দাহশয্যা পর্ব ৫
Raiha Zubair Ripti
জীবন, সে যেন দেওয়ালে ঝুলন্ত ঘড়ির কাটার মতো নিরন্তর প্রবাহিত হয়। কখনো সে থমকে দাঁড়ায়, কখনো আবার এক অদৃশ্য তাড়নায় দ্রুত বয়ে চলে। সময়ের এই অমোঘ গতি কখনো অতৃপ্ত, কখনো বা পরিপূর্ণ। মাঝে মাঝে এমন অনুভূতি হয় যেন সব কিছু হাতের মুঠোয়, আবার কখনো মনে হয় এক মুহূর্তও আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।
এই ধ্রুবক পরিবর্তন, যেন এক দৃশ্যমান অসীমতার অংশ। জীবনের কনভয় কখনো শান্ত, কখনো অসংযত, কিন্তু এই অস্থিরতা ও শান্তিতে এক অদ্ভুত রকমের সম্পর্ক নিহিত থাকে। ঘড়ির কাটার মতো জীবন, কখনো স্থির, কখনো উতাল, তবে সেই এক আড়ালে যা অচেতনভাবে হয়ে চলেছে, তা হল সময়ের প্রতি আমাদের নিরন্তর সেবা।
একটি সেকেন্ড, একটি সিদ্ধান্ত। একেই হয়তো জীবন বলে, যা কখনো সঠিক পথে চলে, আবার কখনো অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
বইয়ের স্তুপে মুখ গুঁজে আপন মনে কিছু ভেবে চলছে মেহরিন। কাল তারা ঢাকায় যাবে। শুনেছে লোকটাও তো ঢাকায় থাকে। বোনের থেকে নাম ঠিকানা জেনে দেখা করার চেষ্টা করবে। খুব তো সেদিন ঊর্মি কে বলল বয়স কোনো ম্যাটার করে না। এখন যদি সত্যি সে দেখতে বুড়ো হয় তখন? আজ আপার কাছে জিজ্ঞেস করবে ঐ লোকের ব্যাপারে।
দুপুর পেরিয়ে বিকেল হলো। সেলাই মেশিনের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো ইতি বেগম। সেই সকাল ১২ টার দিকে বসেছিল মেশিনে জামাকাপড় বানাতে। কলসি থেকে পানি ভরে হাঁক ছেড়ে ঊর্মি কে ডেকে জিজ্ঞেস করলো রান্না বসিয়েছে কি না। ঊর্মি রান্না ঘর থেকে জানালো ভাত বসিয়েছে চুলায়। ইতি বেগম রুম থেকে বেরিয়ে রান্না ঘরে গেলো। ঊর্মি তরকারি কাটছে। আর চুলায় ভাত। ইতি বেগমের চোখ গেলো পাতার বস্তার দিকে। পাতাও ফুরিয়ে আসলো বলে। বাহির থেকে একটা ছালার বস্তা নিয়ে ইতি বেগম বললেন –
-” আমি পাতা গুলো আনতে গেলাম ঊর্মি। ভাত হলে তরকারি বসিয়ে দিস।
একতালা বিশিষ্ট বাড়ি ঊর্মি দের। বাড়িটায় তিন টা রুম। এই বাড়ি আর জায়গা টাই শেষ সম্বল তাদের। আর কিছু করে যেতে পারেন নি ঊর্মির বাবা সাইদুল ইসলাম । ব্যবসায় লস খেয়ে প্রচুর ঋণী হয়েছিলেন সে। তার মধ্যে অতিরিক্ত মানসিক চাপে একদিন হার্ট অ্যাটাক করে পরলোকে গমন করেন। বাড়ির জায়গা ব্যতিত অন্য সব জায়গা গুলো পানির দামে বিক্রি করে দেনা পরিশোধ করতে হয় ইমন দের। যার ফলে বাড়ির জায়গা ছাড়া আর কোনো জায়গা সম্পত্তি তাদের নেই।
ঊর্মি ভাত হলে আলু ভাজি করে। আলু ভাজি দিয়েই রাত আর সকাল টা পার করতে হবে। এমন দিন ঊর্মি দের এসেছে ঘরে এক টুকরা মাছ মাংস কিছুই নেই। সব শেষ। সংসার টা বাবা মা’রা যাওয়ার পর থেকে ঊর্মির মা ইতি বেগম দর্জির কাজ করে চালিয়েছে। আজকাল শরীরও তার ভালো না। ঊর্মির মাকে বলাও হয় নি ঢাকা যাওয়ার কথাটা। অথচ কাল মেহরিন রা ঢাকা যাবে৷ আজ যে করেই হোক মাকে সে বলবে। ভাইয়ের কথা বললে না করতেই পারবে না।
মেহরিন ব্যাগে নিজের জামাকাপড় সহ বাবা মায়ের জামাকাপড় ভরে নিলো। সেরিন যাবে না। সেরিন বাসায় থাকবে। অনিক আসবে। রাত থাকবে মেহরিন রা না ফেরা অব্দি। গতকাল ভোরে তাদের রিজার্ভ করা গাড়ি আসবে। ঊর্মি তো এখনও কিছু জানালো না। মেয়েটা কি যেতে পারবে না তাহলে?
মেহরিন তার মায়ের বাটন ফোন টা নিয়ে ঊর্মির মায়ের নম্বরে কল করলো। ইতি বেগম মেশিনে বসে ছিলেন। ফোনের আওয়াজ পেয়ে ভাবলেন তার ছেলে ফোন করেছে। সেজন্য খুশি হয়ে ফোন ধরতেই দেখলো মেহরিন দের নম্বর। ইতি বেগমের মুখ চুপসে গেলো। ঊর্মি কে ডেকে বলল-
-” মেহরিন ফোন করেছে ঊর্মি।
ঊর্মি দৌড়ে আসলো। ফোন টা নিয়ে বারান্দায় আসলো। মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-
-” কিরে যাবি না? কাল তো ভোরে বের হবো।
ঊর্মি চুপসানো মুখ নিয়ে বলল-
-” মা কে বলতেই পারি নি মেহু।
-” আচ্ছা ফোনটা চাচি কে দে।
ঊর্মি ফোনটা মায়ের সামনে রেখে বলল-
-” মা মেহু কথা বলবে।
ইতি বেগম ফোন টা কানে নিলো। মেহরিন সালাম দিয়ে বলল-
-” কেমন আছো চাচি?
-” এই তো আলহামদুলিল্লাহ ভালো । তুমি?
-” এই তো ভালো আছি। চাচি একটা অনুমতি লাগতো।
-” কিসের?
-” কাল আমরা ঢাকা যাচ্ছি খালার বাসায়। ঊর্মি কেও নিয়ে যেতে চাচ্ছি আমার সাথে। ইমন ভাইও তো ঢাকায় থাকে। ঊর্মি ইমন ভাইয়াকে দেখতে চায়। মানা করো না।
ইতি বেগম উৎফুল্লতা নিয়ে বলল-
-” ইমনের লগে দেহা হইবো?
-” হ্যাঁ ভাইয়ার নাম্বার টা একটা খাতায় লিখে দিও ঊর্মি কে।আর সকালের ভোরে গাড়ি ছাড়বে। ঊর্মি কে জামাকাপড় গুছিয়ে রাখতে বলো।
-” থাকবি কতদিন?
-” ৫-৬ দিন চাচি। আব্বা কে ডাক্তার দেখাবো তো।
-” ওহ্ আচ্ছা আমি বলতাছি গুছিয়ে রাখতে। একটু ইমনের খোঁজ এনে জানাস আমাকে।
-” আচ্ছা চাচি,এখন তাহলে রাখি।
ইতি বেগম ফোন কেটে ঊর্মি কে জামাকাপড় গুছিয়ে নিতে বলল। ঊর্মি তো বেজায় খুশি। জামাকাপড় গুছিয়ে নেয় ছোট্ট ব্যাগে। এই প্রথম তার ঢাকায় যাওয়া।
খুব ভোরের দিকে ঊর্মি রেডি হয়ে নিলো। কালো বোরকা,মুখে নেকাব পড়া হাতে তার ব্যাগ। ইতি বেগম মেহরিন দের বাসা অব্দি দিয়ে আসলো। মেহরিনের মায়ের হাত ধরে বলল – মেয়েটাকে সাথে সাথে রাখতে। মেহরিনের মা সানজিদা বেগম আস্বস্ত করে বলল- চিন্তা করো না ইতি। সাথে সাথেই রাখবো।
মেহরিনের পড়নেও কালো বোরকা মুখে নেকাব। গ্রামের মেয়েদের কোথাও যাওয়া আসার জন্য বোরকা এটাই একমাত্র পোশাক। মেহরিন ঊর্মির হাত ধরলো। চাচির দিকে তাকিয়ে বলল-
-” এই যে তোমার মেয়ের হাত ধরছি। সোজা বাসায় গিয়ে ছাড়বো।
মোতালেব ভুঁইয়া বড় মেয়েকে সাবধানে থাকতে বলে বউ মেয়ে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন। বাড়ির সামনেই প্রাইভেট কার এসে দাঁড়িয়ে ছিলো। সেই কারে উঠে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ঢাকায় এসে কাঙ্ক্ষিত বাড়িটায় এসে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে যায়। মেহরিনের খালা তানজিলা বেগম। মতিঝিলে তাদের বাসা। ৭ তালা বিল্ডিংয়ের মালিক সে। ২৭ বছর আগে ভালোবেসে বিয়ে করেন আলমগীর হোসেন কে। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করেন পালিয়ে। প্রেম ভালোবাসা এসব ভালো নজরে দেখা হয় না বিয়ের আগে গ্রামে। যার কারনে তানজিলা বেগমের পরিবারও বিষয় টাকে ভালো নজরে দেখে নি। আর তানজিলা বেগম ও ঘাড়ত্যাড়া, আলমগীর হোসেন কে ছাড়া কাউকেই বিয়ে করবেন না। তাই বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে আসেন আলমগীর হোসেনের হাত ধরে। আজ অব্দি তানজিলা বেগম বাবার বাড়িতে যেতে পারেন নি। তার বাবা আজও তাদের মেনে নেয় নি। তানজিলা বেগমের দু ছেলেকে অবশ্য আদর করেন তানজিলা বেগমের পরিবার। বড় ছেলে তেহরান এবারর মাস্টার্স করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর ছোট ছেলে তানভীর এবার ক্লাস টেনে পড়ে। মেহরিনের এক ব্যাচ জুনিয়র।
মেহরিনরা বাসায় আসতেই দেখতে পায় তার খালার এত্তো আয়োজন। ডাইনিং টেবিল ভর্তি হরেক রকমের খাবার। এখন বাসায় আছে তানজিলা বেগম আর তানভীর। মেহরিন ঊর্মি কে নিয়ে ফ্রেশ হয়। ঊর্মি ইতস্ত বোধ হচ্ছে। এই প্রথম ঢাকায় আসা। বেশ বড়লোক উনারা তা টের পেয়ে গেছে ঊর্মি। মেহরিন টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল-
-” কিছু ভাবছিস?
-” হুমম।
-” কি?
-” উনারা অনেক বড়লোক তাই না?
-” তা বলতে পারিস। কিন্তু কি হয়েছে এতে?
-” আমার ইতস্ত লাগছে।
-” আমি আছি তো বোকা।
তানজিলা বেগম এসে মেহরিন আর ঊর্মি কে ডেকে গেল খেতে আসার জন্য। মেহরিন ঊর্মি কে নিয়ে আসলো খাবার ঘরে। তানভীর বসে ছিল আগেই। মেহরিন কে দেখে বলল-
-” এই মেহু আপু এখানে বসো। অনেক গল্প আছে তোমার সাথে।
মেহরিন তানভীরের পাশে চেয়ার টেনে বসে পাশে ঊর্মি কে বসতে বলল। ঊর্মি বসলো। তানজিলা বেগম সবাই কে সযত্নে খাবার বেড়ে দিলো। মেহরিন, তানভীর, ঊর্মি আগেভাগে খেয়ে রুমে চলে আসলো। তেহরান এখনও ভার্সিটি তে। তানভীর মেহরিনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
-” কিরে আপু তোমার বলে বিয়ে?
মেহরিন ছোট্ট করে জবাবে বলল-
-” হু।
-” দুলাভাই কি করে?
-” রাজনীতি।
-” কিহ!
মৃদু চিৎকার করে বলল তানভীর।
-” চমকাচ্ছিস কেনো?
-” তোমার কপাল তাহলে পুড়লো। রাজনীতি করা লোকজন ভালো হয় না আপু। এরা মানুষ খু’ন করে। চাঁদাবাজি করে। যেখানে সেখানে মারপিট করে সাথে মারপিট খায়ও। খালুজান কেনো তোমায় এমন লোকের সাথে বিয়ে দিচ্ছে!
মেহরিন তানভীরের কথা শুনে চুপ হয়ে গেলো। আসলেই কি উনি এসব করে? তাহলে সংসার করবে কি করে মেহরিন? তবুও নিজেকে আস্বস্ত করলো তার বাবা নিশ্চয়ই ভালো কিছু জেনেশুনেই রাজি হয়েছেন মেয়েকে ওমন পুরুষের সাথে বিয়ে দিতে।
-” শুধু তাই নয় তানভীর, লোকটা মেহুর থেকে ১৫ বছরের বড়।
-” আল্লাহ তাই নাকি?
-” হুমম।
-” সব দিক দিয়েই কপাল পুড়েছে আপু তোমায়। বাবা মেয়ে বলবে তোমাদের দেইখো। রাজি কেনো হলে? আমি আগে জানলে তো ভাইয়াকে বলে খালুজানের সাথে কথা বলে ভেঙে দিতাম বিয়ে টা।
-” আমার বাবার উপর পুরো ভরসা আছে তানভীর। উনি ভালো কিছু ভেবেই রাজি হয়েছেন। তুই আমার কথা ছাড়। তোর কথা বল।
-” আমি আর কি বলবো। আমার খবর সব সময় ১২ টাতেই আটকে থাকে।
-” কেনো?
-” বাদ দাও আমার কথা। আগে বলো আমার দুলাভাই কোথায় রাজনীতি করে? কোন এলাকার ছেলে সে?
-” শুনেছি ঢাকায় করে।
-” নাম কি?
-” জানি না।
-” কি জানো তাহলে?
-” কিছুই জানি না তার সম্পর্কে।
-” না জেনেই রাজি হয়ে গেলে?
-” বাবা জানে তো।
-” সংসার কি খালুজান করবে?
-” করবো আমি। কিন্তু আমার সকল ভরসার জায়গা সে। চোখ বন্ধ করে তাকে বিশ্বাস করি।
-” ব্যাকডেটেড ই রয়ে গেলে তুমি। আজকাল কেউ সব বাবা মায়ের পছন্দের উপর ছেড়ে দেয়?তাও আবার জীবনসঙ্গী নিয়ে।
-” আমি হতেও চাই না তোদের মতন আপডেটেড। আমি ব্যাকডেটেড ই ভালো।
-” আচ্ছা চলো সন্ধ্যায় মোড়ে খেতে যাই। এরমধ্যে ভাইয়াও চলে আসবে।
-” কোথায় গেছে উনি?
-” একটা কাজে গেছে ভাইয়া। তোমরা থাকো আমি সাইমুলের বাসা থেকে একটু আসতেছি। সন্ধ্যার আগেই ফিরবো। আমাকে রেখে যাবে না কিন্তু।
তানভীর চলে যাওয়ার পরপর ই তেহরান আসে বাসায়। বসার ঘরে খালা খালুকে দেখে সালাম দেয়। মা কে জিজ্ঞেস করে — মেহরিন এসেছে?
-” হ্যাঁ রুমেই।
তেহরান মুচকি হেঁসে তানভীরের রুমে যায়। দরজায় টোকা দিয়ে বলে-
-” আসবো?
ঊর্মি চমকে উঠে আকস্মিক পুরুষালী গলা শুনে। পেছন তাকিয়ে তেহরান কে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তেহরান দেখতে ছ’ফুট লম্বা, ফর্সা গাত্রবর্ণ, চওড়া কাঁধ আর ছিপছিপে গঠন। মুখে সবসময় হাসি ঝুলে থাকে। নাক খাড়া, থুতনিতে হালকা কাট। বড় ঢেউখেলানো চুল।
তেহরান, তানভীরের সাথে আগে থেকেই হাল্কা পরিচয় ঊর্মির। তেহরান রা বেশ কয়েকবার মেহরিন দের বাসায় গিয়েছিল। তেহরান পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে মেহরিন কে দেখতে না পেয়ে এগিয়ে এসে বলল-
-” তুমিও এসেছো ঊর্মি!
-“ হুমমম।
-” ওয়েলমকাম টু আওয়ার ঢাকা সিটি মেহরিনের বেস্ট ফ্রেন্ড। মেহরিন কোথায়?
-” ওয়াশরুমে।
তেহরান বিছানায় আয়েশ করে বসে শব্দ করে বলল-
-” মেহু তাড়াতাড়ি বের হ।
মেহরিন ওয়াশরুম থেকে বের হলে তেহরান বলে উঠে-
-” কিরে হবু জামাইয়ের সাথে দেখা করতে ঢাকায় এসেছিস?
মেহরিন তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল-
-” যার নাম ঠিকানা জানি না তাকে দেখি কি করে?
-” আহাগো অসহায় মেয়েটা। রেডি হয়ে নে।
-” কেনো?
-” মোড়ে খেতে যাব। ঊর্মিমালা তুমিও রেডি হও। এটা তো তোমার ফাস্ট আসা ঢাকা তাই না?
-” হু।
-” যতটা পারি ঘুরিয়ে দেখানোর ট্রাই করবো।
-” এই সময় বাহিরের জিনিস খাওয়া কি ঠিক হবে? করোনার যা প্রকোপ।
-” আরে ধূর করোনায় ধরলে ম-রে যাব। শহীদি মরন হবে আমাদের।
-” আপনার মাথা হবে।
-” বকবক না করে রেডি হ।
মেহরিন, ঊর্মি বোরকা নেকাব পড়ে রেডি হয়। তেহরান অপেক্ষা করলো না তানভীরের ফেরার। করোনা তাতে কি, বৃদ্ধ লোকজনের টঙের দোকানে চা খাওয়া, গল্প গুজব করা বন্ধ হয় নি। যখন হুট করে পুলিশ চলে আসে তখন ফট করে দৌড়ে পালায়।
তেহরান জিজ্ঞেস করলো-
-” কি খাবে তোমরা?
মেহরিন বলল-
-” আপনি যা খাওয়াবেন।
-” ওকে চলো তাহলে ফুচকা খাওয়া যাক।
-” আমি ফুচকা খাই না।
-” তাহলে কি খাও ঊর্মি?
-” চটপটি।
-” আচ্ছা চলো।
একটা ফুচকার স্টলের সামনে এসে দাঁড়ালো। তানভীরের ফোন আসায় তেহরান একটু সাইডে চলে গেল কথা বলতে, মেহরিন কে বলে গেল অর্ডার দিতে। ফুচকার স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক লোক। ঊর্মি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। এত স্মার্ট ছেলে কি না ফুচকা বিক্রি করে!
-” মামা দুটো ফুচকা আর একটা চটপটি দিন।
ইয়াসিন আকস্মিক মামা ডাক শোনায় ভরকে গেল। ইয়াসিন একটা কাজে এসেছিল মতিঝিল। ফুচকার একটা দোকান দেখে লোভ সামলাতে না পেরে এসেছে খেতে। ইয়াসিন ঊর্মির দিকে তাকালো। কালো বোরকা নেকাব পড়া দুইজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইয়াসিন ঊর্মি কে উদ্দেশ্য করে বলল-
-” আমাকে বলছেন?
ঊর্মি বিরক্ত হয়ে বলল-
-” হ্যাঁ মামা। আপনি ছাড়া তো আর কেউ নেই এখানে।
ইয়াসিনের চোখ মুখে হাল্কা রাগের আভাস দেখা গেলো। এই বেয়াদব মেয়ে তাকে মামা ডাকছে! তার উপর ফুচকা ওয়ালাও ভাবছে! সে নিজেই এসেছিল ফুচকা খেতে এখন হয়ে গেলো ফুচকাওয়ালা!
-” এই মেয়ে আমাকে দেখে আপনার ফুচকাওয়ালা মনে হয়?
-” সত্যি কথা বলবো? আসলে আপনাকে দেখে মনে হয় না আপনি এসব বিক্রি করেন।
-” তাহলে বলছেন কেনো?
-” আশ্চর্য খেতে এসেছি তো বলবো না দিতে?
-” সরি ভাই একটু দেরি হয়ে গেল আসতে।
কথাটা বলতে বলতে দোকানদার চলে আসলো। টাকা ভাঙাতে গিয়েছিল দোকানদার। ইয়াসিন টাকাটা নিয়ে ঊর্মির দিকে তাকিয়ে বলল-
-” ইনি হচ্ছে দোকানদার৷ উনার কাছে চান।
ইয়াসিন চলে গেলো। মেহরিন তপ্ত শ্বাস ফেললো। দোকনদার কে বলল দুটো ফুচকা আর একটা চটপটি দিতে। এর মধ্যে তেহরান ও চলে আসলো। তিনজনে খেয়ে নিলো। তেহরান মেহরিন দের নিজের প্রাইভেট কারে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলো। তেহরান কার্জন হলের দিকে চেয়ে বলল-
-” দেখো মেহরিন লাখ লাখ শিক্ষার্থীর স্বপ্ন এই বিশ্ববিদ্যালয়।
-” কিন্তু আমার না।
-” তুমি তো ডক্টর হবে।
-” হুমম।
-” এখন থেকেই পড়া শুরু করো মেডিক্যালের জন্য।
-” চেষ্টা করবো।
এশার আজানের আগ দিয়ে বাড়ি ফিরে আসলো তেহরান ওদের নিয়ে।
ক্লান্ত শরীর নিয়ে পার্টি অফিসে বসে আছে সোলেমান। আগামীকাল বিকেলে শাহবাগে ত্রান বিতরণ করা হবে৷ ওখানে অবশ্য সোলেমান যাবে না। ইব্রাহিম বিতরণ করাবে। সব শুকনো সামগ্রী চাল,ডাল,তেল, মাক্স,স্যানিটারি কিনে প্যাকেট করাও শেষ। প্রায় দেড় লাখ টাকার মতন খরচ হচ্ছে গতকালকের জন্য। এমপি হওয়া তো আর মুখের কথা না। আগে জনগনের ভরসার জায়গা হতে হবে তারপর না হয় অন্য কিছু। আর এই আসনের সব লোকেরই ভরসা আছে সোলেমানের উপর। কারন সোলেমান তার বাপ চাচার থেকেও তুখোড় খেলোয়াড়। সোলেমান যদি ভোটের সময় নিজের প্রচার না ও করে তারপর ও সে জিতে যাবে। এতটাই কনফিডেন্স সে তার আসন নিয়ে।
টেবিলের উপর থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। ইব্রাহিম ফোন করেছে৷ সোলেমান রিসিভ করে কানে নিতেই ইব্রাহিম বলল-
-” কাল চারটার দিকে বিতরণ করবো। আর হ্যাঁ প্রেস মিডিয়াও আসবে।
-” গুড।
কথাটা বলেই সোলেমান ফোন কেটে দিলো।
রাত এখন ৮ টা বাজে। রাতের শহর টা গ্রামের চেয়ে অনেক আলদা। শহরের রাতের শহরে বাহিরে কৃত্রিম আলো জ্বালানো হয়। যা পুরো শহর কে আলোকিত করে রাখে। কিন্তু গ্রামে তা দেখা যায় না। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে মেহরিন ঊর্মি, পাশেই তানভীর বকবক করছে কেনো তাকে ছাড়াই চলে গেলো তারা। বিছানায় ল্যাপটপে কাজ করছে তেহরান।
পাশের ঘরে মোতালেব ভুঁইয়া, সানজিদা বেগম, তানজিলা বেগম আর আলমগীর হোসেন বসে গল্প করছেন। আগামীকাল ডক্টর দেখাতে যাবেন। তেহরান যাবে সাথে। প্রায় সময়ই মোতালেব ভুঁইয়া কে ঢাকায় আসতে হয় ডক্টর দেখানোর জন্য।
মেহরিন আসলো রুমে। মায়ের থেকে বাটন ফোনটা নিয়ে রুমে এসে ঊর্মির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
-” ইমন ভাই কে ফোন কর। শোন উনি কোথায়। আমরা দেখা করবো নি কাল।
ঊর্মির মুখে হাসি ফুটলো। ফোনটা নিয়ে কাগজে লিখে আনা ভাইয়ের নম্বর টা তুলে ভাইকে ফোন করলো।
ইমন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে দশ টাকা দামের একটা পাউরুটি খাচ্ছিল। আকস্মিক মেহরিনের মায়ের নম্বর দেখে ভ্রু কুঁচকালো। ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল-
-” হ্যালো।
-” ভাইয়া আমি ঊর্মি।
-” মেহরিনদের ফোন দিয়ে ফোন করলি যে? বাসার ফোন কি হয়েছে?
-” ভাইয়া আমি ঢাকায়।
ইমন বিস্ময় হয়ে বলল-
-” কিহ!
-” হ্যাঁ মেহরিনের সাথে এসেছি।চাচা চাচিও এসেছে ডক্টর দেখাতে। ভাইয়া তুই কই থাকিস? দেখা কর না। কতদিন হলো তোকে দেখি না। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
-” ঠিক আছে। ঢাকার কোথায় তুই?
-” মেহরিন এই জায়গার নাম কি?
পাশ থেকে তেহরান বলল-
-” মতিঝিল। তোমার ভাইকে বলো শাহবাগ আসতে।
-” ভাই শাহবাগ আসতে পারবে?
-” আচ্ছা বিকেলের দিকে আসবো নি।
দাহশয্যা পর্ব ৪
ঊর্মি ফোন কেটে দিলো। ইমন কি করবে বুঝতে পারলো না। এতদিন পর বোন কে দেখবে অথচ হাতে তার টাকা পয়সা নেই। খালি হাতে কি করে দাঁড়াবে? আর মেহরিন? ও সাথে আসবে নিশ্চয়ই। পকেটে আছে ৫০ টাকার একটা নোট। এটা দিয়ে তো কিছুই হবে না। মেসের কারো কাছে কি টাকা চাইবে? তারা বোধহয় দিবে না। কবে চাকরি মিলবে ভাগ্যে,এত অসহায় লাগছে নিজেকে যা বলার বাহিরে। করোনা টাও আসার আর সময় পেলো না। সব অফিস কলকারখানা সব বন্ধ।
