিন পর সুন্দরবন যাচ্ছে। মাহি সেটা শোনামাত্রই না করে দিয়েছে। বলেছে যাবে না সে। এজওয়ান সেটা শুনে বলল-
“ তোমারে আমি জিজ্ঞেস করি নি যাবে কি যাবে না। বলেছি আমরা যাচ্ছি। ”
“ ওকে যান। আমি আপুর ওখানে চলে যাব। ”
“ তোমারেও নিয়ে যাব কথা কানে যায় না? রুমাইসা বলছে তোমাকেও নিয়ে নিতে সাথে। আমার বোনের কথা আমি ফেলতে পারি না। তাই নিজের সহ আমার জামাকাপড় গুছিয়ে রাখো। «
মাহি বিরক্ত হয়ে বলল-
“ আশ্চর্য আমি গিয়ে কি করবো? ”
“ আমার সেবাযত্ন করবা। ”
“ পারবো না। ”
“ তুমি ভাঙবা তবুও মচকাবা না? ”
“ আপনি কি ভাবছেন আপনার বাবা নির্দোষ দেখে আমি আপনাকে খুশি খুশি মনে মেনে নিব? ”
“ সেটাই কি হওয়ার কথা নয়? ”
“ না। সেটা হওয়ার কথা নয়। আপনার বাবা নির্দোষ হতে পারে কিন্তু আপনি আমার সাথে কি কি করেছেন আমি কি ভুলে গেছি? বিয়েটা কিভাবে করেছিলেন মনে নেই? ”
“ এই এক বালের খোঁটা কতবার দিবা? ”
“ জীবন ভর দিব। ”
“ ওয়াও তারমানে জীবন ভর আমার সাথেই থাকতো চাও? ”
“ আমি সেটা কখন বললাম? আজ হোক বা কাল হোক,আপনাকে তো আমি ছেড়ে যাবই। ”
” পরে দেখা যাবে। তুমি ছেড়ে গেলেই তো আর আমি ছেড়ে দিতে দিচ্ছি না। জামাকাপড় গুছাও। সেই একটা লং একটা ট্যুর দিব। একেবারে সুখবর নিয়ে ফিরবো। ”
মাহি ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো-
“ কিসের সুখবর? ”
এজওয়ান দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে লজ্জা পাওয়ার ভান করে বলল-
“ আব্বা আম্মা হওয়ার। ”
মাহি বিরক্ত হয়ে ল্যাগেজ গোছাতে গেলো। না নিয়ে ছাড়বেও না এই বদ লোক।
ইব্রাহিম ইমন কে বলেছে তারা সুন্দরবন যাবে। ইমন কেও যেতে হবে। মালিক যখন বলেছে তখন ইমন যেতে বাধ্য। ইমন খুব শীগ্রই এই ড্রাইভিং এর চাকরি টা ছেড়ে দিবে। কোনো প্রাইভেট কোম্পানিতে খুঁজবে চাকরি।
ইমন রাজি হওয়ায় ইব্রাহিম সেই সুযোগে বলে বসলো-
“ তোমার তো একটা ছোট বাচ্চা বোন আছে শুনেছি। তাকেও নিতে পারো। ভাই বোন অনেক দিন হলো তো দেখা সাক্ষাৎ করো না। এই সুযোগে বোনকেও ঘুরাতে পারবে। ”
ইমন না করে দিলো।
“ ঊর্মি কে নিয়ে আসলে আম্মা একা হয়ে যাবে বাসায়। আনা যাবে না। ”
ইব্রাহিম আর কিছু বললো না। চলে গেলো। ঊর্মির ফোন আসায় ইমন সাইডে এসে কথা বলতে লাগলো। কথার এক ফাঁকে ইমন জিজ্ঞেস করলো-
“ সুন্দরবন যাবি ঘুরতে? ”
ঊর্মি সাথে সাথে হ্যাঁ বলে ফেললো। ইমন বলল-
“ ঠিক আছে কাল নিতে আসবো। প্যাকিং করে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকিস। ”
ঊর্মি আচ্ছা বলল।
🌼
তানভীর রীতিমত ফ্লোরে শুয়ে কান্নাকাটি করা শুরু করে দিছে। তার ভাই ঘুরতে যাবে অথচ তাকে নিবে না। সেদিন ল্যাপটপটা নষ্ট করার জন্য তেহরান তাকে ১০০০ বার কান ধরে উঠবস করিয়েছে। পা কোমর ব্যথায় এক সপ্তাহ ভুগেছে সে। আজ ভাইয়ের পা ধরে হলেও সে ভাই কে রাজি করাবে।
তেহরান ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়েছে। তার ফ্রেন্ড রাও চলে এসেছে। তানভীর কে গড়াগড়ি করে কাঁদতে দেখে ওদের ভীষণ মায়া হলো। তানভীরকে কোথাও নিতে চায় না সাথে করে তেহরান । ছেলেটা ভীষণ ছটফটে স্বভাবের বলে।
তেহরানের বন্ধু সৈকত তেহরান কে বলল-
“ কুয়াকাটাই তো যাচ্ছি। নিয়ে গেলে কি হবে? ”
তেহরান রাগী চোখে তাকিয়ে বলল-
“ ওটারে সাথে নিলে আমার ওটার পেছনই শুধু দৌড়াতে হবে। ঘুরাঘুরি আর হবে না। ”
“ আমরা সামলাবো ওকে। তোর সামলাতে হবে না। ”
অনেক বলাবলির পর তেহরান রাজি হলো। তানভীর সে তো মহা খুশি। পারে না তো লুঙ্গি পড়ে লুঙ্গি ড্যান্স দিতে। আহা খুব ঘুরবে সে। কুয়া কাটার কুয়া নদীতে সেই কয়েকটা ডুব দিবে। তানভীর ফুরফুরে মেজাজে তার জামাকাপড় সব গুছিয়ে নিলো।
প্রায় কত গুলো মাস পর আজ প্রেমা নিজের রুম থেকে বেরিয়ে ছাঁদে এসেছে। তার জীবনের কোনো উন্নতি হয় নি আর। সন্তান হারানো মাতৃত্ব হারানোর এক সপ্তাহ পর তার বাবা রতন শিকদার এসেছিল এ বাড়ি। প্রেমা একটা কথাও বলে নি। ঘৃণায় রাগে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। লোকটা এসে তাকে বলছিলো-
“ শেখর যখন বাচ্চা চায় না নিতে তাহলে নিতে গেলি কেনো বাচ্চা? সেজন্যই তো শেখর এটা করলো। নিজের দোষেই তোর এই অবস্থা হয়েছে। ”
সিরিয়াসলি! একজন বাবা ঐ সময় টাতেও দাঁড়িয়ে তার মেয়ের জামাইয়ের এত বড় অন্যায় টা না দেখে তার দোষ বলছিলো! প্রেমা কি ইচ্ছে করে সখে পড়ে বাচ্চাটা নিয়েছিল? তার অগোচরেই এসে গেছে। মেডিসিন তো খাচ্ছিলো। কিন্তু এক পাতা মেডিসিন কয়দিন যায়? সারা জীবন তো আর এক পাতায় চলে না। শেখর কে বলেওছিলো প্রেমা তার ঔষধ শেষ হয়ে গেছে সে যেনো প্রটেকশন নেয়। কিন্তু না সে নেয় নি। যার ফল স্বরূপ আজ সে নিস্ব। নিচ থেকে শেখরের গলার আওয়াজ ভেসে আসলো। প্রেমা লম্বা একটা শ্বাস ফেললো। না জানি এখন কোন কথা শুনাবে। কোন অত্যাচার শুরু করবে।
প্রেমা নিচে নিজের রুমে আসলো। শেখর সোফায় বসে ম’দ খাচ্ছিলো। প্রেমা আসতেই বলল-
“ যা চানাচুর নিয়ে আয়। ”
প্রেমা নীরব পায়ে রান্নাঘরে এসে দেখলো চানাচুর নেই। রুমে এসে শেখর কে জানাতেই শেখর প্রেমার চুলের মুঠি টেনে ধরে। বিশ্রী রকমের বকা দিয়ে বলল-
“ মা’গি চানাচুর গেলো কই? সেদিন না আনলাম। সব খাইয়া ফেলছস? ”
আশ্চর্য প্রেমা খেতে যাবে কেনো চানাচুর? দু বেলা যে ডাল ভাত পায় খেতে এটাই তো অনেক। সেখানে চানাচুর খাবে তাও প্রেমা!
প্রেমা ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে বলল-
“ আপনার ছোট ভাই খেয়েছে। আমি খাই নি। ”
শেখর ছুঁড়ে ফেলো দিলো ফ্লোরে প্রেমা কে। প্রেমা হাতের কনুই তে ব্যথা পেলো। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
“ একে বারে মে’রে ফেলতে পারেন না আমায়? আধমরা করে বাঁচিয়ে রেখে কি মজা পাচ্ছেন আপনি? ”
শেখর উঠে আসলো। প্রেমার গাল চেপে ধরে বলল-
“ একদম উচ্চ আওয়াজে কথা বলবি না আমার সাথে। তোরে মে’রে ফেললে তো আমারই লস। তোকে আমি জেন্দা লা’শ বানিয়ে রাখবো। ”
“ এতে আপনার কি লাভ? আপনি আমায় বিয়ে কেনো করেছেন ? শুধু শরীরের লোভে? শরীর তো পতিতালয়ও পাওয়া যায়। আপনার এই সংসার জীবনে আমি কি পেয়েছি বলতে পারেন? আপনি কোনো দিন ভালো মুখ করে কথা বলেছেন আমার সাথে? আমার কি লাগবে না লাগবে জিজ্ঞেস করেছেন? আমি অসুস্থ হলে কখনও মাথায় হাত রাখা তো দূর ভালো মুখে জিজ্ঞেস করেছেন আমি কেমন আছি? আমার শরীর টা কেমন আছে? একটা স্বামীর কাছে একটা মেয়ের কি চাওয়া পাওয়া থাকে? আর আমি কি পাচ্ছি প্রতিনিয়ত? আমার বাচ্চাদের মে’রে ফেলছেন। আমাকে অকজ করে দিছেন। প্রতিদিন শরীরে হাত তুলতে ভুলেন না। আর কতভাবে কষ্ট দেওয়া যায় একটা মেয়ে কে? এরচেয়ে মে’রে ফেলুন না। ”
দাহশয্যা পর্ব ৫৬
শেখর প্রেমা কে বাজে ভাবে ছুঁয়ে দিয়ে বলল-
“ না না সোনা,তোকে একেবারে মেরে ফেলা যাবে না। তোকে মে’রে ফেললে তো আমার জ্বালা মিটবে না। এই তোর কারনে সোলেমান আমায় ভরা ক্যাম্পাসে পিটিয়েছিল। তার দাগ এখনও পিঠে আছে আমার। এত সহজে ছেড়ে দিব আমি তোকে? উঁহু। ছাড়বো না। কদিন পর তো তোকে আমি আমার পতিতালয় রেখে আসবো। ”
